রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

হাউডি মোদী – হিউস্টনে ভারতীয়ত্বর উত্থান ?

-- মানস রায় , ক্যালিফোর্নিয়া

“গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে মৈত্রমহাশয় যাবে সাগরসংগমে, তীর্থস্নান লাগি”

ঠিক তেমনি ঘটল হিউস্টনে । শুরুতে বার্তার গতি ছিল স্লথ,ধীরে গতি বাড়ল । চলো সঙ্গমে, এ এক নতুন সঙ্গমস্থল – হিউস্টন ।

আমেরিকার মূল ভুখন্ডের সর্ববৃহৎ রাজ্য টেক্সাসের রাজধানী হিউস্টন।

ভারতের প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমেরিকা আগমনের প্রথম উদ্দেশ্য ছিল নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনকে সম্বোধন করা। টেক্সাসের ভারতীয়রা ঠিক করলেন এবারের প্রধানমন্ত্রীর সফর হোক আরো বেশি কিছু, যার প্রভাব হোক আন্তর্জাতিক স্তরে। কোমর বাধলেন টেক্সাসের ছয়শোর ও বেশি সংগঠন। দেড় লক্ষ ভারতীয়র বাস শহর হিউস্টনে। আর সারা টেক্সাসে চারলক্ষ। কথায় বলে টেক্সাস রাজ্য যেমন বড় তেমনি এখানে সব জিনিসই বড় মাপের। তাই উদ্যোক্তারা ঠিক করলেন টেক্সাসের ঐতিহ্য তারা রাখবেন । এমন বড় জন সমাবেশ করবেন যা আমেরিকাতে বিদেশী কোন রাজনৈতিক নেতা করেন নি। শুধু বিদেশী কেন, সম্প্রতি কোন আমেরিকান রাজনৈতিক নেতাও করেননি। একমাত্র বিদেশী ব্যক্তি যার বক্তৃতা শুনতে আমেরিকায় পঞ্চাশ হাজার লোক স্টেডিয়াম ভরায় তিনি হলেন ধর্মগুরু পোপ। এমনকি টেক্সাসের সংগঠকরা ছাড়িয়ে গেলেন নিউইওর্ক ও সান ফ্রান্সিস্কোর মোদী মহাসভা গুলিকেও যেখানে সমবেত হয়েছিলেন প্রায় কুড়ি হাজার ভারতীয় ।

যেকথা দিয়ে শুরু করেছি, গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটে গেল গ্রামে। তাই শুরুটা টেক্সাসে হলেও বার্তা সাড়া জাগালো সমস্ত আমেরিকায়। সমাবেশ আর টেক্সাসের রইল না, হয়ে উঠল সমস্ত আমেরিকার ভারতীয়দের মহা সমাবেশ । এ এক নব-ভারতীয়ত্বের উত্থান, একদা বাম ঘেষা ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালির বাঙালি তথ্য-প্রযুক্তিবিদরাও জেগে উঠলেন । দল বেঁধে উড়লেন মহা কুম্ভের উদ্দেশ্যে- জাঠার নেতৃত্বে শ্রীমান যুধাজিত সেনমজুমদার ।

এক প্রাচীন এবং চির নবীন সভ্যতার ধ্বজাবাহক মানুষগুলির এই বিশাল সমাবেশকে উপেক্ষা করতে পারলেন না রাষ্ট্রপতি ট্রামপ. নরেন্দ্র মোদির অনুরোধ সাগ্রহে বরণ করলেন।

এখন দেখা যাক এই মহাকুম্ভ থেকে ভারত ও আমেরিকার প্রবাসী ভারতীয়দের প্রাপ্তি কি ? শুধু এক দিনের হই হুল্লোর নাকি তার বাইরেও কিছু ?

# একদা টেক্সাস গভর্নর এবং পরবর্তী রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট বুশ ২০০৬ সালে ভিসা দেন নি নরেন্দ্র মোদী কে। ২০১৯ সালে টেক্সাসের রাজধানীতে সেই মোদির সভায় (এটা কোন সরকারী অনুষ্ঠান নয় যেখানে প্রটোকল অনুযায়ী মেয়র ও রাষ্ট্রপতি হাজির হন) স্বেচ্ছায় ও সানন্দে সামিল হলেন বর্তমান মেয়র ও রাষ্ট্রপতি। ভারতস্থিত মোদী বিরোধী এক রাজ পরিবার (যাদের প্রচেষ্টায় মোদির ভিসা নাকচ হয়েছিল)এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেবেন আশা করা যেতে পারে।

# মোদির ভিসা নাকচের জন্য সক্রিয় ছিল অনেক খ্রিস্টান সংস্থা, তাদের ভুল শুধরে দিয়ে টেক্সাসের সভায় মার্টিন লুথার চার্চের সদস্যরা তাদের ধর্মীয় গান গাইলেন ভজন গায়কদের সঙ্গে। এ এক অপূর্ব সম্মিলন ।

# এক গুচ্ছ রিপাবলিকান ও ডেমোক্রাট সেনেটর ও কংগ্রেস সদস্যদের সামনে মোদী কোনো রাখঢাক না রেখে পরিস্কার ঘোষণা করলেন ভারতীয় পার্লামেন্ট সত্তর বছর ধরে চলে আসা এক কালো অধ্যায়কে, যা সত্তর বছর ধরে জম্মু কাশ্মির লাদাখের মানুষকে সেকুলার গণতান্ত্রিক মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে সন্ত্রাসবাদীদের অক্সিজেন জুগিয়েছে, ইতিহাসে আবর্জনা স্তুপে নিক্ষিপ্ত করেছে. নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে,

  • As for Modi, he brought the house down when he declared that his “new India” was bidding farewell to open defecation, taxes that are an obstacle to jobs, 350,000 shell companies, 80 million fake names used to defraud the government and — wait for it — Article 37০একদা কাশ্মিরে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে নেহেরু স্নেহধন্য কৃষ্ণ মেননকে রাষ্ট্রসংঘে ছয় ঘন্টা ধরে ভাষণ দিতে হয়েছিল আজ নরেন্দ্র মোদি ছয় মিনিটেরও কম সময়ে আমেরিকার সাংসদদের জানিয়ে দিলেন ভারতের দৃঢ় অবস্থান.

# বর্তমানে কাশ্মীরের সমস্যা মূলত: ইসলামী সন্ত্রাস ও অসহিষ্ণুতা এবং সারা পৃথিবী জোড়া উগ্র ইসলামী সন্ত্রাসের অঙ্গ । সেটা ট্রাম্প সাহেব বোঝেন. তাই পঞ্চাশ হাজার ভারতীয়কে সাক্ষী রেখে সারা দুনিয়াকে জানিয়ে দিলেন যে ইসলামী সন্ত্রাসের মোকাবিলায় ভারতের পাশে তিনি আছেন. নরেন্দ্র মোদির ভাষণে ‘ইসলাম’ শব্দ উচ্চারিত হয়নি । কিন্তু ট্রাম্প পলিটিকাল কারেক্টনেসের ধার ধারেন না, তাই অনায়াসে উচ্চারণ করলেন Radical Islamic Terrorism এর বিরুদ্ধে লড়াই. স্টেডিয়ামের জনতা সবচাইতে জোরালো করতালি ও স্ট্যান্ডিং অভেশান দিয়ে বোঝালেন সব ভারতীয়ের মনের কথা বলেছেন তিনি ।

নিউ ইওর্ক টাইমসের ভাষায়,

  • The president got his biggest cheer by saying the United States was determined to help protect India from the threat of “radical Islamic terrorism.”

# আমেরিকার ভারতীয়রা সেই দেশের সাদা মানুষদের চাইতেও শিক্ষিত ও উচ্চ উপার্জনকারী। তথ্য-প্রযুক্তি, চিকিত্সা, বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম সারিতে আছেন তারা। ছোট হোটেল ও মোটেল ব্যবসা ও ট্রাক পরিবহন ব্যবসায়ও আধিপত্য তাদের । কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক জগতে ভারতীয়রা সেভাবে তাদের জাহির করতে পারেন নি। এখনও স্কুল কলেজে ভারতের ধর্ম, সমাজ, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে অজ্ঞানতা চরমে। এই মহা সমাবেশ, আশা করা যাচ্ছে, আমেরিকার ভারতীয়দের আত্মবিশ্বাস ও আমেরিকার রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষা জগতে ভারতীয়দের এক নতুন ও প্রভাবশালী স্থান করে নিতে সাহায্য করবে ।

# এই মহা সমাবেশকে বানচাল ও বদনাম করার জন্য পাকিস্তানি, খালিস্তানি, বামপন্থী ও ইসলামিক কিছু সংগঠন গত কয়েক মাস ধরে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছে। হিউস্টন আদালতে মোদির বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা করেছে, বাস ভাড়া করেছে বিভিন্ন জায়গা থেকে বিক্ষোভকারীদের স্টেডিয়ামের কাছে জড়ো করার জন্য, উল্লেখযোগ্য হলো, বাসে চড়বার স্টপগুলি ছিল স্থানীয় মসজিদগুলই। কিন্তু জমেন,. লোকজন তেমন হয়নি। খোদ পাকিস্তানি মিডিয়া ব্যাপারটা নিয়ে হই হই করেনি। উগ্র হিন্দুও মোদী বিরোধী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস পর্যন্ত সুর নরম করে আর্টিকেল ছাপিয়েছে “Don’t Mess With Modi In Texas”.


২৩শে সেপেটম্বর, ক্যালিফোর্নিয়া