রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

​বাংলা গানের সেকাল-একাল দ্বিতীয় পর্ব

বাঙালির প্রথম গান – কীর্তন

‘কীর্তন হচ্ছে রত্নমালা রূপসীর গলায়’ – রবীন্দ্রনাথের এই মন্তব্য দিয়েই শুরু লরি ।

কীর্তন বাংলার আদি গান, বাঙালির নিজস্ব সঙ্গীতধারা । এমনকি কীর্তন গানের সঙ্গে যে যন্ত্রের ব্যবহার হয় সেই মৃদঙ্গ ও করতাল একান্তভাবেই বাংলার ।কীর্তন শব্দটির সাধারণ অর্থ বর্ণনা বা কথন। তবে সঙ্গীতের আলোচনায় কীর্তন শব্দটির বিশেষ অর্থ ও তাৎপর্য আছে । শ্রীমদ্ভাগবতে একটি শ্লোক এই অর্থের ইঙ্গিত আছে । পীতবাস পরিহিত কৃষ্ণ বেণু বাজাতে বাজাতে নিজ লীলাভূমি বৃন্দাবনে প্রবেশ করলেন তখন তখন গোপগণ চারিদিকে তাঁর কীর্তিগান করছিল । অর্থাত শ্রীকৃষ্ণের কীর্তিগানই কীর্তন ।

চৈতন্যদেবের আবির্ভাবে প্রবল ভক্তিরসে মথিত হয়েছিল বাংলা । সেই সময়কালকে বাংলার প্রথম নবজাগরণ । চৈতন্যদের বাংলায় ভক্তি আন্দোলনের প্রবর্তক । যদিও বাংলায় ভক্তিবাদের প্রচার চৈতন্য-পূর্ব ঘটনা । দ্বাদশ শতকে জয়দেবের গীতগোবিন্দ, চন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মালাধর বসুর শ্রীকৃষ্ণবিজয় সৃষ্টি হয়েছিল চৈতন্য আবির্ভাবের পূর্বে । শ্রীচৈতন্যের চরিতকাররা বলেন চৈতন্যদেবই কীর্তন গানের স্রষ্টা। চৈতন্যের আবির্ভাবের পূর্বেও কীর্তন গানের প্রচলন ছিল কিন্তু ভক্তি-সাধন পদ্ধতি হিসাবে কীর্তনের বিশিষ্ট রূপ ও পরিণতি শ্রী চৈতন্যদেবের প্রভাবে ।

ধারনাগতভাবে কীর্তন আদতে লোকসঙ্গীত । বিশেষ একটি অঞ্চলের পল্লীগীতি গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের মাধ্যমে অনুশীলন ও পরিশীলনের মধ্য দিয়ে শিল্পসঙ্গীতের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে ।

বিশিষ্ট লোকসঙ্গীত ও লোকসাহিত্য গবেষক আশুতোষ ভট্টাচার্য উল্লেখ করেছেন,

  • “কীর্তনের শিল্পসম্মত রূপ বাংলার লোকসঙ্গীতকে নানাভাবে প্রভাবিত করিয়াছে । পল্লীগীতির সাধারণ সুরের স্তর হইতেই ইহার উদ্ভব হইয়াছে” । চৈতন্য দেবের মৃত্যুর পর ১৫৮২ খৃস্টাব্দে নরোত্তম দাস ঠাকুর প্রবর্তন করেন ‘কীর্তন’ গানের । সমকালে মুঘল সম্রাট আকবর বাদশার দরবারে, মিয়া তানসেন উজ্বলতম রত্ন রূপে বিরাজমান । শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কীর্তন গানের কোন শিকড় নেই, সেই কারণেই ভারতীয় সঙ্গীতশাস্ত্রে কীর্তন গানের কোন উল্লেখ নেই । ‘সঙ্গীত চিন্তা’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন”আত্মপ্রকাশের জন্য বাঙালি স্বভাবতই গানকে অত্যন্ত করে চেয়েছে । সেই কারণে সর্বসাধারণে হিন্দুস্থানী সংগীতরীতির একান্ত অনুগত হতে পারেনি । সেই জন্যই ...... বহুমূল্য গীতোপকরণ থাকা সত্বেওবাঙ্গালিকে কীর্তন সৃষ্টি করতে হয়েছে । গানকে ভালোবেসেছে বলেই সে গানকে আদর করে আপন মনের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করতে চেয়েছে” ।

শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন লীলা অবলম্বনে যে কীর্তন গান গীত হয় তাকে বলা হয় লীলাকীর্তন । চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস প্রমুখের মহাজন পদাবলী লীলাকীর্তনের রসবস্তুকে ৬৪ প্রকার রসে বিন্যস্ত করেছেন যেমন জন্মলীলা, বাল্যলীলা, গোষ্ঠলীলা, পূর্বরাগ, অভিসার, রাসলীলা, কুঞ্জভঙ্গ, মানভঞ্জন, মাথুর, ঝুলন, বসন্ত, হোরি ইত্যাদি । এক একটি রসের বিভিন্ন মহাজন পদের সমাবেশে সেই রসের পালা সাজিয়ে কীর্তন গান গীত হয় যাকে বলি পালা গান বা পালা কীর্তন । শ্রী গৌরাঙ্গদেব কীর্তনের জনক, তাই প্রত্যেক পালা গানের পূর্ব গৌরাঙ্গদেব বিষয়ক একটি পদ গাওয়া হয় যাকে বলা হয় ‘গৌরচন্দ্রিকা’ । গৌরচন্দ্রিকা ভিন্ন পালাকীর্তন গীত হয় না ।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় মধ্যযুগের অধিকাংশ সঙ্গীতধারা অবলুপ্তি হয়েছে কিন্তু বাঙালির আদি গান কীর্তন চিরকালীন গানের মর্যাদা পেয়েছে । অতিক্রান্ত পাঁচশো বছরের সঙ্গীত পরম্পরায় কীর্তনের সুর আজও অমলিন, বাঙালি কোনদিন কীর্তনের সুর থেকে সরে যায়নি ।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর অসংখ্য গানে বাণীর সঙ্গে কীর্তনের সুরের সার্থক প্রয়োগ করেছেন । তিনি বারংবার কীর্তনের সুরের কাছে তাঁর ঋণ স্বীকার করেছেন । রবীন্দ্রনাথের সংগীতচিন্তায় কীর্তন বিশিষ্ট মর্যাদায় আসীন । ‘সংগীতচিন্তা’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ? “কীর্তনে জীবনের রসলীলার সঙ্গে সংগীতের রসলীলা ঘনিষ্ঠভাবে সম্মিলিত । জীবনের লীলা নদীর স্রোতের মতো নতুন নতুন বাঁকে বাঁকে বিচিত্র । ডোবা বা পুকুরের মতো একটি ঘের-দেওয়া পাড় দিয়ে বাঁধা নয় । কীর্তনে এই বিচিত্র বাঁকা ধারার পরিবর্ত্যমান ক্রমিকতাকে কথায় ও সুরে মিলিয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছিল” ।

গত শতকে গান বিপণন সামগ্রী হয়ে ওঠার পর অর্থাৎ কলেরগান ও গ্রামফোন রেকর্ডের চল হবার পর বাঙালির ঘরে ঘরে কীর্তন গান পৌছে গিয়েছিল । গ্রামফোন রেকর্ডে কীর্তন গানের প্রথম সার্থক শিল্পী ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র দে । তারপর রথীন কুমার ঘোষ, ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়, রাধারাণী দেবী থেকে আজকের অদিতি মুন্সী পর্যন্ত অসংখ্য শিল্পী কীর্তন গানে বাঙালির সংগীতভান্ডারকে ঐশ্বর্যমন্ডিত করেছেন ।

আগমনি গান

কীর্তনের মত আগমনিও বাংলার আপন গান । আগমনি গানের একটা উপলক্ষ্য আছে, তা হল শারোৎসবের প্রাক্কালে পার্বতীর মাতৃগৃহে আগমন উপলক্ষ্যে আগমনি গাওয়া হয় । শরৎকালে দুর্গাপূজার সময় গিরিরাজকন্যা পার্বতীর পিতৃগৃহে আগমন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আগমনি গান রচিত হয় । আগমনি গানের ক্ষেত্রটিওধিকার করে আছে হর-পার্বতী । কিন্তু আগমনি ধর্মসঙ্গীত নয় । এ গানের মধ্য দিয়ে বাঙালির চিরন্তন বাৎসল্য রসের বিকাশ হয়েছে । আগমনি গানে বাৎসল্য ও করুণরসের অপূর্ব সমাবেশ দেখা যায়। এ গানের বিষয়বস্ত্ত পল্লীবাংলার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আগমনি গানের মধ্য দিয়ে বাঙালির ঘরের কথা, তার গার্হস্থ্য জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা এবং বাস্তবতার এক নিখুঁত চিত্র পাওয়া যায় এসব গানে। বাঙালি পরিবারের কন্যা ও জামাতাগৃহের বিরোধের কথাও এতে সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে । আগমনি গানের অনুপ্রেরণা এসেছে বৈষ্ণব গীতি কবিতা থেকে । তবে বৈষ্ণব কবিতায় থাকে ব্যক্তিগত অনুভুতির প্রাধান্য আর আগমনি গানে থাকে সার্বজনীনতার সুর । এই প্রসঙ্গে পন্ডিত দীনেশচন্দ্র সেনের উক্তি স্মরণ করি ।

‘বৃহৎবঙ্গ’ পন্ডিত দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন,--

  • “বাংলার অন্তঃপুরের মর্মোক্তি ও বাঙালি জীবনের নিগূঢ ভাবের প্রস্রবন হইতে এই আগমনি গানের ধারা বহিয়া আসিয়া শিব সমাধির স্বর্গলোক স্পর্শ করিয়াছে । যাঁহারা আগমনি গান বুঝেন নাই, তাঁহাদের পক্ষে বাংলা দেশের অষ্টাদশ শতাব্দীর ইতিহাস বুঝিতে বিলম্ব হইবে” ,

আগমনি গানের শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন রামপ্রসাদ সেন । রামপ্রসাদ সেনে্র আগমনি গান সম্পর্কে পন্ডিত দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর ‘বৃহৎ বঙ্গ’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন “রামপ্রসাদের সুরে লক্ষ লক্ষ বিপন্ন সন্তানের ‘ ডাক মূর্ত হইয়া উঠিয়াছে – সমস্ত বাংলা দেশ তাঁহার গানে সাড়া দিয়াছে” । পবর্তী সময়ে আরো যাঁরা এ গান রচনায় বাংলার সঙ্গীতভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কমলাকান্ত ভট্টাচার্য (আনু. ১৭৭২-১৮২১), রামবসু (১৭৮৬-১৮২৮) ও দাশরথি রায় (১৮০৬-১৮৫৭) প্রমুখ ।

প্রাক-আধুনিক যুগ বা মুঘল যুগের শেষ পর্বে বাংলা কাব্য সঙ্গীতে আবির্ভাব হয়েছিল রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র (১৭১০-১৭৬১) ও রামপ্রসাদ সেনের (১৭২১-১৭৮১) । প্রায় সমকালেই সৃষ্ট হয়েছিল হরু ঠাকুর (১৭৩৯) প্রবর্তিত ‘কবিগান’ । অষ্টাদশ শতকে বাংলা গানে আধুনিক কাব্য সঙ্গীতের ছন্দময়তা প্রথম আসে রামপ্রসাদ সেনের শ্যামা বিষয়ক গানে । এঁদের কথা বলা যাবে আগামী পর্বে।

চলবে ...

আগামী পর্বে ‘মধ্য যুগের গান’