শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০

মহাসত্যের বিপরীতে তৃতীয় খণ্ড # দ্বাদশ পর্ব

‘ শাদা রেশমে ঢেকে এসেছে একটি আশ্বাস/ শুক্লা তৃতীয়ার জন্য, আমাকে দয়া করে আরেকটি সংকল্প দাও/ সেই অভিমুখে পূর্ণিমার জন্য’। - ৎসাংইয়াং গ্যাৎসো( ৬ষ্ঠ দলাই লামা)

সোনালি চুলের সাহেব ভাল বক্তা। তাঁর উদ্দীপ্ত বাচনভঙ্গি ও বক্তব্যের সঙ্গে যেন রাজা গেসারের মিল ! নাকি লোকটা খুব ভাল ছাত্র ? ভবিষ্যত বিশ্বে ন্যায়ের বিচার পুনর্স্থাপনকারী গেসার সম্পর্কে লেখা সমস্ত বইগুলি পড়ে ফেলেছে ? পাশাপাশি পড়ে ফেলেছে বোধিসত্ত্বদের লেখা অন্তর্লীন উৎসর্গ এবং অপরিসীম দয়ার কথা? নাহলে গরবের বলা এলোমেলো অথচ আবেগখিন্ন অংশদুটোকে সে কেমন অভিজ্ঞ শল্যচিকিৎসকের মতন ব্যবচ্ছেদ করে মালবাহকদের কেমন সুন্দরভাবে আলাদা করে বোঝায়? এই অপ্রত্যাশিত বিশ্লেষণে গরব অবাক হয়। অথচ গরব ভেবেছিল তার মনের এই দ্বন্দ্বগুলি বুঝতে পেরে দর্দজি মিগ্যুর স্বয়ং একদিন তাকে এগুলি বুঝিয়ে বলবেন! নাকি তিনিই এই সোনালি চুল সাহেবের মুখ দিয়ে বলালেন যে, গেসারের দর্শন দেবতাদের সঙ্গে রাক্ষসদের বিবাদে যেমন কার্যকরী হয়েছিল তেমনি আমাদের মনের ‘সু’ এবং ‘কু’-এর মধ্যে নিরন্তর চলতে থাকা বিবাদেও এই দর্শন হতে পারে পথপ্রদর্শক। এর বিপরীতে বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্বদের বাণী মানুষের দুঃখকষ্ট নিরসনে করুণা ও সেবার কথা বলে গেছে, নির্বাণলাভের কথা বলেছে।

কথায় কথায় দুপুর গড়িয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে গরবের মোহ কিছুটা কাটে। সোনালি চুল সাহেবের কথা শুনে তাঁর প্রতি গরবের মনে সমীহ জাগলেও, তাঁর বক্তব্য যেন শুধু জীবিত প্রাণীদের বেঁচে থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তাঁর প্রকৃতিপাঠও অসাধারণ। কিন্তু মৃত্যুর ওপারের কোনও কিছুকে, মরনোত্তর কোনও দর্শনকে তিনি ছুঁয়ে দেখেননি! এই সীমাবদ্ধতা গরবকে অতৃপ্ত রাখে। সেজন্যে মনে শ্রদ্ধা জাগলেও, শুদ্ধ লাহসা তিব্বতি ভাষায় কথা বললেও সাহেবের কথাগুলি তাকে দীক্ষিত হওয়ার মতন তৃপ্তি দেয় না। পাশাপাশি গেসার ও বোধিসত্ত্বদের শিক্ষার যে পার্থক্য লোকটা বর্ণনা করলো তা-ও গরবের মনে খচখচ করতে থাকে। সে ভাবে যে এবার গুরু দর্দজি মিগ্যুরের সঙ্গে নিজে থেকেই এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করে প্রশ্ন করতে হবে!

গরব ফেরার জন্য উঠে দাঁড়াতেই লোকটা আবার তিব্বতি কায়দায় হাতজোড় করে বলে, আমি তোমার গুরুর দর্শনপ্রার্থী!

গরব মাথা নেড়ে ভাবে এটাই হবে গুরুর কাছ থেকে এই ব্যাপারে বিস্তারিত জানার মস্ত সুযোগ; সোনালি চুল সাহেবের উপস্থিতিতেই তাঁর মনের দ্বিধা দূর করে নেওয়া যাবে! অবশ্য গুরু যদি সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে রাজি হন!

ফিরে যেতে যেতে গরবের মনে হয় এই বিশাল পাহাড়ের গায়ে গোটা অরণ্যটা নানা তলায় আর কোঠায় ভাগ করা যেন পোটালা প্রাসাদের মতন একটা বিশাল বাড়ি। আজকাল এই জঙ্গলে ঘুরলেই সে টের পায় যে আস্তে আস্তে এর চেহারা কেমন যেন বদলে যেতে থাকে। ফার গাছের বন পেরুতেই পাইন বন। পাইন গাছও কোথাও উঁচু, কোথাও ছোটো। যেখানে পাইনের আকার ছোটো সেখানে কোথাও পায়ের নীচে সবুজ শ্যাওলার মখমলী স্পর্শ, কোথাও লম্বা লম্বা লালচে কিম্বা কালচে সবুজ ঘাস আর ঘাসের সঙ্গে রঙ মিলিয়ে পিঁপড়ে আর গিরগিটি, যেখানে পাইনের আকার উঁচু, সেখানে ঘাসের রঙ কচি কলাপাতার মতন আর ফ্যাকাসে সাদা সাদা শ্যাওলা।

গরবের মনে হয়, এই পাহাড়ে মূলতঃ র‍ইছে চারটে ভিন্ন ভিন্ন বন। স্যাঁতসেঁতে নীচু জমিতে আছে রূপোলি ফার গাছের বন। এদের ঘন পুরু শ্যাওলার আস্তরণ পালকের বিছানার মতন। শৈশবে পালক পিতার শোবার ঘরে এমন পালকের বিছানায় দু’একবার লুকিয়ে শুয়ে দেখেছে সে। এর পরে বেলেমাটির ঢালে আছে সবুজ শ্যাওলা জড়ানো পাইনবন, বনের ফাঁকে ফাঁকে অসংখ্য ছোট বড়ো কুল গাছ। সোনালি চুল সাহেবের ভাষায় এগুলি বিলবেরী আর হাকলবেরীর ঝোপ। পাইনের ফাঁকে ফাঁকে স্যাঁতসেঁতে জায়গাগুলিতে ঘাসের জঙ্গল। ওদের তাঁবুর কাছাকাছি ফারবনের প্রান্তে নানারকম পাখি দেখিয়ে সোনালি চুল সাহেব ওকে বলে ওটা ক্রশবিল, এটা সিস্কিন, ঐটা কিংলেট। পাহাড় উঠতে শুরু করতেই একটি সোনালি পাখিকে দেখে সাহেব ফিস্ফিসিয়ে বলে –ওটা ফিঞ্চ। আরও দুটি পাখিকে তিনি বলেন ফ্লাই ক্যাচার আর জে। সাহেব পাখি ও গাছ নিয়ে অনেক কিছু জানে।

গরব ভাবে, সাহেব কি জানে এই অরণ্যে কাঠঠোকরা আছে, আর জংগলটিকে কয়েক তলায় ভাগ করা যায়। যেমন পাইনের জঙ্গল এই পাহাড়ের পশ্চিমদিকে দোতলা, আর পূর্বদিকে তিনতলা। একতলায় শ্যাওলা আর ঘাস। মাঝের তলায় নানারকম ছোট ছোট ঝোপঝাড়, একেবারে ওপরতলায় পাইন। গরবের গুহা থেকে শুরু করে দর্দজি মিগ্যুরের পবিত্র গুহা এই পাইন অরণ্যের উপরের দিকে। উত্তরে ওকের বনটি সাততলা। একেবারে উঁচু তলাটা হল ওক, অ্যাশ, ম্যাপল আর লিন্ডেন গাছগুলির আকাশছোঁয়া মাথা। তাঁদের ঢেউখেলানো মাথাগুলো যেন গোটা জঙ্গলের ছাদ – গ্রীষ্মে সবুজ আর শরতে বিচিত্র রঙের বাহারে পাতায় ভরা। আর নীচে, ওক গাছের মাঝামাঝি রয়েছে অসংখ্য জলপাই, অ্যাশবেরি, বুনো আপেল আর নাসপাতি গাছের অরণ্য।

আরও নীচে রয়েছে ডালপালায় জড়ানো ও লতাপাতায় প্যাঁচানো ঝোপঝাড়, হেজেল, হথর্ণ – আরও কত না গাছ! ঝোপঝাড়ের নীচে জন্মানো ঘাস আর ফুলের কয়েক তলা ভাগ রয়েছে। সবার উপরে মাথা উঁচিয়ে থাকে ঘন্টাফুল। তাঁদের নীচে ফার্ণ অরণ্যের ফাঁকে ফাঁকে পাহাড়ি পদ্ম আর কাউহুইট। দোতলায় বেগুনী ফুল আর বুনো স্ট্রবেরির সম্ভার। একতলায়, মাটির একেবারে কাছাকাছি থাকে পাতাওয়ালা শ্যাওলা। নানা জায়গায় ভূমিক্ষয়ের ফলে মাটির নীচের চোরা কুঠুরিতে গাছপালার নানা আকার ও নানা রঙের শেকড় আর গুল্মলতা দেখা যায়। প্রত্যেক বনের উপরতলায় পাহাড়ের কোটরে বাসাবেঁধে আছে চিলেরা আর গুহায় বন্য ভালুক, তাঁর নীচের ভাগে অধিকাংশ কাঠঠোকরারা বাসা বেঁধে থাকে। ওরা সারা দিন কোনও ফার কিম্বা বার্চ গাছের গুঁড়ির চারপাশে ঘুরঘুর করে। ঠুকঠুক করে কী ঠোকরায়, গাছের ছালের ওপরে কিংবা নীচে কিসের খোঁজ করে?

একটি মরা ফার গাছের ছাল তুলে গরব দেখেছে ছালের ঠিক নীচে নীচে সমস্ত কাণ্ডের চারপাশ দিয়ে চলে গেছে আঁকাবাঁকা সরু সরু রেখা। এই রেখাগুলি দাঁত দিয়ে কেটে কেটে যারা তৈরি করেছে তারা হল ফার গাছের স্থায়ী বাসিন্দা – এক ধরণের পরজীবী গুবরে পোকা। কিছু দূর গিয়েই একটা দোলনার মতন গর্তের মধ্যে গুবরে পোকার শূককীট থেকে প্রথমে মূককীট হয়, তারপর বেরিয়ে আসে পরিণত গুবরে পোকা। এই গুবরে পোকারা ফার গাছে থাকতেই অভ্যস্ত। কাঠঠোকরারও ঐ গুবরে পোকা না হলে চলে না। কাঠঠোকরারা ধারালো লম্বা ঠোঁট দিয়ে গাছের ছাল ফুটো করে। কাঠঠোকরার জিভ এমনই লম্বা ও কমনীয় যে তার জোরে সেই গর্ত থেকে শূককীট টেনে বার করে আনে। শীতকালে কাঠঠোকরারা পাইন গাছের কাণ্ড আর ডালের মাঝখানের ফাঁকে কায়দা করে পাইনের শীষ রেখে তার ভেতর থেকে বীচি বের করে খায়। গাছের কাণ্ড খুঁড়ে খুঁড়ে ওরা বাসার জন্যে কোটর বানায়। টানটান লেজ আর কোনও জিনিস আঁকড়ে ধরার উপযোগী নখওয়ালা আঙুল থাকায় ওরা অনায়াসে গাছের কাণ্ড বেয়ে উঠতে পারে। এই মাঝারি উচ্চতায় আরও রয়েছে একঝাঁক বানর। তাঁদের খাবার জন্যে এই অরণ্যে ফলের অভাব নেই। এর নীচে ঝোপঝাড়ের মধ্যে রয়েছে কালোটুপি পাখিদের বাসা, আরও নীচে মাটিতে ঘোরাফেরা করে খরগোশ আর বন মোরগেরা। ওদের শিকার করতে ওত পেতে থাকে জংলী কুকুর আর শিয়ালের দল। মাটির নীচে, পাতালে সুড়ং খুঁড়ে থাকে অসংখ্য পিকা ইঁদুর।

পাহাড়ি গুহাগুলিতেও উচ্চতা অনুযায়ী পরিবেশের ভিন্নতা রয়েছে। ওপরের দিকে খুব আলোহাওয়া আর শুকনো খটখটে। আর নীচের দিকে বাড়তে থাকবে অন্ধকার ও আর্দ্রতা। এই পাহাড়ে কতগুলি অত্যন্ত ঠান্ডা গুহাও আছে। সেগুলিতে কেবল গ্রীষ্মকালে বাস করা যায়। কিন্তু গরবের গুহাটি সারা বছর থাকার মতন গরম গুহা। বাইরে রয়েছে অসংখ্য কাঠবিড়ালি। এরা মূলতঃ পাইন গাছের শীষ আর কাঠবাদাম ছিঁড়ে খায়। বেজি তাড়া করলে লেজের সাহায্যে কসরত করে লাফ দিয়ে প্রাণ বাঁচায়।

# ৬ #

পরদিন সকালে নীল চোখ সাহেব মঙ্গোলিয়ান মালবাহকদের ডেকে তাড়াতাড়ি শিকারে বেরুনোর প্রস্তুতি নিতে বলে। ওরা কোনও প্রতিবাদ জানায় না। কিন্তু তারপর অনেকক্ষণ সময় পেরিয়ে গেলে দলপতি ওদেরকে ডাকতে এসে দুই চীনা ভৃত্য ছাড়া কাঊকেই খুঁজে পায় না। ওরা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তরে রান্নায় ব্যস্ত চীনারা অরণ্য ও পাহাড়ের দিকে দেখায়! তারাও জানতো না যে ওরা আসলে কোথায় গেছে! দলপতি গিয়ে সোনালি চুল সাহেবকে প্রশ্ন করলে সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঠোঁট বেকিয়ে ঋণাত্মক শ্রাগ করে শিস দিতে শুরু করে! সাহেব তাঁবুতে ফিরে মদের বোতল খুলে বড় পেগ বানায়। চীনা ভৃত্যদের চেঁচিয়ে ডেকে তাঁর জন্যে চাট বানিয়ে দিতে বলে! তারপর সিগারেট ধরায়। এক চুমুকে গ্লাসের পুরো মদ গলাধঃকরণ করে গ্লাসে আবার মদ ঢালে। মালবাহকদের উদ্দেশ্যে নোংরা গালি দিতে থাকে! চীনা ভৃত্যরা এর বিন্দুবিসর্গ না বুঝলেও রাগটাকে বোঝে। লোকটা যে গালি দিচ্ছে এটা বোঝে। ওরা পরস্পরের চোখে তাকিয়ে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। এদিকে রাগ আর মদের নেশায় সাহেবের নীল চোখদুটি ক্রমে লাল হতে থাকে।

মঙ্গোলিয়ান মালবাহকরা ততক্ষণে পাহাড়ের উপর গুরু দর্দজি মিগ্যুরকে প্রণাম জানাতে পৌঁছে গেছে। ওদের আসার কথা শুনে তিনি গুহার দরজা খুলেছেন। শুধু তাই নয়, গরবের যেন মনে হল যে তিনিও ওদেরই আসার অপেক্ষায় ছিলেন! তিনি ওদেরকে বলেন যে সোনালি চুল সাহেবও যেন পরদিন এসে দেখা করে যায়। ওদের মুখে নীল চোখ সাহেবের জোর জুলুমের কথা শুনে গুরু দর্দজি মিগ্যুর যে পরামর্শ দিলেন, গরবের মনে হয় যে, এর থেকে ভাল সত্যিই আর কিছু হতে পারে না! সেই উপদেশ শোনার পর ওরা তাঁর উপস্থিতিতেই কড়গুণে ধারাবাহিক জপ করতে থাকে। ওম মণিপদ্মে হুম, ওম মণিপদ্মে হুম...

সারাদিন মদ খেয়ে বিকেলের দিকে মাতাল সাহেব ওদের বলেন যে অবাধ্য মালবাহকরা ফিরলে ওদের হত্যা করতে হবে, নাহলে তিনি ওদের খুন করবেন! এই হত্যার হুমকি শুনে ওরা ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর মঙ্গোলিয়ান ও তিব্বতি মালবাহকরা পাহাড়ের গুহা থেকে ফিরে সোনালি চুল সাহেবকে জানায় যে সন্ন্যাসী দর্দজি মিগ্যুর ওর আর্জি শুনেছেন। পরদিন সকালে তিনি দেখা করতে যেতে পারেন। নীল চোখ সাহেব ওদের আসার অপেক্ষায় বন্দুক হাতে বসে ছিল। কিন্তু রাগ ও মদের নেশায় তার হাত এত কাঁপতে থাকে যে সে ওদের তাঁবুতে এসে অবাধ্যতার জন্য বিদেশি ভাষায় গালি দিতে থাকে। তারপর হুমকি দেয়, পরদিন তার সঙ্গে শিকার করতে না বেরুলে ফল ভাল হবে না!

মালবাহকরা মাছের মতন তাকিয়ে থাকে। গুরুর পরামর্শ মেনে মাতালের কথার কোনও জবাব দেয় না, কিন্তু সেদিন রাতেই দুই সাহেব যখন ঘুমে অচেতন, তাঁরা কয়েকটি খচ্চরের পিঠে যথেষ্ট খাবারদাবার চাপিয়ে, পরদিন পশু শিকারের জন্যে দেওয়া বন্দুক এবং গুলিবারুদ সঙ্গে নিয়ে নিজেদের তাঁবু গুটিয়ে যে পথে এসেছে, সেই পথ ধরে চলতে থাকে। চেনা পথে ভোরের আগেই তাঁরা চেনা পথে পাহাড়ের অন্য আরেক প্রান্তে পৌঁছে সেখানে তাঁবু গাড়ে। দিনে বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যায় তাঁরা আবার চেনা পথে চলতে শুরু করবে, আবার সারারাত চলবে।

# ৭ #

পরদিন কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে সোনালি চুল সাহেব দেখে যে ওদের দুটি তাঁবু ছাড়া আর কোথাও কিছু নেই। চোখমুখে জলের ঝাপটা দিয়ে টুথব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে বুঝতে পারে যে মালবাহক ও ভৃত্যরা নীল চোখ সাহেবের অত্যাচারে পালিয়েছে। সে তাড়াতাড়ি ফারবনে ঢুকে প্রাতঃকৃত্যাদি সেরে উষ্ণ প্রস্রবণে গিয়ে স্নান করে। তারপর তাঁবুতে ফিরে ধোওয়া জামাকাপড় পরে। নীল চোখ সাহেব তখনও প্রবল বিক্রমে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।

সে ধীরে ধীরে ফার অরণ্যের পথে পাহাড়ে চড়ে সন্ন্যাসী দর্দজি মিগ্যুরের গুহার পথে রওয়ানা দেয়। বেশ কষ্টকর চড়াই। একটু পরপরই দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিতে হয়। আগেরদিনই সে মালবাহকদের কাছে গুহায় যাওয়ার পথ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিয়েছিল।

গরব আগেরদিন ভেবেছিল যে সে সোনালি চুল সাহেবের উপস্থিতিতেই গুরু দর্দজি মিগ্যুরের কাছে তাঁর মনের দ্বিধা দূর করে নেওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু এদিন সন্ন্যাসী দর্দজি মিগ্যুরের গুহায় পৌঁছে সোনালি চুল সাহেব কয়েকঘণ্টা থাকলেও গরবের কথা বলার সুযোগ হয় না। ওরা কী নিয়ে কথা বলেন সে সম্পর্কে গরব কিছুই জানতে পারে না! আলোচনার সময় গুরু তাকে কোনও সাহায্যের জন্যেই ডাকেন নি। শুধু একবার ডেকে অতিথির জন্যে প্রাতঃরাশে ৎসাম্পা বানাতে বলেন, আর জানান যে সাহেব ফেরার আগে ওদের সঙ্গে খাবেন!

দুপুরে খাওয়ার পর গুরুর ডাকে গুহায় গেলে সোনালি চুল সাহেব বলেন, আমি জোওয়ো দর্দজি মিগ্যুরের আশীর্বাদ পেয়েছি, আগামীকাল ভোরেই এই ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাব, তুমি বলেছ যে, জীবজগতের মঙ্গলের জন্য কাজ করতে চাও, আমার সঙ্গী হবে? তোমার গুরু সম্মতি দিয়েছেন, তোমার সম্পর্কে বলেছেন, আমি জেনে গেছি তোমার অতীত; তুমি কি আসবে?

গরব হতভম্ব হয়ে একবার গুরুর দিকে আর তারপর সাহেবের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, কোথায়, তোমার দেশে?

গরব দেখে যে গুরু মিটিমিটি হাসছেন। সাহেব বলেন, আমি সম্ভবতঃ আর নিজের দেশে ফিরবো না; এই দেশেই থাকবো!

সন্ন্যাসী বলেন, দেবতারা তোমাদের পথ দেখাবেন!

গরব তাঁর দিকে তাকিয়ে বলে, এটা যদি আপনার আদেশ হয়, তাহলেই আমি যাব!

সন্ন্যাসী এবার স্বপ্নের ঘোরে থাকা আওয়াজে দৈববানীর মতন কেটে কেটে বলেন, গেলে তোমার ভাল হতে পারে, তোমার নিজের জন্য এবং অন্যদের জন্যও!

এই অপ্রত্যাশিত নিদান শুনে গরব অবাক। সন্ন্যাসী একটু থেমেই আবার আদেশের স্বরে বলেন, তাহলে, কালই রওয়ানা দাও!

গরব এই আদেশ পেয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে। সে উঠে দাঁড়াতেই সোনালি চুল সাহেব হাতজোড় করে ঘাড় ঝুঁকিয়ে গুরুকে প্রণাম জানায়। তারপর একপা এগিয়ে গুরুর হাতে চুমু খায়।

সন্ন্যাসীর এই আদেশের অভিনবত্ব এবং তাৎক্ষনিকতা গরবকে হতভম্ব করে দেয়। অতীন্দ্রীয় কোনোকিছু, অলৌকিক কিছু অনুভব ক‍রে শিহরিত হয়!

গরবের মনে হয়, সেদিন সকালেই নিজের গুহায় বসে মনে মনে যা ভাবছিলো তার সঙ্গে এই আদেশের একটা সুক্ষ্ম যোগসূত্র রয়েছে। সোনালি চুল সাহেব তখন উৎরাই বেয়ে সন্তর্পনে নিচে নামছে । গরব পেছন পেছন। সে কী ভেবে সাহেবকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কি ন্যায়বিচারের প্রতিমূর্তি গেসারের দূত নাকি দয়ার অবতার বুদ্ধের প্রচারক?

সোনালি চুল সাহেব ওর প্রশ্ন শুনে একমুহূর্তের জন্যে থমকে দাঁড়ায়। তারপর পেছন ফিরে ওর দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বলে, হয়তো দুটোই!

তারপর সে আবার সন্তর্পনে পাহাড়ের ধাপ নামতে নামতে পাহাড়ের পাদদেশে নিজের তাঁবুর ভেতর ঢুকে পড়ে। গরব লক্ষ্য করে যে ওখানে এখন মাত্র দুটো তাঁবু। তার মানে মালবাহকরা গতকাল রাতেই জোওয়ো দর্দজি মিগ্যুরের কথামতন স্থানত্যাগ করেছে। তার মানে পরবর্তী সব কিছুর পেছনেও গুরু দর্দজি মিগ্যুরের ইচ্ছাই কাজ করছে বলে মনে হয় গরবের। এভাবেই তিনি হয়তো জীবজগতের মঙ্গলের জন্য যা ভাল তা-ই করে চলেছেন!

গরব আবার পাহাড়ে চড়তে থাকে। তখনই নিচে থেকে কেঊ তার নাম ধরে দু’বার ডাকে। নারীকন্ঠ। সে চারিদিকে তাকায়। কাউকে দেখতে পায় না! সে কি ভুল শুনেছে? নারীকন্ঠে কে ডাকছে তাকে?

গরব ভাবে, নিশ্চয়ই তার মনের ভুল! এখানে তার নাম ধরে কে ডাকবে? একমাত্র গুরুই তাকে নাম ধরে ডাকেন!

গুরু নিজে থেকে না ডাকলে গরব সাধারণতঃ তাঁকে গিয়ে বিরক্ত করে না। কিন্তু পরদিন সকালেই চলে যাওয়ার আদেশ পেয়ে সে এতটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে যে সে দিনের বাকি সময় আর রাতটা গুরুর গুহায় তাঁর পায়ের কাছে বসে কাটাতে চায়। এখান থেকে চলে যাওয়ার আগে সে আরেকটিবার গুরুর জলদগম্ভীর কন্ঠনিঃসৃত বাণী শুনতে চায়, যা একদিন তাঁর অশান্ত হৃদয়কে শান্ত করেছিল। আর যদি তিনি কিছু না বলেন তাহলেও সে চুপচাপ তাঁর গুহায় বসে থেকে তাঁকে দেখবে, তাঁর চারপাশে যে অপরিসীম শুভেচ্ছা আর অবর্ণনীয় শান্তির আবহ বিরাজ করে তাতে ডুবে থাকবে। কিন্তু গুরু তাঁকে সোনালি চুল সাহেবকে পাহাড়ের পাদদেশ অব্দি পৌঁছে দিতে বলেছে, আবার গুহায় ফিরতে বলেননি। তাই সে আপাততঃ নিজের গুহাতেই গিয়ে ঢোকে আর মনে মনে প্রার্থনা করে, তিনি যেন তাকে ডাকেন! আগামীকাল থেকেই যে অজানা পথে সে পা বাড়াতে চলেছে তা নিয়ে একটা অদ্ভূত উত্তেজনা টের পায়।

ঠিক সেই সময়ে তার গুহার মুখে ঝুলতে থাকা চমরি গাইয়ের ভারী চামড়ার পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢোকে এক রূপসী। কে? কে এরই রূপসী? এ কোন দেবী?

রূপসী কাছে এসে বলে, নিচে থেকেই তো তোমাকে দেখে ডাকছি গরব, তুমি শুনতেই পেলে না, আমি এসেছি, এতদিনে তোমাকে খুঁজে পেয়েছি!

গরব অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করে, দেচমা! দেচমা তুমি তো মরে গেছ!

দেচমা হেসে বলে, না, আমি তোমার মতনই জীবিত! ভেবেছিলাম তুমি বুঝি আর বেঁচে নেই! আমি তোমার টুপিটাকে সেই খরস্রোতা নদীর মাঝে একটি পাথরে ঝুলতে দেখে ভেবেছিলাম যে তুমি ডুবে গেছ, প্রবল স্রোত তোমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আমি শোকে মুহ্যমান হয়ে নিজের চুল কেটে ফেললাম। তারপর ঘুরতে ঘুরতে একটা মঠে আশ্রয় পেয়ে ক্রমে ভিক্ষুণী হয়ে পড়লাম। এমনি দিন, মাস, বছর কেটে যায়। নিরর্থক একঘেয়ে জীবনে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম! কিন্তু একদিন ঈশ্বর আমাকে আবার নদীর ওই অগভীর অঞ্চলটায় ফিরিয়ে আনে। সেখানে দেখি এতগুলি মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও, এত ঋতু পরিবর্তন সত্ত্বেও তোমার টুপিটা একইভাবে সেই পাথরে ঝুলছে। এই দৃশ্য আমাকে অবাক করে। প্রবল বাতাস, ঝড় বৃষ্টি তুষারপাতের পরও ওই টুপিটা এতদিন ধরে লটকে রয়েছে দেখে বুঝতে পারি যে এটা আমার জন্যে শুভচিহ্ন। যমদূতেরা আমাদের নিতে এসেও পরস্পরের ভালবাসার জোরে খালিহাতে ফিরে গেছে। তারপরই আবার তোমাকে খুঁজতে বেরুলাম, নদীর দু’পাড়ের গ্রামে গ্রামে বাড়িতে বাড়িতে ভিক্ষে করার অছিলায় তোমাকে খুঁজছিলাম! যেমনটি আগে একবার বেরিয়েছিলাম এবং আগের মতনই এবারও অবশেষে খুঁজে পেলাম। তোমাকে আমি খুঁজে পাবো না তা হতেই পারে না। আমাদের জন্ম-জন্মান্তরের সম্পর্ক। এখন থেকে আমরা একসঙ্গে থাকবো, আর কখনও কাছছাড়া হবো না!

কোনওরকম নাটকীয় আবেগ ছাড়া শান্ত কন্ঠে ধীরে ধীরে কথাগুলি বলে দেচমা। সে যে তার স্বপ্নকে আর একবার বাস্তবে জুড়তে পেরেছে; প্রাকৃতিকভাবেই জুড়েছে! তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার বাইরে গরবের জীবনে আর যা যা ঘটেছে সেসব সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই! এই যেন দুই সহযাত্রী ঝঞ্ঝাসঙ্কুল রাতে পাশাপাশি ঘোড়া চালিয়ে যেতে যেতে ঝড়ের দাপটে ও কুজ্ঝটিকায় হারিয়ে যাওয়া আর ঝড় থেমে গেলে দিনের আলোয় আবার পরস্পরকে ফিরে পাওয়া! গরব যে এখন একসঙ্গে থাকা ছাড়া অন্য কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারে তা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না দেচমা! সে যে বরাবরই গরব অন্তপ্রাণ! অন্য ভিক্ষুনীদের থেকে আলাদা হওয়ার পর এই দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে গরবকে খুঁজে পেতে ওর প্রায় একবছর সময় লেগে গেছে। এই একবছরে তাঁর চুল লম্বা হয়ে প্রায় কোমর ছুঁয়েছে! দীর্ঘ পথশ্রমে সে অনেক শীর্ণকায়, প্রনের আঙরাখাটি শতছিন্ন; তবুও গরবের চোখে আজও আগের মতনই সুন্দরী দেচমা!

গরব আবার দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়ে পড়ে। গত দেড়বছর ধরে দেচমাকে ভুলতে সে কত না কৃচ্ছসাধন করেছে! নিজেকে সম্পূর্ণ সমাজকল্যাণে নিয়োজিত করার জন্যে তিল তিল করে তৈরি করেছে! অবশেষে তার সামনে গুরু যখন নতুন পথ খুলে দিলেন তখনই প্রায় আকাশ ফুঁড়ে দেচমার আবির্ভাব! অবিশ্বাস্য! এ কী পরীক্ষায় ফেললে প্রভু! মানবকল্যাণ...জীবসেবা...অমরত্বের সাধনা! বোধিসত্ত্বরা প্রত্যেকেই জীবজগতের সমস্ত প্রাণকে দুঃখকষ্ট ও যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ দেখাতে নিজেদের জীবনের সুখসাচ্ছ্বন্দ্য ত্যাগ করে আত্মোৎসর্গ করেছেন।

গরব নিজের আবেগ সংযত করে দেচমাকে বোঝাতে চায় যে সে আর আগের গরব নেই, সে জীবকল্যাণে আত্মোৎসর্গের পথে পা বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তার আওয়াজ কেমন দ্বিধাদীর্ণ। শান্ত ও অবাক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকা দেচমার প্রত্যয় ওর সমস্ত অর্জিত জ্ঞান ও ধারণাকে চেপে দেয়। দেচমা যে তার ঊষর মরুভূমির মতো জীবনে একমাত্র মরূদ্যান! গরব নিজের অজান্তেই বলতে থাকে তাঁর পিঠে গুলি লাগা,... দেচমার ডুবে যাওয়া,... বিদ্যুতের চমকে হঠাৎ দেখা শুধু প্রজাপতির মতন পাঁচটি আঙুল,... অচেতন হয়ে পড়া,...জ্ঞান ফিরে সো সা লিং,...অনগ...মিগমার...রাম...মঠাধ্যক্ষ,...নারকীয় শৈলান্তরীপ,...পালানো, ...রামের মৃত্যু,...একবছর ঘুরে ঘুরে অবশেষে অ্যামনে ম্যাৎচেন! এবার সে সন্ন্যাসী হতে চায়, জীব কল্যাণে কাজ করতে চায়!

দেচমা বলে, বুঝেছি, আমি তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি, তুমি আমার, শুধুই আমার, আমিও শুধুই তোমার, এসো!

গরব পাথরের মতন দাঁড়িয়ে থাকে। তার ভেতরে ঝড় বইতে থাকে। দেচমা এবার আবেগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে কেঁদে ফেলে। সে বলে, আমি শুধু তোমার জন্যে বেঁচে আছি গরব, তুমি কেন আমাকে আগের মতন ভালবাসো না, তোমাকে ছাড়া আমার কী হবে?

এই মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে গরবের মনের দ্বন্দ্ব বাড়ে; গুরুর আদেশে বৃহত্তর জীবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার কথা ভেবে নিজেকেই প্রতারণা করছে না তো সে? নিজের প্রতি এই ছলনার ফল তার প্রিয়তমা দেচমা কেন ভোগ করবে? বৃহত্তর উদ্দেশ্য সাধনের প্রথম ধাপেই কি সে এই প্রাণাধিকার আশা- আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নকে বলি দেবে? এভাবে যে সে এক অনিশ্চিত পরোক্ষের জন্যে প্রত্যক্ষভাবে একটি জীবাত্মাকে কষ্ট দেবে! এরকম করলে দেচমা হয়তো অপমানে আত্মহত্যা করবে নতুবা জীবন্মৃত হয়ে বেঁচে থাকবে – এটা কি অন্যায় হবে না? এটা কি ওর পরীক্ষা? ঈশ্বর ওর সামনে প্রিয়তমা দেচমাকে নিয়ে এসে পরীক্ষা নিতে চাইছে যে সে ব্যক্তিগত ভালবাসাকে জয় করে বৃহত্তর জীব-কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করতে পারে কি না?

সে ভাবে, সত্যি সত্যি এহেন উৎসর্গই ওর জীবন ও বেঁচে থাকাকে গৌরবান্বিত করবে! গৌরব এতদিন ধরে যে উৎসর্গীকৃত জীবনের স্বপ্ন দেখে আসছে সেই স্বপ্নই এখন তার দ্বন্দ্বে সবচাইতে বেশি বিপ্লব ঘটায়। আগামীকাল সকালেই গুরুর নির্দেশে সূর্যরশ্মির মতন সোনালি রঙের চুল লোকটির সঙ্গে অজানা পথে বেরিয়ে পড়বে সে, লোকটির বাচনভঙ্গী রাক্ষসহত্যাকারী লিং এর গেসারের মতন কিম্বা অবচেতনে দেখা বোধিসত্ত্বদের মতন।

ওর এই সিদ্ধান্ত বোঝাতে গরব নানারকম কথা বলে, তত্ত্বকথা শোনায়, পাপ-পূণ্য, মানবকল্যাণ – জীবকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার কথা বলে; কিন্তু তার সমস্ত যুক্তি নিজের কানেই খেলো শোনায়, দেচমার অসহায় দৃষ্টির সামনে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। নিজের কান্না থামিয়ে দেচমা এখন ওর কথা বোঝার চেষ্টা করছে – গরবের কী হল? সে কী একা থেকে দেচমার বিরহে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েছে যে এরকম পাগলের মতন প্রলাপ বকছে?

দেচমা এখন আবেগমথিত কন্ঠে জোর দিয়ে বলে, কী সব আবোলতাবোল বকছো? আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি, এখন ফিরিয়ে নিয়ে যাবো, চলো!

তখনই নীল চোখ সাহেবের চীনা অনুবাদক ভৃত্যটি গরবের গুহার মুখে টাঙানো চমরী গাইয়ের চামড়ার পর্দার একপ্রান্ত সরিয়ে উঁকি দেয়। তারপর বলে, মঙ্গোলিয়ান মালবাহকরা সেই যে পালিয়েছে আর ফেরেনি! সাহেব এখন আমার পেছনে দাঁড়িয়ে। সে সন্ন্যাসী দর্দজি মিগ্যুরের সঙ্গে দেখা করতে চায়। তার ধারণা সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা করতে এসে তার ভৃত্যরা তাঁরই কুপরামর্শে পালিয়েছে!

সে ঢোঁক গিলে বলে, সে সকাল থেকে মদ খেয়ে যাচ্ছে। এখন বন্দুকে গুলি ভরে নিয়ে যাচ্ছে! আমার ভয় করছে! তুমিও আমার সঙ্গে সন্ন্যাসীর গুহায় চলো!

গরব কোনও জবাব দেওয়ার আগেই পেছন থেকে এক প্রবল ধাক্কায় লোকটা ছিটকে গরবের গুহার মাঝখানে এসে পড়ে। পর্দাটাকে হ্যাঁচকায় সরিয়ে বিদেশি লোকটিও গুহায় ঢুকে পড়ে। সে তার ভাষায় চীনা লোকটিকে কিছু আদেশ দেয়। চীনা লোকটি হাত পা নাড়িয়ে তাঁকে ঋণাত্মক জবাব দেয়। বিদেশি আবার গরবকে দেখিয়ে একই বাক্য উচ্চারণ করে কিছু আদেশ দেয়।

চীনা লোকটি তখন থতমত খেয়ে বলে, এই লোকটা তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়, সে জানে না যে আরও উঁচুতে সন্ন্যাসীর গুহা রয়েছে, সে তোমাকেই সন্ন্যাসী ভাবছে!

গরব কী করবে, কী বলবে বুঝে পায় না। লোকটার হাতে বন্দুক। চীনা অনুবাদক সাহেবকে আরেকবার তার ভুল বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু হয় সে ভালভাবে বোঝাতে পারেনি অথবা সাহেব এত বেশি মাতাল হয়েছিল যে সে তাঁর কোনও কথাকে আমলই দেয়নি। অথবা ভেবেছে দোভাষী সন্ন্যাসীর পক্ষ নিয়ে মিথ্যে কথা বলে তাকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে। সে আরও রেগে তার বন্দুক উঁচিয়ে চীনা লোকটির দিকে তাক করতেই চীনা লোকটি পড়ি কি মরি এক ছুটে সাহেবের পাশ দিয়ে গুহার বাইরে চলে যায়। এবং পাহাড়ের কোনও খাঁজে লুকিয়ে পড়ে। বিদেশিও তার পেছন পেছন গুহার দরজা পর্যন্ত যায়। পর্দা সরিয়ে হাঁকডাক করে। তারপর পাগলা কুকুরের মতন গজরাতে থাকে। কিন্তু সে চীনা লোকটিকে খুঁজে পায় না!

এতে মাতালের রাগ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। সে টলতে টলতে আবার গুহার ভেতরে ফেরে। ফিরেই সে দেচমাকে দেখতে পায়। দেচমা তখন নানা গ্রাম থেকে আশ্রমের জন্যে দিয়ে যাওয়া নানা খাদ্যশস্যের স্তুপের পেছনে লুকানোর চেষ্টা করছিলো। অপ্রত্যাশিতভাবে একজন মহিলাকে দেখে নীল চোখ সাহেব একবার থমকে দাঁড়ায়। সে তখন এ যাবৎ শেখা তিব্বতি ভাষার ভাণ্ডার আঁতিপাঁতি খুঁজে সন্ন্যাসীর গুহায় মহিলার অবস্থান নিয়ে ব্যঙ্গ করে বলে, হি! গমচেন, দজোওয়ো গমচেন...শিমো, শিমো...হো-হো !

তার মানে, সন্ন্যাসী, মহান সন্ন্যাসী, মহিলা, মহিলা! হো-হো...!


চলবে ...