রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

সংখ্যালঘুদের “মগজ ধোলাই”..... চীন কি সফল হবে ?

সংখ্যালঘু মানে..... চীনের ইসলাম ধর্মালম্বী মানুষ. মুসলমান. হঠাত তাদের মগজ ধোলাইয়ের (চীন বলে Re-education) প্রয়োজন হল কেন?

চীনে মুসলমানরা শুধু সংখ্যালঘু নয় খুব সংখ্যালঘু, মাত্র ০.৫ %, এক শতাংশও নয়. জনসংখ্যার এই সামান্যতম অংশকে নিয়ে চীনের এত মাথা ব্যথা কেন.

আসলে শুধু সংখ্যার বিচারে সব সমস্যার গুরুত্ব মাপা যায়না. সর্বশক্তিমান আমেরিকাতেও ইসলাম ধর্মালম্বী মানুষ এক শতাংশের কম (০.৯%) অথচ গত কুড়ি বছরে একগাদা হত্যা, বিস্ফোরনের সঙ্গে জড়িত এই সম্প্রয়্দায়ের কিছু মানুষ. অনভিপ্রেত হলেও সেই সম্প্রদায়ের বাকি মানুষদের ওপরও প্রসারিত হয় এক সন্দেহের কালো ছায়া. অথচ সংখ্যার বিচারে কাছাকাছি অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়দের - ইহুদি, হিন্দু, বৌদ্ধ, নিয়ে এই মাথা ব্যথা নেই আমেরিকার প্রশাসনের. একই চিত্র ইওরোপের বিভিন্ন দেশে.

আসলে সারা দুনিয়ায় ইসলাম ধর্মালম্বীরা এক অস্থির সময়ের ভিতর জীবন যাপন করছেন. যেদেশে তারা সংখ্যালঘু সেখানে সংখ্যাগুরুদের সঙ্গে ঝামেলা, যেখানে তারা সংখ্যাগুরু সেখানে নিজেদের মধ্যে ঝামেলা এবং সংখ্যালঘুদের (যদি থাকে) উত্পীড়ন ও বিতারণ. এই গন্ডগোলে অমুসলমানদের ভুমিকা একদম নেই এমনটা নয়, তবে সমস্যার কেন্দ্রবিব্দু তারা নয়.

উইঘুর কারা

চীনের মুসলমান বলতে (এবং যারা মগজ ধোলাই এর লক্ষ্য) প্রধানত বোঝায় ‘উইঘুর’ সম্প্রদায়. এদের বাস চীনের উত্তর-পশ্চিমে জিনজিয়াং (Xinjiang – একদা সিনকিয়াং) প্রদেশে. এরা তুর্কি ভাষী, এবং জিনজিয়াং প্রদেশের জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ. এই প্রদেশকে এজন্য একদা পূর্ব-তুর্কিস্তান ও বলা হত. জিনজিয়াং প্রদেশের অপর প্রধান জনগোষ্ঠী হান-চীনাদের (৪৫%) সঙ্গে উইঘুরদের বিবাদ অনেকদিনের. উইঘুরদের অভিযোগ (যা সত্যি) এই হান সম্প্রদায়ের মানুষরা স্থানীয় নয়, মূল চীন থেকে পরিকল্পিত ভাবে এখানে পাঠানো হয়েছে জিনজিয়াং এর জনবিন্যাসকে বিঘ্নিত করতে যাতে তুর্কি ভাষা ও ইসলামের প্রাধান্য প্রতিহত করা যায় (পার্বত্য চট্টগ্রামের বিপরীত চিত্র বলা যায়. সেখানে বাংলাদেশী সৈন্য বাহিনীর সহায়তায় বাঙালি মুসলমানরা জবরদখল করছে ভূমিপুত্র পাহাড়ি জনজাতিদের কৃষি জমি, জন্মভিটা).

জিনজিয়াংকে চীন থেকে আলাদা করার একটা প্রচেষ্টা হয়েছিল চীন বিপ্লবের (১৯৪৯) আগে. কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্যে স্বাধীন রাষ্ট্র তুর্কিস্তান বানানোর  একটা প্রচেষ্টা হয়েছিল. সফল হয় নি. পরবর্তী উদ্যোগ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর. ১৯৯০এ. আফগানিস্তানে ইসলামী জোটের বিজয়ে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে মুসলিম রাষ্ট্র উজবেকিস্তান, কাজাকিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়া নিশ্চিত, তখনও একটা প্রচেষ্টা হয়েছিল জিনজিয়াংকে কমিউনিস্ট চীন থেকে আলাদা ইসলামী উইঘুরিস্তান করার. এবারও সফল হয় নি. 

উইঘুর সন্ত্রাসবাদ

চীনা সরকারী ভাষ্য অনুযায়ী এর কিছুদিন পর থেকেই চীন বিরোধী উগ্রপন্থী কার্য্যকলাপের জন্য গড়ে ওঠে একাধিক সন্ত্রাসবাদী সংস্থা যেমন, East Turkistan Islamic Movement (ETIM), East Turkistan Liberation Organization (ETLO), United Revolutionary Front of East Turkestan (URFET), and the Uyghur Liberation Organization (ULO). এই সব সংগঠনের সদস্যদের, চীন সুত্র জানাচ্ছে, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ট্রেনিং দেওয়া হয়.

এর পরের সাড়া জাগানো ঘটনা ২০০৮ সালে. ২০০৮ সাল এশীয় মহাদেশের জন্য খুব গুরুত্বপর্ণ সন. এই প্রথম একটি এশীয় তৃতীয় বিশ্বের দেশে এই প্রথম অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে. স্থান বেইজিং (পিকিং), চিনের রাজধানী. এটাই সর্বশ্রেষ্ঠ সময় সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করার. ৮ আগস্ট ২০০৮, অলিম্পিক শুরু হবে. তাই ৪ আগস্ট জিংজিয়াং এর কাশগড়ে বিস্ফোরক পদার্থ বোঝাই এক ট্রাক নিয়ে চীনা পুলিশ অফিসারদের কুচকাওয়াজে ঝাপিয়ে পড়ল কিছু উইঘুর. ১৬ জন পুলিশের মৃত্যু হল ওই আক্রমণে.

২০০৯, জুলাই মাস. জিংজিয়াং এর রাজধানীতে একটি স্থানীয় ঘটনাকে কেন্দ্র করে হ্যান-চাইনিজদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ল মুসলিম উইঘুর জনতা. ১৪০ জন নিহত হল সেই জিহাদী আক্রমণে. সারা চীন কেঁপে উঠল. এত ঘৃণা উইঘুর মানসে.

২০১৩ সাল, অক্টোবর মাস, চীন বিপ্লবের মাস. সেই মাসের ২৮ তারিখে বিপ্লবের তীর্থস্থান তিয়েনআনমেন স্কোয়ারে (যেখানে চিরশায়িত আছেন চেয়ারম্যান মাও) দর্শনার্থীদের উপর বিস্ফোরক ভর্তি এস ইউ ভি গাড়ি নিয়ে আক্রমণ চালাল উইঘুর সন্ত্রাসবাদীরা. পাঁচ জন মৃত, ৩৮ জন আহত.

ছয় মাস যেতে না যেতেই আবার আক্রমণ. ২০১৪র ১লা মার্চ কুনমিং ট্রেন স্টেশনে ছুরি হাতে হামলা চালালো আট জন উইঘুর. বীভত্স সেই হামলা. ৩৩ জন নিহত, আহত প্রায় দেড়শ.

এগুলি সব সাড়া জাগানো ঘটনা তবে চীনা সূত্র অনুযায়ী আসল চিত্র আরো গুরুতর. ২০১৪ সাল থেকে জিনজিয়াং প্রদেশে ১,৫৮৮ সন্ত্রাসবাদী গ্যাং ধ্বংস করা হয়েছে, ১২,৯৯৫ সন্ত্রাসবাদীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, উদ্ধার করা হয়েছে ২,০৫২টি বিস্ফোরক অস্ত্র, বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে ৩,৪৫,২২৯ নিষিদ্ধ ধর্মীয় পুস্তক. বেআইনি ধর্মীয় কার্যকলাপের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে ৪,৮৫৮ কে.

মগজ ধোলাই

শুধু ধরপাকড়, শাস্তিতে কাজ হবেনা এটা জানে চীন. তাই নতুন দাওয়াই – মগজ ধোলাই. চীনা বয়ানে, Re-education/ De-radicalisation ইত্যাদি.

কত উইঘুর কে ভর্তি করা হয়েছে এই Re-education এর ইস্কুলে ? ঠিক সংখ্যাটা কেউ জানে না. প্রথমে চীনা কতৃপক্ষ এই জাতীয় প্রচেষ্টার কথা পশ্চিমী দুনিয়ার অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিয়েছিল. এখন বলছে দশ লক্ষ. পশ্চিমী দুনিয়া বলছে অন্তত বিশ লক্ষ্.

Re-education প্রচেষ্টার কথা সত্যি প্রমাণিত হওয়ার পর চীন পাল্টা সুর চড়িয়েছে. বলেছে যা করা হচ্ছে তা সারা দুনিয়ার ভালোর জন্য করা হচ্ছে. ইসলামী সন্ত্রাসবাদীদের সুস্থ চিন্তার জগতে ফেরাতে পশ্চিমী দুনিয়া ব্যর্থ. সুতরাং এর সমালোচনা না করে এই প্রচেষ্টার সহায়তা করা উচিত সবার.

পশ্চিমী দুনিয়ার দাবী, Re-education এর নামে একধরণের জেলখানায় বন্দী করে উইঘুর যুবকদের মগজ ধোলাই ও ইসলামের বদনাম করা হচ্ছে. অত্যাচার করা হচ্ছে. স্বাভাবিক ভাবে চীন অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, ধর্মীয় সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে যুবকদের সমাজের জন্য মঙ্গলকর শিক্ষা ও কুশলতা (skills) প্রদান করা হচ্ছে যাতে তারা আধুনিক চিনের উন্নত কারিগরী ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে পারে.

জিনজিয়াং এর রাজ্যপাল বলেন, এগুলো জেলখানা নয় বোর্ডিং স্কুলের মতন. এখানে ছাত্ররা শিখছে ছবি আঁকা, গান, নাচ, খেলাধুলা. এসব বিষয় সম্বন্ধে আগে তারা কিছুই জানত না. জীবনে যে এইসব সুন্দর বিষয় উপভোগ করা যায় তারা জানত না.

নীরব ইসলামী দুনিয়া

পশ্চিমী দুনিয়া উইঘুর মুসলমানদের ওপর অত্যাচার ও ইসলামের থেকে তাদের দুরে সরিয়ে নেওয়ার চক্রান্ত চলছে বলে যতই চেচাক না কেন ইসলামী দুনিয়া মোটামুটি মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে. দু একটা এদিক ওদিক হালকা বিবৃতি দেওয়া ছাড়া তারা আর কিছু করনি বা করার পরিকল্পনাও নেই. তারা জানে সারা দুনিয়ায় অশান্তি ছড়ানো, ইসলামী মৌলবাদ নিয়ে চিনের কোন মাথাব্যথা নেই. তার নিজের দেশের মুসলমানরা গন্ডগোল না করলেই হলো. যেমন, ভারত বিরোধিতার জন্য পাকিস্তানের ইসলামী সন্ত্রাসবাদীদের চিরকাল সমর্থন দিয়েছে চীন. সারা দুনিয়া স্বীকৃতি দেওয়ার পরও স্বাধীন বাংলাদেশকে চীন স্বীকৃতি দিয়েছে মুজিব হত্যাকারী ভারত বিরোধী শক্তি ক্ষমতায় আসার পর. সুতরাং অর্থনৈতিক মহাশক্তি চিনের সাথে সম্পর্ক খারাপ করার ঝুঁকি কোন ইসলামী দেশ নিতে রাজি নয়.

চীন কি সফল হবে ?

যেকথা শিরোনামে রয়েছে .... চীন কি সফল হবে ? মগজ ধোলাই এর মাধ্যমে কি সত্যিই উইঘুর মুসলমানদের ইসলামী মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ থেকে দুরে সরিয়ে মুক্তমনা চীনা নাগরিকে পরিনত করা সম্ভব হবে ? চীন কি পারবে?

বোধ হয় নয়.

মগজ ধোলাই চিনে নতুন কিছু নয়. মগজ ধোলাইয়ের ক্যাম্প সারা চীন জুড়ে চালু হয়েছিল ষাটের দশকে – সাংস্কৃতিক বিপ্লবের স্লোগান তুলে. শিল্পী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, অধ্যাপক, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার সবাইকে ‘গ্রামে’ পাঠানো হয়েছিল. লাভ হয় নি. সাংস্কৃতিক বিপ্লবের চিন্তাধারাকে ছুড়ে ফেলে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার হাত ধরে উত্থান হয়েছে এক নতুন চিনের. যাকে এখন খোদ আমেরিকাই সমঝে চলে.

উইঘুর সমাজের ভিতর থেকে বা সমগ্র মুসলিম সমাজের ভিতর থেকে মুক্তমনা নেতা বা চিন্তাধারার উদ্ভব না হওয়া পর্যন্ত বাইরে থেকে চাপিয়ে দিয়ে সমাজ সংস্কার সম্ভব নয়.

মানস রায়

ক্যালিফোর্নিয়া.

১৬ই আগস্ট, ২০১৯