রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

মহাসত্যের বিপরীতে, পর্ব ২১

# একুশ

‘তোমাকে উপহার দেবো

ত্রিকোণ ধাঁধা,

যেখানে লুকিয়ে আছে অতীত

ঘটে চলেছে বর্তমান

ঘুমিয়ে আছে ভবিষ্যৎ

এবার ভেদ করো

কালের সীমানা’

– পদ্মশ্রী মজুমদার

শরত অনুভব করে, রিনপোচে ক্রমে তাকে একটি ধাঁধার দিকে, সময়ের ত্রিপাদ ভূমির দিকে টেনে নিয়ে চলেছে।

জর্জ বোগলের লেখা পড়েই প্রথম পণ্ডিত শরৎচন্দ্র দাসের মনে তিব্বত যাওয়ার ইচ্ছা জাগে। তাশিলুম্ফোর দৃশ্য সচক্ষে দেখে সে মনে মনে তাকে স্যালুট জানায়। জর্জ বোগল লিখেছিল, ‘প্রাসাদের প্রশস্ত ছাদগুলো তামায় মোড়া। ইমারতগুলো সব কালচে ইটের তৈরি। শহরের ঘরবাড়িগুলো অধিকাংশই পরস্পরের গায়ে লাগা। সেগুলির মাঝে গিল্টি করা সুদৃশ্য মন্দিরগুলোর দুপাশে কিছুটা ফাঁকা জায়গা। পাথরে মোড়া প্রশস্ত উঠোনগুলির চারপাশে ধাপ-কাটা, সরু গলিপথগুলিও পাথরে বাঁধানো। সব মিলিয়ে এক অসাধারণ রাজকীয় দৃশ্য!’

তারপর কেটে গিয়েছে একশো বছর। অথচ শরতের মনে হয়, তাঁর পড়া তাশিলুম্ফোর সেই দৃশ্য রয়ে গিয়েছে অমলিন ও পরিবর্তনহীন, তবে রাজকীয় নয়, এ যেন মানুষের তৈরি এক অনুপম নৈসর্গ!

এক হাজার ফুট নীচে বিস্তীর্ণ উপত্যকার বুকে সটান দাঁড়িয়ে তাশিলুম্ফোর মন্দির, মঠ আর সমস্ত আবাসগৃহ। মেঘমুক্ত আকাশে আশ্চর্য বর্ণময় সূর্যাস্ত, আর নীচে অসংখ্য চোর্তেন। সৌধ, প্রাসাদ ও সমাধির গিল্টি-করা চুড়োয় সোনালি আলো পড়ে ঝিকমিক করছে।

জর্জ বোগল তাঁর দেখার বর্ণনা ডাইরিতে লিখেছিল, সে ছিল বৃটিশের দূত। শরৎচন্দ্র দূত না হলেও তার সঙ্গে কিন্তু ক্যামেরাও ছিল। পাঞ্চেন লামার প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অতিথি হয়ে শিগাৎসের কাছে খাংসারে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির বাড়িতে অতিথি হয় সে। সেখানেই রিনপোচের সঙ্গে পরিচয়। এমনিতে অসংখ্য তিব্বতি নারীপুরুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল, তাঁদের কথা ভ্রমণবৃন্তান্তে আছে। কিন্তু হয়তো নিরাপত্তার কথা ভেবেই প্রায় কারোও নাম উল্লেখ নেই; কয়েকটি ক্ষেত্রে পদমর্যাদাসূচক খেতাবটি রয়েছে। ব্যতিক্রম রিনপোচে - খাংসারে গৃহকর্তার পুত্রবধু, দুই ছেলের একমাত্র স্ত্রী। তাঁর বয়স তখন বছর কুড়ি। নম্র স্বভাবা, চেহারায় বুদ্ধিমত্তার ছাপ। তাঁর তত্ত্বাবধানে দাসীরা অতিথিদের সেবার ব্যবস্থা করেন। পরিচয়ের পর প্রথম বাক্যালাপ শুরু করে উগেন, — তিব্বতের কোন পরিবারের মেয়ে গো তুমি?

— আপনি কুশো মানকিপার নাম শুনেছেন?

— কুশো মানকিপা? একজন মানকিপাকে আমি চিনি, তিনি সিকিমের রাজার মামা!

- হা তিনিই আমার বাবা - গত বছর দেহ রেখেছেন, এমনই দুর্ভাগ্য আমার, শেষ দেখাও দেখতে পেলাম না!

একটু থেমে, গভীর শ্বাস নিয়ে রিনপোচে বলে,- আপনি কি আমার পিসতুতো দাদা দেনজং গ্যালপোর প্রজা?

ইতিবাচক মাথা নাড়ে উগেন। রিনপোচে বলে, কতকাল হল পিসিমাকেও দেখি নি, তিন বছর হল বিয়ে হয়েছে, এর মধ্যে একেবারে জন্যেও দেশে যাইনি!

রিনপোচের গলা ধরে আসে। আবেগে চোখদুটো চিকচিক করে ওঠে। অবনত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। শরৎ ও উগেন পরস্পরের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করে। গৃহকর্তার ছেলেরা ব্যবসার কাজে লাহসায় গিয়েছে। চামড়া ও ধাতুর ব্যবসা ছাড়াও শিগাৎসে প্রদেশে একাধিক খামার আছে এদের। কারুকার্যময় পপলার কাঠে তৈরি ছিমছাম সাজানো বাড়িটিতে বৈভবের ছাপ স্পষ্ট। রাতে বাড়ির একটি বড়ো ঘরে ভোজের আয়োজন। সিলিঙের মাঝামাঝি আলোর অলিন্দ, মেঝে জুড়ে পুরু খাম্বা কার্পেট বিছানো।

শরতকে অবাক করে দিয়ে খাবার পরিবেশন হয় চীনা কায়দায়, তামার বড় বাটিতে, সঙ্গে চপস্টিক আর চামচ। প্রথমে আসে গ্যা - তুগ - ময়দা আর ডিম দিয়ে তৈরি ফিতের মতন, ভেড়ার মাংসের কিমা দিয়ে রান্না করা, সঙ্গে স্যুপ। দ্বিতীয় দফায় আসে ভাত ও প্রায় ছয় প্রকার মাংসের কারি, সঙ্গে সবজির আচার, সাদা ও কালো ছত্রাক, সবুজ চিনে ঘাসের একটি পদ, আলু আর তাজা মটরশাকের তরকারি ও ন্যুডলস। উগেন তাকে ধীরে ধীরে খাওয়ার ইঙ্গিত করে। তৃতীয় দফায় আসে মিষ্টি পোলাও। ততক্ষণে শরতের পেট ভরে গেছে। সে উগেনের দিকে তাকালে উগেন মৃদু হেসে আরও ধীরে খেতে বলে। চতুর্থ দফায় আসে সিদ্ধ ভেড়ার মাংস, ৎসাম্পা ও অবশেষে চা।

ভোজনপর্ব চলে দীর্ঘক্ষণ ধরে, সম্পূর্ণ নীরবে, ভৃত্যেরা চুপচাপ একের পর এক পদ পরিবেশন করে যায় । খাওয়া শেষ হলে উগেন নীচুম্বরে জানায়, বিশেষ ভোজের অনুষ্ঠানে এদেশে কখনও এমনকি তেরো দফায় খাবার পরিবেশন করা হয়। খাওয়ার পরে অতিথিদের নিয়ে যাওয়া হয় পাশের একটি ঘরে। সেখানে রয়েছেন আং-লা, বাড়ির কর্ত্রী বা কর্তার অশীতিপর মা। ঘরের একদিকের দেওয়ালে সারি দিয়ে তিব্বতি মুখোশ কালো কাপড়ে ঢাকা, মাঝখানে তামার আঙিঠিতে কাঠকয়লা জ্বলছে। তার কমলা আভায় আং - লার বরফের মতন সাদা চুলে ঘেরা বিশীর্ণ মুখটি যেন এক সুদূর হিমবাহের খাঁজে প্রাচীন পশুপালকের ছাউনি। তিনি হাত তুলে শরৎকে আঙিঠির তাপের কাছে এসে বসতে বলেন। একপাশে বসে গৃহকর্তা, তাঁর স্ত্রী, সামান্য পিছনে হাঁটু মুড়ে বসে রিনপোচে।

বৃদ্ধার কথা ঠিকমতন বুঝতে পারে না শরৎ। যদিও সে উগেনের কাছে শিখে প্রামাণ্য তিব্বতি ভাষা ভালোভাবেই আয়ত্ত করেছে। কিন্তু আং - লার কথ্যতিব্বতি ভাষা বুঝতে অসুবিধা হওয়ায় উগেন দোভাষির কাজ করে।

আং - লা বলেন, — 'পবিত্র গ্রন্থ থেকে আমরা জেনেছি আর্যাবর্তের পণ্ডিতদের কথা। ধর্মের বাণী প্রচার সুত্রে তারা গিয়েছেন বিশ্বের দিকে দিকে। আজ আমাদের পরম সৌভাগ্য যে তেমন একজন পণ্ডিতকে কাছে পেয়েছি '!

তোবড়া গালে মিষ্টি হাসেন তিনি। শীর্ণ, জরাগ্রস্ত দেহ থেকে উদ্গত আশ্চর্য সতেজ কণ্ঠস্বর শুনে বিস্মিত হয় শরৎ। সে বিনীতভাবে বলে, -' সৌভাগ্য আমাদের, প্রকৃতির কঠিন বাধা পার হয়ে এই পবিত্রভূমিতে আসতে পেরেছি '!

এরপর কাংলাচেন পাস পেরিয়ে আসার পথের অভিজ্ঞতা নিয়ে গল্প হয়। শীতের শুরুতে ওই পথ যে সত্যিই অগম্য এবং শরতেরা প্রায় অসাধ্য সাধন করেছে, সেজন্যে ঈশ্বরকে প্রণাম জানিয়ে ধন্যবাদ দেয় গৃহকর্তা। সে বলে, মনের জোর আর তথাগতের অসীম কৃপাতেই আপনারা এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পেরেছেন। আপনারা মহাপূণ্যবান!

আং - লা ওদের কাছে বারাণসী, কপিলাবস্তু ও বুদ্ধগয়ার মতন নগরগুলি সম্পর্কে জানতে চান, যাদের স্থানমাহাত্ম্যের কথা তিনি আশৈশব শুনে আসছেন। দু - চার কথায় ভারতে বৌদ্ধধর্মের অবস্থার কথা জানায় শরৎ। বর্তমানে ইংরেজদের রাজ্যপাট, কিছুকাল আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির থেকে ভারতের শাসনভার নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন ব্রিটেনের রানি, তারও আগে দীর্ঘকাল ছিল মুঘলদের শাসন। সেই আমলে হিন্দু আর বৌদ্ধদের পবিত্র মন্দির বিহার চৈত্যগুলি ধ্বংসাবশেষে পরিণত হওয়ার কাহিনি শুনে আং-লা চোখের জল ফেলেন।

এই ভারী হয়ে যাওয়া পরিবেশকে হাল্কা করতেই গৃহকর্তা বলে ওঠে,

- 'আর্যাবর্তের পণ্ডিতেরা হাতের রেখা দেখে মানুষের অতীত ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলতে পারেন। আজ যখন তেমন একজনকে পেয়েছি, আমি চাই, আপনি আমার ও আমার স্ত্রীর হাতের রেখা দেখুন '!

এবার শরৎ ফাঁপরে পড়ে। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা মানুষটিকে কিনা হাত দেখতে হবে ! পশ্চিমী জ্ঞানচর্চায় দীক্ষিত, কিন্তু হস্তরেখা দেখে ভাগ্যগণনার শাস্ত্রটি তাঁর জানা নেই, বিশ্বাস তো দূরের কথা। কিন্তু এই ব্যাপারে তিব্বতিদের গভীর আগ্রহের ব্যপারটা সে জর্জ বোগলের ডায়েরিতে পড়েছে। এই সহজ সরল মানুষদের বিশ্বাসভংগ করতে মন সায় দেয় না, নিজেদের নিরাপত্তার খাতিরে সেটা সমীচীনও নয়। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে বলে,

- 'যদিও এই বিদ্যাটা সামান্য চর্চা করেছি, কিন্তু মানুষের ভাগ্যবিচারের ব্যাপারে হাতের রেখা খুব একটা সাহায্য করতে পারে বলে মনে করি না! আর তাছাড়া ভবিষ্যৎ জীবনের দুর্দশা জানার থেকে খারাপ আর কিছুই হতে পারে না। মানবজীবন যন্ত্রণায় ভরা, পুনর্জন্ম থেকে চিরমুক্তির জন্যই প্রভু বুদ্ধ নির্বাণের সাধনা করেছিলেন! এই ভাষণ শুনে পরিবারের সবাই মুগ্ধ হলেও গৃহকর্তা নাছোড়।

হাত বাড়িয়ে ধরে বিনীতভাবে অনুরোধ করেন, - তবু আমার আয়ু সম্পর্কে যদি বলেন, অপঘাতে মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকলে পূজার্চনার ব্যবস্থা করতে পারি!

শরৎ ভাবে, কীভাবে প্রত্যাখ্যান করি? কীভাবেই বা মিথ্যা ভবিষ্যৎবাণী করি?

সে বাধ্য হয়ে গৃহকর্তার হাতের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে, - আপনার আয়ুরেখা স্পষ্টতই দীর্ঘ, আর সৌভাগ্যের ব্যাপারেও ঈশ্বর আপনার প্রতি সদয়!

অলক ভাবে, বৃদ্ধা আং-লার মনশ্চক্ষে এক সময়হীন মন্দির - বিহার - সৌধ - নগরে গরীয়ান ভারতবর্ষের পটে যে ধ্বংসাবশেষের ছবি আঁচড়ে তুলেছিলেন শরৎচন্দ্র দাস, যা মহিলার চোখে জল এনেছিল, কতটা তীব্র আবেগমথিত আর অনুপুংখ ছিল সেই চিত্র? কতটা ইতিহাস আর কতটা ধারণা নির্ভর? তখন ছিল উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ। তার বেশ কিছুকাল আগে থেকে দেশের নানা অরণ্য আর মাটির ঢিবি কিম্বা পাথরের স্তুপের ভেতর থেকে উঠে আসছে আশ্চর্য সব পুরাতাত্ত্বিক কীর্তি। সেগুলি থেকে নতুন রচিত বিশেষ ঔপনিবেশিক ইতিহাসদৃষ্টির সংস্পর্শে এসেছিল শরৎ। সেজন্যে শুধুই গোয়েন্দাগিরির সরকারি দায়িত্ব পালন করতে সে এত ঝুঁকি নেয় নি। দুর্গম পথে জীবন বিপন্ন করে তাঁর তিব্বতযাত্রা সম্ভবত এক স্থির নিষ্কম্প্র অতীতের সন্ধান, যা হিমালয়ের সুউচ্চ প্রাচীরের আড়ালে শীতল বিশুষ্ক উচ্চভূমিতে অটুট অবিকৃত ছিল এক ইতিহাস বিচ্ছিন্ন কালের গর্ভে। সেই অটুট আবহমানকেই হয়তো আবিষ্কার করতে গিয়েছিল শরৎ। অপরদিকে, তিব্বতে যারা তাকে সাদরে গ্রহণ করেছিল, তারা দেখেছিল এক শাশ্বত পবিত্রভূমি থেকে আসা পুণ্যাত্মাকে।

শরৎও কি তাঁদের সেভাবে দেখেছিল? ব্রিটিশ গুপ্তচর হিসেবে তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে একবারও বিস্মৃত হয়নি সে। চলতে চলতে দেখা এবং দেখতে দেখতে লেখা, লেখার মধ্যে নিজেকে চরিত্র হিসেবে স্থাপন করা, নৈর্ব্যক্তিক অথচ নির্লিপ্ত নয়, সম্পূর্ণ নতুন এক প্রত্যক্ষবাদী পাশ্চাত্য বীক্ষায় যাত্রাপথের প্রতিটি পদক্ষেপ জপমালায় গুণে পথের দৈর্ঘ্য মেপেছে, নদীর বিস্তার, গিরিপথের উচ্চতা জরিপ করেছে, জীবজন্তু উদ্ভিদ পাথর থেকে শুরু করে প্রতিটি প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুপুঙ্খ লিপিবদ্ধ করেছে। পথে যাঁদের সংস্পর্শে এসেছে, তাঁদের আচার-আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি খুঁটিয়ে দেখে লেখার চেষ্টা করেছে।

খাংসারে সন্ধা গড়িয়ে রাত হয়ে এলে বাড়িটা নিঝুম হয়ে আসে, শুধু বাইরের উন্মুক্ত প্রান্তরের শোঁ শোঁ হাওয়ার শব্দ। দোতলার যে শোবার ঘরটি শরতের জন্য বরাদ্দ হয়েছে তার জানলার মাঝখানে এক টুকরো কাচ, চারিপাশে পার্চমেন্ট সাঁটা। এখানকার সব অবস্থাপন্ন মানুষের বাড়িতেই এমন থাকে। বাইরে চাঁদ উঠেছে, কাচ ভেদ করে ক্ষীণ হলুদাভ জ্যোৎস্নার আভা এসে ঢুকছে ঘরে। কুলুঙ্গিতে মাখনের দীপ আর জ্বলন্ত আঙ্গিঠির আভার সঙ্গে মিশে এক বিচিত্র আবহ সৃষ্টি হয়েছে। কাচের ভেতর দিয়ে বাইরে তাকালে চাঁদ দেখা যায় না, নীচে বাড়ির ভিতর উঠোনের একফালি অংশ, মসৃণ নুড়ি পাথরে বাঁধানো। সেই পাথরের ওপর জ্যোৎস্না চিকচিক করে, তারই প্রতিফলিত আলো ঘরে ঢুকেছে। উঠোনের এক কোণে কুচকুচে কালো একটি ম্যাস্টিফ কুকুর শিকলে বাঁধা। সেই কুকুরটি ঘুমিয়ে পড়লে গোটা বাড়িটাই ঘুমিয়ে পড়ে। দোতালায় টানা নীচু কাঠের বারান্দা অন্ধকারাচ্ছন্ন, তার শেষপ্রান্তে অন্দরমহলে একটি ঘরে সম্ভবতঃ লম্ফ জ্বলছে। কাঠের কারুকার্যময় ঝিল্লির ওপাশে আলোটিকে রহস্যময় ফানুসের মতন লাগে।

হঠাৎ কাঠের মেঝেয় খসখস পায়ের শব্দে ঘোর কাটে শরতের। চায়ের পাত্র হাতে নিয়ে এসেছে রিনপোচে স্বয়ং। তিব্বতিরা সাধারণত জল খায় না, এমনি জল খেলে নাকি অসুস্থ হবার সম্ভাবনা। সাধারণ মানুষ তাই ছাং খেয়ে তৃষ্ণা মেটায়, সম্পন্নরা খায় চা।

রিনপোচে বলে, -পণ্ডিতের বিশ্রামের ব্যাখ্যাত করলাম না তো?

শরৎ হেসে বলে, - একেবারেই না, আমি জানলা দিয়ে জ্যোৎস্নার দৃশ্য উপভোগ করছিলাম!

রিনপোচে মাথা নেড়ে বলে, - হ্যাঁ , আজ ত্রয়োদশী, আকাশে মেঘও নেই!

একটু থেমে সে আবার বলে, - আমি কিন্তু একটি বিশেষ প্রার্থনা নিয়ে এসেছি!

রিনপোচের আওয়াজে এমন কিছু ছিল যে শরৎ তার দিকে সরাসরি তাকায়। সন্ধ্যার সেই পশমী চুবুর বদলে একটি সাদা রেশমের গাউনের মতন পোশাক পরনে, তাতে রুপোর জরির কারুকাজ। রেশমের আড়ালে গলায়, বাজুবন্ধে স্বর্ণালঙ্কার চিকচিক করছে; মাথার চুল খোলা। অদ্ভুত অপার্থিব দেখাচ্ছে তাকে।

সে বলে, — আমি আমার ভবিষ্যৎ জানতে চাই!

শরত সসম্ভ্রমে বলে, - ঈশ্বর যে আপনাকে উদার হাতে দিয়েছেন, সে তো বলার অপেক্ষা রাখে না। ভবিষ্যৎ জানার এই ব্যাকুলতা কেন, রিনপোচে?

  • রিনপোচে !

নিজের নাম উচ্চারণ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহিলা বলে - রিনপোচে নামটি আমার শাশুড়ি দিয়েছে, আমার বাপের বাড়িতে অন্য নাম ছিল!

শরত বলে, - রিনপোচে মানে হল - অমূল্য রত্ন, খুবই উপযুক্ত নাম ! আপনার শাশুড়ি দূরদৃষ্টিময়ী, আপনার শ্বশুরও একজন পুণ্যবান মানুষ, আপনার দুই উজ্জ্বল স্বামী, এই প্রাসাদোপম বাড়ি, এত ধনসম্পত্তি –

আচমকাই রিনপোচে দু’পা এগিয়ে এসে মেঝেতে হাঁটু মুড়ে শরতের সামনে বসে পড়ে দ্রুত বলতে শুরু করে,- এরা ধনী , কিন্তু চাষির মতন পরিশ্রম করতে হয়। আমার স্বামীরা বছরের বেশিরভাগ সময় ব্যবসার কাজে দূরদূরান্তে থাকে, আমাকে শাশুড়ির হুকুম মেনে উদয়াস্ত কাজ করতে হয় - কার্পেট বোনা, দাসদাসীদের পরিচালনা করা, রান্নার তদারকি . . . বাড়ি থেকে বেরোনোর কোনও উপায় নেই। বেরোলেও কিছু নেই, চারিদিকে কেবল ধূ ধূ রিক্ত উপত্যকা – ছুরির মতন হাওয়া চলে দিনরাত। আমার চামড়া ফেটে রক্ত ঝরে। আমার বাপের বাড়ির দেশ এমন নয়, সেখানে বাড়ির মেয়ে বউরা এমন পরিশ্রম করে না। আহ , কত কাল আমি বাপের বাড়ি যাইনি। অনেক দূরের দেশ, জানেন তো?

শরৎ বলে, - জানি , সিকিমের রাজপরিবারের মেয়ে আপনি!

- হ্যা , চুম্বি উপত্যকায় আমার দেশ। সেখানে প্রকৃতি সজীব, সরস। তিনবছর হয়ে গেল আমি সবুজ উপত্যকাভূমি দেখিনি, অরণ্যে ঢাকা পাহাড় দেখিনি!

একটু থেমে সে আবার বলে, - ফেরার পথে আমায় নিয়ে যাবেন আমার বাপের বাড়ি?

এর কী উত্তর হয়? একজন নারী নিজের পরিবার পরিজন থেকে দূরে এসে বিরহ কাতরতা অনুভব করছে, উষর প্রকৃতির মাঝে বন্দি হয়ে নিজের সবুজ মাতৃভূমির প্রতি টান অনুভব করছে। শরৎ দ্বিধাগ্রস্ত হয়। সেই ফাঁকে ডান হাতটি প্রসারিত করে নিজের উরুর ওপর রাখে রিনপোচে। শরৎ দেখে একটি হাত, নিরাভরণ, হাতির দাঁতের মতন মসৃণ, রুপোলি জরির কাজ করা রেশমি হাতার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে।

শরৎ জিজ্ঞেস করে, — এমন উৎকৃষ্ট জরি বসানো রেশমের কাপড় ভারতের কোন শহরে তৈরি হয় জানেন?

রিনপোচে এই প্রশ্নের কোনও উত্তর দেয় না। তার দৃষ্টি শরতের মুখের ওপর নিবদ্ধ , উর্ধ্বাঙ্গে এক করুণ প্রার্থনার ভঙ্গি ফুটে ওঠে। ইতিমধ্যে ঘরের ভেতর জ্যোৎস্নার আভা আরও গাঢ় হয়। রিনপোচেকে দেখে মনে হয় যেন সেই আলো জমিয়ে তৈরি এক কুহেলিকা, তার পোশাকটি যেন উজ্জ্বল কুয়াশা দিয়ে বোনা। আর আঙিঠির থিরথির করে কাঁপতে থাকা আভায় কুয়াশার আড়ালে গিল্টি - করা মঠনগরীর আভাস তাকে স্পন্দিত করে। শরৎ স্খলিত স্বরে বলে, - বারাণসী!

তারপর একবার জোরে শ্বাস নিয়ে হাঁটু মুড়ে রিনপোচের মুখোমুখি বসে তার উষ্ণ আর পালকের মতন নরম হাতটি নিজের হাতে তুলে নেয়। শরতের নিজের হাতটি বরফশীতল হলেও সে টের পায়, ক্রমে এক অচেনা চিকন ঘামে ভিজে উঠেছে !