বুধবার, ডিসেম্বর ২, ২০২০

হলদে পাখি বাও ধান খায়, পর্ব -৬

ছয়

বিকেলের দিকে রসেশ্বর বড় ছেলে সোনাকে ডেকে বলল ‘সোনা, তুই রাঙ্গলী গাভিকে এখনই মাঠ থেকে খুঁজে নিয়ে আয়।’ গ্রামের ছোট ছোট ছেলেরা অভিনয়ের আয়োজন করছে। ওদের অভিনয়ের জায়গা হল রত্নেশ্বরদের গোয়ালঘর। এবার সোনার ভাগেও একটা চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ এসেছে। তার জন্য সে তীর-ধনুক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বাবার কথা শুনে সে অবাক হয়ে বলল- ‘রাঙ্গলি গাভি তো ঠিক সময়ে বাড়িতে চলে আসে। আজ আবার তাকে খুঁজে আনতে হবে কেন?’

‘রাঙ্গলীকে এখনই এক জায়গায় নিয়ে যেতে হবে’- রসেশ্বর ইতস্তত করে বলল। সোনা ধনুকের কাজ বন্ধ করে রেখে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল-‘এখনই এক জায়গায় নিয়ে যেতে হবে? কোথায়?’

ছেলের মুখের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে রসেশ্বর বলল,‘ডিম্বেশ্বর মণ্ডলের বাড়িতে।’

পরম অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে সোনা আবার জিজ্ঞেস করল-‘ কেন?’

অপরাধীর মতো করুণ মুখ ভঙ্গি করে রসেশ্বর উত্তর দিল- ‘আমি রাঙ্গলীকে ডিম্বেশ্বর মন্ডলের কাছে বিক্রি করে দিয়েছি।’ বজ্রাহত মানুষের মতো সোনা কিছুক্ষণ নীরব নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হাতের তীর ধনুক ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে এক লাফে দাড়িয়ে বলল-‘আমি রাঙ্গলীকে কখনও বিক্রি করতে দেব না, কখনও দেব না। তোমার এই কয়েকদিন ধরে কী হয়েছে বলতো বাবা? তুমি কেন পাগলের মত কাজগুলি করছ?

বাপ-ছেলের কথাবার্তার মধ্যে রসেশ্বরের স্ত্রী কখন এসে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল ওদের কেউ বুঝতেই পারেনি। ছেলের কথার উত্তরে কিছু একটা বলতে যেতেই স্ত্রী খুব শান্ত এবং গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল-‘আজ রাঙ্গলীকে বিক্রি করছে, কাল বোধহয় ছেলেমেয়েকে এবং তাদের মাকেও কারও কাছে বিক্রি করবে। চারপাশ থেকে তাড়িয়ে এনে জালে ফেলা হরিণের মতো রসেশ্বর কিছুক্ষণ নীরব এবং নিশ্চল হয়ে রইল। কেউ তার কথা বুঝতে চাইছে না, সে সম্পূর্ন অসহায় এবং নিঃসঙ্গ। একটা প্রচন্ড অভিমানে তার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসার উপক্রম হল। দেহ এবং মনের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে কোনো ভাবে চোখের জল সম্বরণ করে রাখল। গলার স্বর যেন স্বাভাবিক থাকে সেই জন্য সে কিছু সময় অপেক্ষা করল। তারপর সে শান্ত কন্ঠে বলল –‘আমার কী বিপদ হয়েছে তোরা কেউ বুঝবি না সোনা। তুই কেবল গাভিটার কথাই চিন্তা করছিস। আমি এখন বাড়ির নটি প্রাণের জীবন কীভাবে রক্ষা করব তা চিন্তা করে মরছি। আমার সামনে এখন ভয়ঙ্কর বিপদ সোনা। যা,দেরি করিস না। দৌড়ে গিয়ে মাঠ থেকে রাঙ্গলীকে খুঁজে নিয়ে আয়।’

রসেশ্বরের মুখের ভঙ্গি এবং কণ্ঠস্বরে এমন একটি সীমাহীন যন্ত্রণা ফুটে উঠল যে সোনা বলার মত আর কিছুই খুঁজে পেল না। বাবার এই ধরনের ভেঙ্গে পড়া আগে আর কখনও দেখেনি। তার ছোট্ট প্রাণটা মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারল যে সত্যিই একটি অভূতপূর্ব ভয়ঙ্কর বিপদ তাদের সমস্ত ঘরটাকে গ্রাস করতে মুখ মেলে এগিয়ে আসছে। সেই বিপদের তুলনায় রাঙ্গলীকে হারানোর দুঃখ অতি তুচ্ছ। বাবার মুখের দিকে তাকানোর মতো তার আর সাহস হল না। তার এই ধরনের অনুভব হল যে বাপের চোখের সামনে থেকে পালিয়ে যেতে পারলেই যেন শেষ রক্ষা হয়। কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ সে আলপথের দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতে লাগল।

সন্ধ্যে হওয়ার আগে সোনা রাঙ্গলী নিয়ে বাড়ি ফিরে এল। রসেশ্বর তখনও বারান্দায় মাটির ওপরে নিস্তব্ধ হয়ে বসেছিল। সোনা এবং রাঙ্গলি এসে উঠোন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রসেশ্বর ছেলের মুখের দিকে একবার তাকাল। কাঁদতে কাঁদতে তার চোখ দুটো ফুলে উঠেছে। চোখের জল মুছতে মুছতে তার চোখ দুটো পাকা লঙ্কার মত লাল হয়ে উঠেছে। পরের মুহূর্তে রসেশ্বর চোখ দুটো ছেলের মুখ থেকে সরিয়ে নিল। সোনার মনের দুঃখ সে খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছে । তার জন্য রাঙ্গলী কেবল একটা গাভি নয়, সে তার খেলার সঙ্গিন্‌ সুখ-দুঃখের সহচরী। প্রানের বন্ধু, সকাল-বিকাল সে রাঙ্গলীর গলা জড়িয়ে ধরে নানাভাবে খেলা করে, যেন সে একটা গাভি নয়। সে সোনার মা বা দিদির মতো একটি অত্যন্ত আদরের বন্ধু। বিকেলে সে তাকে মাঠ থেকে খুঁজে এনে গোয়ালঘরে বাঁধার সময় অনেকক্ষণ তার গা হাত পা টিপে নানা আদরের নামে তাকে ডেকে ডেকে এভাবে কথা বলে যে দূর থেকে মানুষ শুনলে ভাববে যে সে যেন কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলছে। এই কয়েকদিন রসেশ্বরের কী হয়েছে মুহূর্তে মুহূর্তে কথায় কথায় তার চোখ দুটো কেবল চোখের জলে ভরে উঠতে চায়। গামছা দিয়ে এমনিতেই মুখ মোছার ছলে চোখ দুটো একবার মুছে নেয়। তারপর সে উঠে দাড়িয়ে রাঙ্গলীর কাছে গিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে-‘চল মা, চল। তোর জায়গা আমাদের মতো গরিবের ঘরে নয়। যেখানে তোর আসল জায়গা সেখানে তোকে রেখে আসুক গিয়ে। রাঙ্গলীকে তাড়িয়ে নিয়ে ডিম্বেশ্বরের ঘরের দিকে নিয়ে যেতে চাইছিল,ঠিক তখনই স্ত্রী পেছন থেকে দেখে বলল, ‘দাঁড়ান।’

রসেশ্বর পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে স্ত্রী এসে উঠোনে দাঁড়িয়েছে। তার ডান হাতে এক হাড়ি জল বা হাতে একটা কলাপাতায় কিছু কিছুটা নূন। কাঁধে একটা নতুন গামছা। রসেশ্বর অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। স্ত্রী রাঙ্গলীর মুখের সামনে মাটিতে নুনের সঙ্গে কলাপাতা রাখে।তারপরে রাঙ্গলী নূনটুকু খেতে খেতে সে হাড়ির জল দিয়ে রাঙ্গলীর পা গুলি ধুয়ে দিতে লাগ্ল।পা ধুইয়ে দিয়ে সে নতুন গামছা দিয়ে রাঙ্গলীর পা দুটো মুছে দেয়। তারপরে নতুন গামছা গলায় বেঁধে দেয়। ইতিমধ্যে গোধূলির অন্ধকার ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে এসেছিল। তবু রসেশ্বর স্পষ্ট দেখতে পেল স্ত্রীর চোখ দুটি থেকে ঝর ঝর করে জল গড়িয়ে পড়ে গাল ভাসিয়ে দিচ্ছে।রাঙ্গলী নূন এবং কলাপাতা খেয়ে আরও নূনের আশায় মাথা তুলে রসেশ্বরের স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।রসেশ্বরের স্ত্রী রাঙ্গলীর মুখটা বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল,রসেশ্বর পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল ভূমিকম্পে পৃথিবী কাঁপার মতো স্ত্রীর শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। সোনা সমগ্র দৃশ্যটা এতক্ষণ ধরে নীরবে দেখছিল। কিন্তু যেই সে বুঝতে পারল যে এখন রাঙ্গলীর বিদায়ের সময় হয়েছে, সে লাফ মেরে ঘরের ভিতরে ঢুকে গিয়ে একেবারে বিছানায় শুয়ে পড়ল। আস্তে করে স্ত্রীকে ঠেলা মেরে রস্বেশ্বর বলল,-‘তুই চলে যা। এখন আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে।’

রাঙ্গলীকে তাড়িয়ে নিয়ে রসেশ্বর আলপথের দিকে এগিয়ে গেল।

স্ত্রী এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে রাঙ্গলী যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। গোয়ালঘরের সামনে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাঙ্গলী আল পথের দিকে না গিয়ে গোয়াল ঘরে ঢোকার চেষ্টা করলে তাকে গোয়াল ঘরে ঢোকা থেকে বাধা দেবার জন্য যথেষ্ট ঠেলা ধাক্কা এবং মারপিট করতে হল। রাঙ্গলী যখন চোখের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল রসেশ্বরের মনে হল যেন একটি গাভি নয়, নিজের বড় মেয়েকে সে চিরকালের জন্য পরের ঘরে বিদায় দিয়ে পাঠাল। শোকে-দুঃখে স্থির হয়ে দাঁড়াতে না পেরে স্ত্রী মাটিতে বসে পড়ল।


ক্রমশ