শনিবার, নভেম্বর ১৬, ২০১৯

​মহাসত্যের বিপরীতে,পর্ব ১৭

প্রাচীন গ্রিকরা যেমন সমুদ্র বোঝাতে নেপচুনের ত্রিশূল এঁকে রাখত/ আমি কি তেমন কোনও চিহ্নের খোঁজ করছি?/ চিহ্ন আর চিহ্নিতের ভেতরের রহস্য কি আমাদের নিয়ে চলেছে,/ কোনও কিনারাহীন কিনারার সূত্রপাতে?

... অতনু ভট্টাচার্য (যা কিছু সমাপতনঃ অপূর্ণাও যেভাবে বাজান )

# সতেরো

অলোকও এই কবির মতন অচেনা জায়গায় গিয়ে বেশ মুক্তির স্বাদ পায়। সে ভাবে, ভারতের প্রথম আধুনিক শিক্ষিত পেশাদার গোয়েন্দা শরৎচন্দ্র দাসও কি তাঁর অচেনা পথে মুক্তির স্বাদ পেতেন?

১৬ নভেম্বর, ১৮৮১ তারিখে দুপুর দুটোয় শরৎচন্দ্র দাসের দলটি পাহাড়ের আড়ালে ইয়াম্পুং দোক পৌঁছোয়। আগের দিন খরস্রোতা রিংবি পেরিয়ে ঘন জঙ্গলেই তাদের রাত কাটাতে হয়েছে। সেই বনে রয়েছে ভালুক, শুয়োর আর সিকিমি চিতা। সেই জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতে সারাদিন ধরে ওরা ফেজেন্ট পাখির ডাক শুনেছে। এই টিয়ারং ফেজেন্ট পাখিদের দেখে শরতের খুব ভাল লাগে। সে ভাবে, ওরা কি ঠান্ডায় শরীর গরম রাখতে এত ডাকে আর ডানা ঝাপটায়? দুর্গম গিরিপথে চড়ার আগে ওজন কমাতে দুই কুলির সঙ্গে তাঁবুটা দার্জিলিঙে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। ওরা তাই বাধ্য হয়ে বড় পাথর আর গাছের ডালে দড়ি বেঁধে বিছানার চাদর টাঙিয়ে ছাঊনি তৈরি করে। আমিষ খাবার বেঁধে রাখতে হয় উঁচু গাছের ডালে। কিন্তু সেখানেও সারা রাত পেঁচা আর ইঁদুরের দৌড়াত্ম চলে।

শরৎচন্দ্র লেখেন, সকালে পরিষ্কার আকাশের নীচে আবার চড়াই পথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ এক বাঁকে বরফঢাকা পাহাড়ের কোলে রোদের ঝিকিমিকিতে দূর থেকে ইয়াং দোক গ্রামটিকে খুব সুন্দর লাগে। দূরবীন চোখে না লাগিয়েও আলাদা করে চিনতে পারি সারি সারি চমরির ছাউনি আর বেশকিছু মানুষের বাসস্থান কুঁড়েঘরগুলোকে। নীল আকাশে প্রার্থনার ধ্বজা উড়ছে । গ্রামের পথ গিয়েছে পাথর বাঁধানো নীচু লম্বা মেন্ডঙের পাশ দিয়ে। কিন্তু গ্রামে পা রাখতে এক করুণ শুনশান ছবি আমাকে অবাক করে। জনপ্রাণী নেই, ভেড়া কুকুর চমরি কিছুই নেই। একটি কুঁড়েঘরের চালে ধ্বজার ডগায় বসে এক ক্ষুধার্ত দাঁড়কাক একনাগাড়ে ডেকে যায়। ভারি পাথরের দেওয়াল আর পাইন গাছের মোটা মোটা গুড়ির ছাত, অপটু হাতে তৈরি ডজনখানেক ঘর নিয়ে গ্রামটি। প্রত্যেক বাড়ির দরজা বন্ধ, দড়িবাধা, ভেতরে ডাই করা বুনো লতা, যা দিয়ে লাল রং তৈরি হয়। ফুরচুং বলে, গ্রীষ্মে বরফ গলে যাবার পর পুব নেপালের ব্যাপারীরা এখানে আসে, লবণের বিনিময়ে এই লতার বান্ডিল নিয়ে যায়!

গ্রাম ছাড়িয়ে পাথরের খাঁজে খাঁজে বিচিত্র ছত্রাকের মতন মৌচাক দেখে অবাক লাগে। তারপরেই শুরু হয় কঠিন চড়াই। এবার অক্টোবরেই ভারি বরফ পড়েছে, ওপরের দিকে গিরিপথগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, এগোতেই নিষেধ করেছিল রিংবির গ্রামবাসীরা। অনেকটা পথ ওঠার পর তাদের সেই সাবধানবাণীর মর্ম টের পাওয়া যায়। তিনদিকে আকাশ জুড়ে শ্বেতশুভ্র ঢেউয়ের মতন শুধুই বরফঢাকা পাহাড়, উত্তরের গিরিশিরা অবধি ছেয়ে গেছে কাংচেন শৃঙ্গের হিমবাহ। অনেক নীচে গভীর খাতের ভেতর সগর্জনে লাফিয়ে ছুটেছে রিংবি। দু-লা পাস-এ পেীছে উগেনের মাথাঘোরা শুরু হয়। এদিকে প্রবল ঝড় ও ঝঞ্ঝার দাপটে এক কুলির পায়ে প্রবল ফ্রস্ট বাইট বা তুষার-কামড়ে. অসহায়ের মতন আছড়ে পড়ে সে। আমি তখন নিজের জুতো আর কাবুলি মোজা খুলে তাকে দিয়ে সঙ্গে আনা নতুন তিব্বতি বুটজোড়া পরে নিই। সম্পূর্ণ পথ তাজা তুষারপাতে ঢেকে রয়েছে, অগত্যা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের ডানা ধরে সন্তর্পণে এগোতে হয়। এখানে কঠিন বরফ, বিপদ পদে পদে, কখনও পা টিপে টিপে, আবার কখনো চার হাত পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে কোনওক্রমে চলা। যে খাত ধরে আমরা এগুচ্ছিলাম সেটি এতই গভীর যে তার আঁকাবাঁকা পথের দিকে তাকিয়ে চোখ ক্লান্ত হয়ে পড়ে, চড়াই ওঠার চাইতেও এখানে বেশি বিপজ্জনক হল উৎরাই বেয়ে নামা।

কুলিরা আমাকে পেছনে ফেলে অভ্যস্ত পায়ে নেমে যায় দ্রুত। অনেকটা নামার পর ক্রমশ একটি ঘন পাইনের অরণ্যে ছাওয়া উপত্যকার দেখা পাওয়া যায় প্রায় দু হাজার ফিট নীচে। একটি শুকনো হিমবাহের কাঁকুরে পথ ধরে দীর্ঘক্ষণ চলার পর সন্ধ্যা ছটা নাগাদ পৌঁছুই গুমোতাং-এ।

যেদিকে তাকাই অসাধারণ দেখতে লাগে এই অপরূপ গিরিখাত গ্রাম গুমোতাংকে; এদিক ওদিক ছোটো ছোটো চারণভূমি, ন্যাড়া পাহাড়চুড়ার নীচের দিকে জুনিপারের বন, খাতের ও-প্রান্ত থেকে বরফগলা জল এসে জমেছে একটি জলাশয়ে; নাম লাচাম পোখরি, অর্থাৎ সৌভাগ্য সরোবর। মাইলখানেক পরিধির এই জলাশয়ের জলের রং কালো। কুলিরা বলে, এখানে জলের অন্তঃপুরে মণিমাণিক্য আছে, আর আছে জলহস্তীর পাল।

১৯ নভেম্বর সকালে একটি হাঁটুডোবা জলধারা পেরোতে হয়। আমরা সবাই জুতো খুলে হাতে নিয়ে প্যান্ট গুটিয়ে সেই কনকনে জল পেরিয়ে অবশ পা মুছে মোজা আর জুতো পরি। ফ্লাস্ক থেকে গরম চা খাই। তারপর চড়তে থাকি বাগতোলা-র চড়াই। শুকনো হিমবাহের খাত ধরে, দুধারে ফার আর জুনিপারের বনের ভেতর দিয়ে পথ। বালি-কাকরের ওপর দিয়ে বইছে একটি শীর্ণ জলের ধারা । বাগতোলায় বিজন শূন্যতার মাঝে রয়েছে ছোট্ট একটি দংখাং বা যাত্রীছাউনি, তারপরেই পথ ভাগ হয়ে গিয়েছে দুদিকে। জলধারার পাশ দিয়েই এগুচ্ছিলাম। ইয়াম্পুং-এর মেষপালক, গোপালক কিংবা ইয়াংমার লবণ ব্যাপারীরা সাধারণত এই পথ ব্যবহার করে না। এখানে এক ধরনের বিষাক্ত লতা জন্মায়, যা খেলে ভেড়া কিংবা চমরিরা অসুস্থ হয়ে পড়ে, এমনকি মারাও যায়। কিন্তু এখানেও অসংখ্য টিয়ারং ফেজেন্টকে রডোডেনড্রনের ফল ঠুকরে খেতে দেখেছি। চড়াই চড়তে চড়তে দূরে এক ঝলক বুনো ভেড়ার পালও দেখেছি। শিখরে ওঠার আগে ক্রমশ রডোডেনড্রন আর জুনিপার হারিয়ে প্রাণের চিহ্ন থাকে শুধু পাথরের খাঁজে খাঁজে লাইকেন আর শ্যাওলায়। গত কয়েকদিন ধরে শুধু সিদ্ধভাত আর নুন চা ছাড়া পেটে আর কিছু পড়েনি। বাগতোলার কঠিন পাস পেরোবার মতন শক্তি ছিল না দেহে। কুলিদের অবস্থা আরও করুণ, বিপুল মালের বোঝা রয়েছে একেকজনের পিঠে। কনকনে ঠান্ডা বাতাসে ছুরির ধার, আকাশে মেঘের পাল বুনো চমরির মতন উদ্দাম, এতটাই নীচ দিয়ে ছুটেছে বুঝি হাত বাড়ালে ছুঁয়ে ফেলা যাবে। অবশপ্রায় দেহ নিয়ে প্রত্যেকে কোনোক্রমে চড়তে থাকি ওপরের দিকে। মাথা ঘুরতে থাকে, তীব্র বমির ভাব। একসময় নিজের অজান্তেই বরফে গড়িয়ে পড়ি।

পাসের মুখ পর্যন্ত বাকি পথটা আমাকে ফুরচুং পিঠে করে বয়ে এনেছে। ওকে দেখলে বোঝা যায় না যে গায়ে এত শক্তি! মাঝে কেউ একটু চা বানিয়েছিল, কিন্তু আমার খাবার মতন অবস্থা ছিল না। ঠাণ্ডায় জমে সর্বাঙ্গ অসাড় হয়ে আসছিল, মাথা যন্ত্রণায় ছিড়ে যাচ্ছিল। ফুরচুং আমাকে জোর করে একটা হিমজমাট ডিম আর কিছু কাঠবাদাম, কাজু ও কিসমিস খাইয়ে দেয়। সর্বাঙ্গ কম্বলে জড়িয়ে, গুটিসুটি অবস্থায় মালের গায়ে দেহ ঠেসিয়ে রাখা হয়, যাতে গড়িয়ে পড়ে না যাই। এভাবে অনেক কষ্টে রাত কাটে। যদিও মাঝরাতে মেঘমুক্ত আকাশে থালার মতন চাঁদ উঠেছিল, সাদা বরফের গায়ে আলোর বিকীরণে অপার্থিব হয়ে উঠেছিল চারিদিক; মনে হচ্ছিল মৃত্যুপুরীর কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। অস্ফুট তন্দ্রার ভেতর দূর পাহাড়ের গা থেকে ভেসে আসছিল হিমবাহ ঝরে পড়ার বিচিত্র হাড় হিমকরা শব্দ। কিন্তু আমি যেন সেই শব্দ থেকেই উষ্ণতা পাওয়ার চেষ্টা করছিলাম।

কিন্তু সকালেও নিজের পায়ে চলার মতন শক্তি ফিরে পাইনি। ফের ফুরচুঙের কাঁধে চেপে অতিকষ্টে সেই কঠিন গিরিপথ টপকে হাজার দুয়েক ফুট নেমে আমরা একটি ঘাসে ছাওয়া সুন্দর উপত্যকায় পৌঁছোই। এখানে চারপাশে খর্বাকৃতি রডোডেনড্রনের বন, সাবঅ্যালপাইন বড়ো বড়ো গাছ আর বড়ো বড়ো ফার্ন। পাখি ডাকছে। এক আশ্চর্য শান্তির পরিবেশ।

আমাকে পিঠ থেকে নামিয়ে নীরবে হাঁটু মুড়ে বসে বার কয়েক মাটিতে মাথা ছোঁয়ায় ফুরচুং। কোনও দেবতা নয়, পাথর নয়; নিজের গলায় ঝোলানোএকটি লকেটে চুমু দিয়ে দুই চোখে ছোঁয়ায়। তারপর বলে,— আমার পরিবারের কাছে এ হল পবিত্র ভূমি, ঠিক এই জায়গায় আমার বাবা চোখের দৃষ্টি ফিরে পেয়েছি ল। ফিরিয়ে দিয়েছিল এক সাহেব। সে অনেক কাল আগের কথা। আমি তখন এইটুকুন! দু’হাত ছড়িয়ে একটি শিশুর আকার দেখায় ফুরচুং। তারপর নিজের গলার লকেটটি খুলে আমার হাতে দিয়ে বলে,—এই মেডেলটা সাহেব আমাকে দিয়েছিল!

আমি দেখি, রাজা চতুর্থ জর্জের মুখ খোদাই করা একটি রুপোর ফার্দিং, রোমান হরফে সাল লেখা রয়েছে আঠেরশো বিয়াল্লিশ!

ফুরচুং-এর কাংবাচেন গ্রামে পৌঁছুতেই আমাদের খুব সমাদর হয় বাড়িতে তৈরি ছাং আর যবের আটা দিয়ে। ছাং-এর বাটিতে এক চিমটে আটা ফেলে এক চুমুকে পান করতে হয়। এটাই লেপচা রীতি। পুরো দলটাই এত ক্লান্ত ছিল যে ওই গ্রামে সবাই তিনদিন একরকম শুয়ে বসে ঘুমিয়ে কাটাই। দ্বিতীয় দিনেই আমি পায়ে জোর পাই। মনে মনে ভাবি, এই গ্রাম আমারও প্রাণ বাঁচাল! আমার কাছে ফুরচুঙ এখন দেবদূতের থেকে কম কিছু নয়। কাংচেন নদীর ধারে অনেক উঁচুতে ধাপকাটা জমিতে এই দক্ষিণ পশ্চিমমুখী গ্রামের চারপাশে হিমালয়ের উঁচু উঁচু বরফঢাকা শৃঙ্গ।

চতুর্থদিন সকালে আবার তিব্বতের পথে যাত্রা শুরু। গ্রাম ছেড়ে পথ গিয়েছে শ্যাওলায় আবৃত সুপ্রাচীন দেওদার আর সিলভার ফারের অরণ্যের মাঝখান দিয়ে। শুকনো হিমবাহের খাত ধরে আমরা এগুতে থাকি ওপর দিকে। কিছুটা দূরে নদীর বাঁকে ছোট্ট একটি মঠ। সেখানে জলের তোড়ে ঘুরছে প্রার্থনার চাকা। গাঁয়ের পূর্ব সীমানায় সেতুর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ফুরচুঙের মা( যাঁর তরুণ বয়সের বর্ণনা রয়েছে হকারের জার্নালে) ও অন্যান্য বয়স্কারা। তাঁদের হাতের থালায় সুরাপাত্র আর যবের আটা। আটা মেশানো ছাঙে চুমুক দিয়ে ভক্তিভরে থালার ওপর কয়েকটি মুদ্রা রেখে যাত্রা শুরু হয়।

শরৎচন্দ্র দাসের ইংরেজি এতই সহজ যে পড়তে পড়তে অলোক যেন চোখের সামনে সেই দৃশ্য দেখতে পায়! নাংগোলা পাস পর্যন্ত কঠিন চড়াই পথে নেওয়া হয়েছিল দুটি তিব্বতি ঘোড়া, প্রতিটির ভাড়া আটআনা। শরৎ ও উগেন চড়েছিল ঘোড়ায়। বন্দুক কাঁধে নিয়ে পথ দেখিয়ে সবার আগে আগে চলেছে গত কয়েকদিনে শরতের চোখে হিরো হয়ে ওঠা ফুরচুং। আগের রাতে সে প্রচুর মদ্যপান করেছিল, কিন্তু ফুরচুং-এর হাঁটার দৃপ্ত ভঙ্গিতে তার রেশ ছিল না। শরৎচন্দ্র লিখেছেন, হিমালয়ে আমি যত মানুষের সংস্পর্শে এসেছি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বম্ভ ও নিবেদিতপ্রাণ এই ফুরচুং। ওর সুবাদেই কাংবাচেন গ্রামে পেয়েছি এমন আন্তরিক আতিথেয়তা আর প্রচুর উপহার – আলু, মাখন, বাজরা, মুরোভা এবং আস্ত একটি ভেড়া।

অলোক পড়েছে, ওয়ারেন হেস্টিংস-এর নির্দেশে তিব্বত যাত্রার সময় সঙ্গে করে আলুর বীজ নিয়ে গিয়েছিলেন জর্জ বোগল। চলার পথে প্রায় প্রতিটি গ্রামেই সেই বীজ পুঁতেছিলেন তিনি। তার প্রায় পঁচাত্তর বছর পরে হুকারের দিনলিপিতে, কিংবা আরও পরে শরৎ দাসের ভ্রমণবৃত্তান্তে হিমালয়ের প্রত্যন্ত গ্রামে আলু চাষের উল্লেখ রয়েছে। এ ব্যাপারে বোগল ছাড়া আর কারোর সক্রিয় ভূমিকা ছিল কি না জানা যায় না, যদিও হুকার লিখেছেন তিব্বতে আলুর চাষ শুরু হয়েছিল নেপালে ইংরেজদের বাগান থেকে। আজও এই অঞ্চলের পাহাড়ে এক বিশেষ ধরনের আলু পাওয়া যায়, টকটকে লাল ও অতীব সুস্বাদু।

শরৎচন্দ্র দাস লেখেন, তাছাড়া বেতের ঝুড়ি ভরে নেওয়া হয়েছে রক্তের পুডিং: জবাই করা ভেড়ার অন্ত্রের ভেতর তাজা রক্ত আর জবের আটা ভরে সিদ্ধ করা একধরনের সসেজ।

সামনে দুরূহ বাধা কাংলাচেন। সেটি পার হতে পারলে ততোধিক দুরুহ সীমান্তপ্রহরীদের এড়িয়ে তিব্বতের শিগাসে প্রদেশ। দার্জিলিং থেকে সিকিমের ভেতর দিয়ে তিব্বত যাত্রায় পুরো পথটাই পশুপালক, বিশেষত মেষপালকদের গ্রামের ভেতর দিয়ে। এখানে এমনকি ভেড়াদের মালবহনের কাজে ব্যবহৃত হতে দেখেছি, এছাড়া জংগলে দেখেছি বন্য ভেড়ার পাল।

অলোক জানে,হিমালয়ের এই গোটা অঞ্চলেই ভেড়ার মাংস একটি প্রধান খাদ্য। তার বিবিধ পদ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে সংরক্ষণের বিচিত্র সব পদ্ধতি। চলার পথে একটি বসতিতে ফাগড়া নামে এক ধরনের ভেড়ার আস্ত ধড় কেনা হল। এই ভেড়ার দেহে প্রভূত চর্বি জমলে মেষপালকেরা সেগুলিকে ছালচামড়া সমেত জীবন্ত দগ্ধ করে।

শরৎচন্দ্র লিখেছেন, যাতে একফোঁটা চৰিও অপচয় না হয়। তখন নভেম্বরের শেষ, তখন বাকি দুনিয়ার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন ওই পাহাড়ি গ্রামগুলোয় আসন্ন টানা প্রবল শীতের দিনগুলির জন্য খাদ্যসংগ্রহ ও তা সংরক্ষণের তোড়জোড় চলছে। এমনই একটি গ্রামে দেখেছি অসংখ্য ভেড়া নিধনপর্ব : নীচু পাথরে ঘেরা খোয়াড় থেকে শান্ত প্রাণীগুলোকে সারিবদ্ধভাবে নিয়ে যাওয়া হয় বধ্যভূমির দিকে। হত্যার পর গ্রামের মোড়লবাজির প্রার্থনাঘরে সারি দিয়ে ঝুলছিল পাগড়াগুলি।

অলোক জানে, মোঙ্গলিয়ার অধিবাসীদের মধ্যেও সংরক্ষণের একই ধরনের পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, তবে আগুনে ঝলসানোর বদলে জীবন্ত প্রাণীগুলিকে ফুটন্ত জলে ডুবিয়ে মারা হতো। একে বলা হতো তাং-ইয়াং বা ভাপানো ভেড়া।

শরৎচন্দ্র লিখেছেন, কাংবাচেন থেকে উঁচু উঁচু ফার আর দেওদারের বনের ভেতর দিয়ে পথ উঠছে ইয়াংমায়। এই পথে নানা রঙের ফেজেন্ট ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখেছি। কুলিরা জানায়, এই বনে কস্তুরি হরিণ আর বুনো ভেড়া রয়েছে। মাইল দুয়েক চলার পর একদল ব্যাপারির সঙ্গে দেখা হয়। দশ-বারোটা চমরি গাই আর ভেড়ার পিঠে কম্বল, যব, লবন আর চামড়ার মোট নিয়ে চলেছে। ফুরচুং তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, কাংলাচেন গিরিপথ কি খোলা আছে?

কয়েকজন বলে, আছে!

একজন আবার বলে, দিনকয়েক আগে ভারি তুষারপাতে সম্পূর্ণ ঢেকে গিয়েছে!

অসংখ্য জুনিপার গাছে ভরা একটি ছোট উপত্যকা পার হয়ে ফের খানিক দূর উঠে চারপাশের দৃশ্য অনেকদূর দেখতে পাওয়া যায়। একদিকে নাঙ্গো লা, শুকনো হিমবাহের খাতের ওপারে সারি সারি বরফঢাকা বরফশৃঙ্গ। অন্যদিকে লালচে অতিকায় গ্রানাইট পাথরের স্তূপ দেখে মনে হয় যেন কোনও সভ্যতার ধ্বংসচিহ্ন। সন্ধ্যা নামার আগে নদী থেকে প্রায় পঞ্চাশ ফুট উপরে সবুজ চাটানের ওপর ইয়াংমা গোম্পায় পৌঁছাই আমরা। এখানে একটি জীর্ণ কুঠুরিতে রাতে থাকার ব্যবস্থা করে ফুরচুং। কিছু ডিম আর দুধ জোগাড় করে আনে পাশের গ্রাম থেকে, গোম্পার এক আনির( সন্ন্যাসিনী) সাহায্যে রান্নার আয়োজনও হয়। লামারা সবাই ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাৎসরিক শাস্ত্রপাঠের কঠোর আচার পালন করছিলেন। ওখানে মোট পনেরজন লামা আর সাতজন আনির বাস। কাঠের গোম্পায় বিরতিহীন মন্ত্রোচ্চারণের ধ্বনি মৌচাকের মৌমাছিদের মিলিত গুঞ্জনের মতন শোনায়।

এদিকে ফরচুং আর তার সঙ্গী ফুন্টশো মদ খেতে গ্রামে গিয়ে সারা রাত কাটিয়ে দেয়। একটা শঙ্কায় আমার বুক দুড়ুদুড়ু করতে থাকে, যদি নেশার ঘোরে ওরা যাত্রার উদ্দেশ্য ফাঁস করে দেয়? পরদিন সকালবেলায় গ্রামের জনাকয়েক বয়স্ক পুরুষ আসে। তাদের মধ্যে গ্রামের মোড়লও রয়েছে: তার মাথায় তিব্বতি টুপি, কানে লম্বা দুল, পরনে লাল সার্জের পুরুগ, সে একটি চমরের পিঠে চেপে এসেছে। তীর্থযাত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছিল আগেই, ভাষা ও পোশাক থেকেও সন্দেহের কারণ বিশেষ ছিল না। তবু এই প্রতিকূল ঋতুতে তীর্থযাত্রায় বের হবার কারণ জানতে চায় মোড়ল। আমি সহজেই তার সন্দেহ নিরসন করি স্বচ্ছন্দ তিব্বতিতে ধর্মীয় বাচনে।

সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে মোড়ল,-লাসো লাসো!

সে তাড়াহুড়োয় পুণ্যাত্মার জন্য কোনও উপহার না আনতে পারায় মার্জনা চায়। আমি বলি,- শাংপোই যা চোগ ! মানে,আগামী বছর আবার দেখা হবে!

গ্রামের সবাই সমস্বরে বলে ওঠে,-শাংপোই যা চোগ !

কিন্তু তাদের মধ্যে একজন কঠিন চোয়ালের মানুষ আমার দিকে আঙুল উচিয়ে বলে,- এই লোকটা ভারতীয়!

আরেকজন বলে,- এই হিন্দুটা গিরিপথের বরফ পেরোতে গিয়ে বেঘোরে মারা পড়বে! কুলিরা শিগগিরই ফিরে আসবে সেই সংবাদ নিয়ে! ফুরচুং তখন বুক চিতিয়ে বীরের মতন দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে তর্জনী নাড়ায়। তার গলায় ঝোলানো ফার্দিং লকেট তুলে কপালে ঠেকায়। গ্রামের মানুষ সসম্ভ্রমে পথ ছেড়ে দাঁড়ায়।

গোম্পা ছাড়িয়ে খানিক পথ যেতে একসারি মেন্ডং আর চোর্তেন, তারপরেই ইয়াংমা নদীর ঢালে দেখা যায় একপাল বুনো ভেড়া চরছে। কিন্তু এই উপত্যকার মানুষেরা বনপ্রাণী হত্যা করে না, অগত্যা শিকারে নিরস্ত থাকতে হয়। বেলা তিনটে নাগাদ দূর থেকে দেখা যায় ইয়াংমা গ্রাম, ৩০ বছর আগে যার বর্ণনা লিখে গেছেন জোসেফ হুকার। তিনি যখন গিয়েছিলেন গোটা গ্রামটাই আসন্ন প্রবল শীতের অপেক্ষায় ঝিমিয়ে পড়েছিল, পিকা ইঁদুরের মতন কোটরে সেঁধিয়ে এসেছিল।

শরৎ লিখেছেন, পুরুষেরা আলস্যে মদির, কিন্তু মেয়েরা মকাই ঝাড়ছে, জ্বালানি কাঠ যোগাড় করছে, ঘরকন্নার টুকিটাকি কাজ করছে। এখানেও ফুরচুংকে ছাং-এর আসর থেকে ছাড়িয়ে আনতে বেগ পেতে হয়। ঘণ্টাদুয়েক চলার পর উপত্যকা পেরিয়ে একটি ঝুলন্ত পাথরের নীচে তুষারমুক্ত জমিতে আমাদের তাঁবু পড়ে।

পরদিন পথ গিয়েছে ইয়াংমার খাত ধরে, নদীর বুক স্বচ্ছ বরফের চাঙড়ে ঢাকা। চারদিকের শৃঙ্গগুলি আকাশ ছুঁয়েছে। আকাশে পাখি নেই, মেঘের চিহ্নমাত্র নেই,এক অদ্ভূত নৈঃশব্দ্যের ভেতর কেবল পায়ের নীচে বরফ ভাঙার খচরমচর শব্দ। একজায়গায় উপত্যকাটি বেশ প্রশস্ত। সেখানে একটি প্রায় জমে যাওয়া সরোবর। উপেন বলেন, বর্ষার পর এখানে দোকপারা চমরির পাল নিয়ে চরাতে আসে। এখানেই গোল হয়ে বসে চা ও প্রাতরাশ সারা হয়।

তারপর থেকেই চড়াই ক্রমশ কঠিন থেকে কঠিনতর হতে থাকে। পথে তুষার সরে গিয়ে বেরিয়ে আসে ন্যাড়া গ্রানাইট। ইয়াংমা নদীর উৎসমুখের কাছাকাছি এসে ফুরিয়ে যায় উদ্ভিদরেখা। একটি হিমবাহ সিকি মাইল চওড়া আর লম্বায় প্রায় তিন মাইল, সেখানে পথে কোমর পর্যন্ত বরফ। ফুরচুং আবার আমাকে কাঁধে তুলে নেয়। তারপর শুরু হয় বিশালাকার নগ্ন কালো পাথর আর তুষারের রাজ্য। ঠিক হয়েছিল ফুগপা-কারপো বা শ্বেত গহ্বর নামে একটি বরফের গুহায় রাত্রিবাস হবে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও ততদুর পৌঁছনোর আগেই অন্ধকার নেমে আসে। ঘন কুয়াশায় এক হাত দূরের দৃশ্যও দেখা যায় না, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জমে বরফ, পদে পদে ক্রিভাস বা পাথরের ফাটলে মরণফাঁদ। ফুগপা-কারপোয় পৌঁছনোর আশা ছেড়ে দিয়ে দুটি জোড়-লাগা পাথরের মাঝে বরফ সরিয়ে গুটিসুটি মেরে কোনোক্রমে রাতের আশ্রয় নেওয়া গেল। ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসা অক্সিজেন, প্রবল শৈত্য, সারাদিনের পথশ্রম আর ক্ষুধাতৃষ্ণায় কতখানি যে অবসন্ন হয়ে পড়েছিলাম সেটা ভাষায় ঠিক প্রকাশ করা যাবে না! সেই ভয়ঙ্কর রাত্রির কথা মনে পড়লে এখনও কেঁপে উঠি । আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন রাত ছিল সেটি। সারারাত ধরে হাওয়ায় ভেসে আসছিল। বরফের গুঁড়ো, গায়ের কম্বলে জমে উঠছিল স্তূপাকারে, কুয়াশা চুঁইয়ে আসা নিস্প্রভ জ্যোৎস্নায় পাহাড় থেকে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল হিমপ্রপাতের শব্দ।

৩০ নভেম্বর। সকালে দিনের আলো ফুটতেই দেখি - চারদিক উজ্জ্বল সোনায় মোড়া, সামনে ঝকঝক করছে কাংলাচেন শৃঙ্গ। মাত্র কয়েক গজ দূরেই রয়েছে ফুগপা কারপো, রাতের অন্ধকারে দেখা যায়নি। তবে কোনও গুহা নয়, দুটি খাড়া আলগা পাথরের মাঝে মাথাগোঁজার মতন ঠাঁই। সৌভাগ্যক্রমে রাতে নতুন করে আর তুষারপাত হয়নি। বরফের ওপর গাইডের আঁক কাটা পথ ধরে খুব সন্তর্পনে গিরিপথের পিঠে উঠে এলাম আমি আর উগেন। মাথার উপর মেঘহীন নীল আকাশ, যতদূর দেখা যায় অসংখ্য নাম না জানা তুষারাচ্ছাদিত পর্বতশৃঙ্গ, উত্তরপশ্চিমে দেখা যায় ফেরুগ পর্বতমালা।

আহ, তিব্বত!

বড়ো বড়ো পাথর আর নুড়ি বিছানো শুকনো হিমবাহের খাত ধরে নিচের দিকে নেমে আসতে আসতে পাহাড়ের রং ক্রমশ পাল্টে যায়। বরফঢাকা সাদা থেকে ক্রমশ কালচে লাল রঙে বদলে যায়। স্নায়ুর উপর উষ্ণ স্পর্শের মতন এগিয়ে আসে সবুজ উদ্ভিদরেখা, কোনও ঝর্ণা কিংবা ঝোরার শব্দ। বনের ভেতর পাখিরা ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে জুনিপারের বীজ, দূরে চমরি চরছে, চমরি ও মেষপালকদের তাঁবু থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে। ফুরচুং-এর কল্যাণে তিনদিন প্রায় অনাহারের পর আজ আমাদের গরম ভাত আর মাখন- চা জোটে।

জায়গাটির নাম তাশি-রাবকা, তিব্বতের সীমান্তবর্তী জেলার গ্রাম। ওই নামে একটি সরু নদীও বইছে। উগেন বলেন, এককালে, যখন ইয়াংমা আর ওয়ালুং জেলা সিকিম রাজ্যের মধ্যে ছিল, রাজার দলবল তিব্বতে যাবার পথে এখানে বিশ্রাম নিত। এক বিশাল বোল্ডারের মাথায় সেই পাথরের ইমারতের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। কিছুটা দূরে চমরি ও মেষপালকদের তাঁবু। দুই তিব্বতি রমণী ও এক ভয়ঙ্করদর্শন ম্যাস্টিফ কুকুর বসেছিল তাঁবুর বাইরে। ফুরচুং ওদের তাঁবুতে গিয়ে গল্পগাছার ছলে খোঁজখবর নিয়ে আসে। এক বাটি তারা ( একধরনের পাতলা গাঁজানো দই) পান করে আসে।

তাশি-রাবকারনজরদারিএড়িয়েযাওয়াটাইছিলকঠিনবাধা।সন্ধ্যানাগাদগ্রামেরকাছেএসেপৌঁছোইআমরা, কিন্তুঅন্ধকারনামারজন্যঅপেক্ষাকরাহয়পাথরেরআড়ালে।রাতেচাঁদওঠে।পাহাড়েরগায়েটানাউঁচুপাথরেরদেওয়ালযাগোর্খাদেরসঙ্গেযুদ্ধেরসময়রাতারাতিগেঁথেতুলেছিলতিব্বতিরা।দেওয়ালটিনদীরওপরএসেসেতুহয়েছে, সেখানেআটটিনজরচৌকি।ওধারেঘুমন্তগ্রাম।পাথরেরআড়ালথেকেনেমেএসেনিঃশব্দপায়েসেতুরকাছাকাছিএসেউগেনআরফুরচুংআতঙ্কেস্থবিরহয়েপড়ে।জ্যোৎস্নায়ফকফককরছেচরাচর, কোথাওএকটারাতচরাপাখিডাকছে, নদীরবুকেবড়োবড়োবরফেরচাঙড়েরফাঁকদিয়েতিরতিরকরেবইছেজলেরস্রোত।

শান্তমতি ফুন্টসো উপায় বাতলায়,—পাহারাদারেরা যদি জেগে থাকে তাহলে আমরা ওয়ালুং প্রদেশের গান গাইতে গাইতে যাব, নিজেদেরও ওয়ালুংপা বলে পরিচয় দেব। দুরুদুরু বুকে সেতুর ধারে চোর্তেনের কাছাকাছি আসতে চমরির লোমের তাঁবু থেকে হাক শোনা যায়,—- কে যায় ? কোথায় যায়?

—আমরা ওলুংপা, চলেছি শিগাৎসে! ফুন্টসে জবাব দেয়।

মোটা মোটা কাঠ আর পাথরে তৈরি সেতু। আর একটিও বাক্যবিনিময় না করে দলটা সেতুর ওপর দিয়ে পার হয়ে যায় দলপতির কুঠুরি।

বাইরে একটি শিকলবাঁধা ম্যাস্টিক ঘুমোচ্ছিল, তার কালো রোমে ঝিলমিল করছিল জ্যোৎস্নার বিদ্যুৎরেখা।

৩ ডিসেম্বর। সন্ধ্যার আগে তাশিলুক্ষো মঠের অধীনস্থ অঞ্চলে ঢুকে পড়তে মন থেকে সব শঙ্কা আর অনিশ্চয়তা সরে যায়। তাশি রাবকা পার হওয়ার পর কেবল বিস্তীর্ণ বিজন হু হু বাতাসতাড়িত চরাচর, ছোটো ছোটো চটক জাতীয় পাখির ঝাঁকের ওড়াউড়ি, দূর আকাশে চিল আর দিগন্তে নীচু বালির পাহাড়। কোথাও বা উঁচু ঘাসে-ছাওয়া মাঠের ভেতর দিয়ে পথ গিয়েছে, পায়ের শব্দে খরগোশ আর খেকশিয়াল ছিটকে ছিটকে সরে যায়। দূরে দূরে একটি দুটি গ্রাম, মেয়েদের মাথায় বিচিত্র কাপড়ের সাজ, গাধার পাল নিয়ে চলেছে চালের ব্যাপারীরা। কোথাও বয়ে চলেছে সরু নদী, খাল কেটে যবের খেতে সেচের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এক জায়গায় মাটির নীচে পাথর কেটে তৈরি একটি গোম্পা, সেখানে জনা কুড়ি সন্ন্যাসী থাকেন।

রোদপোড়া ইটে তৈরি ভেড়ার খোয়াড়ে স্থানীয় একদল শিকারির সঙ্গে রাত্রিবাস হয় এক জায়গায় । একটি কোমরডোবা নালা ফুরচুঙের কাঁধে চেপে পার হই আমি। আবার একটি শুকনো নদীর খাতে প্রবল ধুলোঝড়ের মধ্যে পড়ি সবাই। ধুলোঝড়ে বুনো গাধার দঙ্গল ছুটে যেতে দেখা যায়। রে চু উপত্যকায় একটি জমাট বরফনদী পার হতে ছোটো ছোটো গ্রাম, ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রা উড়ছে যব আর মকাইয়ের খেতে। এখানে প্রাণীহত্যা নিষিদ্ধ, তাই ফসল নষ্ট করলেও পায়রা মারে না কেউ। পাহাড়ের পায়ের কাছে একটি ছোটো মঠ পার হয়ে নাম্বু গ্রামে পৌছে ঘোড়া ভাড়া করা হল।

৯ ডিসেম্বর। তাশিলুক্ষোয় প্রবেশের দিন। সেই মেঘভারাতুর চাঁদের রাতে দার্জিলিং থেকে বের হবার পর ইতিমধ্যে কেটে গিয়েছে একটি মাস। পথের সব বাধাবিপত্তি আর ক্লান্তি ছাপিয়ে আমার মনে সাফল্যের উত্তেজনায় রাতে ঘুম আসে না। ভোর সাড়ে তিনটেয় উঠে পাটভাঙা পোশাক পরে যাত্রা শুরু হয়। দিনের আলো ফুটতে পথে দেখা যায় ব্যাপারীর দল, গাধা আর চমরির পিঠে বিপুল বোঝা চাপিয়ে নিয়ে চলেছে শিগাংসের দিকে। হিমেল দিন, মৃদু বাতাস বইছে। গন্তব্য যত এগিয়ে আসে আমার দেহমন এক বিচিত্র ফুর্তিতে হালকা ফুরফুরে হয়ে আসে। কিন্তু উগেন ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, বিরক্তি ফুটে বেরোয় ঘোড়াওয়ালাদের সঙ্গে রুক্ষ ব্যবহারে।

দুপুর নাগাদ আমরা পেীঁছোই পাহাড়ের দাঁড়ার ওপর জুং লুগরি নামে একটি জায়গায়। এখান থেকে ধাপ কেটে নেমে গিয়েছে, তাশিলুম্ফোর পথ, সর্বত্র পাথরে উৎকীর্ণ ওম- মণিপদ্মে-হুম মন্ত্র। ঝাঁকড়া উইলো গাছের নীচে একটি ছোটো সরাইখানা, পাশ দিয়ে সশব্দে বইছে একটি নালা। দরজায় শিকলবাঁধা ম্যাস্টিফ, এক বৃদ্ধা বসে আছেন জপমালা হাতে, চালের ওপর পায়রার বকমবকম। আমাকে দেখে সরাইখানার মালিক নিচু হয়ে অভিবাদন জানিয়ে বলে,- আমার নাম লোবডেন! পাতিব লা, চিয়াগ ফেব নাং ডিগ! হে পণ্ডিত, ভেতরে আস্তে আজ্ঞা হোক!

কুকুরটি ঝাঁকড়া লোমের ফাঁকে চোখ খুলে দেখে নেয় একবার।

লোবডেনের ঘরে চা ডিম ইত্যাদি খেয়ে দাম মিটিয়ে উঠে পড়তে বিকেল হয়ে আসে। কিছুটা এগোবার পর একটি পাথরের চাটান, বাঁশে ছাওয়া বিশ্রামঘর পথিকদের জন্য, আর তারপর একটি সরু বাঁক ঘুরে নীচে তাকাতেই আমার বুকের থেকে একটি স্পন্দন খসে পড়ে।

প্রায় এক হাজার ফুট নীচে বিস্তীর্ণ উপত্যকার ওপর বিছিয়ে আছে তাশিলুম্ফোর মন্দির মঠ আবাসগৃহ। মেঘমুক্ত আকাশে আশ্চর্য বর্ণময় সূর্যাস্ত হচ্ছে, আর নীচে অসংখ্য চোর্তেন। সৌধ প্রাসাদ ও সমাধির গিল্টি-করা চুড়োয় সোনালি আলো পড়ে ঝিকমিক করছে।