বুধবার, নভেম্বর ২০, ২০১৯

হিজল জোবায়েরের কবিতা ভাবনা ও কবিতা

আজ কবি হিজল জোবায়ের জন্মদিন। অন্যদেশ পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।


কবিতা ভাবনাঃ

সমস্ত শিল্পমাধ্যম চূড়ান্ত উৎকর্ষতার ভেতর দিয়ে শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠতে চায় কবিতা। আর কবিতাই তা, যা হয়ে উঠতে চায় সুর। সুরই পরিণতি;– যার কাছে পৌঁছাতে হলে কবিতার কাছে এসে দাঁড়াতে হয়। সুর সম্পৃক্ত নীরবতায়। সবকিছুর পূর্ণরূপ ঐ নীরবতার ভেতর জায়গা খুঁজে নেয়। নীরবতা বয়ে আনে অনুধাবন, অনুধাবনকে জারিত করে স্মৃতি। জ্ঞান কিংবা অভিজ্ঞতা যাকে বলি। কল্পনাও অনায়াসে এই স্মৃতি-পুঞ্জীভূত। স্মৃতিই আমার কাছে তাৎপর্যবাহী, যেখানে প্রত্যাঘাতের ভেতর দিয়ে, তা আমাকে ধারাক্রমে পৌঁছে দেয় নৈঃশব্দমথিত সুরের বিস্ফার ও নীরবতা, আঁধার শীতলতা এবং অনুধাবনের দিকে। সে এক অভাবিত রিয়ালিটি। “SILENCE IS ACCURATE.” আহা! ধরা যায় না তাকে, আপাত অনুভবে পাওয়া। দেখি নাই, তবু জানি সে আছে, পাবো না তবু তারই অন্বেষণ, আনন্দ কি ক্লেদের ভেতর দিয়ে! এই কি সেই ঈপ্সিত পরম! পাবো না পূর্ণরূপ; সামান্য আলোকছটা ছাড়া, সামান্য উদ্ভাস! এই সামান্যেই খুঁজে পেতে হবে সমগ্রের প্রকাশ! অমীমাংসিত রই- শতখণ্ড শিলায়, বিদ্যুতে, আমিই তবে অমীমাংসিত পথ! আমিই ধাঁধাঁ!

কাছাকাছি কোথাও উচ্চারণ শুনি, বন্ধুর ব্যাটা কবিপুত্র তারকাভস্কি বলতে থাকে-
কবি তাই, যে ছেঁড়া মোজার একাংশ দিয়ে পায়ের গোড়ালি দেখেই পেয়ে যেতে পারে সমস্ত পায়ের ধারণা। কবির পুরোটুকু দেখবার প্রয়োজন পড়ে না। কবি তাই, যে খণ্ডাংশ থেকেই পেয়ে যায় সমগ্রের ধারণা।
আশ্বস্ত হই…



আদিম পুস্তকে এইরুপে লেখা হয়েছিল…

০১.
কবিবর মান্য হলা যবে
আপন পিতার করোটিতে মদ্যপান করি
খাড়া ঢাল বেয়ে নামি আসো
এই মর্ত্যপুরে
দৈবাৎ অপরাহ্নের নিদ্রার মত বিস্মৃত হবার দিন চলে আসে
গতিময় যদিচ ক্লান্ত ঘোড়ার নুয়ে পড়া মাথা
ক্রমাগতঃ আরো নুয়ে পড়ে
বাতাসে শরীর ঘষে কেঁদে ওঠে বিভ্রান্ত নেকড়ের দল
পায়ুপথে জন্মকুষ্ঠি লুকোনো ইহুদী বালুনির্মিত তোমাদের চিত্ত
ধ্বসে পড়ে আধানোনা সমুদ্রের ঢেউয়ে
এই সংবেদনশীল আত্মা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচারের শেষে পায়ুপথে ফিরে যাও
দ্যাখো বিষ্ঠায় ভরে গেছে আকাশ সাগর
রে এমন মত্ত হবো মদ দিয়ে কুলকুচা করি চল্
মদের দোহাই ভিজে গ্যালো ঠোঁট
বন্যহাতি মাড়িয়ে গ্যালো কাঁচা লঙ্কার ক্ষেত
কদাচিৎ মস্তিস্কে অনুভূতি হয়
রে এমন দিনে আপন পিতার করোটিতে মদ্যপান করি…

০২.
শুনেছি তথাগত,
লুটের মাল ভরা তোমার ধনাগার
স্বর্ণসম্ভার, তুমি তো গরুখোর
হিন্দু নও তবে, মদের পিপা থেকে
যে মদ ঢেলে খাও সে মদ দানবীর
গোপন পায়ুপথে গন্ধ-পুঁজময়
লোহিত ঋতুস্রাব, তবু তা লেবুফুল
কোমল কুৎসিত প্লীহায় যকৃতে
মদের ফেনা মেখে কেবলি নীলায়ন
যে পাখি উড়ে ফেরে সে পাখি জলচর
সারাটা রাতব্যাপী তুমি কি ভাঙ্গাচোরা
কাঠের সিন্দুকে নিজেকে কাটাফাঁড়া
দেখেছ তথাগত…

০৩.
ওই বনে মাঠে তোমার ছায়ারা সব মরে পড়ে আছে- দূরে হলুদ চাদরে মোড়া হিব্রু অবতার- সূর্য ডুবে যায়- তুমি মুছে ফ্যালো রেকাবির ধূলো- আর আমি রোগ থেকে নিরাময়ে যাই- ঘুমের ভেতর শুনি অশ্রুত গান- মৌসুমী বাগানে মরে আছে গন্ধগোকুল- পড়ে আছে বাঘে খাওয়া হরিণের দাঁত- মরণমৃত্যু মিশে আছে মৎস্যভূক সাপে সরীসৃপে- অন্ধকারে হতচকিতের মতো কবন্ধ খুঁজে ফেরে মাথা- মৌসুমী বাগানে ছিন্নশরীর খুঁজে ফেরে নিহত গোকুল…

০৪.
ঈশ্বর তুমি প্রতিপালন করো মাংসখন্ডলোভী সকল কুকুর- তাদের আহত উরু আজও থাবাচিহ্ন বয়- মনে করি সূর্যের পেছনে আকাশ নেই তবে সূর্যের পশ্চাৎপট কি- উত্তর পাবার অপেক্ষায় এমন প্রশ্ন আজও করি- সমস্ত শরীরে সাপের বিষ মেখে তুমি আসো- নিরন্ন সকালে বালু বোঝাই কার্গো এসে ভেড়ে- কারা যেন ছাইয়ের ভেতর থেকে তুলে আনে ফসলের দানা- সবাই বলে নিরন্ন সকালে হলুদ চাদর গায়ে নামবেন অবতার…

০৫.
দোযখের সাপ
তোমার লোলুপ জিহ্বা পোড়ে
তপ্ত তেলে তারপিনে,
তোমার দ্বিধাখণ্ডিত ফল
হে দেবতা
হে পিশাচ
ভোজ্য তেলে সেদ্ধ হয়ে ওঠে

আলোহীন প্রভাহীন আগুনের আঁচে

টেবিলে শোয়ানো পাখি
ছিঁড়ে দু’টুকরো করি
সে তোমার ভোজ

পাখির পালক, অন্ত্র, কোষ
তারপর
সোমরস ক্রমেঃ নদী
ভুল ক্রমেঃ জ্ঞান
তোমার লালায় মেশানো
বিষাক্ত ফুলের সুবাস

বিষাক্ত পরাগ, পাপড়ি ও মধু
তুমি আমাকেই দাও
আমিই সে সাপ
সেই ভ্রষ্ট সরীসৃপ

হে সাপ, বিদেহী ইবলিশ
আত্মা চিরে বের হয়ে আসা
সে কোন ময়ূর
তোমাকেই বিষথলি ভেবে
ঠোঁটে তুলে নেয়

কেবলি ময়ূর
কেবলি পেখম
বিষথলি পোড়ে

এই ধুলা-পবনের দেশ
কমলালেবুর বনে

কুসুমে-কণ্টকে বিষথলি সারাটা শরীর
সরীসৃপ, তবু তোমার অসম কুণ্ডয়ন
তবু নাগ, তবু হে পানোখ
তোমার সকল ছোবল গন্ধমে লীন

কুমারী-ময়ূর আসে
ঘননীল ময়ূরী-কুমার
মেঘ ডাকে
মেঘে মেঘে বিষ-লালা
কুসুমে পরাগ
বিশালিনী দুয়ারে দুয়ারে ময়ূরের পাখা
কবন্ধ বিগ্রহে ফণা তোলা সাপ;
আর কবে ফুরাবে এ-গান

বিষ বলে সাপ
সাপ বলে ময়ূর ময়ূর
ময়ূর সে সাপ

আমি সে ময়ূর…!!!