শুক্রবার, নভেম্বর ২২, ২০১৯

মহাসত্যের বিপরীতে,পর্ব ২৩

#তেইশ

‘...সীমান্তরেখা জুড়ে

অবোধ বাক্য ওড়ে

আর কোনো দিন নয়

অনন্ত প্রলাপ

প্রেম ছিলো

গভীর প্রলেপে দাগ ছিলো

ছিলো নিষ্পলক চোখের ভাষা

অস্ফুট উচ্চারণ

বলেছিলো – এসো’ – ( এসো – জলছবি নাভিপদ্মে – প্রাণজি বসাক)


একবিংশ অধ্যায় পড়ে পাঠক সোমেন চক্রবর্তী ফেসবুকে লিখেছেন,' শরতচন্দ্র দাস কি এক কুলবধূর ভালোবাসায় আচ্ছন্ন হচ্ছেন। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় আছি!'

অপেক্ষায় আছে অলকও। সেই রাতে রিনপোচের উঠোনে সেই জ্যোৎস্নায় শুয়ে থাকা অতিকায় কালো ম্যাস্টিফের বন্ধ চোখের পাতায় ফোটে অদ্ভূত সব রং, শরতের বিশ্রামগৃহে রিনপোচের সঙ্গে ঢুকে পড়া মথের ডানা থেকে ঝরে রঙের রেণু, রিনপোচের হাতির দাঁতের মতন মসৃণ হলুদ ত্বকেও ফুটে ওঠে ঘামের মুক্তোছড়া, না জানি কোথা থেকে একটা রাতচড়া পাখি থেকে থেকে ডেকে ওঠে । সেই পাখির ডাকে ম্যাস্টিফের রোমে খেলা করতে থাকে নীল বিদ্যুৎরেখা। সে ঘুমের মধ্যেই পাথরে নখ আঁচড়ায়, বুকে ধুকপুকানির শব্দ শোনা যায়, বাড়তেই থাকে। এই ধুকপুকানি তিব্বতের শৈত্যে এক সিকিম-রাজকন্যা আর এক ইঙ্গ-বঙ্গ গুপ্তচরের মধ্যে কতটা নৈকট্য এনে দিয়েছিল, তা জানার আগ্রহ অলকেরও রয়েছে। সে শরতের নানা লেখায় তা আঁতিপাঁতি করে খুঁজছে। আর খুঁজতে খুঁজতে পেয়েছে আরেক মহিয়সী অপরূপা লাচামকে।

তিব্বতি ভাষায় লাচাম মানে রাজকুমারী। শরতের পরিচিত লাচাম ছিল লাহসার এক ধনী প্রভাবশালী রাজপুরুষের স্ত্রী। রিনপোচের মাধ্যমেই তাঁর সঙ্গে পরিচয়। সেই প্রথম দেখার স্মৃতি শরত কোনদিন ভুলতে পারেনি। লাচামের বয়স বছর তিরিশেক, পরনে মোঙ্গল গাউন। মাথায় নানান আকারের মুক্তো আর মুকুটের মতন রত্নখচিত পাতুগ । পরনে অত্যন্ত দামী চিনা সাটিনের ওপর অপূর্ব জরির কাজ, বুকের ওপর মুক্তো প্রবাল আর তৈলস্ফটিকের কয়েকটি হারছড়া। তাশিলুম্ফোয় এসে ঠাণ্ডা লেগে স্বাসনালির সংক্রমণে ভুগছিল লাচাম, স্থানীয় বৈদ্যদের জড়িবুটিতে কাজ হচ্ছিল না। রিনপোচের অনুরোধে শরতের দেওয়া ওষুধে কাজ হয়। তিব্বতযাত্রার সময় শরত নিজের জন্যে কিছু বায়োকেমিক ওষুধ সঙ্গে নিয়েছিল। যাত্রাপথে, এবং শিগৎসেতে থাকাকালীন, কয়েকজন রোগীকে সেই ওষুধ প্রয়োগ করে সারিয়ে তোলার সুযোগ হয়। এর ফলে অভিজাত মহলে সর্বজ্ঞ পণ্ডিত হিসেবে তাঁর নাম হয়। লাচামের চিকিৎসা করে অতিরিক্ত লাভ হয় তাঁর দলের সঙ্গে লাহসা যাত্রা এবং সেখানে তাঁদের প্রাসাদোপম গৃহে আতিথ্যলাভ।

তাশিলুম্ফোয় পৌঁছনোর পর থেকেই শরতের মনে লাহসায় যাবার ইচ্ছে ক্রমে প্রবল হতে থাকে। কিন্তু শিগাৎসে থেকে লাহসা দীর্ঘ কঠিন পথ, তার উপর ডাকাতের ভয়। উগেনও সঙ্গে নেই। তবু সে মনে মনে উপায় খুঁজতে থাকে।

লাচামের সঙ্গে পরিচয়ের পর একটা অভাবনীয় সুযোগ আসে। সে তাকে সফরসঙ্গী হওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। কয়েকদিন পরই লাচাম দুই ছেলেকে নিয়ে লাহসায় ফিরবে। শরত ভাবে, ওই দলে সফরসঙ্গী হলে অচেনা পথে নিরাপত্তা তো আছেই, এছাড়া লাহসায় গিয়ে আশ্রয়ও পাবে। দ্রুত যাত্রার প্রস্তুতি শুরু করে দেয় শরৎ। খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বস্তু যেমন আগুন জ্বালানোর চকমকি পাথর ও হাপর চা তৈরির বাঁশের পাত্র ইত্যাদি। লাচামের পরামর্শে বিশেষভাবে বানানো হয় শীতের পোশাক। তার মধ্যে রয়েছে অনেকগুলো শিশু ভেরার চামড়া দিয়ে তৈরি একটি কোট। তখন মে মাস, তিব্বতের অনেক উপত্যকায় বসন্ত এসেছে। কিন্তু পথে তুষারপাতের সম্ভাবনাও রয়েছে।

লাহসার পথে রওয়ানা হওয়ার আগে শরৎ যায় আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান অনুরাগী লামা সেংচেনের কাছে বিদায়ী আশীর্বাদ নিতে। সেংচেন তখন অভ্যর্থনাকক্ষের লাগোয়া একটি প্রশস্ত আসবাবহীন ঘরের মাঝখানে একটি খাম্বা জাজিমের ওপর বসে। তাঁর সামনে একটি নীচু চিত্রিত ডেস্কে রাখা ছিল একটি ড্যাগেরিওটাইপ ক্যামেরার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। ঘরের তিনদিকে দেওয়াল - আলমারিতে অসংখ্য পুঁথির বান্ডিল, একদিকে ঘেরা বারান্দায় খাঁচায় টিয়াপাখি আর একটি টবে কাশ্মিরী কেশরের চারা। মঠের সোনালি চুড়োয় প্রতিফলিত সকালের আলো এসে পড়েছে লামার হলুদ রেশমি গাউনে। তাঁকে প্রণাম করে একটি খুব সুন্দর খাদা উপহার দেয় শরৎ।

দুটো হাত মাথায় সস্নেহে ছুঁইয়ে লামা সেংচেন বলেন, শরৎচন্দ্র, লাহসা যাত্রার জন্য প্রকৃষ্ট সময় নয় এটা। মধ্য তিব্বত জুড়ে গুটি বসন্তের প্রকোপ চলছে। তাছাড়া ভিনদেশির জন্যে লাহসা মোটেই উপযুক্ত শহর নয়। নাগরিক মন কুটিল ও সন্দেহপ্রবণ, শিগাংসের মতন নয়। সবসময় সতর্ক থাকবে, কোনও একটি জায়গায় একটানা বেশিদিন থাকবে না। লাচাম অত্যন্ত প্রতিপত্তিশালী, সে তোমাকে রক্ষা করবে। কঠিন বাধার মুখে পড়লেও তুমি সেই বাধা অতিক্রম করতে পারবে!

মাথা নেড়ে শরত মনে মনে সেংচেনকে ধন্যবাদ জানিয়ে পথে নামে। ১৮৮২ সালের ১১ মে। লাহসার সড়ক কাঁচা ও বন্ধুর। কোথাও বিশ ফুট চওড়া, আবার কোথাও পথের রেখা মাত্র, কোথাওমাঠের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে শুকনো সেচের খালই হয়ে উঠেছে পথ। এ দেশে চাকা লাগানো গাড়ির চল নেই , মানুষ পায়ে হেঁটে, কিংবা ঘোড়া বা খচ্চরের পিঠে চেপে দূরদূরান্তে যায়।

ফেব্রুয়ারির শেষে শুরু হয়েছে তিব্বতি নতুন বছর লোসার। তারপরেই শীতের প্রবল দাপট কমে এসেছে। ক্রমে পপলার আর উইলো গাছে নতুন পাতার কুঁড়ি ফুটছে, জলাশয়গুলির ধার ঘেঁষে বুনো দোপাটির ঝোপে ঝোপে অসংখ্য হলুদ ফুল ফুটেছে, মাঠে মাঠে ভেড়ার পাল নব-অঙ্কুরিত কচি কচি ঘাস খুঁটে যাচ্ছে। এই সময়েই চাষিরা হালচাষ শুরু করে। বিস্তীর্ণ উপত্যকাভূমি ক্রমে শাকসবজি ও ফসলে সবুজ হয়ে উঠছে। চাষিরা হালটানা চমরগুলোকে সাজিয়েছে রঙিন পশম আর কড়ির সাজে, গ্রামে গ্রামে চমর দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন হচ্ছে। নীল আকাশ মেঘহীন, আয়নার মতন স্বচ্ছ জলাশয়গুলিতে হাঁসেরা সাঁতার কাটছে। এই অনাবিল জীবনের মাঝে বসন্তে মড়কের খবর কষ্টকল্পনা বলে মনে হয়।

লাচামের সাদা ঘোড়াটি খুব সুন্দর ও তেজি। তার পিঠের কাপড়ের সাজ অপূর্ব নকশাতোলা, বসার আসনটি তাতার দেশে তৈরি। লাচামের মাথায় মুক্তোর সাজ, গলায় প্রবাল আর তেলস্ফটিকের হারছড়া, সোনার উপর চুনি বসানো লকেট, পরনে সাটিন আর কিংখাবের পোশাক। শরতের মনে হয়, সে যেন কোনও রোমাঞ্ছ উপন্যাসের নায়িকা কিংবা দেবীর পাশাপাশি ঘোড়া চালিয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ জনবসতি ছাড়িয়ে ওরা বিজন প্রান্তরে এসে পড়ে। মাথার ওপর বিশাল নীলরঙা চাঁদোয়ার মতন আকাশ, দূর পাহাড়ের গায়ে প্রাচীন মঠের ধ্বংসাবশেষ, নীচে মালভূমিতে চমর – চমরি নিশ্চিন্তে ঘাস খাচ্ছে। মাঝে মাঝে পথের ধারে মেষপালক বা চমরপালক দোকপাদের ছাউনি। ওরা তেমনই একটি ছাউনিতে থামে টিফিন করতে।

অলোক পড়েছে, শরৎচন্দ্র দাস ‘টিফিন’ লিখেছেন। ব্রিটিশ ভারতে এই ‘টিফিন’ শব্দটি এসেছে ইংরেজি ‘টিফিং’ থেকে – মানে হল ছোট্ট চুমুক। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলের গোড়ার দিকে, যখন ভারতে রাজ্যপাটএকটি সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প হয়ে ওঠেনি , বেশ একটা পিকনিকের মেজাজ ছিল , ইংরেজরাতখন কাজকর্মের ফাঁকে মাঝেমধ্যেই টিফিং করতেন । কিন্তু গ্রীষ্মপ্রধান দেশে এই সময়ে অসময়ে টিফিং যে তাদের স্বাস্থ্যের ওপর তার কুপ্রভাবফেলছে, এটা বুঝতে পেরে ক্রমে এই রেওয়াজ উঠে গিয়ে চালু হয় সন্ধ্যার পর পেগ মেপে সানডাউনার । তবে ‘টিফিং’ থেকে ‘টিফিন’ হয়ে ওঠা শব্দটি ভারতীয় ইংরেজিতে থেকে যায়, আর থেকে যায় এই শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নবীন ঔপনিবেশিক রোমাঞ্ছও । তিব্বতের পাহাড়ি পথে নিঝুম নিঃসীম প্রকৃতির বুকে নির্জনপশুপালক ছাঊনিতে এক তিব্বতি রাজমহিষীর সঙ্গে মাখন-চা টিফিং করার মধ্যে রয়েছে সেই রোমান্সের ছোঁয়া।

শরৎ জিজ্ঞেস করে, - ডুলির চল নেই এদেশে? দীর্ঘ পথ ঘোড়া চালিয়ে যাওয়ার থেকে ডুলিতে চলা কিন্তু অনেক আরামের, বিশেষত মেয়েদের পক্ষে!

লাচাম প্রশ্ন করে, — ডুলি মানে তো সেটা যা মানুষ কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যায়?

শরত বলে, - হ্যাঁ, চার বা তার বেশি মানুষের কাঁধে - অনেকটা সেদান চেয়ারের মতন!

একটু হেসে লাচাম বলে, - কিন্তু মানুষকে ভারবাহী পশুর মতন ব্যবহার করাটা কি ঠিক? তিব্বতে শুধু দুজন ছাড়া আর কারও এমন পরিবহনে অধিকার নেই – সেই দু’জন হলেন দলাই লামা আর পাঞ্চেন লামা!

একটি নীচু গিরিপথ পেরিয়ে গেলে উপত্যকার গা বেয়ে পেঁচিয়ে পথটি নামতে থাকে। অনেকগুলো ছোটো ছোটো বরফগলা জলের ধারা গিয়ে মিশেছে দূরে একটি সবুজ সরোবরে। সন্ধ্যা নামার আগেই ওরা সেই সরোবরের ধারে একটি গ্রামে পৌঁছয়। মৎস্যজীবীদের গ্রাম, বাড়িগুলির দেওয়াল ঘাসে বোনা, শনঘাসের ছাউনি। প্রায় প্রত্যেক বাড়ির সামনে ঘরের গায়ে সারি দিয়ে চামড়ায় মোড়া বড়ো বড়ো ঝুড়ির আকারের নৌকো উলটানো রয়েছে। গোটা গ্রামে তীব্র আঁশটে গন্ধ।

ওরা গ্রাম থেকে ৎসাম্পা আর টাটকা মাখন কেনে। ভালো টাটকা মাছ পাওয়া গেলেও মহামারীর কারণে লাচাম শরতকে মাছ খেতে বারণ করে। শেষরাতের দিকে হঠাৎ শরত কাশতে শুরু করে। কাশতে কাশতে ঘুম পালায়। সঙ্গে রাখা লং খেয়ে বার বার কাশি থামায় সে।

পরদিন সকালে যাত্রা শুরু করে ওই সরোবর ছাড়িয়ে খানিক দূরে একটি নদীর ওপর বেশ শক্তপোক্ত কাঠের সাঁকো পার হয়ে ওদের চড়াই শুরু। কিছুক্ষণ চড়াইয়ের পর পথ নদীকে ছেড়ে উঠে যায় কারো-লা নামে একটি উঁচু মালভূমির বুকে। কিছুদূর চলার পর শরত উত্তরপশ্চিম দিকে বরফে ঢাকা পাহাড় দেখতে পায়। মালভূমির বুকে বিস্তীর্ণ ঘাসজমিতে চমরির দল চরছে। ছোটো ছোটো জলের ধারা এঁকেবেঁকে বয়ে পরস্পরে মিশে নদী হয়ে যাচ্ছে। কারো - লা পেরিয়ে মাইল দুয়েক উপত্যকা দিয়ে নেমে যাবার পর পাওয়া যায় একটি ছোটো গ্রাম রিং - লা। নদী এখানে উত্তরে বাঁক নিয়ে ইয়ামদোর সঙ্গে মিশতে চলেছে। এখান থেকেই শুরু নাঙ্গাৎসের সমভূমি, দূরে অস্পষ্ট সামদিঙের গোম্ফা দেখা যায়। এখানে আবার পথের দু’ধারে ফসলের মাঠ, মেয়েরা যবের খেতে আগাছা নিংড়াচ্ছে, তাঁরা যাত্রীদের দেখে এগিয়ে এসে হাসিমুখে যবের কচি শাক উপহার দিয়ে যায়। কোথাও বা একদল মেয়ে ইট বানাচ্ছে। সেই কাচা ইট তাঁরা গাধার পিঠে চাপিয়ে নিয়ে চলেছে ভাটায়। মাটির পাত্র তৈরি হচ্ছে কাঠের ছাঁচে ঘুরিয়ে, চাকের ব্যবহার নেই।

এখান থেকে কিছু এগিয়েই পথের ধারে রয়েছে লাচামের শ্বশুরের জমিদারির অধীন একটি গ্রাম। পাহাড়ের গায়ে ধাপকাটা ফসলের খেত দেখা যায়। ওপরদিকে জোং, অর্থাৎ স্থানীয় প্রধানের দুর্গপ্রাসাদ - একসারি ধ্বজা উড়ছে। রাতে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে ওখানে।

তার আগে লাচামের দলের লোকেরা পথের পাশে এক জায়গায় লাল কাপড় দিয়ে চটজলদি ঘেরাটোপ বানিয়ে ফেলে। লাচাম ভেতরে ঢুকে পোশাক বদলে পরে নেয় দামি রেশম, মাথায় পরে রত্নখচিত পাতুগ।

গ্রামের পথে যেতে যেতে শরৎ লাচামের কাছে তিব্বতে এক পরিবারে ভাইদের একজন নারীকে বিয়ে করার বিচিত্র সামাজিক রীতি সম্পর্কে জানতে চায়।

কিন্তু লাচাম ওকে পাল্টা প্রশ্ন করে, — আমি শুনেছি ভারতে নাকি একজন পুরুষ একাধিক নারীকে বিবাহ করে?

শরৎ বলে, - সবাই না করলেও সেই রীতি প্রচলিত আছে!

লাচাম বিস্মিত হয়ে বলে, - কী অদ্ভূত! তাহলে তো স্বামীর সোহাগ সম্পত্তি সবই ভাগ হয়ে যায়!

শরৎ সামান্য কেশে বলে, — ফিরিঙ্গিরা কিন্তু আবার একজন পুরুষ একজন নারীকেই বিয়ে করে!

লাচাম বলে, — সে তো আরও অদ্ভুত ব্যাপার!

শরৎ অবাক হয়ে বলে, তা কেন? একজন মানুষ তো একটি সত্ত্বা, বিয়ে তো দুই সত্ত্বার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন। নয় কি?

লাচাম বলে, - কিন্তু এক মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া ভাইয়েরা তো আসলে এক, একই রক্ত বইছে তাদের শিরায়। আত্মা যদিও আলাদা!

শরৎ বলে, - তাহলে একাধিক সহোদরা বোন যদি একই পুরুষকে বিয়ে করে, তাতে কোনও সমস্যা নেই তো?

এক মুহূর্ত চুপ করে যায় লাচাম। তারপর বলে, - কী জানি, কিন্তু আমার মনে হয় ভারতের তুলনায় তিব্বতে নারীরা অনেক সুখী! তাদের জীবন সব অর্থেই অনেক পরিপূর্ণ!

শরত আবার কাশতে থাকে। আবারও লং খেয়ে কাশি থামায়।

জোং এর ফটক পার হয়ে উঠানের মাঝখানে একটি বেদি, তাঁর উপর নরম কার্পেট পাতা। লাচাম ঘোড়া থেকে সেই বেদির ওপর নামে। দলের আর সবাই আগেই ঘোড়া থেকে নেমে পড়েছিল - এমনটাই রীতি। কিন্তু অভ্যর্থনাপর্বের পর জানা গেল প্রধানের ভাই ও এক ভাইপোর গুটি বসন্ত হয়েছে। কোণের একটি ঘরে দুজন লামা ঘণ্টা আর ডুগডুগি বাজিয়ে তারস্বরে রোগ তাড়ানোর মন্ত্রপাঠ করে চলেছে।

সেদিন সন্ধ্যায় শরতের প্রবল জ্বর আসে, সঙ্গে বেদম কাশি। পরদিন দিনের শেষেও জ্বর কমা কিম্বা কাশি থামার কোনও লক্ষণ নেই। তা দেখে লাচাম বলে, - এই অবস্থায় লাহসাযাত্রা অসম্ভব। ঠিক হল লাচামের দল এগিয়ে যাবে। শরতের সঙ্গে তার দুই ভৃত্য ছাড়াও লাচামের দলের কয়েকজন থেকে যাবে। শরত সুস্থ হবার পর লাহসার পথ ধরবে ওরা।

পরদিন ভোরে বেরিয়ে পড়ার আগে লাচাম এক দাসীকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করতে আসে। রোগশয্যায় শুয়ে শরৎ দেখে : সূর্যের প্রথম কিরণ এসে পড়েছে লাচামের মুখে, সম্পূর্ণ নিরাভরণ মুখে তাকে অনেক বেশি সুন্দরী দেখাচ্ছে; এক আশ্চর্য মানবী, যেন নরম আলোয় আলো বিচ্ছুরণের ক্ষমতা রাখেন। সে মনে মনে তাঁর স্পর্শ কামনা করে। আর তাকে অবাক করে দিয়ে শরতের কপালে নিঃসঙ্কোচ হাত রাখে লাচাম। সেই স্পর্শে যেন জাদু রয়েছে। সারা শরীর শিহরিত হয়।

নরম কন্ঠে লাচাম বলে, — সামদিং মঠে একজন আমচি ( বৈদ্য ) আছেন, সেখানে যাও! সন্ন্যাসিনীদের মঠ! তার অধ্যক্ষা দোর্জে ফাগমা আমার আত্মীয়া! আমি তাঁকে চিঠি লিখে রেখেছি!

শরৎ মনে মনে তর্জমা করে, - দোর্জে ফাগমা মানে তো হীরক শূকরী! নিশ্চয়ই বৌদ্ধ বিশ্বাসে কোনও পুনর্জন্ম পাওয়া সন্ন্যাসিনী !

লাচাম আবার বলে, - তোমাকে এভাবে ছেড়ে যেতে খুব খারাপ লাগছে পণ্ডিত। কিন্তু আমি নিরুপায়। বুদ্ধপূর্ণিমার আগেই আমায় লাহসায় পৌঁছতে হবে। বাড়িতে অনুষ্ঠান আছে, দূরদূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজন আসবে। লাহসায় তোমার জন্য আমার বাড়ি অপেক্ষা করবে!

একথা বলে হাসিমুখে বেরিয়ে যায় লাচমা। কিন্তু তাঁর চোখের আর্দ্রতা শরতের দৃষ্টি এড়ায় না। সে-ও অনেক কষ্টে প্রাতকৃত্য সেরে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নেয়। শরৎকে কম্বল জড়িয়ে মাথায় পাগড়ি বেঁধে ঘোড়ায় তুলে দেয় অনুচরেরা। বুকে ভীষণ ব্যথা। ঘোড়ার প্রত্যেক পদক্ষেপে বুকে খোঁচা লাগার মতন অসহ্য ব্যথা তাঁকে পাগল করে দিতে থাকে। অজান্তেই মুখ দিয়ে গোঙানি বেরিয়ে আসতে থাকে।

ন্যাড়া পাহাড়ের মাথায় সামদিং মঠ, পথ গিয়েছে বৃশ্চিকের আকারে একটি সরোবরের পাশ দিয়ে। কিছুটা যাবার পর প্রচণ্ড যন্ত্রণায় শরতের শরীর এলিয়ে আসে, তাঁর আদেশে ভৃত্যরা তাকে ঘোড়ার সঙ্গে বেঁধে দেয়। তাঁর মনে হয় প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে যেন বরফের ছুরি ঢুকে ফুসফুস ফালাফালা করছে, কালো রোদচশমার ভেতর দিয়ে দেখা যায় সরোবরের জলে ভাসছে বরফের চাঙড়। এক জায়গায় খাড়া পাথরের ওপর এক ঝাঁক শকুন দেখে সবাই ঈশ্বরকে স্মরণ করে কপালে হাত ঠেকায়।

জলের ধারে দুজন মানুষ লম্বা কাঠি দিয়ে কী যেন ঠেলছে! শরৎ জিজ্ঞেস করলে লাচামের দলের লোকেরা বলে, - ওরা মুদ্দাফরাস, মৃতদেহ খণ্ড খণ্ড করে জলে ভাসিয়ে দিচ্ছে; এটাই সৎকারের রীতি!

পাহাড়ের গা কেটে খাড়া উঠে গিয়েছে সামদিং মঠের সিঁড়ি। খানিক ওঠার পর মাথা ঘুরে যায় শরতের। তখন একজন কুলির পিঠে মালের ঝাঁকায় চড়ে মঠের ফটক পর্যন্ত যায়। লাচামের চিঠি নিয়ে ভেতরে যায় একজন। শিকলে বাঁধা একজোড়া ভীষণদর্শন ম্যাস্টিফ কুকুর শরতকে দেখে হিংস্র গর্জন করতে থাকে! তাঁর সর্বাঙ্গে কম্বল জড়ানো, কালো চশমায় মুখ ঢাকা। আর মাঝেমধ্যেই বুক চিড়ে বেরিয়ে আসছে কাশির দমক। ওরা কি এই কিম্ভূতকিমাকার মনুষ্যমূর্তির মধ্যে মৃত্যুর ছায়া দেখতে পাচ্ছে? অসহায় শরত ওদের মুখ থেকে লালা ঝরতে দেখে।

সামদিং মঠের আমচি অশীতিপর। মঠের কাঠ - পাথরের স্থাপত্যের গলিঘুঁজির ভেতর এক প্রান্তে তাঁর খুপরি। কাঠের মই বেয়ে ওপরে উঠতে হয়। নস্যি নিতে নিতে, এক হাতে প্রার্থনাচক্র ঘোরাতে ঘোরাতে শরতের চোখ আর জিভ পরীক্ষা করেন। তাঁর জন্য ওষুধপথ্যের ব্যবস্থা করেন, থাকার ব্যবস্থা হয় আমচির খুপরির কাছেই নীচের অপরিসর একটি ঘরে। সেই ঘরের কোণ একটি চিত্রিত সিন্দুক, ওপরে দীপদান, তার ধোঁয়ায় ঘরের দেওয়াল কালো হয়ে আছে; দিনপিছু চার আনা। এছাড়া দের্জে ফাগমার জন্য উপটৌকন, আশিজন লামার জন্য চা পান, ভিক্ষা ও পাঠের আয়োজন করতে হয় অপদেবতাদের তুষ্টির জন্য। কিন্তু এসব সত্ত্বেও দিন যায়, রাত গড়ায়, কাশির দমক চলতে থাকে, কাশতে কাশতে মাঝেমধ্যেই অচৈতন্য অবস্থায় দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যায়!

এর মধ্যেই আমচির নির্দেশে রোগীর একটি কুশপুত্তলিকা তৈরি হয়, সেটাকে পরানো হয় শরতের ব্যবহৃত পোশাক - মৃত্যুকে প্রতারণা করার এক প্রাচীন রীতি! কেউ ওর ঘোড়াটি ধার চায়, মেছোদের গ্রামে যেতে হবে মাছ কেনার জন্য । আমচির নির্দেশে বৃশ্চিক সরোবরের জলে জ্যান্ত মাছ ফেলার ব্যবস্থা হয়। কিন্তু জ্বরের বিকারে শরতের দিনরাত একাকার হয়ে যায়। ঘরের মধ্যে আসা যাওয়া করে অনেক অচেনা সন্ন্যাসিনী, তাদের কথাগুলো যেন ভেসে আসে দূর থেকে। দোর্জে ফাগমার কাছ থেকে কাশ্যপ বুদ্ধের দেহাবশেষ মিশ্রিত বটিকা নিয়ে আসে কেউ। দোর্জে ফাগমা বার্তা পাঠান, - মৃত্যু হবে না, তবে খুব কষ্ট পেতে হবে! শীঘ্রই তিনি দেখা করবেন!

পাহাড়ের মাথায় দিনরাত শো শো শব্দে হাওয়ার দাপট চলতে থাকে। প্রবল হাওয়া দেওয়ালে ধাক্কা মারে, কাঠের গ্রন্থিগুলো গুঙিয়ে ওঠে ঝঞাপীড়িত নৌকোর মতন। সেই গোঙানি উঠোনে একঘেয়ে মন্ত্রপাঠের শব্দে মিশে যায়। শরত সব অনুভব করে, কিন্তু তার চেতনায় ছেয়ে থাকে ছেঁড়া ছেঁড়া দুঃস্বপ্ন। একদিন সে স্বপ্নে দেখে এক দাঁতাল শুকরী, তার বুকে ব্যাগপাইপের মতন স্তনের সারি, সর্বাঙ্গে হীরকের দ্যুতি! জন্মভূমি থেকে এত দূরে এসে মৃত্যুই ঘটবে শেষকালে? শ্যামলী বাংলার এক গৃহকোণে একজোড়া লাজুক চোখের কাতর চাহনি তাকে মাঝেমধ্যেই আঁতুড় করে তোলে। সে তার কাছে ফিরতে চায়। কিন্তু নিজের অবস্থা ভাল ঠেকে না! আচ্ছন্নতার মধ্যেই এক লামাকে ডেকে গোঙাতে গোঙাতে নিজের উইল ও বাড়ির ঠিকানা লিখিয়ে নিয়ে সই করে দেয় শরৎ। লামাকে প্রাপ্য সাম্মাণিক দেয়।

কিন্তু গোঙানির সঙ্গে অবিরাম শো শো শব্দ চলতেই থাকে, তাতে মিশে থাকে নানা আজব শব্দ, অট্টহাসি, জান্তব আর্তনাদ! পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ছুটে যায় সেই ধ্বনি, আবার ফিরে আসে, শিরা-ধমনিতে আর লসিকাপ্রবাহে ঘা দিয়ে চলে রক্তের দমকে, লসিকার স্রোতে। আধোঘুম আধোজাগরণে হাওয়ার দাপট চলতে থাকে। নিয়ন্ত্রণহীন গোঙানি তার অসহায়তাকে চরমে পৌঁছে দেয়।

তারপর হঠাৎ একদিন হাওয়ার দাপট থেমে যায়, মন্ত্রপাঠও বন্ধ হয়, চারিদিকে অন্ধকূপের মতন নিস্তব্ধতা। শরৎ অবাক হয়ে দেখে একটি কুশপুত্তলিকা দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে রয়েছে, চোখে তার কালো রোদচশমাটা। অবাক শরৎ বিছানা ছেড়ে উঠে ঘরের বাইরে বেরোয়, শরীর হালকা পালকের মতন। উঠোনে এক অদ্ভুত অতীন্দ্রিয় আভা, সাদা ধোঁয়ার মধ্যে কালো ছাই উড়ছে, কেউ কোথাও নেই। তিনদিকে মৌচাকের মতন সারি সারি প্রকোষ্ঠ, ঝুলবারান্দা, অসংখ্য পাথর ও কাঠের সিঁড়ি উঠে গিয়েছে এদিক সেদিক। সে কোনদিকে গেলে মানুষের দেখা পাবে তা বুঝতে পারে না! তবু হাঁটতে থাকে। সেই গোলকধাঁধার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটি নীচু প্রশস্ত হলঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়, ভেতরে অসংখ্য থামের সারি। ভেতরটা ছায়াচ্ছন্ন, একদিকে দেয়াল জুড়ে অনেকগুলো মুখোশ কালো কাপড়ে ঢাকা। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়ে একটি থামে ধাক্কা লাগতে দুলে ওঠে সেটি। শরৎ চমকে উঠে লক্ষ্য করে, যেগুলোকে সে থাম ভেবেছিল, সেগুলো আসলে সব ঝুলন্ত সব ফাগড়া; জীবন্ত দগ্ধ ভেড়ার ধড়। তার মানে সে কি ভাঁড়ারকক্ষে ঢুকে পড়েছে!

সে এদিক যায়, ওদিক যায়, কিন্তু কিছুতেই সেখান থেকে বেরোনোর পথ খুঁজে পায় না। গলা শুকিয়ে আসে। ক্রমশই আরও সেঁধিয়ে যেতে থাকে ফাগড়ার অরণ্যে, যেখানে আলো-আঁধারির মধ্যে শত শত ভেড়ার জান্তব আর্তধ্বনি ভেসে রয়েছে স্থির কুণ্ডলীকৃত কুয়াশা হয়ে, আর তার মাঝখানে ঝুলছে একাধিক মানবশরীর। -কাদের? একটা আর্ত শিহরণ বয়ে যায় সমস্ত শরীরে। এ কী? রিনপোচে? সেংচেন? লাচাম? - নগ্ন, রক্তশূন্য, ফ্যাকাশে; চোয়ালের নীচে থেকে ইস্পাতের হুক উঠে গিয়েছে তাদের করোটি ফুঁড়ে, কিন্তু প্রত্যেকের চোখের পাতা নড়ছে, ভাবলেশহীন চেয়ে রয়েছে তার দিকেই। শরত তাঁর স্খলন টের পায়; গমকে গমকে রিক্ত হতে থাকে, ক্রমে অসার হতে থাকে এক অনিবার্য পারক্যহীনতায়...


ক্রমশ ...