রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

মহাসত্যের বিপরীতে, পর্ব ১৯

ঊনিশ

অসংখ্য আগুনে পুড়েছি;/ হিমালয়! তোমার শীতলতা থেকে /একটু ধার চাইছি!/ যেন বঞ্চিত না হই!/ সংঘর্ষ ও যন্ত্রণার থেকে বিশ্রাম চাইছি।/ সেই মুহূর্তগুলি সেখানেই রয়ে গেছে/ এবার একটা নতুন মুহূর্ত চাইছি।

- বীরভদ্র কার্কিঢোলি (যন্ত্রণা থেকে বিশ্রাম চাইছি # অনুবাদ # ভক্ত সিং ঠকুরী)

এক হাজার ফুট নীচে বিস্তীর্ণ উপত্যকার বুকে সটান দাঁড়িয়ে তাশিলুম্ফোর মন্দির মঠ আর সমস্ত আবাসগৃহ। মেঘমুক্ত আকাশে আশ্চর্য বর্ণময় সূর্যাস্ত, আর নীচে অসংখ্য চোর্তেন। সৌধ প্রাসাদ ও সমাধির গিল্টি-করা চুড়োয় সোনালি আলো পড়ে ঝিকমিক করছে।

জর্জ বোগলের লেখা পড়েই প্রথম শরৎচন্দ্র দাসের মনে তিব্বতযাত্রার ইচ্ছা জেগে উঠেছিল। অথবা বলা যায় যে, তাঁর মনে এই ইচ্ছা জাগানোর জন্যেই তাকে বোগলের বই পড়তে দেওয়া হয়েছিল।তাশিলুম্ফোর দৃশ্য দেখে জর্জ বোগল লিখেছিলেন,

  • ‘প্রাসাদের প্রশস্ত ছাদগুলো তামায় মোড়া। ইমারতগুলো সব কালচে ইটের তৈরি। শহরের ঘরবাড়িগুলো অধিকাংশই পরস্পরের গায়ে লাগা। সেগুলির মাঝে গিল্টিকরা সুদৃশ্য মন্দিরগুলোর দুপাশে কিছুটা ফাকা জায়গা। পাথরে মোড়া প্রশস্ত উঠোনগুলির চারপাশে ধাপ-কাটা, সরু গলিপথগুলিও পাথরে বাঁধানো। সব মিলিয়ে এক অসাধারণ রাজকীয় দৃশ্য'। কিন্তু শরতের মনে হয়, রাজকীয় নয়, এ যেন মানুষের তৈরি এক অনুপম নৈসর্গ!

তারপর কেটে গিয়েছে একশো বছর। মাঝে ১৭৯২ সালে নেপালের সঙ্গে যুদ্ধের পর থেকে ভিনদেশিদের জন্য নিষিদ্ধ দেশ হয়ে পড়ে তিব্বত। সেই যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গোর্খাদের পক্ষ নিলে জর্জ বোগলের এত পথশ্রম একরকম বিফলে যায়। তাঁর হাতে গড়া ব্রিটিশ-তিব্বত মৈত্রী সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান হলে এদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল রানি ভিক্টোরিয়ার সাম্রাজ্যের শাসনাধীন হয়ে পড়ে। একশো বছরে পৃথিবীটাও অনেক বদলে যায়। ফরাসি বিপ্লব ইউরোপকে বদলে দেয়, আমেরিকায় গৃহযুদ্ধের পর জন্ম নেয় নতুন যুক্তরাস্ট্র। শিল্পবিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপে, বাষ্পচালিত জাহাজ আর রেলইঞ্জিন আমূল বদলে দেয় দূরত্বের ধারণা, পৃথিবীর মানচিত্রে সাদা শূন্যস্থান খুব বেশি আর বাকি থাকে না। জর্জ বোগল যে-বছর তাশিলুম্ফোয় গেলেন, তার ঠিক আগের বছর জেমস কুক পা রেখেছেন দক্ষিণ গোলার্ধের এক অজানা ভূখণ্ডে, আদিম আরণ্যক প্রকৃতির মাঝে বহু বিচিত্র প্রাণী, উদ্ভিদ ও জনজাতির মানুষের মহাদেশ অস্ট্রেলিয়া। শরৎচন্দ্র দাস যখন তিব্বতের পথে পা বাড়ালেন, ততদিনে সেই অস্ট্রেলিয়া ব্রিটিশ উপনিবেশ, আদিম জনজাতির মানুষ বিলুপ্তপ্রায়। অথচ এতকিছুর মধ্যে তাশিলুম্ফোর সেই দৃশ্য রয়ে গিয়েছে অমলিন ও পরিবর্তনহীন।

১৭৭০ সালে দীর্ঘ জাহাজযাত্রার শেষে কলকাতায় এসে পেীছে বাংলাদেশে এক ভয়াবহ মন্বন্তর দেখেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরুন রাইটার জর্জ বোগল। তার কিছুকাল আগে মুর্শিদাবাদের নবাবী শাসন শেষ হয়েছে, রাজ্যপাট এসেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। কোম্পানির নতুন করের বোঝায় গ্রামের কৃষিজীবী মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত, বিলিব্যবস্থা ভেঙে পড়ে , সেই সঙ্গে যোগ হয় অজন্মা। একমুঠো অন্নের জন্য গ্রামদেশে বুভুক্ষু মানুষের হাহাকার বোগলকে ঝাঁকিয়ে দেয়। গ্রামবাংলার মন্বন্তরের ভয়াবহতা অবশ্য কলকাতা শহরে তেমন ছিল না। তখনও রেলপথ হয়নি, সড়ক যোগাযোগও তেমন উন্নত নয়। পরবর্তীকালের মন্বন্তরগুলোর মতন কঙ্কালসার মানুষের ঢেউ আছড়ে পড়েনি কলকাতায়। তবু খবর আসছিল চারদিক থেকে যে, কোম্পানির শাসনভুক্ত বাংলার গ্রামাঞ্চল শ্মশানভূমি হয়ে পড়েছে। তার সামান্য অভিঘাতে ব্যথাতুর হয়ে সেপ্টেম্বর মাসে তিনি তাঁর বাবাকে চিঠিতে লিখেছেন,- প্রতিদিন প্রায় দেড়শো মৃতদেহ পড়ছে কলকাতার রাজপথে, নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে সেগুলো। গ্রামবাংলার অবস্থা আরও ভয়াবহ। মানুষ খাদ্যের অভাবে ঘাসপাতা খাচ্ছে, এমনকি ধর্মের অনুশাসন উপেক্ষা করে পশুর মাংসও খাচ্ছে। কোথাও কোথাও মনুষ্যদেহ ভক্ষণের খবরও শোনা যাচ্ছে।

এই অভিজ্ঞতা জর্জ বোগলের মনে গভীরভাবে দাগ কাটে। তখনও কলকাতায় কোম্পানির বেতনভুক রাজকর্মচারীদের জীবন খুব একটা সুখের ছিল না। বাগানঘেরা গুটিকয় বাংলোর সাহেবপাড়া ছেড়ে বেরোলেই নেটিভদের ব্ল্যাক টাউন: ধুলোকাদাময় পথঘাট, টালি-খাপরার বাড়ি, দুর্গন্ধ, মশামাছি, ম্যালেরিয়া আর আন্ত্রিকের প্রকোপ। কলকাতা তখনও চোখ ধাঁধানো মহানগর হয়ে ওঠেনি। চারিদিকে অব্যবস্থা আর নৈরাজ্যের ছবি। ছবিটা পাল্টাতে শুরু করে বছর দুয়েকের মধ্যেই, যখন গভর্নর জেনারেল হয়ে আসেন সুপ্রশাসক ওয়ারেন হেস্টিংস, শক্ত হাতে ধরেন শাসনব্যবস্থার রাশ, প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল আনেন তিনি। এইসময়ে জর্জ বোগলকে বোর্ড অব রেভেনিউ-র অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি পদ দেওয়া হয়। গভর্নর জেনারেলের সঙ্গে রাজ্য পরিদর্শনের কাজে যাবার সুবাদে তাঁর বিশেষ স্নেহভাজন হয়ে ওঠেন তরুণ এই অফিসার। তখন জলপথে ক্যান্টনের জাহাজঘাটা দিয়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বড়ো মাপের ব্যবসা ছিল চীনের সঙ্গে। কিন্তু সেই লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করতেন চীনের সম্রাট, শুল্ক দিতে হতো কোম্পানিকে। তাছাড়া বাংলা থেকে আফিম রপ্তানির ব্যাপারেও বন্দর শহরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সম্রাট। বিকল্প পথটি ছিল তিব্বত ঘুরে। তিব্বত থেকে ভুটান ও নেপালের গিরিপথ হয়ে ভারতে গাঙ্গেয় উপত্যকায় বিভিন্ন জনপদের সঙ্গে বাণিজ্যের প্রচলন ছিল দীর্ঘকাল ধরেই। তিব্বতী ব্যাপারিরা আনতো চিনাংশুক, ঘোড়া, মৃগনাভি, চমরির লেজের চামর, ভেড়া, সোনা রুপো আর কাগজ। ভারত থেকে রপ্তানি হতো সুতির কাপড়, কাচের সামগ্রী, প্রবাল, মুক্তো, মশলা, কৰ্পুর, পান ইত্যাদি। বঙ্গোপসাগরের উপকূল থেকে চীন, পারস্য, তাতারভূমি, এমনকি সাইবেরিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এক সুবিশাল বাণিজ্যের মানচিত্রে বিশেষ ভূমিকা ছিল তিব্বতের। মনে রাখতে হবে, তখনও ভিনদেশিদের জন্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধভাবে হয়ে ওঠেনি হিমালয়ের ওপারে চিরতুষারের এই দেশ, ভারতে যার নাম ছিল ভোট বা ভোটিয়া দেশ। তিব্বত শব্দটি ইউরোপীয়রা নিয়েছিল তুর্কী ও পারস্য থেকে।

এই তিব্বতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে জর্জ বোগলকে ১৭৭৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দূত করে পাঞ্চেন লামার কাছে পাঠান ওয়ারেন হেস্টিংস। সালটা ছিল ১৭৭৪। তখন তিব্বতে দলাই লামার মতনইপ্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা ও শাসক ছিলেন পাঞ্চেন লামা। দলাই লামা থাকতেন লাহসায় আর পাঞ্চেন লামা পশ্চিম তিব্বতের শিগাৎসে শহরে তাশিলুম্ফো মঠনগরীতে। এজন্য তাকে তাশি বা তেমু লামাও বলা হতো।

জর্জ বোগলকে ওয়ারেন হেস্টিংস যে দায়িত্বভার দিয়ে তিব্বতে পাঠালেন, তার মধ্যে একটি ছিল সাংপো - ব্রহ্মপুত্রের ভৌগোলিক রহস্য অনুসন্ধান। এই নিয়ে তখন দুটি প্রচলিত মত ছিল। ফরাসি মানচিত্রবিদ জা ব্যাপটিস্ট ডিঅনভিলের মতে, তিব্বতের সাংপো পূর্বমুখী বয়ে গিয়ে ব্রহ্মদেশে ঢুকে ইরায়ডি হয়েছে, অন্যদিকে জেমস রেনেলের মতে সাংপোই ব্রহ্মপুত্রের উৎস। সঙ্গে দিয়েছিলেন অনেক আলুর বীজ, যাতে বোগল পথে যেতে যেতে সমস্ত পাহাড়ি জনপদগুলোয় এই কন্দ পুঁতে দিয়ে মানুষকে এর উপকারীতার কথা বলতে বলতে যান। এছাড়াও বোগলের হাতে একটি দীর্ঘ তালিকা ধরিয়েছিলেন হেস্টিংস। তার মধ্যে ছিল –

( ১ ) টিস নামক প্রাণী একজোড়া, যাদের পশম থেকে শাল হয়। ( জীবিত ও সুস্থ নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনে ডুলি ভাড়াও করা যেতে পারে।)

( ২ ) চামর হয় যে গবাদি পশুর লেজ থেকে, তেমন একজোড়া পশু।

( ৩ ) আখরোটের বীজ, সম্ভব হলে আস্ত একটি গাছ ছাড়াও জিনসেং ও অন্যান্য বিশেষ গুণসম্পন্ন গাছগাছড়া।

(৪) যে কোনও ধরনের কার্যকর অথবা বিচিত্র প্রাণী।

সেই তালিকায় ছিল অজানা দেশের মানুষ, তাদের রীতিনীতি, আচারব্যবহার, ব্যবসাবাণিজ্য, শাসন ও রাজস্বব্যবস্থার হালহদিশ জানা, সেখানকার আবহাওয়া, পথঘাট, ঘরবাড়ি, রন্ধনশৈলী ইত্যাদি খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করা। এসবের জন্য সবসময় একটি ছোটো ডায়েরি ও পেনসিল সঙ্গে রাখার এবং পর্যবেক্ষণের স্মৃতি তাজা থাকতেই সেগুলি লিপিবদ্ধ করে রাখার পরামর্শ ছিল হেস্টিংস সাহেবের। মে মাসের মাঝামাঝি প্রখর দাবদাহ থেকে বাঁচতে এক রাত্রিবেলা ঘোড়ায় চেপে কলকাতা থেকে যাত্রা শুরু করেন আঠাশ বছরের ইংরেজ যুবক জর্জ বোগল। দিনের বেলায় বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে সারারাত ধরে ঘোড়ার পিঠে চেপে মুর্শিদাবাদ, দিনাজপুর হয়ে কোচবিহার রাজ্যে পৌছতে তাঁর এক পক্ষকাল লেগে যায়।

বোগল ডায়েরিতে লিখেছেন,- যে অঞ্চলে ঢুকতে চলেছি সেখানে এর আগে কোম্পানির কোনও কর্মচারী তো নয়ই, আমার ধারণা কোনো ইউরোপীয় মানুষ যায়নি — পথ, আবহাওয়া, মানুষজন সবই অজ্ঞতার অন্ধকারে ঢাকা।

কোচবিহার ছাড়তেই শুরু হয় বিস্তীর্ণ নাবাল জলাজমি। দু - ক্রোশ চলার পর থেকে লম্বা লম্বা ঘাস আর ঘন শরের বনে পথ ঢাকা। ব্যাঙ, জলের পোকামাকড় আর ভ্যাপসা বাতাসে শ্বাস নেওয়াই দুষ্কর। এইভাবে পাঁচ ক্রোশ গিয়ে শুরু হয় শালজাতীয় মহীরুহের অরণ্য। মাইল দুয়েক এগিয়ে নদী। শালের গুড়ি বেঁধে তৈরি ভেলায় চেপে অবশেষে কোচবিহার রাজ্য ছেড়ে ভুটানের দেবরাজার এলাকায় প্রবেশ করা যায়। বাংলার সীমানার ওপর দিয়ে চলেগিয়েছে যে পাহাড়ের শৃঙ্খল, তার পাদদেশে এই রাজ্যটি। ওপারে তিব্বত। একটি পোড়ো দূর্গ, দেখে মনে হয় সম্প্রতি ধ্বংস হয়েছে। সেই দুর্গ পেরিয়ে একটা ছোটোগ্রাম্য বসতিতে এসে সেদিনের যাত্রার ইতি টানেন জর্জ। রাতের আশ্রয় মেলে মোড়লের যে কুঁড়েয়, সেটি বাঁশের তৈরি পাতায় ছাওয়া, ভূমি থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে। একটি খাঁজকাটা গাছের গুড়ি বেয়ে উঠতে হয়। দেওয়াল মেঝে সবই শরে বোনা, লোহা কিংবা দড়িদড়ার ব্যবহার নেই কোথাও। দেখতে ঠিক যেন একটি পাখির খাঁচার মতন। নীচে শুয়োরের খোঁয়াড় রয়েছে।

মোড়ল ছাড়াও দু - চারজন গ্রামের লোক এসেছিল, এক বোতল রাম পান করে তারা বেসামাল হয়ে পড়ে। মোড়লের সঙ্গে ছিল এক ফেরিওয়ালী; স্বাস্থ্যবতী,সুগঠিত দাঁত, চোখদুটো রুবেন্সের স্ত্রীর মতন। তার পরনে পোশাক বলতে একটিমাত্র পশমি চাদর, কাঁধের ওপর রূপোর পিন দিয়ে আঁটা। পুরুষদের সঙ্গে সমান তালে মদ্যপান করেছিল সে-ও। সন্ধ্যার পর অপরিসর কুঁড়ের মেঝেয় নারী পুরুষ শিশু সবাই একসঙ্গে জড়াজড়ি করে শুয়ে পড়ে। পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই যাত্রা শুরু হয়। দূর থেকে যে পাহাড়শ্রেণি দেখে মনে হচ্ছিল যেন মাথার ওপর প্রাচীরের মতন, কাছে যেতে তার গায়ে ক্রমশ ফুটে উঠতে থাকে শাল চীর আর পাইনের বন। সেই পাহাড়ি অরণ্যের বুক থেকে নেমে আসছে অসংখ্য ছোটো ছোটো জলধারা, স্বচ্ছতোয়া, বয়ে চলেছে নুড়িপাথরের বিছানা দিয়ে। পথ ক্রমশ বন্ধুর। বেলা দুটো নাগাদ পাহাড়ের নীচে পৌঁছোই। পাহাড়ে ওঠা কিছুক্ষণ পর্যন্ত সহজ, উঁচু উঁচু গাছের বনের ভেতর দিয়ে। ক্রমশ চড়াই বাড়তে থাকে। পথ সরু হতে হতে এঁকেবেঁকে উঠে গিয়েছে পাহাড়ের গা বেয়ে। প্রায় চারমাইল উঠতে হয় এভাবে। জঙ্গলে ছায়া ঘনিয়ে আসে, ঝর্ণার শব্দ শোনা যেতে থাকে।

সন্ধ্যার আগে জর্জ গিয়ে পেীছোন বক্সাদুয়ারে। একটি পাহাড়ের মাথায় বক্সাদুয়ার, তিনদিকে ঢেউয়ের মতন উঁচু উঁচু পাহাড় উঠে গিয়েছে। নীচে একটি সরু গিরিখাত, তিনফুট উঁচু আলগা পাথরের দেওয়াল, আর একটি প্রাচীন ঝাঁকড়া বটগাছ। আর কিছু নেই। এখানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহেব অফিসারকে প্রথামাফিক অভ্যর্থনা জানাতে সঙ্গে উপহার এনেছে একটি সাদা খাদা (উত্তরীয়), মাখন, চাল, দুধ আর নিকৃষ্ট মানের স্থানীয় চা। সামনে দীর্ঘ পথ, মাল বওয়ার জন্য কুলি জোগাড় করতে একটি গোটা দিন লেগে যায়।

৯ জুন, ১৭৭৪। কোম্পানিশাসিত বাংলা ছেড়ে ভুটানের অরণ্যাবৃত পাহাড়ে পা রাখেন জর্জ। একটি রোগাটে কিন্তু অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ঘোড়ায় চড়েন তিনি। কিছুক্ষণ চলার পর পথ ক্রমশ দুর্গম হয়ে উঠতে থাকে, রীতিমতন সরু আর খাড়াই, এবড়ো খেবড়ো পাথরের ধাপ কেটে পাহাড়ের গা বেয়ে এঁকেবেঁকে উঠে গিয়েছে ওপরের দিকে। এভাবেই পার হন বক্সদুয়ারের ওপরে প্রায় ঝুলে থাকা পিচাকোনাম পাহাড়। গ্রীষ্মের দুপুর, কিন্তু এখানে বাতাস আশ্চর্য স্নিগ্ধ। নীচে গভীর খাদের জঙ্গলে ঢেকে থাকায় তেমন ভীতিপ্রদ দেখাচ্ছে না। পথ উঠে গিয়েছে সটান পাহাড়ের মাথায়। সেখানে পৌছে ফের উলটোদিকে নামার আগে বাংলার দিকে একবার ফিরে তাকান জর্জ। তিনি ভাবেন, ভূপৃষ্ঠের এমন আকস্মিক বদল, এমন বৈপরীত্য, কল্পনা করা অসম্ভব! দক্ষিণে আবহাওয়া নির্মল, বিস্তীর্ণ সমভূমির ওপর দিয়ে দৃষ্টি চলে যায় বৃত্তাকার দিগন্তরেখা পর্যন্ত। কোথাও উঁচুনীচু পাহাড় কিংবা টিলা নেই, শৃঙ্গ বা মিনার নেই। যতদূর দৃষ্টি যায় পরিব্যাপ্ত ছেদহীন সমভূমি, অরণ্যাচ্ছাদিত, কিংবা ফসলের খেত আর গোচারণভূমি, নদীখাতের রেখা, গ্রাম, ধোঁয়ার কুণ্ডলি উঠছে। কিন্তু তাঁকে টানছিল, তাঁর ভেতরে ঢের বেশি আনন্দের সঞ্চার করছিল, বিপরীত দিকের দৃশ্য। কঠিন উৎরাই ঢাল, গহীন উপত্যকা, গগনচুম্বী বৃক্ষরাজি, সারি সারি পর্বত, শৃঙ্গগুলো মেঘের আড়ালে ঢাকা।

মে মাসের মাঝামাঝি কলকাতা থেকে যাত্রা শুরু করে ডিসেম্বর মাসে তাশিলুম্ফোয় পৌঁছোন বোগল। শীতের শেষ পর্যন্ত ছিলেন। এই কয়েকমাসে পাঞ্চেন লামার সঙ্গে তাঁর হার্দিক বন্ধুত্ব গড়ে। তাছাড়া ভুটানের ভেতর দিয়ে বাণিজ্যপথ সুগম করার ব্যাপারেও তিনি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এগুলিই ছিল জর্জ বোগলের অবদান। এর কয়েক বছর পরে আরেকবার তাঁকে কোম্পানির দূত হিসেবে তিব্বতে পাঠাবার ভাবনাচিন্তা শুরু হয়। পাঞ্চেন লামা তখন চীনে। ঠিক হয়েছিল, বোগল চীনে গিয়ে পাঞ্চেন লামার সঙ্গে তিব্বতে ফিরবেন। কিন্তু বেজিঙে থাকাকালীন সময়েই গুটিবসন্তে মৃত্যু হয় পাঞ্চেন লামার। এর কিছুকাল পরে, ৩ এপ্রিল ১৭৮১, ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বোগল মারা যান কলকাতায়। ওয়ারেন হেস্টিংসও অবসর নিয়ে দেশে ফিরে যান। তিব্বতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্ভাবনার পথ হারিয়ে যায় ইতিহাসের চোরাবালিতে। তার বছর দশেকের মধ্যে তিব্বতে গোর্খা আক্রমণ হয়, তাশিলুম্ফো মঠের প্রভূত ধনসম্পত্তি লুঠ হয়, ধ্বংস হয়ে যায় অনেক মূল্যবান পুঁথিপত্র। চীনের সাহায্য নিয়ে শেষপর্যন্ত সেই আক্রমণ প্রতিহত করেছিল তিব্বত, নেপালের রাজাকে পর্যুদস্ত করেছিল। সেই সময় লর্ড কনওয়ালিশের নেতৃত্বে কোম্পানির সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ব্রিটিশ-তিব্বত সম্পর্কে যতিচিহ্ন টানে । তিব্বতে যাবার গিরিপথগুলো বন্ধ হয়ে যায় বহিরাগতের জন্য। ওয়ারেন হেস্টিংসের নির্দেশ মেনে যাত্রার অনুপুংখ দিনলিপি রাখতেন জর্জ বোগল। সেখানে প্রকৃতির বিবরণ ছাড়াও ওখানকার মানুষের সমাজজীবন, ধর্মবিশ্বাস ও লোকাচার ইত্যাদি বিষয়ে পর্যবেক্ষণ ছিল। বোগলের মৃত্যুর পর, সেই দিনলিপি অন্যান্য ব্যক্তিগত কাগজপত্রের সঙ্গে ফিরে যায় ইংল্যান্ডে তাঁর পারিবারিক বাড়িতে। সেখানে একটি কাঠের সিন্দুকের ভেতর একরাশ চিঠিপত্রের মাঝে ডাইরিটি হারিয়েছিল প্রায় একশো বছর। ১৮৭৫ সালে ইন্ডিয়া অফিসের জিওগ্রাফিকাল ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে সেটি প্রকাশিত হয় টমাস মালিং নামে এক পর্যটকের লাসা ভ্রমণের বিবরণের সঙ্গে ।

জর্জ বোগল তাঁর দেখা ডাইরিতে লিপিবদ্ধ করেছিলেন, শরৎচন্দ্র দাসের সঙ্গে কিন্তু ক্যামেরাও ছিল।


চলবে ...

...