শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০

মহাসত্যের বিপরীতে, তৃতীয় খণ্ড # পঞ্চম অধ্যায়

যাও সম্ভ্রমস্থলে/ বিশাল হালো ফুল/ আমার সাথে মন্দিরে এসো/ প্রাণবন্ত ফিরোজা মৌমাছি’। - ৎসাংইয়াং গ্যাৎসো( ৬ষ্ঠ দলাই লামা)

‘দলাই লামা’ শব্দের অর্থ নানাজনের কাছে নানারকম। কেউ বলেন, আমি নাকি জীবিত বুদ্ধ, করুণা অবলোকিতেশ্বরের মানব অবতার। কেউ কেউ বলেন, আমি নাকি ‘ঈশ্বর- সম্রাট’। ১৯৫০এর দশকের অন্তিম বছরগুলিতে আমি ছিলাম ‘পিপুলস রিপাবলিক অফ চায়না’র ‘ন্যাশনাল পিপুলস কংগ্রেস’এর একজন উপাধ্যক্ষ। তারপর যখন নির্বাসনে এসেছি, আমাকে ‘বিপ্লব-বিরোধী’ এবং ‘পরাশ্রিত পোকা’ আখ্যা দেওয়া হয়। কিন্তু আমার জন্যে ‘দলাই লামা’ শুধুই একটি পদের নাম, যা দিয়ে আমাকে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আমি নিজেকে তিব্বতে জন্মগ্রহণকারী একজন মানুষ বলেই মনে করি যে বৌদ্ধ ভিক্ষুর বানা স্বীকার করেছে। এখানে আমি একজন সামান্য ভিক্ষুরূপে নিজের জীবনের কথার পাশাপাশি বেশ কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতার কথা স্পষ্টভাবে লিখবো।

তিব্বত থেকে পালিয়েছিলাম ৩১ মার্চ ১৯৫৯ । সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত শরণার্থী রূপে ভারতে আছি। ১৯৪৯-৫০এ ‘পিপুলস রিপাবলিক অফ চায়না’ তিব্বতে সেনা পাঠিয়ে আক্রমণ শুরু করে। তারপরও প্রায় দশ বছর আমি নিজের দেশবাসীর রাজনৈতিক এবং ধার্মিক নেতা রূপে দুই দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে গেছি। কিন্তু চীনা নেতাদের একদিন তা অসম্ভব বলে মনে হয়। সেজন্যে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছোই যে বাইরে থেকেই দেশবাসীদের জন্য কিছু করতে পারবো।

১৯৪৯ এর আগে তিব্বতও স্বাধীন ছিল। আমার মনে হয় ওই বছরগুলিই আমার জীবনের সেরা সময়। এখন আমি নিশ্চিতভাবেই স্বাধীন, কিন্তু আমার বর্তমান জীবন সেই পোটালা আর নরবুলিংকায় আমার লালন পালন প্রশিক্ষণের জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমি জানি যে এখন সেসব সুখের দিনের কথা ভাবার কোনও মানে নেই, কিন্তু তবু বারবার মনে পড়ে। আর মনে পড়তেই আমি ভেবে ভেবে উদাস হয়ে পড়ি। আমার দেশবাসীর একেকটি দিন মাস বছর যে কী নিদারূণ কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা কেউ স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারবেন না! আমি এ যাবৎ কোথাও একথা বলিনি যে প্রাচীন তিব্বত একটি আদর্শ দেশ ছিল, কিন্তু এটা সত্য যে আমাদের জীবন পদ্ধতি অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল , আর এর মধ্যে অনেক কিছুই মানব সভ্যতার পক্ষে শুভ এবং সংরক্ষণ উপযোগী ছিল, কিন্তু এখন সেসব চিরকালের জন্যে ধ্বংস হয়ে গেছে।

‘দলাই লামা’ শব্দের মানে নানাজনের কাছে নানারকম। কিন্তু আমার কাছে এটি একটি পদের নাম যা আমি জন্মসূত্রে পেয়েছি। ‘দলাই’ শব্দটি এসেছে মঙ্গোলিয়ান ভাষা থেকে। মঙ্গোলিয়ান ভাষায় দলাই মানে ‘সমুদ্র’। আর ‘লামা’ তিব্বতী ভাষার শব্দ, যার মানে ‘গুরু’ বা ‘শিক্ষক’। এই দুটির মানে একত্রে হয়, ‘জ্ঞানের সমুদ্র’ । কিন্তু আমার মতে এটা ঠিক নয়। তৃতীয় দলাই লামার নাম ছিল - সোনম গ্যাৎসো। তিব্বতী ভাষায় ‘গ্যাৎসো’ শব্দের অর্থ হল ‘সমুদ্র’। আমার মতে দ্বিতীয় ভুলটি হল, চীনা ভাষায় লামাদের ‘বুও ফু’বলা হয়, অর্থাৎ - ‘জীবিত বুদ্ধ’। এরকম ভাবা ভুল। কারণ, তিব্বতী বৌদ্ধ ধর্ম এরকম কোনও ব্যক্তিত্বকে স্বীকৃতি দেয় না। তিব্বতী বৌদ্ধ ধারণা অনুসারে কিছু মানুষ নিজের পুনর্জন্মকে বেছে নিতে পারেন, দলাই লামা তাঁদের অন্যতম। এই মানুষদের বলা হয়, ‘তুলফু’ বা অবতার।

এটা সত্যি যে যতদিন আমি তিব্বতে ছিলাম, দলাই লামার গুরুত্ব বেশি ছিল। কিন্তু আমার তখনকার জীবনযাত্রা অধিকাংশ সাধারণ তিব্বতীদের কষ্টময় জীবন থেকে মুক্ত ছিল। যেখানেই যেতাম আমার সঙ্গে একদল ভৃত্য আর দামী জামাকাপড় পরিহিত মন্ত্রী ও সভাসদরা ঘিরে থাকতেন। ওই উচ্চপদাধিকারী সভাসদরা নির্বাচিত হতেন দেশের সর্বাধিক বিত্তশালী পরিবারগুলি থেকে। তাছাড়া মহাজ্ঞানী ও সর্বজনমান্য সাধকরাই ছিলেন আমার দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী। প্রবল শীতেও আরামে থাকার মতো বিশেষভাবে নির্মিত সহস্রাধিক কক্ষবিশিষ্ট পোটালা প্রাসাদ, আর সেখান থেকে কখনও বাইরে পা রাখলে সামনে ও পেছনে কয়েকশো সুসজ্জিত মানুষের শোভাযাত্রা।

ওই শোভাযাত্রার সামনে একব্যক্তি ‘জীবন-চক্র’ র প্রতীক চিহ্ন ‘ঙ্গাগপা’ হাতে নিয়ে হেঁটে যেত। তাঁর পেছনে থাকতো ধ্বজাধারী বিশেষ ঐতিহ্যমণ্ডিত একরঙা বস্ত্র পরিহিত ‘তাতারা’ ঘোড়সওয়ারদের পঙক্তি। তাঁদের পেছনে পাখির খাঁচা আর আমার ব্যবহৃত নানা জিনিস রেশমের কাপড় দিয়ে ঢেকে হাতে নিয়ে সারিবদ্ধ ভৃত্যরা হেঁটে যেত। তাঁদের পেছনে হেঁটে যেতেন দলাই লামার শাসনাধীন নামগ্যাল মঠ থেকে আসা একদল ভিক্ষু। প্রত্যেকের হাতের পতাকায় ধর্মবাক্য লেখা। তাঁদের পেছনে ঘোড়সওয়ার গায়কের দল। গায়কদের পেছনে রাজ্যাধিকারীদের দুটি দল; সামনে সাধারণ আধিকারিকরা আর পেছনে উচ্চপদস্থ ‘সেদ্রুংগ’ আধিকারিকবৃন্দ।

তাঁদের পেছনে দলাই লামার আস্তাবলের ঘোড়াগুলির পাশাপাশি হেঁটে চলা সুসজ্জিত সহিসের দল, পেছনে আরেকদল ঘোড়ার পিঠে রাজ্যের সকল শাসকীয় মোহর এবং অন্যান্য জরুরি জিনিসপত্র। এগুলির পেছনে কুড়িজন সবুজ পোশাক আর লাল টুপী পরিহিত লম্বা চুল পনিটেল পালকিরক্ষক সেনা আর আজানুলম্বিত হলুদ কোট পরিহিত আটজন পাল্কিবাহকের কাঁধে আমার হলুদ পালকি।

উচ্চপদস্থ সেনা আধিকারিকদেরই শুধু মাথার উপরে চুল বাঁধার অধিকার ছিল। পালকির পাশাপাশি হাঁটতেন ‘কাশাগ’ বা দলাই লামার ব্যক্তিগত মন্ত্রীমণ্ডলের চার সদস্য। এদের সামনে থাকতেন দলাই লামার অঙ্গরক্ষক কুসুন দেপোন আর তিব্বতের ছোট্ট সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ মাকচি। এরা স্যালুটের মুদ্রায় তলোয়ার উঁচিয়ে মার্চ করতেন। এদের পরনে নীল উলি পায়জামা আর সোনালি পট্টি লাগানো ঝলমলে কোট আর মাথায় সুদৃশ্য টুপি। এই মুখ্য দলকে ঘিরে এগিয়ে যেত ছয়ফুট লম্বা জবরজং পোশাকে ভয়ানক দর্শন পুলিশ ‘সিংঘা’দের দল। এদের হাতে থাকতো চাবুক, আর এরা প্রয়োজনে যে কাউকে চাবকাতে পারতো।

পালকির পেছন পেছন হাঁটতেন আমার বরিষ্ঠ আর কনিষ্ঠ শিক্ষক। আমি সাবালক হওয়ার আগে পর্যন্ত আমার বরিষ্ঠ শিক্ষকই ছিলেন তিব্বতের রিজেন্ট। তাঁদের পেছন পেছন হাঁটতেন আমার মা, বাবা আর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। তাঁদের পেছনে আগে উচ্চপদস্থ আর পেছনে নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মচারীদের দল হেঁটে যেতেন।

আমি যখনই পোটালার বাইরে বেরুতাম, লহাসা নগরের প্রায় সমস্ত নাগরিক আমাকে দেখতে পথের দুপাশে এসে দাঁড়িয়ে পড়তেন। কেউ টু শব্দটিও করতেন না। নীরবে মাটিতে শুয়ে মাথা উপরে তুলে অশ্রুসজল চোখে আমাকে দেখতেন।

আমাকে অনেক সাক্ষাৎকারকারী জিজ্ঞেস করেছেন যে এই পুনঃর্জন্ম তত্ত্বে বিশ্বাস করি কি না! এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া সহজ নয়। কিন্তু বর্তমান জীবনের অভিজ্ঞতা আর আমার বৌদ্ধ বিশ্বাস অনুযায়ী একথা স্বীকার করতে অসুবিধা হয় না যে আমি পূর্ববর্তী তেরজন দলাই লামার সঙ্গে, চেনরেজিং এর সঙ্গে, আর স্বয়ং বুদ্ধের সঙ্গে আধ্যাত্মিক রূপে যুক্ত।

আমার বয়স যখন তিন বছর পূর্ণ হবে, তখনই তিব্বত সরকার প্রেরিত একটি দল দলাই লামার নতুন অবতারের খোঁজে কুম্বুম মঠে এসেছিলেন। তারপর তাঁরা কিছু চিহ্নের সাহায্যে আমাদের বাড়িতে পৌঁছে যান। আমার পূর্ববর্তী ত্রয়োদশ দলাই লামা ১৯৩৩সালে ৫৭ বছর বয়সে দেহ রাখেন। সেই সময় তিনি দক্ষিণ দিকে মুখ করে বসে ছিলেন। কিন্তু তাঁর শরীর নিস্পন্দ হওয়ার আগে হঠাৎ তাঁর মাথা উত্তর-পূর্ব দিকে ঘুরে গিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পরই তৎকালীন রিজেন্ট, যিনি নিজেও একজন বড় লামা ছিলেন, তিনি একটি অদ্ভূত দৃশ্য দেখেন। দক্ষিণ তিব্বতের পবিত্র সরোবর লহামোই লহাৎসোর জলে তিনি হঠাৎ তিব্বতি লিপির তিনটি অক্ষর ভেসে উঠতে দেখেন, আব, ক আর ম। আর সেই অক্ষরগুলির পেছনে একটি তিনতলা মঠের ছায়া, যার ছাদ সোনা আর প্রবাল দিয়ে তৈরি, আর সেই মঠের পেছন থেকে একটি পায়ে চলা রাস্তা পেছনের পাহাড়ে উঠে গেছে। আর সবার শেষে তিনি একটি ছোট বাড়ি দেখতে পান যার সরু নর্দমাটি ভিন্ন ধরণের। তিনি ভাবেন, আব অক্ষর দিয়ে উত্তর পূর্ব তিব্বতের আমদো প্রদেশই বোঝায়, সেজন্যে খোঁজকারীদের সেই প্রদেশেই পাঠানো হয়!

এই দলটি কুম্বুম পৌঁছুতেই বুঝতে পারে যে তাঁরা সঠিক পথেই যাচ্ছেন। ‘আব’ অক্ষর দিয়ে আমদো বোঝালে ‘ক’ দিয়ে কুম্বুম হওয়া উচিত – আর এই মঠও তিনতলা, যার ছাদ সোনা আর প্রবাল দিয়ে তৈরি, আর সেই মঠের পেছন থেকে একটি পায়ে চলা রাস্তা পেছনের পাহাড়ে উঠে গেছে! এখন তাঁদের সেই ছোট বাড়িটি খুঁজে বের করতে হবে যার সরু নর্দমাটি ভিন্ন ধরণের! সেজন্যে তাঁরা একের পর এক ওই এলাকার গ্রামগুলি ঘুরে ঘুরে খুঁজতে থাকেন। অবশেষে আমাদের গ্রামে এসে আমাদের বাড়ির ছাদ আর বাঁকা কাঠের দেওয়াল দেখতে পান, তাঁদের মনে হয় যে এবার নতুন দলাই লামার সন্ধান পেতে চলেছেন। কিন্তু, তাঁরা কাউকে নিজেদের উদ্দেশ্যের কথা না জানিয়ে সেই রাতটা ওই গ্রামেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন। দলের নেতা উতসাংগ রিম্পোচে দলের অন্যদের সেবকের ভূমিকায় অভিনয় করে উদ্দিষ্ট বাড়ির সবার ছোট ছেলেটির সঙ্গে খেলতে শুরু করেন আর তার হাবভাব লক্ষ্য করতে থাকেন। কিন্তু শিশুটি এক নজরেই তাঁকে চিনে ফেলে আর ‘সেরা লামা, সেরা লামা’, বলে ডাকতে থাকে।উতসাংগ রিম্পোচের মঠের নাম ছিল সেরা লামা।

পরদিনই দলটি ফিরে যায়। কিছুদিন পর সেরা লামার সঙ্গে লাহসা থেকে একটি বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত প্রতিনিধিমণ্ডল ত্রয়োদশ দলাই লামা ব্যবহৃত কিছু জিনিসপত্রের সঙ্গে আরও কিছু একই ধরণের জিনিস নিয়ে আসেন। তাঁরা সেই জিনিসগুলি শিশুটির সামনে নিয়ে গেলে সে তাঁদের অবাক করে দিয়ে শুধুত্রয়োদশ দলাই লামা ব্যবহৃত কিছু জিনিসপত্রগুলিই একটা একটা করে তুলে ধরে ‘এটা আমার, এটা আমার’ বলতে থাকে আর অন্য জিনিসগুলি ছুঁয়েও দেখে না! এতে দলটির মোটামুটি বিশ্বাস হয়ে যায় যে তাঁরা দলাই লামার নতুন অবতার খুঁজে পেয়েছেন!

কিন্তু ওই প্রক্রিয়াকে অন্তিম রূপ দিতে তাঁদের আরেকটি শিশুকেও পরীক্ষা করে দেখতে হতো! কিছুদিন পর সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলে তাঁরা ঘোষণা করে দেন – তাক্তসেরের শিশুটিই দলাই লামা ; সেই শিশুটি ছিলাম আমি!

এসব ঘটনার কথা অবশ্য আমার খুব একটা মনে নেই। তখন আমি অনেক ছোট ছিলাম। শুধু একজনের কথা মনে আছে, তাঁর নাম কেনরাপ তেঞ্জিন, তাঁর দৃষ্টি ছিল তীক্ষ্ণ। তিনিই পরে আমাকে লিখতে শিখিয়েছিলেন। আরও পরে তিনি হয়েছিলেন আমার বস্ত্রাগারের অধিকর্তা।

খোঁজ দল অন্তিম সিদ্ধান্ত নেওয়ার কয়েকমাস পর লাহসা থেকে মহামান্য রিজেন্টের স্বীকৃতি সমাচার আসে। ততদিন আমার পৈতৃক বাড়িতেই থাকার কথা ছিল। কিন্তু এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই আমদো প্রদেশের গভর্নর মা বুফেংগ কিছু সমস্যা সৃষ্টি করায় বাবা আমার নিরাপত্তার কথা ভেবে একদিন শেষরাতে আমাকে আর মাকে কুম্বুম মঠে নিয়ে যান।

রিজেন্টের স্বীকৃতিএলে সেই কুম্বুম মঠেই একদিন কাকভোরে আমার তক্তারোহণ বা অভিষেক সমারোহ আয়োজন করা হয়। সেই ঘটনার কথা আমার খুব ভালভাবে মনে আছে।

তারপরই আমার জীবনের একটি দুঃখময় অধ্যায় শুরু হয়। তক্তারোহণের কিছুদিন পর আমার মা-বাবা গ্রামে ফিরে গেলে আমি অজানা মানুষদের মাঝে একা থেকে যাই। এত ছোট শিশুর পক্ষে বাবা-মায়েরথেকে দূরে থাকা ছিল খুবই কষ্টের।

কিন্তু মঠে আমার দুটো সুবিধাও ছিল। প্রথমতঃ, আমার থেকে তিনবছরের বড় দাদা লোবসাংগ সামতেন ওই গোম্পাতেই থাকতো। সে খুব ভালভাবেই আমার দেখাশোনা করতো, আর সেই মঠেই কিছুদিনের মধ্যে আমাদের ঘনিষ্ঠতা নিবিড় হয়। দ্বিতীয়তঃ, দাদার বৃদ্ধ শিক্ষক আমাকেও খুব ভালবাসতেন। একবার তিনি আমাকে একটি টক মিষ্টি নাড়ু খেতে দিয়েছিলেন। কিন্তু অধিকাংশ সময় আমার খুব কান্না পেত। বিশেষ করে রাত হলে একা বিছানায় মায়ের ও দিদির কথা ভেবে ভেবে প্রায়ই কাঁদতাম। এই দলাই লামা হওয়া ব্যাপারটা আমি বুঝতেই পারতাম না! আমি তো নিজেকে অন্য বাচ্চাদের মতোই ভাবতাম। এমনিতে তিব্বতে বাচ্চাদের অল্পবয়সেই মঠে পাঠানোর পরম্পরা আছে। দুষ্টুমি করলে আমার সঙ্গে অন্য বাচ্চাদের মতোই ব্যবহার করা হতো। আমার এক কাকাও কুম্বুম মঠে ভিক্ষু ছিলেন। একবার সন্ধ্যায় তিনি যখন প্রার্থনাপুস্তক পড়ছিলেন আমি ছুটে পালাতে গিয়ে এক ধাক্কায় তাঁর কাপড়বাঁধা পুঁথির পাতাগুলি চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। কাকা উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে ধরে ফেলে কষে থাপ্পড় কষান। তাঁর রাগ দেখে আমি ভয় পেয়ে যাই। তারপর থেকে অনেক বছর তাঁর কালো কালো বসন্তের দাগভরা চেহারা দেখে ভয় পেতাম।

একদিন দাদার কাছে শুনি যে মা বাবা আসবেন, আর আমার সঙ্গেই লাহসা যাবেন, তারপর থেকে দিনগুলি খুব উৎসাহে তাঁদের জন্যে প্রতীক্ষায় কাটে। অন্য বাচ্চাদের মতন আমিও তখন কোথাও যাওয়ার সম্ভাবনায় খুব খুশি হতাম। কিন্তু সেই দিনটির জন্যে অপেক্ষা করতে হয় প্রায় ১৮ মাস, কারণ বুফেংগ অঢেল অর্থ না পেয়ে আমাদের যাওয়ার অনুমতি দিতে অস্বীকার করে। লাহসা থেকে ওর দাবি অনুসারে অর্থ পাঠানোর প্রতিশ্রুতির পর সে আরও অর্থ দাবি করে বসে। এভাবেই তালবাহানায় ১৯৩৯এর গ্রীষ্মকাল পেরিয়ে যায়। কিন্তু এবার লাহসা বেঁকে বসলে বুফেংগ আগের দাবিমতন অর্থ নিয়েই আমাকে যেতে দিতে রাজি হয়।

অবশেষে, আমার বয়স চারবছর হওয়ার এক সপ্তাহ পরে সেই যাত্রার দিনটি ঠিক হয়। সেই দলে অনেকেই ছিলেন। আমার বাবা, মা আর ভাই লোবসাংগ ছাড়াও খোঁজ দলের সকল সদস্য আর অনেক তীর্থযাত্রীও ছিলেন। আমাদের দেখাশোনার জন্যে অনেক সরকারী কর্মচারী মোতায়েন ছিলেন, অনেক খচ্চর-আরোহী সৈনিক এবং স্কাউটও ছিলেন। এদের প্রত্যেকেরই তিব্বতের দুর্গম পথে দীর্ঘযাত্রায় বেরিয়ে পড়া তীর্থযাত্রীদের পথে সাহায্য করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এরা জানেন যে কোন নদী পার হতে কোথা দিয়ে যেতে হবে, কোন গিরিপথ অতিক্রম করতে কতটা সময় লাগবে!

কয়েকদিন ধরে পথ চলার পর আমরা বুফেংগ শাসিত প্রদেশের সীমা অতিক্রম করি। তিব্বত সরকার আমাকে চিহ্নিত করার সরকারি ঘোষণা করে। এখন আমরা বিশ্বের একটি সুন্দরতম দেশে প্রবেশ করি – বিশাল উত্তুংগ পর্বতমালা আর পাদদেশে সুবিস্তৃত ঊষর সমতলভূমি, সেই জনবসতিহীন প্রকৃতির বিশালতার মধ্যে আমরা একদল পিঁপড়ে কিম্বা ছোট ছোট পোকার মতন এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকি। কোথাও কোথাও চলমান গলিত বরফের প্রবাহ লাফিয়ে পার হতে হয়। আরও কয়েকদিন পর পাহাড়ের খাঁজে বেশকিছু সবুজ ঘাসের ঝোপের ফাঁকে লুকিয়ে বসে থাকা শুনশান ছোট গ্রামের কাছে পৌঁছুই।

আমাদের লাহসা পৌঁছুতে তিনমাস লেগে যায়। কয়েকটি আশ্চর্যজনক দৃশ্য ছাড়া আমার তেমন কিছু মনে নেই। আমি অবাক হয়েছিলাম জংলী চমরী দেখে, সেগুলিকে ‘দ্রোংগ’ বলা হয়। বড়ো বড়ো চমরীর পাল বিশাল ময়দান পেরিয়ে যাচ্ছে; কিম্বা ‘ক্যাংগ’ নামক জংলী গাধার পাল ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে, আর তাদের মাঝখান দিয়ে পথ বের করে হরিণ চোখের নিমেষে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে গিয়ে দূরবর্তী কোনও পাহাড়ের খাঁজে অদৃশ্য হয়ে যায়। এরকম মাঝেমধ্যে আকাশে ডানা মেলা পাখি দেখেও আমার খুব ভাল লাগত।

এই সফরের বেশিরভাগটাই আমি ‘ড্রেলজাম’ নামক চাকা লাগানো পালকিতে আমার দাদা লোবসাং সামতেনের সঙ্গে বসে ছিলাম। দুটো খচ্চর সেই চাকা লাগানো পাল্কিটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো। আমরা দু’জন সেখানে বসে গল্প করেছি, অন্যান্য বাচ্চাদের মতন ঝগড়া মারামারি, কিল ঘুষিও চালিয়েছি। ফলে পাহাড়ি মাঝেমধ্যেই পালকি ভারসাম্য হারিয়ে উলটে যাওয়ার মতন অবস্থাও হয়েছে। এরকম সময়ে চালক, পালকি থামিয়ে আমাদের মাকে ডেকে আনতেন। তিনি যখন ভেতরে তাকাতেন, বেশিরভাগ সময়ই দেখতেন যে আমার দাদার চোখে জল, আর আমি বীরদর্পে বসে আছি। সে আমার থেকে বয়সে বড়ো ছিল, কিন্তু আমি তাঁর থেকে শক্তিশালী ছিলাম। এম্নিতে আমরা খুব ভাল বন্ধু ছিলাম, কিন্তু একসঙ্গে থাকলে মারামারিও করতাম। আমাদের মধ্যে কেউ কোনও কথা বললে, অন্যজন তার জবাব দিতাম, আর তর্ক শুরু হতো, যা শেষ হতো চড় থাপ্পড় আর চোখের জলে। কিন্তু চোখের জল সবসময় দাদার চোখ থেকেই গড়াতো। লোবসাং সামতেনের স্বভাব খুব ভাল ছিল, আর সে কখনও আমাকে আগে মারতো না। মা কিন্তু আমাদের দুজনকেই বকতেন, আর আলাদা করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে শান্ত রাখতেন। আমরা যতই ঝগড়া করি না কেন, পরস্পরকে ছেড়ে থাকার কথাই যেন ভাবতে পারতাম না!

অবশেষে আমাদের দল লাহসার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তখন শরৎকাল। আমাদের দলটি লাহসার কাছাকাছি এলে, কয়েকজন উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা আমাদের স্বাগত জানাতে আসেন, আর আমাদের ধীরে ধীরে রাজধানীর সিংহদ্বার থেকে দুই মাইল দূরে দোয়েগোথাংগ ময়দানে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে দেখি সারি সারি অনেককটা নানা রঙের তাঁবু খাটানো। সেগুলির মাঝে একটি বড়ো নীল-সাদা রঙের তাঁবুতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল, সেই তাঁবুটির নাম ছিল, ‘মাচা চেনমো’ অর্থাৎ, ‘মহান ময়ূর’। তাঁবুর ভেতরটাও সুসজ্জিত,মাঝখানে রাখা ছিল একটি অসাধারণ কারুকার্য করা কাঠের সিংহাসন। আমাকে সেখানে বসিয়ে রাজকীয়ভাবে স্বাগত জানানো হয়। আমার কেমন জানি ভয় করছিল, আবার ভালও লাগছিল।

স্বাগত জানানোর পর সেখানেই নানা মাঙ্গলিক মন্ত্র উচ্চারণের পর আমাকে তিব্বতের জনগণের ধার্মিক নেতা ঘোষণা করা হয়। এই সমারোহ সারাদিন চলে। কিন্তু সারাদিন ধরে কী কী হয়েছিল - সব আমার মনে নেই। শুধু মনে আছে, অনেক মানুষের ভিড়, আর আমি বাড়িতে পৌঁছে গেছি – এ ধরণের একটা স্বস্তির অনুভূতির কথা। এর আগে আমি কখনও এত মানুষ একসঙ্গে দেখিনি। পরে জেনেছি, সেদিনও বেশ কয়েকজন বরিষ্ঠ ভিক্ষু এটা পরীক্ষা করতে এসেছিলেন যে আমিই সত্যি সত্যি ত্রয়োদশ দলাই লামা কি না! তাঁদের সামনে একটা চার বছরের শিশু হয়ে আমি নাকি সব প্রশ্নের সপ্রতিভ উত্তর দিয়েছিলাম। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সন্ধ্যায় লোবসাং সামতেন আর আমাকে নরবুলিংকা প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হয়। নরবুলিংকা শব্দের অর্থ হল – হিরে মুক্তোর উদ্যান। লাহসা শহরের পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে এই প্রাসাদটি। এটি প্রথাগতভাবে দলাই লামার গ্রীষ্মকালীন আবাস। কিন্তু রিজেন্ট পরের বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। তারপর তিব্বত সরকারের প্রাণকেন্দ্র পোটালা প্রাসাদে আমার তক্তারোহন সমারোহ হবে। তার আগে আমার সেখানে থাকা হবে না। এতে আমার কোনও অসুবিধা হয়নি, হওয়ার কথাও নয়! পরে বুঝেছি, পোটালার তুলনায় নরবুলিংকা অনেক মনোহর বাসস্থান। নরবুলিংকায় চারপাশে অনেক কটা ফুলের বাগান আর আর ছোটো ছোটো উন্মুক্ত বেশ কয়েকটি পাকা বাড়ি। সেখান থেকে মাথা উঁচু করে পোটালার বিশাল প্রাসাদ দেখা যায়, পরে জেনেছি, এর অনেক কামরাই অব্যবহৃত,অন্ধকারাচ্ছন্ন, শীতল এবং মন উদাস করা আবহ।

সেজন্যে নরবুলিংকায় একটি গোটা বছর দাদা লোবসাং সামতেনের সঙ্গে খেলাধুলো করে, মা-বাবার সঙ্গে নিয়মিত দেখা করে কেটে গেল। তখন অনুভব করিনি, ওই দিনগুলিই ছিল আমার জীবনে স্বাধীনতার অন্তিম দিনগুলি।


চলবে ...