রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

​মার্ক্সবাদ, প্রথম পর্ব

-- লেখক পরিচিতি

রজতকান্তি দাস একাধারে প্রাবন্ধিক , তত্ত্বানুসন্ধানী লেখক ও ঔপন্যাসিক । বিজ্ঞান অর্থনীতি রাজনীতির ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর একাধিক বিশ্লেণাত্বক প্রবন্ধ রয়েছে।‘Beyond the Boundaries’তাঁর লেখা ইংরেজি উপন্যাস দেশ বিদেশ সমাদৃত ।

প্রাক কথন

মার্ক্সবাদ নিয়ে এই প্রাথমিক আলোচনা করার উদ্দেশ্য কেউকে মার্ক্সবাদে দীক্ষা দেওয়া নয়। অথবা কেউকে মার্ক্সবাদী বানানোর চেষ্টাও এখানে নেই। এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো যে মার্ক্সবাদের মতো এক বিশাল দর্শনের ব্যাপারে মানুষের অনুসন্ধিৎসা গড়ে তোলা। একটা কথা মনে রাখতে হবে যে আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে কোন দেশেই মার্ক্সবাদের প্রয়োগ হয় নি। তাই মার্ক্সবাদকে একটি অসফল দর্শন বলারও সময় আসে নি। এমন কি সোভিয়েত ইউনিয়নেও মার্ক্সবাদকে পরিবর্তন করেই বিপ্লব হয়েছিল। এর জন্য অনেকেই এটাকে লেনিনবাদ আখ্যা দিয়েছেন যার প্রয়োগ পরবর্তীকালে ব্যর্থ হয়েছে। এই নিয়ে সঠিক সময়ে আলোচনা করব। গ্রিস, ভেনেজুয়েলা কিংবা পূর্ব ইউরোপের কোন দেশেই মার্ক্সবাদের প্রয়োগ হয় নি। বিশেষত গ্রিস কিংবা ভেনেজুয়েলাতে কিছু কম্যুনিস্ট নামধারী ব্যক্তির হাতে শাসন ক্ষমতা চলে গিয়েছিল যাদের মার্ক্সবাদ সম্পর্কে জ্ঞান প্রায় ছিলই না। এমনকি অর্থনীতিরও কোন জ্ঞান ছিল না। এর জন্য কোন অবস্থাতেই কার্ল মার্ক্সকে দায়ী করা চলে না।

অনেকের ধারণা যে মার্ক্সবাদ শুধুমাত্র মানুষের অর্থনৈতিক দিক নিয়েই আলোচনা করেছে কিন্তু মানবজীবনের অন্য অনেক দিক আছে যা নিয়ে আলোচনা করে নি। এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। আসলে মার্ক্সবাদ মানবজীবন, সমাজ ব্যবস্থা সহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দার্শনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে। এমন কি মার্ক্সবাদে আধ্যাত্মিকতা নিয়েও আলোচনা আছে এবং এর একটি বস্তুবাদী ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তাই দর্শন হিসেবে মার্ক্সবাদ হলো একটি পূর্ণাঙ্গ দর্শন। ইউরোপের অন্য কোন দর্শনেই এতটা ব্যাপক ভাবে মানব জীবন, সমাজ ব্যবস্থা, অর্থনীতি, উৎপাদন ব্যবস্থা, উৎপাদন সম্পর্ক, শ্রেণি বিভাজন, রাষ্ট্রব্যবস্থা, জাতীয়তাবাদ, সময় ও স্থান, ইত্যাদি আরো অনেক বিষয় নিয়ে এতটা ব্যাপক ভাবে আলোচিত হয় নি। তাই মার্ক্সবাদ একক ভাবে যতটা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে যা আর কোন দর্শন করতে পারে নি। এর চেয়েও বড় ব্যাপার হলো যে মার্ক্সবাদ কতকগুলো মূল তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে সামগ্রিক ভাবে এক বিশ্বভাবনার জন্ম দিয়েছিল তার মধ্যে কোথাও দার্শনিক যুক্তির অভাব পরিলক্ষিত হয় নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও মার্ক্সবাদকে যুগোপযোগী করে তোলার দায়িত্ব বর্তমান কালের উপর বর্তায়। এই ক্ষেত্রে মার্ক্সবাদের মধ্যে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করার প্রয়োজন আছে। কারণ ব্যক্তি কখনও সভ্যতার উপরে স্থান পেতে পারেন না।

মার্ক্সবাদ একটি বিজ্ঞান নির্ভর দর্শন হলেও কিছু কিছু ব্যাপারে পরবর্তীকালে বিজ্ঞানের কিছু আবিষ্কার মার্ক্সবাদের বিরুদ্ধে গেছে। সোভিয়েত রাষ্ট্রে এই ধরণের মার্ক্সবাদ বিরুদ্ধ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোকে গ্রহণ করে মার্ক্সবাদের মধ্যে সংশোধনের চেষ্টা চালানো যেতে পারত। এতে মার্ক্সবাদ এক চলমান দর্শন হিসেবে স্থায়িত্ব পেতো। লেনিন নিজেও মার্ক্সবাদের মধ্যে পরিবর্তন এনেছিলেন। কিন্তু স্তালিনের মধ্যে লেনিনের মতো প্রতিভা ছিল না তাই তিনি কিছু অবিজ্ঞানকে আশ্রয় করে মার্ক্সবাদকে বিজ্ঞানসম্মত করার প্রচেষ্টা চালান এবং এই কাজ করতে গিয়ে তিনি রাষ্ট্র ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। এই জাতীয় কাজের জন্য মার্ক্সবাদ দায়ী নয়। বরং মার্ক্সবাদের মধ্যেই এমন কিছু ছিল যা আশ্রয় করে মার্ক্সবাদের মধ্যেই সংশোধন করা যেতে পারত। কাজেই অনেক ক্ষেত্রে মার্ক্সবাদকে জনমন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবার ব্যাপারে কট্টরপন্থী ডিক্টেটররাই দায়ী। এই নিয়েও আলোচনা করব।

মার্ক্সবাদী দর্শন আকাশ থেকে পড়ে নি অথবা মাটি ফুঁড়ে এর জন্ম হয় নি। বরং রেনে দেকার্তে ইউরোপে যে আধুনিক দর্শনের জন্ম দিয়েছিলেন এরপর স্পিনজা, লেবনিৎজ, লেপলাস, ব্রিটিশ এম্পিরিসিস্টস, কান্ট, আলেকজান্ডার, হেগেল প্রমুখ দার্শনিকদের আবির্ভাবে দর্শনশাস্ত্রের মধ্যে এক লাগাতার উন্মেষ শুরু হয়েছিল। এই নিরন্তর ধারায় মার্ক্সবাদের জন্ম হয়েছিল। ইউরোপের তৎকালীন সামগ্রিক দর্শন থেকে নির্যাস নিয়েই মার্ক্সবাদের আবিষ্কার। তবে অন্যান্য দর্শনের সঙ্গে মার্ক্সবাদের মূল তফাতটা ছিল যে এই দর্শন ছিল বস্তুবাদী দর্শন। এই বস্তুবাদী দর্শন জিনিসটা কি তা নিয়ে পরবর্তী পর্বে আলোচনা করব। তবে বস্তুবাদী দর্শন কার্ল মার্ক্সের আগেও ইউরোপে ছিল। ব্রিটিশ এম্পিরিসিস্টদের মধ্যে যে তিনজন দার্শনিক ছিলেন তারা হলেন লক, বার্কলে ও হিউম। এর মধ্যে লক ছিলেন বস্তুবাদী। কিন্তু লক-এর পর এই এম্পিরিসিজম ভাববাদে রূপ নিয়ে নেয়। তাই বস্তুবাদী দর্শনের সেখানেই ইতি পড়ে যায়। পরবর্তীকালে জার্মান দার্শনিক ফুয়েরবাকের উদারবাদী, নাস্তিক্যবাদী ও বস্তুবাদী দর্শন কার্ল মার্ক্সকে প্রভাবিত করেছিল। এছাড়াও পদার্থ বিজ্ঞানের নানা ধরণের আবিষ্কার, গণিত শাস্ত্র ইত্যাদির নির্যাস নিয়েই মার্ক্সবাদের জন্ম হয়।

কার্ল মার্ক্সের পরবর্তীকালে এমন কিছু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার যা বিজ্ঞান সমাজে সত্যরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যার সঙ্গে মার্ক্সবাদের মিল নেই। এই ক্ষেত্রে মার্ক্সবাদের মধ্যেও কিছুটা সংশোধন করা প্রয়োজন। কারণ কার্ল মার্ক্স তাঁর জীবদ্দশায় যতটুকু প্রতিষ্ঠিত সত্যের সন্ধান পেয়েছিলেন তার ভিত্তিতেই দর্শন রচনা করেছিলেন। এটাকে সর্বৈব সত্য বলে মেনে নিলে নিত্য পরিবর্তনশীল ও অনুসন্ধানকামী এই মানব সভ্যতায় ‘মার্ক্সবাদ সত্য হ্যাঁয়’ ধ্বনি ‘রাম নাম সত্য হ্যাঁয়’ ধ্বনির মতোই শোনাবে এবং এর শ্মশান যাত্রার আয়োজন করে দেবে। তাই মার্ক্সবাদকে এক পরম সত্য হিসেবে জ্ঞান করে এই নিয়ে যথা সম্ভব আলোচনা হতে পারে। কিন্তু কার্ল মার্ক্সকে ঈশ্বরে দূত হিসেবে জ্ঞান করে তাঁর দর্শনকে চরম সত্য হিসেবে জ্ঞান করলে মানব সভ্যতা এটাকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে দেবে। এই ধারাবাহিকে আমরা এই নিয়েও আলোচনা করব যে মার্ক্স পরবর্তীকালে যেসব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হয়েছে তার সঙ্গে কোথায় কোথায় মার্ক্সবাদের অমিল রয়েছে।

এই ধারাবাহিকের মূল উদ্দেশ্য হলো যে সত্যের প্রতি যথাসম্ভব নিষ্ঠা রেখে মার্ক্সবাদের সঠিক মূল্যায়নের এক প্রচেষ্টা। সত্যের পরিবর্তে মার্ক্সের প্রতি নিষ্ঠা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তা মার্ক্স সংকীর্তনের মতোই শোনাবে যা আমি করতে চাই না। এই আলোচনায় কার্ল মার্ক্সকে খাটো করে দেখানোর যেমন কোন প্রচেষ্টা থাকবে না আবার তাঁকে ঈশ্বরের আসনে বসিয়ে দেবারও কোন চেষ্টা হবে না। তবে এই পুরো ধারাবাহিকটি রচনার প্রয়াস করছি প্রায় ৩০-৩৫ বছর আগের কিছু অধ্যয়নকে স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে। অনেক ক্ষেত্রে কিছু জিনিস বাদ পড়ে যেতে পারে। তাই যারা মার্ক্সবাদ নিয়ে পড়াশুনা করতে চান তারা এই বিষয় নিয়ে পড়তে পারেন। আমার মতে মার্ক্সবাদ না জানলে আজকের পৃথিবীকে সঠিকভাবে বুঝতে পারা যায় না। আবার শুধুমাত্র মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্রকে জানলে পরে অন্য অনেক ধরণের সমাজতন্ত্রকে বুঝতে পারা যাবে না। যেমন ভারতে যে নেহেরুভিয়ান সমাজতন্ত্রকে নিয়ে আমরা আলোচনা করি তা এসেছে ফেবিয়ান মতাদর্শ থেকে যার সঙ্গে মার্ক্সবাদের কোন মিল নেই। রুশ লেখকরা এই ধরণের সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এই নিয়েও এই ধারাবাহিকে আলোচনা হবে। এছাড়া মার্ক্সীয় অর্থনীতির সঙ্গে অন্যান্য অর্থনীতিবিদদের চিন্তাধারার মধ্যে মূল পার্থক্য কোথায় তা নিয়েও সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব।

পরিশেষে একটা কথাই বলব যে সত্যের প্রতি নিষ্ঠা নিয়েই এই ধারাবাহিক রচনার দায়িত্ব নিয়েছি। মার্ক্সবাদকে চরম সত্য হিসেবে ধরে নিয়ে নয়। কার্ল মার্ক্সও সত্যের প্রতি নিষ্ঠা নিয়েই মার্ক্সবাদ রচনা করেছিলেন। কিন্তু সত্য সদাই পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনশীলতার কারণ হলো মানুষের নিরন্তর অনুসন্ধিৎসা। উপনিষদে বলা হয়েছে ‘চরৈবেতি’ অর্থাৎ চলতে থাকো। যেসব দেশে মার্ক্সবাদকে চরম সত্য হিসেবে গ্রহণ করে এটাকে এক ধরণের ধর্মীয় রূপ দেবার চেষ্টা হয়েছে সেখানেই নিত্য নতুন চিন্তা ভাবনার উন্মেষ ঘটেনি। মানব সভ্যতা বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। মার্ক্সবাদকে সত্য হিসেবে জোর জবরদস্তি প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস আজ সারা বিশ্বজুড়ে নিন্দিত ও ধিক্কৃত। সোভিয়েত রাশিয়ায় মস্তিষ্ক ও স্নায়ু গবেষণা কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া, জিনতত্ত্বে বিশ্বাসী বিজ্ঞানীদের হত্যা করা কিংবা কারারুদ্ধ করে রাখা, ডারউইনের মতবাদকে নিষিদ্ধ করে ভুল হিসেবে প্রমাণিত ল্যামার্কের তত্ত্বকে প্রাধান্য দেওয়া, লাইসেঙ্কোইজমের মতো এক ভয়ঙ্কর অবিজ্ঞানকে মার্ক্সবাদী বিজ্ঞান হিসেবে তুলে ধরে কৃষি ব্যবস্থায় কাজে লাগানো ইত্যাদির কারণে খোদ রাশিয়াতেই মার্ক্সবাদকে ধ্বংস করা হয়েছে। কাজেই খোলা মন নিয়েই মার্ক্সবাদের আলোচনা প্রয়োজন। মার্ক্সবাদে কট্টরপন্থা একটি বিজ্ঞানসম্মত যুক্তিবাদী দর্শনকে সভ্যতার এক চলমান ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে জনমানস থেকে যতটা সরিয়ে এনেছে আর কিছুই তা করেনি। এই কথাটা মাথায় রেখেই মার্ক্সবাদের আলোচনায় ব্রতী হয়েছি। এতে যদি পাঠকরা উপকৃত হোন তাহলে এই শ্রমকে সার্থক মনে করব।


(চলবে)