রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

​স’ এ সতীদাহ,পর্ব ২

স’ এ সতীদাহ, ‘আ’ এ আরও কিছু কথা

ফেসবুকের ব্যাপারটা যেন বৃষ্টির অব্যবহিত আগেঘনিয়ে ফেনিয়ে থাকা মেঘশেক মথিত দূরের পাহাড়। আছে মনে করলে অসীম;নেই মনে করলে নিমীলিন। অনেকসময় মনে হয় কেনই বা আসি। এর চেয়ে ঢের আলোকিত কাজ বাকি পড়ে আছে। তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, আসি। স্পটেড হলদেটে কাচের বাল্বও যদি মাথার উপর জ্বলার আস্তিত্বিক সঙ্কট উজিয়ে রাখে আর হাতে ধরা থাকে একটা ধূলিধূসরিত আয়না- তাহলেও সেই আলোয় সেই আয়নায় নিজের মুখটাকে দেখতে ইচ্ছে করে এক – আধবার- সে মুখ জলবাসন্তীই হোক বা বাসন্তীভুবনমোহিনী।

সেই আত্মাকে ক্ষণিক আলো দিতে রাজা’র জন্মদিনে পোস্ট করেছিলাম ‘ আই লাভ ইউ রাজা’। সতীদাহ যে কতখানি নারকীয় একটি প্রথা, তার একটা নমুনা পেশ করে দেখাতে চেয়েছিলাম যে রাজা আমাদের কিসের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।আমরা যে সেই ইজের বা টেপবেলা থেকে অমুকের অবদান, তমুকের অবদান মুখস্থ করতে করতে ঢুলি , সেই ‘অবদান’ শব্দের চারটে অক্ষরের গুরুত্ব আর ভার নিজের এবং কতিপয় পাঠকের কাঁধে আরোপ করতে চেয়েছিলাম।

তা, সেই লেখা থেকে কিছু মানুষের স্নেহ,ভালবাসা, বক্রোক্তি সব বুকের মধ্যে বিলীন হয়ে গিয়ে যেটা বিঁধে রইল সেটা হল Dipakranjan kar বাবুর রাখা প্রশ্ন- ‘রামমোহনের সময়ে একাধিক সতীর একজন স্বামীর সহমরণে যেতে হোত কিনা। তৎকালীন বয়স্ক প্রধান ব্রাহ্মণের মেয়েরাও কি সহমরণে যেত?’

এই প্রশ্নগুলো আমাকে ভাবাল প্রায় সারারাত, খোঁজাল। এবং রাতশেষে নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়ার আগে (যাকে আমরা ঘুম বলে থাকি) স্বপ্নঝিলিক খেলে গেল মাথায়।সতীদাহ’ র মতো একটি প্রাচীন বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ফেবু’র পেজে কয়েকটা আঁচড় টানার দুঃসাহস- জানি নিতান্তই পল্লবগ্রাহিতা। তবু…ঘন জঙ্গলের মধ্যেও কাঠুরেরা যেতে আসতে যেমন একটা পায়ে চলা পথ তৈরি করে নেয় তেমন পাঠকের হৃদয়ে নেহাতইকাজ চালানো একটা পোস্ট গেঁথে দেওয়ার লোভটাও সামলানো গেল না।

হ্যাঁ। রাজার সময়েও তাই হোত। ১৮১৭ – এর শেষ দিকেশিব বাজারের কবিরাজ মারা গেলে তার দুই স্ত্রী সতী হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে। পুলিশ তাদের বোঝাল। রাজা মাণিকতলা থেকে কালীঘাট ছুটে এলেন তাদের বোঝাতে। নির্দেশ দিলেন, জোর করে বাঁধাছাদা করা যাবে না। চিতায় প্রথমে অগ্নিসংযোগ করা হবে। তারপরেও যদি তারা স্বেচ্ছায় সতী হতে রাজি হয়, তবে আলাদা কথা। রাজা আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, বছর তেইশের বড়বৌ অম্লান বদনে জ্বলন্ত চিতায় বসে পড়ল। সেই দেখে সতেরো বছরের ছোট বৌটিও।তদানীন্তনবাংলা প্রেসিডেন্সিতে ঢাকা বিভাগ, মুর্শিদাবাদ বিভাগ, পাটনা বিভাগ, বেনারস আর বেরিলি বিভাগের তুলনায় কলকাতা বিভাগে সতীদাহের সংখ্যা ছিল বেশি। ১৮১৮ সালে বাংলা প্রেসিডেন্সিতে সতীর সংখ্যা ৮৩৯ জন। তার মধ্যে কলকাতা বিভাগে সতীর সংখ্যা ছিল ৫৪৪ জন।

স্বামীর সঙ্গে একই চিতায় পুড়ে মরার ‘সহমরণ’ প্রথা ছাড়াও ছিল অনুমরণ। স্বামীর মৃত্যুর সময়ে স্ত্রী অনুপস্থিত থাকলে বা গর্ভবতী থাকলে পরে স্বামীর ব্যবহৃত কোন জিনিষ যেমন থালা বাসন, বাঁধানো দাঁত, লাঠি – ইত্যাদি সঙ্গে নিয়ে চিতায় আত্মাহুতি দেওয়াকে বলা হোত অনুমরণ। ১৮২২ সালে ভোলা চামারের বৌ উদাসীয়া স্বামীর মৃত্যুর সাত বছর পর স্বামীর ব্যবহৃত থালা নিয়ে সতী হয়। সেসময় কোন ধনী পরিবার সতীদাহ করার জন্য দুশো টাকা অব্দি আর্থিক অনুদান দিতেন এবং সেই লোভেও অনেক ব্রাহ্মণ তার পরিবারের মেয়েদের সতী হওয়ায় উৎসাহ দিতেন। রাজা রাধাকান্ত দেব ছিলেন সতীদাহ প্রথার সোচ্চার সমর্থক, যদিও তার পরিবারের কোন নারীকে কখনো সতী হয়ে পুড়ে মরতে হয়নি।

এরপর গ্লোবে একটি মৃদু থাপ্পড় দিলে সেটা প্যারাগুয়ের জঙ্গলে এসে দাঁড়ালেও আমাদের আশ্চর্য হওয়ার কথা নয়। তা কথা হচ্ছে, ১৯৬০ সালের আগে পর্যন্ত যে অ্যাচে গোষ্ঠী প্যারাগুয়ের জঙ্গলে বসবাস করত, তারা ছিল শিকারি-সংগ্রাহক। তাদেরকে দেখে আমরা শিকারি-সংগ্রাহক জীবনের অনেক কিছুই জানতে পারি। যখনই অ্যাচেদের কোন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মারা যেত তখন তারা একটা ছোট শিশুকন্যাকে বলি দিত আর তারপর তাদের দুজনকে একসঙ্গে কবর দিত। একবার একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষকে তার গোষ্ঠী ত্যাগ করল। কারণ, সে অসুস্থ হয়ে পড়ায় অন্যদের সঙ্গে চলতে পারছিল না। তাকে তারা একটা গাছের তলায় ফেলে রেখে চলে যায়। কিন্তু সেই মানুষটা আশ্চর্যজনকভাবে অসুস্থতা কাটিয়ে দ্রুত হেঁটে তার গোষ্ঠীতে ফিরে যেতে পেরেছিল। যখনই কোন একজন অ্যাচে নারী দলের জন্য বোঝা হয়ে যেত তখন একজন জওয়ান পুরুষ চুপিচুপি তার পেছনে এসে কুড়ালের এক আঘাতে তার মাথাটা আলাদা করে ফেলত। সুতরাং অ্যাচে গোষ্ঠীর কুড়ুল দিয়ে মাথা আলাদা করাই হোক, সতীদের সহমৃতা হওয়াই হোক আর সেদিনের বৃন্দাবন থেকে এদিনের বৃদ্ধাশ্রম কিংবা রাজনীতিগন্ধী ইহুদী বা রোহিঙ্গার অধিবাসী নিধন হোক – এসবই মূলত সামাজিক অপসারণের এপিঠ ওপিঠ মাত্র। একজন বিধবার সারাজীবনের খাওয়াপরা, ভরণ পোষণ এসব ঝামেলা কে নেবে বাবা, তার চেয়ে স্বামীর চিতাতেই তাকে নিকেশ করে দাও। খেল খতম, সম্পত্তি হজম। সদ্য বিধবার গয়নার হাতাবার লোভ তো ছিলই ( চিতায় উঠবার আগে সতীকে নিজের গয়না , খৈ, এসব ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিতে হোত, সেইসব কাড়াকাড়ির ধুম পড়ে যেত)। তাছাড়া ১৬৮০ থেকে ১৮৩০ সাল অব্দি বাংলায় ‘দায়ভাগ প্রথা’ চালু ছিল,যা সতী হওয়ার নেপথ্যে ইন্ধন যুগিয়েছিল। এই আইন অনুসারে, একজন বিধবা স্বামীর জমিজমা ও সম্পত্তির ভাগ পাবার অধিকারী ছিল এবং সেই বিধবার মৃত্যু হলে উল্লিখিত সম্পত্তি স্বামীর পরিবারের হস্তগত হোত।

কিন্তু বিস্মিত হতে হয় জ্বলন্ত চিতায় শয়ে শয়ে বড়বৌ, ছোট বৌ, মেজো বৌদের অম্লানবদনে আত্মাহুতি দেবার রেওয়াজ দেখে। কি সেই ‘ড্রাইভ’, যার জন্য রক্ষিতা আর স্ত্রী’ র মধ্যে সতী হয়ে পুড়ে মরা নিয়ে চলত হাড্ডাহাড্ডি লড়াই? একটি আখ্যান এরকম যেখানে ইন্দ্র একদিন মর্ত্যলোকে আসেন একজন বেশ্যার বিশ্বস্ততা পরীক্ষা করতে। তিনি যথাযোগ্য অর্থের বিনিময়ে সারারাত সেই নারীর সঙ্গে রমণে অতিবাহিত করেন। সকালবেলায় তিনি মৃত হবার ভান করে বিছানায় পড়ে থাকেন। তখন সেই বারাঙ্গনা ইন্দ্রের সঙ্গে এক চিতায় যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তার বাবা মা তাকে বহুবার বোঝালেন, সে বারাঙ্গনা, একরাত ইন্দ্রের সঙ্গে রমণ করেছে মাত্র। সে ধর্মপত্নী নয় যে সতী হবার দায় তার উপর বর্তাবে। কিন্তু সেই নারী তার প্রতিজ্ঞায় অটল রইল। যখন চিতা প্রস্তুত হল, তখন ইন্দ্র চোখ মেলে বললেন, এসবই তার ছলনা।অতঃপর তিনি সেই বারাঙ্গনাকে নিয়ে স্বর্গলোকে আরোহণ করলেন। এই যে সতী হওয়ার এক অন্ধ উন্মাদনা- এর নেপথ্যে ছিল যুগ-যুগান্তর ধরে চলে আসা ঋষিদের আপ্তবাক্য।মহর্ষি অঙ্গিরা’র বিধান যদি শুনি –‘মৃতে ভত্তরি যা না সমারোহেদ্ধুতাশনং। সারুন্ধতীসমাচারা স্বর্গ্লোকে মহীয়তে।।যে স্ত্রী পতির সঙ্গে জ্বলন্ত চিতায় আরোহণ করে, সে বশিষ্ট’র স্ত্রী অরুন্ধতীর সমান হয়ে স্বর্গারোহণ করে। ‘যে স্ত্রী ভর্ত্তার সহিত পরলোকে গমন করে সে মনুষ্য দেহে যত লোম আছে যাহার সংখ্যা সাড়ে তিন কোটি তত বৎসর স্বর্গে অবস্থান করে।’ হারীতের বচন- ‘ পতি মরিলে স্ত্রী যাবৎ পর্য্যন্ত অগ্নিতে আত্মাকে দাহ না করে তাবৎ স্ত্রীযোনি হইতে কোনোরূপে মুক্ত হয় না।’ বিষ্ণু ঋষির বচন – ‘পতি মরিলে পত্নী ব্রহ্মচর্যের অনুষ্ঠান করিবেন কিম্বা পতির চিতাতে আরোহণ করিবেন।’

এবার আমি আমার সচেতন জিজ্ঞাসু পাঠকের যে প্রশ্ন, ‘বয়স্ক ব্রাহ্মণদের পরিবারেও কি এ ঘটনা ঘটতো’- এই মর্মে কাহানী মে টুইস্টের উপর সামান্য নুন ওমরিচগুঁড়ো ছড়িয়ে দিতে চাই। অনুমরণের ক্ষেত্রে ব্রহ্মপুরাণ বলছে, ‘যা স্ত্রী ব্রাহ্মণজাতীয়া মৃতং পত্নীমনুব্রজেৎ’। মৃত পতির অনুমরণ ব্রাহ্মণী করিবেন না যেহেতু বেদের শাসন আছে আর ইতর বর্ণের যে স্ত্রী তাহাদের অনুমরণকে পরম তপস্যা করিয়া কহেন। ব্রাহ্মণী জীবদ্দশায় থাকিয়া পতির হিত কর্ম্ম করিবেন। আর ব্রাহ্মণ জাতির যে স্ত্রী পতি মরিলে অনুমরণ করে সে আত্মঘাতজন্য পাপের দ্বারা আপনাকে ও পতিকে স্বর্গে লইতে পারে না।’ অর্থাৎ ইতর স্ত্রী’র অনুমরণ যেখানে পুণ্য, ব্রাহ্মণীর অনুমরণ সেখানে আত্মহত্যাজনিত পাপ। পদ্মপুরানে বলা হচ্ছে যে, ক্ষত্রিয় নারীরা সতী হলে পুণ্যবতী বলে বিবেচিত হবে, কিন্তু ব্রাহ্মণীরা যেন একাজ না করেন, তাদেরকে সতী হতে কেউ প্ররোচিত করলে তার ব্রহ্মহত্যার পাপ হবে।সুতরাং প্রতিটি কাহানী তার বুকে একটি করে আয়লা, সুনামী বা ফণী লুকিয়ে রাখে। ‘রাজা’র মতো মানুষ এগুলো খুঁড়ে যখন বার করে আনেন, তখন ‘গেল গেল’ ঝড় ওঠে অথচ ঝড়ের ব্যবস্থা আগেভাগেই নিহিত ছিল।

অথচ এমন অবস্থা কিন্তু আগে ছিল না জানেন।ঋকবৈদিক যুগের মানুষরা ছিলেন জীবনমুখী। শত শরদের আয়ু, পর্যাপ্ত বৃষ্টি, শস্য, সোমরস, সুখী দাম্পত্য কোনকিছু চাইতেই তাদের কুন্ঠা ছিল না। বিশেষত, ঋগবৈদিক বিধবাদের দিকে যদি তাকাই, বিধবা নারী যখন মৃত স্বামীর পাশে শুয়ে আছে তখন দেবর এসে বলবে,ওঠ নারী, এই গতপ্রাণ মানুষের কাছে শুয়ে আছো, এস, জীবলোকের অভিমুখে চল। যে তোমার হাত ধরেছে,সে তোমার গর্ভে সন্তান এনে দেবে, তার অভিমুখে এসো। (১০/১৮/১৯)

এবার মনুসংহিতার দিকে দৃষ্টি ফেরাই, দেখব, ‘ যদি কোন নারীকে সুরক্ষা করার জন্য কোনও পুত্র বা কোনো পুরুষ পরিবারে না থাকে, অথবা যদি সে বিধবা বা অসুস্থ হয়ে থাকে, অথবা যার স্বামী বিদেশে গেছে, রাজা তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। যদি তার সম্পত্তি তার কোনো বন্ধু বা আত্মীয় হরণ করে, তা হলে রাজা দোষীদের কঠোর দেবেন এবং সম্পত্তি ঐ নারীকে ফেরত দেবেন।’অর্থাৎ তখনও সহায় সম্বলহীন বিধবারা সমাজের বোঝা হয়ে ওঠেননি। তাদের রক্ষা করার জন্যও তখন আরেক রাজা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিলেন। এমনকি, বিধবা নারীতে যথাবিধি নিয়োগ সম্পর্কেও খানকয়েক শ্লোক ঠাঁই পেয়েছে।

না। ঋগবেদে সতীদাহের কোন উল্লেখ নেই। সতীদাহ বা সহমরণের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় অথর্ব বেদে, যেখানে বলা হচ্ছে, ‘ ... জীবিতা নারীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মৃতের বধূ হতে।’ (১৮/৩/৩) ।আবার এই অথর্ব বেদই বলছে, ‘ হে মনুষ্য, এই স্ত্রী পুনর্বিবাহের আকাঙ্খা করিয়া মৃত পতির পরে তোমার নিকট আসিয়াছে। সে সনাতন ধর্মকে পালন করিয়া যাতে সন্তানাদি এবং সুখভোগ করিতে পারে।’ (১৮/৩/১)। মনু বিধবাদের ব্রহ্মচর্য্যের মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করার নিদান দিয়েছেন। আমরা যদি একটু আগেই নির্দেশিত বিষ্ণু ঋষির বিধান আরেকবার ঝালিয়ে নিই, তাহলে দেখব, তিনি কিন্তু বিধবার জন্য ব্রহ্মচর্য্য অথবা সতীদাহ দুটো পথই খোলা রেখেছেন। অর্থাৎ এ সংকীর্ণতা একদিনের নয়। এ যেন এক ঋণাত্মক বিবর্তন। আসলে বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক প্রসার, দীর্ঘকাল ধরে মুসলিম ও ব্রিটিশদের পদানত থাকতে থাকতে হিন্দুদের মধ্যে এক ঘোর আস্তিত্বিক সংকটের জন্ম দিয়েছিল। যার ঘুম পুরে যাবার আগেই উঠে পড়ার বাধ্যতা থাকে, তাকে যেমন অ্যালার্মের চীৎকারে ধড়মড়িয়ে জাগতে হয়, ধর্মীয় সংস্কারগুলোকে যারপরনাই কঠোর ও আচারসর্বস্ব করে তুলে লোকের উপর চাপিয়ে দেওয়াটাও সেইরকমই অপচেষ্টা। দিনের পর দিন এভাবে অভ্যেসের পথে চলতে চলতে দেখা যায়, এলার্ম বাজার আগেই ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে। যুগের পর যুগ ধরে এইসব বিকৃতিগুলো আমাদের রক্ত মাংস মজ্জা মেদে অভ্যাসবশে মিলিত মিশ্রিত হয়ে কখন যে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে গেছে, সে বিবর্তনবাদের বিধাতা জানবেন ভালো। উপরন্তু, যেখানে গোটা একটা জাতি ক্রাইসিসে ভুগছে, এমত পরিস্থিতিতে সেই জাতির ‘উণমানব’ নারীদের উপরই যে খাড়ার ঘা’ টা বেশি পড়বে, এতো জানাই কথা। একটি মেয়ের বাল্যকালে বিয়ে হল, তারপর রজোদর্শনে সে শ্বশুরবাড়িতে পা রাখল, সারাজীবন বাড়ির বাইরে পা রাখা বলতে সাকুল্যেএক আধবার তীর্থদর্শন, লেখাপড়ার পাট নেই, বছর বছর বিয়োন, সতীন কাঁটার সঙ্গে সহবাস, শাশুড়ি, ননদ, জায়ের সঙ্গে হাতা খুন্তি নিয়ে মারামারি, আর ফাইনালে এক্কেবারে শব হয়েশ্মশানযাত্রা। এই তো ছিল জীবন। ইহলোকে তাদের এমনকি প্রাপ্তি ছিল যে স্বর্গসুখের লালসা তাদের থাকবে না? সাধে কি মার্ক্স বলেছিলেন, ‘রিলিজিয়ন ইজ দ্য ওপিয়াম অফ দ্য মাসেস অ্যান্ড সাই অফ দ্য অপ্রেসড?’ শোষিতের হতাশ্বাসই তাদের ধর্ম নেশাড়ু করে তোলায় মূল অনুঘটকের কাজ করে আসছে বরাবর। তাছাড়া সেইসময়ে বৈধব্যকে মেয়েদের দোষ বলে মনে করা হোত (এসময়েও নয় কি?)। তখনকার দিনে লেখাপড়া শিখলে মেয়েরা বিধবা হোত, এমন কথাও শোনা যায়। বৈধব্যের সঙ্গে মেয়েদের স্বভাব ও ভাগ্যদোষকে সমার্থক করে দেখার জন্যবহু ‘ভাতারখাকি’ বিধবা নিজের বিবেক দংশন থেকেও চিতার উপর নিঃশংক চিত্তে উঠে বসত।

তবে ব্যতিক্রমের কথাও শোনা যায়। জোব চার্ণক চিতা থেকে সতীকে উদ্ধার করে তাকে বিয়ে করেন। তার গর্ভে চার্ণকের চার কন্যারও জন্ম হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বর্ধমানের সোঞাইগ্রামের জাতিকা মহীয়সী হটী বিদ্যালঙ্কারকে কিন্তু বিধবা হওয়ার পর তাঁর পিতা সহমরণে যেতে দেননি। পিতৃবিয়োগের পর তিনি কাশীধামে গিয়ে স্মৃতি, ব্যাকরণ ও নব্যন্যায়ে অসাধারণ পান্ডিত্য অর্জন করেন। কাশীর পন্ডিতসমাজ তাঁকে ‘বিদ্যালঙ্কার’উপাধি দান করেন। সেখানেই চতুষ্পাঠী স্থাপন করে অধ্যাপনা করতেন তিনি এবং দক্ষিণাও গ্রহণ করতেন। কিন্তু মহারাষ্ট্র দেশের মালহর রায়ের স্ত্রী অহল্যাবাই তাঁর কন্যাকে রক্ষা করতে পারেননি। পরম ব্যক্তিত্বময়ী অহল্যাবাই ত্রিশ বছর বয়সে আক্ষরিক অর্থেই সিংহাসনে বসে রাজকার্য পরিচালনা করতেন। অথচ তাঁর জামাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁর মেয়ে সহমৃতা হওয়ার সঙ্কল্প করলে তিনি কিছুতেই তার মেয়েকে সংকল্পচ্যুত করতে পারলেন না। তখন তিনি মন শান্ত করে কন্যার সহমরণ বসে দেখেছিলেন।

১৮৫৩ সালে কলকাতায় গণিকাদের সংখ্যা ছিল ১২, ৪১৯। ১৮৬৭ –তে সংখ্যাটা বেড়ে গিয়ে হয় ৩০০০০। এই বেশ্যাদের অধিকাংশই এসেছিলেন হিন্দু উচ্চবর্ণ থেকে। তৎকালীন হিন্দুসমাজের আচার বিচার সর্বস্বতা ও কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধবহু স্বাধীনচেতা নারীর পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব ছিল এবং তারা স্বেচ্ছায় গৃহত্যাগ করে গণিকালয়ে পা রাখতেন, যেহেতু স্বাভাবিক উপায়ে তাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার পথ সহজ ছিল না। ১৮৭২ সালে সরকারের নির্দেশে বঙ্কিমচন্দ্র বাংলাদেশ ব্যাপী গণিকাবৃত্তিতে যোগ দিতে আসা মেয়েদের চরিত্র ও যোগদানের কারণ সম্পর্কে এক বিশদ রিপোর্ট পেশ করেন। বঙ্কিমের মতে যেসব মেয়েরা ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসছে, তার নেপথ্য কারণ ‘ennvi and love of excitement.’ সুতরাং বঙ্কিমের ভাষায় ‘women with vicious tendencies are therefore obliged to place themselves beyond its power.. These women are therefore found to lead the prostitutes’ life for want of a better one.’ সুতরাং হাতে গোণা এইকজন vicious বা পাপীতাপী মেয়েদের বাদ দিলে বাকি অধিকাংশ পুণ্যবতী সতীসাবিত্রীরা – যাদের নিজেদের ভাগ্য নিয়ে রোমাঞ্চকর অভিযানে বেরিয়ে পড়ার সাহস নেই, অথচ ইহজীবনে পাবারও কিছু নেই, তাদের পরলোকে গিয়ে একটু সুখ, শান্তি আরাম পাওয়ার লোভটা কি নেহাতই অসঙ্গত?

ইতিহাসেরও একটা শ্রান্তি আছে। চিতোর গড়ে বিজয়স্তম্ভ দেখে সদ্য নেমেছি। নান্দনিক স্থাপত্যেরকাজল -ঘোর তখনও লেপ্টে আছে চোখে। এমন সময়ে চারিদিকে সবুজের উথলোনো সম্ভার দেখে মনে যেন একটা স্নিগ্ধ বাতাস এসে ঝাপটা দিল। গাইড অম্লান বদনে বলে চলেছেন, এই যে সবুজ মসলিন বিছোন ঘাসের প্রান্তর দেখছেন, এগুলো সব ছিল গাড্ডা। এইখানেই আগুন জ্বালিয়ে রাজপুত রমণীরা ‘জওহর ব্রত’ পালন করতেন। গাইড এগিয়ে গেলেন। আমার সামনে মুহুর্তে জ্বলে উঠল খান্ডব অরণ্য। সেই দাউদাউঝলসানো আগুন – প্রপাতেরমধ্যে চোরা লাল ফিতের মতো দুলছেকতগুলো আলতা ভেজা হাত । এই হাতগুলো তো দেখেছিলামসোনার কেল্লা অর্থাৎ জয়সলমীরের দুর্গের দেয়ালে। জওহর ব্রত পালন করতে যাওয়ার আগেসতী রমণীরা দেয়ালে তাদের আলতাছাপ রেখে যেত। সেই হাতগুলোই স্পষ্ট আমার চোখের সামনে শিখার নীলাভ রুমাল নাড়িয়ে বলে চলেছে – টাটা বাই বাই; আবার যেন দেখা পাই।’ আমরা কী তাদের মুখ দেখিয়াছি?

তথ্যসূত্রঃ

সহমরণ বিষয়- প্রবর্ত্তক ও নিবর্ত্তকের সম্বাদ- রামমোহন রায়

এতদ্দেশীয় স্ত্রীলোকদিগের পূর্বাবস্থা – প্যারীচাঁদ মিত্র

প্রাচীন ভারত সমাজ সাহিত্য- সুকুমারী ভট্টাচার্য

সতীদাহ প্রথা ও রাজা রামমোহন রায়- মণিমেখলা মাইতি। দ্য ওয়াল

প্রাচ্যে পুরাতন নারী – পূরবী বসু

উনিশ শতক বাঙালি মেয়ের যৌনতা – অর্ণব সাহা

কলকাতায় গালিব-শামিম আহমেদ

সেপিয়েন্সঃ আ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ হিউম্যানকাইন্ড- ইউভাল নোয়া হারারি

দ্য হিন্দুজঃ অ্যান অল্টারনেটিভ হিস্ট্রি – ওয়েন্ডি ডনাইজার