বৃহস্পতিবার, মে ২৮, ২০২০

​অসমের হাজো ও পোয়া মক্কা – অসম্প্রদায়িক মহাপীঠ


অসম-গৌরব তীৰ্থ নগর হাজো উত্তর কামরূপের অপরূপ প্ৰাকৃতিক সৌন্দর্যে আবৃত মহাপীঠ। অসমের প্রাণকেন্দ্ৰ গৌহাটি থেকে মাত্ৰ হাত ছোঁয়া দূরত্বে হাজো । শৰাইঘাট ব্রিজ পার হয়ে আগিয়াঠুরি গণেশ মন্দিরের গা ঘেঁসে চলা পথটিই ‘হাজো’ পৌছুয় মাত্র ঘন্টাখানেকে । হাজো সহজ-সরল কৃষিজীবী লোকেদের গাঁও সমষ্টি। প্ৰতিখন গ্রামে আছে এক একটি ঐতিহ্য বহন কারী পরিচয় । ব্ৰহ্মপুত্ৰের উত্তর পারে ঘন সবুজ সৌন্দর্যে আবৃত হাজো ভাৰতবৰ্ষের ঐতিহ্যপূৰ্ণ স্থানগুলির অন্যতম । হাজোর ইতিহাস প্ৰসিদ্ধ বহু রাজা-মহারাজার স্মৃতি বিজরিত হয়গ্ৰীব মাধব মন্দির হাজো্র মাথার মণি । মণিকূট পাহারে অবস্থিত হয়গ্ৰীব মাধব মন্দিরটি অষ্টম শতক। হয়গ্ৰীব মন্দিরের পাশেই রয়েছে মদনাচল পাহারে কেদারনাথ মন্দির।।হাজো নামকরণ নিয়েও নানামুনির নানা মত । হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ এই তিনটি ধর্মীয় সম্পদায়-ই নিজের নিজের যুক্তি জাল বিস্তার করেছে নামকরণের পিছনে । ১ । হাজোর কেদার মন্দিরের শাল বৃক্ষের নিচে বুদ্ধদেবের মহানির্বাণ ঘটেছিল । ভক্তবৃন্দ হা আজু হা আজু বলে কেঁদে ভাসিয়েছিলেন সেই থেকে এর নাম হয় হাজো । ঐতিহাসিকেরা বলে মেচ্ছ রাজা ‘হজে’র নাম অনুসারে নাম হয় হাজো । তবে ভাষাতত্ত্ববিদদের মতে বড়ো ভাষাত 'হা- গজৌ' শব্দ থেকে হাজো হয় ।হা শব্দের অর্থ মাটি এবং গজৌ শব্দের অর্থ হল উঁচুজায়গা ।হাজো যেহেতু পাহারঘেরা জায়গা তাই এর নাম হাজো ।

১২শ শতকে ইরাকের এক যুবরাজ, গিয়াসুদ্দিন আউলিয়া, ধর্মপ্রচারক হয়ে অসমের হাজো অঞ্চলে আসেন ।তিনি মক্কা থেকে মাটি এনে এই স্থানে এই মাজারটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকে এই স্থানটির নাম হয় পোয়া মক্কা’। তাঁর মৃত্যুর পর এই স্থানেই তাঁর সমাধি রচিত হয়। এই জায়গায় পাওয়া পার্সি এপিগ্রাফ থেকে জানা যায়, পরবর্তী কালে, ১৬৫৭ সালে মীর লুতফুল্লা এ সিরাজ (নামান্তরে সুজাউদ্দিন মহম্মদ শাহ) এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। সে সময় ভারতে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের রাজত্ব ছিল। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো এই পীর গিয়াসুদ্দিন আউলিয়ার হাত ধরেই নাকি ইসলাম ধর্ম তৎকালীন ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রচারিত হয়। কথিত আছে এই স্থানে ভক্তি ভরে প্রার্থনা করলে মক্কা যাওয়ার এক চতুর্থাংশ (পোয়া) পুণ্য লাভ হয়। তাই ইসলামিক নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বা ‘উরস’-এ এই স্থানে বহু মানুষের সমাগম হয়। আবার অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্যও এ স্থান একই ভাবে উন্মুক্ত থাকে।শহরে ঢোকার মূল ফটক পেরিয়ে অল্প গেলেই বাঁ হাতে লাল মাটির পাহাড়ি পথ উঠে গেছে সবুজ শালজঙ্গলের মাঝখান দিয়ে। পাকদণ্ডী পথে নীচের দিকে আদিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠ, ধানক্ষেত, এ সব দেখতে দেখতে উঠে গেলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে গরুড়াচল পাহাড়ের ওপর। তার পর সার সার দোকানের পাশের রাস্তা দিয়ে এক্কেবারে মাজারের সিঁড়িতে। এটাই ‘পোয়া মক্কা’। অসম তথা উত্তরপূর্বের ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম পীঠস্থান। নামটি অদ্ভুত শোনালেও এ স্থানের মাহাত্ম্য অপরিসীম।

হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ ধর্মের এক মহামিলন ক্ষেত্র হাজো । হাজো গুয়াহাটি থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে ব্রহ্মপু্ত্র নদের উত্তরপারে শতাব্দী প্রাচীন গরিমায় অবস্থিত। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাজোকে কখনো কলুষিত করতে পারে নি । এখানে হিন্দু মুসলমান হাত ধরাধরি করে আছে । প্রতিটি পার্বণে প্রতিটি সম্প্রদায়ের মানুষজন মিলে মিশে আছেন । এখানে নাই কোন বিভাজন । পঞ্চ তীর্থ হাজো হিন্দু মুসলমান ও বৌদ্ধ ধর্মের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা বহন করে ।হিন্দুদের হয়গ্ৰীব-মাধব, কেদারেশ্বর, কমলেশ্বর, কামেশ্বর আৰু গণেশ এই পাঁচটি তীর্থস্থান রয়েছে । ‘ হয়গ্ৰীব-মাধব’ বৌদ্ধ ধর্মেরও উপাসনা স্থল ।