শনিবার, নভেম্বর ১৬, ২০১৯

মহাসত্যের বিপরীতে, পর্ব ২২


‘যেন অদৃশ্য কেউ একজন / অত্যন্ত সংগোপনে

তার পিঠের আড়ালে নিপুণ হাতে মুছে দিচ্ছে

তার এ পর্যন্ত যাপনের ইতিবৃত্ত...’ জ্যোৎস্না মিলন (তার পিঠের আড়ালে)

# বাইশ

এ এক অদ্ভূত অনুভূতি। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হওয়া, নতুন মানুষ হয়ে ওঠা! এক স্নেহের কাঙাল থেকে দুর্ধর্ষ ডাকাত, তারপর প্রেমিক, ক্রমে অভিযাত্রী, না জানি কিসের আকর্ষণে সে ছুটছে ছুটছে ছুটছে...

গরবের ধারণা ছিল যে ৎসো মাফামই সাংপোর উৎস । থোকচেনে পৌঁছেই কিন্তু তার মনে সন্দেহ দেখা দেয় । সেখানেই হঠাৎ লক্ষ করে যে নদের স্রোত উল্টোদিকে বইছে । তাহলে কি ওরা দিকভ্রান্ত হয়েছে ? ভুল পথে এসেছে ?

সকালে তাসাম বাজার থেকে ফেরার পথে দোংগলকে এই প্রশ্ন করলে সে হেসে জবাব দেয়।এই অঞ্চলের নানা পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসা খরস্রোতার জল মিশে এই সাংপোর উৎপত্তি। ভারতীয় পর্যটকদের কাছে শুনেছি , ভারতে গিয়ে এর নাম হয়েছে ব্রহ্মপুত্র । কিন্তু শামসাং এর প্রয়াগ থেকেই ওই নদের জন্ম। তার আগে কোনও খরস্রোতাকেই সাংপো বলা যায় না। প্রায় সবকটাই সাংপোর বুকে গিয়ে মিশেছে। কিন্তু থোকচেন থেকে কোনও নদী গিয়ে সাংপোতে মেশেনি । এখানকার কিছু নদী গিয়ে মিশেছে তামুলুং ৎসো বা তামুলুং হ্রদে , কতকগুলি গিয়ে মিশেছে তাগ সাংপো আর কতকগুলি মিলে হয়েছে সামো সাংপো । এই তাগ সাংপো আর সামো সাংপোর জল গিয়ে পড়ে ৎসো মাফামে । তার মানে এই দুটি নদীর পাশে সাংপো নাম থাকলেও এদের সঙ্গে মূল সাংপোর কোনও সম্পর্ক নেই । সেজন্যেই এখান থেকে উল্টো স্রোত দেখতে পাচ্ছি ।

ওরা চারজন এখন কোন সাংপোর ধার দিয়ে যাচ্ছে কে জানে ? তবে এটা নিশ্চিত যে ওরা ৎসো মাফামের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছে । চারপাশে এখন বরফের রাজত্ব । চারপাশে বরফগলা জলের স্রোত পাথরের বুকে আছড়ে পড়ছে । দু ' পাশের ঝর্নাগুলি থেকে বেরিয়ে আসছে অজস্র স্রোতধারা । সেই খরস্রোতাগুলির উৎসের কাছাকাছি গিয়ে পার হওয়ার ব্যাপারটা ছেড়ে দিলে ওদের পথ এখন সহজ । পথটা ক্ৰমে নীচের দিকে নামছে , থোকচেনের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পনেরো হাজার সাতশো ফিট উঁচুতে আর ৎসো মাফাম চোদ্দো হাজার ন ' শো ফিট।

এই পথে মনের জোর যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেছে । আসলে আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে । দেহের ক্লান্তি উবে গিয়ে সকলে যেন শরীরে যেন হাতির জোর অনুভব করছে । শরীর এত হালকা লাগছে যে মনে হচ্ছে, ওরা এখান থেকে উড়ে যেতে পারবে।

আধঘণ্টা পথ চলার পরই দু ’ পাশের পাহাড় দুটি জমে ওদের থেকে দুরে সরে যেতে থাকে। সামনের দৃশ্যপট ধীরে ধীরে পাল্টাতে থাকে। এ যেন কোনও বিশাল প্রেক্ষাগৃহ , সামনের পর্দাটা ধীরে ধীরে সরে গিয়ে প্রতিমুহূর্তে সামনের মঞ্চটা প্রসারিত হতে থাকে। মনের কৌতুহল আর উৎকণ্ঠার সংমিশ্রণে তৈরি এক প্রবল আকর্ষণে ওদের চলার গতি বাড়তেই থাকে।

তারপর আসে সেই পরম লগ্ন। একটা ছোটো পাহাড়ের দেওয়াল ডিঙোতেই হঠাৎ ওরা পৌঁছে যায় স্বর্গরাজ্যে। এই দৃশ্য ও শ্রাব্যের অতীন্দ্রীয় অভিঘাতে ওরা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। দু'চোখ ভরে দেখতে থাকে বিশ্ববিধাতার এই অনন্তরূপ। চোখ ও কান সজাগ হয়ে গ্রহণ করতে থাকে সেই অপরূপের আস্বাদন।

ওদের সামনে এক বিরাট সমতলভূমি আর তারই মধ্যে দুটো ঢিপির মতন পাহাড়। সেই সমতলভূমির কেন্দ্রমণি হয়ে রয়েছে দু'টো হ্রদ। সামনেরটিই ৎসো মাফাম বা মানস আর পরেরটি ৎসো লাংগাক বা রাক্ষসতাল। দূরে পাঁচিলের মতন ধু ধু করছে পর্বতশ্রেণি। দক্ষিণের তুষারশুভ্র শৃঙ্গটির নাম গুরলামান্ধাতা আর উত্তরে দু’টো অনুচ্চ পাহাড়ের পেছনে সাদা ত্রিকোনাকৃতি বরফে ঢাকা পর্বতশৃঙ্গ আকাশ ছুঁয়েছে মহান খ্যাং তিসে। ওই খ্যাং তিসের সঙ্গে তার জন্মরহস্য জড়িয়ে থাকায় তার প্রতি গরবের মনে আকর্ষণ আরও বেড়ে যায়। ওরা সবাই ঘোড়া থেকে নেমে বুকভরে শ্বাস নেয়। তারপর প্রত্যেকেই মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে।

গরব বারবার মাথা ঠুকে মনের ভক্তি অর্ঘ্য নিবেদন করতে থাকে। অন্যরাও তাই করে। গরব মনে মনে বলে, হে দয়াময়, এই দস্যুকে তুমি জন্ম দিয়েছ অথবা তুমিই আমার জন্মের কারণ। আমি পণ্ডিত হইনি, জ্ঞানী হইনি, যোগী হইনি — তবুও তোমার কৃপায় তোমার দর্শন পেয়ে এ জীবন ধন্য - আমাকে তোমার পাদপদ্মে স্থান দাও!

প্রণাম ও প্রার্থনা সেরে ওরা আবার ঘোড়ার পিঠে চেপে ৎসো মাফামের দিকে এগিয়ে যায়। সামনেই হাওয়ার দাপটে পতপত করে উড়ছে বিরাট একটা পতাকা আর তার নীচে ছোট্ট একটা চোরতেন। সেখানে পৌঁছে ওরা ঘোড়া থেকে নেমে পায়ে হেঁটে চোরতেনটিকে প্রদক্ষিণ করে প্রথানুযায়ী পাশের কঠিন ভূমি থেকে কয়েকটি পাথর এনে সেই স্তুপে যোগ করে। সামো সাংপোর এই ধার থেকে ৎসো মাফাম স্পষ্ট দেখা যায়। আশপাশের পাহাড়ের বরফ গলে এতগুলি স্রোতধারা ৎসো মাফামে মিশছে বলে এই ঋতুতে ৎসো মাফাম পরিক্রমা বা প্রদক্ষিণ করা অসম্ভব। দোংগল বলেছিল যে চারপাশের নদীগুলো পার হওয়ার জন্য কোন রকম সেতু বা খেয়া নৌকার ব্যবস্থা নেই। শীতের সময় এই নদীগুলি জমে বরফ হয়ে গেলে তিব্বতিরা ৎসো মাফাম প্রদক্ষিণ করেন। গরব মনে মনে ভাবে, কত বছর আগে তার মা-ও লাগস্পাদের সঙ্গে ৎসো মাফাম প্রদক্ষিণ করেছিলেন। মায়ের কাছে অসংখ্যবার সেই বর্ণনা শুনেছে। তার মানে ওরা নিশ্চয়ই শীতের সময় এসেছিলেন।

ওরা আবার ঘোড়ায় চড়ে ৎসো মাফামকে বাঁদিকে রেখে খ্যাং তিসে বরাবর এগিয়ে যায়। ৎসো মাফামের সঙ্গে মাইলখানেক দূরত্ব রেখে পায়ে চলার এই ছোট্ট রাস্তাটা প্রায় সমান্তরালভাবেই এগিয়ে চলেছে। তবে এই পথটা মনে হয় সরোবর থেকে তিন - চারশো ফিট উঁচুতে। ৎসো মাফামের ওপারের দৃশ্যটা স্বপ্নের মতন অলৌকিক, পর্বতশৃঙ্গগুলির শোভা অনুপম। একটু পরেই চোখে পড়ে একপাল চমরি গাই। আরও কাছে যেতেই চোখে পড়ে সারি সারি তাঁবু। পথটা এবার সমতলে নেমে যায়। পথের দু'পাশে সারি সারি যাযাবরদের তাঁবু। কিন্তু তাঁবুগুলিতে কেউ নেই। ওদের দেখে চমরিগুলি মাথা তুলে তাকালেও কোনও শব্দ করে না। বরফ গলার পর এই চারণভূমিতে সবে আত্মপ্রকাশ করা সবুজ তাজা ঘাস খাচ্ছে ওরা। তার মানে ওরাও এখানে সম্প্রতি এসেছে। সূর্যের কিরণটা বেশ উপভোগ্য। ঘোড়ার পিঠে চলতে চলতে গরব দেখে যে, শেষের দুটি তাঁবুর ধারে বসে একদল যাযাবর গল্প করছে। তাদের মধ্যে সবাই কিশোর কিংবা মাঝবয়সি। ওদেরকে দেখেই তারা সবাই উঠে দাঁড়িয়ে জিভ বের করে সম্মান জানায়। গরবরাও একইভাবে ওদেরকে জিভ দেখিয়ে অভিবাদন জানায়। তারপর ঘোড়া থেকে নেমে ওদের কাছ থেকে চার পাত্র চমরি গাইয়ের দুধ কিনে খেয়ে বেশ শক্তি পায় চারজনই। সুন্দর দেখতে ওই যাযাবরদের বেশ ভাল লাগে গরবের। কী মিষ্টি হাসি ওদের! সবচেয়ে সুন্দর ঐ কিশোরদের মুখ। পা লম্বা নাহলে এদের শিশুই বলা যেত। এই দারুণ শীতেও তাদের মুখে এতটুকু কষ্টের রেখা নেই। ওদের কাছে থেমে আরও কথা বলার ইচ্ছে হলেও গরব নিজেকে সংযত রাখে। খ্যাং তিসে ওকে প্রবল আকর্ষণে টানতে থাকায় আবার ঘোড়ায় চড়ে ক্রমে গতি বাড়িয়ে ঘোড়া চালিয়ে যায়। কিন্তু একটু পরই ওরা থামতে বাধ্য হয়, সামনেই আরেকটি নদী। অবশ্য এটাকে নদী না বলে খালও বলা যায়। খুব গভীর নয় কিন্তু পার হওয়া অসুবিধা। কিন্তু মিনিট দশেক ডানদিকে উঠে যাওয়ার পর বড় বড় পাথর সাজিয়ে নির্মিত একটা সাঁকো পাওয়া যায়। ওরা ধীরে ধীরে সেই সাঁকো পেরিয়ে সামান্য বাঁদিকে যায়। তারপর হঠাৎ ওরা গিয়ে পৌঁছায় ৎসো মাফামের তীরে। ওদের ডানদিকেও ছোটো আরেকটি কাকচক্ষু হ্রদ আর বাঁদিকে পবিত্র ৎসো মাফাম। নীল পরিষ্কার ৎসো মাফামের জলে বাতাস খেলা করছে । ছোটো ছোটো ঢেউ উঠে তীরে আছড়ে পড়ছে। ওরা চারজনই ঘোড়া থেকে নেমে ৎসো মাফামের তীরে গিয়ে জল স্পর্শ করে মাথায় ছিটিয়ে নেয়। তারপর ভক্তিভরে ৎসো মাফামের নাম না জানা দেবদেবী ও তথাগত বুদ্ধকে প্রণাম জানায়।

আর তারপর ওরা আবার ঘোড়ায় চড়ে ৎসো মাফামের পাড় ধরে কিছুটা এগোতেই দু'টো রাজহাঁস দেখতে পায়। এই রাজহাঁসের গল্প গরব মায়ের কাছে শুনেছে কিন্তু কখনও চোখে দেখেনি। ৎসোণ্ড, গোরিং কিংবা দেচমা তো দেখা দূরের কথা, এরকম কোনও প্রাণীর কথা কোনওদিন শোনেইনি। দূরে ধবল পর্বতশৃঙ্গের সারি আর এখানে পরিষ্কার নীল জলের বুকে সন্তরণশীল ধবধবে সাদা রাজহাঁস — সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে সত্যি স্বর্গরাজ্য। একটু পরে ওরা দেখে আরও অনেক রাজহাঁস এখানে মনের আনন্দে ভেসে বেড়াচ্ছে। ঠোঁট ডুবিয়ে ছোটো ছোটো মাছ খাচ্ছে। স্বচ্ছ জলে অনেক ছোটো ছোটো মাছ দেখতে পায় ওরা। আরও কিছুটা পথ এগিয়ে গিয়ে ওরা কয়েকজন মাছ সংগ্রহকারীকে দেখতে পায়। বেশভূষা দেখে বোঝে, ওরা আগে দেখা যাযাবর গোষ্ঠীরই মানুষ। এরা কিন্তু জলে নেমে বা বড়শি দিয়ে মাছ মারছে না। যে মাছগুলি কোনও কারণে মরে গিয়ে ঢেউয়ের ধাক্কায় পাড়ে এসে পড়ে শুধু সেগুলিই কুড়িয়ে নিচ্ছে। তীর্থযাত্রীদের দেখে ওরা এগিয়ে এসে জিভ বের করে অভিবাদন জানায়। গরবরাও হেসে ওদের অভিবাদন জানালে ওরা এগিয়ে এসে গরবদের প্রত্যেককে শুকনো মাছ উপহার দেয়।

ওদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় যে গ্রীষ্মকালের তিন - চার মাস এখানে এমন ঢেউয়ে ভেসে আসা মাছ পাওয়া যায়। এগুলি ছাড়াও ওরা ৎসো মাফাম এবং ৎসো লাংগাকের ধারে অসংখ্য নানা রঙের পাথর সংগ্রহ করে কোনও নিকটবর্তী বাজারে বা তীর্থযাত্রীদের কাছে বিক্রি করে। গরবরা ওদের কাছে খ্যাং তিসে পরিক্রমা এবং কোথায় রাত্রিযাপন করলে ভাল হবে এসব বিষয়ে বিস্তারিত জেনে নেয়। ওরা তাদের প্রথম রাতে লাংবোনা গুম্ফায় থাকার পরামর্শ দেয়। তাদেরকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ৎসো মাফামকে বাঁদিকে রেখে উত্তরের দিকে এগিয়ে যায় ওরা। অনেকক্ষণ চলার পর ওরা একটি ছোটো নদী পায়, সেই নদীর উৎসের দিকে কিছুক্ষণ চড়াইয়ের পর লাংবোনা গুম্ফা পাওয়া যাবে। সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে কিছুক্ষণ আগেই। তাই ওরা শশব্যস্ত হয়ে এগিয়ে যায়।

যাযাবরদের সঙ্গে এই সাক্ষাৎকে গরব ঈশ্বরের আশীর্বাদ ভাবে, নাহলে ওরা এত দ্রুত লাংবোনা গুম্ফার নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছতে পারত না। অস্তমিত সূর্যের আলোয় চারপাশের পর্বতমালা, ছোটো পাহাড় দুটি, পবিত্র ৎসো মাফাম এবং আকাশের রং দ্রুত পাল্টাতে থাকে। সবচেয়ে সুন্দর লাগছে ভারত সীমান্তের গুরলা মান্ধাতার পর্বতশিখর। বরফের চুড়ায় সূর্যের শেষ রশ্মি পড়ে তার প্রতিফলনে কখনও সোনালি আবার কখনও রুপালি রঙের ঢেউ বইতে থাকে। আর খ্যাং তিসের বহুবর্ণে রঞ্জিত এক অপার্থিব দৃশ্য দীর্ঘক্ষণ ওদের স্তব্ধ করে রাখে। রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে আসার আগের মুহূর্ত অব্দি ওরা মোহগ্রস্তের মতন কিংবা স্বপ্নবিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখে। তারপরই আবার ঘোড়া চালায়। এই অলৌকিক দর্শন ওদের মনে যতই আনন্দ ছড়িয়ে দিক না কেন লাংবোনা গুম্ফা পৌঁছানোর আগে প্রচণ্ড শীত ও তীব্র বাতাস ওদের কাঁপিয়ে দেয়। একটি সেতু পেরিয়ে লাংবোনা গুম্ফার বিশাল দোতলা বাড়িটায় পৌঁছলেও ওরা অন্ধকারে বাড়িটার প্রবেশ পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। চারপাশে অনেকগুলি দরজা। একে একে সবকটিতে ধাক্কা দেওয়া হলেও, কেউ সেগুলি খুলে দেয় না। কোনও ঘর থেকে এতটুকু সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না, আলোর চিহ্নমাত্র নেই। মনে হয় সবাই আলো নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। ওরা তবুও গুম্ফার একপাশে বাতাসের প্রাবল্য কম দেখে, খচ্চর ও ঘোড়াগুলির বিশ্রামের জায়গা করে ওদের পাগুলিতে চর্বি মাখিয়ে, শরীর পশমের আচ্ছাদনে ঢেকে দিল। তখনই ৎসোণ্ডুর চোখে পড়ে বাইরে থেকে একটা কাঠের সিঁড়ি উপরে উঠে গেছে। সে ও গোরিং তখন সিড়ি ভেঙে দোতলায় উঠে দেখে একটা বিরাট বারান্দা আর সারি সারি ঘর। ওরা একটার পর একটা ঘরে জোরে জোরে করাঘাত করতে থাকে। আর গরব ভাবে ওরা নিষ্ফল হলে গুম্ফার আড়ালে তাবু খাটিয়ে শোয়ার কথা। কিন্তু এই অন্ধকারে তাবু খাটাতে খুবই কষ্ট হবে। দেচমাও দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে। গরব ওকে ঘোড়ার কান ঘষে দেওয়ার ইঙ্গিত করে। তারপর ওরা দু'জনেই নিজেদের ঘোড়া দু’টির কান ও মাথায় হাতের তালু দিয়ে ঘষে দিতে থাকে। কিছুক্ষণ আগে পথে চলতে চলতেই গোরিং এবং ৎসোণ্ডুকে ওরা তাদের ঘোড়ার কান ও মাথা রগড়ে গরম করতে দেখেছে। অবশেষে একটা ঘরের ভেতর থেকে সাড়া পেয়ে দেচমা এবং গরবও দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে পড়ে। দরজা খুলে ওদের সামনে বেরিয়ে আসেন এক নাঙ্গা সাধু। এই ঠাণ্ডায় খালি গায়ে শুধু একটি কৌপিন পরনে। এই সাধুকে লাংবোনা গুম্ফায় আশা করেনি ওরা। তাকে দেখে ওরা সবাই অবাক, বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। সন্ন্যাসী ওদেরকে আস্তাবলে ঘোড়া ঢুকিয়ে ঘরে আস্তে বলেন। আস্তাবলে যথেষ্ট খড় দেখে গরব নিশ্চিন্ত হয়। তবু ঘোড়াগুলির গা কম্বলে ঢেকে দিয়ে ওরা উপরের ঘরে যায়।

সেই ঘরের ভেতর একটা বিশাল কড়াইয়ে হোমাগ্নির মতন আগুন জ্বলছে। সেই আভায় ওরা সেই দিব্যপুরুষ নাগা সন্ন্যাসীর দেহ থেকে জ্যোতি ঠিকরে পড়তে দেখে। গরব অবাক হয়ে অনুভব করে, ইনি তো ত্রাদুমের গুম্ফায় মাঝরাতে দেখা সেই সন্ন্যাসী! ওরা সবাই তাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে। তারপর তার পাশে গোল হয়ে আগুনের কড়াইয়ের চারপাশে বসে। সন্ন্যাসীর লম্বা দাড়ি তার নাভি ছুঁয়েছে। ভারতীয় চেহারা। মাথায় বিরাট জটা । কিন্তু তিনি স্পষ্ট তিব্বতি উচ্চারণে বলেন, তোমরা ক্লান্ত, তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।

বলেই তিনি পদ্মাসনে ধ্যানে বসে পড়েন । ওরা কড়াইয়ের আগুনে সাম্পা ও চা বানিয়ে খায় । সাধুকে চা ও ৎসাম্পা খাওয়ার অনুরোধ জানালে তিনি ঘাড় এদিক - ওদিক করে অসম্মতি জানিয়ে আবার ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়েন। চোখ খোলেন না। গরব মনে মনে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়। আরেকবার তিনি ও তাঁর বড় কড়াইয়ের কাঠকয়লার আগুনের উত্তাপ ওদের জীবন বাঁচাল। মনে মনে তাঁক প্রণাম জানিয়ে গরব নিজের খাওয়া সারে। সঙ্গীরাও চুপচাপ খেয়ে নেয়। প্রত্যেকেরই ভীষণ খিদে পেয়েছিল আর ক্লান্তিতে শরীর অবশ হয়ে আসছিল। ওরা খাওয়ার পরই যে যার মতন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাইরে বেরিয়ে যায়। ফিরে এসে ঘরের দু ' দিকে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে। অন্যরা কম্বলের নীচে মুখ ঢাকলেও গরব ঢাকে না। সে অপলক তাকিয়ে থাকে ধ্যানমগ্ন সন্ন্যাসীর দিকে। ওরা যখন কম্বলের উপর কম্বল চাপিয়ে শীতে কাঁপছে, ওই খালি গায়ে ভস্মমাখা সন্ন্যাসী একসময় চোখ খুলে ওদের দিকে প্রশান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীরে ধীরে একটি কম্বলের উপর খালি গায়েই শুয়ে পড়ে। কড়াইয়ের আগুনে ঘরের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে। ঠান্ডা কম লাগছে। উষ্ণ আবহে দু’চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে। ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ একটা খটকা লাগে গরবের মনে। আচ্ছা, এই ভারতীয় সন্ন্যাসী বারবার ওদেরকে রক্ষা করছেন কেন? এ কি নিছকই কাকতালীয়? নাকি গরবের মনে খ্যাং তিসের প্রতি প্রবল আকর্ষণের সঙ্গে এই ভস্মমাখা নাগা স্যাসীর কোনও সম্পর্ক রয়েছে? পালকপিতা লাগস্পা ও মায়ের কাছে গরব তার পিতা সম্পর্কে যা শুনেছে সেই বিভূতির সারা শরীরেও ভস্ম মাখা ছিল। মা তাকে দেবাদিদেব মহাদেব ভেবেছেন আর লাগস্পার ধারণা লোকটা কোনও ভণ্ড নাগা সন্ন্যাসী। তবে মায়ের বর্ণনার সেই পুরুষের গালে কোনও দাড়ি ছিল না। গরবের মনে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। সাক্ষাৎ মহাদেব নিশ্চয়ই খ্যাং তিসে ছেড়ে ওদের মতন পাপী ডাকাতদের সঙ্গে এসে ঘুমাবেন না! মুনি ঋষিরা সারাজীবন কৃচ্ছসাধন ও তপস্যা করেও যাকে পান না তার মায়ের মতন সহজ - সরল মহিলার শরীরেই বা তিনি উপগত হবেন কেন? গরব-দেচমা- ৎসোণ্ডু - গোরিং-ই বা তাকে কেমন করে দেখতে পাবে?

গরব না ঘুমিয়ে দু - চোখ ভরে সেই নাগা সন্ন্যাসীকে দেখতে থাকে। এবার সে আর তাকে চোখের আড়াল করবে না! দুপুর থেকে শুরু করে বিকেল পর্যন্ত নানাভাবে দেখা নানা বর্ণের খ্যাং তিসের দৃশ্যগুলি মনে পড়ে তার, সেই খ্যাং তিসেই তো হিন্দু পরমেশ্বরের উপযুক্ত স্থান যেখানে তিনি পার্বতীর সঙ্গে বসে তার সৃষ্টি লীলায় ব্যস্ত । তবে তিনি কেন এখানে এলেন ? তবে কি তার নিজের সৃষ্টিকে বাঁচাতেই বারবার আসছেন আর তারপরই ভোজবাজির মতন মিলিয়ে যাচ্ছেন। মা বলেছিলেন, সকল পর্বতচূড়া ও খ্যাং তিসের জমাট বরফের পাথরকে তিনি সৃষ্টি করেন ব্রহ্মা রূপে, নদী রূপে তিনিই বিষ্ণু ,পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী ও উদ্ভিদকে লালনের জন্য প্রবাহিত হতে থাকেন আর রুদ্ররূপে ধ্বংসের মালিকও তিনি। সে কল্পনাই করতে পারছে না যে সশরীরে তিনি সঙ্গীকে নিয়ে কৈলাসের পাদপদ্মে শুয়ে আছেন। এ কি স্বপ্ন . . . এ কি সত্যি . . . মন বারবার সংশয়ে ভরে উঠছে কেন?

কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে জানে না। ভোরবেলা ঘুম ভাঙে দেচমার ধাক্কায়। তাঁকে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে নিয়ে যেতে হবে। ৎসোণ্ডু এবং গোরিং তখনও ঘুমাচ্ছে। এটাই ওদের হাল্কা হওয়ার উপযুক্ত সময়। চোখ খুলতেই সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে রাতের কথা, উঠে বসে তাকিয়ে দেখে সন্ন্যাসী উধাও। কড়াইটাও নেই। আফসোসে মনের ভেতরটা হু হু করে ওঠে, আবার হারাল তাকে। থোং রাং বা প্রথম ভোরের আলোয় ওরা দেখে লাংবোনা গুম্ফাটা বিরাট নয়। এটাকে মাঝারি ধরনের একটা ধর্মশালা বললেও ঠিক হবে। সারি সারি আট - দশটা শৌচালয় রয়েছে। ওরা বুঝতে পারে, ওরা চারজন ছাড়া আপাতত এই গুম্ফায় আর একটি প্রাণীও নেই। ওই গুম্ফার পাশ দিয়ে খ্যাং তিসের বরফগলা জল নিয়ে সরু গীউমা নদীটি ৎসো মাফামে গিয়ে পড়েছে। দোগংলের বর্ণনার কথা মনে পড়ে। হাল্কা হয়ে গরব ও দেচমা সেই নদী থেকে চা ও ৎসাম্পা বানানোর জন্য জল আনতে যায়। দেচমা ওকে জিজ্ঞেস করে, কাল রাতের সেই দাড়িওয়ালা লামা কোথায় চলে গেলেন ? গরব অন্যমনস্কভাবে ঠোট ভেল্টায়।

দেচমা আবার বলে, কাল তিনি ওই আগুনের কড়াই এগিয়ে না দিলে আমরা মরেই যেতাম। দুপুর থেকেই আমার নাক জ্বালা করছিল। আচ্ছা, এই ঠাণ্ডায় ওই লামা মহাপুরুষ খালি গায়ে থাকেন কেমন করে? দেচমার পেছন পেছন গুম্ফার কাঠের সিঁড়ি চড়তে চড়তে গরব বলে, মহাপুরুষরা সব পারেন । ওরা ঘরে ঢুকে দেখে গোরিং আর ৎসোণ্ডু জেগে ঘরের কোণে রাখা একটা ছোটো কড়াইয়ের কাঠকয়লা ফুঁ দিয়ে দিয়ে জ্বালাচ্ছে। দেচমা সেই আগুনে জল গরম করে চা ও ৎসাম্পা বানায়। ততক্ষণে গোরিং ও ৎসোণ্ডু প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে ফিরে এলে ওরা সবাই চা ও ৎসাম্পা খেয়ে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ে।

দোংগলের কাছে শোনা নির্দেশ অনুযায়ীই এগোতে থাকে ওরা। থোকচেনকে অনেকে বলে তাসাম। তাসামে প্রশাসনের রক্ষীরা থাকে। ওই সরকারি দপ্তরের আশপাশে হাট বসে। খ্যাং তিসে এবং ৎসো মাফামের তীর্থযাত্রীদের বাজার - হাট করতে তাসাম যেতে হয়। ৎসো মাফামের পূর্বদিকে যেমন রয়েছে থোকচেন তাসাম, তেমনি উত্তরে রয়েছে তারচেন তাসাম। অনেক বছর আগে গরবের মা ও দুই পুরুষ ভৃত্যকে নিয়ে লাগস্পা এই পথেই সপরিবারে খ্যাং তিসে এসেছিলেন। ওরাও ফেরার পথে ওই পথেই ফিরবে। ৎসো মাফামের দক্ষিণদিকে যে তীর্থযাত্রীরা ভারত থেকে আসেন তারা তাকলাকোট থেকে বাজার - হাট করেন।

বৌদ্ধ ও হিন্দুদের পরম পবিত্র তীর্থক্ষেত্র এই খ্যাং তিসে ও ৎসো মাফাম। যদিও এখানে কোনও হিন্দু মন্দির নেই। প্রাচীন কোনও মন্দিরের চিহ্নও এখানে নেই। বৌদ্ধ তান্ত্রিক, হিন্দু সাধু এবং ভারত, নেপাল ও তিব্বতের তীর্থযাত্রীরা এখানে আসেন দর্শন, স্পর্শ ও স্নানের জন্য। ৎসো মাফাম এবং ৎসো লাংগাক বিরাট সমতলের সৃষ্টি করলেও এই দুই হ্রদের চারপাশে সামান্য দূরে বেশ কিছু অনুচ্চ পাহাড় রয়েছে। সে সব পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য গুহা, অনেক সাধু - মহাপুরুষরা তপস্যা করার জন্য এখানে আসেন। এছাড়া লাংবোন গুম্ফার মতন মাঝারি বা ছোটো আকারের কিছু গুম্ফা রয়েছে। গ্রীষ্মে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে ভারত ও নেপাল থেকে কিছু পান্ডা ও পুরোহিত এসে ওই গুম্ফাগুলিতে থাকেন। হিন্দু তীর্থযাত্রীদের পিতৃতর্পণ, শ্রাদ্ধ ও প্রায়শ্চিত্ত তারাই করান। আবার শীত পড়ে গেলে শেষ তীর্থযাত্রী দলের সঙ্গেই ওরা ফিরে যান। তিব্বতি তীর্থযাত্রীরা অবশ্য শীতকালেও আসেন। তখন তারা ওই গুম্ফাগুলিতে থাকেন। লাগস্পা সপরিবারে গরবের মা ও অন্য দুই ভৃত্যকে নিয়ে ওই গুম্ফাগুলিতে না উঠে পাহাড়ের গুহায় কেন থাকতেন কে জানে! ওরা গুম্ফা থেকে বেরিয়ে ৎসো মাফামকে বাঁয়ে রেখে এগোতে থাকে। গরবের গৃহশিক্ষক বলেছিলেন, এই ৎসো মাফামের মাঝে অদৃশ্যে বসে আছেন ভগবান বুদ্ধ। তাকে ছায়া দিচ্ছে অদৃশ্য অনভতত্ত্ব বৃক্ষ। সেই বৃক্ষের ফল ও পাতায় রয়েছে অমৃত। এই অমৃত খেলে নির্বাণ লাভ করা যায়। জরা, ব্যাধি ও মৃত্যু থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। শীতের দিনে দণ্ডিপ্রণাম করে কেউ কেউ যদি ৎসো মাফাম পরিক্রমা করেন তাহলেও নির্বাণসম পুণ্য লাভ হয়। এই পরিক্রমায় পূণ্যার্থীদের লাগে ২৫ - ২৬ দিন। কিন্তু অনেকেরই এই পরিক্রমা সম্পূর্ণ করার আগেই পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটে।

খ্যাং তিসের আজ অন্য রূপ, আধো আলো আধো ছায়ায় তার রহস্যময় রূপ ওদেরকে চুম্বকের মতন টানতে থাকে। কিছুক্ষণ চলার পর ওরা একটা চৌমাথায় পৌঁছায় — দুটো পায়ে চলা পথের সংগমস্থল।সেখান থেকেই ৎসো মাফাম ছেড়ে সরাসরি উত্তরের পথে এগিয়ে যায় ওরা। রাস্তাটা উপরের দিকে উঠতে শুরু করেছে। থোকচেনের দিক থেকে একটি নাম না জানা পাহাড়ের পেছনে শুরু হয়েছে সূর্যদেবের আগমন প্রস্তুতি। গোটা আকাশ নানা রঙে সেজে উঠেছে। তারই ছটা এসে পড়েছে খ্যাং তিসের চূড়ায়। দেমচোগ দেবের মাথার চূড়াতে সোনালি রং ছোঁয়াচ্ছে কোনও অদৃশ্য শিল্পী। এই ৎসো শার দেমচোগকে জাগিয়ে দিলে তিনি সূর্যকে জড়িয়ে ধরবেন। এ এক অদ্ভুত পরিবেশ, অভাবনীয় আলোর খেলায় ওদের মন যেন বার বার নেচে উঠছে। রাজহাঁসেরা গ্রীবা উঁচিয়ে আকাশের দিকে স্থির তাকিয়ে। প্রতিটি প্রাণী আর আকাশ বাতাস - জল সবাই এক শুভ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছে।

তারপর এল সেই পরম লগ্ন —ৎ - সে – শার! জগৎ পিতা সুর্যদেব উদয় হলেন, চারপাশের তুষারশুভ্র পর্বতশিখরগুলিতে অদৃশ্য অপ্সরিরা শুরু করে দিলেন এক অসাধারণ নৃত্য। সেই অনুপম রূপ, নিঃশব্দের ছন্দ, সেই অলীক জ্যোতির অনুপম ছটা ওদের প্রতিটি রোমকূপ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে শিহরন জাগায়। তারপর চলে রঙের খেলা। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত। এমনকী সূর্যাস্তের পরও এই রঙের খেলা চলতে থাকে। সূর্য যখন মাথার উপর সেই নীইং কুং লগ্নে ওরা তারচেন পৌঁছায়। আজ ওরা এখানেই বিশ্রাম নেবে।

তারচেন থেকেই খ্যাং তিসে প্রদক্ষিণ শুরু করতে হয়। পায়ে হাঁটা পথ। খচ্চর ও ঘোড়াগুলিকে এখানেই রেখে যেতে হবে। এখান থেকে পরিক্রমা শুরু করে সবাই আবার এখানেই আসে। ত্রিশ - বত্রিশ মাইলের পরিক্রমা একদিনেই পুরো করা যায়। বত্রিশ মাইল মানে প্রায় ৫২ কিমি। পরিক্রমার সময় বিশ্রামের জন্য এবং ধ্যান ও পূজার্চনার জন্য খ্যাং তিসের চারদিকে পাঁচটি গুম্ফা রয়েছে। দিরাফুক গুম্ফা সেগুলির মধ্যে সব থেকে বড়। তারচেনে একটি মাত্র বাড়ি ছাড়া যাযাবরদের কয়েকটি তাঁবু রয়েছে। ওদের দেখে ছ - সাতজন যুবক ও মাঝবয়সি মানুষ এগিয়ে আসেন। তারা জমে থাকা দুধ, মাখন আর পথ চলার প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস বিক্রি করেন। তাছাড়া তারা পরিক্রমার জন্য ভাড়া খাটেন অথবা সামান্য পয়সার বিনিময়ে পরিক্রমায় পথপ্রদর্শকের কাজ করেন।

ওদের কেনার কিছুই ছিল না, পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন নেই। পরদিন সারাদিন ওদের ঘোড়াগুলিকে দেখাশোনা করার জন্য দুই যুবককে নিয়োগ করে ওরা। সেই দু’জনকে নিয়েই ৎসোণ্ড আর গোরিং পাহাড়ের গায়ে একটু উঁচু ঢিবির উপর সমতল জায়গায় তাদের দু'জনের জন্য একটা আর গরব ও দেচমার জন্য আরেকটা তাঁবু খাটায়। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। দিনের প্রতিটি কালখণ্ড আলাদাভাবে উপভোগ করে ওরা, বহুবর্ণে আকাশ রাঙিয়ে সূর্যদেবকে অস্ত যেতে দেখে হাতজোড় করে প্রণাম করে।

সন্ধেয় তাঁবুতে বসে গরম গরম চা ও ৎসাম্পা খেতে খেতে দেচমা বলে, মনে হচ্ছে না যে এতক্ষণ আমরা স্বর্গের উৎসবে ছিলাম! অথচ এখন নিঝুম রাত্রি!

গরব মাথা নেড়ে সায় দেয়। ওর চোখ দুটি আনন্দে চকচক করে ওঠে।

ওরা দু'জন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতে একসময় স্বর্গীয় আনন্দে ঘুমিয়ে পড়ে। তারপর থেকে গত আটদিন ধরে গরব, দেচমা আর তাদের দুই সঙ্গী পবিত্র পর্বতের পাদদেশে তাঁবু খাটিয়ে রয়েছে। এত দীর্ঘ যাত্রার পর প্রত্যেকের গায়ে এত ব্যথা হয়েছে যে এই বিশ্রাম ছিল অবধারিত। সাধারণত তীর্থযাত্রীরা এসেই ভগবান দেমচোগ বা দোমচেক এবং ভগবতী দোরজে ফাগমের বাসস্থান গ্যাং তিসে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করেন। গরব এ ব্যাপারে কোনও তাড়াহুড়ো করেনি।

গৃহশিক্ষক বলেছিলেন, যাঁরা হিন্দু ধর্মের গুপ্ত অতীন্দ্রিয়বাদে বিশ্বাস করেন তাদের মতে মহাদেব এই অনতিক্রম তুষারাবৃত পর্বতশৃঙ্গে বসে একা ধ্যান করেন। তাঁর ইচ্ছাতেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি নক্ষত্রমণ্ডল, সৌরমণ্ডল থেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা পর্যন্ত সব কিছুর গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রিত হয়। তান্ত্রিকদের মতে হরপার্বতী, পুরুষ ও প্রকৃতির লিঙ্গাবস্থা — গোটা সৃষ্টির আদি কারণ।

তিব্বতিদের দেবতা দেমচোগ ও দেবী দোরজে ফাগমের মুল মন্ত্র যুবযুং। যুগলমিলনের এই রহস্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কুলকুণ্ডলিনীর মূল স্রোত শিবপার্বতী, হরগৌরীরূপী কল্পনাকে তান্ত্রিকরা মানসপটে স্থাপন করে। লিঙ্গাবস্থার পরম কারণের উপর ধ্যান করে সিদ্ধিলাভ করেন। এই সিদ্ধিলাভই মূলাধার চক্রের সঙ্গে সহস্রার মিলন। চার পাপড়ির মূল আধার সং-বং –শং-যং মিলিত হয় লং মন্ত্রে, তারপর আপন তেজে সেই প্রকৃতি শক্তি উঠে যায় শিবশক্তির দিকে। একের পর এক চক্র পার হয়ে সপ্তম চক্রে সে পরিণত হয় ভূমালোকে। এক মিশে যায় অমৃত সমুদ্রে।

গৃহশিক্ষক ধীরে ধীরে বলেছিলেন, যাঁরা এই প্রতীকীশাস্ত্রের গভীরে বিচরণ করেন নিজেদের চেতনার আলোয় তাঁরা অনন্ত সৃষ্টি, ধ্বংস ও পুনর্বার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গড়ে ওঠাকে প্রত্যক্ষ করেন। ঈশ্বর, দৈত্য - দানব, মানুষ, সমগ্র জীবজগৎ ও বস্তু বিশ্বের অগণিত সৃষ্টিকে ওরা এই সৃষ্টি - স্থিতি - প্রলয়ের বিশাল চক্রের অঙ্গ হিসেবে দেখেন!। তারা একাগ্রচিত্তে জপ করেন অলৌকিক বেদান্ততত্ত্ব – ‘শিবা অহম!' — আমিই শিব, আমিই দেবাদিদেব মহাদেব!

কিন্তু গরব ভারতের এই অন্তর্নিহিত নিগূঢ় জ্ঞান সম্পর্কে এসব কথার মানে তেমন বোঝে নি! তিব্বতের বৌদ্ধ তান্ত্ৰিক জ্ঞানও তার নেই। তার মায়ের মতনই সে ভাবে খ্যাং তিসে যাযাবর মানুষজন আর ভূত - প্রেত - জিন - পরি দৈত্যদানবের স্থায়ী আবাস। এরা সবাই বাঘের ছাল এবং নরকঙ্কালের মালা পরিহিত ভয়ানক দেবতা দেমচোগের চেলা - চামুণ্ডা।

এখানে এসে গরব কেন এত অলস হয়ে পড়েছে, কেন বিলম্ব করছে তা সে নিজেই জানে না। সে যেন অদৃশ্য কিছুর টানেই বাঁধা পড়ে গেছে। সারাদিন পাহাড়ের এক গুহা থেকে অন্য গুহায় উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি আর যেন কীসের খোঁজে সবকিছু খতিয়ে দেখা। সে যেন কিছু আবিষ্কারের অপেক্ষায়। এই আবিষ্কারের পথে সে একা, অন্য সঙ্গীদের শামিল করে কোনও বিপদের ঝুঁকি নিতে চায় না সে। গুহা গুলিতে গিয়ে কিংবা আশপাশে যত গায়ে ছাইভস্ম মাখা নাগা সন্ন্যাসীকে দেখতে পেয়েছে, প্রত্যেকের মুখের দিকে ভালভাবে তাকিয়ে সে বয়স বোঝার চেষ্টা করে। তাদের সঙ্গে নিজের চেহারার মিল খোঁজে।

সে কি তার বাবাকে খুঁজছে? কে তার বাবা, এই প্রশ্ন নিয়ে লাগস্পার সঙ্গে সেই কথোপকথনের পর থেকে আর কোনওদিন সে ভাবেনি। লাহসাতেই সেদিন হঠাৎ তার জন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত খ্যাং তিসের প্রতি একটা অজানা আকর্ষণ তার মনে প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু তার মনে কখনওই সেই অচেনা মানুষটির প্রতি আকর্ষণ জন্মায়নি যে চুপিচুপি রাতের আঁধারে এক অবিবাহিত যুবতী দাসীর সারল্যের সুযোগ নিয়েছিল। কিন্তু খ্যাং তিসের পাদদেশে এই তারচেনে আসার পর থেকে নিজের অজান্তেই কখন যেন সে তার পিতাকেও খুঁজতে শুরু করে দিয়েছে।

তারচেন ৎসো মাফাম থেকে প্রায় দু' শো ফুট উপরে। এখান থেকে ৎসো মাফাম এবং ৎসো লাংগাক অতি পরিষ্কার দেখা যায়। ৎসো মাফাম গোলাকার আর ৎসো লাংগাক প্রায় ভগ্ন ত্রিভূজাকৃতির। এখান থেকে গুরলা মান্ধাতার পর্বতশৃঙ্গও ভালভাবে দেখা যায়। তারচেন থেকে একটা রাস্তা সরাসরি উত্তর দিকে উঠে গেছে, ওই পথে গরবদের ফিরতে হবে। আর একটা রাস্তা প্রথমে উত্তর - পশ্চিমের দিকে গিয়ে তারপর উত্তর দিকে গেছে। ওই পথ ধরেই ওদেরকে পায়ে হেঁটে পরিক্রমায় যেতে হবে।

একটা অদ্ভুত অনুভূতি গরবকে এক অজানা লক্ষ্যের দিকে টানছে যার প্রকৃতি সে চেনে না। এই অস্পষ্ট মেঘকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলার অনেক চেষ্টা করেও বিফল হয়েছে সে। যতদিন যাচ্ছে ওই অনুভূতি ততই প্রবল হয়ে উঠছে। দেচমার প্রতি আশ্লেষকে ছাপিয়ে ওই আকর্ষণ তাকে প্রায় উন্মাদ করে তুলছে। দেচমাও হয়তো এটা অনুভব করে বলতে শুরু করেছে, এখান থেকে চলো, এখানকার বাতাস অস্বাস্থ্যকর, আমার ভাল ঘুম হয় না, জেগে উঠে ভীষণ ক্লান্ত লাগে।

যাযাবরদের সঙ্গে কথা বলে ৎসোণ্ডু ও গোরিং জেনেছে এই খ্যাং তিসে পরিক্রমার তিনটি পথ রয়েছে। দীর্ঘতম হলেও সব চাইতে নীচের পথটি দিয়ে পরিক্রমা করা খুব সহজ। এর থেকে উপরের পথটির দৈর্ঘ্য অনেকটা কম। কিন্তু যাত্রাপথ বেশ প্রতিকূল ও বিপজ্জনক। উচ্চতম পথটির দৈর্ঘ্য আরও কম, কিন্তু এতই দুর্গম যে যাযাবররা কেউ কখনও সেই পথে যায়নি। প্রশিক্ষিত পর্বতারোহী দু’জনকেই শুধু ওরা ওই পথে পরিক্রমা করতে দেখেছে। অথচ কথিত আছে, পুণ্যার্জনের ক্ষেত্রে যে যত উঁচু পথ অবলম্বন করবে তত বেশি সাফল্য পাবে। কিন্তু সাধারণ পর্যটকদের মতন ওরা সেই নিম্নতম পথে পরিক্রমা সেরে যতটা পুণ্য পাওয়া যাবে তাতেই খুশি থাকতে চায়। এই ন্যূনতমের বেশি পুণ্যার্জনের আকাঙক্ষা নেই দেচমারও।


ক্রমশ ...।