বুধবার, জানুয়ারী ২২, ২০২০

মহাসত্যের বিপরীতে, পর্ব ২৯

...যেদিকে তাকাই অসংখ্য কালো মুখোশ, যেন/ একটা আর-একটাকে গিলে খেতে চাইছে/ কী সর্বনাশী এই রাত/ চারিদিকে শুধু নরখাদকের দাঁত...দিব্যেন্দু সাহা (দরজা খোলো ঃ নৈসর্গিক ভালোবাসা)


# ঊনত্রিশ

দেচমা আকাশ ও দিগন্তের দিকে তাকায়। একজোড়া রুপোলী ডানার চিল দ্রুত ওদের দিকে ধেয়ে আসছে। পেছন পেছন যেন তাড়া করছে গাঢ় কালো কিছু মেঘখণ্ড। আর মালভূমির অপর প্রান্ত থেকে এগিয়ে আসছে ঘন কুয়াশার চাদর। দেচমা একজন অভিজ্ঞ আবহাওয়াবিদের মতন বলে, এখন নদীর জল নামবে না, আজ রাতে আবার বৃষ্টি হবে, সারারাত বৃষ্টি হতে পারে! এসব বলতে বলতেই দূরে একটা কিছু দেখে সে চমকে ওঠে। দৃষ্টিভ্রম ভেবে চোখ কচলায়। তারপর আবার তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে, গরব, ওদিকে দেখো, দুজন অশ্বারোহী। ওদের পরনে আলখাল্লা নেই। ওর স্থানীয় মানুষ নয় . . . সৈনিক! এদিকেই আসছে।

গরব ওদিকে তাকিয়ে বলে, ঠিক বলেছ, ওরাও হয়তো আমাদের দেখেছে, না দেখলেও এখুনি দেখে ফেলবে। আমরা আর ফিরে যেতে পারবো না, ওদের সন্দেহ হবে। চলো আমরা নিজেদের পথে এগিয়ে যাই। এই সৈনিকরা টহলদারি কিম্বা শিকার থেকে ফিরছে, আর আমরা যে পথে এসেছি সেই পথেই আসবে। আর দেরি করা উচিত না, জোরে ঘোড়া চালালে ওরা এখানে আসার আগেই আমরা ওদের দৃষ্টির বাইরে চলে যাবো। – কিন্তু নদী পেরোতে পারবো না!

রুপোলী ডানার চিল দ্রুত ওদের উপর দিয়ে উড়ে যেতে যেতে আরও গতি বাড়িয়ে যেন গরবের প্রস্তাব সমর্থন করে। দেচমা বলে, – ঠিকই বলেছ, কিন্তু ওদের থেকে নিরাপদ দূরত্বে পৌছেই আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে পারবো!

গরব ও দেচমা ওদের ঘোড়া জোরে চালায়। আর সম্ভবত তাদেরকে জোরে ঘোড়া চালাতে দেখে সৈনিক ঘোড়সওয়াররাও দ্রুত ঘোড়া ছোটায়। এক তিব্বতী দম্পতিকে এই অসময়ে এরকম খারাপ আবহাওয়ায় এভাবে ঘোড়া ছোটাতে দেখে ওদেরকে গোয়েন্দা ভাবতে পারে অথবা এও ভাবতে পারে এই-ই সেই কাঙ্খিত সর্দার ও তার স্ত্রী, যার মাথার দাম ঘোষণা করেছে সরকার।

ওদেরকে জোরে ঘোড়া ছোটাতে দেখে গরবের মনে হঠাৎ আশঙ্কা জাগে - এবার বুঝি সে দেচমাকে হারাতে চলেছে, এবার বুঝি সে ওই চীনা সৈনিকদের বাহুপাশে চলে যাবে। অবচেতনেই এহেন আশঙ্কায় কিছুক্ষণ আগে সে দেচমাকে যেসব সতর্কতার কথা বলেছিল সেগুলি নিজেই ভুলে আরও বিপদ ডেকে আনে। প্রথমে দেচমার ঘোড়া ও তারপর নিজের ঘোড়াকে চাবুক মেরে আরও জোরে লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে বাধ্য করে। জীবনে এই প্রথম তার আদরের ঘোড়া নাগপোর গায়ে এত জোরে চাবুক চালিয়েছে গরব। তার কষ্ট হয়। কিন্তু তীব্রগতি ছাড়া বাঁচার আর পথ নেই যে!

এই হঠাৎ গতি পরিবর্তনে সৈনিকদের মনের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তোলে। ওরা এবার নদীর পাড় ধরে আসার পরিবর্তে আড়াআড়ি পথে ঘোড়া ছুটিয়ে দ্রুত ওদের দিকে ধেয়ে আসতে থাকে। গরব ওর কাঁধে ঝোলানো বন্দুকটা হাতে নেয়। তারপর ঘোড়ার গতি বিন্দুমাত্র না কমিয়ে সামান্য ঘুরে অগ্রগামী অশ্বারোহীর দিকে তাক করে ট্রিগার দাবায়। লোকটি আর্ত চিৎকার করে ঘোড়ার পিঠ থেকে নিচে গড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয় জন ওর সহসৈনিকের কাছে এসে ঘোড়া থেকে নামে। তারপর মিনিটখানেক সময় ধরে ওর শরীর পরীক্ষা করে দেখে। বুকে গুলী লাগায় তখুনি মারা গেছে সে।

দক্ষ হাতের পাকা নিশানা। সহসৈনিক আহত হলে নিয়ম অনুসারে তখুনি ওকে উঠিয়ে আগে নিকটবর্তী সেনাছাউনিতে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে হতো। কিন্তু মরে গেছে দেখে সে জোরে চেঁচিয়ে গরবের উদ্দেশ্যে একটা অশ্লীল গালি দিয়ে আবার ঘোড়ায় চাপে। তারপর ঘোড়া ছুটিয়ে গরবের দিকে বন্দুক তাক করে ট্রিগার চাপে। ওই গুলী ‘শু উ উ উ’ – শব্দে গরবের কানের পাশ দিয়ে চলে যায়। গরব ও দেচমা সমান বেগে উর্দ্ধশ্বাসে ঘোড়া ছোটাতে থাকে।

সৈনিকটি ওদের চিনতে পেরেছে কিনা কে জানে! কিন্তু গরব অনুভব করে, এখন সে একজন সৈনিকের ইত্যাকারী। পালিয়ে বাঁচা ছাড়া ওর আর কোনও উপায় নেই। গরব ও দেচমা প্রাণপনে ঘোড়া ছোটাতে থাকে।

ততক্ষণে নদীর অপর পারের গাছগুলি নদীতটের কাছাকাছি রয়েছে দেখে গরব বুঝতে পারে যে ওরা পায়ে হেঁটে নদী পার হওয়ার জায়গাটার খুব কাছে পেীছে গেছে। কিন্তু এই আধো অন্ধকারে সঠিক জায়গাটি ঠাহর করতে অসুবিধা হয়। বন্যার জলের ঢেউ প্রবল শব্দে পাথরে আছড়ে পড়ছে। এমন সময়ে পেছনে ধাবমান সৈনিকের আরেকটি গুলী গরবের কানের পাশ দিয়ে শিস দিয়ে বেরিয়ে যায়। সে - ও ঘোড়ার জিনে অর্ধেক ঘুরে সৈনিককে লক্ষ্য করে গুলী চালায়। ওই সৈনিকও এবার আর্ত চিৎকারে নিজের কাঁধ ধরে। কিন্তু সমানভাবে ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে আসতে থাকে। চীনা ভাষায় গালি দিতে থাকে। ওর চিৎকার এবং উপর্যুপরি গুলী বিনিময়ের শব্দে হয়তো পাশের কোনও সেনাদল কুয়াশার চাদর চিরে ওদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে থাকে। ওদের সমবেত হাকডাক শোনা যায়। গরব এবার বুঝতে পারে, যে দুজন সৈনিক ওদের তাড়া করছিলো তারা অগ্রগামী স্কাউট, কিন্তু ওদের পেছনে রয়েছে এলাকায় চিরুনিতল্লাশী চালানো সেনাদল। গরবদের আর একমুহূর্তও দেরি করা উচিত নয়। সে বলে, দেচমা, আমার সোনা, এবার হয় আমরা শেষ হয়ে যাবো, অথবা নতুন জীবন পাবো!

তারপর ওকে পাশে রেখে ঘোড়া নিয়ে জলে নেমে পড়ে। ধীরে ধীরে অগভীর প্লাবিত অঞ্চল পেরিয়ে নদীর মাঝামাঝি খরস্রোতে পেীছে বুঝতে পারে ওরা একদম ঠিক এলাকা দিয়েই নদী পার হচ্ছে। গরব মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানায়। ঘোড়া দুটির মাথা ছাড়া প্রায় গোটা শরীর জলে ডুবে গেলেও ওরা ঠিক স্রোত ঠেলে মাঝের গভীর জল অতিক্রম করে ওপাড়ের প্লাবিত এলাকার কাছাকাছি পৌছে যায়। তখনই হঠাৎ আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়। তারপর বাজ পড়ার ভয়ানক শব্দে হকচকিয়ে দেচমার ঘোড়াটির পায়ের তলার পাথর সরে গিয়ে সেটি উলটে পড়ে। দেচমা জলে পড়তেই প্রবল স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। গরবের ঘোড়া সেইসময় জল ঠেলে এগিয়ে যাওয়ায় সে কিছুই করতে পারে না। বিদ্যুৎ চমকের এক লহমায় শুধু দেখে জলের উপর দেচমার দুহাতের আঙুলগুলি একবার আকাশের দিকে উপরে উঠে আবার জলের ঘূর্ণিতে ডুবে যায়।

গরব পাগলের মতন চেঁচিয়ে নাগপোর পিঠ থেকে একটি বড় চ্যাপটা পাথরে লাফিয়ে পড়ে। সেখান থেকে আরেক লাফে নদীতটের গা ঘেঁষা আরেকটি বড় পাথরে পা দিয়ে ওই পাড়ে লাফিয়ে ওঠে। তারপর সে নদীর তীর ধরে দৌড়োনোর কথা ভাবে। জোরে, আরও জোরে ছুটে স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া দেচমাকে পেতে চায়। কিন্তু তখনই নদীর অপর পার থেকে একটি গুলী ছুটে এসে ওর দুই কাঁধের মাঝে লাগে। ওর বুকের ভেতর থেকে কঁক করে একটি আর্ত চিৎকার বেরিয়ে আসে। সে টাল সামলাতে পারে না। একটা বড় পাথরের পেছনে গড়িয়ে পড়ে।

ততক্ষণে নদীর ওপাড় থেকে ভারি কুয়াশার অন্ধকার এপাড়েও চলে আসে। দু'হাত দূরের কোনও কিছু আর দেখা যায় না। গরব যেখানে গড়িয়ে পড়ে সেখানে হাল্কা জল। পাথরে আছড়ে পড়া জলের শব্দ অবশ্য শোনা যায়। অন্ধকারে নদীর ওপাড়ে অনেকক’টা ঘোড়ার ক্ষুরের আওয়াজ, সৈনিকদের কলরব ধীরে ধীরে দূরে চলে যেতে থাকে। শুধু জলোচ্ছ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। সৈনিকরা কি ওকে চিনতে পেরেছে? ওরা কি ভেবেছে যে সে গুলি খেয়ে জলে পড়েছে আর খরস্রোতে ভেসে গেছে? ওরা কি কুয়াশার মধ্যে দিয়ে ওকে গুলি খেয়ে আছড়ে পড়তে দেখেছে? তাহলে ওরা নিশ্চয়ই দিনের আলোয় ওর মৃত দেহের ধড় থেকে মাথা কেটে নেওয়ার জন্য এপাড়েও খুঁজতে আসবে। সেই কাটামুণ্ডুতে লবন মাখিয়ে ওরা সেনাপতির কাছে পুরস্কারের জন্যে পাঠাবে। এমনি খুঁজতে খুঁজতে ওরা কি দেচমাকে খুঁজে পাবে?

দেচমা, দে -চ – মা! ওকে পেতেই হবে, সে কতদূর ভেসে গিয়েছে কে জানে! বিদ্যুতের ঝলকানিতে সে শুধু দেচমার দুহাতের আঙুলগুলি একবার প্রজাপতির মতন শূণ্যে লাফিয়ে উঠে আবার ডুবে যেতে দেখেছে। তার ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। সে দেচমাকে খোঁজার জন্য উঠে দাঁড়াতে গিয়েও আবার উলটে পড়ে। ওর পিঠ থেকে একটি ঘন গরম স্রোত বেরিয়ে আসছে। সে তবুও মনের জোরে আবার উঠে দাঁড়ায়। ভীষণ দুর্বল লাগে। চিন্তা জড়িয়ে আসে। সে জল থেকে ডাঙায় উঠে আসে। তারপর নদীর পাড় ধরে ছুটতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পরে। একটা পাথরে বেদম কপাল ঠুকে যায়। অনেক কষ্টে আবার উঠে দাঁড়ায়। টলতে টলতে সামান্য দূর এগিয়ে একটি কাঁটা ঝোপে হাত লাগে। তারপরও সে কয়েক পা ভাটির দিকে এগিয়ে যায়। দেচমাকে উদ্ধার করতেই হবে!

সে আবারও ছোটার চেষ্টা করে। কিন্তু তখন চারপাশের কুয়াশার অন্ধকার ওর চেতনাকেও আচ্ছন্ন করে ফেলে। সে একটা গাছের গুড়িতে হোচট খেয়ে আছড়ে পড়ে জ্ঞান হারায়। পাশ দিয়ে খরস্রোতার জল কলকল শব্দে বয়ে যায়। বয়ে যেতে থাকে।

পরদিন কাকভোরে এক তিব্বতী প্রৌঢ় ও এক সুদর্শন সদ্যযুবক ঘোড়ায় চড়ে জঙ্গল ও নদীর মধ্যবর্তী পথ ধরে যাওয়ার সময় গরবকে একটা গাছের গুড়ির পাশে মরার মতন পড়ে থাকতে দেখে। প্রৌঢ়ের নাম মিগমার। তিনি একজন বনধর্মী চিকিৎসক। বন-পা তিব্বতের প্রাচীন ধর্ম। বন-পা অনেকটা নিম্নমার্গের তান্ত্রিক ধর্মের মতন।

তন্ত্রের আদি হলো দেহতত্ত্ব। দেহতত্ত্বকে জেনে তারপর ধীরে ধীরে মন দিয়ে শব্দ স্পর্শ রস গন্ধকে জানা। তারপর আরও উর্দ্ধে পঞ্চমহাভূত ও জাগতিক পদার্থসমূহের উৎস সন্ধান। মূল উদ্দেশ্য হলো পরা ও অপরা বিদ্যার মাধ্যমে প্রকৃতি ও পুরুষের মিলন রহস্য জানা। কিন্তু সে পথ যেমন জটিল তেমনি কঠিন। তাই অনেকেই পথভ্রষ্ট হয়ে পুরুষ ও প্রকৃতির মিলন রহস্যের মূল সুত্র না ধরতে পেরে দেহতত্ত্বকে নিয়েই খুশি থাকেন। শক্তির সৃজনী শক্তিসন্ধানের কঠিন পথ ছেড়ে নিছকই রূপ-রস-গন্ধের আকর্ষণে মাতোয়ারা হয়ে সচ্চিদানন্দের বদলে ভোগানন্দে আটকে পড়া। বৌদ্ধ জ্ঞানী বনতন্ত্রকে এভাবেই ব্যাখ্যা করেন। এই বনরা তন্ত্রের আলোর পথে না গিয়ে একে গবেষণার অঙ্গ করে তুলেছে। তখনকার তিব্বতের ইতিহাস সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না। খ্রিস্টিয় সপ্তম বা বুদ্ধের আবির্ভাবের প্রায় বারো শ বছর পর তাঁর বাণী প্রথম তিব্বতে প্রচারিত হয়। এর মূলে ছিলেন তখনকার রাজা স্রোং - সান্ গার্জেপা। তাঁরই নাম অনুসারে তিব্বতী মঠগুলিকে গাোম্পা বা গুম্ফা বলা হয়।

রাজা স্রোং - সান গার্জেপা তিব্বতের সীমাকে উত্তরে চীন আর দক্ষিণে নেপাল অব্দি বিস্তৃত করেন। বিজিত দেশ চীনের রাজকন্যাকেও তিনি বিয়ে করেন। তারপর নেপাল আক্রমণ করলে নেপালরাজ অংশুবর্মাও তাঁর কন্যা ভৃকুটিকে তিব্বতরাজ স্রোং - সান - গাম্পার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে সন্ধি করেন। তখন নেপালও ছিল সম্পূর্ণ বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। এভাবেই রাজা চীন ও নেপাল থেকে রাজকন্যাদের সঙ্গে করে ধর্মকেও নিয়ে আসেন। শুধু তাই নয়, এই দুই রানীর প্রভাব বৌদ্ধ ধর্মকে তিব্বতে রাজধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন। রাজা নিজেই তাঁর মন্ত্রী ও পরিবার বর্গকে ‘ওম্ মণি পদ্মে হুম’ বীজমন্ত্রে দীক্ষিত করেন। তাঁর অর্থমন্ত্রী থন - মি - সবোথকে তিব্বতের বিদ্বজ্জনদের নেতা বানিয়ে ভারতে পাঠান সত্যিকারের বৌদ্ধধর্মের আচার ব্যবহার শিখে আসতে। থন - মি - সনবোথ ভারতে গিয়ে মহাপণ্ডিত লিপিদত্তের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তিনি পালি ও সংস্কৃত থেকে বৌদ্ধদর্শন, বেদ ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের তিব্বতী অনুবাদও করেন। সেই অনুবাদগুলিকে তিব্বতী লামারা কানজুর ও তানজুর নামে জানেন।

এভাবে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন বন-পা ধর্মটা একটু দূরে সরে দাঁড়ায়। কিন্তু তিব্বতের মানুষের মনে ভূতের ভয় ও দৈত্য দানবদের অত্যাচারের কথা এমনভাবে গেঁথে রয়েছে যে তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া খুব মুশকিল। বনরা বুদ্ধ ধর্মকে দূরে সরানোর পথে না হেঁটে কৌশলে, বৌদ্ধধর্মের পাশাপাশি তন্ত্রমতকেও যুক্ত করে দিলো। ফলে দুই মন্ত্রী, রাজা স্রোং - সান গাম্পো ও তাঁর অর্থমন্ত্রীর আপ্রাণ চেষ্টায় তিব্বতে যে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, রাজার মৃত্যুর পর, সেখানে আবার দেখা দিলো ভূতের তাণ্ডব। শত চেষ্টা সত্ত্বেও বৌদ্ধধর্মের মধ্যে বনদের মহাকাল ও ড্রাগনের প্রবেশকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারলো না। বাবার মৃত্যুর পর রাজপুত্র স্রি-স্নোন- ইদে-সান শাসনভার হাতে নিয়ে দেশে ভারসাম্য আনতে চাইলেন। তিনি পরিষদদের বলেন, বন-পা আমাদের আদি ধর্ম কিন্তু বৌদ্ধধর্ম দেশে শান্তি এনেছে। তাই এমন একজন মহাপণ্ডিত ধর্মীয় নেতাকে খুঁজে বের করতে হবে যিনি এই দুই পক্ষকে সমানে বিচার করে একটা মীমাংসার পথ দেখাতে পারবেন।

অনেক অনুসন্ধানের পর, অনেক বাক বিতণ্ডা ও যুক্তির ঝড় পেরিয়ে অবশেষে কাশ্মীরের মহাপণ্ডিত গুরু পদ্মসম্ভবাকে গ্রহণ করা হলো রাজ্যের আচার্য হিসেবে। তিনি খ্যাত হলেন রিমপোচে অর্থাৎ মহাগুরু বা উরগীয়ন লামা নামে। তিনি তিব্বতে এসে প্রাচীনপন্থীদের অগ্রাহ্য না করে অনাবশ্যক রীতিগুলোকে ধীরে ধীরে দূরে সরাতে থাকেন। তিনি জানতেন যে হঠাৎ যদি বনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন তাহলে বৌদ্ধধর্মই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। যুগ যুগ ধরে একটি জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেসব বিশ্বাস প্রোথিত সেগুলিকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। খুব সাবধানে তিনি নিজের অভিমত তাদের মধ্যে বিতরণ করতে থাকেন অর্থাৎ ভূত-প্রেত-দৈত্য-দানোকে শ্রদ্ধা সহকারে ধীরে ধীরে বশে আনতে হবে, তারপর শান্তির পথ খুঁজে বের করতে হবে। একবার শান্তি স্থাপিত হলে মুক্তি-মোক্ষ ও নির্বাণ লাভের পথ খুঁজে বের করতে হবে।

তাঁর এই ঐক্যবাদ সকলের পছন্দ হয়। যারা তাঁর কথায় অবিশ্বাস বা অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন তাদের পদ্মসম্ভবা নানা রকম ঐশ্বরিক ও অলৌকিক শক্তি দেখিয়ে বশে আনতেন। বনরাও তাঁর কাছে এসে দীক্ষা নিতে শুরু করে। এভাবে রাজধর্ম বৌদ্ধধর্মের বিকৃতির পাশাপাশি বন ধর্মাবলম্বীরাও টিকে থাকে।

কিন্তু শেষ বয়সে পদ্মসম্ভবা গুরু রিম্পোচে তন্ত্রচর্চা থেকে ধীরে ধীরে সরে এলেন মোক্ষ ও নির্বাণের দিকে। তাতে ক্রদ্ধ হয়ে তাঁরই এক বনপন্থী সহকর্মী তাকে হত্যা করে। তারপর ওই বনপন্থী পুরোহিত তিব্বতী ভাষায় অনুদিত বহু অমূল্য সংস্কৃত পুঁথি ধ্বংস করে দেন। সেইসব পুঁথি আর পাওয়া যায় না। গুরু পদ্মসম্ভবার হত্যাকারীকে ধরতে পেরে প্রশাসন তার মুণ্ডচ্ছেদ করলেও বন-পা ধর্ম কিন্তু থেকেই যায়।

ওই ঘটনার পর প্রায় হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও বনদের তন্ত্রচর্চাও একেবারে লুপ্ত হয়নি। মিগমার তেমনি এক তন্ত্রসাধনা ও আরোগ্য ধামের চিকিৎসক। সদ্যযুবকটি তাঁর ভাগ্নে অনগ। সম্প্রতি একটি অজানা জ্বরে মড়ক শুরু হলে অনগের বাবা-মাও এতে মারা যায়। মিগমার অনগকে দূরবর্তী সেই বন-মঠের চিকিৎসালয়ে নিয়ে যাচ্ছে চিকিৎসাবিদ্যা শেখাবে বলে! বন চিকিৎসা-পদ্বতিও খুবই প্রাচীন। এর সমস্ত চিকিৎসার সঙ্গে পূজাপাঠ, জাদুবিদ্যা ও নানা আচার জড়িয়ে রয়েছে। এই বিদ্যা শিখলে ভবিষ্যতে বাপ মা হারা অনাথ অনগের জীবনধারণে কোনও অসুবিধা হবে না। অন্য সব আত্মীয় মিগমারের এই উদ্যোগে সায় দিয়েছে। তিব্বতীরা এখনও বন চিকিৎসকদের যথেষ্ট সমীহ করে।

গতকাল খারাপ আবহাওয়ার কারণে ওদের যাত্রা বিঘ্নিত হয়েছে। ওরা পথের পাশের একটি গ্রামের পশুপালক সর্দারের বাড়িতে দিনরাত কাটিয়ে কাকভোরে নিজেদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। ওরা চলতে চলতে গতকালের প্রবল বর্ষণ ও বন্যা নিয়েই কথা বলছিলো । তখনই ওরা একটি ঝোপের আড়াল থেকে একটি জিন পরানো দামী ঘোড়া বেরিয়ে আসতে দেখে। প্রশিক্ষিত ঘোড়াটি ওদের দেখে হঠাৎ সামনের দু’পা উঁচু করে হ্রেষ্যার তীক্ষ্ণ আওয়াজে কিছু বলতে চায়। ঘোড়াটির মালিক কে? ওরা চারপাশে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পায় না। মিগমার তাঁর ভাগ্নেকে বলেন, ঘোড়াটিকে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেল। ওর মনিব নিশ্চয়ই ওকে খুঁজছে। অবশ্য আমাদের সঙ্গেও ওর দেখা হতে পারে, তখন জানিয়ে দেবো। এক্ষুনি না বাঁধলে ঘোড়াটি আরও দূরে চলে যেতে পারে। মিগমারের কথা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি ঝোপ সরিয়ে আরেকটি তেমনি দামি ঘোড়া বেরিয়ে আসে। ওটা খুঁড়িয়ে হাঁটছে। ওর পিঠেও জিন বাঁধা। অনগ চেঁচিয়ে ওঠে, - কী আশ্চর্য, আরেকটি ঘোড়া!

মিগমার বলে, তার মানে এখানে কোনও পর্যটক দল এসেছে। সাধারণতঃ একটি ঘোড়া দলছুট হলেও অন্যরা তাকে অনুসরণ করে না। আর একাধিক ঘোড়া হারিয়ে গেলে পর্যটকদের কী পরিমাণ কষ্ট হবে তা আন্দাজ করা যায় না। মিগমার ভাগ্নেকে বলে, দুটোকেই ধরে গাছের সঙ্গে বেঁধে দে!

মিগমার এবার ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে। অনগও নিজের ঘোড়া থেকে নেমে একে একে দুটো ঘোড়াকেই ধরে দুটো আলাদা গাছের গায়ে বেঁধে দেয়। ঘোড়া দুটি এই ব্যবস্থায় মোটেও খুশি হয় না। ওরা প্রবল হ্রেষ্যায় প্রতিবাদ জানাতে থাকে। মিগমার তা বুঝে এদিক ওদিক তাকাতে থাকে। মালিকদের সঙ্গে দেখা হলেই জানাতে হবে এই ঘোড়া দুটির কথা! অনগ দুবার চিৎকার করে জিজ্ঞেস করে, - এ - ই ঘোড়ার মালিক কে? দু - টো ঘোড়া!

কিন্তু কোনও জবাব আসে না। মিগমার বলে, ওরা নিশ্চয়ই দূরে চলে গিয়েছে! কিন্তু দুই দুটো দামি ঘোড়া ছেড়ে কেউ কেমন করে দূরে চলে যায়! আচ্ছা, কোনও দুর্ঘটনার শিকার নয়তো আরোহীরা? গতকাল থেকে যেভাবে মুষলধারে বৃষ্টি ও বন্যা হয়েছে।

অনগ জোরে চেঁচিয়ে ডাকতে ডাকতে পাশের জঙ্গলেও সামান্য ঢুকে দেখতে থাকে। তারপরই চেঁচিয়ে ওঠে, - মামা, মামা দেখে যাও, একজন বোধহয় মরে গেছে!

মিগমার ছুটে যায়। গতকাল সন্ধ্যায় যে গাছের গুড়িতে হোচট খেয়ে গবর পড়ে গেছিল, সেখানেই কাদার মধ্যে পড়ে আছে। অনগ ও তার মামা কাছে গিয়ে ওর দিকে ঝুঁকতেই মৃদু গোঙানি শুনতে পায়। অনগ বলে, - লোকটা মরেনি মামা!

গাছের ডাল থেকে একটা কাক ডেকে ওঠে কা কা করে। মিগমার গরবের হাত তুলে নাড়ি পরীক্ষণ করে বলেন, - ঠিক, তবে আর কতক্ষণ বাঁচবে বলা যাচ্ছে না - স্পন্দন শ্লথ!

মিগমার উঁচু হয়ে বসে পেশাদার চোখে আহত মানুষটিকে ভালমতন পরীক্ষা করে দেখতে থাকেন।

অনগ বলে, লোকটি নিশ্চয়ই বন্যার কবলে পড়েছিল!

মিগমার ঠোট ভেল্টে মাথা নেড়ে বলে, - আমার মনে হয় না, আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি - এই অব্দি বন্যার জল এসেছে। আর এই লোকটা জলেও ডোবে নি, তাহলে এতক্ষণ গোঙাতে পারতো না! দাঁড়া, দেখি তো...!

মিগমার গরবের কাদামাখা আলখাল্লা খুলে গুলির ক্ষত দেখতে পেয়ে আৎকে ওঠে, - এই হতভাগাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে, কেউ পেছন থেকে গুলি চালিয়েছে, গাছে বেঁধে রাখা একটি ঘোড়া নিশ্চয়ই ওর। আশপাশের অন্য কোনওখানে ওর সঙ্গীর দেহও পাওয়া যেতে পারে। ওরা কোনও ডাকাতদলের কবলে পড়ে থাকতে পারে। আমাদেরও এখানে বেশিক্ষণ থাকা উচিত হবে না! চেঁচামেচি করাও উচিত হবে না। ডাকাতরা পাশের কোনও জঙ্গলে ওৎ পেতে বসে থাকতে পারে! কিন্তু ডাকাতরা ঘোড়াদুটি নিলো না কেন? এখানেই একটা খটকা লাগে।

অনগ বলে, দুই অশ্বারোহীর মধ্যে তর্কাতর্কি থেকেও লড়াই হতে পারে, কোনও স্বার্থের সংঘাত, সেজন্যেই হয়তো এক অপরকে...

মিগমার বলে, পরস্পরকে আঘাত হেনেছে? হতেই পারে, চল তাহলে অন্যজনকে খুঁজি ! ওরা দুজনে গরবকে ধরাধরি করে ঝোপঝাড় পরিবৃত একটি শুকনো জায়গায় নিয়ে আসে। এই জায়গাটা নদীর পার ধরে যাওয়া পথ থেকে কেউ দেখতে পাবে না। কাকগুলিও উড়ে এসে এদিককার গাছের ডালে বসে কা কা করে ডাকতে থাকে। মিগমার গরবের পাশে বসে দ্রুতহাতে অনগের আনা নদীর জল দিয়ে ক্ষতস্থান ধুয়ে পরিষ্কার করে কিছু তঞ্চনকারী ভেষজ ওষুধ লাগিয়ে শুকনো কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয়। তারপর কিছুক্ষণ ওরা দুজনেই জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে দ্বিতীয় ঘোড়াটির সওয়ারকে খোঁজে। কিন্তু কোথায় কী? কয়েকটি বড়ো বড়ো পিকা ইঁদুরকে ছোটাছুটি করতে দেখে মিগমার শঙ্কিত হন। এগুলি ভীষণ হিংস্র ও মাংসাশী। এরা রক্তের গন্ধ পেলে এখুনি অসুস্থ মানুষটির উপর ঝাপিয়ে পড়ে খুবলে খুবলে খাবে!


চলবে ...