সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০

মহাসত্যের বিপরীতে তৃতীয় খণ্ড # পঞ্চদশ পর্ব

‘ কোকিলেরা আসে হিমালয়ের দক্ষিণ থেকে/ বার্ষিক বর্ষাও এখন আসে/ আমি ভালবাসার মুখোমুখি/ তৃপ্তিতে বিশ্রাম নিই’।

- ৎসাংইয়াং গ্যাৎসো( ৬ষ্ঠ দলাই লামা)

5f0e9957555dd.jpg

বৌদ্ধ দর্শনের এই তৃপ্তি এবং বিশ্রাম নিয়ে আমার মনে কিছু আপেক্ষিক ভাবনা কাজ করে।

লোবসাঙ্গ তাশি এবং লুখাংগ্বার পদত্যাগের প্রায় এক বছর পরে, চীন সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ আসে তিব্বত সরকারের কিছু কর্মকর্তাকে চীনে পাঠানোর জন্য। যাতে তাঁরা গিয়ে ঘুরে দেখে যে নতুন সরকারের গৌরবময় শাসনকালে মাতৃভূমির জীবন কতটা উন্নত হয়েছে।সুতরাং একটি দল গঠন করা হয় এবং তাঁদের চীনা প্রজাতন্ত্র সফরে পাঠানো হয়।বেশ কয়েক মাস পরে, তাঁরা ফিরে এসে,আমাদের কাছে যে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করে সেটি যে অহেতুক প্রশংসা এবং মিথ্যায় পরিপূর্ণ ছিল তা আমি বুঝতে পারি। কারণ, সেই সময়ের মধ্যে এই বিষয়টিতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম যে এই নতুন মালিকদের তদারকিতে থেকে কারও পক্ষে সত্য বলা প্রায়শই অসম্ভব।পাঞ্চেন লামার সঙ্গে সাক্ষাতের পর থেকে আমার এই বোধটা আরও তীব্র হয়। সেই বোধ আমার নিজের ব্যক্তিত্ব গঠনে সাহায্য করে। সেই থেকে, আমি একইভাবে যোগাযোগ করতে শিখেছি: কঠিন পরিস্থিতিতে চীনাদের সাথে যোগাযোগ করার সময় কীভাবে সত্য বলা যায়!

এর কিছুদিন পরে, ১৯৫৪ সালে, চীনের চেয়ারম্যান স্বয়ং আমাকেচীন সফরের আমন্ত্রণ জানান।এই আমন্ত্রণে আমি বেশ খুশি হই। এবার হয়তো নিজের মুখে চেয়ারম্যান মাওয়ের সঙ্গে দেখা করে চীনা আগ্রাসনে তিব্বতিদের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা বলার সুযোগ পাব, বাইরের বিশ্ব দেখারও সুযোগ পাব। কিন্তু কাশাগ এবং আমার ঘনিস্ট তিব্বতীরাদুশ্চিন্তা জানান।তাঁদের আশঙ্কা যে আমাকে বেইজিংয়ে রাখা হবে এবং আর ফিরে আসতে দেওয়া হবে না, আমার জীবন সেখানে বিপন্ন হতে পারে ভেবে তাঁরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমার নিজের কোনও ভয় ছিল না, তাই অন্যদের দুশ্চিন্তাকে আমল না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।এই সিদ্ধান্ত না নিলে সেবার আমি চীনে যেতে পারতাম না।

নিজের মানুষদের স্বার্থে কিছু করার ইচ্ছে থেকেই হয়তো অবশেষে, চীন সফরে গেলাম। আমার সঙ্গে ছিল আমার পরিবার, আমার দুই শিক্ষক, দুই 'সেনশাপ'-- ত্রিজং রিনপোচে আমার কনিষ্ট শিক্ষক নিযুক্ত হওয়ার পর একজন নতুন কর্মচারী নিযুক্ত হয়েছিল - কাশাগ এবং আরও অনেক কর্মকর্তা ।সব মিলিয়ে আমাদের সংখ্যা ছিল পাঁচশো।গ্রীষ্মের এক সকালে যখন যাত্রার জন্য প্রস্তুত, আমাদের কিচু নদীর তীরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানানো হয়।হাজার হাজার মানুষ, সরকারি ব্যান্ড এবং ইউনিফর্ম পরিহিত আধিকারিকরা, প্রত্যেকের হাতে হাতে অসংখ্য ধর্মীয় পতাকা ছিল এবং আমাদেরনিরাপদ যাত্রা এবং প্রত্যাবর্তনের কামনায় তাঁরা ধূপের ধোঁয়া ও গোছা গোছা ধূপকাঠি জ্বালিয়ে বুদ্ধের মন্ত্র উচ্চারণ করছিলেন।

তখন কিচু নদীর উপর কোনও সেতুছিল না, তাই আমরা পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি নৌকায় নদীটি পেরিয়েছিলাম; নদীর অন্যপারে নামগিয়াল ভিক্ষুরা দাঁড়িয়ে মন্ত্রপাঠ করছিলেন।আমি যখন দুটি ছোট নৌকা জুড়ে তৈরি আমার বিশেষ নৌকোটিতে চড়ে আমার জনসাধারণকে বিদায় জানাতে হাতজোড় করে ঘুরে দাঁড়াই, তখন লক্ষ্য করি, তাঁরা প্রত্যেকেই যেন আবেগে মধ্যে ডুবে গেছেন।অনেকে তো প্রবল কান্নাকাটি করে এমনভাবে দু’হাত বাড়িয়ে ছুটছিলেন যে আমার ভয় করছিল, কেউ নদীর জলে না ডুবে যান! যেন তাঁরা আমাকে শেষবারের জন্য দেখছেন! চারবছর আগে দ্রোমো যাওয়ার সময় ঠিক এইরকম মানুষের আবেগ দেখে কেঁদে ফেলেছিলাম। এবারও দেশবাসীকে এরকম করতে দেখে আমার মন খারাপ হয়ে যায়। তবে আগেরবারের মতন এই মনখারাপ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। একজন তরুণ উনিশ বছর বয়সী তরুণের মনে বিদেশযাত্রার সুযোগ কিছু নতুন অনুভূতি এনে দেওয়ায় সে মনে মনে খুশি হয়ে উঠতে থাকে।

লাহসা থেকে বেইজিংয়ের দূরত্ব প্রায় দুই হাজার মাইল।১৯৫৪ - তে এই দুই শহরকে যুক্ত করে এমন কোনও রাস্তা ছিল না, যদিও চীনারা সাংহাই মহাসড়ক নামক একটি রাস্তা তৈরির কাজ শুরু করেছিল সেখানে তারা জোর করে তিব্বতীদেরকাজ করাচ্ছিল। এর যতটা অংশ তৈরি হয়েছিল, ততটা আমি ত্রয়োদশদালাই লামার ডজ মোটরকারে বসে যাই।এই গাড়িটিও নৌকোয় করে নদী পার করা হয়েছিল।আমরা প্রথম থামি লাহসা থেকে 35 মাইল দূরে গান্দেন মঠে, সেখানে আমরা কয়েকদিন থাকি।এই কয়েকদিনে আমি অনেক নতুন অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হই।গান্দেন মঠ তিব্বতী বিশ্ববিদ্যালয় বিহারগুলির মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম।এখান থেকে চীন সফরে এগিয়ে গেলাম যাওয়ার আগে একটি অসাধারণ ঘটনা সবাই হতবাক করে দেয়।তিব্বতের রক্ষক দেবতাদের অন্যতম, যাঁর মাথাটা মোষের, তাঁর স্থান থেকে নড়ে গিয়েছিল।গতবার যখন দেখেছিলাম, তখন তিনি শান্তদৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন।কিন্তু এবার তাঁর চেহারা পূর্ব দিকে ঘুরে গেছে আর মুখের ভাব অত্যন্ত ভয়ংকর। (একইভাবে, পরে যখন আমি দেশত্যাগ করি, তখন এই গান্দেন মঠের মন্দিরের একটি প্রাচীর রক্তে ভরে গিয়েছিল)।

এবারেও ত্রয়োদশ দালাই লামার ডজ মোটরগাড়িতে বসেই আমার যাত্রা শুরু হয়।কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরে, আমি এই আরামদায়ক গাড়ি ছেড়ে খচ্চরের পিঠে চাপতে বাধ্য হই। পরবর্তী পথ বন্যার তোড়ে ভেসে গেছে, সব সেতু ভেঙে গেছে। আর গাড়ি যাওয়ার রাস্তা নেই। পাহাড়ের বরফ গলে খরস্রোতে বড় বড় মাটির টুকরো ভেসে যাচ্ছে। গ্রীষের শেষ দিনগুলিতে মধ্য ও উত্তর তিব্বতে প্রায়ই এরকম ভারী বর্ষণ হয়। নদী তীরবর্তী মাটিতে পা রাখলে হাঁটু পর্যন্ত পা ডুবে যায়। আমাদের দলের বয়স্ক মানুষদের এগিয়ে যেতে অসুবিধা হচ্ছিল, যা দেখে আমার খুব কষ্ট লাগে।

সামগ্রিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। আমাদের তিব্বতীয গাইডরা এই নতুন তৈরি পথ ছেড়ে চীনা কর্তৃপক্ষকে পুরাতন পার্বত্য পথে যাওয়ার প্রয়োজন বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁরা এতে রাজি হন না। তাঁরা বলেন, এ পথে যথেষ্ট পরিষেবা নেই। সুতরাং আমাদের যাত্রা এই তথাকথিত মহাসড়ক ধরেই অব্যাহত ছিল এবং আমি এটিকে একটি অলৌকিক ঘটনা বলব যে এত ভয়ঙ্কর কষ্টে তিনজনের বেশি লোক মারা যায় নি। আর সেই মারা যাওয়া তিনজনই ছিলেন চীনা সৈন্য। যুবক, যাদেরকে তাঁদের অগ্রজ সৈনিকরা রাস্তার পাশ থেকে তুষারের ধ্বস রুখতে পথের পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়েছিলেন। আর তাঁরা নিজেদের কর্তব্য করতে করতে একসময় একে অপরের সঙ্গে স্তুপীকৃত হয়ে মৃত্যুমুখে ঢলে পড়েছে, অন্য অনেকে অসুস্থ হয়েছে। আমার চীন সফরের মতন সাধারণ কারণে ওদের এই মৃত্যু আর এতজনের অবর্ণনীয় কষ্ট আমাকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। অনেকগুলি খচ্চরও পা পিছলে নীচে খাদে পড়ে গিয়ে তাদের পেট ফেটে যায়। এত মৃত্যুতে আমি খুব দুঃখ পাই। কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। কিন্তু আমাদের কাফেলা দুর্গম পথ ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে। প্রতিদিনই মাঝরাত থেকে দুপুর এগারোটা বারোটা অব্দি চলা, এই সময়টায় খরস্রোতাগুলির স্রোত কম থাকে, সূর্য ওঠার পর থেকে বরফ বেশি গলে বলে প্রত্যেক দুপুরে পথের ধারে বড়ো জায়গা দেখে তাঁবু খাটিয়ে খাওয়া দাওয়া আর বিকেলে ও সন্ধ্যায় দিকে বিশ্রাম।

কয়েকদিন পর এক সন্ধ্যায় জেনারেল চিয়াং চিন-উ, যিনি স্বয়ং আমাদের সঙ্গে সফর করছিলেন, আমার তাঁবুতে এসে বলেন যে আগামীকাল যাত্রা আরও ভয়ঙ্কর হবে। খচ্চর থেকে নেমে হেঁটে যেতে হবে। সুতরাং, চীন সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। তাঁর বক্তব্য শুনে আমি ভাবতে শুরু করি যে জেনারেল সাহেবের সম্ভবত ভুল ধারণা রয়েছে যে তিনি যেভাবে আমার দুই প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দিতে সফল হয়েছেন, তেমনি প্রকৃতির উপরও কার্যকর হতে সক্ষম হবেন।

অগত্যা আমি সেদিন চিয়াংয়ের হাত ধরে হেঁটেছি। তিনি আমার থেকে অনেক বয়স্ক, বেশ অসুস্থও, তাই এই ব্যবস্থাটি উভয়ের জন্যেই অত্যন্ত বিরক্তিকর প্রমাণিত হয়। তাছাড়া, আমি আরও শঙ্কিত ছিলাম যে উপর থেকে ক্রমাগত গড়িয়ে আসতে থাকা পাথরের টুকরো গুলি যদি ভুলে যায় যে এত বড়ো পদমর্যাদার সেনাকর্তা যাচ্ছেন, আর হুড়মুড় করে তার উপর পড়লে আমি সামলাতে পারবো কি?

যেখানেই বিশ্রামের জন্য থামা হতো, সেগুলি সবকটি ছিল চীনা মুক্তিসেনার লাল রঙের পতাকা লাগানো চৌকি কিম্বা ছাউনি। সেখানকার চীনা সেনারা তৎপরতার সঙ্গে আমাদের চা দিতেন। একদিন এত তৃষ্ণার্ত ছিলাম যে আমার কাঁধের ঝোলায় থাকা চায়ের মগ না বের করে ওদের দেওয়া মগেই চা খাই। আর তারপর দেখি যে মগটি অত্যন্ত নোংরা, চায়ের নিচে ছিল খাবারের টুকরো এবং তাতে থুথু। আমার ওকি উঠে আসে। হড়হড় করে বমি করে ফেলি। কারণ, শৈশব থেকেই খাওয়া দাওয়ার ব্যপারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং অত্যন্ত যত্নে অভ্যস্ত। তবে এখন সেদিনের কথা মনে পড়লে হাসি পায়।

দু’সপ্তাহ পরে, আমরা দ্রেমো নামে একটি ছোটো শহরে পৌঁছই, যেখানে আমরা একটি জলপ্রপাতের পাশে তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটাই। আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ এবং নদীর তীরে নানা রঙের ফুলগুলি দেখতে খুব সুন্দর। দশ দিন পরে আমরা পপুল প্রদেশে পৌঁছই। এখান থেকে রাস্তাটি ভাল, যানবাহন চলতে পারে। এবার আমরা চীনা মিলিটারি জিপ এবং ট্রাকে করে এগিয়ে চলি। এবার আবার সফর ভাল লাগতে শুরু করে। আমাদের দলের সকলেরই হয়তো ভাল লাগে। কিন্তু আমি আমার আধিকারিকদের একজনের অবস্থা কখনই ভুলব না। এই দীর্ঘ পথযাত্রায় তাঁর কোমরে এত ব্যথা শুরু হয়েছিল যে তাঁকে ক্যাম্পকটে শুইয়ে চারজনকে কাঁধে করে নিয়ে যেতে হয়েছিল। তারপরও তিনি হুশ আছে কিনা দেখার জন্য বারবার হাত দিয়ে কখনও নিজের এই গাল, আবার কখনও ওই গালে হাত ঠেকিয়ে নিজের শরীরে চেতনা আছে কিনা পরীক্ষা করছিলেন।

লাহসা থেকে এতদূরে এই তিব্বতী প্রদেশে চীনা জবরদখলের প্রভাব টের পাওয়া যাচ্ছিল। পথের দুপাশে কয়েক কি.মি. পরপরই ওরা চীনা সেনা আধিকারিকদের জন্য ব্যারাক ও অস্থায়ী ছাউনি বানিয়ে রেখেছে। বড়ো জনপদগুলিতে পাকা দালান তুলে নিয়েছে। সব জায়গায় সেনার লাউডস্পিকার লাগানো, সেগুলিতে মান্দারিন ভাষায় ‘মাতৃদেশের কল্যাণের জন্য’ গানটি ও সেটার তিব্বতি অনুবাদ বাজিয়ে জনগনকে চীনা জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা চলছে।

এর পরে আমরা খাম প্রদেশের রাজধানী চামডো পৌঁছোই, যেখানে আমার জন্য বিশাল সম্বর্ধনা সভার আয়োজন হয়। যদিও এর সমস্ত আয়োজন চীনাদের হাতে ছিল, সেজন্য এই সভার স্বাদ ও বৈশিষ্ট অন্যরকম ছিল। আমার নিজের মানুষদেরই কেমন অন্যরকম লাগছিল। ফৌজি ব্যান্ড চেয়ারম্যান মাও এবং বিপ্লবের প্রশংসা করে লেখা গানের সুর বাজাচ্ছিল, আর তিব্বতিরা চীনের লাল ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে আমাকে স্বাগত জানাচ্ছিল।

চামডো থেকে আমাকে জীপে করে তিব্বতের সীমানা পেরিয়ে চীনের চেংডু পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছতে, এমন একটি পাহাড়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয় যেটিকে যুগ যুগ ধরে তিব্বত ও চীন ঐতিহাসিক সীমানা হিসেবে মেনে এসেছে। যখন আমি জীপে বসে সেই পাহাড় পেরিয়ে উত্তরের সমতলের দিকে নামতে থাকি, তখন একদম বুঝতে পারি যে এই এলাকা আমাদের তিব্বতের থেকে কত ভিন্ন।

চেংডু পৌঁছুতেই আমার শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসে। সেজন্যে জায়গাটা ঘুরে দেখতে পারিনি, এবং বেশ কিছুদিন শয্যাশায়ী থাকি। শরীর কিছুটা সুস্থ হলে আমাকে ও তিব্বত সরকারের কয়েকজন বড়ো আধিকারিককে শিনগাং নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে পাঞ্চেন লামাও আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। কয়েক মাস আগেই তিনি শিগাৎসে থেকে শিনগাং এসেছেন। আমাদের সবাইকে বিমানে জিয়ানে নিয়ে যাওয়া হয়।

আমরা যে বিমানে জিয়ানে গেছি, সেটি অত্যন্ত পুরানো, কখনও এটি ভাল বিমান ছিল বলা যেতে পারে। এর ভেতরে আসনগুলি সপাট লোহার, সেগুলিতে কোনও গদি ছিল না। সেজন্যে ঐ বিমানযাত্রা মোটেই আরামপ্রদ ছিল না। কিন্তু প্রথমবার বিমান সফরের ফলে আমি এতটাই উত্তেজিত ও উৎসাহিত ছিলাম যে আমি কোনও কষ্টকে পরোয়া করিনি, ভয়ও পাই নি। যদিও এরপর থেকে বিমানযাত্রা আগে আমি যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে শুরু করি। আর সহযাত্রীদের সঙ্গে তেমন মেলামেশা করতে পারি না বলে এখন আমি বিমানযাত্রাই পছন্দ করতাম না। আর এখন আমি কারও সঙ্গে বেশি কথা না বলে সেই সময়ে প্রার্থনা করতে পছন্দ করি।

জিয়ন থেকে আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের জন্য রেলগাড়িতে ওঠানো হয়। সেটিও আমার জীবনের একটি অনন্য অভিজ্ঞতা। আমার এবং পাঞ্চেন লামার জন্য নির্দ্ধারিত রেলের কামরায় তাদের সমস্ত ধরণের সুব্যবস্থা ছিল। ভাল বিছানা, স্নানঘর এবং খাদ্যের ব্যবস্থা। কাশাগের অন্যান্য সদস্যদের জন্যও প্রায় একইরকম ব্যবস্থা ছিল। শুধু একটি বিষয় তখনও আমাকে দুশ্চিন্তায় রেখেছিল, তা হ'ল, চীনের রাজধানীতে আমাদের কিভাবে গ্রহণ করা হবে!

অবশেষে আমাদের ট্রেনটি যখন বেইজিং রেলস্টেশনে পৌঁছয়, স্টেশনে আমাদের স্বাগত জানাতে আসা হাজার হাজার যুবকের ভিড় দেখে নিশ্চিত হই। কিন্তু একটি অদ্ভুত অনুভূতি আমাকে আবার উদ্বিগ্ন করে তোলে। স্বাগত জানাতে আসা যুবকদের মুখের দিকে তাকিয়ে না জানি কেন আমার মনে হয়, তাঁদের হাসিমুখ এবং শ্লোগানগুলি সব কৃত্রিম, তাঁরা কারো আদেশ অনুসারে কাজ করছে!

আমরা ট্রেন থেকে নামতেই, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাই এবং উপাধ্যক্ষ চু তেহ আমাদের স্বাগত জানান; দুজনের শরীরী ভাষা অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল । তাঁদের সঙ্গে একজন মধ্যবয়সী তিব্বতি ছিলেন, যাকে আমি লাহসায় জেনারেল তান কুয়ান - সেনের সাথে দেখেছিলাম - তাঁর নাম ফুন্তসোগ ওয়াঙ্গিয়াল। তিনি আমার জন্য নির্দ্ধারিত বাংলো বাড়িটা পর্যন্ত আমার সঙ্গে যান, চারপাশে একটি সুন্দর বাগান। এই বাড়িটা এতদিন ছিল জাপানি দূতাবাস। আমাকে পৌঁছে দিয়ে ফুন্তসোগ ওয়াঙ্গিয়াল পরবর্তী কয়েকদিনের কর্মসূচির কথা বলেন।

কথায় কথায় কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আমার ভাল বন্ধু হয়ে পড়ে্ন। তিনি খামের বাসিন্দা ছিলেন। ছোটোবেলায় তিনি বাথাং শহরে খ্রিস্টান মিশনারি স্কুলে পড়াশোনা করেন, সেখানে তিনি ইংরেজিও শিখেছেন। পাশাপাশি খুব ভালভাবে চীনা ভাষাও শেখেন। বহু বছর আগেই তিনি কমিউনিস্ট আদর্শ গ্রহণ করেন। চীনে আসার আগে তিনি লাহসার চীনা মিশন স্কুলে পড়াতেন এবং কমিউনিস্টদের দূতের মতো কাজ করতেন। ১৯৪৯ সালে মিশনটি বন্ধ করে, এর সদস্যদের তিব্বত থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়। তিনিও তাঁর তিব্বতী মুসলমান স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে চীনে চলে এসেছিলেন।

ফুন্তসোগ ওয়াঙ্গিয়াল চেয়ারম্যান মাওয়ের সঙ্গে আমার কথোপকথনে একজন সফল দোভাষীর কাজ করেছেন। তিনি চেয়ারম্যান মাওয়ের খুব অনুগত, কিন্তু ভীষণ সৎ, শান্ত, বুদ্ধিমান এবং একজন ভাল চিন্তাবিদও। তাঁর সঙ্গ আমার ভাল লাগতে শুরু করে। তিনিও যে দোভাষী হিসাবে কাজ করতে পেরে খুশি তা বুঝতে পারি আমার প্রতি তাঁর অনুভূতি দেখে। একবার আমরা তিব্বতের কথা বলছিলাম, তখন তিনি বলেন যে তিব্বতের ভবিষ্যত সম্পর্কে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী, কারণ দালাই লামার মন খুব উন্মুক্ত!

তিনি আরও বলেন, কয়েক বছর আগে নরবুলিংকায় গিয়েছিলাম, আপনাকে দেখেছিলাম, ছোট একটা বাচ্চা সিংহাসনে বসে আছেন, এখন আপনি আর সেই ছোট বাচ্চা নন, এবং আমার সঙ্গে এখানে বেইজিঙে আছেন!

একথা বলে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠেন এবং প্রকাশ্যে কেঁদে ফেলেন। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে কয়েক মিনিট পরেই তিনি আবার কমিউনিস্ট হয়ে ওঠেন এবং আমার সঙ্গে যুক্তি দিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। তিনি বলেন, আধুনিক দালাই লামার দেশ-শাসনে জ্যোতিষশাস্ত্র ব্যবহার করা উচিত নয়!

একটু থেমে আবার বলেন, জীবন চালানোর জন্য ধর্ম নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নয়!

তাঁর বলার ভঙ্গি অত্যন্ত আন্তরিক, তাই আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। তিনি অন্ধবিশ্বাস প্রসঙ্গ তুললে তা নিয়ে আলোচনার সময় আমি তাকে বলি, স্বয়ং বুদ্ধ জোর দিয়ে বলেছেন, যে কোনও কিছুকে সত্য কিম্বা মিথ্যে ভাবার আগে তাকে সম্পূর্ণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আমি ধর্মকে জীবনে প্রয়োজনীয় বলে মনে করি, বিশেষ করে যাঁরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত!

এমনই অনেক তর্ক চলতে থাকে। আর তর্কের পর অনুভব করি যে আমরা দু’জনেই দু’জনকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি। আমাদের মধ্যে পার্থক্যগুলি ব্যক্তিগত বিশ্বাস নির্ভর, তাই এগুলি দ্বন্দ্বের বিষয় নয়। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে বুঝি আমরা দুজনেই তিব্বতী, মনেপ্রাণে তিব্বতকে ভালবাসি, তিব্বতের ভাল চাই।

বেইজিংয়ে যাওয়ার দু-একদিন পরে ফুন্তসোগ ওয়াঙ্গিয়াল আমাকে জানান যে গোটা তিব্বতী প্রতিনিধিদলকে সরকারের পক্ষ থেকে ডিনারের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সেজন্য তিনি সেদিন বিকেলে আমাদের সকলকে যে শিষ্টাচার পালন করতে হবে, সেগুলির অনুশীলন করান। ফুন্তসোগ ওয়াঙ্গিয়াল বলেন, চীনারা সৌজন্য সম্পর্কে খুব সচেতন!

অনুশীলনের সময় আমাদের সরকারের কর্মকর্তাদের উদ্বেগ চরমে ওঠে। তাঁরা ভয় পাচ্ছিলেন, শিষ্টাচারে ভুলত্রুটি হলে তাঁদের কারণে আমাকে না লজ্জিত হতে হয়! তাই ফুন্তসোগ ওয়াঙ্গিয়াল আমাদের যা যা বলছিলেন, সবাই বুঝে বুঝে পা ফেলছিলেন, এমনকি কতগুলি ধাপ এগিয়ে যাওয়ার পরে আমাদের বাঁ কিম্বা ডানদিকে যেতে হবে! অনুষ্ঠানটি ছিল সেনার প্যারেডের মতন। প্রত্যেককে একটি নির্দিষ্ট ক্রমে দাঁড়াতে হয়। প্রথমে আমার পেছনে পাঞ্চেন লামা, তাঁর পেছনে আমার দুই অধ্যাপক, তারপরে কালোন - কাশাগের চারজন সদস্য - প্রত্যেকে তাঁদের পদমর্যাদা ও সিনিয়রিটি অনুসারে সারিবদ্ধ হয়ে অনুশীলন করতে হয়। আমাদের প্রত্যেককে পদমর্যাদা অনুসারে একটি করে উপহার বহন করতে হয়। এই সমস্ত প্রক্রিয়া, মহৎ রীতিনীতি এবং শিষ্টাচারের নিয়মের জন্য বিখ্যাত আমাদের মতন তিব্বতিদের কাছেও কঠিন লাগে। কিন্তু আমাদের দোভাষীর আন্তরিকতার ফলে লিং রিনপোচে ছাড়া বাকিরা বারবার অনুশীলন করতে থাকেন। লিং রিনপোচে এই আনুষ্ঠানিকতাগুলি পছন্দ করেন নি, এবং অনুশীলনেও বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখাননি।

দ্বিতীয় দিন, যতদূর মনে পড়ে আমার প্রথমবারের মতো চেয়ারম্যান মাওয়ের সঙ্গে দেখা হয়। এটি একটি সরকারি বৈঠক ছিল, যেখানে আমাদের নিজের পদমর্যাদা অনুসারে নিজের পরিস্থিতি অনুসারে এগিয়ে যেতে হয়।

আমরা যখন হলের ভেতরে সারিবদ্ধ হয়ে ঢুকলাম, প্রথম যে বিষয়টি আমার চোখে পড়ে তা হল সরকারি ফটোগ্রাফারদের সুবিধার জন্যে লাগানো সারিবদ্ধ বাতিস্তম্ভে টাঙানো বড় বাতিগুলি। আর এগুলির নিচে ঘরের মাঝে শান্ত ও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে চেয়ারম্যান মাও। তাঁর চেহারায় প্রখর বুদ্ধির ছাপ ছিল না। কিন্তু যখন হাত মেলাই তখন বুঝতে পারি যে একজন শক্তিমান চৌম্বকীয় ব্যক্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বৈঠকের আনুষ্ঠানিকতা সত্ত্বেও, তিনি অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সহজ। অনুভব করি, আমার আশংকাগুলি অহেতুক।

চেয়ারম্যান মাওয়ের সঙ্গে আমার প্রায় বারোবার দেখা হয়েছে, এর অধিকাংশই ছিল বড়ো বড়ো জনসমাবেশে। কিন্তু কয়েকটি সাক্ষাৎ ছিল ব্যক্তিগত, ফুন্তসোগ ওয়াঙ্গিয়াল দোভাষীর ভুমিকায় ছিলেন। উপলক্ষ্য যাই হোক না কেন, তিনি সর্বদা আমাকে তাঁর পাশে বসিয়েছেন, আর একবার তো তিনি আমার খাবারও পরিবেশন করেন। এতে আমার দুশ্চিন্তাও হয়, কারণ আমি কানাঘুষো শুনেছিলাম যে তিনি যক্ষ্মার চিকিৎসা করাচ্ছেন।

কিন্তু সার্বিকভাবে আমার তাঁকে ভাল লাগে। রাশভারী হলেও অত্যন্ত সহজ। গায়ের রঙ শ্যামলা, কিন্তু চামড়া চকচকে। এর জন্য হয়তো তিনি কোনও মলম ব্যবহার করতেন। তাঁর হাতগুলি খুব সুন্দর, আঙ্গুলগুলি এবং বুড়ো আঙ্গুলের গঠন খুব সুন্দর, হাতের চামড়াও টানটান ও চকচকে।

মাঝেমধ্যে লক্ষ্য করেছি যে তাঁর শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে এবং তিনি হাঁপাচ্ছেন। এটি তাঁর কথা বলায় প্রভাব ফেলতো বলেই হয়তো তিনি খুব ধীরে ধীরে কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলতেন। সম্ভবত এ কারণেই তাঁর বাক্যগুলিও সংক্ষিপ্ত হতো। চলাফেরায়ও তিনি খুব ধীর-স্থির। এমনকি লক্ষ্য করেছি যে বাঁ দিক থেকে ডানদিকে মাথা ঘোরাতে তিনি কয়েক সেকেন্ড সময় নিতেন, এতে তাঁর আত্মবিশ্বাস এবং গরিমাও যেন বেড়ে যেত।

তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং আচরণের তুলনায় পোশাক অত্যন্ত নিম্নমানের, জামার হাতা ভাঁজ করা, জ্যাকেটেও এলোমেলো ভাঁজ; সাধারণ মানুষের মতন পোশাক পরতেন। অবশ্য মাওয়ের জামা-কাপড়ের ধূসর রঙটি কিছুটা আলাদা ছিল। কেবল তার জুতো সবসময় নিখুঁতভাবে পালিশ করা - চকচকে দেখাতো। অবশ্য তাঁর ব্যক্তিত্ব এমনই যে বিলাসবহুল পোশাকের প্রয়োজন ছিল না। উপর থেকে অত্যন্ত সাধারণ মনে হলেও তাঁর উপস্থিতি কর্তৃত্ব এবং শক্তিপূর্ণ ছিল, এই কর্তৃত্বকে চীনের আপামর জনগণ শ্রদ্ধা করে। আমিও অনুভব করেছি যে তিনি একজন খাঁটি এবং অত্যন্ত দৃঢ়চেতা মানুষ।

আমরা চীনে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে, তিব্বতি জনগণের দুশ্চিন্তার মূল বিষয় ছিল আমরা কতটা চীনাদের ইচ্ছে পালন করে চলতে পারবো! বাস্তবে আমি কাশাগ এবং কমিউনিস্টদের মধ্যে মধ্যস্থতার কাজ করতাম। বেশ কয়েকটি প্রাথমিক সভা বেশ সফল হয়। আমি চেয়ারম্যান মাওয়ের সঙ্গে একান্তে কথা বলার সুযোগ পেলে এই আলোচনা আরও তীব্র হয়। মাও আমাকে বলেন যে তাঁরা বুঝতে পেরেছেন যে এখুনি সতেরোসূত্রী 'চুক্তি'র সমস্ত ধারা প্রয়োগ করলে তাড়াহুড়ো করা হবে। আর একটি ধারাকে তো বাতিলই করা যেতে পারে! সেটি হল, তিব্বতে চীনা লিবারেশন আর্মি যাতে কার্যকরভাবে রাজত্ব করতে পারে তা সুনিশ্চিত করতে একটি সামরিক বিষয়ক কমিশন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। তিনি বলেন, এর বদলে তিব্বতকে "স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল" এ পরিণত করার জন্য একটি প্রস্তুতি কমিটি গড়ে তুললে ভাল হবে। এই কমিটি তিব্বতে যে সংস্কার হচ্ছে তা জনগণের ইচ্ছানুরূপ হচ্ছে কিনা - সেদিকে নজর রাখবেন! চেয়ারম্যান মাও জোর দিয়ে বলেন যে 'চুক্তি'-এর শর্তাবলী ঠিক তেমন গতিতে প্রয়োগ করা উচিত যেমনটি তিব্বত সরকার সঠিক বলে মনে করে। আমি যখন কাশাগকে চেয়ারম্যান মাও এই বক্তব্যের কথা জানাই তখন তাঁরা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এখন আমরা অনুভব করতে শুরু করি যে এখন আমরা চীনের সর্বোচ্চ নেতার সাথে কথা বলছি, সুতরাং একটি বাস্তবসম্মত চুক্তি সম্ভব হবে।

পরবর্তী একটি ব্যক্তিগত বৈঠকে মাও আমাকে বলেন যে আমি বেইজিংয়ে আসায় তিনি খুব খুশি। তারপরে তিনি বলেন যে তিব্বতে চীনের প্রবেশ আমাদের সাহায্য করার জন্য। তিনি বলেন, তিব্বত একটি মহান দেশ, আপনাদের ইতিহাস অত্যন্ত গর্বের। অনেকদিন আগে আপনারা চীনের অনেকটা অংশ জয় করে নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন আপনারা পিছিয়ে রয়েছেন, তাই আমরা আপনাদের সাহায্য করতে চাই। বিশ বছর পরে আপনারা আমাদের থেকে এগিয়ে যাবেন, তখন আপনারা চীনকে সাহায্য করবেন!

আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না! কিন্তু চেয়ারম্যান মাওয়ের শরীরী ভাষা থেকে মনে হচ্ছিল যে তিনি কেবল আমাকে প্রভাবিত করার জন্য নয়, আন্তরিক বিশ্বাস প্রকাশ করছেন। আমিও চীনের সঙ্গে সুসম্পর্কের মাধ্যমে তিব্বত কী কী যে সুবিধা পেতে পারে তা নিয়ে খুব আগ্রহী হয়ে পড়ি। আমি মার্কসবাদ নিয়ে যত বেশি জানতে থাকি, ততই আমার পছন্দ হতে থাকে। এই ব্যবস্থাটি প্রত্যেক ব্যক্তির সমতা এবং সবার জন্য ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গড়ে তোলা হয়েছে। ফুন্তসোগ ওয়াঙ্গিয়াল দাবি করেন যে বিশ্বের সমস্ত সমস্যার সমাধান মার্ক্সবাদে রয়েছে। আজও আমি মনে করি, তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ফুন্তসোগ ওয়াঙ্গিয়ালের এই দাবি মিথ্যে নয়। কিন্তু ত্রুটিমুক্তও নয়। এর একমাত্র ত্রুটি, এটি মানুষের সত্ত্বাকে সম্পূর্ণ শারীরিক বলে মনে করে। সেজন্যে আমি ফুন্তসোগ ওয়াঙ্গিয়ালের সঙ্গে একমত হতে পারি নি। চীনারা এই উদ্দেশ্যগুলি বাস্তবায়নের জন্য যেসব ব্যবস্থা গড়ে তোলে সেগুলিও আমার ঠিক বলে মনে হয়নি। এক্ষেত্রে তাঁরা খুবই কট্টর। তবুও আমি দলের সদস্য হওয়ার প্রস্তাব মেনে নিই। আমি নিশ্চিতভাবেই অনুভব করেছি এবং আজও মনে করি, বৌদ্ধ দর্শন এবং খাঁটি মার্কসবাদী আদর্শের সমন্বয় সাধন করে সাম্য এবং সবার জন্য ন্যায়বিচারের রাজনীতি পরিচালনার কার্যকর উপায় বিকাশ করা যেতে পারে।

এছাড়াও তখন আমি মহা উৎসাহে চীনা ভাষা শিখতে শুরু করি এবং আমার নতুন চীনা নিরাপত্তা সুরক্ষা আধিকারিকের পরামর্শে - কোরিয়া যুদ্ধের একজন প্রবীণ সৈনিক এবং একজন সবসময় হাসিমুখে থাকা শিক্ষক আমাকে শারীরিক ব্যায়াম শেখাতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁর খুব সকালে উঠার অভ্যাস ছিল না এবং তিনি বুঝতে পারতেন না যে আমি এত সকালে উঠে কিভাবে প্রার্থনা করি! সকালে তাঁর চুল ও জামাকাপড় প্রায়ই অবিন্যস্ত থাকতো। কিন্তু তাঁর নির্দেশে নিয়মিত ব্যায়াম করে আমি উপকৃত হই। আমার বুক, যা এতদিন পাঁজরের ওপর চামড়ায় মোড়া ছিল, এখন দ্রুত চওড়া হতে শুরু করে।

আমরা প্রায় দশ সপ্তাহ বেইজিংয়ে ছিলাম। আমার অধিকাংশ সময় নানা রাজনৈতিক সভা, সম্মেলন এবং অগণিত ভোজে ব্যয় হতো। সামগ্রিকভাবে, এই বিশাল ভোজগুলির খাবার আমার বেশ পছন্দ ছিল, কিন্তু একদিন যখন জানতে পারি যে আমার জিহ্বায় সবচাইতে বেশি স্বাদ লাগা ডিমের তরকারি রান্না হয়েছিল শত বছরের পুরানো ডিম দিয়ে, আমি কেঁপে উঠি। রান্নার গন্ধটি পাগল করে দেওয়া। এর রেশ দ্রুত শেষ হয় না, খাওয়ার পরেও আপনি বুঝতে পারেন না যে ডিমটি এখনও আপনার মুখে অক্ষত আছে নাকি আপনি শুধু তার গন্ধেই বুঁদ হয়ে আছেন! এই অভূতপূর্ব স্বাদ আপনার সমস্ত ইন্দ্রিয়ে পুরোপুরি ছড়িয়ে যাবে। আমি দেখেছি, অনেক ইউরোপীয় পনিরও এরকম খেতে। চীন সরকার এই ভোজসভাগুলিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়, তাঁরা বিশ্বাস করে, কূটনীতিতে খাবার টেবিল সবচাইতে ভাল জায়গা, বিশেষ করে ডিনার টেবিলে আসল বন্ধুত্ব হয়। কিন্তু, এটা ভুল।

সেই সময়ে, কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সম্মেলনে আমাকে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের স্টিয়ারিং কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। এটি একটি নামমাত্র উপাধি, এর তেমন খ্যাতি কিম্বা রাজনৈতিক অধিকার কিছুই ছিল না। (স্টিয়ারিং কমিটিতে নীতিগুলি নিয়ে আলোচনার পর আমাদের মতামত পলিটব্যুরোতে উপস্থাপিত করা হতো, পলিটব্যুরোরই রয়েছে আসল কর্তৃত্ব।)

আমার কাছে স্টিয়ারিং কমিটির সভা এবং সম্মেলন ভোজের চেয়ে বেশি কার্যকর এবং অভিজ্ঞতা সঞ্চয়কারী ছিল, কিন্তু একসময় মনে হতে শুরু করে, এটি যেন কখনও শেষ হবে না! অনেক বক্তা পাঁচ, ছয় বা সাত ঘন্টা একটানা কথা বলে, সেজন্য প্রচণ্ড একঘেয়ে মনে হয়। আমি ঘুম তাড়ানোর জন্য ঘন ঘন গরম জল খেতাম আর ভাবতাম যে লোকটা কখন থামবে! কিন্তু চেয়ারম্যান মাও নিজে যে সভা বা বৈঠকে আসতেন, সেগুলি অন্যরকম। তাঁর বক্তৃতায় জাদু ছিল। তিনি কথা শেষ করে শ্রোতাদের মতামত জানতে চাইতেন, সবসময় মানুষের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করতেন এবং সবকিছু শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তিনি অনেক সময় নিজের সমালোচনা করতেন, এবং একবার তাঁর নিজের গ্রাম থেকে লেখা একটি চিঠি বের করে পড়ে শোনান, এতে সরকারি কাজের পছন্দমতো ফল না পেয়ে এবং স্থানীয় দলীয় কর্মকর্তাদের আচরণ সম্পর্কে অভিযোগ ছিল। এগুলি প্রত্যেকের মনে ভালোই প্রভাব ফেলে, তবে সময়ের সাথে সাথে আমি অনেক বাস্তবতা জানতে পারি। জনগণ তাঁর সামনে খোলামেলা কথা বলতে ভয় পেত, বিশেষত যারা পার্টির সদস্য ছিল না, তাঁরা সবসময় দলের সদস্যদের খুশি রাখতে চেষ্টা করতেন এবং মিষ্টি কথা বলতেন।

ধীরে ধীরে জানতে পারি, চীনের রাজনীতি দ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ, যদিও তখন কারণগুলি ঠাহর করতে পারিনি। কিন্তু যখনই চেয়ারম্যান মাওয়ের সঙ্গে দেখা হতো আমি তাঁর থেকে অনুপ্রেরণা পেতাম। আমার মনে আছে, একবার তিনি আগে থেকে খবর না দিয়েই আমার বাসস্থানে এসেছিলেন। তিনি আমার সঙ্গে একটি বিষয়ে একান্তে কথা বলতে চেয়েছিলেন, যদিও সেদিন তিনি কী বলছিলেন তা আজও আমি মনে করতে পারি না। শুধু মনে আছে , কথায় কথায় সেদিন তিনি ভগবান বুদ্ধের প্রশংসা করায় আমি অবাক হয়ে যাই। তিনি বলেন, গৌতম বুদ্ধ জাতি বৈষম্য বিরোধী, দুর্নীতি ও শোষন বিরোধী’ ছিলেন। তিনি দেবী তারার উল্লেখও করেন, যাকে আমরা স্ত্রী-বুদ্ধ বলে মনে করি। সেইসময় তাকে একজন ধর্ম সমর্থক বলে মনে হচ্ছিল।

এভাবে একবার আমি এই ‘মহান কর্ণধার’ ( যে নামে তাঁকে দল ও প্রশাসনের সবাই ডাকতেন) এর সামনে বসেছিলাম। সেই বড় টেবিলটার দু’দিকে দু’জন জেনারেল বসেছিলেন। তিনি উভয়ের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন যে তিনি তাঁদের তিব্বতে পাঠাতে চান। তারপর কঠোর আওয়াজে আমাকে বলেন, ‘এদেরকে আপনার সেবায় পাঠাচ্ছি, এরা যদি আপনার কোনও আদেশ না মানেন তাহলে আমাকে জানাবেন। আমি এদের ফিরিয়ে নিয়ে আসবো’। এভাবে তিনি ক্রমে আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছিলেন, কিন্তু আমি দেখতাম যে তাঁর দলের সবাই, বিশেষ করে সামরিক ও অসামরিক আধিকারিকরা কীভাবে তটস্থ হয়ে তাঁদের কাজ করতেন! প্রাণের ভয় না হলেও, তাঁরা হয়তো সর্বদা চাকরি খোয়ানোর ভয় পেতেন।

চেয়ারম্যান মাও ছাড়াও আমার বেশ কয়েকবার চৌ এন-লাই এবং লু শাও–চি -র সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। লু খুব কম কথা বলতেন, কখনও হাসতেন না। তিনি অত্যন্ত কঠোর স্বভাবের ছিলেন। একবার আমি লু এবং বার্মার (বর্তমানে মায়ানমারের) প্রধানমন্ত্রী ঊ নু-র মধ্যে একটি বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম। বৈঠকের আগে প্রত্যেককে বলা হয়েছিল, কিভাবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে হবে! আমার বিষয় ছিল ধর্ম, অর্থাৎ বার্মার প্রধানমন্ত্রী যদি ধর্ম নিয়ে আলোচনা করেন, তখন আমাকে কথা বলতে হবে। কিন্তু এর সম্ভাবনা কম ছিল, কারণ ঊ নু এই কাজের জন্য সেখানে আসেননি। তিনি লু-র কাছ থেকে জানতে এসেছেন যে তাদের দেশে বিরোধী কমিউনিস্টদের প্রতি চীনের দৃষ্টিভঙ্গি কী? কিন্তু তিনি যখন এই প্রশ্নটি উত্থাপন করেন এবং বলেন যে তাঁদের দেশে কমিউনিস্ট গেরিলারা অনেক অসুবিধা সৃষ্টি করছে, তখন লু তাঁর দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে বলেন, আপনার দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে আলোচনায় আমার কোনও রুচি নেই। আমরা জড়াতে চাই না!

এভাবে ঊ নু-র প্রশ্নটি উত্তরহীন থেকে যাওয়ায় আমি অবাক হই। তবে আমি এই ভেবে সন্তুষ্ট হই যে লু কোনও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি বা প্রতারণার চেষ্টা করেন নি। আমার ধারণা তাঁর জায়গায় চৌ এন-লাই থাকলে তিনি অবশ্যই কোনও চতুর জবাব দিতেন।

চৌ এদের সবার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের ব্যক্তি ছিলেন। লু যেখানে গম্ভীর এবং স্থির, চৌ সেখানে সবসময় হাসিখুশি এবং মজার মজার কথা বলতেন। তিনি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি নম্র এবং স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্বের মানুষ ছিলেন। কিন্তু এমন মানুষেরা উচ্চপদে থাকলে তাঁদের সব কথা বিশ্বাস করা যায় না। তাঁর দৃষ্টিশক্তি খুব তীক্ষ্ণ ছিল। আমার মনে আছে, একদিন একজন বিদেশী অতিথিকে নিয়ে তিনি একটি বিশেষ ভোজসভায় যাচ্ছিলেন, হঠাৎ সিঁড়িতে তাঁর পা পিছলে যায়। তাঁর সিঁড়ির দিকের হাতে সাড় ছিল না, কিন্তু তিনি দ্রুত অন্যহাতে সিঁড়ির রেলিং ধরে নিজেকে বাঁচিয়ে নেন, আর একগাল হেসে কিছুই হয়নি এমন ভাব করে বিদেশি অতিথির সঙ্গে কথা চালিয়ে যান।

তিনি খুব দ্রুত কথা বলতে পারতেন। ঊ নু-র বেইজিং সফর শেষে তিনি এক হাজারেরও বেশি আধিকারিকদের সামনে বক্তব্য রাখেন এবং বার্মিজ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তীব্র কটাক্ষ করতে ছাড়েন নি। আমি তা শুনে খুব অবাক হই, কারণ তাঁকে আমি প্রকাশ্যে অত্যন্ত নম্রভাবে ঊ নু-র অতিথি-সৎকার করতে দেখেছি। তখন থেকে বুঝতে পারি, তাঁর হাসিখুশি চনমনে ভাব আর নম্র স্বভাব আসলে অভিনয়, এর পেছনে সবসময় সক্রিয় থাকে একজন তীক্ষ্ণধী কূটবুদ্ধির মানুষ।

বেইজিংয়ে অবস্থানকালে আমাকে কিছু চীনা বৌদ্ধদের কাছে প্রবচন দিতে পাঠানো হয়। আমার সঙ্গে যিনি দোভাষী হিসেবে গেলেন তিনি একজন চীনা ভিক্ষু, যিনি তিব্বতে গিয়ে একজন তিব্বতী লামার কাছে দীক্ষা নিয়ে পড়াশুনো করেছেন। (প্রাচীন যুগে অনেক চীনা সন্ন্যাসী তিব্বতে ধর্মীয় শিক্ষার অন্বেষণে আসতেন।) আমার সঙ্গী এই চীনা ভিক্ষুর ধর্মের প্রতি আনুগত্য এবং জ্ঞান আমাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। পাশাপাশি আমি অনুভব করতে শুরু করি, সৈন্যবলে আমার দেশে জবরদখলের পরেও চীন সরকার আমাকে ও কাশাগকে কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছে তার একটি প্রধান কারণ।

চীন সফরে যে কম্যুনিস্টদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে অনেকেই খুব ভাল মানুষ, অন্যের সেবায় নিঃস্বার্থ, তাঁরা আমাকেও নানাভাবে অনেক সাহায্য করেছেন। আমি তাঁদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। তাঁদের মধ্যে একজন লিও কা পিং, সংখ্যালঘু দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, আমাকে মার্কসবাদ এবং চীনা বিপ্লবের সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল। তিনি ছিলেন মুসলমান, আমি প্রায়ই তাঁকে খ্যাপানোর জন্য জিজ্ঞাসা করতাম যে তিনি কখনও শুয়োরের মাংস খেয়েছেন কিনা! আমার মনে আছে, তাঁর একটি আঙুল কম ছিল এবং স্বভাব খুব ভাল। ক্রমে আমরা খুব ভাল বন্ধু হয়ে উঠি। তাঁর স্ত্রী বয়সে এত ছোট ছিলেন যে দেখলে মনে হতো তাঁর মেয়ে বুঝি! ভদ্রমহিলা আমার মা এবং বড় বোনের খুব ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন। আমরা যেদিন বেইজিং থেকে ফিরছিলাম সেদিন তিনি ও তাঁর স্ত্রী শিশুর মতো কাঁদেন।

আমি অক্টোবর বিপ্লব উৎসব পর্যন্ত বেইজিংয়ে থেকেছি। সেবছর গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পঞ্চমবার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রচুর বিদেশী অতিথি এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। রাশিয়া থেকে খুশচোভ এবং বুলগানিন এসেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। কিন্তু আমি এদের দেখে তেমন প্রভাবিত হইনি, বিশেষ করে পণ্ডিত নেহরুর সঙ্গে মিলিত হয়ে যতটা প্রভাবিত হয়েছিলাম, তার তুলনায় এদের প্রভাব ছিল নগণ্য। আমার বেইজিং সফরের সময়েই পণ্ডিত নেহরু সেখানে এসেছিলেন। চৌ এন-লাইয়ের সভাপতিত্বে আয়োজিত একটি ভোজসভায় তাঁকে স্বাগত জানানো হয়েছিল, সেখানে আমরা সারিবদ্ধ হয়ে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য ধীরে ধীরে এগুই। দূর থেকে তাঁকে বেশ আকর্ষণীয় দেখায়। তাঁর সামনে পরিচিত হতে যিনিই যাচ্ছিলেন তিনি প্রত্যেকের সঙ্গে কিছু কথা বলছিলেন। কিন্তু আমি যখন তাঁর সামনে পৌঁছোই এবং তাঁর সঙ্গে হাত মেলাই, তিনি যেন হতবাক হয়ে পড়েন। তাঁর চোখ আমার পেছনে কোথাও আটকে যায় এবং তাঁর মুখ থেকে কোনও শব্দ বের হয় না। এই ব্যবহার আমাকে কিছুটা বিভ্রান্ত করে। আমি নিজের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি।

তিব্বত অনেক দূরে, তা সত্ত্বেও, আপনার সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছি এবং আপনার সঙ্গে দেখা হওয়ায় আমি খুব খুশি!

অবশেষে নীরবতা ভেঙে নেহরু কয়েকটি শব্দ উচ্চারণ করেন। যা আমাকে খুব হতাশ করে, কারণ আমি তাঁর সঙ্গে আরও বেশি কথা বলতে চেয়েছিলাম এবং তিব্বতের প্রতি তাঁর দেশের মনোভাব কী তা জানতে চেয়েছিলাম। এই সাক্ষাৎটি অত্যন্ত অস্বস্তিকর ছিল।

# # #

পরে আমার ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের ইচ্ছায় তাঁর সঙ্গে কথা হয়। কিন্তু নেহরুর সঙ্গে সাক্ষাতের মতো এই সাক্ষাতও নিস্ফল হয়। যদিও আমার সরকারের একজন অফিসার খুব ভাল ইংরেজি জানতেন, কিন্তু চীনারা তাঁদের সরকারি দোভাষীকে সঙ্গে নেওয়া উচিত বলে জোর দেয়। রাষ্ট্রদূত আমাকে ইংরেজিতে যা বলছিলেন তা আগে মান্দারিন ভাষায় অনুবাদ করে তারপর তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করা হবে। এই বৈঠকটিও খুবই হতাশাব্যঞ্জক ছিল। আমি তার সঙ্গে অনেক কথা বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু চীনাদের উপস্থিতির কারণে পারিনি। এই সন্ধ্যার সবচেয়ে স্মরণীয় অংশটি হল যখন আমাদের সবাইকে চা পরিবেশন করা হচ্ছিল, কোনও পরিবেশকের অসাবধানতায় একটি ফলের পাত্রে ধাক্কা লেগে সমস্ত ফল মাটিতে পড়তে শুরু করে। এই সমস্ত বিদেশি ফল, পীচ, আলুচে এবং খুরবানি নিশ্চয়ই অনেক দাম দিয়ে কেনা, এগুলিকে মেঝেতে গড়াতে দেখে আমার সঙ্গে মোতায়েন গম্ভীর প্রকৃতির দোভাষী আর চীনের এক কর্মকর্তা কার্পেটে হামাগুড়ি দিয়ে দামি ফলগুলি কুড়োতে শুরু করেন, এই দৃশ্যটি দেখে আমি না হেসে থাকতে পারিনি।

রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ বেশ উপভোগ করেছিলাম। তিনি ভোজে আমার পাশে বসেছিলেন। তখন রাশিয়া এবং চীন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল, তাই আমাদের কথা বলায় কারও সন্দেহর কোনও কারণ ছিল না। রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত অত্যন্ত নম্র স্বভাবের, তিনি সমাজতন্ত্র সম্পর্কে আমার মতামত জানতে আগ্রহী ছিলেন। আমি তাঁকে বলি, আমি সমাজতন্ত্রের অনেক সম্ভাবনা দেখছি!

তিনি বলেন, আপনার সোভিয়েত রাশিয়া সফরে আসা উচিত!

এই পরামর্শ আমার খুব পছন্দ হয় এবং অবিলম্বে আমার মনে রাশিয়া যাওয়ার ইচ্ছা জাগে - প্রতিনিধি দলের একজন সাধারণ সদস্যের মতো। এইভাবে, আমি কল্পনায় আমার প্রতিনিধি-মণ্ডলকে সঙ্গে নিয়ে, সমস্ত দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে, যেখানে খুশি সেখানে ঘুরতে থাকি। কিন্তু তার কোনও ফল হয়নি। আমার সেই দেশে যেতে কুড়ি বছর লাগে। বলা বাহুল্য, ইতিমধ্যে পরিস্থিতি অনেক বদলে গিয়েছিল আর আমার কল্পনা বাস্তবের সঙ্গে কঠোর সংঘাতে উবে গিয়েছিল।

আমি স্পষ্ট অনুভব করি যে আমাকে বিদেশীদের সাথে দেখা করতে দিতে চীনা কর্তৃপক্ষ দ্বিধায় ছিল। আমি নিজে থেকে কারও সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তাঁদের আরও অস্বস্তি হতো। বিশ্বের বহু দেশ তিব্বতে চীনা আগ্রাসনের ব্যাপক সমালোচনা করেছিল। এই সমালোচনা তাঁদের অস্বস্তির কারণ হতো, তাই তাঁরা নিজেদের ভাবমূর্তি শুধরাতে আমাকে ব্যবহার করতে চাইতো। তাঁরা দেখাতে চাইতো যে তিব্বতের উপর তাদের প্রভাব ঐতিহাসিক এবং অন্যান্য অনেক দিক দিয়ে ন্যায়সঙ্গত, আর তাঁরা একটি বৃহত জাতি হিসেবে প্রতিবেশী একটি দুর্বল জাতিকে সাহায্য করা চেষ্টা করছেন। তাঁরা বিদেশী অতিথিদের সামনে কিভাবে বদলে যেতেন তা দেখে আমি অবাক হতাম। অন্যদের সামনে যাঁদের সমালোচনা করতেন, তাঁরা বেইজিংয়ে এলে তাঁদের সামনে ভেজা বিড়ালের মতো আচরণ করতেন।

তাঁদের মধ্যে অনেকেই আমার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন, এর মধ্যে একটি হাঙ্গেরিয়ান নাচের দলও ছিল। এই দলের সমস্ত সদস্যরা আমার অটোগ্রাফ নিতে চাইলে আমি তাদের অটোগ্রাফ দিই। এছাড়াও, কয়েক হাজার মঙ্গোলিয়ান শুধু আমাকে আর পাঞ্চেন লামাকে দেখতে চীনের রাজধানীতে এসেছিলেন। এই প্রবণতা চীনা কর্তৃপক্ষকে সন্তুষ্ট করেনি, কারণ কিছু ক্ষেত্রে তিব্বত এবং মঙ্গোলিয়ার সামঞ্জস্য তাঁদের পুরানো ইতিহাসের স্মরণ করিয়ে দেয়। অষ্টম শতাব্দীতে যেমন তিব্বতি সেনাবাহিনী সমগ্র চীন থেকে কর আদায় করতো, তেমনই ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মঙ্গোলিয়ার শাসক কুবলাই খানের চীন জয়ের পর ১২৭৯ থেকে ১৩৬৮ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিল। সেই সময়ের কথা আমি আগেও লিখেছি।

সেই সময়কার একটি আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক ঘটনার কথাও আমি আগে লিখেছি - কুবলাই খান বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাঁর গুরু ছিলেন তিব্বতি। তার আগে কুবলাই খান চীনা জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান সংখ্যাবৃদ্ধি রুখতে হাজার হাজার চীনাকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দিলে এই তিব্বতি ধর্মগুরু তাঁকে বাঁধা দিয়েছিলেন। সেই সময় কুবলাই খানের সঙ্গে তিব্বতি ধর্মগুরুর কথোপকথনই নাকি কুবলাই খানের মনে পরিবর্তন আনে!

# # #

আগেই লিখেছি, ১৯৫৪ সালের শীতে আমি সপরিবারে সপার্ষদ দীর্ঘ সফরে চীনে গিয়েছিলাম, আমার সঙ্গে কাশাগের সমস্ত সদস্যরা ছাড়াও আমার মা এবং কনিষ্ঠ ভাই তেনজিন চোয়েগ্যালও ছিল। এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল চীনের শিল্পোদ্যোগ ও বৈষয়িক অগ্রগতি দেখা। আমার এগুলি খুব ভাল লাগে, তবে আমার তিব্বত সরকারের কর্মকর্তাদের মনে এসবকিছু তেমন আগ্রহ তৈরি করতে পারেনি। যেদিন বলা হতো যে আজ কোথাও যেতে হবে না, সবাই খুব খুশি হতেন। বিশেষ করে আমার মা চীন ভ্রমণ পছন্দ করেন নি। সফরের সময় একদিন তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন, যা ক্রমে মারাত্মক ফ্লুতে পরিণত হয়। তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। ভাগ্যক্রমে আমার ব্যক্তিগত ডাক্তার, শৈশবের 'স্থূলকায় চিকিৎসক' আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি খুব গুণী চিকিৎসক এবং মায়ের খুব প্রিয় পাত্র। তিনি মাকে যে ওষুধ দিয়েছিলেন যা মা সব তক্ষুনি খেয়ে নেন। জ্বরের ঘোরে ছিলেন বলে কিনা জানি না, দুর্ভাগ্যক্রমে, তিনি চিকিত্সকের নির্দেশকে ভুল বুঝে দু’ দিনের ওষুধ একবারে খেয়ে নিয়েছিলেন। এর কঠোর প্রতিক্রিয়া হয়, জ্বর ছাড়াও অন্যান্য সমস্যা সৃষ্টি হয়। অনেক দিন ধরে খুব দুর্বল থাকায় বিছানা থেকে মাথা তুলতে পারছিলেন না, আমি দুশ্চিন্তা শুরু করি। কিন্তু, এক সপ্তাহ পরে তার অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে এবং তারপর তিনি ২৫ বছর সুস্থ ছিলেন। লিং রিনপোচেও দীর্ঘকাল ধরে ভুগছিলেন এবং আমরা তিব্বত ছেড়ে ভারতে যাওয়ার পর থেকেই তাঁর স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে।

তেনজিন চোয়েগ্যাল আমার থেকে বারো বছর ছোট। সে দুষ্টুমি করে সবাইকে হাসাতো ও ভয় দেখাতো। চীনা পরিচারকদের কাছে সে খুব প্রিয় ছিল। সে খুব মেধাবী ও বুদ্ধিমান ছিল এবং কয়েক মাসের মধ্যে মান্ডারিন বুঝতে এবং কথা বলতে শুরু করে, সেজন্য লাভ এবং ক্ষতি দুটোই হয়েছিল। প্রবীণদের হয়রান করে সে মজা পেত। আমার মা বা অন্য কেউ যদি কখনও চীনাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতেন, তাহলে সে দৌড়ে গিয়ে তাঁদের বলে আসতো। সে কারণেই আমরা তার সামনে খুব চিন্তাভাবনা করে কথা বলতাম। তবুও, সে বুঝে যেত যে কেউ কী বলতে চান বা কী লুকাচ্ছেন। কিন্তু তার দুষ্টুমিগুলো এত মজার ছিল যে আমার কনিষ্ঠ শিক্ষক ত্রিজং রিনপোচে একমাত্র ব্যক্তি যিনি তাঁর সামনে চুপ করে থাকাই ভাল বলে মনে করেন। তেনজিন চৌয়েগ্যাল টেবিল-চেয়ার নিয়ে খেলতো, আর খেলতে খেলতে বেশকিছু টেবিলচেয়ারের হাতল কিম্বা পায়া ভেঙেছে। টেবিল চেয়ারগুলির এমন দুর্দশা কিভাবে হয়েছে তা চীনাদের জানাতে মায়ের সমস্যা হতো। কিন্তু তেনজিন চৌয়েগ্যাল অবলীলায় চীনা ভাষায় তাঁদেরকে কি যেন বলে দিত যে তাঁরা চুপচাপ মুখ অন্ধকার করে চলে চলে যেত। তবে লিং রিনপোচে অনেকবার তার খেলার সাথী হয়েছেন। আমার সামনে সে অবশ্য শান্ত হয়ে থাকতো। কারণ একবার সে একটি সুন্দর সজ্জিত কৃত্রিম পুকুরের মাছগুলিকে টেনে এনে ঘাসের উপর সাজিয়েছিল। মাছগুলি ছটফট করছিলো। আমি দূর থেকে দেখে ছুটে গিয়ে মাছগুলিকে জলে ছাড়ি, আর তারপর কষে তেনজিন চৌয়েগ্যালের কান মলে দিই। সে চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে সেখান থেকে চলে যায়। তারপর থেকে আমাকে দেখলে শান্ত হয়ে থাকে।

যদিও আমার সরকারের বেশিরভাগ কর্মকর্তা চীনের বৈষয়িক বিকাশে আগ্রহী ছিলেন না, কিন্তু আমি কমিউনিস্টরা শিল্পের ক্ষেত্রে যা করেছে, বিশেষ করে ভারী শিল্পের ক্ষেত্রে তাতে খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল যে আমার দেশেরও এই পথে এগিয়ে যাওয়া উচিত। চীন সরকারের কারিগরি বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিক আমাদের একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য মানচুরিয়ার একটি জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সেটা ঘুরে দেখে আমার মনে হয়েছিল যে তিব্বতে এ জাতীয় অনেকগুলি প্রকল্প হতে পারে, আর এটা বোঝার জন্য বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন নেই। যে আধিকারিক আমাকে এই প্রকল্পটি দেখাচ্ছিলেন, তাঁকে আমি অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করি, তার শরীরী ভাষা দেখে বুঝতে পারি যে, তিনি সন্ন্যাসীর পোশাক পরা এক সদ্যযুবকের কাছ থেকে এই প্রশ্নগুলি আশা করেন নি। তাঁর মুখের প্রশংসার ভাব ও আমাকে বোঝাতে পারার আনন্দের প্রকাশ, আমি ভুলিনি। আসলে লাহসায় সেই পুরানো জেনারেটর ঠিক করার জেদ, আর ঠিক করার পর নিয়মিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে চালু রাখার সময় এই বিষয় সম্পর্কে কিছুটা পড়াশুনা করতে হয়েছিল। অনেককিছু বুঝতে শুরু করেছিলাম। সেজন্যেই আধিকারিককে আমার আগ্রহ থাকে কিলোওয়াট প্রতি ঘণ্টা এবং টারবাইনের আকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম।

এই সফরেই সেই আধিকারিক আমাদের মাঞ্চুরিয়ায় একটি পুরানো যুদ্ধজাহাজ দেখাতে নিয়ে যান। এটি এত পুরনো ছিল যে এর অনেক অংশ বা কলকব্জার উপযোগিতা আমি বুঝতে পারি না, কিন্তু সমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিশালাকায় কাঠ-লোহার বাড়ি আর পোড়া তেলের বিশেষ গন্ধের মধ্যে পৌঁছে অভিভূত হয়ে উঠি - আমার জন্যে এতটাই যথেষ্ট ছিল।

এতকিছু ঘুরিয়ে দেখানোর পেছনে একটি নেতিবাচক দিকও ছিল। চীনারা আমাকে কখনোই তাঁদের দেশের মানুষের সঙ্গে মিশতে দিতে চাইতো না। আমি যখনই কিছু দেখতে বা কারও সঙ্গে কথা বলার জন্য পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির বাইরে যেতে চেয়েছি, আমার সঙ্গে থাকা চীনা আধিকারিকরা আমাকে থামিয়ে দিতেন এবং আমার সুরক্ষার অজুহাত দিয়ে আমাকে একা কিছু করতে দিতেন না। কিন্তু আমি পরে জেনেছি, শুধু আমি নই, বেইজিংবাসী সমস্ত চীনাদের অবস্থাও একইরকম ছিল। তারাও স্বাধীনভাবে কিছুই করার অনুমতি পেতেন না।

এত বাধানিষেধ থাকা সত্ত্বেও আমাদের একজন সেনশাপ, সেরকোন রিনপোচে প্রায়ই যখন খুশি, যেখানে খুশি সেখানে ঘুরে বেড়াতেন। তিনি চীনাদের কোনও বাধানিষেধ মানতেন না, নিজের যা ভাল লাগতো সেটাই করতেন। এর একটি কারণ এও হতে পারে যে তিনি খোঁড়া ছিলেন আর চুপচাপ থাকতেন, তাই কেউ তাঁর দিকে মনোযোগ দেয় নি। সুতরাং, আমাদের সবার মধ্যে, তিনিই একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন, যিনি চীন গণপ্রজাতন্ত্র সম্পর্কে অনেক বেশি বাস্তব তথ্য জানতেন। তাঁর কাছ থেকেই আমরা সমস্ত বিষয়ে বিস্তারীত জানতে পারি, মানুষের মধ্যে কতটা দারিদ্র্য রয়েছে এবং তাঁদের মনে কতটা ভয় রয়েছে।

আমি শিল্পাঞ্চলের এক হোটেল কর্মচারীর কাছ থেকে কিছু অবাক করা বিষয় জানতে পারি। তিনি আমাকে বলেন যে আমার সফর নিয়ে চীনা খবরের কাগজগুলিতে ছাপা আমাদের তিব্বত থেকে আসার সময়ের ছবিগুলি দেখেছেন। তিনি পড়েছেন, তিব্বতের জনগণ নাকি আমার চীন সফরে খুব খুশি হয়েছে! আমি যখন তাকে বলি, একথা ভুল! তখন তিনি খুব অবাক হন।

তিনি বলেন, কিন্তু সংবাদপত্রে তো খুশির কথাই লেখা ছিল!

আমি তাঁকে বলি, এটি একটি ভুল তথ্য, বাস্তবে তিব্বতের জনসাধারণ খুব বিরক্ত!

তিনি আমার কথা শুনে অবাক হয়ে যান। আর আমি এই আলোচনা থেকে বুঝতে পারি যে চীনারা কোন সীমা পর্যন্ত দিনকে রাত করতে পারে, মিথ্যাচার যেন তাদের রক্তে মিশে আছে।

সেই চীন সফরে আমি সীমানা পেরিয়ে মঙ্গোলিয়ায় গিয়েছিলাম, সেই সুযোগে সেরকোন রিনপোচেকে নিয়ে তাঁর জন্মস্থান দেখতে গিয়েছিলাম। এটি আমার জন্য খুব আবেগঘন অভিজ্ঞতা, আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে এই দেশটি আমাদের দেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিকভাবে কতটা গভীরভাবে সংযুক্ত রয়েছে।

১৯৫৫ সালের শেষে আমরা বেইজিং ফিরে আসি। তখন তিব্বতি নববর্ষ লোসার উত্সবটির তাৎপর্য ব্যক্ত করতে একটি ভোজের আয়োজন করি। চেয়ারম্যান মাও এবং 'চার প্রধান’ এর তিনজন অর্থাৎ, চৌ এন-লাই, চু তেহ এবং লু শাও-চিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রত্যেকে আমন্ত্রন গ্রহণ করেন। সেই সন্ধ্যায় চেয়ারম্যান মাওর আচরণ খুব বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল। যখন 'ৎসাম্পা'-র গুড়ো বাতাসে ওড়ানো হয়, তিনি আমার ঘাড় কাত করে জিজ্ঞাসা করেন, এটা কী হচ্ছে?

আমি বলি, এটি প্রতীকী নৈবেদ্য!

তখন তিনিও আঙুলে এক চিমটি 'ৎসাম্পা'-র গুড়ো নিয়ে বাতাসে ওড়ান। এর পরে, তিনি আবার এক চিমটি 'ৎসাম্পা'-র গুড়ো নিয়ে দুষ্টু দুষ্টু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে মাটিতে ফেলেন।

তাঁর এই ব্যঙ্গাত্মক আচরণ অনুষ্ঠানের মাহাত্ম্য নষ্ট করে, উপস্থিত সমস্ত তিব্বতি এতে মনে মনে কষ্ট পায়। তিনি এরকম না করলে তাঁর প্রথমবার 'ৎসাম্পা'-র গুড়ো বাতাসে ওড়ানো উভয় দেশের সম্পর্কে প্রকৃত সৌভ্রাতৃত্বের প্রচারক হতে পারতো। যদিও একদিন পরে চীনের খবরের কাগজগুলিতে চেয়ারম্যান মাও আমার পাশে দাঁড়িয়ে 'ৎসাম্পা'-র গুড়ো বাতাসে ওড়াচ্ছেন – এমন ফটোই সামনের পাতায় ছাপা হয়, আর সাংবাদিকরা একে উভয় দেশের সম্পর্কে প্রকৃত সৌভ্রাতৃত্বের প্রতীক হিসেবেই লিখেছে। চীন সরকারও বহির্বিশ্বের সামনে এভাবেই প্রচার করে। বরাবরের মতো, ফটোগ্রাফারদের একটি বাহিনী এই ফটো নেওয়ার জন্যই প্রস্তুত ছিলেন, যাঁরা ভবিষ্যতের জন্য অনুষ্ঠানের মুহূর্তগুলি সংরক্ষনের কাজ করছিলেন। এর মধ্যে আরও কয়েকটি ফটো - আরও একদিন পরে সেই সংবাদপত্রগুলিতে ছাপা হয়, সঙ্গে সেদিনের অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণগুলিও বিস্তারিত ছাপা হয়। এই ছবিগুলি তিব্বতেও পাঠানো হয়। আমি লাহসায় ফিরে চীনাদের দ্বারা প্রকাশিত একটি তিব্বতি খবরের কাগজের পুরনো সংখ্যায় সেই ফটোগুলি দেখেছি। সেই ফটোতে দেখা যায় যে আমি চেয়ারম্যান মাওকে কিছু দেখাচ্ছি। কাগজের তিব্বতীয় সম্পাদক, তাঁর কল্পনা মিশিয়ে ক্যাপ্সহান দিয়েছেন, পবিত্র দালাই লামা চীনের মহান কর্ণধারকে 'খবসে' (লসারের মিষ্টি) তৈরির পদ্ধতি বলছেন!

যেদিন আমি চীন থেকে তিব্বত রওনা দেবো, তার আগের দিন, ১৯৫৫ সালের সেই বসন্তবিকেলে আমি স্টিয়ারিং কমিটির একটি সভায় যোগ দিয়েছিলাম। সেই সভায় সভাপতিত্ব করছিলেন লু শাও-চি। তাঁর ভাষণের মাঝে আমার সুরক্ষা কর্মকর্তা হঠাৎ ছুটে এসে বলেন - মহান কর্ণধার এখুনি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। তিনি আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমি কী উত্তর দেব বুঝতে পারি না। সভাপতির বক্তৃতার মাঝে দুম করে উঠে আসতে পারিনা, আর সভাপতির থামার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সেজন্যে আমি নিরাপ্রত্তা আধিকারিককেই বলি, আপনি সভাপতির কাছে যান এবং আমার সভাত্যাগের অনুমতি নিন। সভাপতির কাছে গিয়ে তিনি একথা বলতেই তিনি হাত উঁচিয়ে আমাকে অনুমতি দিয়ে অন্যদের জানান যে আমাকে মহান কর্ণধার ডাকছেন।

আমরা সোজা চেয়ারম্যান মাওয়ের অফিসে গেলাম। তিনি সত্যিই আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এবং সেটাই ছিল আমাদের শেষ সাক্ষাৎ। তিনি বলেন যে ফিরে যাওয়ার আগে তিনি আমাকে সরকার সম্পর্কে কিছু পরামর্শ দিতে চান। এরপর তিনি বলেন কিভাবে সভার আয়োজন করা উচিত, জনগণের মতামত কিভাবে জানা উচিত, কিভাবে বিশেষ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, এমন সব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক পরামর্শ, আর আমি বরাবরের মতো খুব সাবধানে নোট নিতে থাকি। তিনি আমাকে বলেন, যে কোনও ধরণের বস্তুগত অগ্রগতির জন্য উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বেশি সংখ্যক তিব্বতিকে শিক্ষিত করতে হবে, তাঁদের দক্ষতা উন্নয়ন করতে হবে। এভাবেই তিব্বতকে উন্নয়নের জন্য প্রস্তুত করতে হবে!

তিনি আরও বলেন, আমি যখনই আপনাকে কিছু দিতে চেয়েছি, তা সর্বদাই কোনও তিব্বতির মাধ্যমে চেষ্টা করেছি!

তারপর তিনি উঠে দাঁড়িয়ে আমার পাশে এসে বলেন, আপনার মনোভাব ভাল, ধর্মই বিষ! প্রথমত, এটি জনসংখ্যা হ্রাস করে, কারণ সন্ন্যাসী এবং নানরা ব্রহ্মচারী থেকে যান; দ্বিতীয়ত, এটি শারীরিক প্রবৃত্তিকে উপেক্ষা করে!

একথা শুনে না জানি কেন আমার দুই গাল ও কপাল জ্বলতে শুরু করে, এবং হঠাৎ আমি ভয় পেয়ে যাই। মনে মনে বলি, তাই? আপনি যে দেখছি ধর্মের বিনাশকারী!

রাত গভীর হচ্ছিলো। চেয়ারম্যান মাও যখন এই রূঢ় শব্দগুলি বলছিলেন, আমি মুখ নিচু করে কিছু লেখার অছিলায় চেহারা আধা আড়াল করে নিই। তিনি যেন আমার ভীত-সন্ত্রস্থ চেহারা না দেখে ফেলেন, তাহলে আমার প্রতি তাঁর আস্থা ভঙ্গ হতে পারে! সৌভাগ্যক্রমে, সেদিন ফুন্তসোগ ওয়াঙ্গিয়াল কোনও কারণে দোভাষী হিসাবে ছিলেন না। তিনি থাকলে অবশ্যই আমার অনুভূতি টের পেয়ে যেতেন। বিশেষ করে আমরা যখন বৈঠকের পর আলোচিত সমস্ত বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করতাম!

তবুও আমার অনুভূতি বেশিক্ষণ লুকিয়ে রাখতে পারতাম না। সৌভাগ্যক্রমে, চেয়ারম্যান মাও কয়েক মিনিট পরেই আমাকে বিদায় জানিয়ে হাত বাড়ান। তিনি হাত মিলিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলে আমি স্বস্তি বোধ করি। আশ্চর্যের বিষয়টি হ'ল এত দেরীতে দপ্তর থেকে বেরোনোর সময়ও তাঁর চোখদুটি চকচক করছিলো, এবং তিনি চটপট নিজের হাত বাড়িয়ে স্যুইচ টিপে দপ্তরের বৈদ্যুতিক আলো নিভিয়ে দেন। শুধু বারান্দার আলোগুলি জ্বলতে থাকে। আমরা দুজনেই উঠোনে বেরিয়ে এলাম, নিঝুম রাত। আমাদের গাড়ি অপেক্ষা করছিল। চেয়ারম্যান মাও এগিয়ে আমার গাড়ির দরজা খুলে দেন আর আমি উঠে বসলে বন্ধ করে দেন। গাড়ি চলতে শুরু করলে, আমি পেছন ফিরে হাত নাড়াই। চেয়ারম্যান মাওকে আমি শেষবারের মতন দেখি, তিনি কোনও শীতের জামা বা টুপি ছাড়াই দাঁড়িয়ে আমার দিকে হাত নাড়াচ্ছিলেন।

ভয় এবং অবাক হওয়ার পর মনে জাগে বিভ্রান্তি। কেন তিনি আমাকে বুঝতে ভুল করলেন? কিভাবে ভাবলেন যে আমি একজন সম্পূর্ণ ধর্মীয় ব্যক্তি নই? আমার কোন আচরণ তাঁকে এরকম ভাবতে বাধ্য করেছে? আমি জানতাম, আমি যা-ই করতাম, স-ব তাঁদের খাতায় লেখা হতো; আমি কবে কত ঘন্টা ঘুমিয়েছি, কত বাটি ভাত খেয়েছি, প্রত্যেক বৈঠকে ও সভায় আমি কী কী বলেছি? আমার কোনও সন্দেহ নেই যে আমার দৈনন্দিন গতিবিধির সাপ্তাহিক প্রতিবেদন পেশ করা হলে তা নিয়ে পর্যালোচনা করা হতো এবং চেয়ারম্যান মাও-এর কাছে পাঠানো হতো। এত কিছুর পরেও তিনি কেন খেয়াল করেন নি যে আমি প্রতিদিন কমপক্ষে চার ঘন্টা প্রার্থনা ও ধ্যানের জন্য ব্যয় করি এবং এগুলি ছাড়াও আমার শিক্ষকরা চীন থাকাকালীন আমাকে সর্বদা আমাকে ধর্মশিক্ষা দিতেন। তিনি হয়তো এটিও জানতেন যে সেই দিনগুলিতে আমি ভিক্ষুত্বের অন্তিম পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এই পরীক্ষার আর বেশিদিন বাকি নেই। এর জন্য কমপক্ষে ছয় থেকে সাত বছর ধরে পরিশ্রম করছি।

চেয়ারম্যান মাও-এর এমন ভাবার একটি সম্ভাব্য প্রেক্ষিত হতে পারে, তিনি বৈজ্ঞানিক বিষয় এবং বস্তুগত অগ্রগতির প্রতি আমার গভীর আগ্রহকে মনে মনে ভুল ব্যাখ্যা করেছেন। এটি সত্য যে আমি মনে মনে চীন গণপ্রজাতন্ত্রের অনুকরণে তিব্বতের আধুনিকীকরণ করতে চেয়েছিলাম। আর এটাও সত্য যে আমার বৌদ্ধিক প্রবৃত্তি মূলতঃ বৈজ্ঞানিক। সম্ভবতঃ বৌদ্ধদর্শন সম্পর্কে ভাল জ্ঞান না থাকার ফলে চেয়ারম্যান মাও বুদ্ধের এই নির্দেশকে উপেক্ষা করেন যে, ধর্মের অনুসরণকারী প্রতিটি ব্যক্তিকে সবকিছু স্বয়ং পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত! সেজন্যে, আমি সর্বদা আধুনিক বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কার এবং সত্যের প্রতি আমার মনকে উন্মুক্ত রাখি। সম্ভবত এই কারণেই মাও ভেবেছেন যে আমার শ্রদ্ধা - নিষ্ঠা ধর্মীয় অনুশীলন অনুসরণ করা ছাড়া আর কিছুই নয়। এখন আমি নিশ্চিত যে তিনি আমাকে ভুল বুঝেছেন।

পরদিন আমরা তিব্বতের জন্য রওনা হই। গত বছরের তুলনায় এবার আমাদের গতি বাড়ে, কারণ ইতিমধ্যে সাংহাই মহাসড়কের নির্মান সম্পূর্ণ হয়েছে। ফেরার সময় আমরা অনেক জায়গায় দু’তিন দিন করে বিশ্রাম নিয়ে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতে থাকি, তাঁদের পরিস্থিতি, তাঁদের মনের কথা বুঝতে থাকি। তাদেরকে আমার চীন সফর সম্পর্কে জানাতে থাকি এবং তিব্বতকে কোন দিকে নিয়ে যেতে ইচ্ছুক তা-ও বলতে থাকি। মাও সম্পর্কে আমার ধারণা পরিবর্তন হওয়ার পরেও আমি তাঁকে একজন মহান নেতা এবং তার চেয়েও বেশি সৎ ব্যক্তি হিসাবে মানি। তিনি প্রতারক ছিলেন না। সুতরাং আমি বিশ্বাস করেছিলাম যে তিব্বতে মোতায়েন চীনা সামরিক ও অসামরিক আধিকারিকরা যতক্ষণ তাঁর আদেশ মেনে চলবেন ততক্ষণ আমরা আশাবাদী থাকতে পারি। তাছাড়াও, আমি সকল পরিস্থিতিতেই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে যাওয়াকে সঠিক বলে মনে করি। নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিস্থিতিকে খারাপ থেকে আরও খারাপ করতে পারে। যদিও আমার কাশাগের সহকর্মীদের মধ্যে খুব কমই আমার সঙ্গে একমত হবেন। চীন সফর তাঁদের অধিকাংশের কাছেই একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা ছাড়া কিছু নয়। তাঁদের আশঙ্কা, কমিউনিস্টদের এই কট্টর আচরণ তিব্বতে দমন-পীড়নের কারণ হয়ে উঠবে। তাঁদের মধ্যে চীনাদের সম্পর্কে একটি গল্প ছড়িয়েছিল যা অত্যন্ত ভীতিজনক। গান কুং নামে একজন উচ্চ চীনা আধিকারিক লু শাও-চি-এর সমালোচনা করেছিলেন, তাই তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।

কিছুদিন পর, আমার মনেও বিভিন্ন ধরণের সন্দেহ অঙ্কুরিত হতে শুরু করে। আমি যখন পূর্ব তিব্বতের তাশিকিয়েল সফরে যাই, সেখানে অনেক মানুষের জমায়েত হয়। আমাকে দেখতে এবং শ্রদ্ধা জানাতে দূর-দূরান্ত থেকে কয়েক হাজার মানুষ আসেন। তাঁদের শ্রদ্ধা-ভক্তিদেখে আমি আবেগতাড়িত হয়ে পড়ি।

কিন্তু পরে অবাক হয়ে শুনি যে লোকেরা যাতে আমাকে দেখতে আসতে না পারে, চীনা কর্তৃপক্ষ একথা বলে মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে যে, আমার যেদিন আসার কথা, সেদিন আমি আসব না - এক সপ্তাহ পরে আসব! এই মিথ্যা প্রচারে অনেকেই নির্দিস্ট দিনে আসেন নি। আমি ফিরে আসার পর সেখানে কয়েক হাজার মানুষ দূরদূরান্ত থেকে এসে পৌঁছেছিলেন।

আমার অখুশি হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল আমার ব্যক্তিগত সুরক্ষার প্রতি তাঁদের বাড়াবাড়ি। আমি যখন নিজের গ্রামে যাই, তখন তারা আমার উপর চাপ দেয়, আমি যেন নিজস্ব সরকারি পাচক ছাড়া অন্য কারও হাতে তৈরি খাবার না খাই, আমি যেন কারও কাছ থেকে এমনকি আমার পরিবারের যে সদস্যরা এখনও তাক্তসরে বসবাস করেন, তাঁদের থেকে কোন উপহার না নিই। তাঁদের কাছে নাকি গোপন খবর আছে, এঁদের মধ্যে থেকেই কোনও সাধারণ, বিশ্বস্ত ও নম্র ব্যক্তি দালাই লামার খাবারে বিষ মেশাতে পারেন! একথা শুনে আমার মা খুব মন খারাপ করেন। আমি বুঝতে পারি না যে গ্রামের মানুষদের আবেগকে কিভাবে অস্বীকার করবো! তারপর যখন আমি তিব্বতিদের সঙ্গে কথা বলি, তাঁদের অবস্থা জানতে চাই, তখন তাঁদের উত্তর ছিল - আমরা চেয়ারম্যান মাও, কমিউনিজম এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন এর কৃপায় খুব সুখে আছি! কিন্তু বলতে বলতে তাঁদের চোখে অশ্রু ভরে আসতো!

লাহসা পর্যন্ত আমার গোটা সফরে, আমি যত বেশি সম্ভব সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতে থাকি। চীনের মতন এখানে কোনও অসুবিধা হয়নি। আমাকে দেখতে এবং আমার আশীর্বাদ নিতে হাজার হাজার মানুষ তাঁদের পরিবার, বৃদ্ধ এবং অসুস্থদের সঙ্গে আসতেন। অনেক চীনাও এই সভাগুলিতে আসতেন। আমি তাঁদেরকেও বলার সুযোগ পেতাম যে তাঁরা যেন তিব্বতিদের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করেন। এটি করার সময় আমি তাদের জিজ্ঞাসা করতাম তাদের মধ্যে কে দলের সদস্য, আর কারা নয়। অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে কমিউনিস্ট দলের সদস্যরা বেশি স্পষ্টবাদী হন।

তিব্বতে কর্মরত চীনা কর্মকর্তাদের আমার প্রতি মনোভাব অত্যন্ত মনোরঞ্জক ছিল। একবার এক চীনা আধিকারিক বলেছিলেন, " তিব্বতের মানুষ দালাই লামাকে যত ভালোবাসে, চীনের জনগণ চেয়ারম্যান মাওকে ততটা ভালোবাসেন না।" একসময় একজন চীনা নিরাপত্তা কর্মী, যিনি মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত কঠোর আচরণ করতেন, তিনি আমার জিপ দেখে এগিয়ে এসে জানতে চান, আপনাদের মধ্যে দালাই লামা কে?

চালক আমার দিকে ইঙ্গিত করলে তিনি টুপি খুলে আমার আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। যখন আমি চেংডু ছাড়ি, সফরে আমার সঙ্গে আসা অনেক চীনাই কাঁদতে শুরু করেন। আমিও তাঁদের সংবেদনশীলতায় অভিভূত হই; এমনকি আদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাঁদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ছিল।

অনেক মাস পরে তিব্বতীদের আবার দেখার পরে আমি মনে মনে তাঁদের সঙ্গে চীনবাসীদের তুলনা করে পার্থক্য বোঝার চেষ্টা করি, উভয়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করি। প্রথমত, উভয়ের চেহারা দেখলেই বোঝা যায় যে চীনাদের তুলনায় তিব্বতিরা অনেক বেশি খুশি। দ্বিতীয়ত, চীনের মতো তিব্বতে মেয়েদের পা বেঁধে রাখা আর পুরুষদের দাস করে রাখার প্রথা ছিল না। চীনা সরকার আইন করলেও তখনও এই প্রথা অবলুপ্ত হয়নি। কিন্তু চীনারা আমাদের সামন্তবাদী সমাজের সমালোচনা করার সময় নিজেদের সমাজের কুসংস্কারগুলির কথা ভুলে যান।

লাহসা পৌঁছানোর ঠিক আগে আমরা যখন খামে প্রবল ভূমিকম্পে জেলায় অনেক ক্ষতি হয়। চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাই আকাশপথে সেখানে এসেছেন; একথা শুনে আমি গিয়ে তাঁকে স্বাগত জানাই। আমি তাঁর ভাষণ শুনে অবাক। কারণ, তিনি ধর্মের পক্ষে কিছু ভাল কথা বলেন। আমার অদ্ভুত বলে মনে হয়, কারণ এটি কমিউনিজমের প্রকৃতির বিপরীত। সম্ভবত, চেইয়ারম্যান মাওয়ের নির্দেশেই কি তিনি এই কথাগুলি বলেছেন, যাতে তাঁদের শেষ বৈঠকের কুপ্রভাব কিছুটা হ্রাস পায়!


চলবে ...