মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১০, ২০১৯

স্বীকৃতিহীন অজিতকুমার


" অজিতের অকাল মৃত্যুতে সাহিত্যের ক্ষতি হবে ৷তার গুণ ছিল - সে সম্পূর্ণ নির্ভীকভাবে সকল পক্ষের বিরুদ্ধে নিজের মত প্রকাশ করতে পারত ৷ঠিক বর্তমানে সে রকম আর কোন বাংলা লেখক ত মনে পড়ছে না l "

এমন কথা বলেছেন রবীন্দ্রনাথ ৷

কিন্তু কার সম্পর্কে ৷ মনে হতেই পারে কে এই অজিত ? কিই বা তার পরিচয় ৷ এই কথাটি রবীন্দ্রনাথ ১৯১৯ সালে ১ জানুয়ারি জগদীশচন্দ্র বসুকে বলেছিলেন ৷ অজিত বলতে রবীন্দ্রনাথ অজিত কুমার চক্রবর্ত্তীর কথা বলেছেন৷ শান্তিনিকেতনের শিক্ষক ছিলেন তিনি ৷

স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তারলেখার অনুবাদের ভার দিয়েছিলেন তার উপর৷ শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয়ের প্রথম পর্বে তিনি শিক্ষার দায়িত্বে ছিলেন৷ গুরুদেব প্রসন্ন হন তাঁর একাগ্রতায় , নিষ্ঠায় ৷ ধীরে ধীরে গুরুদেবের কাছের লোক হয়ে ওঠেন ৷ শিক্ষকতার পাশাপাশি অনুবাদক , সঙ্কলক ও সম্পাদক হিসেবেও স্বীকৃতি লাভ করেন ৷ কবি নিজেএকাধিক রচনা তাঁর হাতে অনুবাদের জন্য দিয়েছিলেন ৷ শান্তিনিকেতন ও রবীন্দ্রনাথের কাজ ও কথা বিলেতবাসীর কাছে পৌছে দিয়েছিলেন স্বয়ংঅজিত কুমার চক্রবর্তী ১৯১০ সালে ।বিলেতের পত্রিকায় সেই খবর প্রথম প্রকাশ হয় ১৯১০ , ১ অক্টোবর ৷ রুদ্রপ্রসাদ চক্রবর্তী " অজিতকুমার " গ্রন্থে জানিয়েছেন ও দেশে থাকার সময়রবীন্দ্রনাথের ''কাবুলিওয়ালা " গ্রন্থের অনুবাদ করে বিদগ্ধ মানুষকে শুনিয়েছেন , তাঁদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংযোগ ঘটিয়েছেন ৷সেই অজিতকুমার যখন শান্তিনিকেতন ছাড়তে হল , তখন তাঁর যন্ত্রণা অনুমেয় ৷তবে ম্যানচেস্টার কলেজে পড়াশুনার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন ররীন্দ্রনাথ ৷ ১৯১০ ,সেপ্টম্বর বিলেত যাত্রা করেন অজিতকুমার ৷ কেন বিলেত যাত্রা করতেন তিনি ৷ তার জীবন ঘিরে এত কেন লুকিয়ে আছে যার উত্তর পাওয়াটা মুশকিল ! গুরুদেব কি তাকে সরিয়ে দিয়েছিলেন এখান থেকে ৷ এক সময় তাঁর লেখার অনুবাদের দায়িত্ব তার হাতে দিয়েছিলেন ৷ হঠাৎ যেন সেই জায়গাটা নড়ে গেল ৷ অজিতকুমারের করা অনুবাদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেখা নিয়ে তা যে পাঠক সমাজে বেশ সোরগোল ফেলেছিল বেশ বোঝা যায় ৷কিন্তু তার উপযুক্ত সমাদর অজিতকুমার পাননি ৷

ররীন্দ্রনাথেরএকটা সময় পরতাদের সম্পর্কের চিড় ধরে ৷ ঠাকুর পরিবারে সাথে যোগাযোগ বাড়ে অনেক কবি ,লেখকদের ৷ তাদের মধ্যে কেউ কেউ শান্তিনিকেতনে আসতেন I তাদের মধ্যে অনেকেই অজিতকুমারকে সহ্য করতে পারতেন না এমন শোনা যায় ৷গুরুদেব একটি চিঠিতে অমল হোমকে লিখেছেন ," তার (অজিত) যৌবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলি সে দিয়েছে আমাকে ঘিরে ।ইদানিং সে একটু দূরে সরে গিয়েছিল ,সেটা একদিক থেকে ভালই হয়েছিল তার স্বাতন্ত্র্যবিকাশে ৷' কেন বলেছিলেন একথা গুরুদেব ? আসলে তীব্র স্নেহ করতেন অজিতকুমারকে ৷ সে থেকেই হয়ত একটা আকর্ষণ ছিল অজিতকুমারের প্রতি ৷সে সময় প্রায় অনেকেই রবীন্দ্রনাথের লেখা ও জীবনধারাকে অনুসরণ করে চলেতেন ৷তেমনটা ছিলেন না অজিতকুমার ৷ বরং তিনি তাঁর প্রতিটি কাজের মধ্যে নিজস্ব ছাপ রেখে চলতেন l তিনি রবীন্দ্রনাথকে পাশ্চাত্য সমাজে পরিচিত করে ছিলেন এমন দাবী করতেন বলে শোনা যায় ৷ কিন্তু তারই সঙ্গে গুরুদেবের প্রতি তার ছিল অপার শ্রদ্ধা ৷ তিনি কখনই সেই শ্রদ্ধার জায়গা থেকে সরে দাঁড়াননি ৷ তাই যদি হত তিনি তাঁর স্ত্রী লাবণ্যলেখাকে লিখতেন না " গুরুদেবের কাছে আদপে যাই না ৷ কারণ তাঁর সঙ্গে বেশী মিশলেহিংসার উদ্রেক হয় এবং তাছাড়া আমি মনেই ভেবেছি যে আমি তাঁর সঙ্গে কাজের সম্বন্ধ ছাড়া কোন সম্বন্ধ বাহিরে রক্ষা করব না ৷ ভিতরে যা কিছু আছে তা ভিতরেই থাক ৷" রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে কাজের বাইরে একটা সু সম্পর্ক ছিল ৷ যেটা কখনই প্রকাশের বাইরে আসেনি ৷ সে সময় এক ঝাঁক নক্ষত্রের মাঝ থেকে যেন চাপা পড়ে গিয়েছিলেন ৷

তিনি লিখেছেন ," আসল কথা হচ্ছে গুরুদেবেরই মোটে আমার উপর স্নেহ নেই -স্নেহ সামান্য থাকলেও শ্রদ্ধা ও আশা কিছুই নেই I সেই জন্য আমাকে আঘাত করা যার তার পক্ষে সহজ ৷এন্ডুরুজ যেগুরুদেবকে বলতে সাহস পেল যে আমি বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে কাজের নই - এটা গুরুদেব বরদাস্ত করলেন তো ?তিনি যদি সামান্য প্রতিবাদটুকু করতেন তবেই এসব সমালোচনা কবে নিরস্ত হয়ে যেত ৷"

রবীন্দ্রনাথ কি তবে তাঁকে ভুল বুঝেছিলেন ?নাকি ভুল ছিলেন অজিত কুমার ? অনেকে বলেছেন যন্ত্রণা নিয়ে শান্তিনিকেতন ছাড়েন তিনি ৷ কেন ছাড়লেন আশ্রম? আশ্রমের পরিবেশ কি তাকে বাধ্য করেছিল ? কিছু প্রশ্ন থেকেই যায় ৷

প্রশান্ত কুমার পাল ' রবিজীবনী' তে লিখেছিলেন আর্থিক ও অন্যান্য কারণে বিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠছিল ৷ বিদ্যালয় ছেড়ে মহর্ষির জীবনী রচনার জন্য বৃত্তি নিয়ে চলে যেতে হয়েছিল কলকাতায় ৷তখন ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কটে অজিতকুমার I কিন্তু আশ্রমের প্রতি টান আর গুরুদেবের প্রতি শ্রদ্ধা অটুট ছিল তাঁর৷ আশ্রমে ফেরার অনুরোধ জানিয়ে সম্ভবত রবীন্দ্রনাথকে একটি চিঠিও দেন তিনি ৷ ১৯১৮ র ২৮ অক্টোবর লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি তার প্রমাণ ৷ 'শান্তিনিকেতনেতোমার আসা সম্বন্ধে এখনো কিছুই স্থির করিনি ৷.... এখানে স্থায়ী বন্দোবস্তের জন্য একটা কোন উপায় বোধ হয় শীঘ্র করা যেতে পারবে ৷'

তা আর করার দরকার পড়েনি ৷ চলে গেলেন অজিতকুমার I ১৯০৪ গ্রীষ্কাবকাশের পর শান্তিনিকেতনের আশ্রমে তিনি যোগ দিয়েছিলেন ৷ এই কাজটি তিনি হৃদয় থেকে করতেন ৷ তাই সেখান থেকে চলে আসাটাকে তিনি মন থেকে মানতে পারেন নি ৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোথাও যেন ভুল বুঝেছিলেন তাকে I বত্রিশ বছরের জীবনে মহর্ষি ,রামমোহন ছাড়াও জিশুর জীবনী তিনি লিখেছিলেন৷ পত্রপত্রিকায় ছড়ানো রচনা , অনুবাদ ছাড়াও আছে তাঁর লেখা বারোটি বই ৷ ছিলেন 'তত্ত্ববোধিনী ' সম্পাদক ৷ বিদেশে 'সোনার তরী ' কিছু অনুবাদ করেন ৷ রবীন্দ্রনাথের অনুমোদন সত্ত্বেও তা প্রকাশ পায়নি ৷ কোথাওযেন তাঁর কৃতিত্বকে চেপে দেওয়া হয়েছিল ৷ এমন ভাবে জৌলুসহীন ভাবেই ছিলেন তিনি ৷ গত ২৯ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু শতবর্ষ হল ৷

এমন অনেক মানুষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের আশেপাশে যারা অনেক প্রতিভাসম্পন্ন হয়ে ও পরিচিতি লাভ করেননি ৷ অজিত কুমার তার মধ্যে অন্যতম ৷