শুক্রবার, অক্টোবর ২৩, ২০২০

মহাসত্যের বিপরীতে,পর্ব ২৭

মৃত্যু কি সকলই নেয়? মৃত্যু কি সকলই নিতে পারে?

তা হলে কী নিয়ে থাকে, যাঁদের নেয়নি মৃত্যু, তারা? –

রেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

# সাতাশ

এই আখ্যানের পঁচিশতম পর্ব পড়ে নবীন পাঠক সোমেন চক্রবর্তী লিখেছেন,-‘ নিষিদ্ধ দেশ মানে তিব্বত, এই কথাটা জেনেছিলাম ছোটবেলায়। কিন্তু কেন যে নিষিদ্ধ বলা হতো সেটা জানা ছিল না। শরৎ কি পেরেছিলো এই তিব্বতের রহস্য উন্মোচন করতে। এই প্রশ্ন নিয়ে আগ্রহের সীমা বেড়ে যায় আরও..’

এই আগ্রহ দেখে অলোক ভাবে, তিব্বত তো আর চিরকাল আগ্রহী ভারতবাসীর জন্যে নিষিদ্ধ ছিল না। ১৭৭৪ সালের মে মাসে কলকাতা থেকে রওনা হয়ে ডিসেম্বর মাসে তাশিলুম্ফোয় পৌঁছেছিলেন জর্জ বোগল। তখন তিব্বত নিষিদ্ধ ছিল না। তিনি প্রায় মাস ছয়েক সেখানে ছিলেন। থাকতে থাকতে পাঞ্চেন লামার সঙ্গে খুব ভালো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে তাঁর। সেই সুবাদে ভুটানের ভেতর দিয়ে ভারত – তিব্বত বাণিজ্যপথ সুগম করার ক্ষেত্রেও অনেক পদক্ষেপ নিতে পেরেছিল উভয় দেশের প্রশাসন।

কয়েক বছর পর তাঁকে আবার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দূত করে তিব্বতে পাঠানোর উদ্যোগ নেন ওয়ারেন হেস্টিংস। পাঞ্চেন লামা তখন বেজিং-এ থাকায় বোগলকে বলা হয় জাহাজপথে চীনে গিয়ে পাঞ্চেন লামার সঙ্গে তিব্বতে ফেরার প্রস্তুতি নিতে। কিন্তু তখনই বেজিং-এ গুটিবসন্ত হয়ে পাঞ্চেন লামার মৃত্যুর মর্মান্তিক খবর এলে যাত্রা শুরুর আগেই তা স্থগিত রাখতে হয়। এর কিছুদিন পরে, ১৭৮১সালের ৩ এপ্রিল ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কলকাতায় বোগলের মৃত্যু হয়। ওয়ারেন হেস্টিংসও অবসর নিয়ে ইংলন্ডে ফিরে যান। এভাবেই তিব্বতের সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতের বাণিজ্য সম্ভাবনা বিনষ্ট হয়।

আর তার দশ বছর পর হঠাৎ নেপালের রাজা তিব্বত আক্রমণ করে। গোর্খাদের অতর্কিত আক্রমণে তাশিলুম্ফোর অনেক ধনসম্পত্তি লুঠ হয়, ধ্বংস হয় মূল্যবান পুঁথিপত্র। শেষে চীনের সাহায্য নিয়ে তিব্বতি সৈন্যরা গোর্খা সেনাদলকে হারিয়েছিল। তখন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দায়িত্বে ছিলেন লর্ড কর্নওয়ালিশ। নেপালের তিব্বত আক্রমণে তাঁর সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ব্রিটিশ- তিব্বত সম্পর্কে ইতি টানে। তিব্বতে যাওয়ার সমস্ত গিরিপথকে বহিরাগতদের জন্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই থেকেই তিব্বত হয়ে ওঠে নিষিদ্ধ দেশ।

হ্যাঁ, কিন্টুপ ও শরতের মতো পণ্ডিত আখ্যাধারী বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষদের নিষিদ্ধ দেশেই গোয়েন্দাগিরি করতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু প্রায় তিনশো বছর ধরে হিমালয়ের নানা গিরিপথে অভিযাত্রীদের ভ্রমণবৃত্তান্ত অলোকের কল্পনার মানচিত্রে সেই রেশম পথ ও অন্যান্য পাহাড়ি পথগুলির মতন, অসংখ্য ঝোড়া ও পাহাড়ি নদীর মতন পরস্পরের সঙ্গে জুড়েছে, খুলেছে, নিবিড় জাল বিছিয়েছে। সমস্ত গুপ্তচর, অনুসন্ধানকারী, প্রকৃতিবিদ, মধু ও কিরাজড়ি সংগ্রহকারী শ্রমিক, মুটে, ভেড়া ও চমরী পালক, লোকগায়ক ও তাঁদের প্রাণ উজাড় করা গান, অধ্যাত্মপিয়াসী আর যোদ্ধাদের গল্প দিনরাত তাড়া করে অলোককে। সেই গল্পমালা খুঁড়ে ছেনে একটা কথামালা গেঁথে তোলার চেষ্টা করেছে সে। তার মাথায় গিজগিজ করে অসংখ্য ছাপা অক্ষরের রাশি, স্থির, অপরিবর্তনীয়, সনতারিখে ডায়েরির পাতায় বাঁধা বিস্মৃত সব ইতিহাসের কুশীলব ও তাদের কীর্তিকাহিনি — তিল তিল করে জড়ো করতে গিয়ে প্রায়ই তার মনের ভেতর নখ আঁচড়ায় একটা দ্বিধা। কেন যেন মনে হয়, একটা সময়ের প্রবাহকে ধরতে চেষ্টা করে যা আসলে আঙুলের ফাঁক দিয়ে বালির মতন ঝরে যাচ্ছে, ছাপা অক্ষরের জাল গলে পিছলে হারিয়ে যেতে থাকে কোনও গভীর গিরিখাতে। অলোক কেবল মুদ্রিত অক্ষর পড়তে পারে — জার্নাল, ক্রনিকল, রিপোর্ট, টেক্সট আর তাঁর নেওয়া অসংখ্য মানুষের সাক্ষাৎকার। কিন্তু সে অনুভব করে যে এসবের বাইরে থেকে যায় এক জটিল গভীর জীবনধারা, যা হয়তো প্রবাহিত হয়। হয়তো কোনও আড়বাঁশির সুরে, যার স্বরলিপি লেখা নেই কোথাও, শুধু মনে ধরা আছে! তিরতিরে জলধারায়, ফার্নের পাতায় শিশিরের শব্দে, ঝিঁঝিঁর ডাক আর নানা অচেনা পাখির ডাকে। লোকগীতির ধ্বনি আর কথা, যা সঞ্চিত থাকে একটি জনগোষ্ঠীর স্মৃতিতে, যুগ যুগ ধরে যা গাওয়া হয় উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে, আগুনের ধারে, গায়ক শ্রোতার অন্তরঙ্গ রক্তের ভেতরে যার অনুরণন হয়ে চলে। তারপর একসময় সেই কণ্ঠস্বরগুলো নিভে যেতে থাকে, হারিয়ে যেতে থাকে লেকের ধারে ছেড়ে রাখা মালবাহী চমরিগুলোর কচিৎ ঘণ্টাধ্বনিতে। ক্রমশ তেল ফুরিয়ে আসা বাতির মতন কথাগুলো নিভে যেতে থাকে হাই তোলার ভেতর, মিঠে অবসাদের ভেতর, হারিয়ে যায় ঝিঝির তান জলধারার ধ্বনির গর্ভে। অলোকের টেবিলে জীর্ণ বইগুলোয় এইসব কথা লেখা নেই। পাতা খুললে মুদ্রিত অক্ষরের ফাঁক দিয়ে বয়ে আসে শুকনো ছত্রাকের বিটকেল গন্ধ, শুকনো কাগজের আলো যেন মরে গিয়েছে কবেই।

অমিতের প্রশ্নে অলোকের অনুভবে জাগে কুয়াশার ভেতর দিয়ে শরৎচন্দ্র দাসের সেই প্রথম তাশিলুক্ষো দর্শন, যেন ফিনফিনে রেশমে ঢাকা কোনও রহস্যময় নারীদেহ, চাঁদের আলোয় দেখা সেই রোমাঞ্ছ কি প্রকৃত সত্য? নাকি তিরিশ বছর পরে শরত যখন শোনেন অন্ধকূপ ভেঙে বের করে আনা ফ্যাকাশে সরীসৃপের মতন মানুষদের, তাঁর সংস্পর্শে — শ্যাওলা আর পাথরের ঘাম চেটে বেঁচেছিলেন যাঁরা, দিনের আলোয় আনতেই সম্ভবতঃ অসংখ্য ফোটনের অনভ্যস্ত চাপে ছটফট করে মারা যান? তিব্বতের নিঃসীম প্রান্তরে রত্নস্ফটিক গলে আসা বিচ্ছুরণের মতন সূর্যাস্তের বর্ণনা সত্য, নাকি তিব্বতের রহস্য উন্মোচনের নামে একটি স্থির নিষ্কম্প সভ্যতাকে বারুদের শক্তিতে ঝিনুকের মতন খুলে দেওয়া? এইসব দোলাচলের ভেতর কিছু একটা আঁকড়ে ধরার আর্তিতেই শরৎ হয়তো তিব্বতি ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বই লেখার কাজ শুরু করেন।

তিব্বতের রহস্য উন্মোচনে অলোকের কাছে সবচাইতে বড় নাম আলেকজান্দ্রা ডেভিড-নীল। সিকিমে অনেকে বলে, এই মহিলা নাকি একটা সময়ে সিকিমের রাজপুত্রের প্রেমে পড়েছিলেন। বালক বয়সে সিকিমের রাজা সিদকিয়ং টুলকু লামা হিসেবে দীক্ষা নিয়েছিলেন গ্যাংটকের কাছে ফোদং গোম্পায়। রাজা ও আলেকজান্দ্রা ডেভিড-নীলের ব্যবহৃত জিনিসপত্রের একটি ছোটো মিউজিয়াম হয়েছে সেখানে। ফ্রান্সের আল্পস পর্বতমালার নীচে ডিনিয়ে নামে একটি গ্রামে বড়ো হয়েছে সে। ছোটো ছোটো পাহাড়ে ঘেরা গ্রাম্য কমিউন, চারিপাশে সবুজ উপত্যকা। এখানেই জীবনের শেষ বছরগুলি কাটিয়েছিলেন আলেকজান্দ্রা ডেভিড-নীল। মৃত্যুর পর তার বাড়িটিতে মিউজিয়াম হয়েছে, সেখানে আছে তার তিব্বতি পুঁথি, থংকা, জপমালা ইত্যাদির সংগ্রহ। গোটা ফ্রান্স জুড়েই কিংবদন্তীপ্রতিম আলেকজান্দ্রা। ১৯৬৯ সালে তিনি মারা যান একশো এক বছর বয়সে। অল্প বয়সে অপেরার নায়িকা হিসেবে জীবন শুরু, বিয়ে করেছিলেন টিউনিশিয়ার এক ধনী রেল আধিকারিককে। কিন্তু এত যশ, বিত্ত - কিছুই এই সুন্দরী অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় যুবতিকে বাঁধতে পারেনি; কারণ তাঁকে হাতছানি দিয়েছিল প্রাচ্য। ১৯১১ সালে ভারতে এলেন, তখন তার মধ্য বয়স, যৌবনের প্রখর সৌন্দর্যে তাঁর প্রজ্ঞা জুড়েছে অসাধারণ এক মেদুর প্রভা। বারাণসী ও কলকাতায় কিছুকাল হিন্দু ধর্মের নানা দিক নিয়ে চর্চা করার পর তিনি যান সিকিমে। সেখানেই যুবরাজ টুলকুর সঙ্গে দেখা ও অনুরাগ। ভারতে আসার আগে থেকেই অবশ্য আলেকজান্দ্রার মূল আকর্ষণ ছিল তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম। এজন্য ইংল্যান্ডে গিয়ে দীর্ঘদিন পড়াশোনাও করেছিলেন। টুলকুর সঙ্গে পরিচয়ের সময় তিনি একজন সুপরিচিত প্রাচ্যবিদ ও ভূপর্যটক। বৌদ্ধধর্মের প্রতি এক ইউরোপীয় নারীর এই প্রবল টান দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলেন যুবরাজ। তিনি নিজেও ফোদং গোম্পায় ধর্মশিক্ষার পর উচ্চশিক্ষা লাভ করেছেন বিলেতে, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। জ্ঞানচর্চায় পারস্পরিক আগ্রহের ভেতর দিয়ে দুজনের সখ্য নিবিড় হয়। সিকিমে দীর্ঘ দু - মাস থেকে গেলেন আলেকজান্দ্রা। সিদকিয়ং টুলকু তাঁর লেখা চিঠিতে আলেকজান্দ্রাকে সম্বোধন করছেন ‘প্রিয় ভগিনী’ বলে। কিন্তু আলেকজান্দ্রার জীবনীকারদের মতে ওদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক হয়েছিল। তাঁর নিজের লেখা বইয়ে যেখানেই টুলকুর কথা লিখেছেন, সেখানেই অলোক দেখেছে এই এই মুগ্ধ আবেশ। রিঞ্চেনপঙের গোম্পায় প্রথম দেখা হবার পর এক অপরূপ বিস্ময়ের ভেতর বাঁচার কথা লিখেছেন আলেকজান্দ্রা।

সেই বিস্ময়ের টানে দ্বিতীয়বার সিকিমে আসেন আলেকজান্দ্রা। সুপুরুষ সিদকিয়ং টুলকু তখন সদ্য রাজা হয়েছেন, উঁচু পাহাড় আর অনড় সংস্কারে ঘেরা দেশের প্রথম পশ্চিমী শিক্ষাপ্রাপ্ত রাজা। রাজঅতিথি হয়ে থেকে আলেকজান্দ্রা দেখেন কী প্রবল উদ্যমে উদার মানবতাবাদী ধাঁচে সমাজ সংস্কার করতে নেমেছেন টুলকু, মদ্যপান নিষিদ্ধ করেছেন, লেপচাদের নিজস্ব লোকধর্ম ও আদিম আচার বন্ধ করে বৌদ্ধধর্ম প্রসারের চেষ্টা করেছেন। ফলে দেশের প্রভাবশালী মহলে অনেকের অপ্রিয় হয়েছেন। সেবার উত্তর সিকিম দিয়ে শিগাৎসে গিয়েছিলেন আলেকজান্দ্রা। তাঁকে বিদায় জানাতে সেবার পাশাপাশি ঘোড়ায় চড়ে অনেকদূর অবধি সঙ্গে যান রাজা। আলেকজান্দ্রার লেখায় সেই কয়েকদিন যাত্রার কিছুটা বিবরণ রয়েছে; রডোডেনড্রনের পাপড়ি-বিছানো সরু পাহাড়ি পথ, জনহীন লোনাক উপত্যকায় একটি লেকের ধারে তাঁবুতে রাত্রিযাপন, চব্বিশ হাজার ফুট উঁচুতে জোংসোং পাস পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গ্যাংটকে ফিরে যান রাজা। তাঁর পরনে ছিল ইউরোপীয় পর্বতারোহীদের মতন আধুনিক পোশাক; বিদায়ের সময় একটি বোল্ডারের আড়ালে হারিয়ে যাওয়ার আগে পেছন ফিরে টুপি খুলে নেড়ে চিৎকার করে বলেন, তাড়াতাড়ি ফিরে এসো আলেক্স! বেশিদিন থেকো না ওখানে!

কিন্তু ওদের দুজনের মধ্যে আর কখনও দেখা হয়নি। মাত্র দশ মাস রাজত্বের পর রহস্যজনকভাবে, বিষক্রিয়ায়, মৃত্যু হয় সিদকিয়ং টুলকুর। অনেকের অপ্রিয় হয়েছিলেন যে!

আলেকজান্দ্রা দুর্গম গিরিপথ পেরিয়ে তাশিলুম্ফায় গিয়ে সাক্ষাৎ করেন নবম পাঞ্চেন লামার সঙ্গে, তারপর উত্তর সিকিমে ফিরে সিদকিয়ং টুলকু নিধনের খবরে মুষড়ে পড়েন। ভগ্নহৃদয়ে উদাস হয়ে ঘুরতে ঘুরতে একদিন লাচেন গ্রামের কাছে গোমচেন নামে এক গুহাবাসী তান্ত্রিক সন্ন্যাসীর শিষ্যা হন। লোকমুখে প্রচারিত ছিল গোমচেনের অলৌকিক ক্ষমতার কাহিনি। গোমচেনের গুহার কাছেই একটি ঝুলন্ত পাথরের নীচে কাঠ আর মাটি দিয়ে মাথা গোঁজার মতন আস্তানা বানিয়ে বরফের রাজ্যে একটানা তিন বছর ধরে তন্ত্রসাধনা করেন আলেকজান্দ্রা। তাঁর বইয়ে তিনি ওই সময়ে বিভিন্ন অতীন্দ্রিয় শক্তি অর্জনের কথা লিখেছেন। এর মধ্যে একটি ছিল ইচ্ছেমতন নিজের দেহে উত্তাপ সৃষ্টি করতে পারার ক্ষমতা। পূর্ণিমার রাতে খোলা আকাশের নীচে বরফগলা ঝর্ণায় স্নান করে রাতভর বিবস্ত্র হয়ে প্রার্থনার মতন কঠিন পরীক্ষাও দিতে হয়েছিল। এদিকে বহির্জগৎ তখন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, ইউরোপে শুরু হয় বিশ্বযুদ্ধ। তিব্বত সীমান্তের মতন সংবেদনশীল অঞ্চলে এক রহস্যময়ী ফরাসি নারীর উপস্থিতিতে সন্দিহান হয়ে পড়ে ব্রিটিশ সরকার, আলেকজান্দ্রাকে ভারত থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু আলেকজান্দ্রাও দমবার পাত্রী ছিলেন না; তাঁর অভীষ্ট ছিল লাহসা। ইতিমধ্যে তিনি লাচেনে থাকাকালীন সময়ে ইয়ংদেন নামে এক চোদ্দ বছরের বালককে দত্তক নিয়েছেন। সেই ইয়ংদেনকে সঙ্গে নিয়ে বর্মা, জাপান, মঙ্গোলিয়া, কোরিয়া ও চীন হয়ে তিব্বতে পেীঁছোন তিনি, লাহসায় গিয়ে দেখা করেন দলাই লামার সঙ্গে।

সুদীর্ঘ বারো বছর ধরে তাঁর সেই যাত্রা ছিল বিচিত্র সব অভিজ্ঞতায় ঠাসা। পূর্ব থেকে পশ্চিমে আড়াআড়িভাবে সুবিস্তীর্ণ চীনদেশ অতিক্রম করার পথে আলেকজান্দ্রা দেখেছেন এক প্রাচীন ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যের ভেঙে পড়া, দেখেছেন অবর্ণনীয় হিংসার ছবি, কখনও সন্ন্যাসিনীর ছদ্মবেশে, কখনও আবার স্থানীয় সামন্তরাজাকে উৎকোচ দিয়ে পার হয়েছেন ঘোর বিপদসংকুল সমস্ত এলাকা, পথে অসুস্থ হয়েছেন, অনাহারে কাটিয়েছেন, এমনকি চামড়ার জুতো সিদ্ধ খেয়েছেন। গোবি মরুভূমি পার হওয়ার সময় আকাশে দেখেছেন এক উড়ন্ত লামাকে, তুষারঝড়ে পথ হারিয়েছেন, শীতের মাঝামাঝি সময়ে দুর্ভেদ্য গিরিপথ পেরিয়েছেন। শেষপর্যন্ত লাহসায় গিয়ে পৌঁছেছেন এক ভিখারিনীর ছদ্মবেশে: পরণে নোংরা ছেড়াখোঁড়া কম্বল, শরীরের চামরা বাদামি হয়ে ওঠা, চুলে বহুকালের জটা। লাহসার নগরদ্বারে পাহারাদারেরা চিনতেই পারেনি। সেটা ছিল ডিসেম্বর, ১৯২৪। আলেকজান্দ্রার বয়স তখন ৫৬।

এই অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার ঝুলি আর ইয়াংদেনকে সঙ্গে নিয়ে নিজের দেশে ফিরে গিয়ে তিনি আল্পসের পাদদেশে ডিনিয়ে গ্রামে শেষজীবন কাটিয়েছেন। ওই গ্রামের প্রকৃতিও নাকি অনেকটা পশ্চিম সিকিমের মতন – পাহাড়, উপত্যকা আর সাব-আল্পাইন বৃক্ষগুল্ম। সেখানে একটি পাহাড়ের ঢালে তাঁর বাড়ি। সেখানে বসেই তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম, তন্ত্র, জাদু – ইত্যাদি নিয়ে কুড়িটিরও বেশি বই লিখেছেন।

তারপরও তিনি একাধিকবার বেরিয়েছেন, চীন, জাপান হয়ে দীর্ঘপথ ঘুরে আরেকবার ভারতে এসেছেন, সিকিম ও দার্জিলিং-এ এসেছেন কয়েকবার। ১৯৫৫ সালে ইয়ংদেনের অকালমৃত্যুতে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন, তবু শেষদিন পর্যন্ত লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন। মৃত্যুর এক বছর আগে, একশো বছর বয়সেও তিনি ফরাসি সরকারের কাছে নতুন করে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছিলেন। তিব্বতে যেতে চেয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালে মৃত্যুর পর তাঁর ইচ্ছামতন, তাঁর ও ইয়ংদেনের চিতাভস্ম ভারতে এনে বারানসীর গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

ইতিমধ্যে পৃথিবীটা বদলে গিয়েছে। মানচিত্রে আর তেমন কোনও অনাবিষ্কৃত অঞ্চল নেই। কিন্তু মানুষের মনে তো আছে, চিরকাল মানুষের মনে অনেক কিছু অনাবিষ্কৃত থেকে যাবে বলে বিশ্বাস অলোকের। সে কল্পনা করার চেষ্টা করে আল্পসের পাদদেশে ডিনিয়ে গ্রামে আলেকজান্দ্রার সেই বাড়িটার কথা, যার জানালা দিয়ে পশ্চিম সিকিমের মতন প্রকৃতি দেখা যায়। কখনও স্মৃতির কুয়াশার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতো ছোট্ট ঘোড়ার পিঠে চেপে দুলকি চালে এগিয়ে আসা এক রাজপুরুষ; তাঁর জরিবসানো কমলা পোশাক, মুকুটে হিরের চমক। পেছনে সারিবদ্ধ অনুচরদের পরনে রামধনু রঙের পোশাক। আবার কখনও স্মৃতির কুয়াশার ভেতর দিয়ে দেখতে পেতেন ঢাল বেয়ে নেমে আসছে লাল খয়েরি লামার পোশাকে উদ্দীপ্ত কিশোর ইয়ংদেন আর তার পেছন পেছন হাসিখুশি একঝাঁক কচি লামা। তাঁর দু’চোখ বাস্পাচ্ছন্ন হতো, আর একটু পরেই দু’গাল বেয়ে নেমে আসতো মুক্তোধারা।

অলোক নিশ্চিত, আলেকজান্দ্রা ডেভিড নীল যা যা লিখে গেছেন, তার সবটাই ঐতিহাসিক নয়, অনেক কিছুই মনের মাধুরী মেশানো।


ক্রমশ ...