শনিবার, মে ৮, ২০২১

হলদে পাখি বাও ধান খায়, পর্ব -১৭

১৭

সকালবেলা রসেশ্বরের স্ত্রী বলল-‘আমাকে একটা টাকা দাও তো, কোথাও থেকে একটু দুধ নিয়ে আসি।’

দুধ আনতে গিয়ে রসেশ্বরের স্ত্রী একঘন্টা পরে ফিরে এল। অনাহার এবং ঘুমের ক্ষতিতে ক্লান্ত রসেশ্বর মেয়ের পাশেই আধ-মরা মানুষের মতো পড়ে রইল।

স্ত্রীর ফিরে আসার শব্দ শুনে সে ক্লান্ত হয়ে প্রশ্ন করল-‘দুধের খোঁজ করতে তোমার এত সময় লাগল? গিরিজাদের বাড়িতেই তো দুধ বিক্রি করে।’

স্ত্রী অবশ ভাবে বিছানায় বসে পড়ে বলল- ‘আমি কি শুধু দুধের খুঁজে গিয়েছিলাম? আমি অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম একের পর এক বিপদ আমাদের সংসারে ঘনিয়ে আসছে। নিশ্চয় কোনো গ্রহ দোষের ফেরে বা উপরি দোষের ফেরে এমনটা হচ্ছে। আমি যা ভেবেছিলাম তাই হয়েছে। দুধ আনতে যাওয়ার অজুহাতে আমি গণেশ্বর বাপুটির বাড়িত গিয়েছিলাম। পঞ্জিকা দেখার পরে বাপুটি গণনা করে বলল আমাদের বাড়িতে নাকি উপরি দোষ রয়েছে।

তিনি পুজোর নামে নয় জন ভক্তকে কালো পাঁঠা,কালো হাঁস বা যে কোনো এক ধরনের কালো মাছে ভাত খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

তার সঙ্গে একজন বামুনকে একটি কালো পাঁঠা, সম্ভব না হলে একটা কালো হাঁস দান করতে বলেছে। তুমি অন্য সব কাজ ছেড়ে আজকের মধ্যে হাঁস দুটো কেনার ব্যবস্থা কর। আগামীকাল মঙ্গলবার অতিথিকে খাওয়ানোর ভালো দিন। সকালবেলা বামুনের ঘরে হাঁসটা দান করে এসে দুপুরবেলা বামুনকে ভাত খাওয়াতে হবে। স্ত্রীর কথা শুনে রসেশ্বরের হাতটা নিজে থেকে পকেটের দিকে গেল। সে হাত দিয়ে টাকাগুলি অনুভব করে দেখল। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে সে বলল-‘সোনাকে লোকের বাড়িতে বন্ধক রেখে এই টাকাগুলি আমি জমির মামলায় খরচ করব বলে এনেছিলাম। কিন্তু তুই যা যা বললি তা করতে হলে তো মামলায় খরচ করার জন্য একটি টাকাও বেঁচে থাকবে না। তারপরে আমি কাকে বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করব?

স্ত্রী বিছানা থেকে চট করে উঠে দাঁড়িয়ে ক্রোধের সঙ্গে বলতে লাগল-‘তোমার কি সাধে এই দুর্দশা হয়েছে? গ্রহদোষ এবং উপরি দোষ কাটানোর জন্য বামুনকে দান করার কথা শুনে তোমার মুখ দিয়ে যদি এই ধরনের কথা বের হয় তাহলে তুমি আঘাটে না মরে কে মরবে? তোমাকে দেবতা বামুন,উপরি পুরুষ কাউকে সন্তুষ্ট করতে হবে না। তুমি কেবল তোমার হাকিম, মন্ডল, কেরানি, পেয়াদা, এদের তুষ্ট করে থাকলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।।যা খুশি কর, আমার আর বলার কিছু নেই।‘ স্ত্রী চট করে উঠে গিয়ে দুধ গরম করার জন্য তুষের আগুনে ফুঁ দিতে লাগল। রসেশ্বর শোয়া অবস্থায় কিছুক্ষণ স্থির হয়ে পড়ে রইল। তার স্ত্রী এখনও গ্রহ-উপগ্রহ, দেবতা উপদেবতায় সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করে সহজ বিশ্বাসের দৃঢ় ভূমিতে স্থির। স্ত্রী সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং নিশ্চিন্ত। কিন্তু রসেশ্বর মাঝেমধ্যে সভা সমিতিতে গিয়ে, কার্তিকের দোকানে ট্রানজিস্টর রেডিও শুনে শুনে নতুন দিনের কিছু কথার আভাস পেয়েছে। অথচ পুরোনো বিশ্বাস এবং সংস্কার থেকেও সে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হতে পারেনি। তার অবস্থা এখন দুই নৌকায় পা রাখার মতো। একদিকে ভয় এবং অন্যদিকে বিশ্বাসের টানা হেঁচড়ায় সে দোদুল্যমান।

স্ত্রীর কথা শুনে তার মনে সত্যি সত্যি ভয় হল। স্ত্রী যে কথা বলছে, যে উপরি দোষের জন্যই তার সংসারে এই ধরনের বাধা বিপত্তি ঘটছে - এই ধরনের একটি চিন্তাকে সে মন থেকে জোর করে উড়িয়ে দিতে পারছে না। শৈশবে তার মা প্রায়ই বলা একটি কথা তার চট করে মনে পড়ে গেল। ওদের পরিবারটা ছিল ‘রাতে-খাওয়া’ সম্প্রদায়ের ভক্ত। রসেশ্বরের বাবা ছিল সেই অঞ্চলের দীক্ষা দিতে পারা ‘চার-সেবা’ উত্তীর্ণ সাধু। প্রতিবছর ওদের বাড়িতে ‘বরসভার’ আয়োজন করা হত। যারা দীক্ষিত নয় তাদের সেই সভায় উপস্থিত থাকা তো দূরের কথা, আশে পাশে থাকার অধিকারও দেওয়া হত না। রসেশ্বর যখন খুবই ছোট, ওদের বাড়ির দুই মাইল দূরের সরকারি মধ্য বিদ্যালয়ের চুতিয়া না কোথা থেকে যেন একজন মানুষ শিক্ষক হয়ে এসেছিল। তিনি নাকি ‘রাতে খাওয়া’ সম্প্রদায়ের গুনাগুণ সংগ্রহ করে একটি বই লিখতে চেয়েছিলে্ন। একদিন তিনি রসেশ্বরের বাবার কাছে এসেছিলেন। বাবা শিক্ষকের প্রস্তাব শুনে লাফিয়ে উঠে ছিলেন। তাঁর মতে অদীক্ষিত মানুষকে শাস্ত্রের এই ধরনের গুপ্ত কথা ব্যক্ত করার চেয়ে বড় পাপ আর কিছুই হতে পারে না। সেই বছরের কোনো একটি মাসে রসেশ্বরদের বাড়িতে ‘বরসেবার’ আসর বসে। সেই শিক্ষকটি রাতের বেলা সবার অজান্তে চুপি চুপি এসে বেড়ার ফাঁক দিয়ে ‘বরসেবার’ আচার-অনুষ্ঠান দেখছিলেন। পরেরদিন সকালে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গেলেন। মহাপাপের ফল হাতে হাতে পাওয়ার পরে শিক্ষকটি নিজেই রসেশ্বরের বাবার কাছে সবকিছু স্বীকার করেছিলেন। গুরুকে অনেক দান দক্ষিনা দিয়ে প্রার্থনা করার পরেও শিক্ষকটি নিজের দৃষ্টিশক্তি আর ফিরে পেলেন না। আজ অনেকদিন পরে সেই কথাটি মনে পড়ে যাওয়ায় একটা গোপন ভয়ে রসেশ্বরের বুক কেঁপে উঠল। আজ কয়েক বছর ধরে উপরি পুরুষের নামে তাদের ঘরে কোনো পূজা-পার্বণ হয়নি। রসেশ্বরের সমস্ত বিপদের মূলে মনে হয় উপরি পুরুষের অভিশাপই দায়ী। নাহলে সাত পুরুষ ধরে ভোগ দখল করে আসা জমির জন্য এভাবে একটা মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পড়ে তার এত ভোগান্তি কেন হবে?

সমস্ত দুঃখ ক্লান্তিকে কাটিয়ে উঠে রসেশ্বর বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। মাখনী অসুস্থ হয়ে না পড়লে স্ত্রী কখনও গণেশ্বর বাপুর কাছে পঞ্জিকা দেখতে যেত না। এটা উপরি পুরুষের কোনো সঙ্কে্ত হবে মনে হয়। ন-পুরুষের জন্য আধসের চাল এবং বামুনের দক্ষিণার ব্যবস্থা আজকের ভেতর যেভাবেই হোক করতে হবে ।

টীকা-

বরসেবা-জনগণের জন্য আয়োজিত ধর্মীয় উৎসব আদি পালনের জন্য আয়োজিত বড় সভা।

রাতে খোয়া সম্প্রদায়-অসমের একটি গুপ্ত ভক্ত সম্প্রদায়। কোনো ধর্মানুসারে জাতিভেদ না করে মধ্যরাতে গুপ্তভাবে দেবতা পূজা এবং অখাদ্য ভোজন করা রীতি।