শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০

​কথাগুলো বলা হলো না, ১

লেখক পরিচয় --দিল্লিনিবাসী কবি ও গল্পকার গৌতম দাস একজন ঔপন্যাসিকও বটে । জন্ম পশ্চিমবঙ্গে , পেশায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার । শুরু হল তাঁর উপন্যাস অন্যদেশে ধারাবাহিক ভাবে , 'কথাগুলো বলা হলো না' । প্রচ্ছদ এঁকেছেন, অন্বিষ্ঠা ।


এক


কথাগুলি আজ বলবে ?

না আজ নয়, অন্য কোনোদিন।

আজ নয় কেন?

কিছু প্রশ্ন প্রশ্নই থেকে যায় তার আর উত্তর হয় না, চিৎ হয়ে শুই, আমাদের কোম্পানিটা বিভিন্ন ধরনের ইনড্রাসটিয়াল ডিভাইস বানায় আর কোলকাতায় আমাদের যে সেলস অফিস আছে সেখানে আমি একটা মাঝামাঝি পজিশনে রয়েছি, না বস না একদম জুনিয়র, বস চিন্ময় মিত্র যেদিন থেকে বুঝেছিলেন যে প্রফেশ্যনালি আমার দিক থেকে ওনার কোনো থ্রেটনিং নেই সেইদিন থেকেই উনি আমার সঙ্গে বেশ ভালো ব্যাবহার করেন, ভালো ব্যবহার মানে ঐ মাঝেমধ্যে ওনার পয়সায় একটু মাল-টাল খাওয়ান আর কী, আর মাল খেতে খেতে কখনো সখনো নিজের সুখ-দুঃখের দু একটা গল্পও বলে ফেলেন, আমি ওসব শুনে বিলকুল হজম করে ফেলি, লোকে বলে এটাই নাকি আমার স্বভাব, লোকে যাই বলুক আমার কিন্তু অন্যের ব্যাপার নিয়ে অত ঘাটাঘাটি করতে ভালো লাগে না, এই যে দীর্ঘদিন একই কোম্পানিতে থাকার সুবাদে ম্যানেজমেন্টকে না জানিয়ে মিত্র বেশ কিছু পজিশনাল আনডিউ অ্যাডভান্টেজ নিয়ে আসছেন সেটা আমি বুঝি বা জানি কিন্তু তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। আসলে আমার মত ভেজা বারুদওয়ালা মানুষরা মাথাব্যথা করে কিছু করতে পারে না, তার চেয়ে মাথা-ফাথা না ঘামিয়ে যদি একটু আধটু সুযোগ সুবিধে পাওয়া যায় তাতে ক্ষতি কী! এই যে আমি এখন ভরদুপুরে মানে অফিস আওয়ার্সে শুভ্রার বিছানায় ল্যাদ খাচ্ছি সেটা তো আসলে মিত্রেরই বদান্যতা, বারোটা নাগাদ কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ ঝুলিয়ে অফিস থেকে বেরনোর সময় বুড়ি ছোঁয়ানোর মত করে বলে এলাম যে ক্লায়েন্ট ভিজিটে যাচ্ছি, কোন ক্লায়েন্ট, কি কাজ, কিছুই জিজ্ঞাসা করলেন না উনি, শুধু মাথা নেড়ে জানিয়ে দিলেন যে আই মে গো !

শুভ্রার এখানেই আজ লাঞ্চ সেরেছি, হোটেল থেকে ও খাওয়ার আনাতে চাইছিল, মানা করলাম, বললাম হোটেলের খাওয়ার নয়, আজ তোমার হাতের রান্না সেদ্ধভাত খাব।

কি সৌভাগ্য আমার! কিন্তু আজ যে হঠাৎ আমার হাতের রান্না খেতে চাইছেন তার কারনটা জানতে পারি?

কেন তোমার হাতের রান্না খাওয়া কি আমার বারণ নাকি?

না বারণ নয়, তবে কোনোদিন তো খেতে চান না তাই বললাম !

অনেকক্ষন হলো শুভ্রার কোনো সাড়াশব্দ পাচ্ছি না, মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে, ঘুম না এলেও আমার সারা শরীর জুড়ে এখন একটা ঝিমঝিমানি ভাব আর সেই ঝিমঝিমানিতে ছাদের কংক্রীটটা সরে গিয়ে আজ আবার দুপুরের আকাশটা চোখের সামনে ভেসে উঠল, কতদিন ভেবেছি যে এই আকাশটাকে আমি কিনে নেব, আমারই মত কোনো সেলসম্যানকে ডেকে বলব, আই ওয়ান্ট টু বাই ইট, উড ইউ বি কাইন্ড এনাফ টু কোট ইওর প্রাইস? আকাশটাকে কিনে নিয়ে সেখানে কিছু রোদ্দুরের বীজ পুঁতব, আর তারপর বীজগুলি যখন চারা হয়ে উঠবে তখন তাদের বলব যে তারা যেন আহ্নিক বা বার্ষিক গতির নিয়ম না মেনে আমায় সব সময় আলোয় ভরিয়ে রাখে, আকাশের এক কোনে একটা ছোট্ট সুইমিং পুলও রাখব, পুলের পাশে পাতা থাকবে বেতের চেয়ার আর সেখানে শরীর এলিয়ে গল্প করার জন্য এক-এককরে ডেকে নেব মৃগশিরা, শতভিষা, স্বাতী, রোহিণী বা কৃত্তিকাকে। আর তারপর সত্যিকারের আকাশে যখন ওদের ফুটে উঠবার সময় হবে তখন ওদের শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য খুঁজে নেব জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলিকে, ঐ তো আমি ঠাকুমাকে দেখতে পাচ্ছি, সামান্য কুঁজো হওয়া শরীরটা নিয়ে ঠাকুমা তুলসীমঞ্চের দিকে হেঁটে আসছে, পরনে সেই সাদা শাড়ি, গায়ে সাদা সেমিজ, আমায় বলছে, বাবু, তুই কিন্তু আবার নোংরা কাপড় পরে আমায় ছুঁয়ে দিস না, ঠাকুমার কথাগুলি শেষ না হতে হতেই চোখের সামনে ফুটে উঠলেন অনিল স্যার, স্যার কর্ণ কুন্তী সংবাদ পড়াচ্ছেন, “আমি রব নিষ্ফলের হতাশের দলে”, বুঝলি কুশল, এই লাইনটাকে ধর, দেখবি কবিতাটা বুঝতে আর কোনো অসুবিধা হচ্ছে না, স্যারও এক সময় ফ্রেম থেকে ধূসর হয়ে গেলেন আর স্যারের জায়গায় যে অশরীরী ছায়াটা এবার ফুটে উঠলো তার মুখটা ঠিক করে বুঝে উঠবার আগেই কে যেন আমায় ধাক্কা দিলো।

তখন যে বললেন সিঁথির মোড়ে যাবেন তাহলে উঠুন এবার, বেলা কিন্তু পড়ে এসেছে! দুপুরের নাইটিটা বদলে শুভ্রা এখন ছাপ-ছাপ একটা শাড়ি পরা, সঙ্গে ম্যাচিং স্লিভলেস ব্লাউজ, কপালে ছোট্ট একটা টিপ, খুব সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে, আমাকে ওর মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয় থাকতে দেখে শুভ্রা জিজ্ঞাসা করে উঠল, কী হলো, অমন করে কী দেখছেন?

সিঁথির মোড়ে এসে ট্যাক্সিটা ছেড়ে দেই, মা যে বাড়িতে থাকে সেই বাড়িটা গলির একদম শেষ প্রান্তে, ট্যাক্সি যাবে না ঐ পর্যন্ত, গলির মাঝামাঝি যে ভ্যারাইটি শপটা আছে সেখান থেকে মায়ের জন্য একটা হরলিকস আর বিস্কিট নিয়ে নিলাম। এর আগেও বেশ কয়েকবার দোকানটায় এসেছি তাই দোকানদার মুখটা চিনে রেখেছেন, হরলিকসের বোতল আর বিস্কিটের প্যাকেটগুলি কাপড়ের থলিতে ভরতে ভরতে জানালেন যে ক'দিন আগে নাকি মায়ের শরীরটা খারাপ হয়েছিল।

মায়ের শরীর খারাপ হয়েছিল, কই ছবি তো আমায় কিছু জানায়নি! ছবির ওপর রেগে উঠতে গিয়েও সামলে নিলাম, মেয়েটা হয়তো জানাতে চেয়েছিল মা হয়তো বাড়ন করেছে।

আজকেও বুড়োটা প্রতিদিনকার মতই বাড়ির সামনের রকটায় বসে আছে, সেই এক চেক-চেক লুঙ্গী আর সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরা, আমাকে দেখলেই নিয়ম করে উনি একটা বত্রিশ পাটির হাসি উপহার দেন আর চকচকে লোভী চোখে আমার বুক পকেটটার দিকে তাকিয়ে থাকেন, কি কুক্ষণে যে একদিন একটা সিগারেট দিয়েছিলাম! সেইদিন থেকেই এ'বাড়িতে আসলে ওনাকে একটা সিগারেট এন্ট্রি ফি হিসেবে দিতে হয়, মুখে অবশ্য চান না কিন্তু বড় অস্বস্তিকর ওনার ঐ তাকিয়ে থাকাটা, সিগারেট দিয়ে সদর দরজা পার করি, মায়ের শরীরটা আজকাল মোটেই ভালো যাচ্ছে না, মাঝে-মাঝেই গড়বড় হচ্ছে, না মাকে এবার কোনো স্পেসালিস্টের কাছে নিয়ে যেতে হবে, এক এক করে সিঁড়ি ভাঙছি, সময় নিয়ে আজকাল সিঁড়ি ভাঙতে হয়, তিনতলায় উঠে দম নেওয়ার জন্য একবার দাঁড়ালাম।

ইশ্, চল্লিশ পেরতে না পেরতেই শরীরের কী হালত!

স্মৃতি সতত সুখের বা দুঃখের যাই হোক না কেন তার ঝাঁপতাল খুলে বসতে কিন্তু খারাপ লাগে না, মনের ডার্করুমে গিয়ে এক-এক করে অতীতের প্রিন্ট নিয়ে দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে হারিয়ে যাওয়া, খেলাটা খেলতে বেশ মজা লাগে আমার, ঈশ্বর সত্য হ্যায়/ সত্য হি শিব হ্যায়/ শিব হি সুন্দর হ্যায়/ জাগো, উঠকর দেখো ............ গলির মোড়ে যে পান-বিড়ির দোকানটা আছে সেখানে চলছে বিবিধ ভারতীর আপ কা পসন্দ গানের অনুষ্ঠান আর অনেক বছর আগে জিয়াগঞ্জের মোড়ে সামন্ত কা ধাবায় এই গানটাই সেদিন গুনগুণ করে গাইছিল এক কিশোরী। বোকারো আর ধানবাদের মাঝামাঝি এই জিয়াগঞ্জ, আজ থেকে বেশ কিছু বছর আগে ধানবাদ বোকারো রুটের বাস বা ট্রেকারগুলি জিয়াগঞ্জের মোড়ে এসে দাঁড়ালেই যাত্রীরা গাড়ি থেকে নেমে ভিড় করতেন সামন্ত কা ধাবায়। বাংলা আর বিহারের বর্ডার ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তার ধাবায় নীলকমল হিন্দির সঙ্গে বড় বড় করে বাংলাতেও সাইনবোর্ডে লিখিয়ে নিয়েছিল, সামন্তের ধাবা, নিরামিষ খাওয়ারের উৎকৃষ্ট স্থল। নীলকমলের জন্ম আর বেড়ে ওঠা দুটোই ঝাড়খণ্ডে, তখন অবশ্য ঝাড়খণ্ড বলে পৃথক কোনো রাজ্য ছিল না, ধানবাদ আর বোকারোর এই অঞ্চলগুলি বিহারেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল তখন, যাই হোক পড়াশুনায় সেরকম মন না থাকলেও ছোটবেলা থেকেই নীলকমলের বিষয়ী বুদ্ধিটা কিন্তু খুব পাকা ছিল আর তাই পিতা রামকমলকে সঠিক পরামর্শ দিয়ে সে বলেছিল, গ্রামের কটা লোকের জন্য জিয়াগঞ্জের মোড়ে তাদের যে মুদি দোকানটা আছে সেখানে তার বদলে একটা খাওয়ারের দোকান খুললে তা অনেক বেশী চলবে। ছেলের পরামর্শ মত পিতা রামকমল সেদিন কিরানা শপের সাইনবোর্ড খুলে তাই সেখানে লাগিয়ে দিয়েছিল নতুন সাইনবোর্ড, সামন্ত কা ধাবা। এরপর বোকারোর শিল্পায়ন দিন-দিন যেমন তার গতি পেয়েছে ধানবাদ-বোকারোর সংযোগকারী রাস্তার ব্যস্ততাও তার সঙ্গে সমানতালে বেড়েছে আর সেই ব্যস্ততায় নীলকমলের অনুমানকে সত্যি করে সামন্তের ধাবার শ্রীবৃদ্ধি হতেও খুব একটা বেশী সময় লাগেনি।

পড়ন্ত দুপুরে সেরকম খদ্দেরের ভীড় নেই এখন, নীলকমল তাই চারপেয়েটা পেতে একটু গড়িয়ে নিচ্ছিল, আজকাল এরকম অলস দুপুরে মনটাও যেন কেমন এলোমেলো হয়ে যায়, ফেলে আসা স্মৃতিরা সেখানে হু হু করে এসে ভীড় করে, মৃত্যুর আগে বোনদের সঙ্গে তার বিয়েটাও বাবা দিয়ে গিয়েছিলেন, পাত্রী পাশের গ্রামের মিত্রবাড়ির ছোটমেয়ে বিন্দু, বিয়ের চার বছরের মাথায় ঘর আলো করে তাদের একমাত্র সন্তান কাজলের জন্ম, সে বড় সুখের সময় নীলকমলের জীবনে, ছোট্ট কাজল টলোমলো পায়ে সারাদিন বাড়িময় ঘুরে বেড়ায়, কখনো তার পুতুল ছেলে-মেয়েদের নিয়ে রান্নাঘরে এসে বসে মায়ের পাশে, কখনো বা মাঝের উঠোনটা এক দৌড়ে পাড় করে ঝাঁপিয়ে পড়ে খদ্দের সামলাতে থাকা নীলকমলের বুকের ওপর, স্মৃতিরা নিজেরাই যেন তাদের পাতা উল্টোতে থাকে, কাজলের তখন ছ’বছর বয়স, মেয়েকে স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করে দেয় নীলকমল, পিঠে বইয়ের ব্যাগ, হাতে জলের বোতল, বেণী দুলিয়ে রোজ সকালবেলায় কাজল স্কুলে যায়, বিন্দু ঘরের কাজ করে, নীলকমল তার ধাবায় খরিদ্দার সামলায়, মসৃণ গতিতে চলছিল জীবনের চাকা, কিন্তু হঠাৎ যে কী হলো, কোথাও কিছু নেই, দুদিনের জ্বরে বিন্দু মারা গেলো আর মায়ের নিথর শরীরটার ওপর কাজলকে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখে সামন্ত সেদিন বলে উঠেছিল, ওরে কাঁদিস না, আমি তো আছি। সত্যিই মা-মরা মেয়েটাকে সেদিন বুকে করে আগলে রেখেছিল নীলকমল, মেয়েও তার বাবা অন্ত প্রাণ, দিনে চারবারের বেশী চা খেলে বা সময় মত খাওয়ার না খেলে বাবাকে সে বকুনি দিতে ছাড়ে না, বকুনি অবশ্য সে আরেকজনকেও দেয়, সে তার সুরোচাচা, চাচা প্রতিদিন সকালবেলায় হারমোনিয়াম নিয়ে তাদের ধাবার সামনে এসে বসে আর ধাবায় খেতে আসা মানুষগুলো যখন তার গান শুনে খুশী হয় তখন সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে, ঈশ্বর আপনাদের সবার মঙ্গল করবেন, সময় থেমে থাকে না, নিয়মের চাকায় নীলকমলের ঝুলপিতেও একদিন রুপোলী রেখা দেখা দেয়, কাজল ততদিনে গাঁয়ের স্কুল থেকে বারো ক্লাস পাস করে ফেলেছে, নীলকমল বোঝে মেয়ের তার পড়াশুনায় সেরকম আগ্রহ নেই, তার সব আগ্রহ যেন ঐ গানবাজনাতেই আর এই আগ্রহটা খুব সম্ভবত সে তার সুরোচাচার থেকেই পেয়েছে, সুরো যে গানই ধরে না কেন কাজল তা একবার শুনেই নিজের গলায় তুলে নেয়, রেডিওতেও বাজতে থাকা গানও মন দিয়ে শোনে মেয়েটা, নীলকমলের বড় আক্ষেপ, তার বাসার কাছাকাছি কোনো গানের স্কুল নেই, থাকলে মেয়েটাকে সে সেখানে ঠিক ভর্তি করে দিত, সুরো অবশ্য বলে, মাইয়া আমাগো গানের স্কুলে না শেখলে কি হইবে, দেইখবা একদিন ওর গান শুইন্যা সারা দেশের মানুষ একদম মোহিত হইয়া যাইবে।

কাজলের বিয়ে নিয়েও আজকাল নীলকমলের বড় চিন্তা, মা মরা মেয়েটাকে ভালো একটা ছেলের হাতে তুলে দিতে না পারলে তার যেন মরেও শান্তি নেই, গাঁয়ের ছেলেগুলিকে তার তেমন পছন্দ নয়, কেমন যেন সব চাষাড়ে চাষাড়ে, ওদিকে আশেপাশের গ্রামের পড়াশুনা জানা বা ভালো চাকরী করা ছেলেদের বাবা-মায়েরা কাজলের কালোপানা মুখটার দিকে চেয়ে যা পয়সাকড়ি বা জিনিসপত্র চায় তা দেওয়ার সামর্থও সামন্তের নেই, বড় চিন্তায় আছে সে। ভোরবেলা সেদিন, সবে ধাবার ঝাঁপ উঠেছে, উনোনের সামনে বসে নীলকমল হাওয়া দিচ্ছিল, এমন সময় একটা জীপ এসে দাঁড়ায়, চারজন যুবক জীপ থেকে নেমে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে আসে ধাবার দিকে, এক ঝলক তাকিয়েই নীলকমল বোঝে যে আগুন্তকরা কোলকাতা থেকে, ভোররাতের ট্রেনে ধানবাদে নেমে জিপ ভাড়া করে এখন চলেছে বোকারোর দিকে।

আসেন বাবুরা, মুখ-হাত ধুইয়া লন, ততক্ষণে আমি আপনাগো লইগ্যা চায়ের জল বসাইয়া দেই, চা খাইতে খাইতে তারপর বলেন নাস্তায় কি বানামু, অভ্যস্ত কথাবার্তায় নীলকমল দিনের প্রথম খরিদ্দারদের আপ্যায়ন করে। বিশ্বনাথ কর, বয়স এই পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি, কোলকাতার আদিনাথ কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে হিসেব রাখার কাজ করে, সাইট ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে সে এবার চলেছে বোকারোর সাইটে, জিপের মাথায় রাখা ব্যাগ থেকে টুথব্রাশ আর পেস্ট বার করে নেয়, মুখ না ধুয়ে চা খেতে তার বড় বিচ্ছিরি লাগে।

কুয়া ঐ দিকে, সঙ্গে দেখবেন কলও লাগানো আছে, দোকানের ছেলেটাকে চায়ের জল চাপানোর তাড়া দিয়ে বিশ্বনাথকে উদ্দেশ্য করে নীলকমল কথাগুলি বলে ওঠে।

বুক সমান উঁচু পাঁচিল দিয়ে কুয়োর চারপাশটা ঘেরা, বিশ্বনাথ তাই ঠিকমত দেখতে পায় না, কিন্তু তার কানে ভেসে আসে সুরেলা এক কণ্ঠস্বর

দয়া করো প্রভু, দেখো ইনকো

হার ঘর কে অঙ্গন মে

রাধা মোহন শরনম

সত্যম, শিবম, সুন্দরম.........

পায়ে-পায়ে বিশ্বনাথ কুয়োর পাড়ে এসে দাঁড়ায়, বছর কুড়ির সদ্য স্নাতা কালোপানা এক যুবতী সিমেন্টের চাতালে বসে ঠাকুরের বাসন মাজছে আর নিজের মনে গুনগুণ করে গান গাইছে। রেডিয়োতে আগে যেমন ধারাবাহিক ভাবে নাটক পরিবেশন হতো ছোটবেলায় তেমনি ঠাকুমার মুখে কিস্তিতে কিস্তিতে আমি বাবা-মায়ের প্রথম দর্শনের বা তাদের বিয়ের এসব কথা শুনেছি।

যাই বলো তোমার ছেলে আর ছেলের বৌয়ের প্রথম দেখা কিন্তু যাকে বলে কি না একদম লাভস্টোরি মার্কা সিনেমা যেন!

ধুর বাবা সিনেমা কি না জানি না তবে সত্যিই সেদিন বৌমার গান শুনে কিন্তু তোর বাবা মজেছিল। বাস্তবিকই কাজলকে দেখে বিশ্বনাথের মনে সেদিন এক অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হয়, বিধবা মা তার বেশ কিছুদিন ধরেই বিয়ের জন্য তাগাদা দিচ্ছিল, কিন্তু বিশ্বনাথ এতদিন বিয়ের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি, কিন্তু আজ নাস্তা আর আরেক-দফা চা খেয়ে যখন তারা আবার জিপে চড়ে বসলো তখন বোকারো যাওয়ার বাকী পথটুকুতে বিশ্বনাথ কারোর সঙ্গে খুব একটা কথা বলেনি, মনে মনে সে শুধু তখন গুণ-গুণ করছিল

ঈশ্বর সত্য হ্যায়

সত্য হি শিব হ্যায়

শিব হি সুন্দর হ্যায়............

অফিসের আরো দুজনার সঙ্গে পরের শনিবার বিশ্বনাথের কোলকাতায় ফেরার কথা, ম্যানেজারেকে বলে সে কিন্তু শুক্রবারই সকাল সকাল বোকারো-ধানবাদের সওয়ারী জীপে চড়ে বসে আর জীপটা সামন্তের ধাবার কাছে এসে দাঁড়াতেই ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলে, ভাইয়া, যারা রুখিয়ে না, মুঝে ইহা উতরনা হয়। ভাত-ডাল-আলুভাজা আর পটলের দোর্মা সহযোগে মধ্যাহ্ন ভোজনের ফাঁকে সামন্তবাবুর সঙ্গে বিশ্বনাথের সেদিন অনেক কথাই হয়, কথায়-কথায় নীলকমল জানায় যে মেয়ের বিয়ে নিয়ে সে খুব চিন্তায় আছে, ভালো একটা ছেলের হাতে মেয়েটিকে তুলে দিতে না পারলে তার যেন মরেও শান্তি নেই, নীলকমল যখন তাকে এসব বলছিল কাজল তাদের থেকে একটু দূরে বাবার ক্যাশবাক্সের সামনে পাতা চেয়ারটায় বসে নিজের মনে কী যেন একটা বই পড়ছিল।

আপনাদের বাড়ির ঠিকানাটা একটা কাগজে লিখে দিন আমায়, দেখি যদি কোনো ভালো ছেলের খবর পাই তাহলে আপনাকে চিঠি দিয়ে জানাব।

বিশ্বনাথ তাদের বাড়ির ঠিকানা চাইলে নীলকমল মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলে, আমাগো বাড়ির ঠিকানাটা ওনারে একটু লিইখা দে তো। এক টুকরো কাগজে বাড়ির ঠিকানা লিখে কাজল সেদিন যখন তা বিশ্বনাথের দিকে দিচ্ছিল তখন অসতর্ক মুহুর্তে তার আঙুলগুলি ছুঁয়ে যায় বিশ্বনাথের ডান হাত আর বাড়ি ফেরার পথে ট্রেনে বসে বিশ্বনাথ কতবার যে সেদিন তার ডান হাতের মধ্যমাটা ছুঁয়ে দেখেছিল তা কে জানে।

কোলকাতায় ফিরে তাহলে তোমার ছেলে লিখে ফেলল লভ-লেটার?

আরে বাবা শোন তো আগে, কোলকাতায় ফিরে তোর বাপ একটা চিঠি লিখল বটে তবে তা নিজের বয়ানে নয়, আমার বয়ানে সে সামন্তবাবুকে লিখে জানাল যে মহাশয়, সম্প্রতি আমার পুত্র শ্রীমান বিশ্বনাথ তার যাত্রাপথে আপনার মেয়েকে দেখিয়াছে, আপনার মেয়েকে দেখিয়া এবং তার গান শুনিয়া ছেলের তাহাকে বড়ই পছন্দ হইয়াছে ......................................................... আপনি যদি এই সম্পর্কের ব্যাপারে উৎসাহী হন তবে শীঘ্রই তা পত্র দিয়া জানাইবেন, সেক্ষেত্রে আমরা আপনার ওখানে আসিয়া এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করিতে ইচ্ছুক – ভবদীয়া – কুমুদ বালা কর।

তারপর?

তারপর আবার কি, দিন পনেরর মাথায় বেয়ানের জবাব এলো আর পরের সপ্তাহে আমরা মা-ব্যাটা ট্রেনে চেপে বসলাম।

মাকে দেখে তোমার কেমন লেগেছিল সেদিন?

সত্যি কথা বলতে কী জানিস তোর মাকে দেখে কিন্তু সেদিন প্রথমে আমার একটুও পছন্দ হয়নি, গায়ের রং কালো, গায়ে-গতরে মাংস নেই, কথা-বার্তায় কেমন যেন বিহারী টান, আর সব চেয়ে বড় যেটা সেটা হচ্ছে তোর বাপের সঙ্গে ওর বয়সের পার্থক্যটা, কিন্তু.........

কিন্তু কী?

ওই মেয়ে যখন সামন্তবাবুর কথায় গান ধরল আমি তো অবাক, কি দরদ ঐ'টুকুন মেয়ের গলায়!

তু হি সাগর হ্যায়, তু হি কিনারা

ধুন্ধতা হ্যায় তু কিসকা সাহারা?

উসকি ছায়া হ্যায়, দর্পন উসিকা

তেরে দিল মে হ্যায় ছায়া উসিকা

তেরি আঁখো মে উসকা ঈশারা

ধুন্ধতা হ্যায় তু কিসকা সাহারা?

স্বয়ং সরস্বতী ঠাকুর যেন ঐ টুকুন মেয়ের গলায় খেলে বেড়াচ্ছিলেন।

তাহলে রূপে নয় বলো গুণ দিয়েই সেদিন মা তোমার মন জয় করে নিয়েছিল, তাইতো!

ঠাকুমার মুখেই শুনেছি, এরপর মাস দুয়েকের মাথায় কাজল সামন্ত তার সিঁথি ভর্তি সিঁদুর আর বিয়ের পরে পাওয়া নতুন পদবী নিয়ে একদিন হাওড়া ষ্টেশনের প্লাটফর্মে পা রেখেছিল তার নতুন জীবনের উদ্দেশ্যে।