রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

​দীপু ও কাবুল কাকা



নিঃঝুমপারা দুপুরটাতেদীপুর মোটেই ঘুম আসে না, পাশে মামনি ঘুমে অসাড়,ইয়াব্বড় কোলবালিশটার ওদিকে মামনির নিঃশ্বাসের ওঠানামা শোনা যায় শুধু। পা টিপেটিপে পুরোনো আমলের পালঙ্ক থেকে নিচে নেমে আসে সে,তারপর এক দৌঁড়ে ঘর,বারান্দা,রোয়াক পেরিয়ে ঠাম্মির ঘরের কাছে,এখানেই যা একটু ভয়ের ব্যাপার আছে। বুড়ির চোখে ঘুমই নেই।গোটা দুপুর হয় জাতি দিয়ে সুপুরি কাটবে কুচকুচ,নয় তেতুঁল
বীজ ছাড়াবে,নয় গৌরাঙ্গের কাপড় কুচিয়ে রাখবে। কখনো বড়ি দেয় বাইরের দাওয়াতে বসে। দীপুকে দেখলেই ডাক ছাড়বে,

"ও খোকা, যাস কুথা?একটুস ঘুমো না মানিক আমার!"

ঠাম্মির চোখে ধুলো দিয়ে এই অংশটা পেরোতে পারলেই পুরো আলাদিনের চিরাগ পেয়ে যায় দীপু। ঠাকুরদালান, উঠোন পেরোতে সময় লাগে নাকি?বাড়ির বাইরে পা দিলেই তো দুপুরটা পুরো হাতের মুঠোয় চলে আসে।

এক একদিন তো পুকুরধারে মাছ দেখতে দেখতেই সময় কেটে যায় তার।কোনোদিন শিলকাটাই দাদুর সাথে গল্প করে।শিলদাদু কেমন ছেনি দিয়ে পাথর কেঁটে কেঁটে ফুল,পাতা,মাছ এঁকে দেয়।বড়ো হয়ে দীপুশিলকাটাই হবে।

কোনো দুপুরে দেখা হয় সাগর বোষ্টুমির সঙ্গে।চুলগুলো গেরো করে বাঁধা,গেরুয়া ছোঁপানো কাপড়,গলায় তুলসী মালা,তিলক কাঁটা বোষ্টুমি তাকে দেখলেই একগাল হেসে বাতাসা দিত।তারপর কত গল্প করতো দীপুর সাথে,গান শোনাতো। বোষ্টুমির ছেলেটা ম্যালেরিয়াতে না মরলে দীপুর বয়সি হতো।তাই তাকে দেখে চোখের জল বাঁধ মানে না বোষ্টুমীর।

কিন্তু আজ ঠাম্মির ঘর পেরিয়ে বাইরে এসে দীপু অবাক।রাস্তায় একটা জনমনিষ্যি নেই।পটলিগাইটা খালি ঘাসপাতা চিবুচ্ছে একমনে। রঘুদাদু থাকলে তাও গান শোনা যেত।উদাস মনে ঘোষালদের আমবাগানে ঢুকে একটা নিচু ডালের ওপর জাকিয়ে বসে সবে দুটো কচি আম ছিঁড়ে কামড়াতে যাবে,এমন সময় নীচ থেকে কে কাঁইমাই করে উঠলো,
"আরে,আরে! ক্যায়া করতা হো খোখাবাবু,ইয়ে কাচ্চা আম মত্ খাও।হামি তুমাকে পিসতা বাদাম দেতা হু।"

নিচে তাকিয়ে দীপু দেখে লম্বা ঢোল পাঞ্জাবি আর চোগা পাজামা পরে এক কাবুলিওয়ালা দাঁড়িয়ে। কাঁধে এক ইয়াবড় ঝোলা। হুঃ।ভাবে কি লোকটা?দীপু কি ছোটো নাকি?ক্লাস থ্রিতে
পড়ে এখন সে।তাকে বোকা বানানো কি এতোই সোজা? সে কি জানে না রাস্তাঘাটে ছেলেধরা ঘোরে। ঘুমের ওষুধ মেশানো খাবার খাইয়ে ঝোলার মধ্যে ভরে চম্পট দেব।তারপর হাত পা ভেঙ্গে ভিক্ষে করাবে।

মনে মনে অবশ্য বেশ ভয়ও পেলো দীপু।লোকটার কাছে যদি বন্দুক থাকে? লোকটা যদি তাকে কিডন্যাপ করে তবে কি করবে সে? ঠাম্মির বানানো গুড়ের পায়েস তবে কে খাবে?বাবা যে আজ ঘুড়ি আর লাটাই আনবে; সেবেলা?মামনি তো ঘুম থেকে উঠে দীপু কে না দেখতে পেয়ে হাপুস করে যা কাঁদবে না... ভাবতেই দীপুর কান্না পেয়ে গেলো।তবুও সাহস রেখে,গম্ভীর গলায় দীপু বলল,
"এটা ঘোষাল কাকুর গাছ,কিছু বলেনা খেলে।আর আমি অচেনা লোকের থেকে কিছু খাইনা।মামনি বারণ করেছে।"

বলেই সরু চোখ করে লোকটাকে জরিপ করতে লাগলো সে,এইবার,এইবারই কি বন্দুক বের করবে নাকি?

দীপুকে হতাশ করে দিয়ে লোকটা গাছের নিচে থেবড়ে বসে ঝোলা থেকে একটা বাক্সো বের করে,তার থেকে কিসমিস বের করে, খেতে খেতে বলল,

"মামনি তো ঠিকহি বোলে দীপুবাবু।আনজান আদমি তো ছেলেধোরাও হতে পারে,কিন্তু হামি ছেলেধোরা না আছি।হামার এত তাকত্ হি নেই।দেখিয়ে না কেমন রোগাসোগা আছি।"

সত্যি লোকটা পুরো প্যাকাটি মার্কা,খালি যেন কটা হাড় আছে।ভয়টা একটু একটু কমছিল দীপুর।এবার সে বলল,

" তোমার বাড়ি কোথায়?তুমি কি করো?বাড়িতে কে কে আছে?তোমার ঝোলায় আরকি কি আছে?"

"আরে আরে! ঠেহরিয়ে দীপুবাবু।থোড়া টেম তো দিজিয়ে। " কিসমিস শেষ করে লোকটা বলল,
"হামার ঘর উইই কাবুল মুলুকমে ছিল, ঘরমে বিবি ছিল, আপকে অউর মিনুদিদি কে য্যায়সে একঠো গুড়িয়ারানী ভি ছিল হামার।সেসব কোবেকার বাত আছে হুজুর। ভুলে গেছি হামি। হামি তো বাংলা মুলুকে আটকা পড়ে আছি হুজুর। ইয়ে ঝোলা মে পেস্তা বাদাম কে ইলাবা মেরে বিটিয়া কি নানহা হাতো কা নিশান হ্যায় । ইয়ে দেখো....."

একটুকরো কাগজ মেলে ধরলো সে দীপুর সামনে।সেখানে দুটো ছোট্ট ছোট্ট হাতের ছাপ।

"আমার জিন্দেগি তো ইধারহি শেষ হোলো,আব অউর কাহা যায়ে। ছোটাছোটা বাচ্চালোগনকে সাথ দুইঠো মিঠা কথা বলে মনকে তাসাল্লি দি আব শুধু।" চোখ মুছলো সে।

ততক্ষনে দীপু কাবুলিওয়ালার গা ঘেঁষে বসে গেছে,আর চোখ বড়ো বড় করে শুনছে মিনুর কথা, কাবুলির আগের জীবনের কথা।

হটাৎ কি মনে হতে দীপু বলল,
"কাবুল কাকু?তুমি ম্যাজিক করতে জান? আমাদের পাড়ার গনাকাকা তোমার মতোই দেখতে।কত ম্যাজিক করে।"

"জানে বই কি খোখাাবাবু!জরুর জানে, এই দেখো না.."

বলেই দীপুরবড়ো বড়ো চোখের সামনে নিজের কাঁধের ঝোলাটা গায়েব করে ফেললো লোকটা।

"আরেব্বাস তুমি তো পুরো ম্যাজিশিয়ান গো।আরো দেখাও প্লিজ।"

এবার লোকটা হাওয়া থেকে কেমন আস্ত একটা আপেল নিয়ে এলো দীপুর জন্য।হাততালি দিয়ে,আপেলে কামড় দিতে দিতে
"আরও আরও" বলে চেঁচাতে লাগলো দীপু।

লোকটা ততক্ষনে নিজের ঘাড়টা পাইপাই করে মাথার চারপাশে একপাক ঘুরিয়ে এনেছে,শূন্যে দুবার ডিগবাজি খেয়েছে,আর নিজের মুন্ডুটা একবার ধড় থেকে আলাদা করে হাতের তালুতে এনে রেখেছে। ছোটখাটো ম্যাজিক গুলোতো লোকটার কাছে জল ভাত।
দেখতে দেখতে দীপু তো পুরো লোকটার ফ্যান। ঠিকই করে ফেলেছে বড়ো হয়ে সে ম্যাজিশিয়ানই হবে।

"আমাকেও শিখিয়ে দেবে ম্যাজিক করা কাবুল কাকা?আমিও তোমার মত ম্যাজিক দেখাব।"

"দীপুবাবু!বেঁচে থাকতে তো এইসব ম্যাজিক শেখ যায়না ,এই ম্যাজিক যতদিন না শেখা যায় ততদিনই ভালো হুজুর। আজ ঘর যাও খোখা।মামনি ফিকর করবে বরনা!"

কাবুল কাকার কথার অর্থ দীপুর বোঝার বয়েস হয়নি।তাই সে বায়না করতেই থাকে,

"না কাবুল কাকা,তুমি প্লিজ কাল দুপুরেও বাগানে আসবে,আমাকে শিখিয়ে দেবে ম্যাজিক।বলো দেবে?"
আবদার করতে থাকে দীপু।

"আচ্ছা খোকা,আজ ঘর যাও।একদিন আমি ঠিক শিখাই দিবো।তুমি খুব ভালো বাচ্চা আছো বেটা।মনটা অ্যাইসা হি রেখো!"

শেষ দিকে কাবুল কাকার গলাটা কেমন যেনো কাঁপাকাঁপা শোনালো দীপুর।

বাড়ির দিকে পা বাড়ালো দীপু।কিছুদূর গিয়ে পিছন পানে চেয়ে দেখে কাবুল কাকা কেমন হওয়ায় মিলিয়ে গেলেন।

অবাক হয়ে দীপু ভাবলো ম্যাজিশিয়ানরা সব পারে,কেমন তার নামটাও ম্যাজিক করে জেনে নিল। বাবাকে আজই বলবে,বড়ো হয়ে সে ম্যাজিশিয়ানইহবে,সে যে যাই বলুক।

দীপুর সাথে অবশ্য তার ম্যাজিশিয়ান কাবুল কাকার আর কোনোদিন দেখা হয়নি।

সমাপ্ত।