শনিবার, অক্টোবর ৩১, ২০২০

মহাসত্যের বিপরীতে দ্বিতীয় খণ্ড # ৭ম পর্ব

...স্পর্শ আসে দৃষ্টির আগে, কথা বলারও আগে। এটিই প্রথম ভাষা। এবং শেষ। এবং তা সব সময় সত্যিটা বলে। - মার্গারেট অ্যাটউড


গরব আর অপেক্ষা করতে পারছে না। তবু চারপাশে দেখে নিকটবর্তী একটি বড় পাথরের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ায়। অপেক্ষা করতে থাকে। ডাকাত দল নিয়ে শিকারের অপেক্ষায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার অভ্যাস রয়েছে ওর। কিন্তু এখন এই অন্ধকারে প্রতিটি মুহূর্ত এত দীর্ঘায়িত যে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরই বিরক্তি ওকে গ্রাস করে। সে সময় নষ্ট করছে না তো? এরপর ভোরহয়ে গেলে আর পালাতে পারবে না। সে বুঝতে পারে যত দেরি হচ্ছে, মৃত্যু তত কাছে এগিয়ে আসছে। মঠাধ্যক্ষ কি আজ রাতে আদৌ আসবে? নাকি এটা নিছকই রামের আশঙ্কা মাত্র!

আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে গরবের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। নিজেকে সচল রাখার জন্যে সে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে বারবার গোড়ালি উপর নিচে করতে থাকে। সে ভাবে, পাথর দিয়ে তালাটা না ভেঙে ওর কোমড়ের ধারালো ছুরি দিয়ে ছিটকিনির কব্জা যেখানে লাগানো সেই অংশটা খুঁড়ে ফেলবে। একথা ভেবে সে আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে।

তখনই সে দূর থেকে একটা আলো নিচে নেমে আসতে দেখে। আবার কিছুক্ষণ দেখতে পায় না। তারপরই আরও জোরালো। আলো দুলতে দুলতে ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকে। গরব আবার পা টিপে টিপে আড়ালে চলে যায়। সেখান থেকে এবার সে স্পষ্ট একটি হাতে লণ্ঠন দেখতে পায়। তার মানে রামের কথা ঠিক। মঠাধ্যক্ষ সত্যি সত্যি আসছে!

গরব দ্রুত নিজের আক্রমণ কৌশল ভেবে নেয়। সে মঠাধ্যক্ষকে গুহার দরজা খুলতে দেবে কিন্তু আর লাগাতে দেবে না। বাকিটা রামের উপর নির্ভর করছে। রাম কি এমনি বন্দি, নাকি ওর হাত পা শেকল দিয়ে বাঁধা। সে গোঙাচ্ছে কেন? গরব নিশ্চিত যে সে মঠাধ্যক্ষকে মেরে শুইয়ে দিতে পারবে, বেঁধেও ফেলতে পারবে। এ ব্যাপারে তার অভিজ্ঞতা বিস্তর। তারপর মঠাধ্যক্ষকেই তালা দিয়ে আটকে রামকে নিয়ে পালাবে।

কিন্তু কোথা দিয়ে পালাবে? এ ব্যাপারে রাম হয়তো কিছু বলতে পারবে। আশায় বুক বেঁধে গরব ওৎ পেতে থাকে। মঠাধ্যক্ষ কাছে এগিয়ে আসে। লষ্ঠনের আলোয় এখন ওর আপাদমস্তক দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদেহী মঠাধ্যক্ষ কাছে এগিয়ে আসে। ইনি মঠাধ্যক্ষ? আজানুলম্বিত আঙরাখার আড়ালে একজন কঙ্কালসার মানুষ, মঠাধ্যক্ষের সেই মসৃণ মুখমণ্ডল আর স্থির দৃষ্টিতে তাকানো চেহারা কোথায়? এ যে হাড্ডির উপর চামড়া বসানো, কোটরে ঢাকা চোখ, কিছুটা ক্লান্তও যেন। নাকি ইনি গরবের দেখা মঠাধ্যক্ষের থেকেও বৃদ্ধ, অন্য একজন সন্ন্যাসী? ওর বন্য কুকুরের মতন জ্বলতে থাকা দৃষ্টি দেখে চোখের অবস্থান ঠাহর করা যায়। গরবের মতন সাহসী মানুষও এই দৃশ্য দেখে ভেতর থেকে কাঁপুনি অনুভব করে।

গুহার সামনে থেমে ভয়ঙ্কর মানুষটি মাটিতে লণ্ঠন রাখে। তারপর আঙরাখার ভেতর থেকে চাবি বের করে। তালা খোলে। লোহার খিলটা খুলে দরজারএকপাশে দাঁড় করিয়ে রাখে। তারপর দরজা খোলে। একটা মাংসপচা দুর্গন্ধ ভক করে বেরিয়ে আসে। এত দুর্গন্ধ যে গরবের বমির উদ্রেক হয়। সে মুখে হাতচাপা দিয়ে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলায়।

মঠাধ্যক্ষ এবার ঝুঁকে হাতে লণ্ঠন নেয়। ওর চলন বেশ শ্লথ, উত্তেজনাহীন। লোকটি মৃদু একঘেয়ে স্বরে কোনও মন্ত্র আউড়াতে আউড়াতে কলের পুতুলের মতন ওই গুহায় ঢুকে পড়ে। গরব পা টিপে টিপে আড়াল থেকে বেরিয়ে সন্তর্পণে গুহার মুখের কাছে পৌছে যায়। সে একপাশে দাঁড়িয়ে ভেতরে উঁকি মারে। কিছু করার আগে সে জানতে চায়, রামকে কি বেঁধে রাখা হয়েছে, সে কি কোনওরকম সাহায্য করতে পারবে? নাকি ওকে অত্যাচার করে পঙ্গু করে ফেলেছে?

কিন্তু গরব লণ্ঠনধারী মঠাধ্যক্ষ ছাড়া আর কাউকে দেখতে পেল না। আর দেখতে পেল একটি পাকা বেদীর উপর বড় চৌকো আলমারির আকৃতির কিছু গুহার মুখটাকে আড়াল করে আছে। আলমারিটা সম্ভবত লোহা কিম্বা ইস্পাতের তৈরি। সেটির সারা গায়ে সারি সারি বেশ বড় বড় গোল ছিদ্র। গরব ভাবে, সে হয়তো কোনও বীভৎস দর্শন মূর্তির পশ্চাদ্দেশ দেখছে!

এই মূর্তি হয়তো তিব্বতের সারি সারি পর্বতমালায় ঘুরে বেড়ানো রাক্ষস কিম্বা অতৃপ্ত আত্মাদের নিয়ে প্রেতচর্চার প্রতীক। গুহায় ঢুকে মঠাধ্যক্ষ তেমনি শ্লথ চলনে একঘেয়ে সুরে গুন গুন করে মন্ত্র জপতে জপতে নানারকম অঙ্গভঙ্গী করে। তারপর সে আঙরাখা খুলে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে যায়। অস্থিচর্মসার একটি অকল্পনীয় অবয়ব। অন্ধকারে তার গোপনাঙ্গ দেখা যায় না। সে একটি সঙ্কীর্ণ শৈলশিলা বা তাকের উপর থেকে লম্বা হাতলঅলা একটি হাতা তুলে নিয়ে আলমারি আকৃতির কাঠামোর উপরের দিকের একটা ফুটোতে ঢুকিয়ে কিছু বের করে তেমনি একঘেয়ে সুরে গুন গুন করে মন্ত্র জপতে জপতে শরীরে ঢালে। মাংসপচা তীব্র দুর্গন্ধে গরবের পেট মোচড়াতে থাকে। বারবার ওকি উঠতে চায়। সে জামার হাত দিয়ে নাক চেপে রাখে। মঠাধ্যক্ষ আবার লম্বা হাতলঅলা হাতটি অন্য একটি ছিদ্রে ঢুকিয়ে কিছু বের করে এনে গায়ে ঢালে। কী করছে লোকটা? একই রকম একঘেয়ে সুরে মন্ত্র জপতে জপতে শ্লথগতিতে নানা ছিদ্র থেকে হাতা দিয়ে কিছু বের করে করে সারা গায়ে ঢালতে থাকে - উত্তেজনাহীন যন্ত্রবৎ। গরবের কী মনে হওয়ায় সে আলখাল্লার পকেটে রাখা একটি বস্ত্রখণ্ড বের করে দ্রুত নাক ও মুখ পেঁচিয়ে গিট দেয়। কিন্তু এতে দুর্গন্ধ কম হলেও এ থেকে মুক্তি পায় না। এমনভাবে পেট মোচড়াতে থাকে যে কোনও মুহুর্তে বিস্ফোরণের মতন সে ওকি তুলে ফেলতে পারে। তাহলেই সর্বনাশ। তার আগেই কিছু করতে হবে।

মঠাধ্যক্ষ এবার হাতাটা তাকের উপর রেখে তেমনি মন্ত্র জপতে জপতে দু’ হাতে সারা গায়ে তেল মাখার মতন মাখতে শুরু করে। বিশেষ করে তলপেট ও নিম্নাঙ্গে। কিন্তু রাম কোথায়? ওই গুহার উগ্র পচা গন্ধের মধ্যে সে নীরব কেন? সে কেমন অবস্থায় আছে?

মঠাধ্যক্ষ আবার হাতাটা তুলে নিয়ে আরেকটি ছিদ্র দিয়ে ঢুকিয়ে নিজের স্থান পরিবর্তন করে বেদীর একটি কোণায় চলে যায়। তারপর একটু ঝুঁকে গরবের পরিচিত মঠাধ্যক্ষের আওয়াজে বলে ওঠে, এই রসায়ন অনন্ত পরমায়ু দেয় রাম, জীর্ণ দেহকে তরতাজা করে তোলে। কত শক্তিশালী যুবকদের প্রাণশক্তি এতে মিশেছে !

এই অবিশ্বাস্য বয়ান, এই পরিচিত আওয়াজ শুনে গরবের সারা শরীরে একটি শীতল শিহরণ বয়ে যায়। তার মানে, এই সে – ই! যে টানটান মসৃণ চেহারা গরব দেখেছে সেটি নিছকই একটি মুখোশ? লোকটি সম্ভবত রামকে বা তার সঙ্গীদের শুনিয়ে বলছে, একজন তপস্বী ছাড়া কেউ এই তীব্র রসায়ন ব্যবহার করলে তক্ষুণি মারা যাবে। কিন্তু একজন সাধক, যিনি একে অঙ্গীভূত করতে পারবেন, হজম করতে পারবেন, তাঁর জন্যে এটি অমৃত - অক্ষয় শক্তি! নিজেকে আশীর্বাদধন্য ভাবো বৎস, এই ক্ষয় শক্তিকে পুষ্ট করবে তুমিও, যা দিয়ে সাধকরা ঈশ্বরের থেকেও বেশি ক্ষমতাবান হয়ে উঠবেন! মঠাধ্যক্ষ এবার জাদুকরের মতন ওই হাতার নির্যাস নিজের ঠোঁটে ছোঁয়ায়। তার কণ্ঠ ওঠানামা করে। চোখেমুখে ঝাঁঝালো কিছু খাওয়ার মতন অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে।

তারপরই লোকটি আবার বেদীর দিকে ঝুঁকে বলে, তোমার চোখ এখনও খোলা বৎস, মহান নিদ্রার আবাহন শুনতে পাচ্ছ না? তোমার আত্মিক শক্তি প্রবল দেখছি। কৃমিকীটেরা এখনও তোমার পাগুলিকে আক্রমণ করেনি? ভারতীয় সাধু, আমাদের গুপ্তবিদ্যা জানতে এসেছিলে? এখন জেনে গেছ? ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করো তুমি যেন পরের জন্মে বন সাধু হও। তাহলে একদিন তুমিও হবে মহান সাধক! এই গুপ্ত সঞ্জীবনী নির্যাস ছিটিয়ে তোমাকে আশীর্বাদ করছি। কিন্তু বেশি দেব না, তুমি সহ্য করতে পারবে না। লণ্ঠনের আলোয় গরব ওই হাতা থেকে আলমারির কোণার দিকে দু-এক ফোটা তরল ছিটানো প্রত্যক্ষ করে। আর তক্ষুনি একটি তীব্র চিৎকারে, ও মা গো, মরে গেলাম গো, বাঁচাও, বাঁচাও!

এ তো রামের চিৎকার! গরব আর স্থির থাকতে পারে না। ক্ষিপ্রগতিতে গুহার পাশে দাঁড় করানো ভারী লোহার খিলটি হাতে তুলে নিয়ে দ্রুত গুহায় ঢুকে সমস্ত শক্তি দিয়ে মঠাধ্যক্ষের মাথায় মারে। মোক্ষম আঘাতে লোকটি নিঃশব্দে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। বেদীর ভিতর থেকেই রাম বলে ওঠে, ওহ গরব, আমাকে বের করো!

গরব ভাল করে দেখার চেষ্টা করে, কোথায় রাম? সে কি কোনও কবরের ভেতর থেকে কথা বলছে? রাম বলে, আমার শরীরের উপর থেকে ভারী লোহার পাটাতনটাকে ঠেলে সরাতে হবে!

গরব লণ্ঠন হাতে নিয়ে অমরত্বের সাধক পিশাচটার হাত পা ছড়িয়ে পড়ে থাকা নগ্ন শরীরের দিকে তাকায়। মাথা থেকে রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়ছে। ডাকাত সর্দারের একঘায়ে খুলি ফেটে ঘিলু বেরিয়ে গেছে।

গরব আগে গুহার দরজার কাছে ফিরে গিয়ে তালা ও চাবিটা নিয়ে নিজের আঙরাখার ভাঁজে ঢুকিয়ে রাখে। লোহার খিলটাকে শক্ত হাতে ধরে রামকে জিজ্ঞেস করে, কোথায় তুমি বন্ধু?

কিন্তু রাম কোনও জবাব দেওয়ার আগেই লণ্ঠন উঁচিয়ে একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখে থ হয়ে যায় সে। বেদীর একটি কোণায় চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা রামের মাথা দেখা যাচ্ছে। তার পাশেই অন্য একটি ভারী লোহার পাতে চাপা দেওয়া আরেকজন যুবকের নীল হয়ে যাওয়া ফ্যাকাশে মুখ। তার এপাশে ও ওপাশে, উপরে ও নিচে বিভিন্ন ভারী লোহার পাতে চাপা দেওয়া আরও আটদশজন মৃত মানুষের খুলি।

এ কেমন নরক?

রাম অনেক কষ্টে বলে, এটি শূন্যগর্ভ বেদী, প্রত্যেক ভারী লোহার পাতের নিচে একেকজন মানুষের মৃতদেহ। তুমি উপরেরটা সরাও গরব, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব –

গরব লণ্ঠন ও লোহার খিলটাকে নিচে রেখে, দুই হাতে ঠেলে ওই লোহার পাত সামান্য নড়াতে পারলেও খুব একটা সরাতে পারে না। ভীষণ ভারী! কয়েকজন মিলে এই পাতটাকে তুলতে হবে!

রাম বলে, আগে শেকলে বাঁধা তালাটা ভাঙতে হবে, তালাটা আমার পায়ের দিকে!

গরৰ আবার লণ্ঠন তুলে ধরে তালাটা দেখে। তারপর আবার লন্ঠন মেঝেতে রেখে লোহার খিলটা দিয়ে মেরে তালাটা ভাঙে। টেনে টেনে শেকল সরায়। এবার অনেক বল প্রয়োগ করে পাতটাকে সামান্য সরাতে পারে। তারপর সেই ফাঁকে লোহার খিলটার একপ্রান্ত ঢুকিয়ে চাড় দিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে রামের শরীরের উপর থেকে লোহার পাতটাকে কিছুটা সরায়।

এভাবে পাথরের দেওয়ালের ভিতরে ঢোকানো প্রান্তটাও ঢিলে হয়ে আসে আর কিছু পাথরের টুকরো খসে পড়ে। সে আবার চাড় দিলে পাতটা সরতে শুরু করে। যতক্ষণ পর্যন্ত না এর নিচ থেকে রামের শরীর বেরিয়ে আসে সে সাবধানে ধাক্কা দিয়ে পাতটা সরাতে থাকে। বেশি জোরে ধাক্কা দিলে রাম ব্যথা পেতে পারে!

অবশেষে রামের উপর থেকে পাতটা সরে গেলেও সে নিজে নিজে নেমে আসতে পারে না। শুয়ে থেকে থেকে স্থবির হয়ে গেছে। রাম সম্পূর্ণ নগ্ন। গরব ওর হাত ধরে নামিয়ে আনলেও, সে নিজে থেকে দাঁড়াতে পারে না। দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়।

গরব তাড়াতাড়ি মঠাধ্যক্ষের ছাড়া আঙরাখাটা রামকে পরিয়ে দেয়। তারপর অচেতন তন্ত্রসাধকের দিকে তাকিয়ে বলে, -অমৃতের সন্ধানী, এখন তোকে এই নরকে বন্দি হয়ে থাকতে হবে!

গরবের হাত ধরে রাম অনেক কষ্টে গুহা থেকে বেরিয়ে আসে। গরৰ গুহার দরজা লাগিয়ে আগের মতন খিল এঁটে দেয়। তালা লাগায়। তারপর রামকে ধরে ধরে ওই শৈলাস্তরীপের প্রশস্ততম স্থানে এসে দাঁড়ায়। বুক ভরে শ্বাস নেয়। ওফ, কতক্ষণ পর ওই পচা গন্ধ থেকে মুক্তি, নরকে থেকে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসা!

রাম ঢোক গিলে বলে, তিনদিন কিছুই খাইনি!

  • তার মানে?
  • এই তন্ত্রসাধকরা এভাবে জীবন্ত মানুষকে পাতের মাঝে শুইয়ে, না খাইয়ে মেরে পচিয়ে ফেলে। মৃতদেহগুলি কখনও সরানো হয় না। সেগুলির উপরই আবার জীবন্ত কাউকে এভাবে সমাধি দেওয়া হয়। এই পচা শরীরগুলির নির্যাসই হল এদের মৃতসঞ্জীবনী। এটাই হল সো সা লিং - এর গোপন রহস্য! এখান থেকে দ্রুত পালাতে হবে গরব!

গরব বুঝতে পারে, হাতে সময় নেই, সকাল হয়ে আসছে! দ্রুত এখান থেকে পালাতে হবে। না হলে এই মুক্ত পৃথিবীই হয়ে উঠবে ওদের মৃত্যুঅন্তরীপ। গরব জিজ্ঞেস করে, পালানোর পথ জানো?

রাম মাথা নেড়ে বলে, - না, আমাকে রাতের আঁধারে এখানে আনা হয়েছিল!

– শয়তানের পূজারি এরা, মানবতার শত্রু!

– তুমিও পালানোর পথ জানো না?

– আমি যে পথে এসেছি, শুধু সেই পথটাই চিনি, ওখান দিয়ে ফেরা যাবে না!

আতঙ্কে রামের গলা শুকিয়ে আসে। গরব লণ্ঠন হাতে শৈলান্তরীপের ধার ধরে হেঁটে হেঁটে দেখতে থাকে। নিচের অন্ধকার এতই গভীর এবং অতল যে লণ্ঠনের আলোকে শুষে নিতে থাকে। তাছাড়া পায়ের তলায় পাহাড়ের গায়ে লাগা মেঘ ভেসে থাকায় কিছুই ভালমতন দেখতে পায় না। শুধু শুনতে পায় নিজের হৃৎপিণ্ডের দ্রুত হাপর পড়ার শব্দ। সে ভেতরের ডাকাত সর্দারকে আরও বেশি করে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করে। বাঁচতে তাকে হবেই, রামকেও বাঁচাতে হবে, বাইরের মানুষকে জানাতে হবে চিকিৎসা মন্দিরের আড়ালে সো সা লিং - এ এই নারকীয় প্রেতসাধনার কথা। ঘন মেঘের ফাঁকে ফাঁকে পর্বতশৃঙ্গগুলিকে ঠাহর করা যাচ্ছে। এখান থেকে আর সো সা লিং-এর দিকে ফেরা যাবে না। এই শৈলান্তরীপ থেকেই গড়িয়ে পড়ে লোকালয়ে পৌঁছুতে হবে। যদিও এটা আত্মহত্যারই নামান্তর। তবুও বাঁচার চেষ্টা তো করতেই হবে। বনদের এই নরকে শুয়ে তিলে তিলে মরার চাইতে গড়িয়ে পড়তে পড়তে ঘাড় ভেঙে মরে যাওয়া অনেক ভাল!

সে নিজের আঙরাখার কোমরে বাঁধা ফিতেটা খুলে দুহাতে টেনে টেনে এর শক্তি পরীক্ষা করে। তারপর রামের পরনে মঠাধ্যক্ষের আঙরাখা থেকে অপেক্ষাকৃত কম লম্বা ফিতেটা খুলে ওর ফিতেটার সঙ্গে শক্ত গিট মেরে জুড়ে দেয়। দুটো ফিতেই ১৫ থেকে ২০ ইঞ্চি চওড়া। গরবের ফিতেটা প্রায় চার গজ লম্বা, কিন্তু মঠাধ্যক্ষের ফিতেটা তিন গজের বেশি হবে না। ফিতে দুটো জুড়ে একপ্রান্ত কজির সঙ্গে বাঁধে, অন্যপ্রান্তে লণ্ঠনের হাতলটা শক্ত করে গিট দিয়ে বেঁধে নিয়ে শৈলান্তরীপের ধারে শুয়ে ধীরে ধীরে নিচে ঝুলিয়ে দেয়। তারপর একরকম গড়িয়ে গড়িয়ে সে ঝাপ দেওয়ার আগে তুলনামূলক সুবিধাজনক ঢাল দেখে নেওয়ার চেষ্টা করে। অবশেষে সে এক জায়গায় কিছুটা এবড়ো খেবড়ো তেরছা ঢালে মাটি আর পাহাড়ের শরীর থেকে গাছপালা বেরিয়ে আসতে দেখে সেখান দিয়ে নামার সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও সে জানে না এই ঢাল কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে, কতটা নিচে পাহাড়ের পাদদেশ, এই ঢাল কোনও অতল পাহাড়ের ফাটল কিম্বা খাদে গিয়ে শেষ হয়েছে কিনা! কিন্তু এটাই আপাতত মন্দের ভাল!

গরব আবেগমথিত আওয়াজে বলে, রাম, ভেব না যে বেঁচে গেছি, আমরা প্রায় মৃত্যুর মুখোমুখি। তুমি কি পা টিপে টিপে এই তেরছা ঢাল ধরে নামতে পারবে? পিছলে যাবে না তো?

– আমি জানি না! রাম কাতর কণ্ঠে বলে, ভীষণ রকম দুর্বল লাগছে!

গরব মনে মনে ভাবে, হবেই তো, তিনদিনের বেশি ও কিছু খায়নি! গরবের আঙরাখার ভেতরে শুকনো খাবারের পুটলি বাঁধা রয়েছে। কিন্তু এখন সময় বেশি মূল্যবান। তবুও সে পুটুলি থেকে এক খণ্ড শুকনো মাংস বের করে রামের মুখে ঠুসে দিয়ে বলে, চিবোতে থাকো, খেতে খেতে চলো। বেঁচে গেলে আমার কাছে যথেষ্ট খাবার রয়েছে।

একবার বুক ভরে শ্বাস নিয়ে শুরু হয় বিপজ্জনক অবতরণ। গরব লণ্ঠনটাকে নিজের কোমরের সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে নেয়। প্রয়োজনে সেটা নামিয়ে নামিয়ে সে ঢালের পরবর্তী অংশটা দেখে নানা গাছের ডাল ধরে ধরে ধরে সন্তর্পণে নামাতে থাকে। বারবারই রামকে হাত ধরে টেনে আনতে হচ্ছে। ওর পা থরথর করে কাঁপছে।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর এ ধরনের অবতরণও থামাতে হয়। তেরছা ঢালটা প্রায় শেষ। তারপরই প্রায় খাড়া পাথুরে ঢাল। সেই ঢালে ধরে ধরে নামার মতন গাছ আর নেই। আকাশের অন্ধকার ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। ক্রমে ভোরের আলো ফুটে উঠছে। ভোর হলে মঠাধ্যক্ষকে না পেয়ে তার শিষ্যরা খুঁজতে বেরুবে। আর নামতে না পারলে ওরা তাদের এখানে দেখে ফেলবে।

ক্রমবর্ধমান হালকা আলোয় গরব দেখতে পায় খাড়া ঢালের কিছুটা নিচেই একটি লতাপাতাবেষ্টিত তেরছা ঢালবিশিষ্ট পশুচারণ ভূমি। পশুদের পায়ে চলা পথ দেখে গরব ভাবে, ওখান থেকে ওই পথ ধরে নেমে গেলে দ্রুত জনবসতি অবধি পৌছুনো যাবে। কিন্তু অশক্ত রামকে নিয়ে এই খাড়া ঢাল সে কেমন করে নামবে? - ‘রাম’! গরব ঢোঁক গিলে বলে, এটা আমাদের বাঁচার শেষ সুযোগ। তোমাকে পিঠে বেঁধে নিচ্ছি, তারপর খাড়া ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়বো।

রাম মাথা নেড়ে বলে, ঠিক আছে!

ফিতের গিট খুলে প্রথমেই লণ্ঠনটি ফুঁ দিয়ে বুজিয়ে অন্য দিকে যত দূরে সম্ভব ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তারপর ওই ফিতে দিয়ে মা যেমন করে বাচ্চাকে কোলে নেয় তেমনি নিজের বুকের সঙ্গে রামকে বেঁধে নেয়। রামের হাত দুটি ওর আঙরাখার ভেতরে ঢুকিয়ে জাপটে ধরতে বলে। আর ওর নিজের জামার হাতের উপর দু ’ হাতে রামের পরা মঠাধ্যক্ষের আঙরাখার হাত দুটিকে পেঁচিয়ে বেঁধে নেয় যাতে গড়িয়ে পড়ার সময় কনুই ও হাত ছড়ে না যায় । সে একা হলে এই ঢাল নামা এত কঠিন হতো না। পায়ের জুতোর গোড়ালি, দুই হাত আর পিঠ দিয়ে প্রয়োজনে গতি কমাতে পারতো, কিন্তু রামকে বুকে নিয়ে কতটা পারবে কে জানে!

রামকে বুকে বাঁধার পর নিজের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানির সঙ্গে রামের ধুকপুকানিও গরবের চেতনায় ছড়িয়ে যায়। রাম যেন এখন তার অস্তিত্বের অংশ। তার মনে হয়, মানুষ এবং যে কোনও জীবন্ত প্রাণীর ক্ষেত্রে স্পর্শ আসে দৃষ্টির আগে, কথা বলারও আগে। এটিই প্রথম ভাষা। এবং শেষ। এবং তা সব সময় সত্যিটা বলে। অনেক প্রাণী তো কথা না বলে, চোখে না দেখেই সব রকম ভাব বিনিময় করতে পারে!

অজানা অন্ধকার ঢালে নামার আগে গরব কয়েকবার বুক ভরে শ্বাস নেয়।


চলবে ...