শনিবার, জানুয়ারী ২৩, ২০২১

হলদে পাখি বাও ধান খায়, পর্ব -৯

(নয়)

রসেশ্বর জীবনে মামলা-মোকদ্দমা করেনি। কাছারিতে কার কাছে কী করতে হবে সে কিছুই জানেনা। ডিম্বেশ্বর মন্ডল শিখিয়ে দেওয়া অনুসারে সে প্রথমে একজন মুহুরির কাছে গেল। তার সমস্ত কথাবার্তা বলে মুহুরির মাধ্যমে দরখাস্ত লিখে নিতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগল। দরখাস্ত লেখা শেষ করে মুহুরী টিকেটের দাম,কাগজের দাম এবং লেখার খরচ নিয়ে দশ টাকা দাবি করল। রসেশ্বরের মনে একটা ভয় ছিল যে কাছারিতে আদব-কায়দা না জানা বোকা মানুষ পেলে নিশ্চয়ই তাকে ঠকিয়ে বেশি টাকা আদায় করবে। দশ টাকা থেকে কয়েক টাকা কমানোর জন্য অনেক অনুরোধ করল কিন্তু মহুরি কিছুতেই রাজি হল না। অবশেষে সেই দশ টাকা দিয়ে দরখাস্ত নিয়ে হাকিমের অফিসের দিকে এগিয়ে গেল।তার পকেটে বাকি থাকল পাঁচ টাকা। একটা অজানা ভয়ে তার বুকটা ধুকপুক করতে লাগল। খড়ের চালার নিচে পা ভাঙ্গা চেয়ারে বসে মুহুরিগিরি করা মুহুরিকেই যদি দশ টাকা দিতে হয় তাহলে অফিসের পাকা ঘরে ভালো চেয়ারে বসে কাজ কাজ করতে থাকা কেরানি বা হাকিমকে না জানি কত টাকা দিতে হবে।

কেরানি বাবুর অফিস ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রসেশ্বর দেখল-কেরানি বাবু বাঁ-হাতে একটা দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে কান চুলকাতে চুলকাতে ডান হাতে কলমটা ধরে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষকে খুব বকাবকি করছে। তার টেবিলে অজস্র কাগজপত্র। কেরানি বাবুর মূর্তি দেখেই রসেশ্বরের ধৈর্য হারানোর উপক্রম হল। সে ভয়ে ভয়ে দরজার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তা দেখে কেরানির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা পকেট থেকে সিগারেটের একটা প্যাকেট বের করে কেরানির সামনে রেখে দিয়ে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে গেল। কেরানি বাবু রসেশ্বরের উপস্থিতির প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে খচখচ করে কিছু একটা লিখতে শুরু করলেন।

অনেক চেষ্টা করে মনের ভয়কে জয় করে রসেশ্বর কেরানির টেবিলের কাছে গিয়ে দাড়িয়ে বলল, ‘বাবু দরখাস্তটা একটু দেখবেন?’

কেরানি রসেশ্বরের কথায় কান না দিয়ে একমনে লিখে যেতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরে রসেশ্বর পুনরায় ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবু’-

কেরানি এবার ধমক দিয়ে উঠল-‘বাবু বাবু বলে কী চিৎকার করছ?দেখতে পাচ্ছ না আমি একটা জরুরি কাজ করছি?... দেখি, কীসের দরখাস্ত এনেছ... ও, আধি মামলার দরখাস্ত। দরখাস্তটা রেখে যাও। এক সপ্তাহ পরে এসে কবে তারিখ পড়ে জেনে যাবে। এখন যাও। আজ আমার অনেক জরুরি কাজ আছে।‘

কেরানির কথা শুনে রসেশ্বরের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতো অবস্থা হল। মামলার দিন কবে পরে সেটা জানার জন্য যদি আবার এক সপ্তাহ পরে আসতে হয় তাহলে মামলা কাছারিতে উঠতে উঠতে দেখছি ভাদ্র মাস শেষ হয়ে যাবে। তার মনে বিশ্বাস ছিল যে দরখাস্ত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এক সপ্তাহের মধ্যে মামলার দিন ধার্য হবে এবং একদিনে এই মামলা শেষ হয়ে যাবে। তখন সে জমি চাষ করতে না পারলেও কষ্টেসৃষ্টে অন্তত আশ্বিনের প্রথম সপ্তাহে ধানের চারাগুলি লাগিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু মামলা শেষ হতে হতে যদি ভাদ্র মাস পার হয়ে যায় তাহলে এ বছর সে কীভাবে চাষ করবে? চাষ করতে না পারলে সে পরিবারকে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখবে? হাত জোড় করে সে কাতর কণ্ঠে কেরানিকে বলল-‘আমার সর্বনাশ হয়ে যাবে প্রভু। জমিটা তাড়াতাড়ি মুক্ত করে নিয়ে চাষ করতে না পারলে আমি মারা পড়ব। আপনি সাতটা ছেলেমেয়ের মৃত্যুর ভাগীদার হবেন না। আজকেই আমাকে মামলার তারিখটা দিয়ে দিন এবং এক সপ্তাহের মধ্যে মামলাটা শেষ করার বন্দোবস্ত করুন। এই উপকারের জন্য আমি আপনার কাছে সারা জীবন দাস হয়ে থাকব।’

কেরানি বাবু চেয়ারটাতে সোজা হয়ে বসে রসেশ্বরের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা নির্মম বিদ্রুপের হাসি হাসল। জীবনে সে অনেক মানুষ দেখেছে কিন্তু এর মত গ্রাম্য ভূত কখনও দেখেনি।বিদ্রূপের কন্ঠে সে বলল-‘এইযে ভাই, তুমি কি এটা নাড়ুর দোকান পেয়েছ নাকি যে পয়সা বের করে দেবে আর নাড়ু নিয়ে যাবে? এটা কাছারি বুঝেছ,কাছারি। কিলিয়ে কলা পাকানো গেলেও কিলিয়ে মামলা পাকানো যায় না। তোমার মামলা একসপ্তাহে কেন- এক বছরেও শেষ হওয়ার আশা নেই। সত্তর সনের জমা দেওয়া মামলা এখনও এক কুড়ির মতো পড়ে রয়েছে। আর তুমি আজ দরখাস্ত দিয়ে কাল মামলা শেষ করতে চাইছ। তুমি এখন দরখাস্তটা রেখে চলে যাও। এক সপ্তাহ পরে এসে খবর করে যেও।’

কথাটা শেষ করে কেরানিবাবু পুনরায় লেখার জন্য কলমটা হাতে তুলে নিল কিন্তু হঠাৎ টেবিলের উপরে পড়ে থাকা সিগারেটের প্যাকেটের দিকে চোখ যাওয়ায় একটা সিগারেট জ্বালিয়ে নিতে তিনি প্যাকেটটা খুললেন। প্যাকেটটা খুলেই তিনি চট করে থেমে গেলেন। সিগারেটের প্যাকেটে সিগারেটের পরিবর্তে রয়েছে একটা দশ টাকার নোট। কেরানিবাবু ঈষৎ অপ্রস্তুত হয়ে রসেরশ্বরের মুখের দিকে তাকাল। এবং রসেশ্বরের বিস্মিত মুখ ভঙ্গি দেখে তাঁর হঠাৎ রাগ হয়ে গেল।ক্রোধে উত্তেজিত হয়ে উঠে মুখ ভ্যাংচিয়ে বলল-‘তোমাকে যেতে বলেছি না। ভালো করে কানে শুনতে পাওনা নাকি? কাজের সময় এভাবে অসুবিধা করলে তোমার মামলা ভালো হবে না কিন্তু।’ মামলা ভালো না হওয়ার কথা শুনে রসেশ্বরের প্রাণ বেরিয়ে যাবার অবস্থা হল। সে দ্রুত কাকুতি-মিনতি করে বলল-‘এভাবে বলবেন না প্রভু, আমি গ্রামের মূর্খ মানুষ। না জেনে কোনো দোষ করে থাকলে ক্ষমা করে দেবেন। আপনি কেবল আমার কথা নিয়ে পড়ে থাকলে কীভাবে হবে? ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত কাজ আপনার টেবিলের উপরে। আমি কি সেকথা জানিনা। আপনি কাজ করুন প্রভু, আমি আসছি।’

রসেশ্বর স্বপ্নে চলাফেরা করা মানুষের মতো একপা দুপা করে গিয়ে অফিসের গেটের সামনে হাজির হল। গেটের কাছে নিম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল এবং সমস্ত কথাগুলি ভেবে দেখতে শুরু করল। তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস হল যে টাকা না পেলে কেরানি কখনও দ্রুত মামলার তারিখ ফেলবে না। সিগারেটের প্যাকেটে দশ টাকার নোটটা দেখেই তার মনের সেই ধারণা আরও দৃঢ় হয়েছে। সেই মানুষটার উপরেও কেরানি রসেশ্বরের মতোই প্রথমে খুব রাগ করেছিল।কেরানির ধমক শোনার পরেই মানুষটা সিগারেটের প্যাকেটটা টেবিলে ফেলে রেখে চলে যায়। তার মানে কেরানিকে টাকা দেওয়ার এটাই নিয়ম। কিন্তু তার হাতে আর মাত্র পাঁচ টাকা রয়েছে। কেরানি বাবুর রেটই যদি দশ টাকা তাহলে মাত্র পাঁচ টাকা দিলে তিনি কি সন্তুষ্ট হবেন? কিন্তু উপায় কি? কাজ হোক আর না হোক টাকা পাঁচটা দিয়ে দেখতেই হবে। সিগারেটের খালি প্যাকেটের খোঁজে সে পাশের পান-সিগারেটের দোকানে গেল। দোকানের ছেলেটি সিগারেটের একটা খালি প্যাকেট ও তাকে দিতে চাইল না। তাকে নাকি কমেও দুটো সিগারেট কিনতে হবে তাহলেই তাকে একটা খালি প্যাকেট দেওয়া হবে। কিন্তু কেরানি বাবুকে পাঁচ টাকা দিতেই তার ভয় হচ্ছে, সে জায়গায় যদি চার আনা পয়সা কম হয় তাহলে দেবতা সন্তুষ্ট হওয়ার পরিবর্তে রুষ্ট হয়ে উঠার সম্ভাবনাই বেশি। অনেক কাকূতি মিনতি করার পরে দোকানের ছেলেটি রসেশ্বরের দিকে একটা খালি চার্মিনার সিগারেটের প্যাকেট ছুঁড়ে দিল। তাতে পাঁচ টাকা ভরিয়ে নিয়ে রসেশ্বর পুনরায় গিয়ে কেরানি বাবুর অফিসের দরজার সামনে দাঁড়াল। এবার কেরানি বাবুর অফিসে কেরানি বাবুর সামনে দুজন ভালো ভদ্র মানুষ চেয়ারে বসে রয়েছে। সরল মনা রসেশ্বর ও বুঝতে পারল যে মানুষগুলির সামনে সিগারেটের প্যাকেটটা দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে।সে নিজেকে আড়াল করে দেওয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। লোকদুটির সঙ্গে কেরানিবাবুর কথা আর শেষ হতে চায় না। সবাই মিলে কীসব কথাবার্তা বলছে।আর মাঝেমধ্যে সজোরে হাসছে। কেরানি বাবুর কোমল কথা এবং হাসি ঠাট্টা শুনে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে না যে এই মানুষটাই কিছুক্ষণ আগে রসেশ্বরের সামনে জমদগ্নি মুনির মূর্তি ধারণ করেছিল। এখন তো দেখছি কেরানি বাবুর জরুরি কাজের তাগিদ নাই হয়ে গেছে। আকাশের তারার সঙ্গে মাটির প্রদীপের আত্মীয়তা কীভাবে হবে ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিল। ভালো ভদ্র মানুষ এখানে এলে হাজার সরকারি কাজ থাকলেও ভদ্রতা করে তাদের সঙ্গে দু'একটি কথা বলতেই হবে। দশ আঙ্গুল যেমন সমান হয় না তেমনই সমাজের প্রত্যেকটি মানুষ কখনও সমান হতে পারে না। রসেশ্বর ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে রইল কিন্তু এক ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পরেও মানুষগুলির কথাবার্তা শেষ হচ্ছেনা। রসেশ্বর মাঝে মধ্যে তাদের কথাবার্তা শুনে বুঝতে পেরেছে যে তারা কোনো সরকারি কাজের কথা বলছে না। পশু শিকারের কথা বলছে। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে থেকে রসেশ্বরের পা ব্যাথা করতে লাগল। একই সঙ্গে তার কয়েকটা হাই উঠল। সংসারে ছোট মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়াটা কী কষ্ট আর কী অপমানের সে কথা আজ যেন সে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারল। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে এবার সে দরজার সামনে উঁকি দিয়ে কেরানি বাবুর দিকে তাকাল। তার চোখে চোখ পড়া মাত্রই কেরানি বাবু হাসি বন্ধ করে গম্ভীর মুখে একটা বজ্রদৃষ্টি নিক্ষেপ করল। মুখে চাবুকের আঘাতের মতো সে তৎক্ষণাৎ পিছিয়ে চলে এসে পুনরায় দরজার আড়ালে আত্মগোপন করল। অসীম দৈর্ঘ্যের সঙ্গে রসেশ্বর অপেক্ষা করতে লাগল। কতক্ষণ পার হয়ে গিয়েছিল রসেশ্বরের সে হিসেব নেই কিন্তু তার মনে হল যেন অনন্তকাল ধরে সে একই জায়গায় অপেক্ষা করে রয়েছে। কেবল যে মুহূর্তগুলি পার হয়ে গেছে তা নয়। কেরানি বাবুর পশু শিকারের গল্পে মশগুল হয়ে থাকা মানে তার ক্ষেতে চাষ করার সময় দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে। দাঁড়িয়ে থেকে বিরক্তি বোধ করতে করতে মুহূর্তে মুহূর্তে সে হাই তুলতে লাগল। বারান্দাটায় কয়েকবার পায়চারি করল। পর্দার ফাক দিয়ে ভেতরের দিকে উঁকি দিল।আর অবশেষে তার একটা প্রকাণ্ড আর্তনাদ করে উঠতে ইচ্ছে করল। আর ঠিক তখনই খাকি কাপড় পরা একজন মানুষ হাতে অনেকগুলো কাগজ নিয়ে হাকিমের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে কেরানি বাবুর ঘরে ঢুকতে যেতেই রসেশ্বরের সঙ্গে ধাক্কা লাগার মতো হল। মানুষটা ক্রোধে চিৎকার করে উঠল-‘কোথাকার কানা রে? অফিসের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উঁকি দিচ্ছিস কেন? যা এখান থেকে বের হয়ে যা’।

পিয়নের ধমক শুনে রসেশ্বরের এত ভয় হল যে অনেকক্ষণ পর্যন্ত তার বুক ঢিপ ঢিপ করতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে পিয়নটাকে বেরিয়ে এসে আবার হাকিমের ঘরের দিকে যেতে দেখেই রসেশ্বর ‘'যা থাকে কপালে'বলে’ পেছন থেকে দৌড়ে গিয়ে কাতর স্বরে তাকে ডাকল- ‘পিয়ন বাবু!’

পিয়ন থমকে ঘুরে তাকাল। পা থেকে মাথা পর্যন্ত বিদ্যুৎ গতিতে একবার নিরীক্ষণ করে তার অভিজ্ঞ হিসেবি দৃষ্টিতে মুহূর্তের মধ্যে একটা আলাদা ভাব ফুটে উঠল। নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য সে মুখে একটা গাম্ভীর্য এবং ব্যস্ততার ভাব আনার চেষ্টা করে বলে উঠল- ‘কী বলতে চাইছ?’

পিয়নের ভাবভঙ্গি দেখে রসেশ্বরের মৃতদেহে প্রাণ ফিরে পেয়েছে যেন অনুভব করল। কন্ঠস্বরে যতটা সম্ভব কাতরতা ঢেলে সে বলল-‘বড় বিপদে পড়েছি। আমি বুঝতে পেরেছি আপনি রক্ষা না করলে আমাকে আর কেউ রক্ষা করার নেই। আমার আধি মামলার তারিখটা...’

পিয়ন এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে বলল-‘এদিকে এসো।’ দুজনে গিয়ে মুহুরিরা বসার চালাঘরের এক নির্জন কোণে একটা বেঞ্চে বসল। বসতে না বসতেই পিয়ন বলে উঠল-‘বিড়ি সিগারেট কী সঙ্গে আছে একটা বের কর তো।ইস কাজের ঠেলায় আজ সারাদিন একটা সিগারেট খাওয়ারও সময় পাইনি।’- কথাটা বলে পকেট থেকে রুমালটা বের করে নিজের মুখটা মুছে নিল।

রসেশ্বর ভয়ে ভয়ে বলল-‘পিয়নবাবু,আমি গ্রামের চাষাভুষো মানুষ, সিগারেট খাওয়ার সাধ্য কোথায়। সাদা-চুরুট একটা খাবেন কি?’- কথাটা বলেই অত্যন্ত সংকুচিত ভাবে সে পকেটে হাত ঢুকাল।

মুখে বিরক্তি প্রকাশ করে পিয়ন বলল-‘বাড়িতে যা খুশি খেতে থাক, কিন্তু অফিস কাছারিতে এলে পকেটে এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে আসতে হবেই বুঝেছ? যাও যাও, দৌড়ে গিয়ে সিগারেট এক প্যাকেট নিয়ে আস। সঙ্গে একটা তামোল-পান নিয়ে এসো। তোমাদের দৌলতে যদি পান সিগারেট না খেতে পারি তাহলে আমাদের চলবে কীভাবে?...যাও,দেরি করছ কেন? হাকিম কখন ডেকে পাঠাবে তার ঠিক নেই, একবার আমি উঠে গেলে আমার সঙ্গে তোমার আর কথা বলা হবে না।’

যন্ত্র-চালিত পুতুলের মতো রসেশ্বর হয়ে উঠে দাঁড়াল এবং পা দুটি ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে নিয়ে পান-সিগারেটের দোকানের দিকে এগিয়ে গেল। পকেটে মাত্র পাঁচ টাকা রয়েছে। সেই পাঁচ টাকা সে কেরানি বাবুকে অগ্রিম দেবে বলে রেখেছিল। এখন যদি পিওনকে পূজা দিতে গিয়েই পান-সিগারেটের জন্য এক টাকা খরচা হয় বাকি থাকা মাত্র চার টাকা কোন সাহসে সে কেরানিকে দিতে যাবে? তাছাড়া পিয়ন যে কেবল পান-সিগারেট খেয়েই সন্তুষ্ট হবে এবং আসল কাজের কথা বলার পরে নগদ দক্ষিণা দাবি করবে না তার কি নিশ্চয়তা আছে? কী করব কী না করব ভাবতে ভাবতে সে পান দোকানের কাছে পৌঁছাল এবং নিজে থেকেই তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল ‘এক প্যাকেট সিগারেট দাও তো।’

‘কী সিগারেট?’ দোকানি জিজ্ঞেস করল।

‘সবচেয়ে সস্তা দামের কী সিগারেট তাই দিন।’ সঙ্গে একটা তামোল-পান দেবে।‘

এক প্যাকেট চারমিনার সিগারেট এবং দুটো তামোল-পান নিয়ে রসেশ্বর পিয়নের কাছে ফিরে এল। তার পকেটে পয়সার পরিমাণ যত কমে এল ততই তার ভয়টাও বেশি হতে শুরু করল। পিয়ন একটা সিগারেট জ্বালিয়ে নিয়ে বাকি প্যাকেটটা অবলীলাক্রমে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। মুখে তামোল পানের স্বাদটা আস্বাদ করার পরে সিগারেটে একটা সুখটান দিয়ে পিয়ন বলে উঠল-‘আচ্ছা এবার বলতো তোমার কি বলার ছিল?’ রসেশ্বর যতটা সম্ভব সংক্ষেপে নিজের সবিশেষ বৃত্তান্ত বলে অবশেষে পিয়নের হাত ধরে কাতর কণ্ঠে বলল,-‘পিয়নবাবু,এখন আপনার উপরই আমার ভরসা। এক সপ্তাহের মধ্যে আমার মামলা নিষ্পত্তি করে দেবার একটা ব্যবস্থা করুন। ভাদ্র মাস শেষ হতে না হতেই যদি জমিতে চাষ শুরু করতে না পারি তাহলে পুরো পরিবারটা নিয়ে আত্মঘাতী হয়ে মরতে হবে।’

পিয়ন রসেশ্বরের কথা শুনে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল-‘ তুমি এসব কী বলছ? তুমি আজ আম গাছ লাগিয়ে কাল আম খাওয়ার আশা করতে পারলেও আজ মামলা করে এক বছরের আগে তার নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করতে পার না। আমি এই অফিসে পনেরো বছর পিয়নের চাকরি করছি। আজ পর্যন্ত একটা মামলা ও তিন বছরের আগে শেষ হতে দেখিনি। তুমি কি শুধু তোমার মামলা বলেই ভেবেছ নাকি? কত শত শত মামলা পড়ে রয়েছে, একজন হাকিম কত মামলা শেষ করবে? এরকম অসম্ভব আশা তুমি ভুলেও মনের কোণে ঠাই দিও না।’

পিয়ন আরও একটা সিগারেট জ্বালিয়ে নিল।

ভয় এবং দুশ্চিন্তায় রসেশ্বরের জিভ শুকিয়ে খটখটে হয়ে গেল। কোনোমতে ঢোক গিলে সে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল –‘তাহলে আমার কী উপায় হবে পিয়নবাবু? মামলা শেষ হতে যদি তিন বছর লাগে, যদি তিন বছর ধরে আমি জমিতে চাষ করতে না পারি, তাহলে এই তিন বছর আমি কী খাব? ছেলেমেয়েদেরই বা কী খাওয়াব?’হাত দুটি জোড় করে পায়ের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে রসেশ্বর প্রায় আর্তনাদের সুরে বলে উঠল-‘আপনি কিছু একটা উপায় করুন পিয়নবাবু। এবার চাষ করার জন্য আমাকে জমিটা মুক্ত করে দিন। আমি অন্য কোন ভগবানকে জানি না, আপনাকেই ঈশ্বর বলে পুজো করে যাব।’

পিয়ন কিছু সময় গভীরভাবে চিন্তা করার মতো মুখ ভঙ্গি করে কিছুক্ষণ পরে বলল-‘ তুমি তো জানই আমি তো হাকিম নই। একজন সামান্য পিয়ন মাত্র। আমি আর বেশি কী করতে পারি? তবু আমি কেরানি বাবুকে হাতে-পায়ে ধরে বলে তোমার মামলার তারিখটা যাতে তাড়াতাড়ি পড়ে তার জন্য যতটা পারি চেষ্টা করব। কিন্তু তিন বছরের কাজ ছয়মাস বা এক বছরে করতে হলে তোমাকে কিছু টাকা পয়সা খরচ করতে হবে। তোমাকে পায়ে হেঁটে কুড়ি মেইল যেতে হলে সারা দিন লাগবে কিন্তু মোটর বাসে উঠে সারাদিনের রাস্তা এক ঘন্টায় যেতে হলে তোমাকে নিশ্চয় কিছু টাকা পয়সা খরচ করতে হবে। এটাও ঠিক তেমনই বুঝেছ। দ্রুত কাজ করতে হলে কিছু পয়সা খরচ করতেই হবে।‘

রসেশ্বরের অজান্তেই তার হাতটা পকেটের মধ্যে ঢুকে গেল। পকেটের চার টাকা এবং খুচরো পয়সা সে নেড়েচেড়ে দেখল। সে এখন বুঝতে পেরেছে যে তার শক্তির একমাত্র উৎস তার নিজের পকেট,মানুষের দয়ামায়া বা ন্যায় ধর্ম নয়। টাকাগুলি খামচে ধরে সে বলল-‘আমি খুব দুখী মানুষ পিয়নবাবু। শরীরটা দা দিয়ে ঘষে ঘষে কেটে ফেললেও এক ফোঁটা রক্ত বের হবে না। কত টাকা খ্রচ করলে কাজটা হতে পারে বলে তুমি ভাবছ?’

পিয়ন একবার রসেশ্বরের মুখের দিকে তাকাল,তারপর কিছু একটা মনে মনে হিসেব করল।কিছুক্ষণ নীরব থেকে অবশেষে সে বলল –‘এক মাসের মধ্যে মামলার দিন ফেলতে হলে কেরানিবাবুকে কম করে হলেও কুড়ি টাকা দিতে হবে।মামলার অবস্থা বুঝে পরের কথা পরে হবে।আর আমার ও যে বেশ খাটুনি হবে বুঝতেই পারছ। সেই অনুসারে তুমি আমাকে যা দিতে চাও নিজেই বিবেচনা করে দিও। কিন্তু একটা কথা তোমাকে এখন থেকেই বলে রাখছি,না হলে পরে তুমি আমাকে মিছামিছি দোষ দেবে। মামলার দিন ফেলার জন্য কেরানিবাবু বা আমি দায়িত্ব নিতে পারি কিন্তু তার ফলাফল কী হবে সেই দায়িত্ব আমরা নিতে পারব না।’

‘সেই দায়িত্ব তাহলে কে নিতে পারবে?’-রসেশ্বরের শুকনো গলা থেকে এমন একটি আওয়াজ বেরিয়ে এল যে সে নিজেই তার কণ্ঠস্বরকে চিনতে পারল না।

‘সে কথা বলা বড় কঠিন বুঝেছ’।- পিয়ন চিন্তায় কপালে ভাঁজ ফেলে বলল-‘ আমাদের হাকিমের বিষয়ে নানা মুনির নানা মত। কেউ কেউ বলে- এরকম দয়ালু হাকিম দেখা যায় না। বিনা স্বার্থে কেউ বন্ধু ভাবে একটা বিলেতি মদের বোতল উপহার দিলে তিনি গ্রহণ না করে থাকেন না কিন্তু তা তাছাড়া কারও কাছ থেকে ঘুষ হিসেবে কিছু নেন না। অন্য অনেকে বলাবলি করে যে হাকিম নিজে কিছু নেয়না সে কথা সত্য কিন্তু তার নাম করে মন্ডল কানুনগো সবাই জনগণের রক্ত খেয়ে শেষ করছে। কিন্তু প্রতিটি মানুষ এই কথা বিশ্বাস করে না। তাদের মতে এরকম একজন ধূর্ত হাকিম এর আগে কখনও এই সার্কেলে আসেনি। আসলে তিনি ঘুষ খাওয়ার যম। কিন্তু এরকম বুদ্ধি করে তিনি ঘুষ খান যে তাকে সন্দেহ করার মত বা ধরতে পারার সাধ্য কারও নেই।‘…এতটুক পর্যন্ত বলে পিয়ন এদিকে ওদিকে তাকিয়ে মুখটা রসেশ্বরের কানের কাছে এনে গলা নামিয়ে বলল-‘ কিন্তু হাকিমের বিষয়ে একটা কথায় কারও মনে কোনো সন্দেহ নেই। সেটা কি জান? মানুষটার নাকি নারী সংক্রান্ত ব্যাপারে দুর্বলতা রয়েছে। তুমি তাকে এক হাজার টাকা দিলে যে কাজটা হবে না, এক ঘন্টার জন্য একটি মেয়ে মানুষ জোগাড় করে দিতে পারলে তারচেয়ে বেশি কাজ হবে। হাকিমের বিষয়েএকটা রসালো গল্প বলার জন্য পিওন যখন আবার মুখ খুলেছে মাত্র তখনই অন্য একটি পিয়নকে কিছুটা দূর দিয়ে পান দোকানে যেতে দেখে সেই কথা বদলে নিয়ে বলল-‘ আচ্ছা এসব কথা এখন বাদ দাও। আমরা আদার বেপারি জাহাজের খবর নিই কি করব? আমি তাহলে এখন উঠছি। অনেকক্ষণ তোমার সঙ্গে বকবক করলাম। আমার যা বলার তা বললাম,এখন তুমি নিজে বিচার বিবেচনা করে যা করার কর।’

পিয়নের সমস্ত কথা রসেশ্বরের কানে ভালো করে প্রবেশ করল না, কেরানিকে কুড়ি টাকা দিতে হবে, পিয়নকে নিশ্চয় দশ টাকা, হাকিমকে বিলেতি মদের বোতল,মেয়ে মানুষ … স্বর্গের পারিজাত ফুলের চেয়েও যে সমস্ত জিনিস তার কাছে বেশি দুর্লভ, অথচ ত্রিভুবন খুঁজে হলেও সেই সমস্ত জিনিস তাকে সংগ্রহ করতেই হবে, না হলে সে তার চৌদ্দ পুরুষের সম্পত্তি, তার জীবনের একমাত্র সম্বল জমিটা কখনও উদ্ধার করতে পারবে না, সে পথের ভিখারিতে পরিণত হবে, তার চোখের সামনেই তার ছেলমেয়ে, স্ত্রী না খেতে পেয়ে তিল তিল করে মরবে- টাকা,মেয়েমানুষ, মদের বোতল- হঠাৎ কীভাবে যেন পিওনের শেষ কথাগুলো কানে প্রবেশ করল ,এবং সে ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে ওঠা মানুষের মতো আর্তনাদ করে বলে ওঠে-‘পিয়নবাবু, আর কিছুক্ষন অপেক্ষা করুন, আপনার পায়ে ধরে বলছি, আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। আমাকে এখন কী করতে হবে ভালো করে বলে যান।’

পিয়ন উঠে দাঁড়িয়ে বলল-‘ তোমাকে তো বলেছি, মামলার তারিখ যদি তাড়াতাড়ি ফেলতে চাও তাহলে কেরানি বাবুর জন্য কুড়ি টাকা আমার হাতে আজ দিয়ে যাও। আমাকে খুব বেশি দিতে হবে না। তুমি গরিব মানুষ, আমিও গরিব মানুষ। গরিব গরিবের রক্ত খায় না। আমাকে পাঁচ টাকা দিলেই হবে। এই কয়টি টাকা দিয়ে তুমি আজ বাড়ি ফিরে যাও। তিনদিন পরে এসে পুনরায় একবার খবর করে যাবে। এর ভেতরে আমি যা করতে পারি করে রাখব।’

পকেটের টাকা গুলিতে হাতের মুঠি ঢিলা করে রসেশ্বর উঠে দাঁড়াল। তার পা দুটি ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেছিল, কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে সে ভয়ে শুকিয়ে যাওয়া কন্ঠে বলল-‘পিয়নবাবু, আমার হাতে এখন পুরো পাঁচ টাকাও নেই। অথচ মামলার দিন তাড়াতাড়ি না পেলে আমি নিশ্চয়ই আত্মঘাতী হয় মরব। আপনি আজ এই কয়েকটি টাকা রাখুন। আমি তিন দিনের মধ্যে পারি এক সপ্তাহের মধ্যে পারি বাকি টাকাগুলি যেভাবেই হোক জোগাড় করে এনে আপনার সঙ্গে আবার দেখা করব। কিন্তু মামলার দিনটা এগিয়ে আনার জন্য আপনি আমার পথ চেয়ে থাকবেন না। এর ভেতরে কিছু একটা করে রাখবেন। ঠাকুরের নামে শপথ করে বলছি, আমি কথা দিয়েছি আমি ভিক্ষা করে পার্‌ চুরি ডাকাতি করে পারি আপনার প্রাপ্য টাকাগুলি যেভাবেই হোক দিয়ে যাব।’

রসেশ্বর পকেট থেকে টাকা গুলো বের করে পিয়নের হাতে দিতে যাচ্ছিল মাত্র তখনই সন্ত্রস্তভাবে চারপাশে চোখ বুলিয়ে পিয়ন বলে উঠল-‘ইস ইস কী করছ, তুমি তো দেখছি বোকার হদ্দ,একেবারে ছেলেমানুষ। নিজে তো মরবেই, অন্যকে নিয়েও ডুববে। এই সমস্ত কাজ সবাইকে দেখিয়ে এভাবে করা ঠিক নয়। চল, চল তোমাকে রাস্তার দিকে একটু এগিয়ে দিই।‘

রাস্তা দিয়ে কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে একটা নির্জন জায়গা দেখে পিয়ন বলল-‘তোমার হাতে যা আছে আজ তাই দিয়ে যাও। একেবারে খালি হাতে আমি তোমার হয়ে কেরানি বাবুকে খাতির করতে পারব না। তুমি আবার দেখা করতে আসতে এক সপ্তাহ লাগিও না।তিনদিন পরে এসে বাকি টাকাগুলি দিয়ে যেও আর একই সঙ্গে তখন মামলার তারিখটাও নিয়ে যেও।’