বৃহস্পতিবার, মে ২৮, ২০২০

​মহাসত্যের বিপরীতে, তৃতীয় খণ্ড # অষ্টম পর্ব

‘কেউ যদি ধর্মের জন্য বাঁচে/ আর ধর্মাচরণ করে যায়/ একজীবনেই সে/ বুদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।‘ - ৎসাংইয়াং গ্যাৎসো( ৬ষ্ঠ দলাই লামা)

মাও শৃসানের ডাইরি -২

আবারও বলি, মার্ক্সবাদের সংস্পর্শে আসার আগে আমি বৌদ্ধধর্মকে একটি আচরণীয় ধর্ম এবং বিশ্বাসের সমাহার ভাবতাম। আমি মনে করতাম, কারও আচরণমূলক ধর্ম না-ও থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর একটি বিশ্বাসের জায়গা থাকতে হবে। আমি বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা অবলম্বণেই মানুষের ভালো এবং সমাজের সার্বিক উন্নতির নানা উপায় ভেবেছিলাম। আমি ভাবতাম, ইতরজনেরা ভদ্রলোকদের জন্য পরিশ্রম করেন, তাই ভদ্রলোকদের হৃদয়ে ইতরজনদের বাঁচানোর জন্য করুণা থাকা প্রয়োজন।

সেই সময়ে আমি ‘ছন’ বা ধ্যান বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কুলপতি হুইনং-এর দার্শনিক চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হই। আর পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে চাকরি পেয়ে গোগ্রাসে গিলতে থাকি চীনা ভাষায় অনুদিত ব্জ্রচ্ছেদিকা প্রজ্ঞাপারমিতাসূত্র, মহাপরিনির্বাণসূত্র, বুদ্ধভতাংশসূত্র ইত্যাদি। বৌদ্ধ বিষয়ে আমার এত উৎসাহ ছিল যে একই সূত্রগ্রন্থের অনুবাদের বিভিন্ন সংস্করণও পড়ে ফেলি। যেমন ব্জ্রসূত্রের ক্ষেত্রে আমার কুমারজীব অনূদিত দীর্ঘ এবং অনেক ক্ষেত্রে দুর্বোধ্য সংস্করণের থেকে শুয়ানজাং(হিউয়েন সাঙ) এর অনুবাদ সংক্ষিপ্ত হলেও সহজবোধ্য লেগেছে।

দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আমাকে আধুনিক চীনের তিন চিন্তাবিদ ও নেতার অনুগামী হওয়ার প্রেরণা জোগায়। তাঁরা হলেন, খাঙ ইয়ৌওয়েই(১৮৫৮-১৯২৭) এবং তাঁর দুই শিষ্য – থান সিথুঙ(১৮৬৫- ১৮৯৮) এবং লিয়াং ছিছাও(১৮৭৩- ১৯২৯)। খাঙ ছিলেন সাংবিধানিক রাজতন্ত্র পদ্ধতি প্রবর্তনের প্রবক্তা। আধুনিক চীনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ১৮৯৮ সালের ‘সংস্কার আন্দোলন’-এ মূলতঃ এরা তিনজন নেতৃত্ব দেন। এই আন্দোলন দমন করেন তৎকালীন শাসক কিশোর সম্রাটের মাতামহ।

আন্দোলন ব্যর্থ হলে খাঙ এবং লিয়াং দেশ ছেড়ে পালান, কিন্তু থান ধরা পড়ে গেলে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আমি এই তিনজনের প্রতি আগ্রহী হই মূলতঃ লিয়াং ছিছাও এর ‘ধর্ম ও জনগণের প্রতি শাসনের অন্তঃসম্পর্ক’ শীর্ষক প্রবন্ধ পড়ে। সেখানেই প্রথম ‘ফলিত বৌদ্ধধর্ম’ কথাটি পড়েছিলাম। তিনি লিখেছিলেন, ‘পাশ্চাত্যের বিদ্যা বিষয়ে গবেষণা দুই ভাগে বিভক্ত – বিশুদ্ধ এবং ফলিত, যেমন, বিশুদ্ধ দর্শন এবং ফলিত দর্শন, বিশুদ্ধ অর্থনীতি এবং ফলিত অর্থনীতি ইত্যাদি’।

আসলে লিয়াং ছিছাও চেয়েছিলেন বৌদ্ধধর্মের কিছু মৌলিক তত্ত্ব ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক আন্দোলন চালাতে। ওয়াও কুওশিং-এর মতে লিয়াং এই প্রবন্ধে মূলতঃ ছ’টি বিষয়ে ‘ফলিত বৌদ্ধধর্ম’ ব্যাখ্যা করেছেন। আমি এই ছ’টি বিষয়কে নিজের জীবনে যেভাবে নিয়েছি এখানে সেভাবেই লিখছি।

এক, আমার মতে বৌদ্ধধর্ম প্রজ্ঞাকে আশ্রয় করে মানুষকে পথ দেখায়; কুসংস্কার নয়। লিয়াং এবং তাঁর সমসাময়িক চিন্তাবিদেরা ‘প্রজ্ঞা’ শব্দটিকে চীনা প্রতিশব্দ ‘চুয়ে’ অর্থাৎ চৈতন্যের সঙ্গে এক করে দেখেছেন। তাঁরা মানুষের মনে চেতনা জাগাতে বৌদ্ধধর্মের কিছু কিছু যুক্তিসঙ্গত বিষয় ব্যবহার করে এক ঐক্যবদ্ধ বিশ্বাস জাগাতে চেয়েছিলেন। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এই ভাবনার প্রভাবেই হয়তো আমি তখন লিখেছিলাম, ‘এক ব্যক্তির আচরণমূলক ধর্ম নাও থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর একটি বিশ্বাসের জায়গা থাকতে হবে’।

দুই, বৌদ্ধধর্মের বিশ্বাস হল, ‘বহুজন হিতায়’ মানে, অনেকের স্বার্থে। লিয়াং বলতেন, সবার বুদ্ধত্বপ্রাপ্তি হয় না, শুধু চেতনা থাকলে এবং ধ্যান করলেই বুদ্ধত্ব পাওয়া যায় না। সব মানুষের মুক্তির উদ্দেশ্যে কাজ করলে তবেই তা পাওয়া সম্ভব। থান সিথুঙ তাঁর বইয়ে লিখেছেন, মনুষ্য জগতের সব কষ্ট দূর করতে চাই চিত্তের ব্যবহার!’ এর প্রভাবে আমি একটি প্রবন্ধে লিখেছিলাম, ‘একজন ভদ্রলোকের হৃদয়ে ইতরজনদের বাঁচানোর জন্য আকুতি থাকা প্রয়োজন,… আমি নিজেও ক্লেশমুক্ত জীবন, এবং অন্যদের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে চিত্তের প্রশান্তি চাই’। আমি যে বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা অবলম্বণেই মানুষের ভালো এবং সমাজের সার্বিক উন্নতির নানা উপায় ভেবেছিলাম, এই মন্তব্য তারই প্রতিফলন।

তিন, বৌদ্ধধর্মে ঘৃণা না করে বিশ্বাসের মাধ্যমে জগৎকে উপলব্ধি করার কথা বলা হয়েছে। লিয়াং লিখেছেন, ‘সত্যই বলা হয় যে বৌদ্ধধর্ম হল স্বর্গোদ্যান, তবে তা বাস্তব আকারের নয়, নিরাকার স্বর্গোদ্যান, মানুষের মনেই তার অবস্থান, সেজন্যে জন্ম ও মৃত্যুকে ঘৃণা না করলে, নির্বাণকে ভালবাসা সম্ভব নয়!... একথাও বলা হয় যে, স্বর্গ ও নরক উভয়ই পূণ্যভূমি!’ ‘রাজ্য শাসনের অধ্যয়ন বিষয়ে দুইটি পথ’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিয়াং লিখেছেন, চীনের ধ্যান সম্প্রদায়ের বৌদ্ধরা ফলিত বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করতেন!...বিশ্ব বৌদ্ধধর্ম সত্যিকার ভারতের বাইরে আবির্ভূত হতে পারে, চীনা জনগণের বৈশিষ্ট্যগুলিকে ব্যক্ত করতে পারে, আর মেনে নিতে পারে যে জন্ম-মৃত্যু পারস্পরিক স্বতন্ত্র নয়। জগতের রহস্য যেভাবে বৌদ্ধধর্মে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তা কনফুসিয়াসবাদকে ছাড়িয়ে গিয়েছে!’

খাঙ ইয়ৌওয়েই এবং তাঁর দুই শিষ্য – থান সিথুঙ এবং লিয়াং ছিছাও আর আমার প্রিয় আরেক চিন্তাবিদ লিয়াং ছিছাও জনগণের জাগতিক বিষয়গুলি পরিচালনায় ঐতিহ্যশালী চীনা দর্শনগুলির ভাবধারার সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের মোক্ষলাভের চিন্তার মেলবন্ধন করতে চেয়েছিলেন। এই মেলবন্ধনে প্রভাবিত হয়ে আমি বাস্তব অবস্থার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে এক ধরণের বাস্তববাদ সৃষ্টি করি।

আমরা একটি ঘটনাকে ভালো বা মন্দ বলি, বাস্তবতার নিরিখেই ভালোকে ভালো আর মন্দকে মন্দ বলি। সুপ্রাচীন কাল থেকেই ভালোকে ভালো এবং মন্দকে মন্দকে মন্দ বলা হয়, কিন্তু এই দুটিকে একই সঙ্গে বিচার না করে। আমি মনে করি, হাজার হাজার বছর ধরে এরকম নামকরণের ভাবনা অসঙ্গত, আর যারা এই নামগুলি ধরে রাখতে চান তাঁরাও অসঙ্গত। সবকিছুকে ভালো বা মন্দ এরূপে দুভাগে ভাগ করে পৃথক সত্ত্বারূপে গ্রহণ না করে বাস্তবতা অনুযায়ী উভয়কে সমগ্র হিসাবে চিন্তা করা উচিত।

চার, বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাস হল ‘অমিত’, কিন্তু ‘সীমিত’ নয়। এই প্রসঙ্গে লিয়াং ছিছাও বৌদ্ধধর্মে ‘আত্মা অবিনশ্বর’ ধারণার কথা ব্যাখ্যা করেছেন। থান সিথুঙও একই মত পোষণ করতেন। আমিও এঁদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলাম।

পাঁচ, বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাস হল ‘সাম্য’, ‘বৈষম্য’ নয়। এই ধারণা বিশ্লেষণ করে লিয়াং ছিছাও বলেন, ‘জগতের সব প্রাণীর মধ্যেই বোধিচিত্ত আছে। আর, সব প্রাণীরই বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি হতে পারে; জন্ম, মৃত্যু, নির্বাণ যেন এক স্বপ্ন’। লিয়াং এবং থান উভয়েইবুদ্ধের করুণা প্রয়োগ করে জগতে মোক্ষলাভ এবং জনগণের মধ্যে সমতা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। এই ভাবনাও আমাকে প্রভাবিত করেছে।

ছয়, বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাস হল ‘স্বাবলম্বন’, অপরের ওপর নির্ভরশীল না হওয়া। লিয়াং বলেন, ‘একটি দেশে দুর্নীতি এবং দুর্বলতার কারণ একদিনে ঘটে না; আমাদের আফিমখোর পূর্বপুরুষেরা অশুভ জমি কর্ষণ করেছেন, আর বর্তমান প্রজন্ম তার কুফল ছেদন করছে। যেভাবেই হোক, আজকের প্রজন্মকে পূর্বপুরুষদের এই অশুভ কর্ম থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। আমাদের প্রজন্মকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভালো কাজ করতে হবে, যাতে কয়েক বছরের মধ্যে ভালো ফল পাওয়া যায়, অথবা কয়েক দশক বা শতাব্দীকাল ধরে আমাদের ভালো কাজ করে যেতে হবে। তবেই আমাদের দেশ ক্রমশঃ প্রভূত অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাবে!

চাং থাইইয়েনও এভাবে ‘নিজের শক্তি’-র প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন।

লিয়াং ছিছাও তাঁর পাক্ষিক পত্রিকার উদ্বোধনী সংখ্যায় ‘নতুন মানুষ প্রসঙ্গে’ প্রবন্ধে চীনের তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা, মানুষের নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা করে সারা বিশ্বে মাত্র চার-পাঁচটি বৃহৎ শক্তি কেন আধিপত্য বিস্তারলাভ করতে পেরেছে বা প্রকৃতিকে জয় করতে পারছে তা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছেন,’ আমরা যদি চীনা জাতিকে নিরাপদ, বিত্তশালী ও সম্মানযোগ্য করে তুলতে চাই, তাহলে আমাদের ভাবতে হবে কিভাবে মানুষকে নতুন মানুষে পরিণত করা যায়!’

লিয়াং ব্যাখ্যা করে বলেন, নতুন মানুষে পরিণত করার অর্থ এই নয় যে পুরোনো সবকিছু ত্যাগ করতে হবে আর অন্যদের নকল করতে হবে। তাঁর মতে, একদিকে মানুষের মধ্যে যে মৌলিক সত্ত্বা রয়েছে, তাঁকে উন্নত ও পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, অন্যদিকে, যার স্বভাবে যে জিনিসের অভাব রয়েছে, তা অন্যদের থেকে নিতে হবে, তাতে মানুষ নতুন মানুষে পরিণত হবে।… সংস্কারের প্রথম প্রয়োজন হল মানুষের চেতনাকে উন্নীত করা, তারপর প্রতিনিয়ত তাঁর পরিবর্তন করা।… যদি নতুন মানুষের উদ্ভব হয় তাহলে নতুন পদ্ধতি, নতুন সরকার এবং নতুন দেশ না থাকার জন্য কোনও দুশ্চিন্তা থাকবে না।আমাদের গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে কী করে দেশের মানুষের মধ্যে যে অভাব রয়েছে তা পূরণ করে নতুন মানুষে পরিণত করার পদ্ধতি ও উপায় খুঁজে পাওয়া যায়।

এই প্রবন্ধের ‘প্রগতি সম্পর্কে’ শীর্ষক উপ-শিরোনামে লিয়াং ছিছাও ‘আধুনিক সভ্যজাতি’, ‘শাসনতন্ত্র, পার্লামেন্ট এবং দ্বায়িত্বশীল সরকার’ ইত্যাদি বিষয় আলোচনা করেন। আমি তখন লি চিংশিকে লেখা চিঠিতে এই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে লিয়াং ছিছাও-এর মতবাদ সমর্থন করি। এই ভাবনা থেকেই ১৯১৭ সালে ছাংশা শহরে ‘নতুন মানুষ পাঠচক্র’ গড়ে তুলি।

তিব্বতি শরণার্থীদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে অলোক এভাবে নিজের মতন করে মাও শৃসানের কাল্পনিক ডাইরি লিখছে, লিখছে দলাই লামার কাল্পনিক ডাইরি। তিব্বতিদের বর্তমান সমস্যার জন্য এই দুজনকেই সবচাইতে বেশি দায়ী বলে মনে হয় অলোকের। সেজন্যেই এভাবে সাজাচ্ছে।

মাও শৃসানকে ইতিহাস মাও জে তুঙ নামে চেনে। ১৯৫৫ সালের ৮ মার্চ চতুর্দশ দলাই লামার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি নানা বিষয় উত্থাপন করে বলেন, “আমাদের দৃষ্টি আরও প্রসারিত করতে হবে; চীন এবং সারা বিশ্বের ভালো করতে হবে। ...বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠাতা শাক্যমুনির মতবাদ ‘বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়’ তখনকার ভারতের শোষিত জনগণের কন্ঠস্বরকে প্রতিনিধিত্ব করে। জনগণকে দুঃখ-ক্লেশ থেকে মুক্ত করতে তিনি রাজকুমার থাকতে চান নি, গৃহত্যাগ করে প্রতিষ্ঠা করেন বৌদ্ধধর্ম। সুতরাং, আজ, চীন ও তিব্বতের জনগণকে দুঃখ-ক্লেশ থেকে মুক্ত করতে বৌদ্ধধর্মী আর আমাদের কমিউনিস্টদের পরস্পরকে সাহায্য-সহযোগিতা করতে হবে। চুংশেং অর্থাৎ বহুজনকে দুঃখ-ক্লেশের শোষণ থেকে মুক্ত করার বিষয়ে আমরা উভয়ই একমত”

অলোকের মনে পড়ে প্রখ্যাত বৌদ্ধদর্শন পণ্ডিত ও মার্ক্সবাদ বিশেষজ্ঞ রাহুল সাংকৃত্যায়ণের বইয়েও এরকম কথা পড়েছে, মার্ক্সীয় দর্শন নাকি বৌদ্ধ দর্শনপ্রণালীর খুবই কাছাকাছি!

সে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে যে টেবিলে অলোক কাজ করে সেখান থেকে দুটি কাচ ঘেরা সংরক্ষিত কাঠের চেয়ার দেখা যায়, একটি মাও জে তুঙ যে চেয়ারে বসে গ্রন্থাগারের কাজ ও পড়াশুনো করতেন, আর দ্বিতীয়টি তাঁর গুরু লি তাচাও-এর। চেয়ারের পেছনের দেওয়ালে তাঁদের ফ্রেমে বাঁধানো ফটো রয়েছে। চেয়ার দুটির দিকে যতবার তাকায় অলোকের মনে একটা অদ্ভুত শিহরণ হয়। সে মনে মনে তাঁর অনুবাদিকা মধুছন্দাকে ধন্যবাদ জানায়। সে অলোককে তাঁর চীনা নাম ব্যবহার করতে বারণ করায়, অলোক নিজের দেওয়া নাম ব্যবহার করে। পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের এখনকার বরিষ্ঠ গ্রন্থাগারিক টিন রেনের (পরিবর্তিত)অনুমতি নিয়ে অলোক এই গ্রন্থাগারে কাজ করতে পারছে। টিন রেন মধুছন্দার স্বামী এবং খুব কমকথার দীর্ঘদেহী মানুষ। কিন্তু মধুছন্দা ঠিক তাঁর উল্টো। সে ইংরেজির ছাত্রী। ভার্জিনিয়া উলফের সাহিত্য নিয়ে পি এইচ ডি করেছে। তারপর দিল্লি গিয়ে জে এন ইউ তে থেকে সংস্কৃত ভাষা শিখেছে। বেশ কিছু সংস্কৃত ক্লাসিক সে মান্দারিন ভাষায় অনুবাদও করেছে। অলোকের বেশ কিছু লেখাও তখন অনুবাদ করেছে। সেই থেকে পরিচয়। এবার তো বেজিং বিমানবন্দরে সে নিজেই অলোককে রিসিভ করতে গেছিল। তারপর মেট্রোরেলে(বেজিং-এ বলে সাবওয়ে) চাপিয়ে সোজা পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে এসেছে। পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্টহাউসেই তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। এই সবকিছুর জন্য অলোক মধুছন্দার প্রতি কৃতজ্ঞ। টিন রেনই তাকে যে বইগুলি দিয়েছে, তার মধ্যে মাও জীবনীকার ওয়াং এর লেখা বইটি অলোকের খুব কাজে লেগেছে।

১৯৫৮ সালের মে মাসে, অষ্টম কংগ্রেসের দ্বিতীয় প্লেনামে কুসংস্কার দূরীকরণ নিয়ে বলার সময় মাও জে তুঙ বলেন, শাক্যমুনি যখন বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন তখন তাঁর বয়স ছিল ১৯ বা ২০। তিনি ছিলেন তখনকার ভারতের শোষিত জাতির ব্যক্তি।

সে বছর আগস্ট মাসে পেইতাইহোতে এক বক্তৃতায় তিনি আবার উল্লেখ করেন, বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠাতা শাক্যমুনি জন্ম নিয়েছেন শোষিত জাতিতে!

অথচ, ১৯৫৯ সালের মার্চে দলাই লামাকে তিব্বত ছেড়ে ভারতে পালাতে হয়েছিল। মাও প্রশাসন তখন তাঁকে ‘বিপ্লব-বিরোধী’ এবং ‘পরাশ্রিত পোকা’ আখ্যা দিয়েছিল। আবার সে বছর ২২ অক্টোবর, পাঞ্চেন লামাকে মাও জে তুঙ বলেন, আগে শাক্যমুনি ছিলেন এক রাজকুমার; কিন্তু রাজকুমার হয়ে থাকতে চাইলেন না। সংসার ত্যাগ করলেন, জনগণের সঙ্গে মিশলেন, হয়ে উঠলেন জননেতা!

তাহলে কি মাওয়ের কথায় আর কাজে ফারাক ছিল? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে অলোক দেখে ওয়াং লিখেছেন, যুক্তফ্রন্টের প্রয়োজনে মাও কঠোর ছিলেন, কিন্তু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, প্রাচীনকালে বৌদ্ধধর্মে সাম্যের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল।‘জনগণের সেবা করো’ আর ‘সাম্যের দৃষ্টিভঙ্গি’ হল জীবনদর্শনের মূল ব্রত। মুখে এবং কাজে তিনি সবসময় এর পরিচয় দিয়েছেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, জগতে সব মানুষই কিছু না কিছু কর্তব্য পালনে দায়বদ্ধ। এমন অনেকে আছেন যাঁরা এই কর্তব্যপালনে বিব্রত বোধ করেন। তাঁরা ভাবেন, অপরের ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাবার দরকার নেই, করলে হয়তো নিজেরই ক্ষতি হতে পারে। এ বিষয়ে তাঁর মত হল, নিজের কথা ভেবেই অপরের সুবিধা দেখা উচিত। তাতে উভয়েরই লাভ হবে।…তাই সব কর্তব্যই আসলে আমরা নিজের জন্যই করি। অপরকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারলে, মন তৃপ্ত হয়, নিজেকে শক্তিশালী ভেবে শ্লাঘা হয়।

আরেক মাও জীবনীকার জিয়াও শিমেই লিখেছেন, মাও জে তুঙ এর মতে যে কোনও পরোপকার আসলে পারস্পরিক সাহায্যমাত্র। পরোপকার আত্মবিকাশের একটি উৎকৃষ্ট পন্থা। মানুষের সমাজে ব্যক্তির অবস্থান সীমায়িত। সীমায়িত জীবনে অর্থবোধকভাবে বেঁচে থাকতে হলে পরোপকার বোধই হয় প্রারম্ভবিন্দু। না হলে নিজেরই বোধগম্য হবে না আজকের রাত বা কোন বছর, কিংবা আমি কোথায়, আমি কে, আর কেনই বা এভাবে বেঁচে আছি! সেজন্যে জীবনের দুটি আলম্ব হল’আত্মচেতনা’ আর ‘বর্তমানকে জানা, বোঝা ও মূল্য দেওয়া’।

এসব পড়ে অলোকের মনে একটা প্রশ্ন জাগে, মাওয়ের মতে ‘আমি’-ই সমস্ত বোধের মূলে, তাহলে তিনি কি শেষ পর্যন্ত ‘আমি’র বাইরের ‘ঈশ্বর’কে মানতেন? খুঁজতে খুঁজতে জিয়াও শিমেই এর বইয়ে অলোক তার জবাব পায়। মাও নাকি কোথাও লিখেছেন, ঈশ্বরকে মেনে নেওয়া আর নিজেকে মেনে নেওয়া এক, কারণ তথাকথিত ঈশ্বর নিজেরই মধ্যে। যার অস্তিত্ব বাস্তব আর অনস্বীকার্য, তা হল ‘আমি’। বৌদ্ধদর্শন অনুযায়ী সকল ব্যক্তির মধ্যেই আছে বোধিচিত্ত আর যে কোনও ব্যক্তির বুদ্ধত্বপ্রাপ্তি সম্ভব।

অন্য জায়গায় মাও লিখেছেন, অপরের প্রতি সমবেদনা বা অন্যকে সুখী করার চেষ্টা আদৌ অপরের জন্য নয়, আসলে নিজের জন্য। আমাদের অপরকে ভালবাসার মন আছে, তা পূর্ণ করতে চাই, পূর্ণ করতে না পারলে পরিপূর্ণ জীবনযাপন অসমাপ্ত থাকবে।

‘বর্তমানকে জানা, বোঝা ও মূল্য দেওয়া’ নিয়ে মাও জে তুঙ বলেন, আমি শুধু আমার মানসিক ও বৈষয়িক বাস্তবতার প্রতি দায়বদ্ধ। অতীত জানি না, ভবিষ্যৎ জানি না, যা আমার নিজের বাস্তবতার মধ্যে সম্পৃক্ত নয়। অনেকে মনে করেন, মানুষ অপরের জন্যে কাজ করে যাতে তাঁর অবদান মৃত্যুর পর ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়। মৃত্যুর পর আমি ইতিহাসে পরিণত হব; পরবর্তী প্রজন্ম বিচার করবে আমার সত্যিকার সাফল্য, নিজেরাই যোগ করবে আমার যশোগাথা!

আরেক জায়গায় অলোক পড়ে, মানুষ অতীতকে পিছনে ফেলে বাস করে বর্তমানে, আর বর্তমান বাস্তব জীবনের অধিকারী আমি নিজে। …সময়তত্ত্বে দৃষ্টি শুধু অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে সীমাবদ্ধ, দৃষ্টি দেওয়া হয় না বর্তমানকে। কারণ, বর্তমান এই আসে এই যায়; যেন মুহূর্তের ঝলক। কিন্তু আরেক দিকে, সময়ের গণ্ডীতে, স্বভাবত সর্বত্রই বর্তমান; বর্তমানই শুধু বাস্তব নয়, আমার কাছে অতীত নেবং ভবিষ্যৎও বাস্তব !


চলবে ...