রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

​বাংলা গানের সেকাল-একাল - ৩

তিন

মধ্যযুগের গান

প্রাক আধুনিক যুগ বা মুঘল যুগের শেষ পর্বে বাংলা কাব্য সঙ্গীতে আবির্ভাব হয়েছিল রায়গুণাকর ভরত চন্দ্রের (১৭১৩-১৭৬১) । তাঁর রচিত ‘বিদ্যাসুন্দর’ কা্ব্যে, আদিরসের প্রাধান্য থাকলেও এটি মধ্যযুগের বাংলা সঙ্গীত ধারার উল্লেখযোগ্য নিদর্শন রূপেই মান্য ।প্রায় সমকালেই সৃষ্ট হয়েছিল হরু ঠাকুর (১৭৩৯) প্রবর্তিত ‘কবিগান’, আর অষ্টাদশ শতকে বাংলা গানে আধুনিক কাব্য সঙ্গীতের ছন্দময়তা প্রথম আসে রামপ্রসাদ সেনের শ্যামা বিষয়ক গানে ।

রায়গুণাকর ভারত চন্দ্র

রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায় মধ্যযুগের মঙ্গল কাব্যের সর্বশেষ কবি । আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অগ্রদূতের মর্যাদা পান ভারতচন্দ্র । জন্ম পরিচয়ে ভারতচন্দ্রের পদবী মুখার্জী ভারতচন্দ্রের পূর্বপুরুষেরা বিত্তবান এবং ক্ষমতাশালী হওয়ায় সমাজে তাঁরা রায় পরিবার নামে সম্মানিত ছিলেন। পিতা নরেন্দ্রনারায়ণ রায়ের কনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন ভারতচন্দ্র, মাতা ভবানী দেবী। নরেন্দ্রনারায়ণ ছিলেন হাওড়া জেলার অন্তর্গত পেড়ো গ্রামের জমিদার । বর্ধমানের মহারাণীর সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে নরেন্দ্রনারায়ণ আর্থি দুর্দশাগ্রস্ত হন, এই সময় ভারতচন্দ্র পালিয়ে তাজপুরে মাতুলালয়ে চলে যান । ঘটনাবহুল জীবন ছিল ভারতচন্দ্রের । ভাগ্য অন্বেষণে নানান স্থানে পর্যটন করেন । পুরি বা নীলাচলেও অবস্থান করেন দীর্ঘ দিন । অবশেষজ তাঁর পান্ডিত্য ও কবিত্ব শক্তিতে মুগ্ধ হয়ে ভারতচন্দ্রকে চল্লিশ টাকা বেতনে তাঁর সভাকবি নিযুক্ত করেন, তখন ভারতচন্দ্রের বয়স চল্লিশ বছর । মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আদেশে ভারতচন্দ্র রচনা করেন তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্য ‘অন্নদামঙ্গল’ । ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যের ৩টি খন্ড। প্রথম খন্ড, সতীর সঙ্গে শিবের বিবাহ এবং তাঁর পিতা দক্ষ কর্তৃক আয়োজিত মহাযজ্ঞের ধ্বংসলীলার উপাখ্যান। দ্বিতীয় খন্ড, কালকেতু এবং তার উপাসনার মধ্য দিয়ে দেবী অন্নদার পৃথিবীতে আবির্ভাবের উপাখ্যান,এবং তৃতীয় খন্ড - বর্ধমানের রাজকন্যা বিদ্যা এবং যুবরাজ সুন্দরের কলঙ্কজনক অবৈধ প্রণয়-উপাখ্যান।১৭৫২ সনে ভারতচন্দ্র অন্নদামঙ্গল রচনা করতে শুরু করেন। একজন ব্রাহ্মণ তাঁর রচনা লিখে রাখেন ও নীলমণি সমাদ্দার নামে এক গায়ক তাতে সুর দেন। এরপরে রাজার আদেশে তিনি বিদ্যাসুন্দর রচনা করেন। এছাড়াও সত্যপীরের কথা, নাগাষ্টক,ইত্যাদি রচনা করেন। ‘অন্নদামঙ্গল’কাব্যের অনেক পংক্তি প্রবাদ হয়ে গেছে, আজও আমরা আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তায় প্রয়োগ করে চলেছি, যেমন : ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’, ‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন, ‘অতি বড় বৃদ্ধ পতি সিদ্ধিতে নিপুণ/ কোন গুণ নাই তার কপালে আগুন , ‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন’,

ভারতচন্দ্র সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করেছেন “রাজসভাকবি রায়গুণাকরের অন্নদামঙ্গল-গান রাজকণ্ঠের মণিমালার মতো, যেমন তাহার উজ্জ্বলতা তেমনি তাহার কারুকার্য” । আবার বিদ্যাসুন্দ্র কাব্যে আদিরসের প্রাধান্য থাকায় বিরূপ মন্তব্য কছেন যে “বিদ্যাসুন্দরের কবি সমাজের বিরুদ্ধে যথার্থ অপরাধী”।‘বিদ্যাসুন্দর’গানে আদিরসের প্রাধান্য ছিল সেই জন্যই উনিশ শতকের নব্য বাবু সম্প্রদায়ের কাছে বিদ্যাসুন্দরের গান খুবই কদর পেয়েছিল । সেই সময় বাঙালির নতুন বিনোদন থিয়েটারের গানে বিদ্যাসুন্দর গানের সুর নেওয়া হত ।

১৭৬০ খৃষ্টাব্দে ভারতচন্দ্রের মৃত্যু হয় মাত্র ৪৮ বছর বয়সে । এবং তাঁর মৃত্যুর সঙ্গেই বাংলা সাহিত্য-সঙ্গীতে মধ্যযুগের অবসান ঘটে ।

রামপ্রসাদসেন

রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র যখন নানা দুর্বিপাকে নিজভূমি থেকেপালিয়ে বেড়াচ্ছেন, সেই সময়কালে আবির্ভাব রামপ্রসাদ সেনের । অষ্টাদশ শতকে বাংলা গানে আধুনিক কাব্য সঙ্গীতের ছন্দময়তা প্রথম আসে রামপ্রসাদ সেনের শ্যামা বিষয়ক গানে ।আজ আড়াইশ বছর পরেও সে গানের প্রতি বাঙালির মুগ্ধতা কিছুমাত্র কমেনি । ”মন রে কৃষিকাজ জানোনা / এমন মানব জমীন রইলো পতিত / আবাদ করলে ফ’লতো সোনা” এ শুধু সঙ্গীত ছন্দই নয়, আধুনিক কাব্যের মত এক দার্শনিক সত্যকেও প্রকট করে । এবং কখন ? যখন কলহ প্রবণ, পরশ্রীকাতর, আত্মমর্যাদাহীন বাঙালি খাল কেটে কুমির আনার মত ঔপনিবেশিক শক্তিকে তাদের নয়া শাসনকর্তা রূপে আহ্বান জানাতে চলেছে ।

রামপ্রসাদ সেনের জন্ম এখনকার উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার হালিশহরে । পিতা রামরাম সেন ছিলেন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক । পিতা চেয়েছিলেন পুত্র চিকিৎসা পেশা গ্রহণ করুক কিন্তু রামপ্রসাদের তাতে কোন আগ্রহ ছিলনা । তার আগ্রহ ছিল সাহত্য ও সঙ্গীতে । কৈশোরেই রামপ্রসাদ সংস্কৃত, ফারসি, হিন্দি ও বাংলা ভাষায় জ্ঞানার্জন করেন, ফলে তাঁর সাহিত্য ও সঙ্গীত চর্চার পথ প্রশস্ত হয় । পিতার মৃত্যুর পর রামপ্রসাদ উপার্জনের আশায় কলকাতায় আসেন ও জনৈক ধনাঢ্য ব্যক্তির মুহুরির কাজে নিয়োজিত হন । ভাবুক ও উদাসিন রামপ্রসাদের ভক্তিভাব ও কবিত্ব শক্তির পরিচয় পেয়ে সেই ধনাঢ্য ব্যক্তি রামপ্রসাদকে তাঁর মুহুরির কাজ থেকে অব্যাহতি দেন এবং তাকে মাসিক ত্রিশ টাকার বৃত্তিসহ হালিশহরে ফিরে গিয়ে সঙ্গীত সাধনায় মনোনিবেশ করার পরামর্শ দেন । রামপ্রসাদ নিজগ্রাম হালিশহরে ফিরে এসে সাধনা এবং সঙ্গীত রচনায় নিমগ্ন হন। নিজের গানে নিজেই সুর দিয়ে মাধুর্যভরা কণ্ঠে তিনি গেয়ে শোনাতেন। তখন নবদ্বীপেরাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় রামপ্রসাদের কবিত্ব ও সঙ্গীতখ্যাতির কথা শুনে তাঁকে নিজের রাজসভায় যোগদানের আহবান জানান।ভারতচন্দ্র তখন কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি। কিন্তু বিষয়বিমুখ রামপ্রসাদ রাজসভায় যোগদানে সম্মত হননি । তা সত্ত্বেও কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর ভরণ-পোষণের জন্য তাঁকে একশত বিঘা নিষ্কর জমি দান করেন এবং ‘কবিরঞ্জন’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

তাঁর গানের ভাষা সহজ, কিন্তু ভাব গভীর, আবেগমন্ডিত। তিনি ভক্তিভাব এবং রাগ ওবাউল সুরের মিশ্রণে এক ভিন্ন সুরের সৃষ্টি করেন, যা বাংলা সঙ্গীতজগতে ‘রামপ্রসাদী সুর’ নামে পরিচিত। রামপ্রসাদ নিজে এই সুরে কালী বা শ্যামার উদ্দেশে অনেক সঙ্গীত রচনা করেন, যা শ্যামাসঙ্গীত নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে তিনি বাংলা গানের জগতে প্রাচীন সুরের পাশাপাশি রাগসুরও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন।

রামপ্রসাদের গানে আছে দুঃখবাদ । দুঃখবাদ বাউলের গানেও আছে ।

  • “বাউলের সুরের দুঃখবাদ ও রামপ্রসাদের দুঃখবাদে এই প্রভেদ । বাউল মানুষকে প্রতিপদে শত দুঃখ দেখাইয়া শ্মশানের নির্বাণটাকে শেষ আশ্রয় স্বরূপ মনে করিয়াছে, রামপ্রসাদের দুঃখবাদে সংসারের শত দুঃখের প্রতি ইঙ্গিত থাকিলেও তাহা যে মাতৃ-পাদপদ্মের স্মরণ লইলে দূর হয় তাহা জোরের সহিত বলা হইয়াছে । এই নিছক সত্য, এই নির্ভর আত্মোৎসর্গময় সঙ্গীত এককালে সমস্ত বাঙ্গালা দেশকে জয় করিয়াছিল ...। হাটে মাঠে ঘাটে এই সকল গানের সুধা হরির লুটের মত তিনি বিলাইয়া গিয়াছেন”( হালিশহরে রামপ্রসাদের স্মৃতিসভায় ভাষণ / ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ – আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন )

রামপ্রসাদের সঙ্গীত রচনার সময়কালে বাংলার সমজ জীবনে ঘটে গিয়েছিল বিপর্যয় । বর্গী হানায় (১৭৫২) গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়েছিল, পলাশীর যুদ্ধে বিদেশী বণিকের ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি রচনা এবং ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম মন্বন্তর (১৭৬৯) । এমনই এক সময়ে রামপ্রসাদের গান হয়ে উঠেছিল মানুষের এক আশ্রয় । রামপ্রসাদ বৈষ্ণবদের ভাব আত্মস্ত করে কঠোর শাক্ত ধর্মকে কোমলশ্রী দান করেছিলেন । পন্ডিত দীনেশচন্দ্র সেন ‘বৃহৎবঙ্গ’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন “রাজনৈতিক বিপ্লব ও দুর্ভিক্ষাদি নানা বিপদে পড়িয়া বাঙ্গলা তখন নয়নজল দিয়া মাতাকে তখন পূজা করিতে চাহিয়াছিল – রামপ্রসাদের গান সেই শত সহস্র বঙ্গসন্তানের নয়নজল – আকুল কন্ঠের ‘মা’ ডাক” । বিস্ময়কর এই যে, প্রায় আড়াইশো বছর আগে লোকান্তরিত রামপ্রসাদ সেন আজও বেঁচে রয়েছেন তাঁর গানে । তাঁর গান যেন উদার আকাশের বিশালতা, সুরের মাধুর্যে মনের সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণা, বিক্ষোভ বিদ্বেষ মুছে দেওয়ার শক্তি নিয়ে এখনও বাংলার কাব্যসঙ্গীতের ভান্ডারে অক্ষয় ঐশ্বর্য হয়ে রয়েছে ।

রামপ্রসাদ তাঁর সৃষ্টির মধ্যগগনে থাকাকালীন আরো আধুনিকতার ছোঁয়া নিয়ে এলো ‘বাংলা টপ্পা গান’, প্রবর্তন করলেন রামনিধি গুপ্ত বা নিধু বাবু (১৭৪২ – ১৮২৯) । বাংলা গান পৌছালো প্রাক-আধুনিক যুগে । সে প্রসঙ্গ বলা যাবে পরের সংখ্যায় ।

(আগামী সংখ্যায়প্রাক-আধুনিক যগের গান – নিধু বাবু, গোপাল উড়ে ও দাশরথি রায়)

চলবে ...