শুক্রবার, এপ্রিল ১৬, ২০২১

হলদে পাখি বাও ধান খায়, পর্ব -১৩


(তেরো)

একদিন একরাত রসেশ্বর মৃত মানুষের মতো বিছানায় পড়ে রইল। স্ত্রী দু'বেলা দু'মুঠো ভাতের জোগাড় কোথা থেকে কীভাবে করেছে সে খবর নেবার মত তার শরীরে শক্তি ছিল না। এই একদিন একরাত সে বাড়ির কারও সঙ্গে একটুও কথা বলে নি। দ্বিতীয় দিন রাতে ছেলে মেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার পরে সেই প্রথম মুখ খুলল- ‘এইযে শুনছো?’

স্ত্রী মুখে কোনো শব্দ করল না। কিন্তু এপাশ-ওপাশ করে বাঁশের মাচার বিছানায় শব্দ তুলে সে জানিয়ে দিল যে সে জেগেই আছে। ‘'কার্তিক মাসের পাঁচ তারিখ মামলার দিন পড়েছে' -রসেশ্বর বলতে লাগল-‘মামলার জন্য অনেক টাকা লাগে,কেরানি বাবুর ক্রোধ নিবারণের জন্য টাকার প্রয়োজন, উকিল আনতে টাকা দিতে হবে।সাক্ষীকে দেবার জন্য টাকার দরকার। মোটকথা চারপাশে কেবল টাকা, টাকা আর টাঁকা।

রসেশ্বর আরও কিছু বলবে বলে স্ত্রী কান করেছিল কিন্তু মানুষটা হঠাৎ নীরব হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে স্ত্রী বলল-‘তোমার মামলার জন্য টাকা দরকার, আমাদের খাওয়ার জন্য টাকার দরকার নেই? তোমার মাটি যতদিন উদ্ধার না হয় ততদিন আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে নাকি?

স্ত্রীর খোঁচা দেওয়া কথা শুনে রসেশ্বরের চট করে মাথা গরম হয়ে গেল। সামনে পেলে সে হয়তো স্ত্রীকে দুই এক ঘা বসিয়ে দিত। কিন্তু পাঁচটি ছেলে মেয়েকে ডিঙিয়ে গিয়ে স্ত্রীকে মারার মতো তার দেহে বা মনে শক্তি ছিলনা। চট করে ওঠা ক্রোধকে শান্ত করার জন্য সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আবার বলল-‘তোরা সব কটা মরে গেলেও তো আমি কিছুটা রক্ষা পেতাম। আমার রক্ত শুষে খাওয়ার জন্য তোরা প্রত্যেকেই বেঁচে আছিস। কখন রাগ উঠে যাবে, সবকয়টিকে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে নিয়ে দরজা বন্ধ করে ঘরে আগুন লাগিয়ে দেব। তখন আমাকে চিনতে পারবি। এখন শোন, চুপ করে থেকে আমার ক্রোধের আগুনে ঘি ঢালিস না,- এতগুলো টাকা এখন আমি কোথা থেকে পাব?’

রসেশ্বরের অসহায় অবস্থা দেখে দুঃখে স্ত্রীর বুক ভেঙ্গে গেল।সপ্তবীর চক্রব্যূহে প্রবেশ করে অভিমন্যুকে বধ করার মতো সংসারে চারপাশ থেকে সহজ সরল মানুষটাকে ঘেরাও করে মারার উপক্রম করেছে। কিন্তু কথায় সহানুভূতির কোনো চিহ্ন না দেখিয়ে কর্কশ স্বরে বলল-‘তুমি পুরুষ মানুষ হয়ে টাকা কোথা থেকে পাবে সে কথা জান না, মেয়ে মানুষকে জিজ্ঞেস করতে এসেছ।আমি সেসবের কিজানি? সংসার যখন পেতেছ কীভাবে খাওয়াবে সেটাও জানতে হবে। খাওয়াতে না পারলে তুমি যেকথা বলেছিলে সেটাই কর- ঘরে আগুন দিয়ে আমাদের সবাইকে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরে ফেল।পুরুষ আর কাকে বলে?’

স্ত্রীর কথা শুনে রসেশ্বরের আবার রাগ হয়ে গেল। কিন্তু বিদ্যুৎ চমকের মতো রাগ নাই হয়ে তার জায়গা দখল করল একটা গভীর দুঃখের অনুভূতি। দৈব দুর্বিপাকে পড়ে আজ তার এরকম অবস্থা হল যে বিবাহিত স্ত্রী ও তার পৌরুষকে উপহাস করার মতো সাহস পায়।অথচ স্ত্রী যে কথাগুলি বলছে তা তো মিথ্যা নয়। উত্তরে বলার মতো তার আর কিছুই নেই। কিছু একটা বলতে গিয়েও তার ঠোঁট দুটি থর থর করে কেঁপে উঠল। সে তখন বুঝতে পারলো যে একটা প্রচন্ড কান্না তার গলা ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তার খুব লজ্জা হল, পুরুষ মানুষ হয়ে সে আজকাল কেবল কথায় কথায় মহিলাদের মতো কেঁদে উঠে- নিজের উপর তার ভীষন রাগ হল। খুব কষ্ট করে সে একটা কর্কশ এবং কঠিন কথা বলার চেষ্টা করল-‘সময় হলে আমি নিজেই ঘরে আগুন দিয়ে তোদের পুড়িয়ে মারব, তোর হুকুমের জন্য আমি অপেক্ষা করে থাকব না।’ এই কথাও মনে রাখবে- আমি নিজে খুঁজে নিয়ে এসে তোকে বাড়িতে আনি নি। তোকে আমার সঙ্গে বিয়ে দেবার জন্য তোর বাপ আমার পায়ে ধরে অনুরোধ করেছিল।কোনো লাট সাহেবকে যদি বিয়ে করার ইচ্ছে ছিল তাহলে বাপকে বললিনা কেন? এখনও যদি কোনো নেওয়ার লোক থাকে তাহলে চলে যেতে পারিস। আমার কোনো আপত্তি নেই।’

কোন কথাগুলি স্ত্রীর মনে সবচেয়ে বেশি আঘাত দিতে পারে সে কথা রসেশ্বর ভালো করে জানে। তার উদ্দেশ্য সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধি হল।রসেশ্বরে কথা শুনে স্ত্রী দুই কানে আঙুল দিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।–‘হে ভগবান তুমি এই মুহূর্তে আমাকে কেন তুলে নিচ্ছ না? সংসারে ধর্ম নামে যদি কোনো জিনিস থেকে থাকে, তাহলে এই ধরনের মহাপাপের কথা যে মানুষের মুখ থেকে বের হয় সেই মুখে নিশ্চয়ই পোকা পড়বে। এই ধরনের মানুষের নরকেও জায়গা হবে না। মুখে যা আসে তাই বলে বলে সে অনেকক্ষণ ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদল।

রাত দুপুর হতে চলেছে। তথাপি স্বামী-স্ত্রী দুজনের কারও চোখে ঘুম নেই। রসেশ্বরের মনে এরকম একটি জেদ চেপেছে রয়েছে যে ভোর হওয়ার আগেই টাকার একটা সমস্যার সমাধান হতে হবে। পুরো একদিন একরাত সে কথাটা ভেবে ভেবে বিছানায় আধমরা হয়ে পড়ে আছে। রাতের মধ্যে সমস্যাটির কোনো একটি সমাধান না হলে আগামীকাল সকালে সে বিছানা থেকে উঠতে পারবে না। স্ত্রীর কান্না বন্ধ হওয়া পর্যন্ত সে কোনোরকম ভাবে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে রইল। স্ত্রী কান্না থামানোর সঙ্গে সঙ্গে সে অতি সহজ ভাবে, যেন এতক্ষন কোনো ঝগড়াঝাঁটি হয়নি, এরকম সুরে বলল,একটা উপায় আছে বুঝেছ। সোনাকে কারও বাড়িতে চাকরিতে ঢুকিয়ে দিয়ে কয়েক কুড়ি টাকা অগ্রিম আনতে হবে। জমিটা মামলার হাত থেকে মুক্তি পেলেই চাষ করতে পারলে নিজে খাইবা না খাই সোনাকে সঙ্গে সঙ্গে মুক্ত করে আনব। রসেশ্বরের কথা শেষ হয়েছে কী হয়নি স্ত্রী গায়ের কাপড়টা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বিছানায় বসে বাঘিনীর মতো গর্জন করে উঠল-‘তুমি কি কালা? সোনার পড়া ছাড়িয়ে দিয়ে লোকের ঘরে চাকরিতে ঢুকাবে। এরকম কথা মুখে আনার আগে তুমি গলায় পাথর বেঁধে নদীতে ডুবে মর না কেন? এরকম কথা আজকে বললে তো বললে,আর যেন তোমার মুখে এই ধরনের কথা না শুনি। আমার কথা না শুনে যদি তুমি সোনাকে কারও বাড়িতে চাকর হিসেবে রাখ তাহলে তুমি ঠিক জানবে আমাকে তুমি আর জীবিত অবস্থায় পাবে না। পরের মুহূর্তে আমিও গলায় দড়ি দিয়ে মরব।’

সোনা এবং মায়ের মধ্যে আরও তিনটি ছেলে মেয়ে ঘুমোয়। রসেশ্বরের স্ত্রী মাঝখানের ছেলেমেয়েগুলোকে বেড়ার দিকে ঠেলে দিয়ে নিজে এসে সোনার কাছে শুয়ে তাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল। যেন সেই মুহূর্তেই বাপ তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া থেকে সে বাধা দিতে চেষ্টা করছে। রসেশ্বর কিছু সময় চুপ করে রইল। মনে মনে চিন্তা করে সে বুঝতে পারল যে জোর করে বা তর্ক করে স্ত্রীকে সম্মান করার চেষ্টা করলে ব্যাপাটা খারাপ হবে। কণ্ঠস্বরকে যতটা সম্ভব কোমল করার চেষ্টা করে সে বলল-‘কথাটা শুনেই তুই সাপের মতো ফণা ধরে ফোঁস করে উঠলি। ঠান্ডা মাথায় কথাটা ভেবেচিন্তে দেখছিস না কেন আমাদের ছেলে পড়াশোনা করে দারোগা বা হাকিম হবে বলে তুই আশা করছিস নাকি? পড়াশোনা যতই করুক না কেন, লাঙ্গলের মুঠি হবে তার শেষ সারথি। কিন্তু তার জন্য যদি আমি জমিটাকে ঝামেলা মুক্ত করে যেতে না পারি তাহলে আমি মরে যাওয়ার পরে সে খাবে কি? ওকে তো আমি সারা জীবনের জন্য পরের ঘরে চাকর রাখতে চাইছি না। খুব বেশি ছয় মাস বা এক বছর। এই ছয় মাস এক বছরের জন্য তুই ওকে চাকর রাখতে চাইছিস না।কিন্তু জমিটা মুক্ত করতে না পারলে তাকে যে সারাজীবন লোকের বাড়িতে চাকর খাটতে হবে সে কথাটা ভেবে দেখেছিস? ঠিক আছে আমার কথা যদি মানতে না চাস আমি কিছুই বলব না। কিন্তু একথা জেনে রাখিস আজ থেকে আমি নিজে পথের ভিখারি হলাম। এই আমার ছেলেমেয়েদের পথের ভিখারী করে রেখে যাবার ব্যবস্থা করল...

রসেশ্বর পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। সে স্ত্রীকে বুঝিয়ে দিল যে তার দিক থেকে কথাবার্তার সেখানেই অন্ত পড়ল। এখন স্ত্রী কি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে দেখা যাক। রসেশ্বসরের অকাট্য যুক্তির উত্তরে কিছুই বলতে না পেরে স্ত্রী এতটাই অসহায় অনুভব করতে লাগল যে তার সমস্ত শরীর মৃত মানুষের মতো অসহায় হয়ে পড়ল। রাতের অন্ধকারের চেয়ে শতগুণে বেশি আর ও ভয়ঙ্কর এক অন্ধকার পাষানের মতো তাকে চেপে ধরল। সে অনুভব করল যে সেই অন্ধকারের চাপে তার হাড়গোড় ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আর যেন অন্তহীন দূর থেকে, তার বুকের গভীরতা থেকে একটা ক্ষীণ অস্ফুট আর্তনাদ বের হয়ে আসছে- ‘ভগবান’।