বৃহস্পতিবার, মে ২৮, ২০২০

​মহাসত্যের বিপরীতে দ্বিতীয় খণ্ড# চতুর্থ পর্ব

‘যদিও পায়ের নীচে মাটি এখন অগ্নিগর্ভ;/

যদিও আমাদের মাথার উপর আকাশ বলতে কিছুই নেই’...। - বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


এখানে আসার পর থেকে এক অদ্ভুত শীতল শ্লথ পরিবেশে রামপ্রসাদের সবচাইতে বেশি মনে পড়ে শরৎচন্দ্র দাসের ডাইরির একেকটি বাক্য, পণ্ডিত শরৎচন্দ্র দাস তিব্বতকে ভালবেসে ফেলেছিলেন। কিন্তু তাঁর ভালবাসার ফলে নিদারুণ কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে তাঁদেরই, যাঁদেরকে তিনি সবচাইতে বেশি ভালবেসে ছিলেন। আর এই খবরগুলি একেকটি বোমার মতন আছড়ে পড়ে বিদীর্ণ করতো তাঁর হৃদয়, ক্ষতবিক্ষত করতো।

রামপ্রসাদের মনে পড়ে আরও দুই গোয়েন্দা পণ্ডিত নেম সিং আর পণ্ডিত কিন্টুপের অভিজ্ঞতার কথা। তাছাড়া জর্জ বোগলে, জোসেফ ডাল্টন হুকার, ফ্র্যাঙ্ক ইয়ংহাজব্যান্ড, একাই কাওয়াগুচি, স্যর ফ্রান্সিস ইয়ংহাজব্যান্ড, এফ এম বেইলেরা প্রত্যেকেই এদেরই মতন অদম্য সাহস ও প্রখর স্মৃতিধর মানুষ। এদের লেখা কিম্বা জবানবন্দী সম্বল করেই তো সে এই অজানা দেশে পাড়ি দিয়েছে। কেউ গুপ্তচর, কেউ সেনানায়ক, কেউবা প্রেমিক ও প্রকৃতিবিদ। কেউ রহস্যনদীর পথ খোঁজেন, কেউবা স্বজাতির উৎস সন্ধান করে কিছুই পাননি! ওদের নানারকম দায় ছিল, কর্তব্যও ছিল। কিন্তু রামপ্রসাদের কোনও দায় নেই, তাঁর রয়েছে শুধু আগ্রহ। তথাকথিত শাংগ্রিলা বা জ্ঞানগঞ্জের আকর্ষণেই সে নিজের জীবন তুচ্ছ করে পদব্রজে হিমালয় পাড়ি দিয়েছে। আর এখন তাঁর এই আগ্রহের সর্বস্ব হরণ করেছে এই সো সা লিং।

রামপ্রসাদ ভাবে, এখান থেকে সে কী কী আহরণ করেছে তা অবশ্যই একে একে গরবকে জানিয়ে রাখতে হবে। এখানে তাঁর পরিচয় ভারতীয় আয়ুর্বেদ ও যোগবিদ্যার শিক্ষক রূপে। তাঁর সহশিক্ষক মিগমারই তাঁকে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়া গরবকে যোগ শেখাতে বলেছেন। কিছু কিছুদিনের মধ্যেই সে বুঝে গেছে যে এই গরব মঠাধ্যক্ষের অত্যন্ত আগ্রহের বিষয়। কেন? রামপ্রসাদের প্রতি মঠাধ্যক্ষের যতটা আগ্রহ, গরবের ক্ষেত্রে তার থেকে কম নয়। সেজন্যে রামপ্রসাদ শঙ্কিত।

রামপ্রসাদ বেশ কিছুক্ষণ গরবের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে ফিসফিসিয়ে বলে,- এখানে মঠাধ্যক্ষ ও তাঁর কয়েকজন শাকরেদ অমরত্বের নিগুঢ় তত্ত্ব জানার গবেষণা করছেন। তুমি যাকে দেখেছ তিনি কয়েকশো বছর ধরে বেঁচে আছেন। কিন্তু সাধারণ জীবদ্দশার গণ্ডি পেরিয়ে অনেকদূর যেতে সক্ষম হলেও তিনি অমর নন।

গরব জিজ্ঞেস করে -তাহলে? কোন পদ্ধতিতে ওরা নিজেদেরকে মৃত্যু থেকে মুক্ত রাখার কথা ভাবছে?

রামপ্রসাদ বলে, আমি নিশ্চিত, ওদের কোনও গোপন গৃঢ়বিদ্যা জানা আছে যা তাঁরা এই মঠের হাসপাতাল ও চিকিৎসাবিদ্যার উচ্চ শিক্ষাকেন্দ্রের আড়ালে অভ্যাস করে। আমি সেই পদ্ধতি জানতে চাই! সেজন্যেই এত প্রতিকূল পরিবেশে মাটি কামড়ে পড়ে আছি!

গরব রামপ্রসাদের দিকে অবাক চোখে তাকায়। রামপ্রসাদ এবার চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, তবে ওরা সফল হবে না ! এই সাধুরা মৃত্যুকে জয় করতে পারবেই না, কারণ ওরা মৃত্যুকে বিশ্বাস করে !

কিছুক্ষণ চুপ থেকে গরবের চোখে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে আবার বলে,- মৃত্যু একটা এমন ধারণা যা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, এর ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করতে হবে, তারপর তাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে ! যে পরমাণুগুলি ধ্বংস হচ্ছে সেগুলিকেই অপসৃয়মান বস্তু থেকে হাজার হাজার গুণ শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে । প্রাণ একটি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অস্পষ্ট শক্তি । অন্ধ যেমন কিছু আবছা ছায়া ছাড়া বাস্তবের কিছুই দেখতে পায়না তেমনি যেসবের মিশ্রণে আমাদের প্রাণ, আমরা যাকে বেঁচে থাকা বলি সবই ভ্রম !

গরব অবাক হয়ে অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞেস করে , সবই ভ্রম?

রামপ্রসাদ উদাস কণ্ঠে বলে, মায়াও বলতে পারো! দেখ বন্ধু, সো সা লিং - এর সাধুরা যা জানে আমি তা শিখতে চাই। অন্যরা যা জানে অন্যখানে আমি তা শিখেছি। সেজন্য এদের পদ্ধতি জেনে আমি হয়তো এদের থেকেও ভাল ফল পাবো !

গরব বলে,- আমি এখনও বুঝতে পারছিনা, তুমি ঠিক কী চাও?

রামপ্রসাদ ম্লান হেসে বলে, – তোমার বোঝার কথাও না, তুমি যত তাড়াতাড়ি পারো এখান থেকে চলে যাও! আমার ধারণা, এরাও তোমার বাবার মতনই নিষিদ্ধ তান্ত্রিক পথের সাধক, অন্যের প্রাণশক্তি হরণ করে নিজেদের প্রাণশক্তি বাড়াতে চায়। মঠাধ্যক্ষ আমাকেও চেষ্টা করেছে। আমি সেটা অনুভব করেছি এবং মানসিক শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করেছি। এই প্রতিরোধের শক্তি অনেক সাধনা করে রপ্ত করতে হয়। চাইলেই তোমাকে দ্রুত শেখানো যাবে না ! তুমি সাবধান ! খুব দ্রুত পালানোর চেষ্টা করো।

গরব ঢোঁক গিলে বলে,- আর তুমি অমরত্বের স্বার্থে ওদের সঙ্গে একা লড়বে?

রামপ্রসাদ ঠোঁট উল্টে বলে,- তোমাকে আগেই বলেছি, অমরত্বের পথ কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন । নশ্বর সবকিছু ধ্বংস হবে, বিলোপ হবে, তবেই অবিনশ্বর শক্তি মুক্তি পাবে। আমার ধারণা এখানকার তান্ত্রিকরা এমনি মুক্তির পথে হাঁটার সাহসই পাবে না! ওঁর কথাগুলি ভালভাবে না বুঝলেও গরব মুগ্ধ হয়ে শোনে।

রামপ্রসাদ গরবকে কয়েকটি যোগাসন শিখিয়ে বলে, এগুলি নিয়মিত অভ্যাস করবে, মনের বল ফিরে পাবে, যদিও এই শারীরিক কসরতগুলি যোগাভ্যাসের মুখ মাত্র। কোনও সঙ্গীতানুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে বাদ্যকররা যেমন তাল ঠোকাঠুকি করে প্রস্তুতি নেয়, যোগাসনও তেমনি যোগাভ্যাসের মুখ মাত্র! যোগের পূর্ণ উপযোগের জন্য, যোগকে সম্পূর্ণরূপে বোঝার জন্য আমাদেরকে বুঝতে হবে – যোগী কে? একটু থেমে রামপ্রসাদ আবার বলে, যোগী এমন এক ব্যক্তিই যিনি তার শরীর, মন, পরিবেশ ও প্রকৃতির মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে একটি ঐকতান গড়ে তুলতে পারেন। সেই ঐকতান প্রাপ্তির পথকে বলা হয় যোগ। শরীরের সংযমকে মানব-সচেতনতায় র রূপান্তর করা এবং নিয়মিত অভ্যাসের মাধ্যমে অনুভুতিগুলিকে সঞ্জীবিত করার পদ্ধতিকেই উপনিষদে যোগ বলা হয়েছে। পরমেশ্বরকে অনুভব করার বাহন হল মানুষের শরীর।

রামপ্রসাদকে থামিয়ে গরব জিজ্ঞেস করে,- উপনিষদ আবার কি?– যোগগ্রন্থ?

রামপ্রসাদ বলে,- না, বেদ ও উপনিষদ হলো দুটো প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্র। তেমনি শ্রীমদ্ভগবদগীতা একটি প্রাচীন ভারতীয় দীর্ঘসংগীত। সেই সংগীত নিজেকে একটি যোগশাস্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছে। গীতা বলে, ‘ যোগ কর্মেষু কৌশলম’ অর্থাৎ, যোগ হল কর্মের উৎকর্ষ। আত্মোৎসর্গ এবং পিছুটানহীন কর্মই হল প্রকৃত যোগ। গীতা আরও বলে, ‘যোগস্য তথা কুরু কৰ্মাণী’ অর্থাৎ একজন যোগীর উপলব্ধি করার ক্ষমতাই হল যোগ। সেজন্যই আমরা যোগকে মানবতার সংহত ভবিষ্যতের লক্ষ্য হিসেবে দেখতে পারি। এটি একটি অবস্থা যাকে মনের প্রকৃতি বলা যায়। যোগ একটি আস্থা, আর যতক্ষণ ওইরূপে আমরা না পাই, ততক্ষণ আমরা তাকে খণ্ডিত রূপে দেখি, তার পূর্ণতাকে চিনতে পারি না। গরব জিজ্ঞেস করে, আমার জীবন হতাশায় ভরা, যোগের সুফল কিভাবে টের পাবো?

রামপ্রসাদ বলে, যোগের সুফল বহুমাত্রিক। অনুশাসন মেনে যথাযথভাবে অভ্যাস করলে যোগ আমাদের শরীরের সম্ভাবনাগুলিকে শক্তি, দক্ষতা, সার্বিক স্বাস্থ্য, শান্তি এবং চাপমুক্ত জীবনে রূপান্তরিত করে। আমরা যেমন কখনও নিজেকে চিনতে ভুল করি, তেমনই কখনও যোগের শক্তিকেও চিনতে ভুল করি। যিনি গাছ দেখেননি, বীজ থেকে যে গাছ হয় সেই জ্ঞান যার নেই, তাকে একটি বীজ দেখিয়ে তার সম্ভাবনার কথা যতই বোঝাও না কেন তিনি বিশ্বাস করবেন না, হাজার প্রশ্ন করবেন। কিন্তু, এটা নিশ্চিত যে ওই ছোট্ট বীজটিকে সঠিকভাবে লালন-পালন করলে প্রকৃতি থেকে জল ও শক্তি সংগ্রহ করে একদিন মহীরূহে পরিণত হবে। মানুষের মধ্যেও পরমাত্মা তাবৎ শক্তি ভরে দিয়েছেন। আমাকে দিয়েছেন আর তোমাকে দেননি, এমন নয়। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই এই সামর্থ নিহিত রয়েছে। কিন্তু যিনি সেই সামর্থকে লালন-পালনের শৈলী জানেন, যিনি একে বিকশিত করার অবসর পান, যিনি আস্থাকে সম্বল করে অভ্যাসের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিকশিত করে তুলতে পারেন, তিনিই উৎকৃষ্ট জীবনের শিখরে আরোহণ করতে পারেন!

গরব বলে, আমি পারবো না, দেচমার মৃত্যুর দৈববাণী শোনার পর থেকে বাঁচার ইচ্ছাই আর নেই!

রামপ্রসাদ শান্ত স্বরে বলে, ঈশ্বর প্রত্যেক জীবের মধ্যেই যে যেখানে রয়েছে, সেখান থেকে উপরে ওঠার সহজ ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। যোগ সেই পরিস্থিতিকে জন্ম দেওয়ার একটি মাধ্যম! তাছাড়া ওই দৈববাণী তোমাকে কাবু করার একটা কৌশলও হতে পারে।

- এ আবার কেমন কৌশল!একথা শুনে গরবের দ্বন্দ্ব বাড়ে। কিন্তু হিন্দু দর্শন সম্পর্কে তার মনে যে আগ্রহ ছিল রামপ্রসাদের কথা শুনে তা আরও গভীর হয়। জ্ঞানী কোনও লামার কথা শোনার পর যেমন মনে কেমন একটা পবিত্র ভাব আসে, এই ভিনদেশি মানুষটির কথা শুনেও মনের গভীরে তেমনি এক প্রশান্তি ডানা মেলতে চায় ! উচাটন গরব সেই প্রশান্তিকে পেতে চায়।

দেখতে দেখতে বেশ কিছুদিন কেটে যায়। গরব প্রতিদিনই কিছু শিখছে। এই শিক্ষা তার বেঁচে থাকাকে প্রবল হাহাকারের চাপ থেকে কিছুটা মুক্ত করতে পেরেছে। ওকে এবং অন্য কয়েকজন শিক্ষার্থীকে যোগ শেখানোর পাশাপাশি রামপ্রসাদ নিয়মিত সমস্ত রোগীদের নাড়ী পরীক্ষা করে, তাঁদের শারীরিক পরিস্থিতি দেখে ঔষধ বানিয়ে দেয়। তারপর গ্রন্থাগারে গিয়ে বন চিকিৎসা পদ্ধতির নানা পুঁথি পড়ে, খাতায় নোট করে, মিগমার ও অন্যান্য অভি জ্ঞ চিকিৎসকদের কাছে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে। এসব দেখে গরবের মনেও সো সা লিং-এ কিছুদিন থেকে চিকিৎসা পদ্ধতি শেখার ইচ্ছে জাগে। তার যে কোথাও যাওয়ার নেই! তাছাড়া রামপ্রসাদের উপস্থিতি ওকে ওই আরোগ্য ধামে থেকে যাওয়ার শক্তি জোগায়। নিয়মিত যোগাভ্যাসে তার শারীরিক শক্তিও ফিরে আসছে বলে টের পায়। অবশ্য প্রাক্তন ডাকাত সর্দারের স্পষ্ট বিচার আর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব তার মনে জেগে ওঠা এই হিন্দু সাধুর প্রতি শ্রদ্ধার সামনে মাথা নত করেনি। সেই সত্তাটিকেও সমানভাবে জেগে থাকতে দেখে গরবের ভাল লাগে। রামপ্রসাদের জ্ঞান, বুদ্ধি তার থেকে অনেক বেশি হলেও তাঁর দূরদর্শিতা সম্পর্কে গরবের মনে সন্দেহ রয়েছে। সে যে শিক্ষার অছিলায় ক্রমে একটি বিপজ্জনক ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে তা বুঝতে পারছে না! গরবের কেন জানি মনে হয় সেই জাল অদৃশ্যে দ্রুত গুটানো হচ্ছে। গরবের যোগশিক্ষাও একটি অছিলা মাত্র।

এই অনুভূতির কথা গরব তাকে জানালে সে বলে, নিজেকে বাঁচানোর শক্তি আমার রয়েছে, তবুও তোমার যখন এমন মনে হচ্ছে, সতর্ক থাকবো!

গরব আর কিছু বলে না। বেশি বললে সে হয়তো ভাববে, গরব ওর গুপ্তবিদ্যা ও আত্মিক শক্তি সম্পর্কে সন্দিহান। কিন্তু সে মনে মনে ভাবে, যতটা সম্ভব রামপ্রসাদকে চোখে চোখে রাখতে হবে! অনেক সময় দুটো শক্ত হাতের সাহারা পেলে একজন জাদুকরেরও শক্তি বাড়ে।

সেজন্যেই গরব মিগমারের কাছে সো সা লিং-এর চিকিৎসকদের সহায়ক হওয়ার আবেদন জানায়। পরদিনই মিগমার জানায় যে তার আবেদন মঞ্জুর হয়েছে। এত দ্রুত তার আবেদন মঞ্জুর হতে দেখে রামপ্রসাদও অবাক হয়ে যায়।

পরদিন থেকেই গরব হাসপাতালের নানা কাজ শিখতে শুরু করে। প্রথমেই তাকে দেওয়া হয় সাফাইয়ের কাজ। এই প্রবল শীতে এটি অত্যন্ত কঠিন কাজ। রামপ্রসাদ তাঁকে গোপনে খুব করে অঙ্কোল তেল মালিশ করে দেয়। তারপর থেকে সে নিজেই নিয়মিত মালিশ করতে থাকে।

প্রতিদিন নিয়ম করে হাসপাতালের সমস্ত কক্ষ পরিষ্কার করার পর ক্রমে সে রোগীদের চা ও ৎসাম্পা পরিবেশন এবং তাদের এঁটো বাসনগুলি ধুয়ে পরিষ্কার করার দায়িত্ব পায়। শীতে প্রতিদিন আট দশজন লামা পাহাড়ের ঢাল থেকে চাই চাই কঠিন বরফ কেটে আনে। সেগুলি টিনে ঢেলে কেরোসিন স্টোভের উপর গরম করে পানীয় জল এবং রান্না ও শৌচালয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়। তুষারপাতের দিনগুলিতে অবশ্য প্রথম ও দ্বিতীয় বেষ্টনীর উঠোন থেকেই কাঁচা বরফ সংগ্রহ করা যায়। সেই বরফ গলিয়ে কম জল হয়। কিন্তু গরবের ওই জল খেতেই বেশি ভাল লাগে। আর ভাল লাগে রামপ্রসাদের কাছে রামায়ণ - মহাভারতের গল্প শোনা। গরবও নিজের জীবনের নানা ঘটনার পাশাপাশি রামপ্রসাদকে লিং - এর গিজারের বীরত্বের কথা শোনায়। ইতিমধ্যে রামপ্রসাদ একদিন গোপনে গরবের লিঙ্গে ক্যাথিটার দিয়ে পারদ পুটিত ভেষজ রস প্রয়োগ করে। রামপ্রসাদের নির্দেশে গরব নৌলামুদ্রার টানে লিঙ্গেন্দ্রিয় বার বার উপরে টেনে ভেষজ রস ইন্দ্রিয় দিয়ে শোষণ করে। ব্যপারটা রপ্ত করতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগে। সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। পরদিন থেকেই খেচরী মুদ্রার সঙ্গে যুক্ত প্রাণায়াম শুরু হয়। কিন্তু রামপ্রসাদ তাকে সতর্ক করে যাতে সে কিছুতেই এই বিদ্যা সো- সা- লিং- এর কারও সামনে অভ্যাস না করে!

গরব বাধ্য ছাত্রের মতন সতর্ক থাকে। এভাবে প্রতিদিন সকালে সামান্য সূর্যভেদী যোগাভ্যাস আর সারাদিন কাজের ব্যস্ততায় দেখতে দেখতে দিন মাস বছর গড়িয়ে প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে যায়। ইতিমধ্যে সে রামপ্রসাদের কাছে গোপনে মূলবন্ধ, মহাবন্ধ, জ্বালন্ধর বন্ধ করে মুহুর্মুহু কুহু নাড়ির আকর্ষণে শক্তিকেন্দ্র মূলাধার থেকে কুণ্ডলিনীকে টানতে শিখেছে। কিন্তু তখনও দ্বিতীয় গ্রন্থি ভেদ করে মণিপুরে উঠতে পারেনি। কিন্তু যোগাভ্যাস এবং হাসপাতালের সহায়কের কাজে সে যে নিঃসন্দেহে আগের থেকে অনেক বেশি পারদর্শী হয়ে উঠেছে তা ডাক্তারদের প্রশ্রয়ে সে বুঝতে পারে। ফলে সে কাজে আনন্দ পেতে শুরু করেছে।

তখনই হঠাৎ একদিন আবার মঠাধ্যক্ষের ডাক আসে। কী ব্যাপার! কী চায় বুড়ো?

প্রায় দেড় বছর পর গরব আবার সেই আধো অন্ধকার ঘরে সেই আকর্ষণীয় মানুষটির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ওর হাতের ইশারায় তেমনি জুলে ওঠে মায়াবি ধূপদণ্ড। তারপর অদ্ভুত ধূপের গন্ধে চারপাশ ম ম করতে থাকে। মঠাধ্যক্ষ ওর দিকে অনেকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় বলেন, - তোমার আচরণে আমরা মুগ্ধ!

গরব আবার লক্ষ্য করে যে মুগ্ধতার কোনও প্রকাশ তাঁর গলার আওয়াজে, স্বরের ওঠানামায় নেই, বা স্বরই নেই বলা যায়! দেচমার মৃত্যুর কথা জানানো সেই দৈববাণীর মতন স্বরহীন আওয়াজে মঠাধ্যক্ষ বলেন, নিয়মিত যোগাভ্যাস আর অন্যের সেবায় নিজেকে নিঃস্বার্থভাবে নিয়োজিত করে তুমি নিজেকে সম্পূর্ণ শুদ্ধতার পথে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছ। এভাবে তুমি জ্ঞাত বা অজ্ঞাত অনেক পাপ থেকে মুক্তি পাবে। নাহলে যতদিন বেঁচে থাকতে ততদিন যন্ত্রণাময় জীবন কাটাতে হতো !

এই কথাগুলি শুনে গরবের বেশ ভাল লাগে। একটু থেমে মঠাধ্যক্ষ আবার বলতে শুরু করেন,- আমি ঠিক করেছি তোমার কৃতকর্মের ফলে জমা হওয়া বাকি পাপগুলির কালোছায়া থেকে তোমাকে মুক্তি দেব, তোমার জন্য পুজো দেব!

একথা শুনে গরব বেশ খুশি হয়। মঠাধ্যক্ষ আবার তালি বাজান। একজন মঠবাসী ওই কক্ষে ঢোকেন। তার হাতে একটা তামার বারকোষ আর একটি পায়ে সুতলি বাঁধা মুরগি। মঠাধ্যক্ষ তখন উঁচু আসন থেকে ওর সামনে নেমে আসেন। গরবকে বলেন ঘরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াতে।

তিনি ডানহাতে মুরগিটার দু’পা চেপে ধরেন আর বাঁ হাতে বারকোষটা নিয়ে গরবকে ধীরে ধীরে উপর থেকে নিচে ঝাড়তে শুরু করেন। মুরগিটা যেন একটা ঝাড়ন যা দিয়ে তার শরীর পরিষ্কার করা হচ্ছে আর বারকোষটা নিচে এমনভাবে ধরেছেন যেন সব নোংরা গিয়ে ওতে পড়ছে।

ওই ঝাড়ার সময় মঠাধ্যক্ষও তার চেলা একে একে এক অদ্ভুত স্বরে এমন সব মন্ত্র আবৃত্তি করতে থাকে যার মাথামুণ্ডু গরব বুঝতে পারে না।

কিছুক্ষণ পর মঠাধ্যক্ষ মুরগিটাকে মেঝেতে ফেলে দেয়। প্রাণীটি একবার ককিয়ে উঠে আর্তস্বরে চেঁচিয়ে ডানা ঝাপটাতে থাকে। মঠাধ্যক্ষ বলেন, ওর পায়ের বাঁধন খুলে দে!

শিষ্যটি তা করলে মুরগিটি উঠে দাঁড়িয়ে পালানোর চেষ্টা করে। শিষ্যটি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গুরুর দিকে তাকায়।

গরব এই বিস্ময়ের কারণ বুঝতে পারে না। যেন অসম্ভব কিছু ঘটেছে।

কিন্তু মঠাধ্যক্ষ তখন গরবের চোখের দিকে বরফ দৃষ্টিতে তাকান। কিছুক্ষণ সব চুপ। তারপর মঠাধ্যক্ষ নিস্তব্ধতা ভেঙে নিচু মৃদুস্বরে কথা বলেন, এই প্রমাণটাই আমি চাইছিলাম! এই ফল আগে থেকেই অনুমান করেছিলাম! তোমাকে বুঝতে হবে বাবা, এই ঝাড়ন ক্রিয়ায় ব্যক্তির সমস্ত পাপ মুরগির শরীরে চলে যাওয়া উচিত, সেক্ষেত্রে মুরগিটাও মরে যাওয়া উচিত। তা না হলে এটাই বোঝা যায় যে ওটা কিছুই গ্রহণ করতে পারেনি বা গ্রহণ করার মতন কিছু পায়নি। তার মানে ব্যক্তির শরীরে থেকে নেমচেস বা আত্মা আগেই চলে গেছে, শুধু খোলটা পড়ে আছে!

এই প্রথম মঠাধ্যক্ষের আওয়াজে স্বরের ওঠানামা টের পায় গরব। এই আওয়াজ একটু অন্যরকম। গরব আগেও অনেকবার লামাদের মুখে এমন কথা শুনেছে যে অনেক মানুষের মৃত্যুর অনেক আগেই নেমচেস তাঁকে ছেড়ে চলে যেতে পারে!


চলবে ...