রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

​মহাসত্যের বিপরীতে,পর্ব ১৩

‘যে অমৃত মৃৎপাত্রকে অক্ষয় এবং শুচি করতে না পারে, সে আবার অমৃত কিসের ? ’ – তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়

# তেরো

ভারতের সঙ্গে তিব্বত ও চীনের সুপ্রাচীন সম্পর্কের অমৃতকে চাখতে হলে ইতিহাসই আসল মৃৎপাত্র । আর তার এক প্রধান কুম্ভকার হলেন পণ্ডিত শরৎচন্দ্র দাস। তাঁর কাহিনি পড়ে অলোক উনবিংশ শতাব্দীর তিব্বত সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারে। দার্জিলিং-এর নিরক্ষর দর্জি কিন্টুপ বিশ্বের দুর্গমতম গিরিখাতের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা নদীর অজানা পথের সন্ধানে যাওয়ার পাঁচবছর আগেই ১৮৭৪ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতা থেকে দার্জিলিং পৌঁছেছেন পঁচিশ বছর বয়সী মেধাবী যুবক শরৎচন্দ্র। সমুদ্র উপকূলবর্তী চট্টগ্রামের ছেলে । আগে কখনো পাহাড় দেখেননি । তবে পড়াশুনো করে এসেছেন। তিনি কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছেন।তখনও বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ আলাদা হয়ে শিবপুরে স্থানান্তরিত হয়নি। কলেজে পড়ার সময়ই তাঁর অধ্যবসায়, তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব সাহেব শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এমনকি ক্রমে খোদ ডিরেক্টর অব পাবলিক ইন্সট্রাকশন অ্যালফ্রেড ক্রফটের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন । রাত জেগে পড়াশুনা করতেন। কিন্তু একবার ম্যালেরিয়ায় দীর্ঘদিন ভুগে শরতের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে।

তখন বঙ্গদেশে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব। তখনও এর প্রকৃত কারণ আবিষ্কার হয়নি। সমতলের ভ্যাপসা জোলো বাতাসকেই দায়ী করা হতো। একদিন তাকে ডেকে পাঠিয়ে ক্রফট বলেন,- দার্জিলিঙ যাও, পাহাড়ে সাত হাজার ফুটের ওপর নতুন স্বাস্থ্যনিবাস গড়েছে ক্যাম্পবেল। ভারি মনোরম আবহাওয়া, সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ। ওখানে গিয়ে থাকলে স্বাস্থ্যোদ্ধার হবে। মনে রেখ, স্বাস্থ্যই সম্পদ ! ইয়াংম্যান , তোমার সামনে পড়ে আছে সম্ভাবনাময় আস্ত একটা জীবন, আর সেটা অপেক্ষা করছে দার্জিলিঙেই।

শরৎচন্দ্র জানতেন না যে এই প্রস্তাবের পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী এক পরিকল্পনা। মূলত অ্যালফ্রেড ক্রফটের উদ্যোগেই দার্জিলিঙে তখন সদ্য খোলা হয়েছে ভুটিয়া বোর্ডিং স্কুল। সেই স্কুলের হেডমাস্টার করে পাঠানো হল তাকে।

তখন দার্জিলিং বলতে ঘন অরণ্যে ঘেরা পাহাড়ের মাথার ওপর কয়েকটি কাঠের কটেজ আর নীচের দিকে কাচা সরু পথের শেষে ছোট একটি বাজার। প্রত্যেক গ্রীষ্মে লটবহর লোকলস্কর নিয়ে কলকাতা থেকে দার্জিলিং যাওয়ার সাহেবি হিড়িক তখনও সেভাবে শুরু হয়নি। পাহাড়ের গা বেয়ে এঁকে বেঁকে চলা ছোট খেলনা রেলপথও ছিল না। ক্রফটের পরামর্শ অনুযায়ী শরৎ শিলিগুড়ি থেকে পালকিতে চড়ে সকালবেলায় যাত্রা শুরু করেন। সে এক অদ্ভূত অভিজ্ঞতা। পালকিতে বসে যাওয়াও যে এত পরিশ্রমের ব্যাপার সে ধারণাও তাঁর ছিল না। ক্রমাগত ঝাঁকুনিতে গা গুলায়। মাঝেমধ্যে বেহারারা দম নেওয়ার জন্যে থামলে তিনি পালকি থেকে বেরিয়ে গা আড়িমুড়ি ভাঙেন। এভাবে থেমে থেমে পাঙ্খাবাড়ি পৌঁছোন বিকেল নাগাদ। তরাইয়ের ঘন বৃক্ষরাজির ছায়ায় ছায়াচ্ছন্ন গ্রাম পাঙ্খাবাড়ি। সেখান থেকেই হিমালয় শুরু। ডাকবাংলোটা শ-দুয়েক ফুট উঁচুতে। সন্ধ্যার অন্ধকার নামার আগে চৌকিদারকে গ্রামে পাঠিয়ে দরদাম করে তিনি একটি ঘোড়া ও দুজন শক্তপোক্ত দেখে মেচ জনজাতির কুলি ভাড়া করেন। পরদিন সকালে গায়ে বেশ ব্যথা ! তবু চড়াই বেয়ে শুরু হয় দার্জিলিঙের পথে যাত্রা। দু দিনের বন্ধুর পথ প্রায় ৩২ মাইল দীর্ঘ। মাঝে কার্শিয়াং আর সোনাদা ডাকবাংলোয় রাতের বিশ্রাম।

চাকরির নিয়োগপত্র পকেটে নিয়ে শরৎ যখন দার্জিলিঙে চলেছেন, ঠিক সেইসময়ে ডিরেক্টর অব পাবলিক ইন্সট্রাকশনের সিল আঁটা একটি গোপন চিঠি চলেছে সিমলায় ভাইসরয়ের কাছে। কিছুকাল ধরে তিব্বতে গুপ্তচর পাঠানো শুরু হয়েছে তখন। তাঁরা সকলেই উত্তর ভারতের পাহাড়ি জনজাতির মানুষ। এদের পরিব্রাজক বা বণিক সাজিয়ে পাঠালে ধরা পড়ার ঝুঁকি কম, দুর্গম পার্বত্য পথে যাত্রার ধকল সইতেও এরা সক্ষম। কিন্তু সমস্যা হল, এরা কেউই তেমন শিক্ষিত নন; দুর্গম অচেনা দেশের ভূপ্রাকৃতিক তথ্য আর বিভিন্ন ধরণের সংবাদ আহরণের জন্য যে বিদ্যাবুদ্ধি থাকা দরকার তার অভাব রয়েছে। বিশেষত জরিপ ও মানচিত্র অঙ্কনের কাজে দক্ষ, শিক্ষিত আধুনিক ভারতীয় প্রজন্মের খুবই প্রয়োজন। তেমনই একজনকে এবার দার্জিলিং-এ পাঠানো হচ্ছে।

শরৎ এসবের কিছুই জানতেন না। কলকাতা থেকে এত দূরে একটি নতুন জায়গায় কর্মজীবন শুরু করতে চলেছেন, এক চাপা উত্তেজনায় মাঝেমধ্যেই কেঁপে কেঁপে উঠছেন। সনাতন বৈদ্য পরিবারের ছেলে, কলকাতার কলেজে পড়তে আসার সময় রীতি মেনে বিয়ে করেছেন। বউ দেশের বাড়িতে। চট্টগ্রাম থেকে কলকাতা হয়ে শিলিগুড়ি, সুদীর্ঘ যাত্রাপথে মাঝেমধ্যেই মনের কোণে জীবন্ত হয়ে উঠছিলো ঘোমটায় ঢাকা একটি সরল মুখ, নাকে নথ আর চোখে অশ্রুবিন্দু। কিন্তু পাংখাবাড়িতে ঘোড়ার পিঠে ওঠার পর থেকে পথের অদৃশ্যপূর্ব নাটকীয়তায় সেই স্মৃতিছবি ফিকে হয়ে যায়। নানারকম সবুজ রঙের গুল্মের ঝোপঝাড়ের ফাঁক দিয়ে লাটিমে পাকানো লেত্তির মতন রাস্তা যত চড়াই বেয়ে উঠছে, ততই দৃশ্যপটে সুউচ্চ পাহাড়শ্রেণি যেন পরপর ঢেউয়ের মতন ফুলে ফুলে উঠেছে। চারিদিক থেকে ঘিরে থাকছে ঘন ক্রান্তীয় অরণ্যের অসংখ্য নাম না জানা লতাবেষ্টিত বড় বড় মোটা মোটা গাছ। এদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো শত শত বছর ধরে আকাশ মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাদের শাখা থেকে ঝুলছে বনলতার দড়িদড়া, খিদিরপুর জাহাজঘাটায় পালতোলা মাস্তুলের গায়ে যেমন দেখা যায়। একসময় পেছনের ধোয়াশাঢাকা সমতলভূমি, বালাসোন নদীর বালুখাত হারিয়ে যায় মোটা বাঁশের ঝাড় আর অতিকায় ফার্নের আড়ালে। অসংখ্য পাখির কুজনে মুখরিত হয়ে অরণ্যের সীমা ছাড়িয়ে তিনি ঢুকে পড়তে থাকেন ওক, বার্চ আর কুয়াশার দেশে, যেখানে এক আদিম নৈঃশব্দ্য ক্বচিৎ বিচলিত হয় ঝিঁঝিঁ আর ঝর্ণার তানে। কখনও হঠাৎ অজানা পশুর গর্জন কিম্বা তীক্ষ্ণ চিৎকার প্রতিধ্বনিত হয়ে যাচ্ছে পাহাড় থেকে পাহাড়ে। মাঝেমধ্যে পথে দেখা মেলে কুলির দলের : পিঠে ভারি মোট নিয়ে ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছেন দার্জিলিং-এর দিকে। তাঁদের পায়ে জড়ানো চামড়ার ফালি, জোঁক কিম্বা কোনও জংলি পোকার কামড়ে ঘা থেকে রক্ত ঝরছে।

কার্শিয়াং পার হতেই উত্তর আকাশের গায়ে স্থির ভেসে থাকা উত্তুংগ কাঞ্চনঝংঘা দেখে শরৎচন্দ্র বিস্ময়ে অবাক হয়ে যান। পালকির ভেতরেও বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগে। তিনি একটা সোয়েটার গায়ে দেন। তারপর ঘুম নামে একটি ছোট গ্রামে থেমে চা খান। সেখানে কয়েকঘর লেপচা পরিবারের বসতি। ঘুম ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলে কিছুক্ষণ পর বাতাসিয়া পৌঁছুতেই চোখে পড়ে দূরে পাহাড়ের গায়ে গায়ে বেশ কিছু সাদা সাদা কটেজ।

কুলিরা বলে, ওই তো দার্জিলিং!

শরৎ আরেকবার পালকি থেকে নেমে শীতল হাওয়ায় বুক ভরে শ্বাস নেন। গা আড়িমুড়ি ভাঙেন। বেশ ঠান্ডা এখানে। তিনি সোয়েটারের উপর জ্যাকেট চাপান। কুলি আর বেহারারাও এখানে সোয়েটার পরে নেন।

দার্জিলিং-এর ডেপুটি কমিশনার তখন একজন আইসিএস অফিসার মিস্টার জন এডগার। শহরে পৌঁছে সোজা কমিশনারের বাংলোয় দিয়ে এডগার সাহেবের কাছে রিপোর্ট করেন বাবু শরৎচন্দ্র দাস। তাঁর থাকার ব্যবস্থা হল মাউন্ট প্লেজেন্ট রোডে অ্যালিস ভিলা নামে একটি বোর্ডিং হাউসে।

পরদিন ভুটিয়া বোর্ডিং স্কুলে কাজে যোগ দেন তিনি।

দার্জিলিং তখন নিতান্তই নবীন, কাঠ আর পাথরে তৈরি , টিমটিমে একটি শহর । গুটিকয় বাংলো আর পাহাড়ের গায়ে আঁকাবাঁকা পাকদণ্ডি । সব পাকদণ্ডি এসে মিলেছে একটি রাস্তায় , তার নাম কার্ট রোড । সাহেবমেমরা ঘোড়ায় কিংবা শরৎচন্দ্রের মতন পালকিতে চেপে আসেন । দু- তিনদিন পর পর চাকার ক্যাচকোচ শব্দে সমতল থেকে মহিষে টানা গাড়িতে মাল এলে আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে টিনের ছাউনির হাট বাজার । সেখানে নীচের গ্রাম থেকে লেপচা মেয়েপুরুষেরা আসে নানাধরনের শাকপাতা ফল নিয়ে । তাদের বিচিত্র চেহারা আর সাজপোশাক শরতের নজর টানে । পাহাড়ের যে কোনো দিকে পা বাড়ালেই ঘন আদিম জঙ্গল । সেখান থেকে বিচিত্র বর্ণময় পাখি ও বন্যজন্তু , বেশিরভাগই স্টাফ - করা , নিয়ে শহরে বেচতে আসে স্থানীয় শিকারিরা । এভাবেই পাহাড়ের প্রকৃতি এক উদগ্রীব তরুণের সামনে নিজেকে মেলে ধরে একটু একটু করে । দূর আকাশের গায়ে কখনো মেঘের পর্দার আড়ালে , কখনো বা সূর্যের আলো ঝলমল এক অসম্ভব স্বপ্নের মতন মাথা উঁচু করে তাকিয়ে থাকে কাঞ্চনজংঘা ।

তিনি ছাড়া ভুটিয়া স্কুলের একমাত্র শিক্ষক তখন সিকিমের এক মঠের প্রাক্তন লামা উগেন গ্যাৎসো। এই সেই উগেন গ্যাৎসো যাকে দিয়ে পরে কিন্টুপের জবানবন্দী তিব্বতী ভাষায় অনুলিখন করানো হয়েছিল। তাঁর সাহায্য নিয়েই শরৎচন্দ্র দাস পরবর্তীকালে লিখেছেন তাঁর গবেষণালব্ধ ‘টিবেটান - ইংলিশ ডিকশনারি, উইথ স্যান্সক্রিট সিননিমস! এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০২ সালে।

শরৎচন্দ্র ভুটিয়া স্কুলে হেডমাস্টারের পদে যোগ দেবার কিছুদিনের মধ্যেই ডেপুটি কমিশনার এডগার সাহেব তাঁর হাতে তুলে দেন একটি বই, চেরি-লাল মরক্কো চামড়ায় বাঁধানো , ওপরে সোনার জলে লেখা :

  • Narratives of the /Mission of George Bogle to Tibet/ And of the/ Journey of Thomas Manning to Lhasa/ Edited by/ Clements R Markham , C . B . , F . R . S

শরৎ দাসকে দার্জিলিঙে পাঠাবার পেছনে ব্রিটিশ সরকারের যে গুঢ় উদ্দেশ্য ছিল, সেই বিষয়ে এডগার অবহিত ছিলেন কিনা কে জানে ! কিন্তু লন্ডন থেকে সদ্য প্রকাশিত বইটি যে সেই উদ্দেশ্য সাধনে অনেকটাই সাহায্য করেছিল , সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই । একশো বছর আগে জর্জ বোগলের তিব্বত যাত্রার বিবরণ এক বঙ্গজ তরুণের মনে জাগিয়ে তোলে বরফাবৃত পাহাড়শ্রেণির ওপারে নিষিদ্ধ দেশটি সম্পর্কে তীব্র আগ্রহ । বোগলের বিবরণ পড়ার পর সেই স্বপ্নের ওপারে চিররহস্যের দেশে যাবার জন্য আকুল হয়ে ওঠেন তিনি। সেই সুযোগও এসে যায়। সহকারী শিক্ষক লামা উগেন গ্যাসো শরৎচন্দ্রের জন্য পাঞ্চেন লামার ছাড়পত্র নিয়ে আসেন। বলাই বাহুল্য, ব্রিটিশ প্রশাসন সেই সুযোগ লুফে নেয়।

কথিত আছে, বোধিসত্ত্ব পদ্মপাণি মানবজাতির কল্যাণের জন্য মহানির্বাণ লাভ প্রত্যাখ্যান করে পৃথিবীতে মানুষরূপে বার বার জন্মাতে চেয়েছিলেন। পাঞ্চেন লামা সেই বোধিসত্ত্বের অবতার । চতুর্দশ শতকে আবির্ভাব হয় প্রথম পাঞ্চেন লামার । জর্জ বোগলের সঙ্গে যাঁর সাক্ষাৎ হয় তিনি ছিলেন ষষ্ঠ। একজন পাঞ্চেন লামার মৃত্যু হলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করার জন্য কিছু বিশেষ দেহলক্ষণযুক্ত একটি শিশুকে খুঁজে বের করার এক গোপন রহস্যময় ধর্মীয় আচার পালিত হয়। এই অনুষ্ঠানে যুক্ত থাকেন তাশিলুক্ষো গুফার শীর্ষস্থানীয় সন্ন্যাসীরা। এতে অবশ্যই দলাই লামার স্বীকৃতি থাকে। দলাই লামার নির্বাচনও একই পদ্ধতিতে হয় এবং সেখানেও পাঞ্চেন লামার স্বীকৃতি লাগে। এইভাবে শত শত বছর ধরে বিভিন্ন শিশুর মধ্যে ফুটে ওঠে কিছু বিশিষ্ট লক্ষণ, বিভিন্ন মনুষ্যদেহে প্রতিফলিত হয় এক অবিনশ্বর আত্মা। এমনটাই বিশ্বাস করে তিব্বতের ধর্মভীরু মানুষ। এভাবেই কাহিনির ভাঁজে একটি চিত্রকল্পে, একটি অস্পষ্ট কামনা বা উৎকণ্ঠার ভেতরে নিজের মুখচ্ছবির মতন প্রতিফলিত হয় আমাদের জীবন। কোনও এক দুর্লভ পলকা মুহর্তে ভেসে উঠেই মিলিয়ে যায়, পাহাড়ে একটানা বর্ষার মাঝে মেঘভাঙা অনির্বচনীয় আলোর মতন। সেই আলোর ভেতর এক অনন্ত মুহূর্তে আমরা বেঁচে উঠি, সোনালি আলোয় চারিদিক ধুয়ে ওঠে জন্মজন্মান্তরের স্মৃতির মতন, অকস্মাৎ দীপ্যমান হয়ে ওঠে আমাদের অকিঞ্চিৎকর জীবন।

জর্জ বোগলের দিনলিপি পড়ে সম্ভবত তেমনই এক অনুভূতি হয়েছিল শরৎ দাসের। তারপর সেই পথে যাত্রা ছিল নেহাতই নিষ্পাদ্য। ১৮৮১সালের ৭নভেম্বর রাতে শরৎচন্দ্র দাস দার্জিলিং থেকে তিব্বত যাত্রা শুরু করেন। তখন রাতের আকাশে পূর্ণচন্দ্র। কিন্তু কালো মেঘে বৃষ্টির আশঙ্কাও ছিল।

বারবারই চোখ চলে যায় পূর্ব নেপালের পাহাড়শ্রেণির দিকে, ওদিকে তুষারপাত হচ্ছে কিনা দেখার জন্য। একদিকে বরফের দেশে মৃত্যুভয়, অন্যদিকে সব ধরনের প্রাকৃতিক বাধা জয় করার অদম্য আকাংখা, এই দোলাচলের মধ্যেই বাসভূমিকে বিদায় জানান তাঁরা। আর কখনো ফিরে আসতে পারবেন কিনা জানেন না। এই অভিযানের জন্য ব্রিটিশ সরকার শরতের মাসিক বেতন চল্লিশ টাকা থেকে বাড়িয়ে তিনশো টাকা করে। দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে স্ত্রীর জন্য ভাতা ধার্য হয় একশো টাকা। স্বাভাবিকভাবেই কাউকে কোনোভাবে কিছু জানানো বারণ ছিল। যাবার আগে তিনি স্ত্রীকে চিঠিতে লিখেছিলেন ,- 'তিব্বতের শিগাৎসে শহরে অত্যন্ত গোপন একটা সরকারি কাজে যাচ্ছি, দার্জিলিং থেকে দিন দুয়েকের পথ'।

ঘোড়ার পিঠে চেপে নিঃশব্দে শহর ছেড়ে বেরিয়ে যান তাঁরা। ভাগ্যক্রমে দার্জিলিংমুখী দুয়েকজন ভুটিয়া ছাড়া পথে আর কেউ দেখতে পায়নি। মধ্যরাতের নৈঃশব্দ্যের ভেতর তাকভরের দিক থেকে ভেসে আসছিল কামিনদের গান, বাঁশি আর ঢোলকের শব্দ। রঙ্গিতের পাড়ে এসে দলে যোগ দেন উগেন গ্যাৎসো। বড়ো বড়ো পাথরের খাত দিয়ে কুলকুল করে বয়ে চলেছে রঙ্গিত, আড়াআড়ি ফেলে রাখা চার - পাঁচটি বাঁশের ওপর দিয়ে কোনওক্রমে পার হয়ে রাত দেড়টার সময় দলটি পৌঁছয় গোক নামে একটি জায়গায়। দল বলতে শরৎ, উগেন ও চাকর, পাচক আর কুলি মিলিয়ে মোট সাতজন।

উগেন বলেন, আগে কয়েকঘর দোকানপাট ছিল গোক-এ , পাহাড়ের ব্যাপারিরা এসে ভুট্টা আর এলাচ কিনে নিয়ে যেত দার্জিলিঙের বাজারে বিক্রির জন্য। এখন জনহীন হয়ে পড়েছে। একটিমাত্র ছোটো গোয়ালের ছাউনি টিকে আছে শুধু। তার ভেতরে প্রবল নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে এক নেপালি। অগত্যা বাইরে ঘাসের ওপর জাজিম বিছিয়ে দু-দণ্ড বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হয়। কিন্তু এবড়োখেবড়ো জমি, জাজিম ফুড়ে ওঠা আগাছার কাটা আর পোকামাকড়ের জন্য বিশ্রাম আর হয়ে ওঠে না। তার মধ্যে আবার ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হলে আপাদমস্তক ভিজে ভোর চারটে নাগাদ আবার হাঁটা শুরু। ফুটখানেক চওড়া পিচ্ছিল পথ, লম্বা ঘাস আর ঝাোপঝাড়ে ঢাকা, চারদিক অন্ধকার। লণ্ঠন জ্বালিয়ে নিয়ে ভৃত্য ফুরচুঙের পেছন পেছন চলতে থাকেন শরৎ ও অন্যরা। শটগানটা ফুরচুঙের পিঠের বোঝায় বাধা। এভাবে বার কয়েক আছাড় খেয়ে ওরা রাম্মাম উপত্যকায় পৌঁছোলে আকাশে নীলাভ আলো ফুটে ওঠে।

৮ নভেম্বর । রাম্মামে ন্যাড়া বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে ব্রিটিশ ভারতের সীমানার আগেই তিব্বতি ছদ্মবেশ পরে নেন শরৎচন্দ্র। শীতের শীর্ণ রাম্মাম নদী , বড়ো বড়ো পাথরের ফাঁকে জমা জলে বেতের শঙ্কু আকৃতির জাল দিয়ে মাছ ধরছেন লিম্বু জনজাতির মেয়ে বউয়েরা। নদীর পাড় ধরে টানা শালের জঙ্গল, মাঝে মাঝে তুলো আর এলাচের চাষ। ভালুক আর হনুমানের উপদ্রব ঠেকাতে রাতপাহারার উঁচু মাচা। পাহাড়ের ওপরের দিকে জঙ্গল সবজে বাদামি হয়ে পড়েছে।

সরু পাকদণ্ডি দিয়ে বড়ো বড়ো কমলালেবুর ঝাঁকা নিয়ে হেটে আসছে জনা কুড়ি লিম্বু জনজাতির মানুষ। দিনরাত হেঁটে তাঁরা দার্জিলিঙের বাজারে পৌঁছবে পরদিন ভোরবেলায়। ওরা শরৎ ও উগেনের তিব্বতি পোশাক দেখে সসম্ভ্রমে পথ ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়।

শরৎ অনুভব করেন, উগেনের কথা শুনে যথাসময়ে পোশাক বদলে নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছে! খেতের ভেতর দিয়ে পথ উঠে গেছে চড়াই বেয়ে। সেই পথে পাহাড়ের দাঁড়ায় উঠে আসতে বিকেল হয়ে যায়। ঠিক ওপরে একটি চোর্তেন, পাথরে খোদাই করা ‘ওম - মণি পদ্মে – হুম’ মন্ত্রের ওপর বহুকালের শ্যাওলা জমে ঢেকে এসেছে। এর নামেই জায়গাটার নাম চোৰ্তেন গং। এখান থেকে দক্ষিণ দিকে তাকালে বহুদূরে নদীর উজানে ধরমদিন উপত্যকা দেখা যায়। দিনশেষের মেঘভাঙা আলোয় ফুটে রয়েছে ধাপ-কাটা খেতখামার ঘরবাড়ি। চোর্তেনের পিছনদিকে একটি ঝোরা তিরতির শব্দে নেমেছে কয়েকশো ফুট নীচে রাম্মামের বুকে।

উগেন বলেন,—এখানেই তাঁবু খাটানো হোক!

তারপর নীচুস্বরে শরৎকে বলেন, কাল সকালে শিংলি পাহাড় ডিঙাবো।

নদীর পাড়ে লিম্বুদের গ্রাম থেকে টাটকা সবজি আর পথশ্রমের ক্লান্তি দূর করতে দু-বোতল মুরোভার মদ কিনে আনে ফুরচুং।

৯ নভেম্বর। সকাল থেকে চারদিক কুয়াশায় ঢাকা, দু-ফুট দূরের জিনিসও স্পষ্ট দেখা যায় না। শিংলি পাহাড়শ্রেণি পেরোতে জঙ্গল ক্রমশ নিবিড় হয়ে আসে। শুরু হয় বেতের বন, উঁচু উঁচু পাইনের গায়ে জড়ানো অতিকায় সব ফার্ন, সবুজ মরকতমণির মতন পাহাড়ের গা বেয়ে কলোচ্ছ্বাসে নামছে ঝর্ণা । পথ খাড়া উঠে গিয়েছে তারই পাশ দিয়ে। ওক পাইন আর ম্যাগনোলিয়ার গগনবিসর্পী ডালপালায় ছায়াচ্ছন্ন হয়ে আছে। আকাশ দেখা যায় না। ঘণ্টাখানেকের বেশি চড়াই ভেঙে দলটা রিশি চোর্তেন নামে একটি জায়গায় পৌঁছয়। এখানেও জঙ্গলের মাঝে জনমানবহীন স্থানে একটি প্রাচীন সৌধ, পাথরে নির্মিত নীচু আর লম্বাটে, ভুটিয়ারা বলে মেন্ডং। এখান থেকে শুরু হচ্ছে হি-লা পাসের পথ। কিছুদূর এগোলে দক্ষিণ-পশ্চিম সিকিমের অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়: টংলু, সিংলি, এমনকি দার্জিলিঙের পাহাড়ও। ঝোপঝাড়ের ভেতর বুনো শুয়োরের চলার পথ, হনুমানের কোলাহলে মুখরিত জঙ্গল। দুপুর একটা নাগাদ ছয় হাজার ফুট উঁচু পাহাড়শ্রেণির মাথায় পৌঁছোন সম্ভব হয়। অনেকগুলো জলধারা পার হয়ে এসে একটি পাথরে তৈরি খালি বাথানঘর, গোপালকদের শীতকালীন আশ্রয়। এখানে দু-দণ্ড বিশ্রাম নেওয়ার ইচ্ছে হলেও চারিদিকে ঘাস ও ঝোপেঝাড়ে নিজেদের দৈর্ঘ্য মাপতে মাপতে ধেয়ে আসা অসংখ্য জোঁক থিকথিক করতে দেখে আর সাহস করে না।

বিকেল চারটে নাগাদ শুরু হয় নীচের দিকে নামা। চারদিকে বেঁটে বাঁশের ঝোপ তাদের মাথায় লাল কাপড়ের টুকরো বাঁধা। এমনই এক ঝোপের সামনে দাঁড়িয়ে ফুরচুং বিড়বিড় করে মন্ত্র জপতে থাকে পাহাড়ের দেবতাদের উদ্দেশ্যে। বনের মাঝে একটু ফাঁকা জায়গায় এক বিশাল ওক গাছের নীচে রাতের বিশ্রামের জন্য থামা হয়। এখানে কুলিরা তুলে আনে এক ধরনের একরাশ কাঁটাঝোপ যার পাতা থেকে নাকি খুব ভালো স্যুপ হয়!

১১ নভেম্বর, ১৮৮১। আকাশে মেঘ জমে ছিল, তারপরে শুরু হয় রোদবৃষ্টির খেলা। ভুটিয়ারা একে বলে মেতগ-চার্পা, অর্থাৎ পুষ্পবৃষ্টি। প্রতিটি জলকণায় প্রতিফলিত সুর্যরশ্মিতে জ্বলন্ত ফুলের মতন, শবনমের মতন আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে খাদের অতলে। হি গ্রামে ভুটিয়া, লেপচা আর লিম্বুদের বসতি। লিম্বুদের দেখে মনে হয় বেশ সচ্ছল, ধাপে ধাপে সেচপদ্ধতি ব্যবহার করা চাষের জমিতে ধান রয়েছে। কালাই নদীর কয়েক ধাপ ওপরে বেড়া দেওয়া এলাচের খেত । বছরের এই সময়েও রীতিমতো খরস্রোতা এই কালাই কিম্বা কালহাইত নদী, শিংলি পাস থেকে উৎসারিত হয়ে এঁকেবেঁকে প্রায় কুড়িমাইল গিয়ে রঙ্গিতে মিশেছে তাশিদিং পাহাড়ের নীচে। নদীর পথ ধরে পাহাড়ের শিরায় শিরায় গ্রামগুলি, দুপাশের খাড়া পাড়ে উঁচু উঁচু গাছ। এই নদীর সব মাছই বেশ সুস্বাদু। জলের গভীরতা যেখানে যেখানে কম, সেখানে বাঁশের জাল পেতে এক ধরনের বিষাক্ত গাছের পাতা ফেলে মাছ ধরে লিম্বুরা।

নদীর পাড় ছেড়ে দিয়ে চড়াই পথে লম্বা ঘাস আর শরের বনের ভেতর দিয়ে। ওপরের দিকে উঠে যেতে থাকে দলটা। এই বনে নাকি বুনো শুয়োর আর সজারু রয়েছে। এরা ফসলের খুব ক্ষতি করে, বিশেষ করে ডাল আর মুলোর খেত তছনছ করে। তিন হাজার ফুট ওঠার পর কালাই উপত্যকার অন্যপাশে একে একে পেমিয়াংশি, ইয়ান্তাং, হি ও অন্যান্য গ্রামগুলো দৃশ্যমান হতে থাকে। ওদিকে রাতোং নদীর খাত। ডানদিকের লিংচাম গ্রামে রয়েছে মুরোভার খেত আর কমলালেবুর বাগান। সেরাতে তাঁরা ঐ গ্রামেই এক লিম্বু বাড়িতে আশ্রয় পান। ক্লান্তিতে অঘোরে ঘুমায় সবাই।

পরদিন সকাল থেকে শুরু হয় সুঁড়িপথ ধরে চড়াই ওঠা। বনের মাঝে মাঝে ভুট্টাখেত আর এক্কা দোক্কা লিম্বু বাড়ি। পথে কেউ কেউ মাথায় করে এক ঝুড়ি বুনো খুবানি তুলে নিয়ে চলেছে। বেলা দুটো নাগাদ একটি জাহাজের মাস্তুলের মতন জায়গায় পৌঁছোয় দলটা। দূরে সাঙ্গাচোলিং মঠ, সামনে একটি শ্যাওলাঢাকা চোর্তেন। ঘন ওক-পাইনের বনের ভেতর দিয়ে ঝোপঝাড় কেটে টালে গ্রামে পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে যায়। টালে গ্রামে গোটা বিশেক বাড়ি। বাড়িগুলির আশেপাশেই গৃহপালিত ঘোড়া আর মহিষ চরছে। অভিযাত্রীদের দেখে গ্রামের মানুষ বেরিয়ে এসে ছাং-এর বিনিময়ে লবণ চান। ওদের মোড়ল বলেন, এবছর অক্টোবরেই তুষারপাত হওয়ায় ইয়াম্পুং থেকে লবণের ব্যাপারীরা আসেনি!

কিন্তু শরৎদের কাছে উদ্বৃত্ত লবণ না থাকায় তাঁরা দুঃখপ্রকাশ করে। ছাং তাঁরা কিনে নেয়। তারপর মোড়লের বাড়িতে অতিথি হয়ে রাতের খাবার খাওয়ার আগে মোড়ল ও গ্রামের অন্যান্য পুরুষদের সঙ্গে ছাং, ভুট্টাসিদ্ধ ও খুবানী খেয়ে আনন্দ পায়।

পরদিন ভোরে বাঁশের সাঁকোর ওপর দিয়ে সন্তর্পনে খরস্রোতা রিংবি পার হয়ে নদীর পাড় ধরে মাইল পাঁচেক এগোয়। খাড়া পাহাড়ের গা কামড়ে চলেছে পথ, সরু আর পিচ্ছিল, যখন তখন বুনো লতায় পা জড়িয়ে আছাড় খাওয়ার ভয়। পাথরের খাঁজে পা ফেলে চলতে হয়। অনেক নীচে জলের ফেনিল গর্জন, পায়ের ধাক্কায় পাথর খসে খসে নিমেষে হারিয়ে যায় তার হাঁ-মুখে। পা হড়কালে মানুষ কিম্বা ঘোড়াদেরও এই দশা হবে ভেবে বারবার গা শিউরে ওঠে। এক জায়গায় একটি অতিকায় পাথর কেটে গভীর খাত করে নিয়েছে জলধারা, ওপরে বাঁশের মই ফেলা রয়েছে। এখানে ধীরে ধীরে ঘোড়াগুলিকে পার ক্রতে বেশ বেগ পেতে হয়। শরৎ নিজেও পায়ে ভর দিয়ে পার হতে পারেন না। অগত্যা, হামাগুড়ি দিয়ে সেটি পার হতে হতে ওপর দিকে তাকিয়ে তিনি দেখেন পাথরের ফাটলে গোঁজা কয়েকটি স্টাফ-করা ফেজেন্ট জাতীয় পাখি আর একটি লাল তিব্বতি জামা। এই ধরনের পাখি কিনতে পাওয়া যায় দার্জিলিঙের বাজারে।

আরও মাইলখানেক এগিয়ে তাঁরা পৌঁছন একফালি রোয়াকের মতন জমির ওপর গড়ে ওঠা ছবির মতন রিংবি গ্রামে। অপরূপ দৃশ্য। পিছনে খাজকাটা ন্যাড়া পাহাড়ের প্রেক্ষাপট, অনেকটা নীচে সগর্জনে বইছে রিংবি। খাতের ওপারে বন্য কলার বন, ওক, পাইন আর রাতান লতার দড়িদড়ায় পাহাড়ের গা ঢেকে রয়েছে। আধ ডজন কুঁড়ে নিয়ে লিম্বু উপজাতির ছোট গ্রাম, সেখানে পৌছেই ফুরচুং পিঠ থেকে মালের বোঝা খসিয়ে তার প্রভুর জন্য মুরোভার বিয়ার কিনতে ছোটে তার এক চেনা বাড়িতে। ফিরে আসে তিনটি বোতল নিয়ে, যার মধ্যে একটি অবশ্যই তার প্রাপ্য। নদীখাতের ধারে ঘাসজমিতে তাঁবু টাঙিয়ে ভেতরে জাজিম বিছানো হয়। তার ওপরে শরীর এলিয়ে বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে ক্রমে ক্লান্তি লাঘব হয় শরতের। কুলি চাকরেরা কেউ গিয়েছে জ্বালানি কাঠ কুড়াতে, কেউ বা বনের শাকপাতা তুলতে, রাতের খাবার জোগাড় করতে গিয়েছে কেউ। অনেকটা নীচে জলের কলধ্বনি ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। ছেড়ে আসা অতীতের থেকেও অনাগত ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাকে বেশি করে ভাবায়। তা থেকে মুক্তি পেতে তিনি ভাবেন চট্টগ্রামের বাড়িয়ে রেখে আসা তাঁর স্ত্রীর কথা। ভাবতে ভাবতে একসময় আবেশে ঘুমিয়ে পড়েন। সন্ধ্যায় ফুরচুং তাকে ডেকে খাওয়ায়। তারপর আবার ঘুম।

১৪ নভেম্বর। ঘুম ভেঙে দেখেন পরিষ্কার আকাশ, চারিদিকে অপরূপ পাহাড়ের দৃশ্য এত মনোরম যে দেখে আঁশ মেটে না! কিন্তু ফুরচুঙের দেখা নেই। গত সন্ধ্যায় তাঁকে খাবার দিয়ে সে পাহাড়ের ওপারে নাহুরা গ্রামে গেছে পরবর্তী কঠিন যাত্রার জন্য রসদ সংগ্রহ করতে। সেদিন দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও ফুরচুং ফিরে না আসায় দুশ্চিন্তা বাড়ে। অগত্যা সেদিনের যাত্রা বাতিল করতে হয়। অবশেষে বিকেলের পর টলতে টলতে উদয় হয় সারা গায়ে কাদামাখা ফুরচুঙ, ধুম মাতাল, কিন্তু রসদ আনতে ভোলেনি। চাল, ভুট্টা, মুরোভা, ডিম, শাকসবজি আর আস্ত একটা ভেড়া কিনেছে চার টাকায়। অনেক ক্ষমা চেয়ে, সেলাম ঠুকে, তিব্বতি কায়দায় জিভ ঘুরিয়ে চোখের সামনে থেকে বিদায় হয় সে। রিংবিতেও গ্রামের লোকেরা লবণের বদলে দিতে চাইছিল এক বিশেষ ধরনের লতা। এই লতা এখানকার জঙ্গলে খুব জন্মায়। এই লতা থেকে রং তৈরি হয়। টাটকা তুষারপাতে ঢেকে গেছে ওপরের গিরিপথ, গ্রামবাসীরা তাই এগিয়ে যেতে নিষেধ করেছিল। রিংবিতে থাকলে বরং খাবারদাবার পাওয়া যাবে! কিন্তু উগেন বলেন, বেশিদিন থেকে গেলে এই খবর তিব্বতী সীমান্তরক্ষীদের কানে পৌছে যাবে! তাছাড়া কবে নরম তুষার জমে গিয়ে চলার মতন হবে, তা জানার কোনও উপায় নেই। মাত্র তিন-চার দিনের দূরত্বে গিরিপথ। শেষপর্যন্ত ঠিক হয়, যাত্রাপথ পালটে ওঁরা এখন ইয়াম্পুং পাস দিয়ে যাওয়া হবে। ওদিকটায় বরফ পড়েনি। গ্রামের মানুষদের অবশ্য বলা হয়েছিল যে ওরা শিকারীর দল, গিরিপথ পেরোনোর প্রয়োজন নেই। ফুরচুঙের পাখিমারা বন্দুক আর গুলির বেল্ট দেখে তাঁরা একথা বিশ্বাস করে।

রিংবি পেরুতেই উঁচু উঁচু সাইপ্রাস আর একটি প্রাচীন জুনিপার গাছ। কিছুটা এগিয়ে পথের ধারে একটি গুহাকে সবাই সসম্ভ্রমে প্রণাম করে। এটির নাম দেচান ফুগ বা আনন্দ গুহা ; একটি অতিকায় পাথরের গহ্বরে নাকি অগণন প্রেতাত্মাদের বাস। নদীর পাড় ধরে পথ তেমন কঠিন নয়, ঝর্ণার ওপরে সাঁকো কোথাও বা পাথরে ধাপ কাটা রয়েছে। ঘর ছাইবার জন্য বনের বাঁশ সংগ্রহ করতে ব্যস্ত লিম্বু জনজাতির লোকেরা।

বেলা একটা নাগাদ দলটি পৌঁছয় পাওংতাং। সেখানে একটি জীর্ণ যাত্রীছাউনিতে বিশ্রামের ব্যবস্থা হয়। স্থানীয় ভাষায় এগুলিকে বলে দংখাং। এই দংখাংটি এতই নীচু যে ভেতরে সোজা হয়ে দাঁড়ানো যায় না, মেঝেয় থিকথিক করছে পিঁপড়ে, আগুনের ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসে। সঙ্গে তাঁবু রয়েছে, কিন্তু গোঁয়াড় কুলিরা কিছুতেই সেটি খাটাবে না। তাদের যুক্তি হল, দংখাং যখন আছেই তখন তার সদ্ব্যবহার হবে না কেন? এর মধ্যে আবার শুরু হয় ঝিরঝিরে বৃষ্টি। এসবের মাঝেই কোনোক্রমে রান্নার ব্যবস্থা হয়।

কাছেই গোপালকদের বসতিতে ফুরফুঙের এক তুতো ভাই থাকে। সেখান থেকে সে দুধ, চীজ, মুরোভা আর খুব সুস্বাদু মাছ কিনে আনে। মাছভাজা দিয়ে মুরোভার বিয়ার পান করে পথের শ্রান্তি দূর হবার পর কুলিরা গানের আসর বসায়। গায়ক দুই কুলি, জোর্দান আর তোনজাং। মোটবাহকের কাজ করলেও আসলে এরা নিজের নিজের গ্রামে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। যাত্রার আসল উদ্দেশ্য স্থানীয় লোকেদের কাছে গোপন রাখার কথা মাথায় রেখে এদের বহাল করা হয়েছিল।

নির্জন পাহাড়ের মাঝে জোর্দান আর তোনজাঙের গান শুনে, কয়েক চুমুক মদ কীভাবে পাহাড়ি মানুষের ভেতর তাঁদের গভীর সংস্কৃতি জাগিয়ে তুলতে পারে তা চাক্ষুষ করে অবাক হন শরৎচন্দ্র। তাঁরা রিঞ্চেন তেনোয়া নামে একটি জনপ্রিয় পাহাড়ি গাথা সুর করে গাইতে থাকেন। এই সুর মুরোভারের নেশাকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়। এই সুর পবিত্র, অজর, অমর ও অমৃতসুধাময়।


চলবে ...