শনিবার, নভেম্বর ১৬, ২০১৯

মহাসত্যের বিপরীতে পর্ব - ২

লেখক পরিচিতি ঃ

শ্যামল ভট্টাচার্য , আশির গোড়া থেকেই ত্রিপুরার একজন উল্লেখযোগ্য গল্পকার রূপে উঠে আসেন । ক্রমশ ত্রিপুরার গণ্ডি ছাপিয়ে সর্ব ভারতে ছড়িয়ে পরেন তাঁর স্বভাবজাত প্রতিভার স্বপ্রকাশে । একাধিক ভাষাবিদ কথাসাহিত্যিক শ্যামল ভট্টাচার্য ভারতীয় কথা সাহিত্যে সহজেই নিজের আসন পাকা করে নেন । উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ –‘চিলতে দাগ’, ‘ফুলমতির বসন্তকাল’,জামিছলঙ’,’ভারোং পাখির নাচ’,’Paisley’ এবং আকাশে ওড়ার গল্প’। তাঁর অনন্য উপন্যাস ‘বুখারি’র জন্য ২০১৫ সালে ‘ত্রিবেণী সাহিত্য আকাদেমি’, জলন্ধর কর্তৃক ‘অমৃতা প্রীতম সম্মান’-এ ভূষিত হয়েছেন । ‘লোদ্রভার কাছাকাছি’ উপন্যাসের জন্য ২০১০ সালে তিনি লাভ করেন ‘পশ্চিম বংগ বাংলা আকাদেমি পুরষ্কার’ । পাঞ্জাবী কথাসাহিত্যিক মোহন ভাণ্ডারির ,’মুন দী আঁখ’-এর অনুবাদ’কুমারী হরিণীর চোখ’( ২০০৭ ) অনুবাদ করে ২০১১ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরষ্কার লাভ করেন । অনুবাদ করেছেন একাধিক ভাষা থেকে ।

‘মহাসত্যের বিপরীতে’ – চলছে তিব্বতিদের অস্তিত্বের সংকট ও জীবন যুদ্ধের সুদীর্ঘ লড়াই এর উপর ভিত্তি করে তিন প্রজন্ম নিয়ে এপিক উপন্যাস ...


দুই.

অলৌকিক মখপোল ও অসহায় চমরি

বিশাল কালো চমরি গাইটির পিঠ থেকে বরফে গড়িয়ে পড়ে পাঁজরে ক্ষুরের লাথির ব্যথায় অবশ হতে হতে ছিলিঙ পানচুক জানবাকের আবার মনে পড়ে যায় একটি অলৌকিক মখপোল আর ঠাকুর্দা ডাম্মা ডুলকু গরবের কথা।

দু’দিন ধরে বরফ গলে পাহাড় ধুয়ে ঘোলা জল বয়ে যাচ্ছে সমস্ত নালা আর নুব্রা নদী দিয়ে। চায়ের মতন রঙ। প্রকট মাটির গন্ধ। বিতিকিচ্ছিরি স্বাদ। যতই ফোটাও, যতই ছাঁকো প্রায় একই স্বাদ থেকে যায়। পুরো স্বচ্ছ হয় না। এমনিতে নুব্রার জল ওরা খায় না, পাহাড়ের বরফ গলা জল খায়। তবু কুঁড়েমির সঙ্গে টিনফুডের বিক্রিয়ায় অনায়াসে গ্যাস হয়। অ্যাসিড হয়। বুক ব্যথা করে। সৈনিকদের ব্লাড-প্রেশার ওঠা-নামা করে। তাই তখন এখানকার পাথর ওখানে, ওখানকার নুড়ি এখানে জড়ো করে ওরা। ছিলিক পানচুক জানবাক তখন সতর্ক থাকে। সুযোগ পেলেই ব্যক্তিগত কাজের আদেশ দেবে তাগড়া কোন হাবিলদার। এড়িয়ে যাওয়া তখন অসম্ভব। আবার সুবেদার সাহেবের কাজে পান থেকে চুন খসলেই গালি খেতে হবে।

এখন এত অসহায় পড়ে আছে পানচুক। কেউ হাত ধরে না তুললে কোনমতেই আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না। মেরুদন্ডটা কি ভেঙে গেছে ? কোমরে ভীষণ যন্ত্রণা। এদিকে নুব্রার তীরে প্রচন্ড হু-হু হাওয়া। ঠান্ডা হাওয়ায় বরফের উপর শুয়ে পানচুকের মনে হয় এবার আর বাঁচবে না। আর কোনও মানুষের মুখ বুঝি দেখা হল না। মনে পড়ে সাসোমার ঝর্ণা। ছোট-ছোট গ্রাম একশা, হরগম, ফুপুচে পেরিয়ে এই তো সত্তর কিমি দূরেই ওর গ্রাম পানামিক গোগমা। গোগমার বিপরীতে নুব্রার ওপারে ইনসা গোম্পা ও কুবেত গ্রাম। ওই কুবেতেই নুব্রা উপত্যকার সমস্ত পোর্টারদের নেতা লবজাঙ্গ স্টোকডানের বাড়ি। ১৯৮৫ সালে ইন্ডিয়ান আর্মি অথরিটির সঙ্গে মজুরি ও সৈনিকদের ব্যবহার নিয়ে বিবাদের নেতা। জেলা প্রশাসনের মধ্যস্থতায় রফা হওয়ার পর থেকে গ্রাম প্রধানদের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পোর্টারদের এখন ও-ই নিযুক্ত করে।

আজকের ঘটনা জানতে পারলে লবজাঙ্গ স্টোকডান এখুনি ছুটে আসবে। কিন্তু কখন খবর পাবে, কিভাবে খবর পাবে, আদৌ পাবে কিনা, জানে না, ছিলিঙ পানচুক জানবাক। জানে না, ততক্ষণ ও বেঁচে থাকবে কিনা।

পানামিক গোগমার পরই এলাকার সবচাইতে বড় গ্রাম পানামিক। এখানেই ব্লক অফিস ও ডাকঘর। এই ডাকঘরে

এলাকার সমস্ত চিঠিপত্র আসে। এখানে ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার বড় গুদামে দীর্ঘদিন পোর্টারের কাজ করেছে সে। কোনওদিন এত অপমান সইতে হবে, ভাবেনি পানচুক। ছোটবেলায় এই এলাকায় পাকিস্তানি সৈনিকদের অত্যাচার চলতো। নৃশংস ব্যবহার করতো ওরা তিব্বতি শরণার্থী পরিবারগুলির উপর। ক্রীতদাসের মতন খাটতো। সন্ধ্যে হলেই বাড়ি-বাড়ি হামলে পড়তো মা-বোনদের উপর। লবজাঙ্গ স্টোকডানের দাদা আর পানচুকের বাবা প্রতিবাদ করতে গিয়ে পাকিস্তানি সৈনিকদের পায়ুধর্ষণের শিকার হয়েছে। ওরা ১৩ গোর্খা রেজিমেন্টের প্রাক্তন সৈনিক। বাংলাদেশের যুদ্ধে লড়াই করেছে। ওদের দু’জনকে ধরে নিয়ে উলঙ্গ করে হাত-পা বেঁধে সারিবদ্ধ জেরিক্যানে-র উপর প্যারাশুটের কাপড় বিছিয়ে সৈনিকদের তৈরি করা অদ্ভুত বিছানায় ফেলে দু’দিন দু’রাত একে একে ছাউনির সমস্ত সৈনিক গণধর্ষণ করে। পায়ুদেশ থেকে রক্ত বেরিয়ে তিলে তিলে অসহ্য যন্ত্রণায় ফ্যাকাশে পাথর হয়ে যায় ওরা। তৃতীয় দিনে ওদের মৃতদেহ পানামিক চাঁদমারিতে নিয়ে গিয়ে নিশানা বানিয়ে লক্ষ্যভেদ অভ্যেস করেছে সৈনিকরা। অসহায় গ্রামবাসী সব সহ্য করেছে। চার দিকে প্রহরারত পাকিস্তানিদের বন্দুকের নিশানা এড়িয়ে পালিয়ে যাওয়ারও কোন পথ ছিল না।

এখনও সেই রক্তাক্ত দৃশ্য চোখে ভাসে। বুলেটে ঝাঁঝরা দু’টি দেহ তুলে এনে চোখের জলে ভাসতে ভাসতে গ্রামের মানুষ চিতায় তোলে। অভিশাপ দেয়। তারপর আর একমাসও পাকিস্তানিরা থাকতে পারে না এখানে। সুমুর গ্রাম থেকে পানচুক নামগিয়াল অনেক কষ্টে পায়ে হেঁটে পালিয়ে খরদুঙলা গিরিপথ দিয়ে লেহ পৌঁছে ওর দাদা কর্ণেল রিনগঝিনকে সব জানায়। একাত্তরের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে সুমুরের ছেলে মেজর রিনগঝিন লাদাখ স্কোয়াডের সৈনিকদের নেতৃত্ব দিয়ে অসম সাহসিকতার সঙ্গে তুরতুক উপত্যকার চালুংকা, থাং, ত্যাকশি, ফারোল আর তুরতুক- এই পাঁচটি গ্রামের ছিয়াশিটা বসতি পাকিস্তানের কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন। আরও সময় পেলে ওরা হয়তো পাক অধিকৃত কাশ্মীরের চাকলালা এবং গিলগিট অঞ্চলও দখল করে নিতো। কিন্তু তার আগেই যুদ্ধ থেমে যায়। মেজর রিনগঝিন জীবিত অবস্থাতেই পরমবীর চক্র পেয়ে প্রবাদ হয়ে ওঠেন। আউট-অফ-টর্ণ প্রোমোশান পান। এবারেও এই পাকিস্তানি অত্যাচারের কাহিনি দিল্লিতে জানান তিনি। তারপর তো ১৯৮৪ সালের ১৩ এপ্রিল ভারত একটা পুরো রেজিমেন্ট প্যারাড্রপ করে। শুরু হয় হিমবাহ যুদ্ধ। সেই যুদ্ধ আজও চলছে। এখন নুব্রা উপত্যকার গ্রামে গ্রামে পনের-ষোল বছর বয়সী অনেক ছেলে-মেয়েই পাকিস্তানি সৈনিকদের ঔরসজাত। ওর নিজের স্ত্রী কুঞ্জমই তো পাঞ্জাবী মেয়েদের মতন দেখতে।

এ সময় কুঞ্জমের কথা খুব মনে পড়ে। কুঞ্জম হয়তো আর ওকে দেখতে পাবে না। কান্না পেয়ে যায় পানচুকের। কোনওমতেই উঠে বসতে পারছে না। ও গোঙাতে থাকে। ভারতীয় সৈনিকরাও এত নৃশংস হবে স্বপ্নেও কল্পনা করা যায় না।

পানামিকের পরের গ্রাম তিরিষা। বাঁদিকে পশ্চিম কারাকোরামের তিন পাহাড়ের মাঝে ছোট নীল হ্রদ। প্রতিবছর বুদ্ধপূর্ণিমায় ইলকম, চামসেন, পিঞ্চিমিক, আরও দূর দূর থেকে লোকের জমায়েত হয়। মেলা বসে পিঞ্চিমিকের পরের গ্রাম টেগারে এলাকার সবচাইতে প্রাচীন শিরপো গোম্পায়। এর লামা শিরপো ছুলটিক নিমা ঠাকুর্দা ডাম্মা ডুলকু গরবের প্রিয় বন্ধু। তিব্বত থেকে দালাই লামার যে অনুগামীরা এদেশে পালিয়ে আসে তার একটি গোষ্ঠীর নেতা এই ছুলটিক নিমা। আর যে সশস্ত্র ডাকাতদলটি তাদের সুরক্ষার জন্য পাশাপাশি ঘোড়া চালিয়ে এসেছে, তার দলপতি ছিল পানচুকের ঠাকুর্দা গরব। ওরাই নুব্রা উপত্যকায় প্রথম বসতি স্থাপন করে। ডাকাবুড়ো না হলে এই চরম প্রাকৃতিক প্রতিকূল পরিবেশে বসতি স্থাপনের কথা কেউ ভাবতেও পারবে না। গরবের চেহারা দেখে মনেই হতো না যে তিনি তিব্বতী। ঠাকুমা দেচমা ছিলেন অপরূপ সুন্দরী। গরব-দেচমার প্রেম নিয়ে ওদের গ্রামগুলিতে অনেক গল্প রয়েছে। একেকজনের মুখে একেকরকম গল্প। একগ্রাম থেকে অন্যগ্রামেসেই গল্পের কোনও একটা অংশ বদলে যায়। সুমুরের পর লাজুক। তারপরই তিরিত। তিরিতে নুব্রা ও শীয়োক মিলিত হয়েছে। মেলার শুরুতে তিরিত থেকেও লোকেরা তিরিষায় আসে। লাজুক গ্রামের লজ্জাবতী কুঞ্জমকে পানচুক প্রথম দেখেছে সেই তিরিষার মেলায়। প্রস্তাব দিলে কুঞ্জমের মা সঙ্গে সঙ্গে রাজি। গরব দেচমার নাতি বলে কথা। তার উপর সুপুরুষ, সমস্ত লা এবং কাঙ্গরি নখদর্পণে এই বয়সি ক’টি যুবকের রয়েছে ? লাদাখি ভাষায় ‘লা’ মানে গিরিপথ আর ‘কাঙ্গরি’ মানে পাহাড়। ‘দাখ’ মানে দেশ। অসংখ্য গিরিপথের দেশ এই লাদাখ। এমনি অনেক লাদাখি শব্দ জানলেও ভাল লাদাখি জানে না পানচুক। লাদাখিদের সঙ্গে সে হিন্দিতে কথা বলে।

তিরিষার মেলায় নানা পণ্যের পসরা নিয়ে লেহ, নিম এবং জাঁসকর থেকে লাদাখি ব্যবসায়ীরা আসে। একটি অলৌকিক মখপোলের গল্পের জন্য এই মেলা প্রসিদ্ধ। পুণ্যবানেরাই শুধু ওই বিশালাকায় পাহাড়ি ছাগলটিকে দেখতে পায়। ইচ্ছাপূরণ মখপোল। স্বর্গে ও মর্ত্যে সমান বিচরণ তার। ঠাকুমার মৃত্যুর পর ঠাকুর্দা কেমন যেন হয়ে গেছিল। সে বছর মেলায় ঠাকুর্দা চেপে বসেন সেই অতিকায় মখপোলের পিঠে। তারপর যেমন করে ঘোড়া চালিয়ে ডাকাতদলের নেতৃত্ব দিতেন তেমনি মখপোলটাকে ছোটাতে শুরু করেন। সবাই বলে, ডাম্মা ডুলকু গরব নিশ্চয়ই জাতক। ছুলটিক নিমা গম্ভীর হয়ে যান। তিনি জানেন, গরব নিজেকে বলতো ‘কৈলাসপুত্র’। স্বয়ং ভগবান শিব, হিন্দুদের দেবতা মহাদেবের ঔরসে নাকি তাঁর জন্ম। অলৌকিক মখপোল ছুটতে ছুটতে পাহাড়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেও শিরপো ছুলটিক নিমা নির্বিকার তাঁর হাতের ছোট ধর্মচক্রটা ঘোরাতে ঘোরাতে বলেন, -ওম্ মণিপদ্মে হুম...ওম্ মণিপদ্মে হুম.........

এরপর অনেক দিন-মাস-বছর পেরিয়ে গেছে। গরব আর ফেরেনি। পানচুক ভারতীয় সৈনিকদের সার্ভে টিমের সঙ্গে গাইড হয়ে বেশ কয়েকবার তিরিত থেকে খালসার, ডিগার-লা ও ওয়ারিশ্-লা বা শীয়োকের উৎস অব্দি কারাকোরাম লা’তে গেছে। কিন্তু কোথাও কোনও খোঁজ পায়নি। তবে বছর আষ্টেক আগে ঠাকুর্দাকে খুঁজতে খুঁজতে এক বিদেশিনী ওদের গ্রামে এসেছিলেন। তিনি তাঁর মায়ের লেখা একটা বই পানচুককে উপহার দেন। তাঁর মা আলেকজান্দ্রা বহুবছর তিব্বতে কাটিয়েছেন, বহু গোম্পায় থেকেছেন। বইটি মূল ফরাসী থেকে ইংরেজিতে অনুদিত। প্রেমকথা লেখা রয়েছে। এই বই হাতে পাওয়ার পর থেকে পানচুক ঠাকুর্দাকে খোঁজার জন্যে আরও বেশি পোর্টারের কাজ নেয়। ছাতি গ্রাম থেকে ঘোড়ার পথ তিনদিকে গেছে। প্রথমটা ওয়ারিশ-লা দিয়ে সাবু গোম্পা হয়ে হেল্, দ্বিতীয়টা টাঙসে হয়ে দুরবুক এবং তৃতীয়টা কারাকোরাম লা-সাসের লা হয়ে সাসোমাতেই ফিরে আসে। তৃতীয় পথেই ঠাকুর্দার খোঁজ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল সবচাইতে বেশি। কিন্তু অনেক খোঁজ করেও কোনও হদিশ পাওয়া যায়নি।

যেমন আজকের পর থেকে কেউ আর ওর খোঁজ না-ও পেতে পারে। আজ সকালে পশ্চিম কারাকোরামের খাড়া ধার থেকে পা ফসকে প্রায় পাঁচ হাজার ফিট নিচের উপত্যকায় পড়েছে একটি মখপোল।

আর্মির জওয়ানরা সেটাকে কেটে খাওয়ার জন্যে লঙ্গরে নিয়ে আসে। শুনে ছুটে যায় পানচুক। সে সৈনিকদের বোঝায়, স্থানীয় মানুষে বিশ্বাস ওর ঠাকুর্দা যেহেতু এক অলৌকিক মখপোলের পিঠে চেপে অদৃশ্য হয়েছেন, তিনি এবার মখপোল হয়ে পুণর্জন্ম লাভ করেছেন। এই কথা কোম্পানি হাবিলদারকে বোঝালে, তিনি হা হা হেসে ওঠেন। সুবেদার সাহেবকে বললে তিনি বলেন, ঠিক হ্যায়, আজ আমরা তোমার ঠাকুর্দার মাংস খাবো.......

পানচুক, দোর্দন্ডপ্রতাপ ডাকাতসর্দার গরবের নাতি ছিলিং পানচুক জানবাক অসহায় হয়ে পড়ে। কিন্তু এত সহজে হাল ছাড়ার বান্দা সে নয়। ততক্ষণে লঙ্গরের কসাইখানায় পৌঁছে গেছে মখপোলের মৃতদেহ। ও গিয়ে সেই মৃতদেহের উপরই হাত-পা ছড়িয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। -দেখি কে কাটে মখপোল, তার আগে আমাকে কাটতে হবে। কাছেই দাঁড়িয়ে লঙ্গরের পচা লাউ আর টমেটোর বস্তা সাবাড় করছিল একটা বিশাল কালো চমড়ি গাই। দু’জন হরিয়ানি সৈনিক তখন পানচুককে চ্যাংদোলা করে উঠিয়ে নিয়ে ওটার পিঠে চাপিয়ে ওর হাত দু’টো চমরি গাইয়ের গলা জড়িয়ে বেঁধে দেয়। পানচুক তারস্বরে চিৎকার করতে থাকে। চমরি গাইটা এই অতর্কিত আক্রমণের জন্যে প্রস্তুত ছিল না। ওরা ছেড়ে দিতেই লেজ ওপরে তুলে প্রাণের ভয়ে অতিকায় প্রাণীটা ছুটতে থাকে।

ছুটতে ছুটতে ওটা বারবার মাথা উপর নিচে করে। শিঙের গুঁতো লাগে পানচুকের পিঠে। যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত পানচুক আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায় ওর হাত দু’টো ইয়াকের মাথা গলিয়ে বের করতে। অথচ প্যারাশুটের দড়ি বাঁধা হাত দু’টোকে কিছুতেই ও গলিয়ে আনতে পারে না। চমরি গাইয়ের মুখের সামনে ওর হাত এলে ওটা হা করে একটা কামড় দিয়ে আবার ছেড়ে দেয়। কব্জির হাড়গুলি বুঝি গুঁড়িয়ে যায়। আর তখনই পাথরে হোঁচট লেগে নুব্রার তীরে গড়িয়ে পড়ে গাইটা। হঠাৎ পতনে না জানি কেমন করে ওর হাতটা মাথা গলিয়ে বেরিয়ে আসে। ও ছিটকে পড়ে।চমরি গাইটা উঠে দাঁড়িয়ে ওকে দেখে বোধহয় ভয় পেয়ে যায়। ওর চোখ দু’টি টকটকে লাল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ভয়ে ওর বুকের উপর দিয়েই ছোটে। ছুটতে ছুটতে উপত্যকা পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। কোনও চমরি গাইকে কোনওদিন এত লম্বা দৌড় দৌড়াতে দেখেনিও।

এখন কোমরে ও পাঁজরে অসহ্য যন্ত্রণা। ও যেন তলিয়ে যাচ্ছে। তার উপর ঠান্ডা হাওয়া। আকাশ দেখা যাচ্ছে না। বাতাস ভারি। এখুনি হয়তো তুষারপাত শুরু হবে। রাশি রাশি বরফে চাপা পড়ে যাবে ছিলিঙ পানচুক জানবাক। কেউ জানতেও পারবে না, ওর নিথর দেহটা কোথায় পড়ে রয়েছে। কুঞ্জম কাঁদবে উদাস হয়ে। মা কাঁদবে বুক চাপড়ে। ভাবতে ভাবতে সে তলিয়ে যাচ্ছে। শেষ মুহুর্তে মনে হয় কতদূর থেকে একটা হৈ-হল্লার শব্দ। তাহলে কি লবজাঙ্গ স্টোকডান খবর পেয়েছে ! দলবল নিয়ে ছুটে আসছে সে ! ওরা কি খুঁজে পাবে আদৌ। তবু একটা আশা নিয়ে জ্ঞান হারায় ছিলিঙ পানচুক জানবাক। কঠিন কোনও পাহাড়ের অন্ধকার সুড়ঙ্গ অথবা গভীর শীতল ফাটলের অতলে তলিয়ে যেতে দেখে একটা মখপোলের শরীর থেকে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। তার পিঠে বসে দু’হাত বাড়িয়ে ডাকছে ঠাকুর্দা ডাম্মা ডুলকু গরব। সেই আলোতে উজ্জ্বল গুহায় একটি অসহায় চমরি দিকভ্রান্ত হয়ে ছুটে চলেছে এক দেওয়াল থেকে অন্য দেওয়ালে...


চলবে ...