শনিবার, এপ্রিল ৪, ২০২০

মহাসত্যের বিপরীতে, পর্ব ৩০


হয়তো আশাহীনতাই সেই মাটি যা মানুষের আশাকে লালন করে। - ভাস্লাভ হাভেল

# ত্রিশ

অবশেষে মিগমার বলে, আর দেরি করা যাবে না। দ্বিতীয়জন হয়তো নদীতে পড়েছে আর স্রোতে ভেসে গেছে। আমরা আহত মানুষটিকে সঙ্গে করে নিয়ে যাই। সে সম্পূর্ণ অচেতন; ওকে আমার ঘোড়ায় দু ' দিকের রসদের পুটলির মাঝে শুইয়ে নিতে হবে। আমি লোকটির বা তার সঙ্গীর ঘোড়ায় চড়বো!

– অন্য ঘোড়াটিকেও নিয়ে যাব?

— অবশ্যই । কেউ এপথে এত দামি ঘোড়া ছেড়ে যায় ? দ্বিতীয় ঘোড়াটি খোড়াচ্ছেও! আহত মানুষটি যদি জ্ঞান ফিরে পায়, সুস্থ হয়ে উঠে ঘোড়াদুটি চায়? ওর ঘোড়ার পিঠে ঝোলানো থলেগুলিতে কী আছে দেখেছিস?

– হ্যাঁ মামা, টাকা, খাবার আর জামাকাপড়, সব চুপচুপে ভেজা!

মিগমার বলে,- তাহলে এরা নদীর ওপার থেকে এসেছে অথবা পার হওয়ার চেষ্টা করেছে।

অনগ বলে,- পথে প্রথম যে গ্রামটি আসবে সেখানেই লোকটিকে ছেড়ে যেতে হবে!

ওর মামা বলে, কেন? ওকে আমাদের সঙ্গে মঠে নিয়ে যেতে হবে, পথের ধকলটা যদি সইতে পারে তাহলে ওখানে ওকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করা যাবে!

একটু থেমে তিনি ফিসফিসিয়ে বলেন, ভাল করেও কাউকে সত্যি কথাটা বলে দিস না, কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবি, এ আমাদের অসুস্থ বন্ধু, পাহাড়ি পথে ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে মারাত্মক আহত হয়েছে! এই চারটি ঘোড়াই আমাদের বুঝলি! মুখ ফসকেও যদি কাউকে, অন্য কিছু বলে ফেলিস তাহলে আমরা বিপদে পড়বো!

মিগমারের আওয়াজ ও তার চাহনিতে এমন কিছু ছিল যে অনগ কেঁপে ওঠে। সে বলে, মামা, আপনার কথা অমান্য করার প্রশ্নই ওঠে না! আমি আর কতটা দুনিয়া দেখেছি, আপনার বিপুল অভিজ্ঞতা! অনগ মনে মনে ভাবে, মামার সঙ্গে যেতে রাজি হয়ে ভুল করেনি তো? তিনি হঠাৎ করেই যেন বেশি কর্তৃত্ব ফলাচ্ছেন, সামান্য কারণে শরীরী ভাষা বদলে ফেলে সন্ত্রস্থ করে তুলেছেন। এই মামাকে তো অনগ আগে দেখে নি! এই কর্তৃত্বে মামার বাড়ির আদর কোথায়?

মিগমার মনে মনে ভাবে, এই ঘোড়াদুটি আমার লাভ, আর জীবিত অথবা মৃত এই মানুষটি আমাদের আরোগ্য নিকেতনের কাজে লাগবে। মহামহিম খুব খুশি হবেন। মহামহিম বন-পা মঠ হাসপাতালের সবচাইতে বৃদ্ধ এবং বড় ডাক্তার। শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের হাতে-কলমে উপাচার শেখাতে মৃতদেহও মহার্ঘ। তাই চিকিৎসক শিক্ষকদের প্রতি নির্দেশ রয়েছে...!

কিন্তু মহামহিমের কথা মনে পড়তেই এক মুহুর্তের জন্যে মিগমার কেঁপে ওঠে। যেমন করে একটু আগে মিগমারের সতর্কবানী শুনে তার ভাগে কেঁপে উঠেছিল।

এতক্ষণ ধরে হাকডাক এবং খোঁজাখুঁজির পরও দ্বিতীয় অশ্বারোহীর কোনও হদিশ না পেয়ে মিগমার নিজের ঘোড়ার পিঠে জামাকাপড় এবং রসদের পুটলিগুলির সঙ্গে নিরুদ্দেশ অশ্বারোহীর খোড়া ঘোড়াটির পিঠের কিছু থলে যুক্ত করে তার উপর সংজ্ঞাহীন গরবকে কম্বলে মুড়ে শুইয়ে ভালভাবে বেঁধে নেয়। শুধু নাকের কাছে কম্বলে ফাঁক রাখে। তারপর ওই ঘোড়ার লাগামের অন্যপ্রান্ত নিজের ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বেঁধে নেয়। নিরুদ্দেশ অশ্বারোহীর ঘোড়াটির আহত পায়ে অনগের পুটলি থেকে হলুদবাটা বের করে লাগিয়ে কাপড়ের পটি বেঁধে দেয় মিগমার। সেটির লাগাম বেঁধে দেয় ভাগ্নে অনগের ঘোড়ার জিনে। এদিকে কাকের ডাক বেড়েই চলেছে । তখনও সূর্য ওঠেনি।

ওরা দূরবর্তী বন-পা মঠ আরোগ্য নিকেতনের পথে এগিয়ে যায়। মিগমার জানে না তার এই পদক্ষেপ একটি হাজার হাজার বছরের জগদ্দলকে কেমনভাবে ঝাঁকিয়ে দেবে!

এদিকে মামা মিগমারের রকমসকম দেখে সদ্যযুবক অনগের মনে দ্বিধা ও সংশয় ক্রমে একটি অজানা আশংকায় রূপান্তরিত হচ্ছে। কি জানি কেন বুক দুড়দুডু করে। বড় অসহায় লাগে।

তবুও সে বন্ধুর পথে মামাকে অনুসরণ করে ঘোড়া চালিয়ে এগিয়ে যায়।

দেচমা যেভাবে জলে ডুবে ভেসে যাচ্ছিল সে আর বাঁচার আশাই করে নি। কিন্তু ভাগ্যদেবী তাকে যেন কোলে করে অক্ষত অবস্থায় বাঁচিয়ে দিয়েছে। গরবের পাশাপাশি ঘোড়া চালিয়ে সে প্রায় নদী পার করেই ফেলেছিল তখনই ঘোড়ার পা হড়কে যাওয়ায় সে জলে পড়ে যায় আর প্রবল স্রোতের ঘূর্ণি তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু তার সৌভাগ্য যে বন্যার জলের তোড়ে নদীর মাঝে চলে না গিয়ে ঘূর্ণির ধাক্কায় প্রায় একশোগত দূরে নদীর পাশেই তৈরি হওয়া একটি পুকুরে গিয়ে পড়ে। সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য কে জানে। তখন সে অর্ধ অচেতন ও ক্ষতবিক্ষত। বরফগলা জল ক্রমে জমিয়ে দিচ্ছে তাকে।

ওই পুকুরে জলের গভীরতা তখন বড়জোর হাঁটু সমান। ওর পেছনের বিশাল খাড়া পাথরের চাঁইটি নদী আর এই পুকুরের সীমানায়। পাথরটিতে শ্যাওলা জমে পিচ্ছিল। অন্ধকারে ওই পাথর চড়ে উপরে ওঠা সম্ভব নয়। ওর ডানে ও বাঁয়ে বন্যার জলের ছলাৎছল শুনে সে কোনদিকে যাবে বুঝে উঠতে পারে না। কিন্তু সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে না। ওকে এখান থেকে বেরুতেই হবে। নাহলে সে নির্ঘাত জমে গিয়ে মারা যাবে অথবা তখনই আবার বৃষ্টি শুরু হলে, বন্যার জলে বাড়লে এই পুকুরের জলও বেড়ে গেলে ডুবে মরতে হবে। একটু পরেই সে বুঝে যায় যে আর বৃষ্টি হবে না। ভারি কুয়াশায় চারপাশ ঢেকে যায় । দেচমা ভাবে, গরব নিশ্চয়ই তাকে খুঁজছে, সে এখন কোথায়? ঘোড়া চালানোয় সে দেচমার থেকে আরও পারদর্শী। দেচমার দেখা শ্রেষ্ঠ পারদর্শী ঘোড়া গরবের আদুরে নাগপো। সে নিশ্চয়ই নির্বিঘ্নে নদী পার হতে পেরেছে। হয়তো দেচমাকে এভাবে ভেসে যেতে দেখে ধরেই নিয়েছে যে সে আর বেঁচে নেই। তারপর? তারপর কি ও সেখান থেকে চলে গেছে? না গিয়ে সে যদি নদীর তট ধরে খুঁজতে বেরুতো, চিৎকার করে ডাকতো, তাহলে এতক্ষণে ওকে পেয়ে যেত। অবশ্য চিৎকার করলে নদীর ওপার থেকে সৈনিকদের গুলি ছুটে আসতে পারে। ওরা যদি জানতে পারে যে পলাতক ঘোড়সওয়ার আসলে কোনও সামান্য গুপ্তচর কিম্বা চোরাকারবারী নয়, কুখ্যাত ডাকাতসর্দার গরব যার মাথার দাম এক লক্ষ ইউয়ান তাহলে লোভের বশবর্তী হয়ে ওই সৈনিক দলও নদী পার হয়ে ওকে ধাওয়া করতে পিছপা হবে না। দেচমা বুঝতে পারে না, গরব এখন কোথায়?

দেচমা জলের মধ্যেই লাফাতে থাকে। লাফাতে লাফাতে লাফাতে লাফাতে কিছুক্ষণের মধ্যেই অনুভব করে, সে যে জায়গায় অসহায়ের মতন দাঁড়িয়ে রয়েছে সেখানকার জল আরও নেমে গেছে তার গোড়ালি পর্যন্ত। ভোর হওয়ার আগেই সে বুঝতে পারে যেখানে দাড়িয়ে রয়েছে সেটি কোনও পুকুর নয়; নিচু জমি মাত্র। ততক্ষণে জল সম্পূর্ণ নেমে গেছে। শুধু সে ভেজা শরীরে থরথর করে কাঁপছে। বারবার পায়ে খিঁচ ধরছে। সে ভোরের আলোতে অনেক কষ্টে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে শুরু করে। এখন চলাই একমাত্র ওকে বাঁচাতে পারে।

সাবধানে পাথরের খাঁজে পা রেখে অনেক কষ্টে সে নদীতীরে উঠে আসে। দুপাশে ঘন অরণ্য। জামাকাপড় যথাসম্ভব চিপে জল নিংড়ে ফেলে সে পায়ের মোজা এবং হাতের দস্তানাও চিপে জল বের করে। তারপর আবার লাফিয়ে লাফিয়ে শরীর গরম করার চেষ্টা করে। কিন্তু বারবার পায়ে খিঁচ ধরছে। গরব কিম্বা ঘোড়াদুটি কোথায়? অনেক কষ্টে সে আবার লাফাতে চেষ্টা করে। লাফাতে লাফাতে লাফাতে লাফাতে সে ভাবে গরব আর ঘোড়াদুটিকে কি আদৌ খুঁজে পাবে? গরব কি চীনা সৈন্যদের ধাওয়া খেয়ে দূরে কোথাও চলে গেছে? নাহলে সে নিশ্চয়ই দেচমার খোঁজ করতো! এত সহজে দেচমাকে হারিয়ে ফেলার পাত্র নয় তার গরব। দেচমার ঘোড়াটিই বা কোথায় গেল? সেটি কি বন্যার জলে ভেসে গেছে? যেভাবে হোচট খেয়েছিল তাতে যা খুশি হয়ে থাকতে পারে। ভেসে যাওয়া কিম্বা দেচমার মতন কোথাও আটকে বেঁচে যাওয়া। চারিদিকে তাকিয়ে সে কোনও জনপ্রাণীর হদিশ পায় না। শুধু উজানের দিকে কিছু কাকের ডাক শুনতে পায়। সে সেদিকেই দৌড়ুতে শুরু করে। এবড়ো খেবড়ো পাথুরে পথে পায়ে খিঁচ নিয়ে দৌড়ানো খুব মুশকিল। তবুও যতটা জোরে লেংচে লেংচে ছোটা যায়! গরব গরব আমার গরব - তোমার কিছু হয়নি তো ? তাহলে আমি পাগল হয়ে যাব!

ছুটতে ছুটতে ছুটতে ছুটতে দেচমা একসময় ঠিক সেই জায়গায় পৌঁছে যায় যেখানে নদীর জল অগভীর, বন্যার জল নেমে যাওয়ায় এখন কোথাও হাঁটুজল আবার কোথাও কোমরজল। যে গাছটার গোড়ায় হোঁচট খেয়ে পড়ে গরব সারারাত অজ্ঞান হয়েছিল ওখান দিয়ে যাওয়ার সময় দেচমা কিছুই বুঝতে না পারলেও কাদামাটির উপর অনেককটা ঘোড়ার পায়ের ছাপ দেখতে পেয়ে সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। নিশ্চয়ই কিছু ঘটেছে। ওর তলপেটে মোচড় দেয়। কিন্তু কী ঘটেছে কিছুই বুঝতে পারে না। কেননা একটু পরেই কাদাজম শেষ। চারপাশে গুড়ি পাথর আর পাথুরে জমিতে আর কোনও ঘোড়ার পায়ের ছাপ দেখতে পায় না সে। না পাওয়ারই কথা, ওই শক্ত মাটিতে ঘোড়ার পায়ের ছাপ পড়ে না । কাকগুলিও আর ডাকছে না, গতসন্ধ্যায় অনুধাবনকারী সৈনিকরা যদি এপাড়ে এসে গরবকে ধাওয়া করে থাকে তাহলে গরব কোনদিকে পালিয়েছে কে জানে ? নাকি ওরা গরবকে ধরে ফেলে নদী পার হয়ে চীনের কারাগারে নিয়ে গেছে! দেচমার মন কু ডাকে। কাদামাটির উপর ঘোড়ার পায়ের দাগগুলি দেখে সে বোঝে যে বন্যার জল নেমে যাওয়ার পরই এই ঘোড়াগুলি এখান দিয়ে গেছে। তাহলে কি ভোরের দিকেই ওরা গরবকে ধরে নিয়ে গেছে? দেচমা কিছুই বুঝতে পারে না। আর এই চিন্তার ঘূর্ণিতে ডুবতে ডুবতে ভাসতে ভাসতে সে ওই পরিবেশে ওর প্রেমিকের যন্ত্রণাভোগের চিহ্নগুলি টের পায় না, বাতাসে পরিব্যপ্ত প্রিয়তম গরবকে হারানোর হাহাকার ও ফিরে পাওয়ার তীব্র আকুতি অনুভব করে। সে ভাবে , না, এখানে দাঁড়িয়ে থাকা নিরর্থক। গরব যদি নদী পার হওয়ার পর সুস্থ থাকে তাহলে সে নিশ্চয়ই ভাটির দিকে দেচমাকে খুঁজতে গেছে। কাজেই তার উচিত নদী যেভাবে বয়ে গেছে তার পাড় ধরে সেইভাবে ভাটির দিকে এগিয়ে যাওয়া।

দেচমা ঘুরে উন্মাদের মতন নদীর পাড় ধরে ছুটতে থাকে। যেমনভাবে ছুটতে ছুটতে উজানের দিকে এসেছিল তেমনভাবেই ছুটতে ছুটতে ভাটির দিকে ফিরতে থাকে। ছুটতে ছুটতে ছুটতে ছুটতে শরীর গরম হলে মস্তিষ্কের চিন্তার গ্রন্থিগুলির জট খুলতে থাকে। তার চলার গতি শ্লথ হয়। সে হাঁটতে হাঁটতে রাতের দুর্ঘটনার কথা ভাবে।

চীনা সৈন্যদের ধাওয়া খেয়ে গরব একে একে দু ’ জন সৈন্যকে গুলিবদ্ধ করে। পেছন থেকে আরও সৈন্য ধেয়ে এলে ওরা সন্ধ্যার অন্ধকারে পাশাপাশি ঘোড়া চালিয়ে নদী পার হতে যায়। এপারের কাছাকাছি এসে ওর ঘোড়াটি পা পিছলে পড়ে গেলে দেচমাও জলে পড়ে যায়। তারপর ঘোড়াটির কী হল? সেটি কি স্রোতে ভেসে গেল? গরবের ঘোড়াটিও কি পড়ে গেছিল? নাকি দুটি ঘোড়াই এপাড়ে উঠে পড়ে, আর দেচমাকে খুঁজে না পেয়ে রাতের আধারে কিম্বা কাকভোরে গরব ওখান থেকে চলে গিয়ে আত্মরক্ষা করেছে? শেষের ভাবনাটিকে বিশ্বাস করে উঠতে পারে না দেচমা। আর যাইহাক, ওর গরব পালিয়ে যাওয়ার মতন কাপুরুষ নয়। সে হয়তো কোথাও লুকিয়ে আত্মরক্ষা করে আবার গেরিলা আক্রমণে শত্রুর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওদের ঘাড় মটকে দেবে। এক্ষেত্রে গরব নৃশংস ও ক্ষিপ্র।

স্কালের সূর্যকে ডাইনে রেখে হাঁটতে হাঁটতে এসব ভাবছে, তখনই হঠাৎ নদীর মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা একটি তীক্ষ প্রস্তর খণ্ডের মাথায় একটি নীলরঙের কিছুকে বাতাসে পতপত করে নড়তে দেখে। এক নজরে মনে হবে নীলরঙা কোনও পাখি বুঝি ওখানে বসে ডানা নাড়ছে। কিন্তু ওটার গায়ে লাগানো একটি চকমকে ধাতব চাকতিতে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হওয়ায় দেচমা বুঝতে পারে ওটি কোনও পাখি নয়। তার পরিচিত কিছু আভাস পেতেই দেচমার তলপেটে আবার মোচড় দেয়। একদম নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে ওটাকে আরও ভালভাবে দেখে তার হৃদপিণ্ডের স্পন্দনও বেড়ে যায়। ওটি যে গরবের টুপি। নীল কাপড়ের বেস্টনির উপর বসানো চকচকে সোনালি ফিতে আর মধ্যিখানে সোনালি ধাতব বোতাম দেখে সে হ্যাটটি চিনতে পারে। সে দাঁড়িয়ে পড়ে।

টুপিটা ওখানে গেল কেমন করে? তার মানে গরব নিশ্চয়ই দেচমাকে বাঁচানোর জন্য নদীতে ঝাঁপিয়েছিল। তখনই হয়তো তার মাথা থেকে টুপিটা খুলে ছিটকে জলে পড়ে যায়। ওই নদীর মাঝামাঝি জলের মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরটির মাথায় টুপিটা আটকে থাকার মানে জলের উচ্চতাও তখন এত বেশি ছিল! এই দৃশ্য দেখে দেচমা একা একা একা একা হয়ে ভেঙ্গে পড়তে থাকে। তার মনে হয়, গরব আর বেঁচে নেই। একথা ভাবতেই গলা ধরে আসে, চোখ জলে ভরে যায়। সে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে শুরু করে। কাঁপতে কাঁপতে বারবার দাঁতি লেগে যেতে থাকে। পূর্বজদের থেকে পাওয়া অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারগুলি মনের মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। লাহসায় সেই গণকের কাছ থেকে বেরিয়ে এসে ওর মনে যেমন ঝড় উঠেছিল, একটা অপরাধবোধ আর হাহাকার সমস্ত অস্তিত্বে ছেয়ে যায়। শুধু নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটে স্বার্থপরের মতন নিজের অসহায় বৃদ্ধ ঠাকুর্দা-ঠাম্মাকে বিপদে ফেলে পালিয়ে আসার পাপের ফল ভুগছে এখন সে। অদৃষ্ট ওর প্রিয়তম মানুষটিকে এভাবে কেড়ে নিয়ে ওকে শাস্তি দিলো!

ওই পুরনো পাপের স্মৃতি ছাড়াও কিছু অদূর অতীতের ঘটনা ওর চোখে ভাসে। শুধুমাত্র ওকে খুশি করার জন্যেই লাহসা যাওয়ার পরিকল্পনা ছকেছিলো। ডাকাতির পর স্বাভাবিক নিয়মে সে তার গ্রামে ফিরে গেলে ওই প্রভূত ধনরাশি ও মহামূল্যবান অলংকার তাকে বিরাট ধনী ও পরাক্রমী করে তুলতো। লাহসা যাওয়ায় সে মহামহিম সর্বশক্তিমান অবলোকিতেশ্বর দলাই লামার সামনে ধনী সওদাগর সেজে অভিনয় করেছে। দেচমার ধারণা মহামহিম ঠিক টের পেয়েছেন যে গরব ও তার সঙ্গীরা আসলে কারা? তাদের দেওয়া উপটৌকনও যে আসলে লুটের মাল তা-ও নিশ্চয়ই তিনি টের পেয়েছেন। কৌশলে আশীর্বাদ নিতে গিয়ে গরব হয়তো দলাই লামার অভিশাপ পেয়ে এসেছে। সেজন্যে দলাই লামার মহাপ্রয়াণের পরই চীনা সৈন্যরা গ্রামে হানা দিয়ে ওদের সর্বস্ব লুট করে নিয়েছে আর এখন গরব নিজেই ...ভাবতে ভাবতে আবার চোখ জলে ভরে আসে।

গরবের সম্ভাব্য মৃত্যুর জন্যেও নিজেকেই দায়ী ভাবে দেচমা। তার উচিত ছিল গরবকে একা যাত্রা করতে উদ্বুদ্ধ করা। হয়তো তার সঙ্গে একজন মহিলা অশ্বারোহী দেখেই চীনা সৈন্যদের মনে সন্দেহ জাগে। তার চাইতে গোরিং এর উপদেশ মেনে মাথার চুল কেটে সে সন্নাসিনীর ছদ্মবেশে একা পদব্রজে এগিয়ে যাতয়ার জন্য জেদ ধরতে পারতো। সে কেন চুল কাটাতে চাইলো না? চুল কাটালে ওকে দেখতে বাজে লাগবে, এই স্থূল ভাবনাটির উর্ধে না উঠতে পারার জন্যে আফশোষ হয়।

ওর সাধের চুল! এই আজানুলম্বিত চুল দেখেই ওদের এলাকার প্রশাসকের ছেলে তার প্রেমে পড়েছিলো। আর তার স্বপ্নপুরুষ তো কত রাতে ওর চুলে মুখ ঢেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। এখন দেচমা সেই চুলকেই ঘেন্না করতে শুরু করে। ওর স্বপ্নের নায়ক, যে প্রেমিকের উপস্থিতি ওর দেহের প্রতিটি কোষে কোষান্তরে খুশির লহর বইয়ে দিত - সে আজ নেই। সে আর কার জন্য সুন্দরী সেজে থাকবে! এই অভিশাপ্ত চুল সে কেটেই ফেলবে। গরবের আগে কোনও পুরুষ তাকে স্পর্শ করেনি, আর কোনওদিন কাউকে স্পর্শ করতেও দেবে না সে। সে মনে মনে ঠিক করে, এখন সত্যিকারের সন্ন্যাসিনীর জীবনযাপন করবে। মঠে গিয়ে থাকবে।

কিন্তু তার মনে কোনও বৈরাগ্য আসবে বলে মনে হয় না। দেচমা নিজের অজান্তেই বিলাপ করে কাঁদতে শুরু করে। এই শীর্ণ নদীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা অনুভূমিক প্রস্তরখণ্ডে ঝুলতে থাকা গরবের নীলটুপি ও সোনালি ফিতে পাখির মতন ডানা ঝাপটায়। মেঘহীন আকাশ, জলো কলকল শব্দ ছাপিয়ে দেচমার কানে শুধু নিজের কান্নার শব্দ। মাটিতে থেবড়ে বসে দু’হাতে মাথা চেপে ধরে কাঁদতে থাকে সে। আশপাশের গাছের পাতা, পাথরের খাঁজে খাঁজে সেই কান্নার শব্দগুলি গিয়ে রেণু রেণু জমা হতে থাকে। তারপরই সে তার কোমরবন্ধনী থেকে লম্বা ছুরিটা বের করে পাগলের মতন নিজের চুল কাটতে শুরু করে। গুচ্ছ গুচছ লম্বা চুল তার পায়ের ওপর গড়িয়ে পড়তে থাকে। কিছুক্ষণ পর ওর মাথা প্রায় ন্যাড়া হয়ে যায়। শুধু এখানে ওখানে বিক্ষিপ্ত কিছু চুল অর্ধেক কাটা অবস্থায় লেগে থাকায় তাকে দেখলে অপ্রকৃতিস্থ ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না। সে দুহাতে ওই চুল তুলে ধরে। পাথরের উপর গরবের টুপিটা যেখানে আটকে রয়েছে সেই দিকে লক্ষ্য করে তার চুলগুলিকে ছুঁড়ে দেয়। চুলগুলি জলে পড়ে মুহূর্তে খরস্রোতে ভেসে যায়। সে বলে, আমার গরব, প্রিয়তম, আমার জীবন, তোমাকে দিলাম!

তার শিরা-ধমনীতে প্রবাহিত রক্তও যেন তখন হিম হয়ে গেছে। দুই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা । সে একদৃষ্টে ওই টুপিটার দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে। জোরে বাতাস বইছে। পাথরে আটকে থাকা টুপিটাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। সে জোড়হস্ত উঁচু করে তিনবার মন্দিরের বিগ্রহকে প্রণাম করার মতন টুপিটাকে প্রণাম করে। অঞ্জলি ভরে নদীর জল খায়। তারপর সে ঘুরে দাঁড়ায়। চোয়াল শক্ত হয়। অরণ্যে তখন গাছগুলির ছায়া ক্রমে দীর্ঘ হচ্ছে। সে হাঁটতে শুরু করে। অনেক দূরে একটা বসতি দেখতে পেয়ে জোরে পা চালায় । হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে অনেকক্ষণ পর সে যখন একটি খামারবাডির দরজায় পৌঁছোয় তখন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। ওর করাঘাত শুনে যে মহিলা দরজা খোলেন, তিনি ওকে দেখে আঁতকে ওঠেন। কাদামাখা ভেজা আলখাল্লা আর ছুরি দিয়ে কাটা অসমান চুল, প্রায় ন্যাড়ামাথা রূপসী মানুষটিকে দেখে তিনি সাক্ষাৎ পেত্নী ভেবে ভয় পান। কে বলবে এই মেয়েটিই গত এক দশক ধরে চীন-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় রেশম পথের কুখ্যাত দস্যুসর্দার গরবের প্রাণাধিক প্রিয়তমা সুন্দরী দেচমা।

দেচমা মহিলাকে আঁতকে উঠতে দেখে নরম স্বরে বলে, ভয় পাবেন না, আমি এক হতভাগিনী! বাবার সঙ্গে খ্যাং তিসে ও ৎসো মাফাম তীর্থে গেছিলাম, ফেরার পথে গতরাতের বন্যায় তোমাদের এই নদী আমার বাবাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আজ সারাদিন খুঁজেও তার দেখা পাইনি।

অনেক ভাবনাচিন্তা প্রসূত এই মিথ্যে কথা বলে সে গরবের খাতিরেই। তিব্বতে প্রতিবছরই অসংখ্য হড়কা বানে ভেসে যাওয়া কিম্বা ডুবে মরার ঘটনা ঘটে। একথা সবাই বিশ্বাস করবে, তাছাড়া গরবের মাথার দাম ঘোষণা করা থাকায় সত্যি কথাটা চীনা সেনাবাহিনীর কেউ কিম্বা নদীতীরবর্তী কোনও লোভী মানুষ জানতে পারলে ওরা সবাই নদীপথে বা নদীর পাড় ধরে ছুটবে তার মৃতদেহ উদ্ধার করতে । তারপর তার শরীর থেকে মাথা কেটে নিয়ে ওরা লবন মাখিয়ে সেনাপতির কাছে পুরস্কার নিতে যাবে। ভাবতেই শিউরে ওঠে দেচমা!

দেচমার মুখে পিতার মৃত্যুসংবাদ শুনে ব্যথিত গৃহকত্রী তাকে জিজ্ঞেস করেন, কিন্তু এমন বিচ্ছিরিভাবে চুল কেটেছ কেন!

দেচমা বলে, আমি বিধবা!

– এই বয়সে, আহারে, আর তোমার বাবাও ডুবে গেলেন, আহা . .

কিছুক্ষণ চুপ থেকে গৃহকত্রী আবার বলেন, ধর্মের পথ বেছে নিয়ে ভালই করেছ, এই পৃথিবী দুঃখে ভরা, কিন্তু তথাগত বুদ্ধ দুঃখকে অতিক্রম করে এগিয়ে চলার পথ দেখিয়েছেন।

উনুনের পাশে অনেকক্ষণ বসে দেচমার জামাকাপড় শুকিয়ে যায়। গৃহকত্রীর দেওয়া একবাটি গরম বার্লি খায়। তারপর গৃহকত্রী ওকে বিছানা দেখিয়ে দিতেই সে পা তুলে শুয়ে পড়ে। আর কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে নিজেও জানে না।

কাকভোরে ঘুম ভাঙ্গলে গৃহকত্রীর সঙ্গে মাঠে ঘুরে এসে সে আর একবাটি গরম বার্লি খেয়ে গৃহকত্রীর দেওয়া একটি পুটলিতে সামান্য শুকনো খাবার নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়ে। গৃহকত্রী ওকে একটা মঠের হদিশ দিয়েছে। সারাদিন হেঁটে সন্ধ্যার আগেই সেই মঠে পৌছে যায়।

মঠের বয়োজ্যেষ্ঠ ভিক্ষুণীর কাছেও সে একই গল্প বলে। আর বলে স্বামী ও পিতার মৃত্যুর পর বাকি জীবনটা সে ভিক্ষুণী হয়েই সমাজের সেবা করতে চায়। তার আলখাল্লার নিচে লুকনো সমস্ত গরম গয়না সে ওই বয়োজ্যেষ্ঠার হাতে তুলে দিয়ে বলে, এগুলি বিক্রি করে মঠের তহবিলে দেওয়া হোক আর একবার আমার স্বৰ্গত পিতা ও স্বামীর নামে প্রদীপ জ্বালানো হোক, আরতি করা হোক! মনে মনে সে এসব কিছু গরবের আত্মার শান্তিকামনায় ও পবিত্র প্রাণে পুনর্জন্মের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে। পরদিন দেচমার মাথা ভালভাবে মুণ্ডন করা হয় আর আটদিন পর তাকে দীক্ষা দেওয়া হয়।

কিন্তু তারপর দিনের পর দিন, সপ্তাহ, মাস এমনকি বছর পেরিয়ে গেলেও দেচমা তার গরবকে ভুলতে পারে না। অবশ্য সে এখন আর স্বপ্নে ঘোড়া ছোটায় না। একটি প্রস্তরখণ্ডের উপর পাখির মতন ডানা ঝাপটাতে থাকে - একটি নীল টুপি ও সোনালি ফিতে। ডানা ঝাপটাতে থাকে অবিরাম।