বৃহস্পতিবার, মে ২৮, ২০২০

হরিদ্বার থেকে প্রয়াগরাজ -- পূর্ণতাঁর সন্ধানে


সুপ্রভাত তীর্থ যাত্রীগণ ।

প্রাতঃপ্রণাম ।

আশাকরি আপনারা মানসিকভাবে প্রস্তুত । তবে আর কী ডেরা ডাণ্ডা উঠাও । ডাক শুনতে পাচ্ছ ? সো সো সমুদ্র গর্জন । মানুষের স্রোত ,পুণ্যার্থী থেকে ব্যবসায়ী, সাধু থেকে অসাধু শুনতে পাচ্ছ লাখ লাখ ছুটন্ত মানুষের পাখার পত পত শব্দ । হ্যাঁ মানুষ পতঙ্গের মতো ছুটছে । লক্ষ্য কুম্ভ স্নান । শতাব্দী যোজন দূর থেকে হয়তো বাবাজী এসে গেছেন নিভৃত নির্জনতা অঙ্গে মেখে । যেখানে লাখো মানুষের উন্মাদনা বাবাজী সেখানে নীরব দর্শক । কেন আসেন তিনি লাখো মানুষের ভিড়ে ? সমাধি প্রাপ্ত স্থিরপ্রজ্ঞের কুম্ভে কাজ কী ? অমৃতের আকর্ষণ ? গঙ্গা যমুনা সরস্বতীর ত্রিধারায় তিনি তো নিত্য স্নাত । আরোহণ অবরোহণের উর্ধে তিনি স্থিরনেত্র । স্বয়ম্ভু । পৃথিবীর চঞ্চলতা চাওয়া পাওয়ার তাঁকে স্পর্শ করে না । তবু তিনি আসেন নিত্য শতাব্দী কাল ধরে । সন্ধানী লাখো ভিড়ের মধ্যে তাঁকে খুঁজে আজো । বাইশ বছরের নবযুবা । কাল তাঁকে স্পর্শ করতে অপারগ । কারণ কাল তাঁর চরণ বন্দনা করে । তিনি যে স্বয়ং মহাকাল , কালাতীত । যোগী যুক্তেস্বর তাঁকে দেখেছেন কুম্ভযোগে , যোগী যোগানন্দের আত্মজীবনী yogi র একটি পরিচ্ছেদ রয়েছে গুরুর গুরু এই মহা গুরুকে নিয়ে ।
কোন মানুষ কী দুহাজারের অধিক কাল বেঁচে থাকতে পারে ? বাবাজীর পার্থিব বয়স এখন কত হবে ! দুহাজার !!!
স্বামী যোগানন্দ আমার মাথা ঘুলিয়ে দিয়েছেন । আশ্চর্য এই ভারতবর্ষ , আশ্চর্য যোগপথ । আশ্চর্য যোগী !
আমি এক নিরন্তন ভোগী , সন্দেহের আবর্তে পথ চলি । Autobiography of yoga বিশ্বের বেষ্ট সেলারদের একটি । প্রামান্য গ্রন্থ রূপে বিশ্বে আদৃত । যোগ কী তবে অলৌকিক গুণসম্পন্ন স্বয়ং সিদ্ধ আত্মজয়ী বিজ্ঞান !
দুহাজার বছর একটি মানুষ কী করে বাঁচতে পারে ? মায়াময় পৃথিবীর ধুলি বালি মেখে একক কুম্ভ যাত্রী আমি ভাবনার থৈ খুঁজে পেলাম না ।
কুম্ভের পথে প্রয়াগরাজে মিলবে কী সেই উত্তর ? যুক্তিবাদী মন যুক্তি তর্কের আবহের ভিতরে এক্কা দুক্কা খেলে । হরিদ্বার থেকে
প্রয়াগরাজ পূর্ণ থেকে অর্ধ ,আমার উল্ঠারথ সেজে উঠেছে । যাত্রার শেষ সাজ সুটকেস বন্দি । ব্যস মন ডেরা ডাণ্ডা উঠাও । যদি কেউ ডাক না শুনে একলা চলো রে ..

আগামী মৌনী অমাবস্যা ডাকছে ...

কুম্ভমেলা সাধুসন্ন্যাসীদের মেলা । পৃথিবীর সব আধ্যাত্মিক পদযাত্রীরা মহাকুম্ভের অমৃতযোগে একত্রিত মিলিত হয়ে স্নান করেন । কুম্ভ অর্থাৎ কলস । সমুদ্র মন্থনে দেবতা ও অসুরদের সম্মিলিত শক্তির সমুদ্র দোহনে অনেক দ্রব্যের সঙ্গে লক্ষ্মী উঠেছিলেন অমৃত কলস কাঁখে নিয়ে । ঋষির অভিশাপে অহংকারী হয়ে যাওয়া দেবতারা দেবী লক্ষ্মীকে হারান । লক্ষ্মী দেবলোক ছেড়ে সমুদ্রের ভেতরে লুকিয়ে থাকেন । লক্ষ্মী ছাড়া স্বর্গ মত্য পাতালে হাহাকার উঠে । নিদারুণ খাদ্যের অভাব দেখা দেয় । তখন দেবতারা ব্রহ্মার কাছে গিয়ে লক্ষ্মীকে ফেরত পাওয়ার উপায় জিজ্ঞেস করেন । ব্রহ্মা বলেন যদি সমুদ্র মন্থন করতে পারো তবে লক্ষ্মী উঠে আসবেন । কিন্তু এত বড় সমুদ্র মন্থন হবে কীকরে ? ব্রহ্মা বললেন অসুরদের সাহায্য নাও । শুধু একা জয়ী হওয়া যাবে না । লক্ষ্মীর অভাবে পাতালেও হাহাকার । অসুরদের অবস্থা ও দেবতাদের মতোই । অসুর রাজি হল । মন্থন তো হবে । দুধ দধি মন্থনে মাখন পাওয়া যায় । মন্থন করতে রশি লাগবে , দণ্ড লাগবে । এত বড় ক্ষীর সমুদ্র মন্থন হবে কীভাবে । ব্রহ্মা সমাধান দিলেন দণ্ড হবে মৈনাক পর্বত আর রশি হবে বাসুকি সাপ । মৈনাক পর্বত দেবী পার্বতীর ভাই । দেবতাদের প্রার্থনায় রাজি হয়ে সমুদ্রে ঝাঁপ দিল । বাসুকি হল রশি । দেবতারা ঠিক করলো ওরা সাপের ল্যাজের দিক ধরবে আর অসুরদের দেবে মাথার দিক । মন্থনে সাপের মুখ থেকে বিষ বের হয়ে অসুরদের শক্তি হ্রাস করবে । সেইমত চতুরালির সঙ্গে মন্থন শুরু হল । সমুদ্রের নীচ রত্নে ভরা । যত মন্থন হচ্ছে কিছু না কিছু জিনিস পাওয়া যাচ্ছে । যেমন ঐরাবত হাতি , শাঁখ, পারিজাত পুষ্প ইত্যাদি । সব ভালো জিনিস দেবতারা নিয়ে নেয় । কথা ছিল আধাআধি নেবে । উঠলো বিষ ও । ওই বিষ যে খাবে সেই বিনাশ হবে । কেউ নিতে রাজি হল না । তখন দেবাদিদেব শিব ত্রিজগতের মঙ্গলের জন্য ওই বিষ কন্ঠে ধারণ করে নীলকণ্ঠ হয়ে যান । উঠে আসে অত্যন্ত সুন্দরী অপ্সরা তিলোত্তমা । দেবতারা অসুরদের ঠকিয়ে তিলোত্তমাকে নিয়ে নেয় ।
অবশেষে উঠলো অমৃত কলস নিয়ে মা লক্ষ্মী । অমৃত পান করলে কেউ আর মৃত হবে না । মরণজয়ী অমর হবে । তাই ওই অমৃত যাতে অসুরেরা না পায় তারজন্য ষোল আনা ষড়যন্ত্র করলো দেবতাগণ । দেবতারা বললো আধাআধি করবো কিন্তু তাঁর আগে লক্ষ্মী কার হবে ঠিক হোক । জনার্দন বিষ্ণু হাসলেন কারণ তিনি লক্ষ্মীপতি । লক্ষ্মী দেবী নারায়ণকে বরণ করলেন পতিরূপে । এইবার অমৃত বিতরণের পালা । দেবতাগণ বিষ্ণুর স্মরণ নিলেন । কীভাবে অসুরদের বঞ্চিত করা যায় । বিষ্ণু অপূর্ব সুন্দরী মোহিনীর রূপ ধারণ করলেন ।তাঁর রূপে অসুর তো বটেই স্বয়ং শিব ঠাকুর ও মোহিত হয়ে গেলেন । তিনি মোহিনীর পিছনে ধাবিত হলেন । পার্বতী আবির্ভূত হয়ে শিবকে বোঝালেন মোহিনী বিষ্ণুমায়া মাত্র কোন নারী নন । শিব লজ্জ্বিত হলেন । তিনি অমৃত পান করলেন মোহিনীর হাত থেকে । এইবার ছদ্মবেশী মোহিনী বললেন দেবতা ও অসুর আলাদা আলাদা লাইন করে বসো । সবাইকে স সবাইকে সমান করে দেবো ।
দুটি লাইনে বসলো দেবতা অসুর । অসুরদের মধ্যে রাহু ও কেতুর সন্দেহ হল । ওরা ছদ্মবেশে দেবতাদের লাইনে বসলো । মোহিনী দেবতাদের অমূত দিলেন । সূর্য ও চন্দ্র রাহু কেতুকে চিনে ফেললেন । বিষ্ণুকে সেই কথা জানাতেই
সঙ্গে সঙ্গে পরিকল্পনা অনুযায়ী ইন্দ্রের পুত্র জয়ন্তের হাতে অমৃত কলস দিয়ে পালিয়ে যেতে ইঙ্গিত করলেন বিষ্ণু । জয়ন্ত কুম্ভ নিয়ে পালিয়ে গেল । বিষ্ণু মোহিনী মূর্তি ত্যাগ করে সুদর্শন চক্র দিয়ে রাহু ও কেতুকে বধ করলেন । কিন্তু অমৃত তো খেয়ে ফেলেছে রাহু কেতু তাই মুণ্ডু হীন হয়েও বেঁচে গেল ।
অসুররা হৈ হৈ করে উঠলো । ওরা জয়ন্তর পিছনে ধাওয়া করলো । জয়ন্ত পালিয়ে যেতে যেতে ভারতবর্ষের চার জায়গায় থেমেছিলেন বিশ্রামের জন্য । এবং কলসটিও রেখেছিলেন । সেই চার জায়গা হচ্ছে নাসিক উজ্জ্বয়িনী প্রয়াগ ও হরিদ্বার । যেহেতু ওই স্থানে অমৃত কলসী রাখা হয়েছিল নির্বাণ ও মুক্তির কামনায় সব সাধু একত্রিত হয়ে সঙ্গম স্নান করে । ছয় বছরে অর্ধ কুম্ভ মেলা হয় । বারো বছরে হয় পূর্ণ কুম্ভ ।
প্রয়াগে এইবার অর্ধকুম্ভ । এই প্রয়াগে রয়েছে । গঙ্গা যমুনা ও সরস্বতীর ত্রিবেণী সঙ্গম । এখানে স্নান করেছেন কুম্ভ যোগে চৈতন্য মহাপ্রভু ভক্তবৃন্দ সহ । এই প্রয়াগেই প্রথম রূপ গোস্বামীর সঙ্গে প্রভুর মিলন হয় । এই প্রয়াগে কুম্ভমেলা যোগে ভক্তবৃন্দ সহ স্নান করেছিলেন আমার পিতৃদেব করিমগঞ্জের কর্তাপ্রভু । এই প্রয়াগে স্নান করেছিলেন কুম্ভমেলা যোগে আমার ভ্রাতৃদেব বারাসাতের কর্তাপ্রভু ।
এইবার এই অভাজনের পালা । যদিও গত পূর্ণ কুম্ভে হরিদ্বারেও উপস্থিত ছিলাম ধেমাজীর দিলীপ সস্ত্রীক, বুবু, পূর্ণিমা অণিমা কল্পনা আমার ছোটকন্যা পূজা , দেবাশীষ সহ ...


পরবর্তী ...