রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

​প্রসঙ্গ ‘এন-আর-সি’ : কিছু কথা, কিছু জিজ্ঞাসা.., প্রথম ভাগ

প্রসঙ্গ ‘এন-আর-সি’ : কিছু কথা, কিছু জিজ্ঞাসা...

কুমার অজিত দত্ত

এই নাগরিকপঞ্জি নবায়ন করার ক্ষেত্রে আসুর (All Assam Students Union) দাবি সঙ্গত। কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে। যে সমস্যা সমাধানের জন্য তাদের এই পদক্ষেপ সেই সমস্যা তো আরও বেড়েই গেল। প্রথম নাগরিকপঞ্জি তৈরি হয়েছিল ১৯৫১ সালে।আজ থেকে ৬৮ বছর আগে। আদমসুমারির মতো নাগরিকপঞ্জিও দশ বছর পর পর নবায়ন করতে হয়।এটাই আমরা জানি। অথচ নাগরিকপঞ্জির ক্ষেত্রে এ নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। যারফলে এখন যে ভয়াবহ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে সারা অসম সে-সমস্যা তখন থেকেই একটু একটু করে এই ভয়াবহতার দিকে এগিয়ে এসেছে। ২০১৮ তে যে নবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হল তাও আসুর চাপে পড়ে। আসু চাইছে অসম চুক্তি মেনে অর্থাৎ ২৫ মার্চ ১৯৭১ এর পর যারা বাংলাদেশ থেকে অসমে এসেছে তাদের নাম বাদ দিয়ে নাগরিকপঞ্জি নবায়ন করতে । এবং এই দাবিসহ নাগরিকপঞ্জি নবায়নের ওপর জোর দেওয়া হল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৭ বছর পর। এতোগুলো বছর সরকার ও এই ছাত্রসংস্থা জেগে ঘুমিয়ে ছিলেন কি? যদি ২৫ মার্চ ১৯৭১-এর পর আসা এধরনের কোনও প্রমাণ তাদের হাতে থেকেই থাকে তাহলে কী-ভাবেই বা এই বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকে সেই মানুষগুলোর প্রব্রজন ঘটল? বাধা দেওয়া হয়নি কেন তাদের? এইসব প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে আসা ভিটেমাটি ছাড়া অথবা পেটের দায়ে আসা গরিবগুরবো অভাবী মানুষগুলোর প্রতি কি সত্যি সহানুভূতিশীল ছিলেন তৎকালীন ভারত সরকার? আসুর বক্তব্য যদি ধরা হয়, কী-ভাবেই বা ভোটার তালিকায় এদের নামও উঠে যায়? দীর্ঘ ৪৭ বছর পর , যে সময়ের ভেতর একটা নতুন প্রজন্মেরও সৃষ্টি হয়ে যায়, এতগুলো মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে না কি ? অমানবিকও। এতগুলো মানুষ যাবে কোথায়? যথা সময়ে সীমান্তে বাধা দিলে এ পরিস্থিতি কখনোই সৃষ্টি হতো না। এখানেই তো ওরা শেকড় গেড়েনিয়েছে কোনও রকম বাধা পায়নি বলেই। সরকারই বা কোথায় ঠেলে দেবে ওদের আজ! এতগুলো বছর পর বাংলাদেশ সরকারও কি ফিরিয়ে নিতে রাজি হবেন? এইসব মানুষগুলোকে কি কুকুর-বেড়াল, গরু-ছাগল ভাবা হচ্ছে যে, লাঠি দেখিয়ে তাড়িয়ে দিলেই হবে। নাকি পেশিশক্তি প্রয়োগ করা হবে ওদের ওপর!ভুল তো করেছেন সরকার।ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, অসমে যুগে যুগে প্রব্রজনকারীরা এসেছে,এই যেমনআহোম,মায়ামরিয়া,মোঘল,শিখ...। বিভিন্ন সঙ্গত কারণে, অর্থনৈতিক,সামাজিক, রাজনৈতিক...।এইভাবে বাঙালিদেরও আগমন ঘটেছিল আহোম যুগে আহূত হয়ে, ব্রিটিশ-ভারতের যুগে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির আমলে, ইংরেজ প্রশাসনের কাজ নিয়ে,অসমের চরগুলোতে চাষবাসের কাজে আহূত হয়ে, এরপর দেশ বিভাগ, দাঙ্গা, প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে উদ্বাস্তু হয়ে,তারপর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ারপরবর্তী কয়েকটা দিশেহারা বছর, অর্থনৈতিক দুর্দশা, পাকিস্থানপন্থী মৌলবাদীদেরঅত্যাচার ইত্যাদি কারণে ছিন্নমূল হয়ে...। সুতরাং এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, এতোগুলো মানুষের কেউই সাত পুরুষের শ্যামলা-সুফলা ভিটেমাটি ছেড়ে নাচতে নাচতে চলেআসেনি এই অনিশ্চয়তার বিদেশ-বিভূঁইয়ে ।

এই ‘এন-আর-সি’র ডামাডোলে অসমের আকাশে-বাতাসে শোনা যাচ্ছে একটি শব্দ ‘খিলঞ্জিয়া’ অর্থাৎ ভূমিপুত্র। এই ‘খিলঞ্জিয়া’ কারা? শুধু অসমিয়ারাই কি,বাঙালিরা নয়? অসমের সব বাঙালিকেই কি দেশ ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল এখানে? যারা নিজেদের সুবিধা মতো ‘খিলঞ্জিয়া’র সংজ্ঞা তৈরি করছেন তাদের উচিত নিরপেক্ষ মানসিকতা নিয়ে অসমের প্রাচীন ইতিহাস ও ভূগোলটা খুঁটিয়ে পড়া।নয়তো অন্তর্নিহিত সমস্যা বাড়তেই থাকবে।আশ্চর্য, সেই গত শতকের ষাটের দশক থেকে অসমিয়া সাধারণ সমাজে একটা ফোবিয়া রটিয়ে আসা হচ্ছে এই বলে যে, বাঙালিরা অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতিকে গিলেখাবে! সেই রেওয়াজ আজও চলছে! এবং এই রেওয়াজের পেছনে কাজ করে একটি ন্যস্ত স্বার্থ।ভোগবাদী রাজনৈতিক স্বার্থ। এই ফোবিয়া অনেকটা শিশুদের জুজুবুড়ির ভয় দেখানোর মতো।অসমিয়া সাধারণ সমাজের মধ্যে সহজেই ছড়িয়ে পড়ে এই ভয়।এবং ওদের এই আশ্বাসও দেওয়া হয় এই বলে যে, তাদের(যারা ভয় দেখায়) মসনদে জিতিয়ে আনলে এই ভয় দূর হয়ে যাবে। আবার কখনো কখনো বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে বাঙালিদের মধ্যেও ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় এই বলে যে, তোমরা কিন্তু যখন–তখন বিদেশি আখ্যা পেয়ে যেতে পার । সুতরাং আমাদের দলকে মসনদে জিতিয়ে আনলে তোমরা নিশ্চিন্তে থাকবে। এইভাবে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়। সমস্যা যে কূলে ছিল সে কূলেই থেকে যায়। মজা লুটে ন্যস্ত স্বার্থ।বছরের পর বছর এই সমস্যাগুলোকেই ক্যাপিটেল করে ওরা।অসমিয়া সাহিত্য-সংস্কৃতির ভিত্তিভূমিটি যে ক্রমশ দৃঢ় হচ্ছে, উন্নত হচ্ছে তার বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা, এক্ষেত্রে পৃথিবীর ভাষার ইতিহাসে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির অবস্থান যে উজ্জ্বল স্তম্ভের মতোই, অসমিয়া ভাষাসংস্কৃতি যে কখনোই হারিয়ে যাবার নয়, অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির পরিধি যে ক্রমশ বাড়ছে সমাজ-বিজ্ঞানের নিজস্ব নিয়মেই-- এই তথ্যগুলি সাধারণ অসমিয়া সমাজ জানে না, প্রচারিত হয় না। কিন্তু যখনই তাদের জানানো হয় যে, তাদের অতি আদরের এই অসমিয়া ভাষাসংস্কৃতি বিপদের মুখে।

চলবে ...