শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী ২৬, ২০২১

হলদে পাখি বাও ধান খায়, পর্ব -১৯

১৯

কার্তিক মাসের পাঁচ তারিখ মামলার তারিখ পড়ল। প্রথমবারের জন্য গর্ভবতী হওয়া মা জীবনের প্রথম জন্মযন্ত্রণার দিনটির জন্য যেভাবে অজানা ভয় এবং ব্যাকুল আশায় পথ চেয়ে থাকে রসেশ্বর ঠিক তেমনই দিনটির জন্য পথ চেয়ে বসে ছিল। আড়াই কুড়ি টাকা খরচ করে সে শহর থেকে উকিল আনিয়েছে। প্রতি জনকে দশ টাকা হিসেবে মোট ত্রিশ টাকা দিয়ে সে গ্রামের তিনজন মানুষকে সাক্ষী ঠিক করল। তার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না যে সে মামলা জিতবেই। এই পৃথিবীতে ধর্ম এবং ন্যায় বিচার নিশ্চয় এখনও শেষ হয়ে যায়নি। এই মামলার জন্যই সে সর্বস্বান্ত হয়েছে কিন্তু একবার নিজের মাটিটুকু ফিরেপেলে গত তিন মাসের সমস্ত কথাকে একটা দুঃস্বপ্নের মতো ভুলে যাবে। সে পুনরায় নতুনভাবে জীবন আরম্ভ করবে। রসেশ্বর ভেবেছিল যে মামলার দিন পরা মানেই কোনো ভাবে মামলার নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া। কিন্তু প্রায় এক ঘণ্টা সময় ধরে হাকিম উকিল মেম্বারদের নানা কথাবার্তা চলার পরে উকিল তাকে বাইরে ডেকে নিয়ে বলল যে পুনরায় পৌষ মাসের দশ তারিখ নতুন করে মামলার তারিখ পড়েছে। রসেশ্বরেরমাথায় বজ্রপাতহওয়ার মতো অবস্থা হল। ভয় এবং নিরাশায় শুকিয়ে আসা জিভাটাঅত্যন্ত কষ্ট করে ঘুরিয়ে সে উকিলকে জিজ্ঞেস করল-’ কেন প্রভু, আজকে মামলার শেষ হল না কেন?’ রসেশ্বরের অকল্পনীয় অজ্ঞতাদেখে উকিলের মুখে নির্মম বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠল। তার হতাশায় ভেঙ্গে পড়া অবস্থার দিকে তিলমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে তিনি বললেন-’ বীজ মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাতে ফল ধরে না কি? নাকি বিয়ের পরদিনই স্ত্রীর পেট থেকে বাচ্চা প্রসব হয়? মামলার নামে কাছারি পর্যন্ত একটি রাস্তা যদি তৈরি করা না যায় তাহলে তা কীসের মামলা? কেবল একবার নয় কমপক্ষে পাঁচ ছয়বার তারিখ পড়বে, বুঝেছ? তাছাড়া তোমার সাক্ষী আজ কি করেছে? তিনজন সাক্ষীর কথা বলেছিলে, তার মধ্যে দুজন আজ এলই না। বাকি যে জন এল,তারকথাও দেখছি সনাতনের পক্ষে গেল। আগামী বারের জন্য অন্য সাক্ষী ঠিক করবে। এখন যাও মামলার দিনটা ভালো করে মনে রাখবে। পৌষ মাসের দশ তারিখ মামলার দিন, তার মানে আবার টাকা জোগাড় করার চিন্তা। ভাঁড়ারের শেষ মুঠোধান পর্যন্ত শেষ হয়ে এসেছে। সাধারনত বড় কোনো বিপদ-আপদ না হলে ভাঁড়ারের ধানে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত চলে যায়। ভাঁড়ারের সঞ্চিত ধান শেষ হওয়া মানে অগ্রহায়ণের নতুন ধান খাওয়া শুরু হওয়া। এবার আর সেই সুযোগ রইলনা। বিউলির ডাল সরষে এক মুঠো করে খাওয়ার জন্য হালের একটা গরু কে বিক্রি করে দিতে হল। তারমানে এবার তার বিউলি সরষে নেই, আউশ ধানের চাষ নেই,, আগামী বছর শালি ধানের চাষ ও শীতকালের বৃষ্টির মতোই অনিশ্চিত। কোনোভাবে যদি মামলায় হেরে গিয়ে জমিটা হাতছাড়া হয় তখন তাকে ভিখারির জীবনযাপন করতে হবে কিন্তু এখন সে পাঁচটি ছেলে-মেয়েসহ পরিবারটাকে কীভাবে প্রতিপালন করবে এবং হতাশায় উন্মত্ত হয়ে পড়া তার মন একবার ভাবল সংসারের ঝামেলা ভোগার জন্য মাখনী যেভাবে বেঁচে রইল না, বাকি ছেলেমেয়েগুলিও সেভাবে অপরিচিত অসুখে পড়ে মরে গেলেই বোধহয় ভালো হত। ওরাও রক্ষা পেত,রসেশ্বরও, মুক্তহতেন। মাখনীর মৃত্যুর পরেই রসেশ্বরের স্ত্রী বিছানা নিয়েছিল। না খেয়ে না ঘুমিয়ে দিনরাত কান্নাকাটি করে মানুষটার কঙ্কালটুকু শুধু বাকি ছিল। একদিন রসেশ্বর কোথাও থেকে এসে বলল ছেলে মেয়েগুলির কী হবে?আমি কালিনাথ মৌজাদারের ঘরে বন্দোবস্ত করে এসেছি। আগামীকাল থেকে তুই তাদের জমিতে ধান কাটতে যাবি। আমিও তাদের ধানের ভার বইব। দশ মণ ধানের ব্যবস্থা করে এসেছি।

সাত পুরুষ ধরে নিজের জমির ফসল খেয়ে পরিবার প্রতিপালন করতে থাকা রসেশ্বরের পরিবার এক দিনেই গোলামে পরিণত হল। পরের দিন সকালে রসেশ্বরের স্ত্রী আধমরা দেহটা টেনে হেঁচড়ে নিয়ে একহাতে চোখের জল নাকের জল মুছতে মুছতে কালিনাথের ক্ষেতে ধান কাটতে গেল। পেছন পেছন রসেশ্বর। নিজের জমি পড়ে রইল, নিজের ভাঁড়ার শূন্য হয়ে রইল ।স্বামী স্ত্রী মিলে অন্যের ক্ষেতের ধান দিয়ে ভাঁড়ার ভরাতে লাগল। যাইহোক, এভাবে কিছুদিনের জন্য রসেশ্বরের ঘরে নূন ভাতের সংস্থান হল। এদিকে দেখতে দেখতে পৌষ মাসের দশ তারিখ আসার সময় হয়ে গেল। এর মাশুল আর সাক্ষী আনার খরচ কোথা থেকে জোগাড় হবে? অন্য কোনো উপায়ের কথা চিন্তা করার মতো রসেশ্বরের সময় ছিল না। মগজের শক্তিও ছিল না। শেষে হালের শেষ গরুটাও সে মাত্র একশো টাকায় বিক্রি করে দিল। গরুটা কিছুটা বুড়ো হয়েছিল।একশোটাকা যে পেল তাতেই রসেশ্বর সৌভাগ্য বলে মনে করল। পৌষের দশ তারিখেও যখন মামলার নিষ্পত্তি হল না। পুনরায় ফাল্গুনের প্রথম সপ্তাহে দিন পড়ল।, এবার রসেশ্বর বিন্দুমাত্র অবাক হল না। সারা জীবন ধরে কোমরে খোঁচা খেতেখেতে পরে হাজার খোঁচা দিলেও টের না পাওয়া বুড়ো হালের গরুরমতো রসেশ্বরের মনি যন্ত্রণার অনুভূতি ক্রমশ নাই হয়ে আসছিল। সাঁতরে সাঁতরে শেষে সম্পূর্ণ অবশ স্রোতে গা ছেড়ে দেওয়া মানুষের মতো রসেশ্বর অবশেষে ঘটনাপ্রবাহের স্রোতেনিজেকে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিল।ডুবে মরলেও মরবে স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে কোনো অজানা অচেনা তীরে পৌঁছেদিলেও দেবে। মোটকথা রসেশ্বরের নিজের করার মতো কিছু নেই। ভাগ্যের উপর সে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করল।