মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১০, ২০১৯

​যোগ চিত্তবৃত্তি নিরোধাঃ

--আন্তর্জাতিক যোগদিবস । এইভাবেই মহামান্য ভারতসরকারেরপ্রচেষ্টায় দিনটি চিহ্নিত হল বিশেষ নামে । অথচ প্রতিদিন-ই হওয়া উচিত যোগ দিন । দেহ মন প্রাণ সমন্বয়কারী পদ্ধতি-ই যোগ । পতঞ্জলি বলেছেন , চিত্ত বৃতি নিরোধ-ই যোগ । খৃস্টপূর্ব থেকেই ভারত বর্ষে যোগ জনপ্রিয় । এমনকি অনেকে যোগ কে অনার্যদের দান বলে মনে করেন । আর্য সভ্যতার পূর্বে ভারতে যোগ প্রচলিত ছিল বলে ধারণা

সত্যিকার অর্থে যোগের উৎপত্তিকাল ও ক্রমবিবর্তনের ধারা সম্পর্কে সুস্পষ্ট তেমন কোন ধারণা পাওয়া যায় না। তার কারণ, মানব সভ্যতার উষালগ্ন থেকে শরীর ও মনের সুস্থতার জন্য যে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছিল এবং এই অস্থিরতার প্রশান্তির প্রচেষ্টায় বিভিন্ন সময়ে মানুষ যে সকল উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল, তারই ভিতর দিয়ে যোগশাস্ত্রের বিকাশ ঘটেছিল। বিভিন্ন মানুষের অভিজ্ঞতালদ্ধ সে সকল উদ্যোগের সার সংকলন তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন কিছু গবেষক। সেই সূত্রে কালক্রমে গড়ে উঠেছিল সুসংবদ্ধ যোগ শাস্ত্র। প্রাচীন ভারতের ঋষিদের লিখিত এই সকল পাঠে আমরা যোগের বর্ণনা পাই বটে, কিন্তু তাতে সুস্পষ্ট ইতিহাসের পরিবর্তে লৌকিক ও অলৌকিক ধারণার সমন্বিত ধ্যান-ধারণার প্রকাশ দেখি মাত্র। সে দিক থেকে বিচার করলে, উৎপত্তির বিচারে এটি খাঁটি ভারতীয় নয়। তবে এটি বিকশিত ও লালিত হয়েছিল ভারতবর্ষে।

মহেঞ্জোদাড়ো ও হরপ্পা সভ্যতা থেকে ধারণা করা যায় যে- যোগাসনের চর্চা ছিল ভারতবর্ষে আর্যদের আসার বহু আগে থেকে। হিসাবের নিরিখে তা প্রায় খ্রিষ্ট-পূর্ব ৫০০০ অব্দেরও আগে আরম্ভ হয়েছিল। এই সকল সভ্যতার ভারতীয় উত্তরপুরুষরাই পরবর্তী সময়ে এক একটি পৃথক শাস্ত্র রূপে পরিবেশন করেছেন মাত্র।

প্রাচীন ভারতের ঋষিরা এই চর্চাকে একটি পরিশীলিত শাস্ত্রে পরিণত করেছিলেন। সেই শাস্ত্রই যোগ শাস্ত্র নামে কথিত । পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলনই হলো যোগ। বেদ – কাণ্ড থেকেই যোগসাধনার কথা আছে । খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকে পতঞ্জলি নামক জনৈক ঋষি যোগসূত্রগুলো একত্রিত করে, একটি পৃথক শাস্ত্রে রূপ দেন। এই সঙ্কলনে সূত্র রয়েছে ১৯৫টি। এই সূত্রগুলো আটটি অঙ্গে বিভক্ত। এই কারণে একে অষ্টাঙ্গ যোগ বলা হয় । যম , নিয়ম , আসন , প্রাণায়াম , প্রত্যাহার , ধারণ , ধ্যান ও সমাধি ।

পতঞ্জলি যোগ সূত্রগুলোকে চারটি পাদে বিভক্ত করেছিলেন। এই পাদগুলো হলো— যোগপাদ, সাধনপাদ, বিভূতিপাদ ও কৈবল্যপাদ।
যোগশাস্ত্রের চর্চার জন্য কিছু পদ্ধতি বা পথ দ্বারা নির্দেশিত করেছেন। এই পথগুলোকে বলা হয় যোগমার্গ। এর সংখ্যা নিয়ে মতান্তর আছে। সাধারণত যে যোগমার্গগুলির নাম পাওয়া যায়, সেগুলি হলো― কর্মযোগ, ক্রিয়াযোগ, জ্ঞানযোগ,ভক্তি যোগ, মন্ত্রযোগ, রাজযোগ, লয়যোগ, হটযোগ।

৩. আসন: স্থির সুখকর, শরীরিক ও মানসিক অবস্থাই আসন। ঋষিদের আবিস্কৃত আসনের মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা রাখা সম্ভব। দীর্ঘায়ু লাভের জন্য আসন, মুদ্রা অভ্যাস বিশেষ ফলপ্রদ। বিভিন্ন গ্রন্থে চুরাশি লক্ষ আসনের উল্লেখ আছে। তার মধ্যে ষোল শত আসন শ্রেষ্ট। মহর্ষি পতজ্ঞলির যোগ সূত্র গ্রন্থে ১৮৫ টি যোগ সূত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়।

যোগাসন অভ্যাসের উদ্দেশ্য: সাধারনত শরীরকে সুস্থ রাখা, রোগাক্রান্ত শরীরকে রোগমুক্ত করা এবং পরমাত্মার সংগে জীবাত্মার মিলন সাধিত করা। আসন দুই প্রকার-১. ধ্যান্যাসন ২. স্বাস্থ্যাসন। এ ছাড়া ও অনেক মুদ্রা আছে যা অধিক প্রচলিত, স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের অভ্যাসযোগ্য এবং ফলপ্রদ। আসন কেবল যে অরোগ ব্যক্তিরাই করবেন তা নয়। যে কোন ব্যক্তি আসন করতে পারেন। নারী পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ, রোগী-অরোগী, যে কোন অবস্থার লোক করতে পারেন। তবে আসনে ফল পেতে হলে চাই নিরলস সাধনা।

৩. আসন: স্থির সুখকর, শরীরিক ও মানসিক অবস্থাই আসন। ঋষিদের আবিস্কৃত আসনের মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা রাখা সম্ভব। দীর্ঘায়ু লাভের জন্য আসন, মুদ্রা অভ্যাস বিশেষ ফলপ্রদ। বিভিন্ন গ্রন্থে চুরাশি লক্ষ আসনের উল্লেখ আছে। তার মধ্যে ষোল শত আসন শ্রেষ্ট। মহর্ষি পতজ্ঞলির যোগ সূত্র গ্রন্থে ১৮৫ টি যোগ সূত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়।

যোগাসন অভ্যাসের উদ্দেশ্য: সাধারনত শরীরকে সুস্থ রাখা, রোগাক্রান্ত শরীরকে রোগমুক্ত করা এবং পরমাত্মার সংগে জীবাত্মার মিলন সাধিত করা। আসন দুই প্রকার-১. ধ্যান্যাসন ২. স্বাস্থ্যাসন। এ ছাড়া ও অনেক মুদ্রা আছে যা অধিক প্রচলিত, স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের অভ্যাসযোগ্য এবং ফলপ্রদ। আসন কেবল যে অরোগ ব্যক্তিরাই করবেন তা নয়। যে কোন ব্যক্তি আসন করতে পারেন। নারী পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ, রোগী-অরোগী, যে কোন অবস্থার লোক করতে পারেন। তবে আসনে ফল পেতে হলে চাই নিরলস সাধনা।

৪. প্রাণায়াম: প্রাণায়াম অর্থ প্রাণের আয়াম। প্রান হলো শ্বাস রূপে গৃহিত বায়ু আর আয়াম হল বিস্তার। প্রাণবায়ুকে আয়ত্ত করার জন্য শ্বাস প্রশ্বাসের সংযমকে প্রাণায়াম বলে। অনুশীলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে গভীর ভাবে ও ছন্দোবদ্ধভাবে শ্বাস গ্রহণ করলে শ্বাসতন্ত্র বলিষ্ঠ হয়, স্নায়ুতন্ত্র শান্ত থাকে এবং কামন বাসনা হ্রাস পায়। মন মুক্ত হয়। অন্তরের কামনা বাসনা লোপ পেলে দেহাভ্যন্তরের দিব্য আগুন মহিমান্বিত হয়ে জ্বলে উঠে। আয়াম তিনটি পর্যায়ে হয়ে থাকে- (১) পূরক (২) রেচক (৩) কুম্ভক। প্রাণায়ামকে আবার চার ভাগে ভাগ করা যায় (১) সহজ প্রাণায়াম (২) লঘু প্রাণায়াম (৩) বৈদিক প্রাণায়াম (৪) রাজ যোগ প্রাণায়াম। যোগ ত্রয়ে উদ্ধৃত অষ্ট কুম্ভকই প্রাণায়ামের মধ্যে মুখ্য, নিরলস অনুশীলনের মাধ্যমে মনকে নিজের দাসত্বে আবদ্ধ করতে পারলেই প্রাণায়ামে কৃতকার্যতা আসে।

৫. প্রত্যাহার: প্রত্যাহার অর্থ ফিরিয়ে নেয়া। বাহ্যিক বিষয়বস্তু থেকে ইন্দ্রিয় সমূহকে ভিতরের দিকে ফিরিয়ে নেয়াকে যোগে প্রত্যাহার বলে। মানুষের মন সর্বদা বিষয় থেকে বিষয়ান্তরের দিকে ধাবিত হয়। এ সব বিষয় ইন্দ্রিয় দ্বারা সঞ্চিত হয়।ছন্দবদ্ধভাবে শ্বাস নিয়ন্ত্রন করতে পারলে এসব বিষয় থেকে মনকে মুক্ত করে ইন্দ্রিয় সংযম দ্বারা নিয়মিত প্রত্যাহার সাধন করে ইন্দ্রিয় সমূহকে বশে আনতে হয়।

৬. ধারনা: ধারনা অর্থ একাগ্রতা। কোন বিষয় আয়ত্ব করতে হলে চিত্তবৃত্তিকে বিষয়ান্তর থেকে প্রত্যাহার করে ঐ বিষয়ে একাগ্রতা স্থাপন করতে হয়। চোখ বন্ধকরে স্রষ্টার চিন্তা ও জপ করা বা কোনো একটি বিষয় নিয়ে তার গভীরে প্রবেশ করে একাগ্রভাবে চিন্তা করাকে সূক্ষ উপাসান বলে। প্রত্যাহার ও ধারনা এ দুটি স্তর একে অপরের পরিপূরক। একটি বস্তু বা চিন্তা থেকে মনকে সরিয়ে নেয়ার নাম প্রত্যাহার। পরক্ষণে অন্যকোনো চিন্তা বা বিষয়ে মনকে স্থির রাখার নাম ধারনা। মনকে একাগ্র করতে ধারনা সাহায্য করে। সঠিক ধারনা অভ্যাসে মনের ইচ্ছাশক্তি বাড়ানো সম্ভব। আবার কুলকুন্ডলিনীর শক্তি বৃদ্ধি করতে ধারনা অভ্যাস বিশেষ প্রয়োজন। মানবাত্মা সাধনার পথে চলে পরমাত্মাকে লক্ষ্য রেখে। ধারনা শক্তি ব্যতীত সাধনা অপূর্ণ থেকে যায়। সাধনায় সিদ্ধ হতে প্রতিনিয়ত ধারনা অভ্যাস বিশেষ প্রয়োজনীয়।

৭. ধ্যান: ধ্যান অর্থ নিরবচ্ছিন্ন গভীর চিন্তা। মন যদি নিরবচ্ছিন্নভাবে স্রষ্টার চিন্তা করে তাহলে দীর্ঘ চিন্তনের পর অন্তিমে স্রষ্টার নিকটবর্তী হতে পারে। ধ্যানে দেহ, শ্বাস-প্রশ্বাস, ইন্দ্রিয়, মন, বিচার শক্তি, অহংকার সব কিছু স্রষ্টায় লীন হয়ে যায় এবং তিনি এমন এক সচেতন অবস্থায় চলে যান যার কোনো ব্যাখ্যা দেয়া অসম্ভব। তখন পরম আনন্দ ছাড়া আর কোন কিছু অনুভূত হয় না। তখন তিনি অন্তরের আলো দেখতে পান। তখন তিনি নিজের কাছে এবং অন্যদের কাছে আলোময় হয়ে উঠেন।

ধ্যানের যে কোনো প্রক্রিয়াই মূলত ধারনা। ধারনার মনকে চেষ্টার দ্বারা ধ্যেয় বস্তুতে স্থির রাখা হয়, এই অভ্যাসের ফলে মন যখন নিজেই স্বত:স্ফূর্তভাবে ঐ বস্তুতে স্থির হয়ে যায় তখন ধারনা ধ্যানে পরিনিত হয়। যোগ শাস্ত্রে তিন প্রকার ধ্যানের উল্লেখ আছে। ১ স্থুল ধ্যান ২ সূক্ষ ধ্যান ৩ জ্যোতি ধ্যান।

৮. সমাধি = সমাধি অর্থ সম্পূর্নরূপে স্রষ্টায় চিত্ত সমর্পন। ধ্যানের পরিনতি হলো সমাধি। ধ্যান গভীর হলে ধ্যেয় বস্তু ও ধ্যানী অভিন্ন হয়ে উঠে। চিত্ত তখন ধ্যেয় বস্তুতে লীন হয়ে যায়। সেই লয় অবস্থাকে সমাধি বলে। সমাধি প্রাপ্ত হয়ে পরমাত্মার মিলন বা যোগ ঘটে। মন তখন সত্য ও অব্যক্ত আনন্দে ভরপুর হয়ে উঠে। মনের সেই শান্তি বর্ননাতীত। এর সংগে কোন কিছুর তুলনা হয় না। এ অবস্থায় পাপ, পূণ্য, রিপু, দংশন, জরা, মৃত্যু, ব্যাধি থেকে মানবাত্মা মুক্তি লাভ করে।

পতঞ্জলি ১৯৫টা সূত্রকে একত্রিত করে যোগকে একটা সংক্ষিপ্ত আকার দেন। পতঞ্জলির যোগ দর্শন রাজ যোগ নামেই পরিচিত। এর মোট আটটা শাখা আছে - ইয়ম্‌ (সামাজিক বিধি), নিয়ম (ব্যক্তিগত বিধি), আসন (শারীরিক ভঙ্গিমা), প্রাণায়াম (শ্বাস-প্রশ্বাসের বিধি), প্রত্যাহার (চেতনা কে সরিয়ে রাখা), ধারণ (মনঃসংযোগ), ধ্যান ও সমাধি। যদিও, আগেকার যোগাভ্যাসে পতঞ্জলি বেশ কিছু শারীরিক ভঙ্গিমা ও শ্বাস বিধির সংযোগ করেছিলেন সেগুলো ব্যবহার করা হত শুধুমাত্র ধ্যান ও সমাধির আনুষঙ্গিক হিসাবে। পতঞ্জলির সূত্রে কোন আসন বা প্রাণায়ামের নাম পাওয়া যা য় না।