শনিবার, মে ৮, ২০২১

​মরণ্যা চরের ইতিকথা

উত্তরপূর্বের কথাসাহিত্যিক কুমার অজিত দত্তের সাড়া জাগানো উপন্যাস , ' মরণ্যা চরের ইতিহাস' - গ্রন্থটি নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা করলেন কবি সম্পাদক সমালোচক সেলিম মুস্তাফা

মরণ্যা চরের ইতিকথা

এটি একটি উপন্যাস । প্রকাশকাল ২০১৯ সাল । লিখেছেন কুমার অজিত দত্ত, যাঁর নাম কমবেশি আমরা সকলেই জানি, অন্তত ‘একা এবং কয়েকজন’ সাহিত্যপত্রটির কল্যাণে তো বটেই । কবি নকুল রায়ের মাধ্যমে বইটি আমাকে উপহার পাঠিয়েছেন সুলেখক কুমার অজিত দত্ত । তাঁর রচিত কোনো গ্রন্থ আমি এই প্রথম দেখলাম ও পড়লাম ।

আসামের চর ও চরজীবনের ঘটনাবহুল যাপনকে কেন্দ্র করে এই কাহিনির ডালপালা । লেখক নিজেই বলেছেন যে লেখাটি বাস্তব ও কল্পনার রসায়ন । চরজীবন নিয়ে কৌতূহল আর বিভিন্ন পত্রপত্রিকা পাঠ, একইসঙ্গে চরবাসীদের সঙ্গে নানান হাটবাজারে মিলিত হওয়া এবং তাদের সঙ্গে অনুসন্ধিৎসু বাক্যালাপের ভিত্তিতে এর কাঠামো গড়ে ওঠে । পড়ে খুব ভালো লাগলো । তাই আমার পাঠপ্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার ইচ্ছেতেই এই লেখার উদ্যোগ । খুব বড় নয় । মাত্র ৯৪ পৃষ্ঠার ছোটো আকারের (সম্ভবত ১/১৬ ডি.সি. সাইজ) বই । অত্যন্ত দ্রুতগতিসম্পন্ন এমন একটি উপস্থাপনা, যাতে পাঠককে নিঃশ্বাস ফেলার অবকাশ যেন দিতে চান না লেখক ।

মরণ্যা চর কল্পিত নাম । লেখক জানাচ্ছেন চরবাসীদের অধিকাংশই মইমনসিঙিয়া, ছিন্নমূল হয়ে বর্তমানে যারা আসামের একটি চরে আশ্রয় নিয়েছেন । ফলে তাদের মইমনসিঙিয়া বুলির সঙ্গে অসমিয়া বুলিও যথারীতি জায়গা করে নিয়েছে । এতে ভাষার রক্ষণশীলতা বা দুর্বলতা নিয়ে কিছুটা হলেও স্বাধীনতা লেখক নিতে পেরেছেন বলা যায় । তবু লেখক জানাচ্ছেন যে, এই চরুয়াদের মুখের বর্তমান বুলি যথাসাধ্য অক্ষুণ্ন রাখার প্রয়াস তিনি নিয়েছেন । কাজটা কঠিন, তবু মাটির গন্ধ যেন মিশে রইলো মুখের বুলির সঙ্গে ।

যদিও প্রোটাগোনিস্ট আধারিত কাহিনি এ নয়, তবু উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে লুৎফা নাম্নী এক জেলে রমণীর সংগ্রামী যাপন, যে একাধারে নারীমুক্তি ও গণমুক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে ক্রমশ । আর এ কারণেই গ্রন্থটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলা যায় । জেলেদের জীবন আর চরের কাহিনি নিয়ে আরও অনেক দেশি বেদেশি উপন্যাস আছে, যার দুয়েকটি মাত্র আমি পড়েছি স্কুল জীবনে । ফলে কোনো মিল-অমিল বা তুল্যমূল্যের দিকে আমি যাচ্ছি না ।

লুৎফাকে কেন্দ্র করে ক্রমে এসেছে আরও কিছু চরিত্র, যারা প্রত্যেকেই অপরিহার্য । যেমন জাফর, সোনাভাবি, জমির, সুফি, ফজল, ময়না, ইসমাইল, গুলাফকইনা, আমিনা, ফতেমা, বাহারুদ্দিন, নুরুল মহালদার, কুঁজো উলফৎ, লুৎফার কুড়িয়ে পাওয়া পরিত্যক্ত শিশু আকবর, এবং এমন আরও কয়েকজনসহ একটি বেড়ালও ।

কাহিনি শুরু হয়েছে চলতি জীবনের মাঝখান থেকে সহসা, কোনো প্রারম্ভিক ভনিতা ছাড়াই । বিশেষ করে প্রেমচন্দের গল্পে এমন দেখা যায় । পুরো কাহিনি মাথায় বাসা বেঁধে না থাকলে এমন শুরু খুব সহজ নয় । এটা লেখকের কৃতিত্ব মানতেই হবে ।

জাফরের দৃষ্টি থেকে কাহিনির শুরু—

“জাফর দেখে লুইতের পানি এখন একেবারে শান্ত । রোদ হেলে আসছে । আলম, সুফি ও অন্যান্য জেলে ভাইরা এখন ভাঁটিতে বোতল সাঁটছে ।…”

এরপর কাহিনি দ্রুত এগিয়ে গেছে মহাজনী প্রতাপের নিষ্পেষণে নানাভাবে নির্যাতিত, অবহেলিত ও শোষিত চরুয়াদের ক্রমে প্রতিবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে ক্রমশ মুক্তির আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াসে । শেষকথা লেখক বা তাঁর চরিত্র বা পাঠক বা সময় কেউ জানে না । তবু থামতে হয় বলে একসময় থেমে যাওয়া ।

উপনিবেশ-উত্তর কালের উপন্যাসে এখন আমরা শুধু কাহিনি চাই না, আরও অনেক কিছু চাই, কারণ প্রথমেই প্রশ্ন আসে, এটা কেন লেখা হলো ? সেই তাৎপর্য খুঁজতে গেলেই আরও অনেক প্রশ্ন আরও অনেক উত্তর খুলে খুলে আসে পঙ্‌ক্তির আড়াল থেকে । কাহিনি তো কতই বলা যায়, যে-কেউ বলতে পারে, আর পাঠকেরও অভাব হয় না । পাঠক প্রতিদিন তৈরি হয়, প্রতিদিন বিবর্তিত হয় । কোনো বই সে আবার পড়ে, কোনো বই বিসর্জন দেয় চিরতরে । ফলে সামনে এসে যায় লেখকের মূল অভিসন্ধান, আধেয় আর তাঁর লিখনপদ্ধতির কথা ।

শিক্ষিত কুঁজো উলফৎই, যে মূলত পিতা ও মাতা দ্বারা পরিত্যক্ত এবং ইমামবড়া মসজিদের মৌলানা দ্বারা প্রতিপালিত, এই চরে সংগ্রামী চেতনার অগ্রদূত হয়ে আসে । তাকে সবাই ‘পরভু’ বলে সম্বোধন করে । আমার মনে হয়েছে এই উলফৎ চরিত্রটি মূলত একটি প্রতীক । শাসন ও শোষণের আধিপত্যের বিপরীতে সে এক অবহেলিত, আশ্রয়হীন, পরিচয়হীন এমন এক অপর-সত্তা, যাদের অস্তিত্ব বিশ্বের সর্বত্রই রয়েছে, রয়েছে এই ভারতবর্ষে, রয়েছে তাই আসামেও, যেখানে লেখকের দৃষ্টি বিশেষভাবে কেন্দ্রীভূত । এবং এর পিঠের কুঁজও জীবনের সেই ভার, যাকে বহন করা যায় না, আবার ফেলাও যায় না । এই ভার জগতের সকল অবহেলিতের তো বটেই, রাষ্ট্রিক ও সামাজিক আধিপত্যও সহ্য করতে পারে না এর বিরোধাভাস, বহন করতে পারে না এর কণ্টকাকীর্ণ ওজন । তাই কোনো না কোনোভাবে, প্রকাশ্যে বা গোপনে এর অপনোদন ঘটায় বা ঘটাতে চায় । তথাকথিত সভ্যসমাজের হেজিমনি ও হায়ারার্কির পিঠে তাই উলফৎ-এর গোটা অস্তিত্বই, এমনকি এই গোটা চরটাই, বাকি সমস্ত চরের প্রতিনিধি হিসেবে, একটা সুবিশাল কুঁজ ।

এবার দেখি চরের ভেতর কী হচ্ছে, একটু শোনা যাক একটি গোপন সভার সামান্য কথাবার্তা—

উলফৎ বলছে উপস্থিত চরুয়াদের সামনে—“…দিছপুর টেকসো লয়, ভুট লয়, কিন্তুক চরচাপরির লাইগা কিছু করে না, চরচাপরি হগ্গল সরকারি উন্নয়ন থিক্যা বঞ্চিত, আমরার টেকসো লইয়া, আমরার হাকপাচলি খাইয়া হেরা ফাইপ্যা ফুইল্যা উঠতাছে । অথচ আমরা যে আন্ধারে আছিলাম হেই আন্ধারেই রইয়া গেছি, আমরারও যে মাইনসের লাহান বাইচ্যা থাহনের হক আছে হেরা কহুনো ভাবে না—

উপস্থিত মাউচ্ছা আর চাষিরা অবাক হয়ে বলে ওঠে, পরভু, ঠিকই ত, হেরা অইছে আমির উমরা, হেরার মরণ বাঁচন ত বাদশার লাহান, আমরা অইলাম গিয়া হে গ পরজা, না বাব্বা, আমরার যা আছে তাই বালা, আমরার আর কিছু নে লাগে—

উলফৎ মৃদু হাসে ওদের কথা শুনে । তারপর বলে, না ফাইতে ফাইতে আমরার মনডা বহুত ছুডো হইয়্যা গেছে বাইরা, আমরা যেনেকা জিয়াই আছু হেইডা যে জিয়োন না, বাবতেই পারি না আমরা—…”

যেন একই পরিবারের সদস্য সব, এমনি অত্যন্ত আন্তরিক কথাবার্তায়, এই সহজপাঠ্য ঘটনাবহুল এবং শঙ্কাসংকুল একটি কাহিনি ক্রমশ এগিয়ে গেছে তরতরিয়ে । একের সত্তার আততিতে গড়ে উঠেছে অপর সত্তাগুলো, এই পারস্পরিকতা, যা কোনো অস্তিত্বের মূলকথা, এই বহুস্বরসঙ্গতিকে কলমে ফুটিয়ে তোলা, এটাও একটা মস্ত ব্যাপার, অন্তত একটা উপন্যাসের ক্ষেত্রে, এই সময়ের একজন লেখকের ক্ষেত্রে, কারণ অধিকাংশ লেখকেরই বাজারচলতি রগরগে কাহিনির দিকেই নজর । এর প্রতিটি চরিত্র নিপুণভাবে আঁকা হলেও কখনো মনে হয় না যে এরা ক্রিয়েটেড, যেন এদের দেখে দেখেই লেখা । হয়তো তা-ই ।

লক্ষ করলে দেখি যে, এখানে লেখকের মূল ইঙ্গিতটি দার্শনিক অভিঘাত নিয়ে উলফতের মুখ দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে । তথাকথিত সভ্যসমাজের দাপটের তলে যে প্রতিসত্তা, তারা খেয়েও বাঁচে, না-খেয়েও বাঁচে, আর সেটাকেই তারা বিনা প্রশ্নে জীবন বলে ভেবে নেয় । বাঁচা-ও যেন চাল-ডালের মতো পণ্য হয়ে উঠেছে, যার যার সাধ্যমতো সংগ্রহ করে ব্যবহার করা, যেন এতে অন্য কারো হাত নেই, পেছনে নেই কোনো কলকাঠি ! ফলে কোনো প্রতিবাদ বা দোষারোপের কথা তাদের ভাবনাতে আসেই না । অপরসত্তার সঙ্গে এটাই একজন লেখকের সহমর্মিতা, যা তার সন্দর্ভকে বাস্তবিকতার প্রেক্ষিতে অধিষ্ঠিত করে ।

কোনো কোনো লেখকের আধিপত্য অনেকসময় চরিত্রের ওপর চেপে বসে । এখানে সেই প্রতাপ চরিত্রের ওপর কামড় বসায়নি । তারা নিজে নিজেই যেন গড়ে উঠেছে । এও একজন লেখকের কাছে খুব সহজ ব্যাপার নয় । একজন লেখক হিসেবে তারই সৃষ্ট চরিত্রকে, তাদের মতো চলতে বা বলতে দেবার এই সংযম বা কুশলতা বজায় রাখাই সম্ভবত এই সময়ের নবীনতম ধারা ।

কাহিনি বলতে যাচ্ছি না । এই পরিসরে তা সম্ভবও নয় । আমার এই লেখাটাই কেউ পড়বে কিনা সন্দেহ আছে । অবসর কম বলে সকলেই সংক্ষেপে সব জেনে নিতে চায় । হয়তো, লেখকের মনেও এই একই ধারণা চেপে বসেছিল ।

উপন্যাস কমবেশি পড়েছি স্কুলজীবন থেকেই । এক একটা উপন্যাস যেন এক একটা আকাশ । প্রকৃতপক্ষে, আমার ধারণা গড়ে উঠেছে এমন যে, উপন্যাসের আদতে কোনো শেষ নেই, এমনকি শুরুও নেই । উপন্যাস শুধুই একটি আখ্যান নয়, একটি অসীম বিস্তার, যার অন্তর্গত কোনো ঘটনাই কোনো ঘটনা নয়, কোনো চরিত্রই কোনো চরিত্র নয়, সুদূরপ্রসারী ইজেলে একটা ফবিস্ট তুলির টান যেন, যার মধ্যে সমাহিত সকল আশা আকাঙ্ক্ষা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, সকল ঘটনাপ্রবাহ, সময় ও পরিসরের সকল অক্ষাংশ দ্রাঘিমা । আর সব মিলিয়েই জ্বলজ্বল করবে সেই তুলির টান, যা লেখকের মূল কথাবস্তু হবার কথা, যা হবার কথা শেষ পর্যন্ত এক বিশেষ চিহ্নায়ক, যা অঙ্গুলি নির্দেশ করবে এক বিশেষ সময় ও পরিসরকে, একই সঙ্গে ইতিহাসের ধারাবাহিকতাকে টেনে এনে আছড়ে ফেলবে বর্তমানে, আবার যেখান থেকে খুলে যাবে ভবিষ্যতের নানান সরণির ইঙ্গিত । সবই ঘটে অত্যন্ত ধীরগতিতে, বিস্তৃতি নিয়ে, পাঠকের অগোচরেই যেন । ফলে এই উপন্যাস পড়তে গিয়ে আমার ধারণায় কিছুটা হলেও যে ধাক্কা লাগেনি, তা বলতে পারছি না ।

প্রথমত, রচনাটি শেষ করার পর মনে হয়েছে উপন্যাস নয়, একটা নাটক যেন পড়ে শেষ করলাম । ভৌগলিক চিহ্ন হিসেবে চরের উপস্থিতি অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু, সেই চরের চরিত্রটিই যথেষ্ট সুবিচার পায়নি যেন, তার সুখদ উপস্থিতি বা সমস্যাসংকুলতা নিয়ে তার চরিত্রের নির্মমতা আর হৃদয়খোলা আহ্বান ঠিক তেমনভাবে যেন গড়ে ওঠেনি, যদিও বন্যা ও ঝড়ের তাণ্ডব লেখক এনেছেন, এনেছেন বন্যা পরবর্তী রোগের প্রকোপ, চিকিৎসা, মৃত্যু ইত্যাদি উপকরণ । সবই আছে, কিন্তু পাত্র ছোটো বলে ঠাসাঠাসি ।

যা আমরা দেখেছি সবই চরের ভেতর থেকে দেখা, কোনো লং-শট নেই, ফলে পাঠকের মনে চর একটা ভিন্ন ভূখণ্ড, একটা বিশেষ চরিত্র হিসেবে মনে ততখানি দাগ কাটে না, যতখানি জেগে থাকে তার ওপর বিচরণশীল মানুষগুলো । তবে একথা ঠিক যে, যেসব পাঠকরা নিজের চোখে কখনো ‘চর’ দেখেছেন, তাদের মনে এই অভাব ধরা পড়বে না । চর শব্দেই তাদের মনে তার চিত্র ফুটে উঠবে পূর্বধারণা থেকে । আমি কখনোই চর দেখিনি, ফলে আগন্তুক পাঠক হিসেবে আমার কিছু অসুবিধে হয়েছে । অত্যন্ত গতিশীল চরিত্রদের বেগে আর আবেগে, পাঠক হিসেবে আমার ভাবনার জন্য অবসর পেয়েছি খুবই কম । একটি অধ্যায় শেষে আরেকটি অধ্যায়ের শুরুর আগে যে অবসর, সেটাই আমার ধারণায় কোনো লেখায় পাঠকের প্রবেশ বা অনুপ্রবেশের চোরাগলি । এমন পরিসর যেন খুবই কম ।

আসামের তথা দেশের প্রশাসনের অবহেলা, গণমানুষকে বিবেচনায় না-এনে দালাল-সর্বস্ব মহাজন-সর্বস্ব কলাকৌশলের দ্বারা শাসন আর শোষণ, বিদেশি-চিহ্নিতকরণ, নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার, ইত্যাদি অনেক বিষয়ই এসেছে কাহিনিতে । এসেছে এই সব অত্যাচারের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা ধিকিধিকি আগুনের একদিন দপ করে জ্বলে ওঠার গোপন ও প্রকাশ্য স্ফুরণ । তবে সংক্ষিপ্ততার কারণে, ব্যক্তিগতভাবে সবই প্রতীকী-ছোঁয়া বলে মনে হয়েছে । অনেক বিচিত্র ও বিক্ষিপ্ত ঘটনা থাকলেও আখ্যান মূলত একরৈখিক । যা ঘটেছে সবই কাহিনির প্রয়োজনে ঘটেছে । ফলে তাবৎ চিত্রণই এক বদ্ধ মোটিফ (Bound Motif)-এর বিস্তার বলা যায়, মুক্ত মোটিফ (Free motif) স্থাপন করার অবকাশ ততটা আসেনি যতটা প্রয়োজন ছিল শ্বাস ফেলার জন্য । তবু কিছু তো আছেই, যা এসেই পড়ে কখনো পার্শ্বঘটনা হিসেবে, কখনো নন্দনের খাতিরে । মনে হয় এই ‘অধিকন্তু’ ব্যাপারগুলোই বটের ঝুড়ির মতো প্রতিষ্ঠা দেয় একটি উপন্যাসকে । এমনি এসেছে জাফর আর গুলাফকইনার এপিসোড । আমিনার কাহিনি ।

তবু, যিনি লেখেন, তিনিই লেখেন, সকলের পক্ষে তা সম্ভব নয় ।

এ উপন্যাসটি অন্তত আসামের প্রেক্ষিতে, চরবাসীদের প্রেক্ষিতে এবং তাবৎ কথিত ও যন্ত্রণাক্লিষ্ট বহিরাগতদের প্রেক্ষিতে মূলত যে একটি প্রতীকী ঢিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই এবং এই হিসেবে এর মূল্য অপরিসীম ।

এবার লুৎফার কথায় আসা যেতে পারে । লুৎফা অত্যন্ত শক্তিশালী একটি চরিত্র এবং মূলত তাকে কেন্দ্র করেই ঘটনা বিন্যস্ত হয়েছে । দু-একটা বাদে ঘটনা সবসময়ই লুৎফার দিকে কেন্দ্রাভিগ, পরিধি অদৃশ্য হয়ে গেছে । স্বামী জাফরকে সে খুবই ভালোবাসে, কিন্তু জাফরের সন্তান উৎপাদন করার ক্ষমতা নেই । তবু লুৎফা বিরক্ত নয় । কিন্তু একটি কুড়িয়ে পাওয়া শিশুকে বাড়িতে আনতেই দ্বন্দ্বের সৃষ্টি । আর এখান থেকেই প্রতিবাদমুখর লুৎফা তেজস্বিনী হয়ে ওঠে । সে জাফরকে বলে দেয়, তার যদি না পোষায়, তবে যেন অন্যত্র চলে যায়, সে এখানেই থাকবে শিশুটিকে নিয়ে ।

ঘটনা এগিয়ে গেলে আমরা দেখব জাফর একসময় গৃহত্যাগ করে এবং তার সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা আছে প্রমাণ করার জন্য গুলাফকইনাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে । কিন্তু এখানেও সেই একই ব্যাপার । সে পিতা হতে পারে না এবং গুলাফকইনাকে ফেলে রেখে পালিয়ে আসে । পরে গুলাফকইনা তাকে খুঁজতে খুঁজতে এসে লুৎফার কাছেই আশ্রয় পায় । এখানে লুৎফার মমতাময়ী রূপটি খুব সুন্দরভাবে ধরা পড়ে । সে ধীরে ধীরে চরের সকলের কাছেই একটা ভরসাস্থল হিসেবে জেগে ওঠে, এও যেন অকূল জলরাশিতে এক চরের ভেতর আরেক চরের জেগে ওঠা । দিন যায়, উলফতের দিশা মেনে সরকারি ও বেসরকারি শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আগুন ধিকিধিকি জ্বলতে থাকে । এবং একসময় কিছু পরিবর্তন এলেও সেই সর্বসুখের দিন যেন কিছুতেই আসে না, আখ্যান শেষ হয় । কিন্তু জীবন শেষ হয় না । এটাই হয়তো বাস্তবসম্মত সমাপ্তি কোনো উপন্যাসের । আর এই উপন্যাসের নামই তো মরণ্যার চর, এ তো রোজই একবার মরে, রোজই বেঁচে ওঠে আবার !


—দুই—


কিছু ঘটনা লক্ষ করা যাক—

অন্যান্য জেলে জেলেনীদের তুলনায় লুৎফা খুব বেশি মাছ ধরতে জানে । বিশেষ করে বোয়াল আর কাতলা । ফলে—

“…মহালদার ওর কাজে সন্তুষ্ট । মহালদার এতোই মজে গেছে লুৎফার ওপর যে, একদিন ওকে ওর কামটুঙ্গিতে যেতে বলেছিল, রাজরানি করে রাখবে বলে ।

লুৎফা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে উঠেছিল, তুই জানস না মুর সোয়ামি আছে একজন, আমি হের খাইয়াপইরা আছি, জাফর হের নাম, মুর হগ্গল কামাই ত হেরও কামাই, আমি হের বাইরে ত বেলেগ কাউরে ভাবতেই পারি না ।”…(পৃঃ-১০)

কিন্তু এখানেই শেষ নয় । জাফরের অবর্তমানে, নুরুল মহালদার লুৎফাকে আবার তার কামনার শিকার করতে চায় । দিতে চায় নানান উপঢৌকন । লুৎফা সব ফিরিয়ে দেয় ।

“…লুৎফার মাথায় আগুন চড়ে যায় । মহালদারের এতই সাহস যে সে জাফরের জায়গা নিতে চায় । জাফর চলে গিয়েছে তো কী হয়েছে, সে তো এখনও শৌহর । ওর প্রতি তার শ্রদ্ধার বিন্দুমাত্র হেরফের হয়নি ।…”(পৃঃ-২৪)

এখানে লুৎফার চরিত্রের এক ধরনের স্ববিরোধিতা লক্ষ করা যায় । যে স্বামীকে অন্যত্র গিয়ে থাকতে বলে যদি তার না পোষায়, আবার সে-ই এখানে নুরুলের সামনে পতিভক্তি দেখালো । তা কি নুরুলের হাত থেকে অব্যাহতি পাবার জন্য, নাকি ‘পতি পরম গুরু’, এই বদ্ধসংস্কারের প্রতি গভীরে প্রোথিত বিশ্বাসের জন্য ?

নাকি ছকবাঁধা চিরাচরিত নারীচরিত্র না-আঁকার অসম সাহসের ঝুঁকি না-নিয়ে লেখক এক ধরনের মান্যতা আর প্রশ্রয় দিয়ে বসলেন ‘পতি পরম গুরু’ নামক পুরুষতান্ত্রিক এক্সপ্লয়টেশনকে ? লুৎফার কণ্ঠও তো লেখকেরই ! এই জায়গাটা যেন কুণ্ডলী পাকিয়ে ফিরে এলো গতানুগতিক ছকের ভেতর । অথচ সম্ভাবনা ছিল ছক কেটে বেরিয়ে যাবার । কারণ, জাফর আর কখনোই ফিরে আসেনি লুৎফার কাছে, এমনকি গুলাফকইনাকেও সে ত্যাগই করেছে ।

প্রশ্ন উঠবে, কেন এমন কি হতে পারে না ? নিশ্চয় হতে পারে, এবং তা-ই হয়েছে । কিন্তু এই যে নারীচরিত্র, বা নারীত্বের পরাকাষ্ঠা দেখানো, বা মেনে নেয়া, এটা কি যুগ যুগ ধরে চলে আসা পুরুষতান্ত্রিক হেজিমনির চাপানো এক ভারবহ অবাস্তব অনুশাসন নয়, যা খোদ নারীরাও গভীরভাবে এখনও বিশ্বাস করে, এবং অসহনীয় হলেও মান্যতা দিয়ে থাকে ! হয়তো লেখক সেটাই দেখাতে চাইলেন— একজন নারী, এই সময়ের হলেও, কত কঠিন তার পক্ষে আদিকাল থেকে চাপানো নিষ্পেষণের কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যাওয়া ।

আরও একটা ব্যাপার খুব সুন্দর ফুটে উঠেছে । সেটা হচ্ছে গুলাফকইনার উপস্থিতি । লৈঙ্গিক বর্গ হিসেবে দেখলে জাফরের কাছে অপর (Other) হচ্ছে লুৎফা ও গুলাফকইনা । ফলে তাদের মধ্যে বিরোধাভাস সম্ভব । আবার সতীন হিসেবে গুলাফকইনা হচ্ছে লুৎফার প্রতিসত্তা বা অপরসত্তা । ফলে লৈঙ্গিক একই বর্গের হলেও এখানে বিরোধ অসম্ভব ছিল না । কিন্তু লুৎফা তাকে বিতারিত না করে আশ্রয় দেয় ।

তারা মিলিত হয়ে যায়, কারণ উভয়ই ভাগ্যবিড়ম্বিত তথা জাফর দ্বারা নির্যাতিত বা পরিত্যক্ত, বা তারা দুজনেই জাফরকে পরিত্যাগ করেছে । ফলে বাস্তবিকভাবেই গুলাফকইনা যেন হয়ে ওঠে লুৎফারই দ্বৈত সত্তা বা সহভাগী সত্তা । পরস্পর সাপেক্ষ, রেসিপ্রক্যাল, ফলে সত্তার এই দ্বিবাচনিকতায় বাখতিন কথিত সহযোগী সত্তার বাস্তবরূপ এখানে খুঁজে পাই । দু-জনে মিলেই একটা গোটা সত্তা, যা লুৎফার কর্মকাণ্ডসহ বাকি তার জীবনকে পরবর্তী প্রতিরোধের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে । গুলাফকইনাও সময়ে সময়ে সমানভাবে প্রতিস্পর্ধী হয়ে ওঠে লুৎফার সহভাগী হিসেবে ।

এবার যাব অন্য আর একটি বিষয়ে । এখানেও সেই লুৎফাই কেন্দ্রে । সেখানে আমরা পেয়ে যাই ভূত, প্রেত, জাদুটোনার প্রতি বিশ্বাসের প্রসঙ্গ । লেখক বলছেন—

“…(জাফর) জাল সারাই করতে-করতে ভাবে, লুৎফার জালটা খুব কম সারাই করতে হয় । এর পেছনে কী জাদু আছে জানে না জাফর । লুৎফা মাউছ্যা ভূতদের পোষ মানাতে পারে বলে কি ?

হুঁ, ভূতগুলোর লগে এত্তো হুলামেলা, প্যাটে একটা কেঁচুয়া আনতে ফারতাছে না, বাঞ্জা নেকি ?... … ও ভূতের মন্ত্র জানে । লুইতের যে অংশে কাতলার ছড়াছড়ি সে-অংশটি ভূতেদের জায়গা । ভূতেদের সন্তুষ্ট না-করা পর্যন্ত ওই অংশে মাছ ধরা দায় । মালোপাড়ায় একমাত্র লুৎফা ধরতে পারে মাছ । কারণ ও মন্ত্র পড়ে ভূতদের শান্ত করে, ভূতেরাই ওকে মাছ ধরতে সাহায্য করে তখন । প্রচুর কাতলা পায় সে ।…”(পৃঃ-১০)

এমনি আরেক জায়গায় দেখি—

“…লুৎফা ছেলে চেয়েছিল তার কাছে । কিন্তু সে আশা পূরণ হয়নি । অনেক কবিরাজ বৈদ্য করেছে, নিয়ে গেছে লালুংপুরের রাংখের সাধুর কাছে । অনেক টোটকা, ঝাড়ফুঁক করে শেষ কথা বলল সে-সাধু, লুৎফার গায়ে বাতাস ঢুকেছে, এ বাতাস তাড়াতে হবে, ভয়ংকরী মাকে পুজো দিতে হবে পাঁচটা মুরগি, দু-বোতল মদ আর পাঁচ কুড়ি টাকা দিয়ে ।

লুৎফা সেদিন রাতের বেলায় বিছানায় জাফরের বুকে ঘনিষ্ঠ হতে হতে বলেছিল, হাওয়া খালি মুর ভিতর হোমায়, তর ভিতরে না—

লুৎফাকে জড়িয়ে ধরতে ধরতে জবাব দিয়েছিল জাফর, আমি ত মরদ, আমার ভিতরত আবার কী হাওয়া ঢুকব ?

—হুঁ, মরদ, মরদ মাইনসের কুনো দুষ থাকতে লাই ?...” (পৃঃ-১৬)

আরও পাই—

“…লুইতের ও-পারে কলাই গাঁয়ের পিদিম মাসিমা বলেছিলেন, হুন জাফর, মা ষষ্ঠী ত’গ পতি সন্তুষ্ট নন, হেইর লাইগ্যা পোলামাইয়া হইতাছে না ত’গ, ষষ্ঠী পূজা কর, বিলাই পাল, দেখবি ঠিক বাইচ্ছা আইব ত’গ—…”(পৃঃ-১৬)

কিন্তু লুৎফা নিজে এসব কিছুই বিশ্বাস করে না । সে বলে—

“…ধুর তর কি মাথা খারাপ হইছে, উইগুলান সব বুজরুকি, এই মরণ্যা চরের কাসেমরে ত চিনছ, গোয়ালপারা কলেজে পড়ে, হে কইছিল উইসব ঝাড়ফুঁক নেকি সব বের্থা (বৃথা), পাছ করা উজারাই সাচ্চা কথা কয়…”(পৃঃ-১৬)

এই জাদুটোনা, জড়িবুটি এসব লুৎফা হয়তো বিশ্বাস করে না তার বাস্তববোধ থেকে, কিন্তু আজও এর প্রচলন বিভিন্ন সমাজের কোনো না কোনো স্তরের গভীরে ফল্গুধারার মতো বহমান । লুৎফার অধিক মাছ ধরার পেছনে হয়তো রয়েছে একজন নারীর স্বাভাবিক স্থৈর্য ধৈর্য পর্যবেক্ষণক্ষমতা ও কর্মকুশলতা, কোনো জাদুটোনা নয় । একইভাবে গুলাফকইনার ধান কাটার ক্ষিপ্রতা আর কুশলতা দেখেও জাফরের মনে হয়েছিল—

“…ওর হাতের কাঁচিটা জাদু জানে ।…” (পৃঃ-২২)

লেখক তার আখ্যানে খুব স্বাভাবিক এবং অনিবার্যভাবে এসবের আমদানি করে ছুঁয়ে গেলেন হতাশ মানুষের সেইসব ঐন্দ্রজালিক বিশ্বাসকে, যার উপস্থাপনাকে আমরা শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে জাদু-বাস্তবতা বলে চিহ্নিত করে থাকি ।


—তিন—


কিন্তু লুৎফার শরীরে সত্যিই বাতাস ঢুকেছিল । চেতনার বাতাস । যে বাতাস বহিরাগত । সে বাঁজা নয় । হয়তো তার গর্ভাশয় চায়নি জাফরের মতো কোনো মৃতবীর্য পুরুষের ঔরস । তাই সে কুড়িয়ে আনে শহর-পরিত্যক্ত এক মানবশিশু, যাকে দেখে তার ভেতরে জেগে ওঠে সেই মানবিকতা, যার ক্ষয় নেই ।

উপন্যাসের কাহিনি সাধারণত খুব একটা একমুখী বা একরৈখিক হয় না । আর হলেও স্বপ্ন আসে, অতীত আসে, ভবিষ্যৎ আসে । মূল কাহিনির পাশাপাশি খুচরো কাহিনিও আসে, যা অনিবার্য না-হলেও, মূল মোটিফ-এর সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলে । আমিনার কাহিনিটিও এমনই এক টুকরো কাহিনি, কিন্তু জুড়ে গেছে মূল কাহিনির বিবশতার ভেতর ।

স্থান আর কালের একরৈখিক পরিষেবা কখনো গোলমেলে হলেও বৈচিত্র্য নিয়ে আসে, যা অনেকসময় পাঠকের নজর এড়িয়ে যায়, আর এটাই সম্ভবত একজন ঔপন্যাসিকের ক্ষেত্রে আখ্যান নির্মাণের নিজস্ব কৌশল ।

জাফর ঘর ছেড়ে আসার পর স্মৃতিকাতর হয়ে স্বপ্ন দেখে—

“… সে মাছ ধরছে পূর্ণিমা রাতে, লুৎফা ভালোবাসছে গভীর রাত অবধি ।… …লুৎফা তো ওকে আদর করে বলত, গুমাও, গুমাও, আরও গুমাও, রাইতে ত নিজে গুমাও না, আমারেও গুমাইতে দাও না ।

অথচ লুৎফা উঠে ঘরকন্নার কাজ শুরু করে দিত, মাঝে মাঝে এসে জাফরের গায়ের চাদরটা ভালো করে গায়ে বিছিয়ে দিত…

উঠতেই হল বিছানা ছেড়ে । মহিষের পিঠে চড়ে ক্ষেতে এসে দেখে, ঠিকই, রোয়ানি ছুয়ালিরা এসে কাজ শুরু করে দিয়েছে ।…”(পৃঃ-১৭)

জাফরকে স্বপ্ন ভেঙে উঠে অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে আসতেই হয় । সময় আর পরিসরের এই বিভঙ্গ নিশ্চিতভাবেই একটি উপন্যাসের নির্মাণ-কৌশলের বিশিষ্টতা দাবি করে ।

কিঞ্চিত কার্নিভালাইজেশনের (Carnivalization)-এর ছোঁয়াও দেখতে পাই, চরুয়াদের নিয়ে উলফতের গোপন সভায় । আগামীর পরিকল্পনার ভেতর কিছু হাসি ঠাট্টা—

“—কিন্তু আফনেরার এই কয়েকজন মিল্যা কি কইর‍্যা ফারবা, সারা মরণ্যা চর ত নুরুল মহালদার আর হের হাঙ্গোফাঙ্গোর কথায় উডে বহে, ভুটের সুময় ত হেরা কম্বল-মশারি আর নগদ পাইয়া সারা বছরর দুখ্খু জ্বালা ভুইল্যা যায়—

উপস্থিত জনতা কোনো প্রতিক্রিয়া জানায় না, ধিকিধিকি কাঁপতে থাকে যেন । জনতার ভেতর থেকে কোনো এক চাষি বলে ওঠে। হ পরভু, আমরাও ত হেই কম্বল-মশারি-নগদ ফাওনের লাইগ্যা লাইন দেই—

চাষির এ-কথা শুনে জনতার ভেতর হাসির রোল ওঠে । আরেকজন বলে ওঠে, হ লাইন দেই, কিন্তুক আমরা ভুট দেই আমরার পছন্দের দলরে, দিছপুরের দলরে নয়—

এবার হাসির রোল উঠলো দ্বিগুনভাবে । …” (পৃঃ-৪১)

এই ব্যঙ্গ বিদ্রুপ খুব স্বাভাবিক জীবনের স্বাভাবিক কথাই, এখান থেকেই যেমন আসে বাঁচার ইন্ধন, তেমনি প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ । এই সব ছোটোখাটো বিষয়ের উল্লেখে, কাহিনি এগিয়ে গেছে আধিপত্যবাদীদের প্রতাপের আড়ালে আড়ালে এই লোকায়ত, এই অপর-সত্তাদের নিজেদের মুখে মুখে, চলনে বলনে, আর আখ্যানটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ক্রমশ ।

এবার আসা যায় সেই বিড়ালটির প্রসঙ্গে । লুৎফা কুড়িয়ে এনেছিল একটি মানবশিশুকে, আর জাফর এনেছিল একটা বেড়ালের বাচ্চাকে, পরে যার নামকরণ লুৎফার অনুরোধে উলফৎ করে ‘বিম’ (ভীম) । অর্থাৎ মহাভারতের সেই মহাবলী ‘ভীম’। এই প্রসঙ্গে মিথ, পুরাণকাহিনির প্রসঙ্গের অবতারণাও করে ফেললেন লেখক । এই বিমই লাফিয়ে পড়ে এক বিশেষ মুহূর্তে কোমর ভেঙে ফেলে জাফরের । দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ-এর মতো ।

“…সে আবার জাফরকে দলবল নিয়ে হামলা চালাতে বলে লুৎফার ওপর । জাফর হামলা চালায় । লুৎফা বিমকে সঙ্গে নিয়ে জাফরের আক্রমণ প্রতিহত করে । লুৎফার নির্দেশে বিম জাফরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর কোমর ভেঙে দেয় । লুৎফা মুখ ভেঙচিয়ে বলে, যা শালা তর মালিকরে গিয়ে ক এইবার হের কুমরডাও বাইঙা দিয়াম ।…”(পৃঃ-৭৬)

বিম একটা বেড়ালের বাচ্চা । কিন্তু সরকার মহলে খবর চলে যায় যে মরণ্যা চরে বাঘের আবির্ভাব হয়েছে । এমন কি ফরেস্ট ডিপার্টমেণ্ট থেকে দুজন সিপাহিও এসে যায় সেই বাঘ ধরতে । কারণ সে “…ডাকেও বাঘের মতন । মাছভাত আর দুধভাত খায় । ভীষণ ভীতু, ঘরকুনো …”(পৃঃ-৯৩)

কী বলা যায় একে ? এ তো নিঃসন্দেহে একটা প্রতীক । যদি বাঘ ধরি, তবে সে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বংশধর । বাঙালির সঙ্গে এর একটা যোগসূত্র যেন রয়েছে বলে মনে হয় । আচরণেও এমন ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে ওঠে । কারণ, সে খায় শুধু মাছভাত আর দুধভাত, উপরন্তু ভীষণ ভিতু, ঘরকুনো আর ঘুমকাতর । আমরা পাই—

“…গুলাপকইনার বড় ভয় করে বিলাইটাকে দেখে । এতো মদ্দা হয়ে উঠছে বিলাইটা যেন ওকে খেয়ে ফেলবে । এরকম খটখটে ভোম্বল বিলাই জীবনে কখনও দেখেনি সে । অথচ বিলাইটা এতো ম্যাড়ম্যাড়ে যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে পারে না । …” (পৃঃ-৬১)

এই মরণ্যা চরের সকলেই তো বাঙালি এবং মুসলিম ধর্মাবলম্বী । তাহলে এ বিলাই কোন বাঙালি ? শিক্ষিত মধ্যস্বত্বভোগী ? প্রতিবাদে এরাও আছে, সকলের সঙ্গে উত্তেজিত অবস্থায় অদ্ভুত এক উচ্চকণ্ঠে গর্জন করে এবং তারপরই আবার ঝিমিয়ে যায়, ঘুমিয়ে পড়ে ।

এই সূত্রে এই মরণ্যা চরের আরেক তাৎপর্য এসে হাজির হয় চোখের সামনে । যেন গোটা আসামের ভেতরে আরেক আসাম, যেখানে কেবল চরবাসী নয়, শুধু মুসলিম ধর্মাবলম্বী নয় বরং এই চরুয়াদের মতোই আরও অনেকই সার্বিকভাবে নিঃসহায় হয়ে বাস করছেন, এবং তাদের খণ্ড-বিখণ্ডতা নিয়েই এক অদৃশ্য মরণ্যা চর, এক অধিবাস্তবিক মেটাফর যেন ।

আবার বিলাইটা এমনও হতে পারে যে, এটা চরবাসীদেরই আরেকটি সত্তা । যে সত্তায় রয়েছে প্রতিবাদী চেতনা, যে সত্তা ইন্ধন পেলেই জেগে ওঠে, গর্জন করে, ফের অভ্যস্থ জীবনের নিদালিতে ঢলে পড়ে । স্বয়ং জাফর, যে একে নিয়ে এসেছিল, সেও সঠিকভাবে চিনতে পারে না । কারণ তার ভেতরে কোনো প্রতিবাদী চেতনা আদৌ নেই ।

“…কয়েকদিন পরই চরবাসী শোনে উলফতের ডেরা থেকে ভেসে আসছে বাঘের ডাক । চরুয়ারা আতংকিত হয়ে ওঠে । এ ডাক জাফরের কানে গিয়েও পৌঁছয় । ওর এবার সন্দেহ দূর হয় মন থেকে । ও যেটা ভেবেছে তাই । ওটা বিলাই নয়, ছোটোখাটো বাঘ । লুৎফার আদরে দুধভাত খেতে খেতে বড় হয়েছে, ওটার রাগ নেই, স্বভাব বিলাইয়ের মতোই । আকবরের খুব লাইয়ে, অনুগত । একেবারে পুষ্য বনে গেছে যেন । যদি সেটাই হয়ে থাকে তবে তো মুশকিল । এটাকে এখান থেকে বিদায় দিতেই হবে । …” (পৃঃ-৭১)

এটা চরুয়াদের মধ্যে জেগে ওঠা বিপ্লবচেতনাই যেন, যাকে গভীর বিপদ বলে ভাবছে জাফর, যে জাফর এখন নুরুল মহালদার তথা কায়েমী স্বার্থের দালাল । আকবর আর বেড়াল দুজনেই মূলত বহিরাগত এবং তাদের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য ঘনিষ্ঠতার তাৎপর্যে কোনো ইঙ্গিত যদি এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে তবে তা চর-অভ্যস্থ চেতনার কাছে নতুন বার্তার সমতুল্য ধরে নেয়া যায় । আকবর লুৎফার কুড়িয়ে পাওয়া মানবশিশু, কিন্তু লুৎফার বুকে দুধ নেই ফলে সে প্রতিপালিত হয় সোনাভাবির স্তন্য পান করে । হয়তো এখানেও রয়েছে কংস ধ্বংসের জন্য মারক ও কারক গ্রহের কৃষ্ণছায়া !

এমন হোক বা অন্য কিছু হোক, কিন্তু একটা তীব্র ব্যঙ্গ যে এখানে আছে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই ।


—চার—


আরও নিবিষ্টপাঠে হয়তো আরও গ্রন্থিমোচন করা যাবে, এমন মনে হয়েছে আমার । কিন্তু সেক্ষেত্রে এই রচনা অত্যন্ত ভারবহ হয়ে যাবে, হারিয়ে যাবে আখ্যানের মূল অন্বেষণ ।

সবকিছু মিলিয়ে এই সময়ের প্রেক্ষিতে আখ্যানটি যে একটি ব্যতিক্রমী রচনা শুধু নয়, একটি শক্তিশালী প্রতিবাদ, এতে কোনো সন্দেহ নেই । উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ক্ষেত্রে তো বটেই, তথা গোটা বাংলা-সাহিত্যকৃত্যের মধ্যে এটি অবশ্যই সেই প্রয়াসের বিশেষ একটি দৃষ্টান্ত, যা উপনিবেশোত্তর কালের উপন্যাস দাবি করে ।

এই লেখকের আরও উপন্যাস আছে । সেগুলো আমার পড়া নেই, ফলে বলতে পারছি না আলোচ্য গ্রন্থে লেখকের যে অভিসন্ধান রয়েছে, তার ধারাবাহিকতা আগেও কোথাও রয়েছে কিনা ।

সুন্দর এবং যথাযত প্রচ্ছদ করে দিয়েছেন শ্রী পার্থপ্রতিম আচার্য ।

আর কিছু বলা আমার সাধ্যের বাইরে । তাই এখানেই ইতি ।




মরণ্যা চরের ইতিকথা : কুমার অজিত দত্ত প্রকাশক : অর্চনা দত্ত / স্বরের আড়ালে শ্রুতি প্রকাশনী / মাধবশঙ্কর হাউসিং কমপ্লেক্স / পাণ্ডবনগর / বরিপাড়া / পাণ্ডু / গুয়াহাটি-৭৮১০১২ । বিনিময় ২০০ টাকা ।