বুধবার, জুলাই ৮, ২০২০

​মহাসত্যের বিপরীতে # তৃতীয় খণ্ড # নবম পর্ব

পাকা ফলে তুহিনের আস্তরণ/ শীতের বার্তাবহ/ যা ফুল ও মৌমাছিদের পরস্পর থেকে দূরে সরায়’! - ৎসাংইয়াং গ্যাৎসো( ৬ষ্ঠ দলাই লামা)

দলাই লামার ডাইরি-৩

চা খাওয়ার প্রসঙ্গে মনে পড়ে, একটি চীনা প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আগে নাকি তিব্বত চীন থেকে প্রতিবছর এককোটি টন চা আমদানি করতো। আমার মতে এই পরিসংখ্যান বানানো। চীনের সব প্রতিবেদক তখন তাই লিখতেন, যা মাও জে তুঙের পছন্দ । আর মাও জে তুঙ কত প্রখর বুদ্ধি রাখতেন তা বিশ্ববাসী জানে। কনফুসিয়াসের পর আর কেউ এমনভাবে চীনের জনগণের মন জয় করতে পারেন নি! অথচ তিনি সবসময় বিশ্বের সামনে প্রমাণ করতে চেয়েছেন, তিব্বত কতটা অর্থনৈতিকভাবে চীনের উপর নির্ভরশীল! আমার মতে, তিব্বতের জন্য চীনের তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অছিলায় সেনা আগ্রাসন হল পাকা ফলে তুহিনের আস্তরণ, যা তিব্বতে জবরদখলের শীতকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে, মাতৃভূমি থেকে লক্ষ লক্ষ তিব্বতীকে দূরে সরিয়েছে , ভিনদেশে শরণার্থী করেছে। কিন্তু এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে তিব্বতবাসীদের চা-প্রেম অবশ্যই প্রমাণিত হয়।

আমি ব্যক্তিগতভাবে, দেশবাসীর এতটা চা-প্রেম পছন্দ করি না। কোনও নেশাই পছন্দ করি না! তবে এটা ঠিক যে সীমিত চা পান ক্ষতিকারক নয়, বরঞ্চ এর কিছু কিছু ভাল দিকও আছে।

তিব্বতি সমাজে নুন মিশিয়ে চা খাওয়া হয়, আর চায়ে দুধের বদলে মাখন মিশিয়ে পান করা হয়। সঠিকভাবে তৈরি করা হলে এটি অত্যন্ত সুস্বাদু এবং স্বাস্থ্যকর পানীয় হয়ে ওঠে, তবে কতটা স্বাস্থ্যকর তা মাখনের উৎকর্ষের উপর নির্ভর করে।

পোটালা প্রাসাদের রন্ধনশালায় নিয়মিত তাজা এবং ঘন মাখন পৌঁছে দেওয়া হতো। এবং এত সুন্দর চা তৈরি হতো যে আজও সেই চায়ের স্বাদ আমার মুখে লেগে আছে। এখন যা খাই সেটা হ'ল ইংরেজি ধরণের চা, যা সকালে এবং সন্ধ্যায় পান করা হয়। বিকেলে আমি ঈষদুষ্ণ সাধারণ জলপান করি, এটাই অভ্যাস। পরবর্তী বছরগুলিতে, যখন আমি চীনে থাকতাম, তখনই আমার এই অভ্যাস তৈরি হয়েছে। শুনতে হয়তো অদ্ভুত মনে হতে পারে, তবে স্বাস্থ্যের দিক থেকে ঈষদুষ্ণ সাধারণ জলপান খুব ভাল। তিব্বতী পারম্পরিক চিকিৎসাশাস্ত্রে গরম জলকে শ্রেষ্ঠ প্রাথমিক ঔষধ বলা হয়েছে।

চা পান করার পর,দু’জন সেনস্যাপ সন্ন্যাসী আসতেন। আর আমি একঘন্টার বেশি সময় ধরে তাঁরা আমাকে অনেক বিমূর্ত বিষয় বোঝাতেন। যেমন, মনের প্রকৃতি কী? এর পরে, প্রায় সাড়ে পাঁচটা নাগাদ এই কর্মসূচি শেষ হতো। আমি সমস্ত সময়ই আন্দাজে বলছি, কারণ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতন তিব্বতের মানুষ ঘড়ির উপরে খুব একটা নির্ভর করে না, এবং সুযোগ পেলে সুবিধা অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যায়। তাড়াহুড়ো তিব্বতবাসীর স্বভাবে নেই।

যখন পোটালায় ছিলাম, শিক্ষকের কাছ থেকে ছুটি পেতেই আমার দূরবীনটি নিয়ে ছাদে পৌঁছে যেতাম। সেখান থেকে দূরবীন দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে নিকটবর্তী চাকপোরী মেডিকেল স্কুল থেকে শুরু করে দূরবর্তী জোখাং মন্দিরের চারপাশে অবস্থিত লাহসার একেকটি অঞ্চলকে ভালভাবে দেখতাম। তবে আমার সবচাইতে ভাল লাগতো শহরের দূরপ্রান্তে লাল পাহাড়ের কোলে শোলা নামক একটি গ্রামের দৃশ্য দেখতে। সেখানে দেশের প্রধান কারাগার ছিল, এবং এই সময়ে বন্দীদের কারাগার প্রাঙ্গণে হাঁটাচলা করার জন্যে ছাড়া হতো। না জানি কেন আমার মনে হতো ওই কয়েদীরা আমার বন্ধু, তাঁদের অসহায় অবস্থা, তাঁদের চলাফেরা আমি নিয়মিত দেখতাম। তাঁরাও বোধহয় এটা জানতেন এবং যখনই কেউ আমার দিকে তাকাতেন, অন্যদেরকেও দেখাতেন, তখন তাঁরা সবাই মাটিতে সাষ্টাঙ্গে শুয়ে পড়ে আমাকে প্রণাম করতেন। ক্রমে আমি তাঁদের সকলকে চিনতে শুরু করি,এবং যখন কেউ মুক্তি পেতেন বা নতুন বন্দী আসতেন, আমি দূরবীনে তাকিয়েই তা জেনে যেতাম। কারাগারের প্রাঙ্গণে রাখা শুকনো জ্বালানি কাঠের গুড়ো এবং পশুখাদ্যের জন্য রাখা ঘাসের বোঝাগুলিও আমি গুণে ফেলতাম।

এই তদন্তের পরেও, আমার হাতে খেলার সময় বাকি থাকতো।তখন আমি রং তুলি নিয়ে ছবি আঁকতাম। সন্ধ্যা সাতটায় রাতের খাবার খেতাম। রাতের খাবারে থাকতো মাখন চা, নানারকম শাকসব্জির ঝোল, আর মায়ের পাঠানো বিভিন্ন ধরণের তাজা ডাবল রোটি আর কখনও সখনও গোপনে পাঠানো ছোটো ছোটো মাংসের টুকরো। এর মধ্যে আমদোর মতন করে তৈরি বাইরে মুচমুচে আর ভেতরে খুব নরম ডবল-রুটি আমার বেশি পছন্দ ছিল।

অনেকসময় আমি আমার সেবকদের সঙ্গে বসে রাতের খাবার খেতাম। তাঁরা প্রত্যেকেই খুব খেতে পারতেন। তাঁদের বাটিগুলি ছিল আকারে বড়ো, যাতে একটি গোটা কেটলির চা ঢেলে রাখা যেত। কয়েকবার নামগিয়াল মঠ থেকে আগত অনেক সন্ন্যাসীও আমার সঙ্গে বসে রাতের খাবার খেতেন। কিন্তু, অধিকাংশ দিনে আমার তিন সহায়কই খাওয়ার সময় আমাকে সঙ্গ দিতেন, এবং কখনও কখনও কর্মচারীদের প্রধান চিকিয়াব কেনপোও আমাদের সঙ্গ দিতেন।

কিন্তু এই চিকিয়াব কেনপো না থাকলেই আমার সহায়ক তিন ভিক্ষু মহানন্দে বেশ হৈ-হুল্লোড় করে খাওয়া উপভোগ করতেন। আমার বিশেষ করে সেই সন্ধ্যাগুলির কথা মনে পড়ে যখন আমরা ঝলমলে মাখনের প্রদীপের আলোতে গরম গরম স্যুপ পান করতাম আর বাইরে কনকনে ভারী বাতাসে তুষারপাতের শব্দ শুনতে পেতাম।

খাওয়ার পরে আমি সাত ধাপ সিঁড়ি নেমে সামনের উঠোনে ঘুরতে ঘুরতে সশব্দে ধর্মসূত্র পাঠ করতাম। তবে যখন ছোট ছিলাম,ধর্মসূত্রে মনোযোগ দিতে পারতাম না, এর বদলে হয় নিজেই কোনও গল্পের কথা ভাবতে শুরু করতাম, বা ঘুমানোর আগে আমাকে কোন গল্প বলা হবে তা নিয়ে ভাবতাম। গল্পগুলি বেশিরভাগই ছিল ভূতে-প্রেত নিয়ে। অতঃপর ভীতসন্ত্রস্থ দলাই লামা তাঁর পোকামাকড় ভরা অন্ধকার ঘরে ঢুকে পড়তো!এই গল্পগুলির মধ্যে দৈত্য-পেঁচাদের গল্পটি সবচাইতে ভয়ঙ্কর ছিল যারা অন্ধকার হওয়ার পরে ছোট বাচ্চাদের নিয়ে যেত। এই গল্পটির সূত্র ছিল জোখাং মন্দিরের একটি প্রাচীন ভিত্তিচিত্র। এই আতংকে দুরুদুরু বুকে আমি রাত হতেই নিজের শয়নকক্ষে পৌঁছুতাম।

পোটালা এবং নরবুলিংকা – দুই প্রাসাদেই আমার রুটিন এরকম ছিল। কিছুটা ছন্দপতন হতো যখন কোনও বড় উত্সবে, বা কোথাও তথাকথিত বিশ্রাম নিতে যেতাম। যখন বাইরে যেতাম, আমার সঙ্গে নামগিয়াল মঠের দু-একজন শিক্ষক কিম্বা বড় লামা থাকতেন। সাধারণত প্রতিবছর একটি ধর্মযাত্রা হতো, বিশেষ করে শীতের দিনগুলিতে। তিন সপ্তাহের জন্য বাইরে থাকতাম। এই দিনগুলিতে কয়েকটি সাধারণ ক্লাস হতো, কিন্তু বাইরে খেলার অনুমতি ছিল না। বেশিরভাগ সময় লামাদের নির্দেশে প্রার্থনা ও ধ্যান অভ্যাস করে কেটে যেত। ছোটবেলায় এসব কিছু আমার ভাল লাগত না। তখন ঘরের প্রথম বা দ্বিতীয় জানালা দিয়ে বাইরে দেখে সময় কাটাতাম। উত্তর দিকের জানালা দিয়ে পাহাড়ের কোলে সেরা মঠ দেখা যেত। দক্ষিণমুখী জানালাটি খুলতো একটি বিশাল সভাঘরে, যেখানে প্রতিদিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বৈঠক হতো।

সেই বড়ো প্রেক্ষাগৃহের দেওয়ালগুলিতে বিখ্যাত তিব্বতি ধর্মীয় নেতা মিলেরেপা-র জীবনের বিভিন্ন ঘটনা অঙ্কিত প্রাচীন থানকা তৈলচিত্র ঝুলতো। আমি অবাক হয়ে সেই চিত্রগুলির দিকে তাকিয়ে মিলারেপা সম্পর্কে ভাবতাম। এখন তৈলচিত্রগুলির অবস্থা কী, আমি জানি না।

সেই সময় আমার সন্ধ্যাগুলি আরও বাজে কাটতো, কারণ তখন আমার বয়সী ছেলেমেয়েরা তাদের গরুগুলিকে হেঁকে পোটালা প্রাসাদের পাদদেশে শোল গ্রামের দিকে নিয়ে যেত। মনে পড়ে, সেই অস্তগামী সূর্যের আলোয় গুনগুন করে প্রার্থনা সঙ্গীত গাইতে গাইতে একসময় চুপ হয়ে যেতাম, চুপচাপ বসে রাখাল বালকদের উদাত্ত কন্ঠে গাওয়া মেঠো গান শুনতাম। শুনতে শুনতে বুকের ভেতরটা কেমন যেন করতো। এরকম সময়ে অনেকবার ভেবেছি, আমি যদি তাদের মতন হতাম, আর তারা আমার মতন!

আমি কিছুটা বড়ো হলে এই ধর্মযাত্রার গুরুত্ব অনুভব করতে শুরু করি। আর এখন ভাবি, ইস, ওই ধর্মযাত্রার দিনগুলি যদি আরও দীর্ঘ হতো!

আমি লেখাপড়ায় বেশ ভালই ছিলাম, তাই শিক্ষকদের সঙ্গে বেশ ভাব ছিল। কিছুদিন পর যখন আমাকে তিব্বতের মহান পণ্ডিতদের সাথে রাখা হয়, তখন তাঁরা আমার পেছনে বলতেন, আমার মস্তিষ্ক নাকি খুব তীক্ষ্ণ! কখনও আড়ালে আবডালে থেকে তা এসব প্রশস্তি শুনে বেশ সন্তুষ্ট হতাম। আর যে কোনও শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনোরকম পরিশ্রম করতে পিছপা হতাম না। কিন্তু ক্রমে আমি আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে শুরু করি। তাই একদিন এমন সময়ও আসে যখন আমার শিক্ষকরা আর আমার অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন না, এবং মুখের উপরই বলে দেন। আর সেজন্যেই হয়তো কেনরাপ তেনজিং একটি মিছিমিছি পরীক্ষার পরিকল্পনা করেন যাতে আমাকে আমার প্রিয় সাফাইকর্মী নোরবু থোণ্ডুপের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। আমাকে না জানিয়ে কেনরাপ তেনজিং তাকে নির্দিষ্ট বিষয়ে এমনভাবে শিখিয়েপড়িয়ে প্রস্তুত করেন যাতে আমি প্রতিযোগিতাটি হেরে যাই। আর নির্দিষ্ট দিনে নোরবু থোণ্ডুপ তা করে দেখায়। বিষয়টি ছিল তিব্বতে মঙ্গোল শাসনের সূচনা নিয়ে। কেনরাপ তেনজিং আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি গল্পের মতন করে কিছু কথা বলি।

কিন্তু নোরবু আমাকে ও উপস্থিত সবাইকে অবাক করে দিয়ে ইতিহাসের সময় উল্লেখ করে গড়গড় করে বলতে শুরু করে ঃ……১২৪০ খ্রিষ্টাব্দে তিব্বতে প্রথম মঙ্গোল আক্রমণ হয়। তারপর ১২৫১ সালে দ্বিতীয়বার তিব্বত আক্রমণ করে তারা সমগ্র তিব্বতকে মোঙ্গল শাসনাধীন করে ফেলে। মোঙ্গল রাজকুমার কুবলাই খান সমগ্র অঞ্চলটিকে নিজের ইউয়ান রাজবংশের অধীনে নিয়ে নিলে সা-স্ক্যা ধর্মসম্প্রদায়ের সপ্তম সা-স্ক্যা-খ্রি-'দ্জিন ও কুবলাই খানের আধ্যাত্মিক শিক্ষক 'গ্রো-ম্গোন-ছোস-র্গ্যাল-'ফাগ্স-পা তিব্বতের শাসক হিসেবে কুবলাই খানের নাম ঘোষণা করেন।

মঙ্গোল সাম্রাজ্যের আধ্যাত্মিক প্রধান এবং তিব্বতের কার্যনির্বাহী প্রশাসক হিসেবে সা-স্ক্যা লামাদের অধীনে থেকে তিব্বত এই সময় নাকি যথেষ্ট ধর্মীয় ও রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করতো। যদিও তিব্বতের প্রশাসনিক ও সামরিক শাসন শুধুমাত্র তিব্বতের জন্যই দায়িত্বপ্রাপ্ত জুয়ানঝেং ইউয়ান নামক এক উচ্চ পর্যায়ের ক্ষমতাসম্পন্ন মঙ্গোল মন্ত্রির অধীনে ছিল। তাছাড়া বুদ্ধিমান কুবলাই খান সা-স্ক্যা লামাদের ক্ষমতাকে রাশ টানতে সা-স্ক্যা বৌদ্ধবিহারে একজন বিশ্বস্ত প্রশাসনিক আধিকারিক নিযুক্ত করেন।

এর ফলে তিব্বতে এক দ্বৈত শাসন শুরু হয়, উভয়পক্ষই পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও মূল ক্ষমতা ছিল প্রধানত মঙ্গোলদের হাতেই। সম্রাটের সিদ্ধান্তই ছিল অন্তিম ও সর্বোচ্চ।

আবার মঙ্গোল সম্রাটদের ওপর প্রভাবের ফলে সা-স্ক্যা লামারা মঙ্গোলদের রাজসভায় যথেষ্ট প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। গ্রো-ম্গোন-ছোস-র্গ্যাল-'ফাগ্স-পা ইউয়ান সাম্রাজ্যে বসবাসকারী সমস্ত বৌদ্ধ ভিক্ষুর প্রধান হিসেবে বিবেচিত হতেন।

নোরবু একইভাবে প্রত্যয়ের সঙ্গে বলতে থাকেঃ

...১২৬০ সালে কুবলাই খান মোঙ্গল সম্রাট হলে তিনি 'গ্রো-ম্গোন-ছোস-র্গ্যাল-'ফাগ্স-পা-কেগুওশি বা জাতীয় ধর্মশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করেন। তিব্বতের ইতিহাসে 'গ্রো-ম্গোন-ছোস-র্গ্যাল-'ফাগ্স-পা ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি তিব্বতি ও মঙ্গোল বৌদ্ধ সমাজে রাষ্ট্র ও ধর্মের পারস্পরিক সম্পর্কের এক রাজনৈতিক সূচনা করেন। কুবলাই খানের সমর্থনে তিনি নিজেকে ও তাঁর সা-স্ক্যা সম্প্রদায়কে তিব্বত ও মঙ্গোল সাম্রাজ্যে সবচাইতে ক্ষমতাশালী ধর্মীয় সম্প্রদায়ে পরিণত করেন।

১২৬৫ সালে তিনি তিব্বতে ফিরে এসে শাক্য-ব্জাং-পো নামক সা-স্ক্যা ধর্মসম্প্রদায়ের এক অনুগতকে প্রশাসনিক কাজে নিযুক্ত করে তিব্বতে সা-স্ক্যা ধর্মসম্প্রদায়ের শাসন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করেন। 'গ্রো-ম্গোন-ছোস-র্গ্যাল-'ফাগ্স-পা একজন সম্রাট ও ধর্মীয় নেতার মধ্যে কত ভাল সম্পর্ক হতে পারে তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে মঙ্গোলদের কর্তৃত্বকে সুদৃঢ় করতে সহায়তা করেন। তাঁর পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের সঙ্গে মঙ্গোল রাজকুমারীদের বিবাহের মাধ্যমে সম্রাট ও 'গ্রো-ম্গোন-ছোস-র্গ্যাল-'ফাগ্স-পার মধ্যে সম্পর্ক আরো মজবুত হয়।

আমি অবাক হয়ে নোরবুকে দেখতে থাকি, এতকিছু সে শিখলো কেমন করে? নোরবু কিন্তু আমার দিকে একবারও না তাকিয়ে বলতে থাকে,

১২৭০ সালে তাঁকে সমগ্র সাম্রাজ্যের ধর্মশিক্ষক বা দিশি হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। কুবলাই খানের নির্দেশে সা-স্ক্যা ধর্মসম্প্রদায়ের প্রধানেরা গুওশি এবং দিশি নামক পদাধিকারী হয়ে চীনে বসবাস করে সাম্রাজ্যের সমস্ত বৌদ্ধদের ওপর কর্তৃত্ব করতে পারতেন। তাঁদের প্রতিনিধি হিসেবে দ্পোন-ছেন নামক একজন তিব্বতী আধিকারিক তিব্বতে প্রশাসনিক কাজকর্ম দেখাশোনা করতেন।

এই ধরণের ব্যবস্থার ফলে সা-স্ক্যা ধর্মসম্প্রদায়ের প্রধানদের সঙ্গে দ্পোন-ছেন আধিকারিকদের মাঝেমধ্যেই বিরোধ সৃষ্টি হত। কুবলাই খানের মতন দক্ষ প্রশাসকও অনেক সময় সেসব বিরোধ মেটাতে হিমসিম খেতেন। আবার তিনি ভেদনীতি কাজে লাগিয়ে সকল পক্ষকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতেন।

কুবলাই খান মঙ্গোল সাম্রাজ্যের বহু ভাষা সমৃদ্ধ লিখন পদ্ধতিগুলিকে একত্র করে একটিমাত্র লিপি উদ্ভাবনের জন্য 'গ্রো-ম্গোন-ছোস-র্গ্যাল-'ফাগ্স-পাকে নির্দেশ দেন।

১২৬৮ সালে 'গ্রো-ম্গোন-ছোস-র্গ্যাল-'ফাগ্স-পা তিব্বতী লিপি থেকে 'ফাগ্স-পা লিপি নামে এক নতুন ধরণের লিপির উদ্ভব করেন। কুবলাই এই লিপিকে সাম্রাজ্যের সরকারি লিপি বলে ঘোষণা করেন। এমনকি তিনি সাম্রাজ্যে বহুল প্রচলিত চীনা ও উইঘুর লিপির পরিবর্তে এই নতুন লিপি প্রচলনের ঘোষণা করেন। কিন্তু এই 'ফাগ্স-পা লিপি সাম্রাজ্যে খুব একটা প্রচলিত হয়নি।১৩৬৮ সালে ইউয়ান রাজবংশের পতনের ফলে এই লিপির ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়। তিব্বতে সা-স্ক্যা ধর্মসম্প্রদায়ের শাসন ব্কা'-ব্র্গ্যুদ ধর্মসম্প্রদায়ের 'ব্রি-কুং-ব্কা'-ব্র্গ্যুদ ধর্মীয় গোষ্ঠীর ভিক্ষুরা মেনে নিতে পারেনি…।

সময় উল্লেখ করে নোরবুর এই বর্ণনা এবং হাত নেড়ে নেড়ে অসাধারণ উপস্থাপনা আমাকে হারিয়ে দেয়। তাসের প্রাসাদের মতন আমার অহং মাখানো পোটালা প্রাসাদও দখিনা বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে বিধ্বস্তপ্রায়, বিবর্ণ মনে হতে শুরু করে। এতে আমি খুবই মুষড়ে পড়ি, আমার চোখ জলে ভরে ওঠে। সেদিন সে যে আমাকে এভাবে প্রকাশ্যে হারিয়ে দেবে তা কখনও স্বপ্নেও কল্পনা করিনি।

আমার শিক্ষার ক্ষেত্রে কেনরাপ তেনজিং –এর এই কৌশলটি খুব কার্যকর প্রমাণিত হয়। আমি রাগে কঠোর পরিশ্রম করতে শুরু করি। বিশেষ করে ইতিহাস খুব ভালো করে পড়ি। এতে আমার সারাজীবনের জন্য অনেক উপকার হয়েছে। কিন্তু কিছু সময় পরে আমার উত্সাহ আবার শীতল হয়ে যায় এবং আমি পুরানো অভ্যাসে ফিরে যাই। কেনরাপ তেনজিং কেন যে আবার আমাকে এরকম কোনও পরীক্ষার সামনে ফেলেননি তা জানি না! হয়তো প্রকাশ্যে দলাই লামার অপমান প্রশাসনের কাছে ঠিক মনে হয়নি!

এভাবেই কিশোর বয়স কাটিয়ে যৌবনের দোরগোড়ায় পৌঁছে আমি শিক্ষার প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধি করি আর আমি পড়াশোনায় গভীর আগ্রহী হওয়া শুরু করি। আজ আমি সেই অলস দিনগুলির জন্য আফশোস করি, এবং আজও প্রতিদিন কমপক্ষে চারঘন্টা বই পড়ি। এখন আমি মনে করি যে আমার শিক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম ত্রুটি হল আমার কোনও প্রতিযোগী ছিল না। আমি আমার স্কুলে একা ছিলাম, তাই নিজেকে কারও সাথে তুলনা করতে পারিনি।

যখন আমার বয়স নয় বছর, আমার ত্রয়োদশ দলাই লামার ব্যবহৃত জিনিসের ঘরে দুটি পুরানো হ্যান্ডহেল্ড ফিল্ম প্রজেক্টর এবং কিছু ফিল্মের রিল পাই। কিন্তু এমন কোনও ব্যক্তি ছিল না যিনি সেগুলি চালানোর উপায় জানেন। শেষ অবধি, অবশেষে একজন প্রৌঢ় চাইনিজ সন্ন্যাসীর খোঁজ পাই, যাকে শৈশবেই তাঁর বাবা-মা ত্রয়োদশ দলাই লামাকে উৎসর্গ করেছিলেন। ১৯০৮ সালে তিনি যখন চীন সফরে গিয়েছিলেন, তখন ফেরার সময় ওঁকে নিয়ে এসেছিলেন। সেই থেকে তিনি নরবালিংকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তিনি খুব ভাল টেকনিশিয়ান ছিলেন। তিনি অত্যন্ত ধার্মিক এবং নিষ্ঠাবান মানুষ ছিলেন, যদিও অধিকাংশ চীনাদের মতন তিনি ছিলেন রাগী প্রকৃতির।

তাঁর সাহায্যেই আমি ত্রয়োদশ দলাই লামাকে উপহার দেওয়া হ্যান্ডহেল্ড ফিল্ম প্রজেক্টর দিয়ে ওই রিলগুলি চালিয়ে দেখতে পাই। কিছু ফিল্মের রিল ছিল অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। তার মধ্যে একটি ছিল সম্রাট পঞ্চম জর্জের সিংহাসনে অভিষেকের সাদা কালো চলচ্চিত্র। এটি আমার খুব ভাল লাগে। কারণ এতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত সৈন্যদের সারি একের পর এক ফর্মেশনে সিরেমোনিয়াল প্যারেড করছিল। আরেকটি রিলে, ট্রিক ফটোগ্রাফির মাধ্যমে নর্তকীদের ডিমের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। তবে আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফিল্মটি ছিল যাতে সোনার খনির ভেতর থেকে সোনা খোদাই করে উত্তোলনের ধারাবিবরণী দেখায়। এটি দেখে বুঝতে পারি যে খনির কাজ কতটা বিপজ্জনক, এবং সেখানকার শ্রমিকরা কেমন সব সমস্যার মুখোমুখি হন। এর পর থেকে যখনই আমি মজুরদের শোষণ সম্পর্কে শুনতে পেতাম - যা পরবর্তী বছরগুলিতে প্রায়ই শুনতাম - আমার এই সিনেমাটির কথা মনে পড়তো। আমি কোনোদিনই অত্যাচারী শোষকদের মেনে নিতে পারতাম না। আর চীনে যখন মাও জে তুং এর নেতৃত্বে বিপ্লব হয়, আমি মনে মনে তাকে সমর্থন করি।

তবে দুর্ভাগ্যজনক বিষয়টি হ'ল ওই চীনা সন্ন্যাসী ক্রমে আমার ভাল বন্ধু হয়ে উঠলেও খুব শীঘ্রই তিনি মারা যান। তবে তার আগে আমি নিজেই তাঁর কাছে মেশিনগুলি চালানো শিখে নিয়েছিলাম। তাঁর কাছ থেকে আমি বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং ডায়নামোর বেশ কিছু কাজ শিখেছি। এই জ্ঞান আমার খুব কাজে লাগে যখন ব্রিটিশ রাজ পরিবার আমাকে একটি আধুনিক প্রজেক্টর এবং এর উপযোগী জেনারেটর উপহার হিসাবে দিয়েছিল। ব্রিটিশ ট্রেড মিশন এগুলি আমার কাছে পাঠিয়েছিল। তাঁদের সহকারী বাণিজ্য কমিশনার রাল্ফ ফক্স নিজেই আমাকে এগুলি চালানো শেখাতে এসেছিলেন।

তিব্বত তার উচ্চতার কারণে বিশ্বের অনেক রোগ থেকে মুক্ত। তবে এখানে একটি রোগ প্রতিবছরই হয় – তা হল গুটি বসন্ত। আমার বয়স যখন দশ বছর, তখন একজন কিছুটা স্থূলকায় নতুন ডাক্তার আমার কাছে এসে আমদানিকৃত ওষুধ ব্যবহার করে আমাকে গুটি বসন্তের প্রতিষেধক টীকা দেন। এই টীকা নেওয়ার পর আমার খুব গায়ে ব্যথা হয়েছিল। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে আমার জ্বর হয়, আরোগ্য লাভের পরে, আমার বাহুতে মোটামুটি চারটি বড় চিহ্ন চিরকালের সঙ্গী হয়ে যায়। আমার মনে আছে, আমি দীর্ঘকাল ধরে মনে মনে ওই মোটা ডাক্তারকে গালি দিতাম।

সেই সময় আমার একজন ব্যক্তিগত ডাক্তার ছিল। আমরা তাকে ডাক্তার লেনিম বলে ডাকতাম। কারণ তাঁর ছাগলের মতন ছোট ছোট দাড়ি ছিল। বেঁটে খাটো, পেটুক এবং অত্যন্ত রসিক! খুব হাসাতে পারতেন। তিনি এত মজার মজার গল্প বলতেন যে আমার তাঁকে খুব পছন্দ হয়েছিল। এই উভয় চিকিৎসকই তিব্বতীয চিকিৎসা পদ্ধতিতে শিক্ষিত ছিলেন। তাঁদের কথা আমি পরের অধ্যায়ে বলবো।

সেই সময়ে, সারা পৃথিবীতে পাঁচ বছর ধরে চলতে থাকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। আমি এই বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে জানতাম না। যুদ্ধ শেষ হওয়ার ঠিক পরে, আমার সরকার অনেক উপহার সহ একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করে প্রতিনিধি দলকে ব্রিটিশ সরকারের সাথে দেখা করতে ভারতে পাঠায়। ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দেখা করেন। পরের বছর দ্বিতীয় প্রতিনিধি দলও ভারতে যায় এশীয় সম্পর্কের প্রতিনিধিত্ব করতে।

তার কিছুদিন পরই, ১৯৪৭ সালের বসন্তে এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যা থেকে অনুভব করি যে উচ্চপদে আসীন ব্যক্তিদের স্বার্থপর আচরণ কিভাবে সমগ্র দেশের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারে!

সেদিন যখন আমি একটি ধর্মতত্ত্ববিষয়ক বিতর্কসভায় মনোযোগ দিয়ে দু’পক্ষের বক্তব্য শুনছিলাম তখন হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাই। উত্তরের সেরা মঠের দিক থেকে গুলির শব্দ আসছিলো। আমি ছুটে বারান্দার দিকে যাই। একবার ভাবি, দূরবীন বের করে এনে দেখবো। আবার এটাও ভাবি যে এভাবে গুলি চললে মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এমনই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় জানতে পারি যে ছয় বছর আগে যে রেটিং রিনপোচে রিজেন্ট পদ ত্যাগ করে রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছিলেন, এখন তিনি আবার তাঁর পদ ফিরে পেতে সচেষ্ট হয়েছেন। রেটিং রিনপোচের ঘনিস্ট কয়েকজন লামা এবং কিছু সরকারী কর্মকর্তা যারা তাঁর সহযোগী ছিলেন, তাঁদেরকে সঙ্গে নিয়ে তিনি তাথাগ রিনপোচের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বিদ্রোহ করেছেন। কিন্তু, কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রশাসন রেটিং রিনপোচেকে গ্রেপ্তার করে ফেলে। কিন্তু তার আগে গুলি বিনিময়ে তাঁর ঘনিস্টদের মধ্যে অনেকেই প্রাণ হারান।

অবশেষে রেটিং রিনপোচেকে বিচারের জন্য পোটালায় নিয়ে আসা হয়, তখন তিনি প্রার্থনা করেন যে তাঁকে আমার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হোক! দুর্ভাগ্যক্রমে, এই আবেদন আমার পক্ষ থেকে প্রত্যাখ্যান করা হয়, এবং তাঁর সাজা হয় - আজীবন কারাবাস! অবশ্য বেশিদিন তাঁকে কারাগারে থাকতে হয় নি। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মারা যান। নাবালক ছিলাম বলে আমি সেই সময়ে কোনও আইনি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারিনি, কিন্তু এখন সেই ঘটনাটির কথা মনে পড়লে আফশোস হয়, আমি কি চেষ্টা করলে তখন অন্য কিছু করতে পারতাম না? আমি যদি কোনওভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারতাম তবে তিব্বতের প্রাচীনতম এবং সর্বাধিক সুন্দর বিহারগুলির অন্যতম রেটিং মঠটি ধ্বংস থেকে বাঁচানো যেত। সব মিলিয়ে পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত মূর্খতাপূর্ণ ছিল। তাঁর ভুল থাকা সত্ত্বেও রেটিং রিনপোচের প্রতি আমার মনে বিশেষ ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা রয়েছে; তিনি ছিলেন আমার প্রথম শিক্ষক এবং পরামর্শদাতা। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর নামটি আমার সম্পূর্ণ নাম থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল। তবে বহুবছর পরে, আমি একজন দিব্য বক্তার নির্দেশে এই নামটি আবার আমার নামে অন্তর্ভুক্ত করেছি।

এই ঘটনার অল্প কিছুদিন পরই আমি তাথাগ রিনপোচের সঙ্গে দ্রেপং এবং সেরা মঠ সফরে গিয়েছিলাম – যথাক্রমে লাহসার পাঁচমাইল পশ্চিমে এবং সাড়ে তিন মাইল উত্তরে রয়েছে এই গুহাদুটি। দ্রেপং ছিল সেই সময়ে বিশ্বের বৃহত্তম মঠ। তখন সেই মঠে সাতহাজার লামা বাস করতেন। সেরা মঠও খুব একটা ছোট ছিল না। সেখানে পাঁচহাজার লামা থাকতেন। এই সফরটি ছিল দ্বন্দ্বমূলক বিতর্ক ব্যবস্থার একজন পণ্ডিত হিসাবে আমার প্রথম প্রকাশ্য অংশগ্রহণ। সেখানে আমি দ্রেপংয়ের তিনটি এবং সেরার দুটি বিদ্যালয়ে সেখানকার শীর্ষস্থানীয় ভিক্ষুদের সঙ্গে তর্কে অবতীর্ণ হয়েছিলাম। নানা কারণে তখন আমি কিছুটা চাপে ছিলাম। বিগত দিনগুলিতে রাজধানীতে ঘটে যাওয়া অশান্তির ফলে সেবার আমাদের সফরে বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তাই আমি কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছিলাম। পাশাপাশি, আমি জীবনে এই প্রথম মহান বিদ্বানদের সামনে দাঁড়িয়ে বিতর্কে অংশ নিতে যাচ্ছিলাম। তবে, দুটি মঠই আমার কাছে কোনওভাবে পরিচিত ছিল। সেগুলিতে গিয়ে অনুভব করেছি যে পূর্ববর্তী জীবনে তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলাম। আমার উদ্বেগ সত্ত্বেও, সভাগুলিতে কয়েকজন সন্ন্যাসীর উপস্থিতিতে এই কর্মসূচি ভালভাবে উৎরে যায়।

এর কিছুদিনের মধ্যেই তাথাগ রিনপোচে আমাকে পঞ্চম দলাই লামার বিশেষ শিক্ষাপ্রদান করেন, যা পরবর্তী প্রত্যেক দলাই লামার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। ‘মহান পঞ্চম’ – তিনি তিব্বতে এই নামেই পরিচিত - একটি স্বপ্নে এই শিক্ষালাভ করেছিলেন। তাথাগ রিনপোচে আমাকে পঞ্চম দলাই লামার বিশেষ শিক্ষাদানের পরে, বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে আমার অনেক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয় আর আমি অনেকক’টি বিশেষ স্বপ্নও দেখেছি, সেগুলির তাৎপর্য আমি তখন বুঝিনি, পরে বুঝতে পেরেছি।

পোটালা প্রাসাদে থাকার অন্যতম সুবিধা হ'ল এতে অসংখ্য আসবাবপত্র ভরা ঘর ছিল। আমার মতো ছোট বাচ্চার কাছে সোনা, রূপোর অলংকার, মূল্যবান ধর্মীয় নিদর্শনপূর্ণ ঘরগুলি বা নীচের কক্ষে সংরক্ষণ করা আমার প্রত্যেক পূর্বসূরীর ব্যবহার করা রত্নসামগ্রীগুলির চেয়ে আমার কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় ছিল সেই ঘরগুলিতে সাজিয়ে রাখা নানারকম অস্ত্রশস্ত্র, প্রাচীন তরোয়াল, বন্দুক এবং গোলাবারুদ। কিন্তু সবচাইতে প্রিয় ছিল ত্রয়োদশ দলাই লামার ব্যবহৃত কিছু দুর্দান্ত জিনিস – যেমন একটি রাইফেল এবং একটি এয়ার রাইফেল, যার বুলেটগুলিও সযত্নে রাখা ছিল, একটি অত্যাধুনিক দূরবীন – যেটির কথা আগেই লিখেছি – আর ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কিত কয়েকটি সচিত্র ইংরেজি বই। এই বইয়ের ছবিগুলি আমাকে অবাক করে দেয়। এই ছবিগুলি দেখেই আমি জাহাজ, ট্যাঙ্ক এবং অন্যান্য যুদ্ধ সামগ্রীর মডেল তৈরি করতাম। পরে, আমি এই বইগুলির কিছু অংশ তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করিয়েছি।

সেখানে আমি দু’জোড়া ইউরোপীয় জুতোও পেয়েছি। সেগুলির তুলনায় আমার পা খুব ছোট, তবু আমি সেগুলি বের করে সামনে পেছনে কাপড় ভাঁজ করে ঢুকিয়ে তারপর পরতাম। সেই জুতোগুলির হিল ইস্পাত-ধারযুক্ত । হাঁটার সময় যে ঠক ঠক শব্দ - তা আমার খুব ভালো লাগতো।

ছোটবেলায়, আমি জিনিসগুলি আলাদা করতে এবং আবার পুরানো জিনিসের ভিড়ে মিশিয়ে দিয়ে লুকিয়ে ফেলতে পছন্দ করতাম। এই খেলায় আমি খুব দক্ষ হয়ে উঠি। তবে প্রাথমিকভাবে এটিও সহজ কাজ ছিল না। ত্রয়োদশ দলাই লামার ব্যবহৃত একটি পুরানো গ্রামোফোন যন্ত্রও পেয়েছিলাম, যেটি তাঁকে রাশিয়ার জার উপহার দিয়েছিলেন, সর্বশেষ জারের সঙ্গে ত্রয়োদশ দলাই লামার বন্ধুত্ব ছিল। আমি চালাতে গিয়ে দেখি গ্রামোফোন প্লেয়ারটি কাজ করে না, তাই আমি সেটিকে ঠিক করার সিদ্ধান্ত নিই। খুলে দেখি এর মূল স্প্রিংটি জ্যাম হয়ে আছে। ব্যস, আমি সেটাকেআমার স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে ঘোরালে হঠাৎ সেটি তীব্রগতিতে দ্রুত উল্টোদিকে চলতে শুরু করে, আর সেই বেগে হঠাৎ ঘোরায় ভয়ানক শব্দে প্লেয়ারের নানা যন্ত্রাংশ ভেঙে ছোট ছোট টুকরো টুকরো হয়ে চারিদিকে ছিটকে পড়তে থাকে। পরে যখনই সেই ঘটনা নিয়ে ভাবি, নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি যে সেদিন কোনও টুকরো ছিটকে আমার চোখ ফুটো করে দেয়নি। যখন এই কুকর্ম করছিলাম, তখন আমার মুখ যন্ত্রটার কাছে ঠিক উপরে ছিলো। যদি সত্যি এমন কোনও দুর্ঘটনা ঘটতো, তাহলে, মানুষ আমাকে হয়তো সারাজীবন মোশে দায়ান* বলে ভাবতো।(Foot note: মোশে দায়ান* একজন বিখ্যাত একচক্ষু ইস্রায়েলীয় সেনাপতি ছিলেন যার দৃষ্টিহীন চোখটিতে সবসময় ব্যান্ডেজ বাঁধা থাকতো।)সুতরাং এই কুকর্মটি আমার গান শোনার পাশাপাশি সংগীত বাজানোর চিন্তাকে শিকেয় তুলে দিল।

আমি ত্রয়োদশ দালাই লামা থুপতেন গ্যাৎসোর কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ, যিনি আমার জন্য এত অদ্ভূত সব জিনিস রেখে গেছেন। পোটালার অনেক সাফাই কর্মচারী ত্রয়োদশ দলাই লামাকে দেখেছেন, তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁরা আমাকে তাঁর সম্পর্কে অনেক অলিখিত তথ্য জানিয়েছেন।তাদের কথা শুনতে শুনতে আমার বিশ্বাস দৃঢ় হয় যে তিনি কেবল একজন সফল ধর্মীয় শিক্ষকই নন, অত্যন্ত দূরদর্শী এবং প্রজ্ঞাবান ছিলেন। আমার শিক্ষকদের কাছে আগেই জেনেছি, বিদেশি হানাদার বাহিনীর আক্রমণে তাঁকে দুবার দেশ ছাড়তে হয়েছিল - প্রথমবার, ১৯০৩ সালে কর্নেল ইয়ংহাজব্যান্ডের নেতৃত্বে ব্রিটিশদের আক্রমণ এবং দ্বিতীয়বার ১৯১০ সালে মাঞ্চুরিয়ানদের আক্রমণ। ব্রিটিশরা যুদ্ধজয়ের পর চুক্তি সম্পাদন করে নিজেরাই ফিরে গেছিল, কিন্তু মাঞ্চুরিয়ানদের ১৯১১-১২র শীতে তিব্বতি সৈন্যরা প্রাণ বাঁচিয়ে পালাতে বাধ্য করেছে। তিব্বতি সৈন্যদের এই মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন ত্রয়োদশ দলাই লামা নিজে।

ত্রয়োদশ দলাই লামার আধুনিক প্রযুক্তিতে খুব আগ্রহ ছিল। তিনি বাইরে থেকে যে জিনিসগুলি অর্ডার দিয়ে আনিয়েছিলেন সেগুলির মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ তৈরির মেশিন, মুদ্রা মিন্টিং ও কাগজের নোট ছাপার মেশিন এবং তিনটি মোটরগাড়ি। এই সমস্ত জিনিস তিব্বতে সম্পূর্ণ নতুন ছিল এবং জনগণ এসব দেখে অবাক হয়েছেন। তখন দেশে হুইল ড্রাইভ ছিল না। ঘোড়ার গাড়িও তেমন জনপ্রিয় হয়নি। মানুষ ঘোড়ার গাড়ির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু তিব্বতের পথঘাট এত এবড়োখেবড়ো ছিল যেখানে ভারবাহী প্রাণীগুলি ছাড়া অন্য চলাফেরার উপায় ছিল না।

ত্রয়োদশ দলাই লামা অন্যান্য ক্ষেত্রেও অত্যন্ত দূরদর্শী ছিলেন। দ্বিতীয়বার নির্বাসন থেকে ফিরে আসার পরে তিনি তিব্বতি যুবকদের উচ্চশিক্ষার জন্য ব্রিটেনে পাঠিয়েছিলেন। পরীক্ষাটি সফল হয়েছিল, যুবকরা ব্রিটেনে গিয়ে অনেক কিছু শিখেছে। ব্রিটেনের রাজপরিবারও তাঁদের স্বাগত জানায়, কিন্তু ত্রয়োদশ দালাই লামার মহাপ্রয়াণের পর এই পরীক্ষা বেশিদূর এগিয়ে নেওয়া হয়নি। রেটিং রিনপোচে বা তাথাগ রিনপোচে যদি চাইতেন, যুবকদের বিদেশে পাঠানোর এই কর্মসূচি যদি অব্যাহত থাকত, আমি বিশ্বাস করি, তিব্বতের পরিস্থিতি আজকের চেয়ে অন্যরকম হত। একইভাবে, ত্রয়োদশ দলাই লামা সেনাবাহিনীরও সংস্কার করেন, যা তিনি দেশের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করতেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরে এই প্রক্রিয়া থেমে যায়।

তাঁর আর একটি পরিকল্পনা ছিল খাম প্রদেশে লাহসার সরকারকে শক্তিশালী করা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে লাহসা থেকে খামের দূরত্ব বেশি হওয়ায় ওই প্রদেশের মানুষ কেন্দ্রীয় সরকারের উপেক্ষার শিকার। সেজন্যে তিনি খামের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ছেলেদের লাহসায় এনে শিক্ষিত করে তাঁদেরকে সরকারি কর্তৃত্ব প্রদান করে খামে ফেরত পাঠাতেন। এতে প্রশাসন এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলিতে সমতা এসেছিল। তিনি সেনাবাহিনীতে খাম প্রদেশ থেকে সৈন্য নিয়োগ করতে চেয়েছিলেন। তবে সম্ভবত অলসতার কারণে এক্ষেত্রে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি।

ত্রয়োদশ দলাই লামার রাজনৈতিক বুদ্ধিও খুব প্রখর ছিল। তিনি তাঁর সর্বশেষ লিখিত নথিতে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে দেশে যদি মৌলিক পরিবর্তন না করা হয় তাহলে- ‘ তিব্বতের ধর্ম ও রাজনীতি উভয়ক্ষেত্রেই ভিতর এবং বাইরে থেকে আক্রান্ত হতে পারে। আমরা যদি নিজেদের দেশকে রক্ষা না করি তাহলে দলাই লামা এবং পাঞ্চেন লামা, তিব্বতের ধর্মীয় পিতা এবং পুত্র, এবং তাঁদের সঙ্গে অন্যান্য ধর্মীয় প্রতীকেরা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, তাঁদের নামও আর কোথাও শোনা যাবে না। মঠগুলি এবং সেগুলিতে বসবাসকারী ভিক্ষুরা সবাই শেষ হয়ে যেতে পারে। আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়বে। সরকারি কর্মকর্তাদের জমি ও সম্পত্তি হরণ করা হবে। তাঁরা হয় তাঁদের শত্রুদের সেবা করতে বাধ্য হবেন বা সব হারিয়ে ভিখিরির মতন ঘুরে বেড়াবেন। প্রত্যেককেই সীমাহীন কষ্ট এবং সন্ত্রাসের মুখোমুখি হতে হবে, দিনরাত নানা বিভীষিকার শিকার হবেন’।

এই লেখায় তিনি যে পাঞ্চেন লামার উল্লেখ করেছেন, তাঁকে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মে দলাই লামার পরে দ্বিতীয় স্থানটি দেওয়া হয়েছে। ঐতিহ্য অনুসারে তিনি তিব্বতের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর শিগাৎসের তাশিলহুনপো মঠে থাকেন।

ত্রয়োদশ দলাই লামা অত্যন্ত সহজ সরল ব্যক্তিত্বের সর্বমান্য নেতা ছিলেন। তিনি অনেকগুলি পুরানো রীতিনীতি বিলুপ্ত করেছিলেন, উদাহরণস্বরূপ, যখনই ত্রয়োদশ দলাই লামা তাঁর কক্ষ থেকে বেরুতেন তখন প্রথামতন যে সেবকই তখন তাঁর কাছে থাকতেন তাঁকেই তাঁর সঙ্গে ছুটে যেতে হত। তাঁর মতে এটি সেবকদের অকারণ সমস্যায় ফেলতো। ফলে সেই সময় কোনও সেবকই আর কাছে থাকতে চাইতেন না! তিনি যেদিন তাঁদের এই সমস্যা অনুভব করেন, সেদিন থেকেই এই প্রথা বন্ধ করে দেন।

আমি তাঁর সম্পর্কে এমন অনেক গল্প শুনেছি যা থেকে বোঝা যায় যে তিনি কতটা মাটির সঙ্গে জুড়ে ছিলেন। একবার নামগিয়াল মঠে এক বৃদ্ধের সঙ্গে পরিচয় হয়, তাঁর ছেলে সেখানে ভিক্ষু ছিলেন। কথায় কথায় তিনি আমাকে একটি গল্প শোনান, এটি সেই সময়ের কথা যখন নরবুলিংকায় একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছিলো। এমন প্রথা ছিলো, তখন অনেকেই রাজধানীতে আসার সময় সঙ্গে করে একটি পাথর বয়ে আনতেন। তাঁরা সেই পাথর নির্মীয়মান ভবনের ভিত্তিতে রেখে শ্রদ্ধা জানাতেন। একদিন সেই ব্যক্তিও অনেক দূর থেকে পাথর নিয়ে সেখানে যান। তার খচ্চরটি ছিল খুবই চঞ্চল, তিনি পাথরটি ফেলার জন্যে হাত বাড়ালে লাগাম হাত থেকে ঢিলে হতেই খচ্চরটি দড়ি সহ পালাতে শুরু করে। তখন সামনে থেকে একজনকে আসতে দেখে লোকটি চেঁচিয়ে খচ্চরটিকে ধরতে বলেন। পথচারী লোকটি তক্ষুণি ছুটে গিয়ে চঞ্চল খচ্চরটিকে ধরেন, তারপরে তাকে মালিকের হাতে এনে দেন। লোকটি খুশি হয়ে কৃতজ্ঞতাবশে হাতজোড় করতেই অবাক হয়ে দেখেন স্বয়ং দলাই লামা। তিনিই ছুটে গিয়ে খচ্চর ধরে এনেছেন। এরকম আরও গল্প আমি শুনেছি।

পোটালা ও নরবুলিংকার কর্মচারীদের চোখে ত্রয়োদশ দলাই লামা ছিলেন অত্যন্ত কঠোর প্রশাসক। তিনি পোটালা ও নরবুলিংকায় তামাক সেবন নিষিদ্ধ করেছিলেন। একবার তিনি যখন বাইরে ঘুরছিলেন, নির্মীয়মান বাড়িটার পাশে এক জায়গায় কয়েকজন শ্রমিক পাথর ভাঙছিলেন। তাঁরা দালাই লামাকে না দেখে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন বলেন, তামাকের উপর নিষেধাজ্ঞাটি ভুল, এটি ক্লান্ত শ্রমিকদের বিশ্রাম নিতে এবং ক্ষুধা নিবারণে সাহায্য করে। একথা বলে তিনি তামাক বের করে মুখে নিয়ে চিবানো শুরু করেন। ত্রয়োদশ দলাই লামা কিছুই দেখেন নি বা শোনেন নি এমন ভাব করে চুপচাপ সেখান থেকে ফিরে যান কিন্তু তারপর এই বিষয়ে সেই শ্রমিকদের কিছু বলেন নি।

কিন্তু তার মানে এই নয় যে তিনি সবসময় এ জাতীয় দয়া দেখিয়েছেন। উচ্চ আধিকারিকদের প্রতি তাঁর আচরণ অত্যন্ত কঠোর ছিল এবং সামান্যতম ভুলের জন্যও তিনি তাঁদের সঙ্গে অত্যন্ত রুক্ষ আচরণ করতেন। তাঁর উদারতা সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে ত্রয়োদশ দলাই লামার সবচেয়ে বড় অবদান হ'ল, তিনি তিব্বতের ছয় হাজারেরও বেশি মঠে শিক্ষার মান ও স্তর উঁচু করতে পরিকল্পনা মাফিক কঠোর পরিশ্রম করেছেন। সেজন্য তিনি নিজে যাচাই করে বয়সে ছোট হলেও জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় এগিয়ে থাকা যোগ্য ভিক্ষুদের উঁচু পদে বসিয়েছেন। এছাড়াও তিনি নিজে হাজার হাজার নবভিক্ষুদের দীক্ষা দেন। ১৯৭০এর দশকে, বেশিরভাগ অগ্রজ ভিক্ষুরা তাঁর কাছে দীক্ষিত ছিলেন।

প্রতিবছর বসন্তের শুরুতে আমি নরবুলিংকায় যেতাম এবং ছয়মাস কাটিয়ে প্রবল শীত শুরু হ’তেই পোটালায় ফিরে আসতাম। যেদিন আমার পোটালার অন্ধকার ও একঘেয়েমিভরা ঘরটি ছাড়তাম, সেদিনটি আমার জন্য বছরের সবচেয়ে সুখী দিন হতো। দিনটির সূত্রপাত হতো একটি লোকাচার দিয়ে যা দু’ঘন্টা ধরে চলতো। আমার শয়নকক্ষ ও সভাগৃহকে ধুপধুনো দিয়ে মন্ত্রপূতঃ করে সেগুলির দরজা বন্ধ করা হতো। কিন্তু আমার মনে হতো যেন অনন্তকাল ধরে চলছে। তারপর আমাকে নিয়ে একটি বড় শোভাযাত্রা বেরুতো যা আমি তেমন উপভোগ করতাম না। তার জায়গায় আমার গ্রামে গঞ্জে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াতে, পৃথিবীর মাটিতে জন্ম নেওয়া যে কোনও নবাঙ্কুর আর ফসলের ঘ্রাণ নিজের অস্তিত্বে ছড়িয়ে দিতে বেশি ভাল লাগতো।

নরবুলিংকায় অদ্ভূত সব জিনিস ছিল। এর চারদিকে একটি উঁচু প্রাচীরবেষ্টিত সুন্দর পার্ক ছিল। এর মধ্যেই সেখানে অনেকগুলি সুদৃশ্য অট্টালিকা ছিল। সেগুলিতে সেখানকার কর্মচারীরা থাকতেন। ভিতরে অন্য একটি প্রাচীর ছিল, যাকে হলুদ দেওয়াল বলা হত, তার ভেতরে দলাই লামা, তাঁর সমস্ত সেবক- কর্মচারী এবং কয়েকজন বিশেষ ভিক্ষু ছাড়া অন্য কেউ ঢুকতে পারত না। এর ভেতরে একপাশে বেশ কয়েকটি বাড়ির মধ্যে দলাই লামার নিজস্ব বাসস্থান এবং চারপাশে একটি সুন্দর বাগান ছিল। সেখানে আমি নানারকম ফল ও নানারঙের পাতার দিকে তাকিয়ে, বিচিত্র সব প্রাণী ও পাখি দেখে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটাতাম। এখানে অনেক বিশেষ ধরণের প্রাণী রাখা ছিল, যেমন গৃহপালিত কস্তূরী মৃগের দল, প্রায় ছয়টি ডখোই প্রাণী, একটি বিশালাকায় তিব্বতি ম্যাস্টিফ কুকুর ছিল পার্কের পাহারাদার, কুম্বুম থেকে পাঠানো একটি ছোট সুন্দর পেকিনিজ কুকুর, বেশ কয়েকটি পাহাড়ি ছাগল, একটি বানর, মঙ্গোলিয়া থেকে আনা বেশ কয়েকটি উট, দুটি নেকড়ে এবং একটি বৃদ্ধ উদাস চিতা - এরা সকলেই স্ত্রী প্রাণী, তাছাড়া - বেশ কয়েকটি তোতাপাখি, আধা ডজন ময়ূর, বেশ কয়েকটি সারস, একজোড়া সোনালি হাঁস এবং প্রায় তিরিশটি কানাডিয়ান হাঁস, সেগুলি যাতে উড়তে না পারে সেজন্য তাদের ডানা কেটে ফেলা হয়েছে - তাদের দেখে আমার মনে খুব দুঃখ হতো। মনে মনে ভাবতাম, দলাই লামা যদি করুণাময় বুদ্ধের অনুসারি হন, তাহলে তাঁর বাসস্থানে প্রাণীদের বন্দী রাখা হবে কেন?

একটি তোতার সঙ্গে আমার পোশাক আধিকারিক কেনারাপ তেনজিনের বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। তিনি এদের কাঠবাদাম খাওয়াতেন। তোতাটি যখন তাঁর হাত থেকে কাঠবাদাম খেত, তখন তিনি অন্য হাত দিয়ে ওর শরীর নেড়ে দিতেন। তোতাটি আহ্লাদে খুবই খুশি হয়ে উঠতো। আমিও সেটার সঙ্গে একইরকম সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছি, কিন্তু সফল হই নি। তখন খুব রাগ হতো, আমি সেটাকে মারার জন্য লাঠি তুলতাম। তারপর থেকে আমাকে দেখামাত্র সে উড়ে চলে যেত। এই ঘটনা আমাকে একটি শিক্ষা দেয়: কীভাবে বন্ধু তৈরি করা যায় - শক্তি দিয়ে নয়, মমতা দিয়ে।

একইভাবে, লিঙ্গ রিনপোচের বন্ধুত্ব ছিল একটি বানরের সঙ্গে। কিন্তু বানরটি আর কারও বন্ধু ছিল না। তিনি পকেট থেকে খাবার বের করে বানরকে খাওয়াতেন, তাই বানরটি তাঁকে আসতে দেখলেই তাঁর পোশাকে ঢোকার চেষ্টা করতো।

আমি অবশ্য পার্কের ভেতর বড় হ্রদে থাকা কিছু মাছের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে সফল হয়েছি। আমি তীরে দাঁড়িয়ে মাছগুলিকে ডাকতাম। ওরা এলে তাদের পাউরুটির টুকরো ইত্যাদি খাওয়াতাম। তবে প্রায়ই ওরা আমাকে অবজ্ঞা করতো,আমার ডাকে আমার কাছে আসতো না। তখন আমার রাগ হতো, খাবার ছুঁড়ে ফেলার পরিবর্তে তাদের উপর নুড়িপাথরবৃষ্টি হতো। কিন্তু ওরা আমার কাছে এলে আমি তাদের প্রত্যেককে খাবার ছুঁড়ে দিতাম, বিশেষ করে ছোট ছোট মাছগুলি যেন অবশ্যই তাদের ভাগ পায় সেটা দেখতাম। প্রয়োজনে আমি একটি লাঠি নিয়ে বড় মাছেদের তাদের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে খাওয়াতাম।

একবার পুকুর পাড়ে খেলার সময় জলের মধ্যে একটি টুকরো কাঠ ভেসে যেতে দেখি। আমি সেটিকে আমার বড় মাছ তাড়ানো লাঠি দিয়ে ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকি। কিন্তু অজান্তেই জলে পড়ে হাবুডুবু খেতে শুরু করি। সৌভাগ্যক্রমে একজন সাফাই কর্মচারি যিনি পশ্চিম তিব্বতের একজন প্রাক্তন সৈনিক ছিলেন, তিনি কাছেই দাঁড়িয়ে আমার দিকে নজর রাখছিলেন। তিনি ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে বাঁচান।

নরবুলিংকার আরেকটি আকর্ষণ হ'ল এটি কিচু নদীর একটি ধারার খুব কাছে। কয়েক মিনিট পায়ে হাঁটলেই পৌঁছানো যায়। আমি যখন ছোট ছিলাম প্রায়ই কোনও সেবকের ছদ্মবেশে বাইরের প্রাচীর থেকে কয়েক মিনিট হেঁটে নদীতে যেতাম। প্রথমে কেউ তা টের পায়নি, কিন্তু একদিন তাথাগ রিনপোচের কানে খবর পৌঁছলে তিনি এই অভিযান বন্ধ করে দেন। দুর্ভাগ্যক্রমে, দলাই লামা সম্পর্কিত বিধিগুলি অত্যন্ত কঠোর ছিল। আমি পেঁচার মতো লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হতাম। বাস্তবে তখন তিব্বতি সমাজ এত প্রাচীনপন্থী ছিল যে উচ্চ সরকারি আধিকারিকরাও যদি মাথা নীচু করে রাস্তার দিকে তাকিয়ে চলতেন তাহলে তাঁদের বিদ্রূপের চোখে দেখা হতো।

পোটালার মতন নরবুলিংকায় আমার বেশিরভাগ সময় সাফাইকর্মীদের সঙ্গে কাটতো। যখন খুব ছোট ছিলাম, সমস্ত আনুষ্ঠানিক আচরণে বিরক্ত হতাম এবং আমি সরকারী কর্মকর্তাদের থেকে সেবকদের সঙ্গে থাকতেই বেশি পছন্দ করতাম। আমি যখন বাবা-মার কাছে বাড়িতে যেতাম, আমি সেখানে গৃহকর্মীদের সঙ্গে আরও বেশি সময় ব্যয় করতাম, এরা সবাই ছিলেন আমদোর বাসিন্দা। তাঁরা আমাকে নানারকম গল্প বলতেন।

আমরা যখন পরিবারের খাদ্য ভাণ্ডারে হামলা চালাতাম, তখনও তাঁরা সঙ্গে থাকতেন এবং খুব মজা পেতেন। এসব দুস্টুমিতে আমাকে সঙ্গ দিয়ে তাঁরা খুশি হতেন। কারণ আমার সঙ্গে তাঁরাও উপকৃত হতেন। এই হামলার সেরা সময় ছিল শরতের শেষ ভাগে যখন তাজা তাজা শুকনো মাংসের প্যাকেটগুলি আসতো, সেই মাংস আমরা লঙ্কার চাটনি দিয়ে খেতাম। আমি এই মাংস খুব পছন্দ করতাম। একবার আমি এত বেশি খেয়েছি যে আমার পেট কামড়ানো ব্যাথা শুরু হয়। আমি পেট চেপে চেপে কঁকিয়ে উঠতে থাকি। বারবার পায়খানায় যেতে থাকি। কেনরাপ তেনজিং আমার এই অবস্থা দেখে সান্ত্বনা দিতে বলেন, ‘সমস্যা নেই, ঠিক হয়ে যাবে, আসলে এটি ভালই হয়েছে, পেটের জমা ময়লা বেরিয়ে যাচ্ছে!’ তাঁর সান্ত্বনা গায়ে মাখিনা, মনে মনে নিজের বোকামির জন্য অনুশোচনা হয়।

দলাই লামা হওয়া সত্ত্বেও ওই বাড়ির সহায়করা আমার সঙ্গে সাধারণ শিশুর মতন আচরণ করতেন। বাড়ির অন্যরাও বিশেষ অনুষ্ঠান বাদে একইরকম আচরণ করতেন। কেউ আমার সঙ্গে কোনও বিষয়ে কথা বলতে ভয় পেতেন না। সেজন্যে, শৈশবেই বুঝে গেছিলাম যে সাধারণ মানুষের জীবন খুব সহজ নয়। আমার সাফাই কর্মচারীরাও আমাকে নির্ভয়ে গড়গড় করে তাদের সমস্যাগুলি বলতেন,সরকারি কর্মকর্তা এবং বড় বড় লামারা তাদের উপর কেমন জুলুম করেন। তাঁরা আমাকে চারপাশে কোথায় কী হচ্ছে - নানা মহলের সব খবর দিতেন। মন ভাল থাকলে তাঁরা কাজ করতে করতে গুনগুন করে গান গাইতেন। আর তাঁদের মধ্যে যাঁরা গান জানতেন আমার অনুরোধে তাঁরা গলা ছেড়ে মেঠো গান গেয়ে শোনাতেন। সুতরাং, আমার জীবনে অনেক সময় একা একা কাটালেও একাকীত্ব আমাকে গ্রাস করেনি। বারো বছর বয়স হতেই তাথাগ রিনপোচে আমার বাবা-মায়ের বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করে দেন। তবু আমার জীবন রাজকুমার সিদ্ধার্থ কিম্বা চীনের শেষ সম্রাট পু ওয়ির মতো তেমন একা কখনও ছিল না। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক বিচিত্র মানুষের সংস্পর্শে এসেছি।

আমার ছোটবেলায় প্রায় দশ জন ইউরোপীয় লাহসায় বসবাস করতেন। আমি তাদের চিনতাম না। কৈশোরে একদিন লবস্যাং সামতেন আমার কাছে হেনরিখ হেরিয়ারকে নিয়ে এলে আমি প্রথমবারের মতো একজন 'ইঞ্জি'-কে দেখি। তিব্বতে পাশ্চাত্যের মানুষকে ‘ইঞ্জি’ বলা হয়। আমার বড় হওয়ার দিনগুলিতে বিভিন্ন সময়ে যে ‘ইঞ্জি’-রা লাহসায় থেকেছেন তাঁরা হলেন ব্রিটিশ বাণিজ্য মিশনের সভাপতি স্যার বেসিল গোল্ড; তাঁর উত্তরসূরি হিউ রিচার্ডসন যিনি তিব্বত নিয়ে বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন এবং দেশ ছেড়ে আসার পরেও তাঁর সঙ্গে তিব্বত নিয়ে কথাবার্তা বলার জন্য বেশ কয়েকবার সাক্ষাত হয়েছে। তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন রেজিনাল্ড ফক্স এবং একজন ব্রিটিশ মেডিকেল অফিসার, যাঁর নাম এখন মনে পড়ছে না। তবে আমার মনে আছে যে আমার পার্কের একটি ময়ূরের যখন একটা চোখ ফুলেছিল, সেটার চিকিত্সা করার জন্য তিনি নরবুলিংকায় এসেছিলেন। আমি তাঁকে খুব যত্ন সহকারে ময়ূরটির চিকিত্সা করতে এবং সকলের সঙ্গে লাহসার চলিত উপভাষায় আর আমার ও উচ্চ আধিকারিকদের সঙ্গে আলঙ্কারিক তিব্বতিতেই কথা বলতেন। তাঁর মুখ থেকে ময়ূরের জন্য 'সম্মানিত ময়ূর' সম্বোধন শুনে বেশ মজা পেয়েছিলাম।

তবে আমার সবচাইতে প্রিয় ছিলেন হ্যানরিখ হ্যারর। তিনি খুব মিস্টি স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তাঁর মতো চকচকে সোনালি চুলের কাউকে আর দেখিনি। সেজন্যে তাঁর নাম রেখেছিলাম 'গোপসে', অর্থাৎ, হলুদ মাথা। অস্ট্রিয়ান ছিলেন বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তিনি কোনওভাবে সহবন্দী, পিটার অফ্রেশনেটরকে নিয়ে পালাতে সক্ষম হন এবং অনেক কষ্টে লাহসায় পৌঁছন। এটি ছিল তাঁদের অত্যন্ত মিষ্ট স্বভাবের অর্জন; কারণ তিব্বতে সেইসময়ে নির্দিষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের বাদ দিলে বিদেশীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। যাযাবরের মতো দীর্ঘ পাঁচবছর পথে কাটিয়ে তাঁরা লাহসায় পৌঁছাতে পারেন। তাঁদের সাহসিকতা, অধ্যবসায় ও তিব্বতের প্রতি ভালবাসা দেখে তাথাগ রিনপোচে ও প্রশাসনের উচ্চ –পদাধিকারীরা এতটাই মুগ্ধ হন যে আমার সরকার তাঁদের লাহসায় স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি দেয়। তাঁর ক্ষেত্রেই প্রথমবার আমার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমতিপত্রে সাক্ষর করানো হয়। তাথাগ রিনপোচে নিজে আমাকে তাঁদের আগমনের খবর দেন। এহেন ‘ইঞ্জি’রা কেমন দেখতে তা দেখার জন্য আমি উদগ্রীব হয়ে পড়ি। বিশেষ করে হ্যাররের সঙ্গে, কারণ ইতিমধ্যেই তাঁর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব এবং মিশুকে স্বভাবের খ্যাতি দাবানলের মতন দ্রুত শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল।

তিনি খুব ভাল চলতি তিব্বতি বলতেন আবার রেজিনাল্ড ফক্সের মতন বিলিতি উচ্চারণে আলংকারিক তিব্বতিও বলতে পারতেন। আর সব কথাই হেসে হেসে বলতেন। অনেক তিব্বতি গ্রাম্য মজাও শিখে গেছিলেন। অবশ্যই প্রত্যেককে যথাযোগ্য শ্রদ্ধা ও সৌজন্য প্রদর্শনের পর অন্তরঙ্গ মুহূর্তে সেগুলিও শোনাতেন । তাঁর সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গতা যত বাড়তে থাকে ততই তাঁর স্পষ্টবক্তা চরিত্র আবিষ্কার করতে থাকি। তাঁর এই গুণটি আমার খুব ভাল লাগে। আমার মনে আছে, ১৯৪৮ সালে তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখা,তাঁর প্রায় দেড়বছর পর তিনি তিব্বত ছেড়ে যান। আমরা প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত মিলিত হতাম। তাঁর কাছে বাইরের জগত, বিশেষ করে ইউরোপ এবং বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি। তিনি আমাকে ইংরেজি শিখতেও সাহায্য করেছেন; আমি আগেই আমাদের এক ইংরেজি জানা আধিকারিকের কাছে শেখা শুরু করেছিলাম, এবং ততদিনে ইংরেজি বর্ণমালার পাশে পাশে তিব্বতি উচ্চারণ লিখে আয়ত্ত করেছিলাম, ব্যাকরণ শিখছিলাম। আমি হ্যাররের কাছে ইংরেজি বলা শেখার অভ্যাস করতাম। তিনি আমাকে আরও অনেক ব্যবহারিক কাজে সাহায্য করতেন। যেমন, প্রজেক্টরের সঙ্গে উপহার পাওয়া জেনারেটরটি বিকল হলে সেটি ঠিক করতে সাহায্য করেন। আমি প্রায়ই ভাবতাম যে ব্রিটিশ ডাক কর্তৃপক্ষ আমার উপহার থেকে নতুন জেনারেটরটি নিজেদের ব্যবহারের জন্য রেখে আমাকে তাঁদের পুরনো একটি দিয়ে গেছে! আমার সন্দেহের কথা শুনে হ্যারর শুধু মুচকি হাসেন, আর তারপর সেটি সারাতে লেগে পড়েন।

এই সাফল্য আমার মনে ত্রয়োদশ দলাই লামার আনানো তিনটি অকেজো মোটর গাড়ি সারানোর উৎসাহ জোগায়। তিব্বতের রাস্তা ভাল না হলেও তিনি নাকি প্রায়ই এগুলি চড়ে শহরের চওড়া পথে এবং শহরের আশেপাশে ঘুরে বেড়াতেন। তাঁর মৃত্যুর পর থেকে সেগুলি নরবুলিংকার একটি কক্ষে অব্যবহৃত রাখা আছে। একটি গাড়ি আমেরিকান ডজ আর বাকি দু’টোই বেবি অস্টিন। সবকটি গাড়িই ১৯২০র দশকের শেষের দিকের মডেল। এগুলি ছাড়াও ছিল একটি উইলিস জীপগাড়ি, এটি আমার আমলেই ১৯৪৮ সালে তিব্বত বাণিজ্য মিশন তাঁদের আমেরিকা ভ্রমণের সময় নিয়ে এসেছিল, এটিও খুব কম ব্যবহৃত হয়েছিল।

মুভি প্রজেক্টরগুলি সারানোর পর, মোটরগাড়ি সারাই জানেন এমন কাউকে খুঁজে পেতে আমাদেরও অনেক সময় লেগে যায়। কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে সেগুলি ব্যবহার করব। অবশেষে হ্যাররের কাছেই তাশি সেরিং নামে এক চালকের খোঁজ পাই যিনি ভারত সীমান্তের দক্ষিণে কলিম্পংয়ের মানুষ। কোনও ইংরেজ দলের সঙ্গে লাহসায় এসেছিলেন। এখানে এসে তাঁর গুটিবসন্ত হওয়ায় দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী ছিলেন। ততদিনে তাঁকে নিয়ে আসা সাহেবরা ভারতে ফিরে গেছেন। আর এই মানুষটি তিব্বতি চিকিৎসকের দয়ায় তাঁর সহায়কের কাজ করতেন। কিন্তু তাঁর মাথাও খুব গরম ছিল।

আমরা একসঙ্গে গাড়িতে কাজ করতাম। এবং শেষ অবধি, একটি অস্টিনের কিছু কলকব্জা খুলে অন্যটিতে লাগিয়ে সেটিকে চলমান করা হয়েছে। তবে ডজ এবং জিপের অবস্থা খুব একটা খারাপ ছিল না, সামান্য মেরামতির পরই সেগুলি ভালভাবে চলতে শুরু করে।

কিন্তু গাড়িগুলি ঠিক হয়ে গেলে, আমি যখন চালানো শিখতে শুরু করি তখন প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাকে মানা করা হয়। এই অবশ্য-পালনীয় উপদেশ আমার পক্ষে অসহনীয় ছিল। কিন্তু মেনে চলা ছাড়া আমার আর কোনও উপায় ছিল না। তাই তাশি সেরিংকে চালক নিয়োগ করা হয়। কিন্তু একদিন, যখন তাশি কোথাও গিয়েছিল, আমি নিজেই গাড়ি নিয়ে বেরুই। ডজ এবং জীপটি চাবি ঢুকিয়ে চালাতে হতো, আর সেই দু’টির চাবিও সেরিং-এর কাছেই ছিল, কিন্তু বেবি অস্টিনকে কেবল ইগনিশন বোতাম টিপে ক্র্যাংক হ্যান্ডেল ঘোরাতে হতো, তাই আমি খুব যত্ন সহকারে সেটিকে শেড থেকে বের করে চালিয়ে পার্কের দিকে কিছুটা এগিয়ে যাই। দুর্ভাগ্যক্রমে, নরবুলিংকার পার্কটি গাছে পূর্ণ ছিল, তাই কোনও গাছে ধাক্কা লাগাতে বেশি সময় লাগেনি। দেখলাম সামনের একটি হেডলাইটের কাঁচ ভেঙে গেছে। আমি যদি সেদিনের মধ্যে এটি ঠিক না করি তাহলে আমার অভিযানের গোপনীয়তা প্রকাশিত হয়ে পড়বে। আমার মাথা গরম চালক ফিরে এলে আমি সমস্যায় পড়ব।

এরপর আমি সতর্কভাবে কোনও সমস্যা ছাড়াই গাড়িটি গ্যারেজে নিয়ে যাই। পার্ক করার পরই কাঁচটি ঠিক করার উপায় ভাবতে শুরু করি। ভালভাবে দেখে বুঝতে পারি যে এটি একটি রঙিন কাঁচ ছিল, সাধারণ কাঁচ নয়। তাই আমি সেই রঙের একটি কাঁচ খুঁজতে শুরু করি। খুঁজতে খুঁজতে একই আকারের অন্যরঙের কাঁচ খুঁজে পাই। এখন আগের কাঁচের রঙটি কীভাবে তৈরি করা যায় তা নিয়ে ভাবতে থাকি। ভাবতে ভাবতে অবশেষে, এটির উপরে চিনির শিরা ঘষে অন্যটির মতো করে ফেলি। আমি আমার কাজে সন্তুষ্ট হই।

কিন্তু পরদিন তাশি সেরিং ফিরে এলে তাঁর সামনে যেতে লজ্জা লাগে। আমার বিশ্বাস ছিল, আজ কিংবা কাল তাশি এই জিনিসটি জানতে পারবেন। কিন্তু জানি না কেন, তিনি কখনও আমাকে এ বিষয়ে একটি শব্দও বলেননি। আমি কখনই তাশি সেরিংকে ভুলব না। তিনি এখনও বেঁচে আছেন এবং ভারতে আছেন বলে জানি। যদিও ভারতে আসার পর তার সঙ্গে কখনও দেখা হয়নি, তাকে আমি আমার ভাল বন্ধু বলে মনে করি।


চলবে ...