বুধবার, নভেম্বর ২০, ২০১৯

স্মৃতি থেকে দেখা বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০০৩


২০১৯ বিশ্বকাপ শুরু হতে আর দু সপ্তাহর মত বাকী।টিভিতে কয়েক সেকেন্ডের সেসব বিজ্ঞাপন স্মরণ করে দিচ্ছে বিগত বিশ্বকাপ আসরগুলোর উত্তেজনাপূর্ণ মুহুর্তগুলো। তবে দর্শকদের হৃদয়ে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে যাচ্ছে ২০০৩ বিশ্বকাপের খণ্ড চিত্রগুলো।

সাউথ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে এবং কেনিয়ায় যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৩ বিশ্বকাপ। এটি ছিল আইসিসির অষ্টম বিশ্বকাপ আসর। টুর্নামেন্টের শুরুতেই ১৯৯৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে হারের প্রতিশোধ নেয় অস্ট্রেলিয়া। শুরু থেকেই প্রত্যেকটি ম্যাচ জমে উঠেছিল তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ২০০৩ বিশ্বকাপের আগে কখনোই ১৪ দলের কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজন করেনি আইসিসি।

গ্রুপ পর্ব থেকে ফাইনাল পর্যন্ত ৫৪টি ম্যাচ আয়োজিত হয়েছিল ২০০৩ বিশ্বকাপে। টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করা ১৪টি দলকে ভাগ করা হয়েছিল দুইটি গ্রুপে। দুই গ্রুপের পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষ ৩টি দল সুযোগ পেয়েছিল সুপার সিক্সে খেলার। সাউথ আফ্রিকা গ্রুপ পর্বেই ডাকওয়ার্থ লুইস পদ্ধতিতে ১ রানে হেরে যাওয়ায় স্বাগতিক দর্শকদের কাছে ২০০৩ বিশ্বকাপ পরিণত হয় হতাশার গল্পে।

২০০৩ বিশ্বকাপ জেতে অস্ট্রেলিয়া; Source: espncricinfo.com

পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো শক্তিশালী দল বিদায় নেয় গ্রুপ পর্বেই। ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে শিরোপা জেতে রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়া। বিনোদন আর বিস্ময়ে ভরপুর বিশ্বকাপের এই আসর আইসিসির আয়োজিত সেরা টুর্নামেন্টগুলোর একটি। আমাদের আজকের আলোচনা সাজানো হয়েছে এই বিশ্বকাপকে ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা আসর হিসেবে আখ্যা দেয়ার গুরুত্বপূর্ণ ৪টি কারণ নিয়ে।

৪. শচীন টেন্ডুলকারের পারফরম্যান্স

ভারতের ক্রিকেটেশ্বর শচীন টেন্ডুলকার নিজের সেরাটা ঢেলে দিয়েছিলেন ২০০৩ বিশ্বকাপে। টুর্নামেন্টে আলাদা করে নজর কেড়ে নিয়েছিল এই লিটল মাস্টারের ব্যাটিং পারফরম্যান্স। পুরো আসরটি অনেকটা স্বপ্নের মতোই কাটিয়েছেন এই ভারতীয় ব্যাটসম্যান। ভারতকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলার জন্য সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিল টেন্ডুলকারের ব্যাটিং।

স্বাগতিক জিম্বাবুয়ের সাথে ম্যাচে টেন্ডুলকারের ব্যাট থেকে আসে ৯১ বলে ৮১ রানের অনবদ্য একটি ইনিংস। গ্রুপ পর্বে ভারতের চতুর্থ ম্যাচে নামিবিয়ার বোলারদের রীতিমতো তুলোধুনোয় করেন এই ব্যাটসম্যান। সেই ম্যাচে ১৫১ রানের একটি অতিমানবীয় ইনিংস খেলেন এই কিংবদন্তি। বিশ্বকাপে এটিই তার সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। ভারতের পরের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও চওড়া ছিল টেন্ডুলকারের ব্যাট। বলের সাথে পাল্লা দিয়ে সে ম্যাচে ৫০ রান করেছিলেন তিনি।

প্রত্যেকটি ম্যাচে ফর্মে ছিলেন টেন্ডুলকার; Source: dnaindia.com

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সাথে ৯৮ রানের ম্যাচ জয়ী একটি ইনিংস আসে শচীনের ব্যাট থেকে। এই ইনিংসটি অনেকের চোখে সেই বিশ্বকাপের সেরা ইনিংসগুলির একটি। সুপার সিক্সে শ্রীলঙ্কার সাথে ম্যাচে অল্পের জন্য সেঞ্চুরির দেখা পাননি এই ব্যাটসম্যান। সেই ম্যাচে তিনি ৯৭ রান করে সাঙ্গাকারার হাতে ক্যাচ আউট হয়েছিলেন।

কেনিয়ার সাথে সেমিফাইনালে ৮৩ রান করেন টেন্ডুলকার। তার ব্যাটে ভর করে ভারত সেমিফাইনাল পেরিয়ে ফাইনালে পৌঁছে যায়। পুরো টুর্নামেন্টে টেন্ডুলকার করেছিলেন ৬৭৩ রান। এক বিশ্বকাপে এটিই কোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। সবমিলে ২০০৩ বিশ্বকাপের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছেন টেন্ডুলকার।

৩. ভারত এবং পাকিস্তানের মুখোমুখি লড়াই

বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে ভারত এবং পাকিস্তানের ম্যাচ মানেই দর্শকদের বাড়তি উত্তেজনা। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিবেশী এই দুই রাষ্ট্রের ক্রিকেট সম্পর্ক বরাবরই উত্তপ্ত। ভারত পাকিস্তানের ম্যাচকে ঘিরে তাই প্রত্যেক বিশ্বকাপেই দর্শকরা মেতে ওঠে উন্মাদনায়।

ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচের আগে; Source: ibtimes.co.uk

২০০৩ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বেই মুখোমুখি হয়েছিল ভারত পাকিস্তান। টসে জিতে আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন পাকিস্তান অধিনায়ক ওয়াকার ইউনিস। ওপেনার সাইদ আনোয়ারের সেঞ্চুরিতে সেঞ্চুরিয়নে ২৭৩ রানের মাঝারি সংগ্রহ পায় পাকিস্তান।

জবাবে ব্যাট করতে নেমে ইনিংসের শুরুতেই বীরেন্দ্র শেবাগকে হারিয়ে ভারতের জয়ের স্বপ্ন খানিকটা হোচট খায়। তবে একপ্রান্ত আগলে রেখে ঠিকই স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন ফর্মে থাকা শচীন টেন্ডুলকার৷ ৭৫ বলে ৯৮ রানে আউট হওয়ার আগে ভারতকে পৌছে দিয়েছিলেন জয়ের বন্দরে। শেষের দিকে যুবরাজ সিংয়ের ৫৩ বলে ৫০ রানের অপরাজিত ইনিংসটি ভারতকে আর পথ হারাতে দেয়নি। ২৬ বল বাকি থাকতেই ৬ উইকেটের জয় পায় টিম ইন্ডিয়া।

২. সেরা দুই দলের ফাইনাল

২০০৩ সালের বিশ্বকাপে সাউথ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান এবং ইংল্যান্ড গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল। এতগুলো বড় দলের অনুপস্থিতিতেও ঠিকই জমে উঠেছিল সুপার সিক্স এবং সেমিফাইনাল। অস্ট্রেলিয়া ফাইনালে ওঠে কোনো ম্যাচ না হেরেই। অপরদিকে গ্রুপ পর্বে শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়ার সাথে এক ম্যাচ হেরে ফাইনালে ওঠে ভারত। ফর্মে থাকা সেরা দুই দলই খেলেছিল ২০০৩ বিশ্বকাপের ফাইনাল।

শিরোপা জেতে রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়া; Source: cricketcountry.com

জোহানসবার্গে ফাইনাল ম্যাচে টসে জিতে আগে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেন ভারত অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ১৪ ওভারেই ১০০ পেরিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। ওপেনার অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ৪৮ বল খেলে করেন ৫৭ রান। অধিনায়ক রিকি পন্টিংয়ের ১৪০ রানের ইনিংসের উপর ভর করে ৩৫৯ রানের বড় সংগ্রহ পায় অস্ট্রেলিয়া শিবির।

বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ওপেনার বীরেন্দর শেবাগ ৮১ বলে ৮২ রান করে আউট হলে জয়ের আশা ক্ষীণ হয় ভারতের৷ মিডল অর্ডারে রাহুল দ্রাবিড়ের ৪৭ রানের ইনিংসটি বাদে আর কেউই অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের সাথে লড়াই করে স্কোরবোর্ডে রান তুলতে পারেননি। ১২৫ রানের ব্যবধানে ফাইনাল জিতে শিরোপা জয়ের উৎসব করে অস্ট্রেলিয়া।

১. কেনিয়ার চমক

এক যুগ আগেও ক্রিকেটে শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং ইংল্যান্ডের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। কিন্ত ২০০৩ বিশ্বকাপের পর থেকে ক্রিকেটে একক আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি কোনো দলই। বড় দলগুলো বিদায় নিলেও সেবার বিশ্বকাপের সুপার সিক্সে খেলেছিল জিম্বাবুয়ে এবং কেনিয়া।

কেনিয়া খেলেছিল সেমিফাইনাল; Source: espncricinfo.com

গ্রুপপর্বে শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশের সাথে জয়ের দেখা পেয়েছিল কেনিয়া। টেস্ট খেলুড়ে দলগুলোর বাইরে একমাত্র কেনিয়াই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলার রেকর্ড গড়ে। সেমিফাইনালে ভারতের কাছে ৯১ রানে হারলেও মাথা উঁচু করেই টুর্নামেন্ট শেষ করেছিল স্বাগতিক কেনিয়া৷