সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০

মহাসত্যের বিপরীতে তৃতীয় খণ্ড #ষোড়শ পর্ব

আমি বরফে পায়ের ছাপ রেখে এসেছি/ আর কিছু গোপন কিম্বা অগোপনে নেই/ আমার ভালবাসার শয়নকক্ষে/ শংখশুভ্র হৃদয়, শরীর টানটান। - ৎসাংইয়াং গ্যাৎসো( ৬ষ্ঠ দলাই লামা)

মধ্য তিব্বতের খ্যাং তিসে বা কৈলাশ থেকে প্রথমে অতিপ্রাকৃত কারণে ও পরে চীনা সৈন্যের তাড়া খেয়ে ফেরার পথে যেখানে যেখানে তারা বরফে পায়ের ছাপ রেখে এসেছে, যেখানে বিশ্রামের সময় সমস্ত ভ্রম কাটিয়ে পরস্পরকে পাগলের মতন আদর করেছে, কোনও শয়নকক্ষ না জুটলেও, কোনও অমাবস্যার অন্ধকার কিম্বা প্রাকৃতিক আড়ালে আর কিছু গোপন থাকেনি, অগোপনেও থাকেনি, ফলে দেচমার শরীরে যে গরবের ভালবাসার ফসল অঙ্কুরিত হয়েছিল তা দুজনেই জানতো না। এটাই স্বাভাবিক। খরস্রোতা নদীটা পেরোনোর সময় দেচমার ঘোড়াটি পিছলে না গেলে আর গরব গুলিবিদ্ধ না হলে ওদের জীবনটাই অন্যরকম হতো!

পরস্পরের কাছ থেকে অনেক দূরে চলে যাওয়া গরব ও দেচমার পুনর্মিলনের জন্য অলক এত ব্যগ্র হয়ে অপেক্ষা করছিলো যে এতক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকেই আনতে ভুলে গেছিল। এবার তাঁকে আগে বলা গল্পের বেশ কিছুটা অংশ একটু নতুনভাবে বলতে হবে। ভারত কিংবা তিব্বতের ঠাকুমা – দিদিমা – গ্রামবুড়ো-বুড়িদের পরস্তাবে, কথকঠাকুরদের বলা কাহিনিতে সময়ের প্রয়োজনে এরকম অনেক পরিবর্তন অত্যন্ত স্বাভাবিক। আমরা এভাবেই গল্প শুনতে অভ্যস্ত। অলক তো এই মহাদেশেরই এক ক্ষুদ্র লেখক। তার লেখায়ও এই পরিবর্তন পরবর্তী কথনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গরবের ভালবাসার অঙ্কুরকে দেচমা প্রথম টের পায় সামতেন লিং মঠে। ততদিনে সেখানকার জীবন দেচমার কাছে ক্রমে একঘেয়ে হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান কোনদিনই তাকে তেমন টানে না। তাই ভেতরে ভেতরে বিরক্তি ও এক দুর্বোধ্য ক্লান্তি অস্থির করে তুলতো। সামতেন লিং এর গ্রন্থাগারে বসে বসে বুদ্ধের বানী ও বোধিসত্ত্বদের উপদেশমালা পড়তেও আর ভাল লাগতো না। ঘুম পেত। মঠাধ্যক্ষার কাছে গিয়ে নিয়মিত বসতো, নানা আচার অনুষ্ঠান দেখতো, কিন্তু সক্রিয় অংশগ্রহণ করতো না, এমনকি এগুলির মানে বোঝারও কোনও চেষ্টা সে করে নি।

মঠাধ্যক্ষা এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের উচ্চ-ধর্মশিক্ষায় শিক্ষিত মহিলা। নিঃসন্তান। বিধবা হওয়ার পর দীক্ষা নিয়ে নিজের সমস্ত সম্পত্তি এই মঠকে দান করেছেন। কিন্তু এই মঠের কারও জীবনযাপন দেচমাকে আকর্ষণ করে না। সে যে আকৈশোর দিবাস্বপ্নচারিনী! এখনও সে একইরকম স্বপ্নে বিচরণ করে।

তার স্বপ্নে হামেশাই অতীত, বর্তমান ও কল্পনা একাকার হয়ে যায়। এই স্বপ্নের ঘোরে ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়ে একদিন সে গরবকে পেয়েছিল, সেই স্বপ্নের নায়কের মৃত্যু তার জীবনকে অর্থহীন করে তুলেছে। সেদিন থেকে সে একরকম নির্বাক, কৌতুহলহীন, নিজের প্রতি অমনোযোগী, আর এই মঠে দীর্ঘদিন থেকে ক্রমে পূজাচার ইত্যাদির একঘেয়েমির শিকার। মাঝেমধ্যে তো এটাই বুঝে উঠতে পারতো না যে বেঁচে থেকে কী হবে!

তখনই একদিন খুব বমি হল, দুদিন ধরে বারবার বমি হতে দেখে মঠাধ্যক্ষা কিছু আঁচ করেন। কিছু জড়িবুটি দেন। আর ওকে কিছু প্রশ্ন করেন। দেচমাও গরবের পরিচয় ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কিছুই গোপন করে না।মঠাধ্যক্ষা দোরজে ফাগমার শিষ্যা, এবং চিকিৎসা বিদ্যা ভালোই জানেন। তৃতীয় দিনেই তিনি ঘোষণা করেন যে দেচমা মা হতে চলেছে, আর ছ’মাসপরেই সে প্রসব করবে।

দেচমা হতবাক। সে হাসবে না কাঁদবে? এক অদ্ভূত আবেগে তার দু’চোখ জলে ভরে ওঠে। মঠাধ্যক্ষা তাঁর মাথায় ও পিঠে হাত বুলিয়ে বলেন, যে আসছে সে তিব্বতের জন্য লড়বে, মানবতার জন্য লড়বে, তাঁকে ভাল করে লালন করো মা ! তার আগে তোমাকে নিজেকে সুস্থ রাখতে হবে, নিয়ম মেনে ভাল খাওয়াদাওয়া ও প্রার্থনা করতে হবে।

দেচমা চমকে ওঠে। এই ভবিষ্যদ্বাণী যে তাঁর অতীত কল্পনার সঙ্গে মিলে যায়! তার দু’গাল বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ে। সে হাত দিয়ে গাল মুছে মঠাধ্যক্ষাকে প্রণাম করে। তারপর নীরবে উঠে কাহিল শরীরে ধীরে ধীরে হেঁটে নিজের কামরায় ফেরার পথে লম্বা বারান্দার দেওয়ালে লাগানো মঠের আয়নার সামনে দাঁড়ায়। কতদিন নিজেকে দেখেনি! তার মলিন পোশাক আর পরিত্যক্ত সৌন্দর্য দেখে নিজেই অবাক হয়। তার মুন্ডিত মস্তক যেন এই পরিত্যক্ত সৌন্দর্যেরই প্রতীক। সে মনে করে, এই সমস্ত কিছু তাঁর বৃদ্ধ দাদু-দিদার স্নেহের প্রতি কৃতঘ্নতার পরিণাম ! তাঁদেরকে বিপন্ন ও অসহায় অবস্থায় ফেলে স্বার্থপরের মতন শুধু নিজের স্বপ্নের পেছনে ছোটার প্রায়শ্চিত্য করছে। এই প্রায়শ্চিত্য যতদিন শেষ না হবে, এই একঘেয়ে বিরক্তিকর জীবন থেকে সে মুক্তিও পাবে না। তারপর যদি তার মৃত্যু আসে!

তার আরও মনে হয় যে, গরবকে এত পাগলের মতন ভালবেসে তার সঙ্গে মিলনসুখকে দীর্ঘায়িত করতে সে তাকে মাসের পর মাস ঘোড়ার পিঠে ছুটতে ও নানারকম ঝুঁকি নিতে উৎসাহ জুগিয়েছে। ফলস্বরূপ, সে তার প্রিয়তমকে হারিয়েছে!

না না, এরকম নেতিবাচক ভাবলে চলবে না, এখন সে মা হবে, সন্তানকে বড়ো করতে হবে! কিন্তু কার জন্যে? তিব্বতের জন্যে? মানবতার জন্যে?

শরীরে নতুন প্রাণের অস্তিত্ব ধীরে ধীরে তার জীবনশৈলী বদলে দেয়। মঠের অভিজ্ঞ সন্ন্যাসিনীরা তাঁকে বেশ কিছু যোগাসন শেখান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরে আসা পরিবর্তন অনুসারে তাঁরা যোগাসনে পরিবর্তন আনেন। রোজ সকালে নিয়ম করে কাজু, কাঠবাদাম, চিনেবাদাম, আখরোট, খুবানী ও কিসমিসের তৈরি লাড্ডু খেতে হয়।ছ’মাস পর লোসার উৎসবের দিন সকালে সামতেন লিং মঠের মঠাধ্যক্ষার তদারকিতে আশপাশের গ্রামগুলিতে অনেক প্রসবের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এক দাইয়ের হাতে একটি পুত্রসন্তান জন্ম দেয় দেচমা।

এরপর থেকে তার জীবনে আরও পরিবর্তন আসে। মঠাধ্যক্ষা তার ছেলের নাম রাখেন শৃসান। প্রথম দিনেই চুকচুক করে বুকের দুধ খেয়ে সবাইকে অবাক করে দেয় শিশুটি। অবাক করে তার মাকেও, এক অভাবনীয় আনন্দে শরীর মন আনন্দে ভরা যায়। দেচমার জীবনে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। এভাবেই দেখতে দেখতে ছেলে একদিন উপুড় হয়, কয়েকমাস পর উঠে বসে, হামাগুড়ি দিয়ে সারা ঘরে ঘোরে, আর পরের বছর লোসারের আগেই উঠে দাঁড়ায়। তারপর ছ’মাসের মধ্যেই টালমাটাল হাঁটতে থাকে। কিন্তু তখনও বুকের দুধ খায়।

শৃসানের বয়স একবছর হওয়ার পর থেকেই মাঝেমধ্যেই দেচমাকে অন্য মঠবাসিনীদের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে ভিক্ষে চাইতে যেতে হতো। এতদিন ওর মাতৃত্বকালীন ছাড় ছিল। সারাদিন ভিক্ষের পর সন্ধ্যায় ওরা যখন মঠে ফিরতো, প্রথম প্রথম শৃসান ঠোঁট বাকিয়ে ক্ষোভ জানাতো। কিন্তু ধীরে ধীরে সে মঠের প্রবীণা সন্ন্যাসিনীদের এত ন্যাওটা হয়ে পরে যে মা থাকলো কি থাকলো না তাতে ওঁর কিছু আসে যায় না।

সামতেন লিং এ দু বছর থাকার পরই একদিন দেচমাকে দুজন প্রবীণা সন্ন্যাসিনীর সঙ্গে দূরবর্তী এক জনপদে যাওয়ার সুযোগ পায়। এক ধনী বিধবা তাঁর বাড়িতে সন্ন্যাসিনীদের নিয়ে গিয়ে চা-পানের পূণ্যার্জন করতে চান বলে মঠে আবেদন জানিয়েছিলেন। তাঁদের হাত দিয়ে তিনি মঠের অন্য সকলের জন্যে চায়ের সরঞ্জামও পাঠাতে চান। সেখানে তাঁদের রাতে থাকতে হবে। মহিলার সেই খামারবাড়িটি যে সেই পাহাড়ি নদীর কাছাকাছি, যার ওপারে রয়েছে দেচমা ও গরবের দীর্ঘ মিলনের রাতগুলি, সে ও গরব পাশাপাশি ঘোড়ায় চেপে ছুটে চলেছে যেন স্বপ্নের অতীতে, আর সেই নদী পার হতে গিয়েই যে গরবকে হারিয়েছিল তা দেচমা জানতো না!

প্রথা অনুযায়ী সন্ন্যাসিনীদের পুরো দু’দিন দু’রাত সেই খামারবাড়িতে থাকতে হবে। সন্ন্যাসিনীদের এভাবে সেবা করে তিনি যা পুণ্য অর্জন করবেন, সেই ধনী বিধবার বিশ্বাস যে এতে তিনি আগামী জন্মে আরও ধনসম্পদের অধিকারিনী হবেন!

ওই খামারবাড়ির পথে যেতে যেতে দেচমা একসময় বুঝতে পারে যে সে পরিচিত এলাকার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে,। সেই অভিশপ্ত নদীটি আর বেশিদূরে নয়, না জানি কেন সে কিছুটা চনমনে হয়ে ওঠে। হঠাৎ করে তাঁর মনে সেই নদীটাকে, বিশেষ করে নদীর ওই অগভীর অংশটিকে আরেকবার দেখার প্রবল ইচ্ছা জাগে। সেখানে নদীতীরের সেই অরণ্য, যার প্রায় প্রতিটি গাছের গুঁড়িতে সে গরবকে খুঁজেছে, আর জলের মধ্যে জেগে থাকা সেই শঙ্কু আকৃতির পাথরটি, যার তীক্ষ্ণ অগ্রভাগে গরবের পশমি টুপিটাকে ঝুলে থাকতে দেখে সে তার মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছিল।

সে অবশ্য সঙ্গিনীদের কাছে নিজের ইচ্ছার কথা জানায় না! জানালে তাঁরা কোনও কারণে মানা করতে পারেন। কিন্তু দেচমার মনে যখন ইচ্ছে জেগেছে, সে অবশ্যই যাবে! পরদিন কাকভোরে সবার আগে ঘুম থেকে উঠে সে নদীর পথে বেরিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ চলার পর কয়েকজন কৃষককে দেখতে পেয়ে সে নদীর অংশটি কোনদিকে জানতে চায়। ওরা আঙুল দিয়ে পথ দেখিয়ে বলেন, এই ক্রোশখানেক দূরে!

দেচমা দ্রুত পা চালায়। সূর্যোদয়ের একটু পরেই সেখানে পৌঁছে যায়।

তখন বসন্তকাল। রোদে সামান্য তাপ থাকলেও পাহাড়ের বরফ তখনও গলতে শুরু করেনি। দেচমার দেখা প্রবলা খরস্রোতা এখন শীর্ণ, ধীরগতিতে কুলকুল করে বয়ে চলেছে। স্বচ্ছ জলের নিচে ঝকঝকে নুড়িপাথর ও শ্যাওলা! অরণ্যের পথে হাঁটতে হাঁটতে দেচমা সেই জায়গাটি খুঁজে পায় যেখানে সে পাথরে ঝুলতে থাকা গরবের টুপি দেখতে পেয়ে নিজের চুলগুলি কেটে বৈধব্য বরণ করে নিয়েছিল। এই নিরানন্দ সন্ন্যাসিনীর আঙরাখা পরে একঘেয়ে দিন কাটাচ্ছে। দু’বছর কয়েকমাস পর প্রায় একই জায়গায় হাঁটুগেড়ে বসে সে মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে প্রণাম করে। কাকে প্রণাম করে? মনে মনে তথাগত বুদ্ধের মুখশ্রী কল্পনা করে। কিন্তু একী, তার মনের মধ্যে ভেসে ওঠে গরবের মুখ। আর প্রণাম সেরে চোখ খুলতেই সে একটি আজব দৃশ্য দেখে।

সেই শঙ্কু আকৃতির পাথরটার মাথায় কিছু একটা ঝুলছে, যা থেকে পাখির ডানার মতন কিছু পতপত করছে। নীলাভ ওই বস্তুটির গায়ে একটি চকচকে চাকতির মতন কিছু দেখে সে বুঝতে পারে এটি নির্ঘাত গরবের সেই টুপিটি যা নীল ও সোনালি রিবন দিয়ে সাজানো ছিল।

দেচমা কি ভুল দেখছে ? দীর্ঘ প্রায় আড়াই বছর পরেও রোদ জল ঝড় বৃষ্টি তুষারপাতে বিবর্ণ হয়েও একই পাথরের গায়ে টুপিটা একইভাবে ঝুলছে, হাওয়ায় পতপত করে পাখির ডানা ঝাপটানোর মতন উড়ছে রিবনগুলি ! দেচমা নদীর পাড়ে জুতো খুলে রেখে জল থেকে জেগে থাকা বড় বড় পাথরগুলিতে পা রেখে ওই বড় পাথরটার কাছে পৌঁছে যায়। সেই মলিন টুপিটাকে হাতে নিয়ে সারা শরীরে এক অদ্ভূত শিহরণ বয়ে যায়। সে যেন মহাকালের হাত থেকে নিজের অতীতের এক টুকরো ফিরে পেল! এমনও বাস্তবে হয়? নাকি সে বরাবরের মতনই দিবাস্বপ্ন দেখছে ? না, এই তো সে খালিপায়ে হিমশীতল পাথরের উপর দাঁড়িয়ে আছে, এভাবে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে জমে যাবে, এখন মন্দগতিতে বয়ে চলেছে নদীটি! সে আবার সাবধানে পা ফেলে ফেলে নদীতীরে ফিরে আসে।

দু’বছর পরেও টুপিটাকে একই পাথরে একইভাবে ঝুলতে দেখে ওর মনে একটা নতুন আশার সঞ্চার হয়। এটি নিঃসন্দেহে একটি শুভ সংকেত। দেচমার মন বলে, গরব নিশ্চয়ই মারা যায়নি, সে অবশ্যই বেঁচে আছে; নাহলে এই টুপিটা এতদিন ওই পাথরে ঝুলে থাকতো না!

সে কোথায় ?দেচমা কিছুই ভাবতে পারে না, কিন্তু সেই সকালের মিষ্টি রোদে ক্রমে ওর কল্পনার ঘোড়াটি আবার মনের মধ্যে স্পষ্ট হতে থাকে। গা ঝাড়া দিয়ে ফসিলপ্রায় স্বপ্নের নায়ক আবার সজীব হয়ে উঠতে থাকে! কোথায় পাবে তাকে? কিন্তু দেচমার মনে ক্রমে একটা প্রত্যয় জেগে উঠতে থাকে, আবার একদিন সে তাকে ফিরে পাবেই! একদিন সে তার স্বপ্নের নায়ককে পেতে সবকিছু ছেড়ে পথে নেমেছিল বলেই স্বপ্ন সফল হয়েছিল। এবারও তেমনি তাকে পেতে আবার পথে নামতে হবে! পেছনে তাকালে চলবে না!

একজোড়া টিয়া পাখি গাছের ডালে বসে পরস্পরকে আদর করছে। এই দৃশ্য দেখে না জানি কেন তার গায়ের রোম কাঁটা দিয়ে ওঠে।

নদীতীরে ফিরে পায়ে জুতো গলানোর আগেই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে আর সঙ্গিনী সন্ন্যাসিনীদের কাছে ফিরবে না। মঠে ফেরার প্রশ্নই ওঠে না! কিন্তু শৃসান? তার আর গরবের ভালবাসার ফসল শৃসান?

মলিন টুপিটাকে সে আঙরাখার ভেতরে বুকে গুঁজে নেয়। তারপর একবার পেছনে তাকিয়ে ভাবে, এখন শৃসান আর বুকের দুধ খাচ্ছে না। দেচমার নিরুদ্দেশের খবরকে কোনও দুর্ঘটনা ভেবে মঠের সন্ন্যাসিনীরা নিশ্চয়ই তার দেখাশোনা করবে। আর গরবকে ফিরে পেলে দুজনে এসে ওকে নিয়ে যাবে সবাইকে সত্যি কথা বলে।

এই ভেবে দেচমা নদীর উজানে অগভীর অঞ্চলটার দিকে হাঁটতে থাকে। সেখানে পৌঁছে নাজানি কেন সে আবার জুতো খুলে হাতে নেয়, আঙরাখা গুটিয়ে হাঁটুর উপর তুলে ধরে। সাধারণ তিব্বতি মেয়েদের তুলনায় সে বেশ লম্বা। সাবধানে পা ফেলে ফেলে আঙরাখা বিন্দুমাত্র না ভিজিয়ে সে নদীর অপর পাড়ে উঠে যায়।

তার কখনোই মনে হয় না যে সে কোনও বোকামি করছে!, মঠের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে একা মেয়েমানুষ অনিশ্চিতের পথে পা বাড়িয়েছে। এই নতুন অভিযানে তার পরনের আঙরাখা আর জুতোজোড়া ছাড়া আর কিছু নেই। গরব জীবিত রয়েছে এমন একটা সদ্য জেগে ওঠা বিশ্বাস ছাড়া কোনও প্রমাণ তার হাতে নেই। অবশ্য প্রমাণের ভাবনা অধিকাংশ সরল বিশ্বাসী তিব্বতিদের তেমন ভাবায় না! টিয়াপাখি দুটি এখন আকাশে উড়ে উড়ে নদীর এপারে ওপারে পরস্পরের সঙ্গে খুনসুটি করছে। কী এক আশ্চর্য তাড়নায় দেচমার হাঁটার গতি বেড়ে যায়।

প্রথম গ্রামের প্রথম বাড়িতে পা রাখতেই তার খাবার জোটে। সে জানতো একজন পদব্রজ্যা সন্ন্যাসিনীকে কেউ ফিরিয়ে দেবে না! হাজার হাজার পুরুষ-নারী প্রায় সারা বছরই তিব্বতের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে তীর্থযাত্রা কিম্বা কোনও প্রাজ্ঞ লামার সঙ্গে দেখা করতে যায়। তাদেরই মতন একজন পরিব্রাজক দেচমা কারও কোনও বিশেষ মনোযোগ দাবি না করে দু’বেলা ভিক্ষান্ন আর রাতে মাথা গোঁজার ঠাই সম্পর্কে প্রায় নিশ্চিন্ত হয়ে নিজের প্রিয়তমকে খোঁজার দ্বিতীয় অভিযানে এগিয়ে যেতে থাকে। চরৈবেতি চরৈবেতি...।

পায়ে হেঁটে পথ চলার গতি তেমন দ্রুত হয় না, বিশেষ করে প্রায় প্রতিটি গ্রামেদুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষে করে এগুতে হলে, অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে হলে আরও দেরি হয়। তাকে যে গরবের খোঁজ নিতেই হবে ! সেজন্যে ভিক্ষার চাইতে ভাল বৃত্তি আর কিছু হতে পারে না ! আর লোকের সঙ্গে কোনও ব্যক্তিগত কথা না বলে, মহিলাদের দিকে মিষ্টি হেসে, বাচ্চাদের মাথা নেড়ে আদর করে এগিয়ে যাওয়ার কায়দা সে ধীরে ধীরে ভালোই রপ্ত করেছে। এতে তার শৃসানকে ছেড়ে দূরে চলে যাওয়ার দীর্ঘশ্বাসও যুক্ত হয়। তবু সে পেছনে তাকায় না। যদিও দেচমার কোনও নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই, পরিকল্পিত পথও নেই।

কয়েক বছর আগে প্রথম যেদিন বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল সেদিনও এমনি নির্দিষ্ট কোনও গন্তব্য ছিল না। স্বপ্নে দেখা নায়ককে পাওয়ার আকুতি নিয়েই সে পথে বেরিয়ে ঘুরতে ঘুরতে একদিন সত্যি সত্যি তাকে পেয়ে গেছিল। সেই পাওয়া আর দিনের পর দিন, মাসের পর মাস চুটিয়ে প্রেম, মাইলের পর মাইল বিস্তৃত বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, পাহাড় পর্বত শুষ্ক মালভূমি আর নানা নদী তীরবর্তী অসংখ্য জনপদ পেরিয়ে যাওয়া। এত অল্প সময়ের মধ্যে এত দীর্ঘ যাত্রার ওই জীবন আবার ফিরে পাক বা না পাক, মানুষটিকে সে আবার ফিরে পেতে চায়। একান্ত আপন করে পেতে চায়, এগিয়ে যেতে থাকে।

সে যে এখন কোথায় আছে কে জানে! সেজন্যে যার সঙ্গেই দেখা হয় দেচমা তাঁকে সেই প্রবল জলোচ্ছ্বাসের পর কোনও সুঠাম যুবক কিম্বা ঘোড়াকে দেখেছে কি না সে ব্যাপারে প্রশ্ন করে। দেখতে দেখতে শীতকাল এসে যায়।

এভাবে একদিন নদীর জল সম্পূর্ণ বরফ হয়ে যায়। চলার পথেও বরফ আর হু হু ঠাণ্ডা বাতাস, দুপুরবেলা ছাড়া আর হাটা যায় না! দেচমা তবু যতটা সম্ভব বেশি সময় হাঁটে। ওই নদীর উজানে কিছু গ্রাম আর ভাটিতে দু’পারের অসংখ্য গ্রামে ঘুরে ঘুরে প্রায় ছয়মাস কেটে যায়। তারপর সে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল গা এবং ক্যারকু এলাকার গ্রামগুলিতে ঘুরতে থাকে। স্থানীয় উচ্চারণে ক্যারকুকে ৎচেরকু, চীনা মানচিত্রে অবশ্য ওই বিস্তীর্ণ তৃণভূমির দক্ষিণপ্রান্তের অঞ্চলটির নাম লেখা রয়েছে জারক্যান্ডো, আবার কোনটায় জ্যাকান্ডো। ওই অঞ্চলে পৌছোনোর আগেই অবশ্য শীত কমে যায়। আর সেখানে পৌঁছে সে দূরে অ্যামনে ম্যাৎচেন পর্বত দেখতে পায়। মাঝে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি। এভাবে নিজের অজান্তেই সে একদিন গরবের ডাকাতদলের লোকেরা যে গ্রামগুলিতে থাকে সেই তাঁবু টাঙানো পশুপালকদের একটি গ্রামে ঢুকে পড়ে।

গ্রামটির চেহারা দেখেই দেচমার মনে আশা জাগে। মনে হয়, এমন গ্রামের বর্ণনা সে গরবের মুখে শুনেছে। সে ভাবে, এমনও তো হতে পারে যে গরব আবার এমনি একটা গ্রামে এসে আবার আগের মতনই রয়েছে। সে কি আবার বিয়ে করেছে? ওর বুকে এক অযাচিত উৎকণ্ঠা বাসা বাঁধে। ওই গ্রামে ঢুকে প্রথম বাড়িতে জিজ্ঞেস করে বুঝতে পারে সে যা ভেবেছে তা-ই ঠিক, এটাই সেই ঙ্গোলোগ এলাকা!!!

তার মনে একটা নতুন আশা জাগে। দেচমা জানে, গরবের সঙ্গে সেই অভিযানে যে ডাকাতরা গেছিল শুধু তাদের মধ্যে কারও সঙ্গে দেখা হলে তাকে চিনতে পারবে! অন্যরা কেউ তাকে চিনতে পারবে না! অবশ্য গরবের তৎকালীন বন্ধুরাও এই মলিন সন্ন্যাসিনীর বেশে তাকে চিনতে পারবে কিনা কে জানে! এই আড়াই বছরে তার মুণ্ডিত মস্তকে চুল গজিয়েছে।

দেচমা নীরবে ওই গ্রামের দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষে করতে থাকে। এখানে সে গরবকে নিয়ে কোনও প্রশ্ন করার সাহস পায় না। যদিও চীনা মুসলমান বাহিনীর আক্রমণের পর বেশ কয়েকবছর কেটে গেছে, তবুও সে জানে যে গরবের মাথার দাম ঘোষণা করা হয়েছিল, গরব যদি আদৌ এখানে থাকে তাহলে সে কোন পরিচয়ে আছে, আত্মগোপন করে আছে কিনা কে জানে!

এভাবে দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষে চেয়ে সপ্তম দিনে ঙ্গোলোগ এলাকার তৃতীয় গ্রামে ঢুকতেই গরবের ডাকাতদলের একজনের সঙ্গে তার দেখা হয়ে যায়। প্রাথমিক কুশল বিনিময়ের পর সে তাকে বলে, দুজন ডোকপা (পশুপালক) পুবের ওই অ্যামনে ম্যাৎচেন পাহাড়ের গুহায় গরবকে দেখেছে। সে মহান সন্ন্যাসী দর্দজি মিগ্যুরের শিষ্য হয়ে আধ্যাত্মিক জীবনযাপন করছে।

দেচমা একথা শুনে অবাক হলেও, আধ্যাত্মিক জীবনযাপনের ব্যাপারটা তার কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকে না! সে জানে, গরব তাকে কত ভালবাসত! তার বিরহে গরবের দিনগুলি নিশ্চয়ই শোকগ্রস্ত নিরাশাময় হয়ে পড়েছিল। সেই অবস্থায় কোনও সন্ন্যাসীর শরণাপন্ন হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। তিব্বতে লামা সন্ন্যাসীরা কোনও পেশার মানুষকেই নিরাশ করেন না!

দেচমা আর দেরি না করে লোকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে, তাঁর দেওয়া সামান্য রসদ সঙ্গে নিয়ে অ্যামনে ম্যাৎচেনের পথে হাঁটে। এখন আর তার বুক ঢিপঢিপ করছে না। তবে সোজা পূবদিকে হাঁটার উপায় নেই। মাঝে রয়েছে জনবসতিহীন বিস্তীর্ণ তৃণভূমি। সেই পথে কেবল ঘোড়া বা খচ্চরের পিঠে চেপে কাফেলার সঙ্গে যাওয়া যায়। দেচমা তাই সরাসরি না গিয়ে জনবসতি ধরে ধরে ঘুরপথে রাতে বিশ্রাম নিয়ে সারাদিন হেঁটে এগুতে থাকে। এতে তার আরও কয়েকমাস সময় পেরিয়ে যায়।

দেচমা তবু স্বপ্নাদিষ্টের মতো সোনার পাহাড় অ্যামনে ম্যাৎচেনের পথে হেঁটে যেতে থাকে, হেঁটে যেতে থাকে।

হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে কয়েকমাস পর সে সোনার পাহাড় অ্যামনে ম্যাৎচেনের কাছে পৌঁছে যায়, যে পাহাড়ের একদিক প্রায় ন্যাড়া কঠিন প্রস্তরময়, আর অন্যদিকে অসংখ্য বৃক্ষগুল্মের ঘন অরণ্য। তার স্বাভাবিক বুদ্ধি তাঁকে সেদিকেই নিয়ে যায়। মাটি থাকলেই অরণ্য – গুহা এসব পাওয়া যাবে।

প্রায় সারারাত হেঁটে সে পাহাড়ের অন্যপাশে পৌঁছোয়।তারপর আরও ঘন্টাখানেক হাঁটার পর সে একটা উষ্ণ প্রস্রবন পেয়ে স্নান ইত্যাদি সেরে নেয়। তারপর চলতে চলতে একটু পরেই একজায়গায় পাহাড়ের পাদদেশে মাঠের মধ্যে দুটো তাঁবু দেখে। সে ভাবে এগুলি নিশ্চয়ই সেই সাধুর সঙ্গে দেখা করতে আসা কোনও ধনী ব্যবসায়ীর! সে পাহাড়ের দিকে তাকায়। আর তখনই গরবকে দেখতে পেয়ে চমকে যায়। পাহাড়ি পাকদণ্ডী দিয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠছে সে। দেচমা চিৎকার করে ডাকতে যায়। কিন্তু তার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না। সে ঢোক গেলে তারপর ছিৎকার করে ডাকে, গরব, গরব...!

গরব চারিদিকে তাকায়। আরে পুরুষ, নীচে তাকাও!

কিন্তু গরব একটু দাঁড়িয়ে আবার হাঁটতে থাকে। দেচমাও তখন সেই পাকদণ্ডি দিয়ে পা চালিয়ে পাহাড়ে চড়তে চড়তে আবার ডাকে,গরব, গরব...!

গরব আবার চারিদিকে তাকায়। নীচের দিকেও তাকায় এবার। কিন্তু না জানি কেন দেচমাকে না দেখতে পেয়ে আবার এগিয়ে যায়। দেচমা আরও জোরে পা চালায়। কিন্তু চড়াই বলে খুব একটা জোরে হাঁটতে পারে না। সে কাঁধের ঝোলা থেকে ফ্লাস্ক বের করে সামান্য গলা ভেজায়। তারপর আবার এগিয়ে যায়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই একটা মোড় ঘুরে সে আর গরবকে দেখতে পায় না। বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস শব্দ হতে থাকে। সে তবু এগুতে থাকে, দেখা যাক এই পথ তাকে কতদূর নিয়ে যায়। সে কোনও ভুল দেখেনি তো? না, হতেই পারে না! তবু মনের মধ্যে একটা অদ্ভূত উত্তেজনা টের পায়।

আরেকটু পথ এগিয়ে আবার মোড় ঘোড়ার পর সে পথের শেষে একটি গুহা দেখতে পায়। এটাই কি সাধুর গুহা? কিন্তু এর উপরেও পথ উঠে গেছে। সামনের গুহাটির কাছে পৌঁছে গুহার মুখে ঝুলতে থাকা চমরি গাইয়ের ভারী চামড়ার পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে প্রদীপের আলোয়দেখে সামনেই পাথরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে গরব। ওকে দেখে ভুত দেখার মতন চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে।

দেচমা তার কাছে এগিয়ে গিয়ে বলে, নিচে থেকেই তো তোমাকে দেখে ডাকছি গরব, তুমি শুনতেই পেলে না, আমি এসেছি, এতদিনে তোমাকে খুঁজে পেয়েছি!

গরব অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করে, দেচমা! দেচমা তুমি তো মরে গেছ!

দেচমা হেসে বলে, না, আমি তোমার মতনই জীবিত ! আমিও ভেবেছিলাম, তুমি বুঝি আর বেঁচে নেই ! আমি তোমার টুপিটাকে সেই খরস্রোতা নদীর মাঝে একটি পাথরে ঝুলতে দেখে ভেবেছিলাম যে তুমি ডুবে গেছ, প্রবল স্রোত তোমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আমি শোকে মুহ্যমান হয়ে নিজের চুল কেটে ফেললাম। তারপর ঘুরতে ঘুরতে সামতেন লিং মঠে আশ্রয় পেয়ে ক্রমে ভিক্ষুণী হয়ে পড়লাম। সেখানে কয়েকমাস পরে টের পেলাম যে মা হতে চলেছি! আরও মাস ছয়েক পর জন্ম হল আমাদের সন্তান শৃসানের।

গরব অবাক হয়ে বলে, ছেলে? শৃসান? কোথায়? সে এগিয়ে গুহার পর্দা সরিয়ে দেখে।

দেচমা বলে, সে সামতিং লিং-এই আছে। আমরা এখন গিয়ে তাঁকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে আসবো !

  • কিন্তু তুমি কিভাবে এখানে এলে?
  • এমনি করেই দিন, মাস, বছর কেটে যাচ্ছিলো, নিরর্থক একঘেয়ে জীবনে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম! কিন্তু একদিন ঈশ্বর আমাকে আবার নদীর ওই অগভীর অঞ্চলটায় ফিরিয়ে আনে। সেখানে দেখি এতগুলি মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও, এত ঋতু পরিবর্তন সত্ত্বেও তোমার টুপিটা একইভাবে সেই পাথরে ঝুলছে। এই দৃশ্য আমাকে অবাক করে। প্রবল বাতাস, ঝড় বৃষ্টি তুষারপাতের পরও ওই টুপিটা এতদিন ধরে লটকে রয়েছে দেখে বুঝতে পারি যে এটা আমার জন্যে শুভচিহ্ন। যমদূতেরা আমাদের নিতে এসেও পরস্পরের ভালবাসার জোরে খালিহাতে ফিরে গেছে। তারপরই আবার তোমাকে খুঁজতে বেরুলাম, নদীর দু’পাড়ের গ্রামে গ্রামে বাড়িতে বাড়িতে ভিক্ষে করার অছিলায় তোমাকে খুঁজছিলাম! যেমনটি আগে একবার বেরিয়েছিলাম এবং আগের মতনই এবারও অবশেষে খুঁজে পেলাম। তোমাকে আমি খুঁজে পাবো না তা হতেই পারে না। আমাদের জন্ম-জন্মান্তরের সম্পর্ক। এখন থেকে আমরা একসঙ্গে থাকবো, আর কখনও কাছছাড়া হবো না!

কোনওরকম নাটকীয় আবেগ ছাড়া শান্ত কন্ঠে ধীরে ধীরে কথাগুলি বলে দেচমা। সে যে তার স্বপ্নকে আর একবার বাস্তবে জুড়তে পেরেছে; প্রাকৃতিকভাবেই জুড়েছে! তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার বাইরে গরবের জীবনে আর যা যা ঘটেছে সেসব সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই! এই যেন দুই সহযাত্রী ঝঞ্ঝাসঙ্কুল রাতে পাশাপাশি ঘোড়া চালিয়ে যেতে যেতে ঝড়ের দাপটে ও কুজ্ঝটিকায় হারিয়ে যাওয়া আর ঝড় থেমে গেলে দিনের আলোয় আবার পরস্পরকে ফিরে পাওয়া ! গরব যে এখন একসঙ্গে থাকা ছাড়া অন্য কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারে তা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না দেচমা! সে যে বরাবরই গরব অন্তপ্রাণ ! নিজের পেটের সন্তান আর অন্য ভিক্ষুনীদের থেকে আলাদা হওয়ার পর এই দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে গরবকে খুঁজে পেতে ওর প্রায় একবছর সময় লেগে গেছে। এই একবছরে তাঁর চুল লম্বা হয়ে প্রায় কোমর ছুঁয়েছে! দীর্ঘ পথশ্রমে সে অনেক শীর্ণকায়, পরনের আঙরাখাটি শতছিন্ন; তবুও গরবের চোখে আজও আগের মতনই সুন্দরী দেচমা!

গরব এবার দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়ে পড়ে। গত দেড়বছর ধরে দেচমাকে ভুলতে সে কত না কৃচ্ছসাধন করেছে ! নিজেকে সম্পূর্ণ সমাজকল্যাণে নিয়োজিত করার জন্যে তিল তিল করে তৈরি করেছে! অবশেষে তার সামনে গুরু যখন নতুন পথ খুলে দিলেন তখনই প্রায় আকাশ ফুঁড়ে দেচমার আবির্ভাব! তাঁদের সন্তান! - অবিশ্বাস্য! এ কী পরীক্ষায় ফেললে প্রভু ! মানবকল্যাণ...জীবসেবা...অমরত্বের সাধনা! বোধিসত্ত্বরা প্রত্যেকেই জীবজগতের সমস্ত প্রাণকে দুঃখকষ্ট ও যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ দেখাতে নিজেদের জীবনের সুখসাচ্ছ্বন্দ্য ত্যাগ করে আত্মোৎসর্গ করেছেন।

গরব নিজের আবেগ সংযত করে দেচমাকে বোঝাতে চায় যে সে আর আগের গরব নেই, সে জীবকল্যাণে আত্মোৎসর্গের পথে পা বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তার আওয়াজ কেমন দ্বিধাদীর্ণ। শান্ত ও অবাক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকা দেচমার প্রত্যয় ওর সমস্ত অর্জিত জ্ঞান ও ধারণাকে চেপে দেয়। দেচমা যে তার ঊষর মরুভূমির মতো জীবনে একমাত্র মরূদ্যান! গরব নিজের অজান্তেই বলতে থাকে তাঁর পিঠে গুলি লাগা,... দেচমার ডুবে যাওয়া,... বিদ্যুতের চমকে হঠাৎ দেখা শুধু প্রজাপতির মতন পাঁচটি আঙুল,... অচেতন হয়ে পড়া,...জ্ঞান ফিরে সো সা লিং,...অনগ...মিগমার...রাম...মঠাধ্যক্ষ,...নারকীয় শৈলান্তরীপ,...পালানো, ...রামের মৃত্যু,...একবছর ঘুরে ঘুরে অবশেষে অ্যামনে ম্যাৎচেন! এবার সে সন্ন্যাসী হতে চায়, জীব কল্যাণে কাজ করতে চায়!

দেচমা বলে, বুঝেছি, আমি তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি, তুমি আমার, শুধুই আমার, আমিও শুধুই তোমার, এসো! আমাদের তাড়াতাড়ি সামতিং লিং –এ যেতে হবে!

গরব পাথরের মতন দাঁড়িয়ে থাকে। তার ভেতরে ঝড় বইতে থাকে। দেচমা এবার আবেগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে কেঁদে ফেলে। সে বলে, আমি শুধু তোমার জন্যে বেঁচে আছি গরব, তুমি কেন আমাকে আগের মতন ভালবাসো না, তোমাকে ছাড়া আমার কী হবে? আমার ছেলের কী হবে?

এই মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে গরবের মনের দ্বন্দ্ব বাড়ে; গুরুর আদেশে বৃহত্তর জীবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার কথা ভেবে নিজেকেই প্রতারণা করছে না তো সে? নিজের প্রতি এই ছলনার ফল তার প্রিয়তমা দেচমা আর তাঁদের পুত্র কেন ভোগ করবে? বৃহত্তর উদ্দেশ্য সাধনের প্রথম ধাপেই কি সে এই প্রাণাধিকার আশা- আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নকে বলি দেবে? এভাবে যে সে এক অনিশ্চিত পরোক্ষের জন্যে প্রত্যক্ষভাবে দু’টি জীবাত্মাকে কষ্ট দেবে! এরকম করলে দেচমা হয়তো অপমানে আত্মহত্যা করবে নতুবা জীবন্মৃত হয়ে বেঁচে থাকবে – এটা কি অন্যায় হবে না? এটা কি ওর পরীক্ষা? ঈশ্বর ওর সামনে প্রিয়তমা দেচমাকে নিয়ে এসে পরীক্ষা নিতে চাইছে যে সে ব্যক্তিগত ভালবাসাকে জয় করে বৃহত্তর জীব-কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করতে পারে কি না?

সে ভাবে, সত্যি সত্যি এহেন উৎসর্গই ওর জীবন ও বেঁচে থাকাকে গৌরবান্বিত করবে! গৌরব এতদিন ধরে যে উৎসর্গীকৃত জীবনের স্বপ্ন দেখে আসছে সেই স্বপ্নই এখন তার দ্বন্দ্বে সবচাইতে বেশি বিপ্লব ঘটায়। আগামীকাল সকালেই গুরুর নির্দেশে সূর্যরশ্মির মতন সোনালি রঙের চুল লোকটির সঙ্গে অজানা পথে বেরিয়ে পড়বে সে, লোকটির বাচনভঙ্গী রাক্ষসহত্যাকারী লিং এর গেসারের মতন কিম্বা অবচেতনে দেখা বোধিসত্ত্বদের মতন।

ওর এই সিদ্ধান্ত বোঝাতে গরব নানারকম কথা বলে, তত্ত্বকথা শোনায়, পাপ-পূণ্য, মানবকল্যাণ – জীবকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার কথা বলে; কিন্তু তার সমস্ত যুক্তি নিজের কানেই খেলো শোনায়, দেচমার অসহায় দৃষ্টির সামনে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। নিজের কান্না থামিয়ে দেচমা এখন ওর কথা বোঝার চেষ্টা করছে – গরবের কী হল? সে কী একা থেকে দেচমার বিরহে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েছে যে এরকম পাগলের মতন প্রলাপ বকছে?

দেচমা এখন আবেগমথিত কন্ঠে জোর দিয়ে বলে, কী সব আবোলতাবোল বকছো? আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি, এখন ফিরিয়ে নিয়ে যাবো, চলো!

তখুনি নীল চোখ সাহেবের চীনা অনুবাদক ভৃত্যটি গরবের গুহার মুখে টাঙানো চমরী গাইয়ের চামড়ার পর্দার একপ্রান্ত সরিয়ে উঁকি দেয়। তারপর বলে, মঙ্গোলিয়ান মালবাহকরা সেই যে পালিয়েছে আর ফেরেনি! সাহেব এখন আমার পেছনে দাঁড়িয়ে। সে সন্ন্যাসী দর্দজি মিগ্যুরের সঙ্গে দেখা করতে চায়। তার ধারণা সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা করতে এসে তার ভৃত্যরা তাঁরই কুপরামর্শে পালিয়েছে !

সে ঢোঁক গিলে বলে, লোকটা সকাল থেকে মদ খেয়ে যাচ্ছে। এখন বন্দুকে গুলি ভরে নিয়ে যাচ্ছে! আমার ভয় করছে! তুমিও আমার সঙ্গে সন্ন্যাসীর গুহায় চলো!

গরব কোনও জবাব দেওয়ার আগেই পেছন থেকে এক প্রবল ধাক্কায় লোকটা ছিটকে গরবের গুহার মাঝখানে এসে পড়ে। পর্দাটাকে হ্যাঁচকায় সরিয়ে বিদেশি লোকটিও গুহায় ঢুকে পড়ে। সে তার ভাষায় চীনা লোকটিকে কিছু আদেশ দেয়। চীনা লোকটি হাত পা নাড়িয়ে তাঁকে ঋণাত্মক জবাব দেয়। বিদেশি আবার গরবকে দেখিয়ে একই বাক্য উচ্চারণ করে কিছু আদেশ দেয়।

চীনা লোকটি তখন থতমত খেয়ে বলে, এই লোকটা তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়, সে জানে না যে আরও উঁচুতে সন্ন্যাসীর গুহা রয়েছে, সে তোমাকেই সন্ন্যাসী ভাবছে!

গরব কী করবে, কী বলবে বুঝে পায় না। লোকটার হাতে বন্দুক। চীনা অনুবাদক সাহেবকে আরেকবার তার ভুল বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু হয় সে ভালভাবে বোঝাতে পারেনি অথবা সাহেব এত বেশি মাতাল হয়েছে যে সে তাঁর কোনও কথাকে আমলই দেয়নি। অথবা ভেবেছে দোভাষী সন্ন্যাসীর পক্ষ নিয়ে মিথ্যে কথা বলে তাকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে। সে আরও রেগে তার বন্দুক উঁচিয়ে চীনা লোকটির দিকে তাক করতেই চীনা লোকটি পড়ি কি মরি এক ছুটে সাহেবের পাশ দিয়ে গুহার বাইরে চলে যায়। এবং পাহাড়ের কোনও খাঁজে লুকিয়ে পড়ে। বিদেশিও তার পেছন পেছন গুহার দরজা পর্যন্ত যায়। পর্দা সরিয়ে হাঁকডাক করে। তারপর পাগলা কুকুরের মতন গজরাতে থাকে। কিন্তু গরব বোঝে যে লোকটা চীনা দোভাষীকে খুঁজে পায় না!

এতে মাতালের রাগ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। সে টলতে টলতে আবার গুহার ভেতরে ফেরে। ফিরেই সে দেচমাকে দেখতে পায়। দেচমা তখন নানা গ্রাম থেকে আশ্রমের জন্যে দিয়ে যাওয়া বিবিধ খাদ্যশস্যের স্তুপের পেছনে লুকানোর চেষ্টা করছিলো। অপ্রত্যাশিতভাবে একজন মহিলাকে দেখে নীল চোখ সাহেব একবার থমকে দাঁড়ায়। সে তখন এ যাবৎ শেখা তিব্বতি ভাষার ভাণ্ডার আঁতিপাঁতি খুঁজে সন্ন্যাসীর গুহায় মহিলার অবস্থান নিয়ে ব্যঙ্গ করে বলে, হি! গমচেন, দজোওয়ো গমচেন...শিমো, শিমো...হো-হো !

তার মানে, সন্ন্যাসী, মহান সন্ন্যাসী, মহিলা, মহিলা! হো-হো...!

গরব জানে যে শ্যাং থাং এর পূর্বের লোকেরা মহিলাকে ‘শিমো’ বলে, তিব্বতি ভাষায় বলে ‘কিয়েমেন’! তার মানে নীল চোখ লোকটি শ্যাং থাং এর পূর্বাঞ্চল ঘুরে এদিকে এসেছে।

লোকটা আবার বলে, - হা, হা! শিমো! আর তারপরই দ্রুত এগিয়ে একহাত দিয়ে দেচমার গলা জড়িয়ে ওর ঠোঁটে চুমু খেতে যায়। তখনই নিজের অজান্তেই এক প্রাক্তন দস্যুসর্দার জেগে উঠে ক্ষিপ্রগতিতে ওর বন্দুক কেড়ে নেয়। উত্তেজনায় ঘোড়া টেপে। আর তারপরই গুলির শব্দ! বিদেশির বুক লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে গরব।

নীল চোখ সাহেব অবাক বিস্ফারিত চোখে চিৎ হয়ে গুহার অসমান মেঝেতে পড়ে ছটফট করতে করতে নিথর হয়ে পড়ে। এই তাৎক্ষনিক উত্তেজনা ও মৃত্যুর দৃশ্য গরবকেও স্তব্ধ করে দেয়। তার হাতে তখনও বন্দুক আর পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে থাকা নীল চোখ সাহেবের দম্ভ!

গরবের এই ক্ষিপ্রতায় দেচমা অবাক হয় না। সে তো এমন গরবকেই চেনে, ভালবাসে। সাময়িক নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে দেচমা শান্তকন্ঠে বলে, এই দ্যাখো, তুমি এখনও আমাকে কত ভালবাসো, স্বয়ং ঈশ্বর তোমাকে দেখিয়ে দিলেন, আমাকে বাঁচাতে আজও কাউকে খুন করতে তোমার হাত কাঁপে না!

ওর কণ্ঠস্বরে জয়ের গৌরব মিশেছিল, কিছুটা ব্যাজস্তুতিও!

একটি বিশালাকায় পিকা ইঁদুর সম্ভবত রক্তের গন্ধ পেয়ে পাহাড়ের গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে সাহেবের বুকের পাশে মেঝে থেকে জমাট রক্ত খুঁটে খেতে শুরু করে। কত দ্রুত খবর পায় ওরা!

গরব চমকে উঠে অপ্রত্যাশিতভাবেই নিজের স্বাভাবিক বোধশক্তি ফিরে পায়। মোহাবিষ্ট চোখে স্বপ্নে দেখা অলীক ছায়ামূর্তি বা প্রকৃত মূর্তির মিথ্যা ধারাবাহিক প্রবাহের ভ্রম ছারখার হয়ে যায়। ক্রমে তার মনে একটি নিষ্ঠুর অনুভব জন্ম নেয়। সেই অনুভবের শীতল, দয়াহীন আলোকে সে তাৎক্ষণিক আবেগে মূর্খের মতন করে ফেলা কুকর্মের ফলে তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও সাধনার সমস্ত সুফলকে নীল চোখ সাহেবরূপে রক্তাক্ত হতে দেখে, নিজের সমস্ত মহৎ স্বপ্ন ধূলিসাৎ হতে দেখে। পরার্থে নিজেকে উৎসর্গ করার পরিবর্তে সে নিজের অজান্তেই শুধু নিজের প্রেমিকাকে নিয়ে ভেবেছে। সে কি নিছকই দেচমাকে খুশি করতে সাহেবকে খুন করেছে? অথচ সে তো একটু আগেই ওকে ছেড়ে জীব-কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার কথা ভাবছিলো, আধ্যাত্মিক পথে পা বাড়িয়ে মহান হওয়ার কথা ভাবছিলো! ওই সমস্ত ভাবনাই কি তাহলে মিথ্যে? তাঁর আত্মোৎসর্গের ভাবনা কি তাহলে শুধুই নিজের রিরংসা ও আবেগকে প্রশমন করার জন্যে ছদ্মকান্নার ফসল? সে তাহলে নিজের স্বার্থেই খুন করেছে?

ততক্ষণে আরও বেশ কয়েকটি পিকা ইঁদুর এবং একসারি পিঁপড়ে নীলচোখ সাহেবের বুক থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তের স্বাদ নিচ্ছে। একটু পরেই পিকারা লোকটার শরীর খুবলে খেতে শুরু করবে! নীল চোখ সাহেবের আত্মা হয়তো এখনও এই গুহার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে, পিকা ও পিঁপড়েদের প্রতিহত করার চেষ্টা করছে প্রাণপণ, কিন্তু পারছে না! এই সমস্ত কিছুই কি জোওয়ো দর্দজি মিগ্যুরের ইচ্ছেমতনই সংঘটিত হচ্ছে? তিনিই তো এখানে সমস্ত প্রাণীর রক্ষাকর্তা!

একথা ভেবে গরব হঠাৎই পাগলের মতন হাসতে শুরু করে, বাঁধনহারা হাসি। সেই হাসির শব্দ পবিত্র পর্বতের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।

আর তারপরই গরব হঠাৎ চুপ করে যায়। তারপর অনেকক্ষণ চারপাশ শুনশান। শুধু তীব্র বাতাসের ঘন ঘন শিস ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। দুজনে সতৃষ্ণ নয়নে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে – একদৃষ্টে!


#

আলেকজান্দ্রার উপন্যাস পড়ে অলক ভাবতে থাকে, ৩২ বছর বয়সে গরব দেখতে কেমন ছিল; সুদর্শন, সুঠাম, মাংসপেশিতে আবেগের স্রোত আর মস্তিষ্কে দীর্ঘলালিত স্বপ্নের মতন জীবের পরিত্রাতা না হতে পারার রিক্ততা, তার সমস্ত সংযমের গর্ব চুরমার হয়ে যাওয়ার হাহাকার ও ভর্তসনাই হয়তো তার মিলনাকুল অথচ সন্ত্রস্থ প্রেমিকার চোখের সামনে পাগলের মতন তিক্ত হাসিতে ফেটে পড়ে।

তারপর সে কী করলো? গরব আর বলে না। তাঁর বর্তমান প্রতিপত্তি দেখে আর স্থানীয় লোকেদের কাছে শোনা কথা মিলিয়ে আলেকজান্দ্রা বুঝতে পারেন যে গরব আবার তার পুরনো পেশায় ফিরে এসেছিল। কিন্তু দেচমার কী হল?

তারপর ?তোমার প্রেমিকা দেচমা?

-সে আর সশরীরে নেই! গরবের কন্ঠস্বরে যেন মিশে থাকে অদৃষ্টের পরিহাস।

-নেই ? মারা গেছে? কবে ?

গরব মাথা নেড়ে বলে, দর্দজি মিগ্যুরের অনুমতি নিয়ে পথে বেরুনোর সপ্তাহখানেক পরেই ! আমরা পাহাড়ি পথে যাচ্ছিলাম... সরু পথ... সে পা পিছলে পড়ে যায়!

একথা শুনে না জানি কেন আলেকজান্দ্রার মনে পড়ে দেচমাকে বলা সেই লাহসার জ্যোতিষীর দৈববাণী‘প্রতিহিংসার হাসি – অতল গহ্বর!’

আলেকজান্দ্রা বুঝতে পারে যে গরবের চোখে তখন দৃশ্যটা ভাসছে! পাহাড়ের গায়ে ছাগল চলা সে সব খাড়া পথগুলির একটা ধরে ওরা হয়তো হেঁটে যাচ্ছিল। এহেন খাড়া পথে একটি সামান্য ধাক্কা বা পা হড়কে গেলেই মৃত্যু নিশ্চিত। সেই করুণ বিস্মৃতিই সম্ভবতঃ প্রাক্তন দস্যু সর্দারকে তাড়িয়ে বেড়াতে থাকে!

তখনই আলেকজান্দ্রার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের ভাবনাকে পুষ্ট করে গরব বলে, সে ছিল ছদ্মবেশী রাক্ষসী সিংদোংমা,সে আমাকে বুদ্ধের পথ থেকে সরিয়ে নিয়েছিল, আমাকে সংসারী করতে চেয়েছিল, আমি মন্ত্র জপতে জপতে ওর পেছন পেছন হাঁটছিলাম। ওম মণিপদ্মে হুম, ওম মণিপদ্মে হুম…! সরু পথ...আমার সামনে থেকেই সে পা পিছলে পড়ে যায়!

গরব ঢোঁক গিলে বলে, সে একবারেই পড়ে যায়নি। একটি গাছের ডাল ধরতে পেরে সে কিছুক্ষণ ঝুলছিলো। আমি ভাবলাম সে আবার নিজেই উঠে আসবে। সেই নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়ার আগে বজ্রপাতের আলোয় তার ছোট ছোট আঙুলগুলিকে প্রজাপতির মতন নড়তে দেখেছি! এবারও সে এক হাতে ডাল ধরে ঝুলে থেকে একটি কথাও না বলে আমার দিকে অপলক তাকিয়ে ছিল। তাঁর চেহারা দিয়ে তখন যেন জ্যোতি বেরুচ্ছিলো; কোনও মানবী এত সুন্দরী হতেই পারে না! আমি তার বিস্ফারিত চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছিলাম না! কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আমি তখন দুষ্ট আত্মা তাড়ানোর মন্ত্র জপতে শুরু করি।

আলেকজান্দ্রা সেই মন্ত্র ও দেহভঙ্গী জানে। দুষ্ট আত্মা তাড়াতে তিব্বতি লামারা মন্ত্র জপতে জপতে পাথর ছুঁড়ে মারে। এই প্রথাও বনদের থেকে এসেছে। গরবও কি দেচমাকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে পাথর ছুঁড়েছিল?

গরব বলতে থাকে, তারপর সে হাত ছেড়ে দিয়ে গড়াতে গড়াতে গভীর খাদে পড়ে যায়, কিন্তু কোনও চিৎকার করে না!

আলেকজান্দ্রা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, এভাবেই সে মরলো?

গরব উত্তেজিত হয়ে একরকম চেঁচিয়ে বলে, আমি কি তোমাকে বলেছি যে সে মরে গেছে? সে মরতে পারে না! আমি তাকে আজও আমার চারপাশে অনুভব করি, প্রায়ই গোধুলির আলো আঁধারিতে তাঁকে দেখতে পাই। সে আমার সঙ্গে দিগন্তবিস্তৃত চারণভূমিতে মৃদু পায়ে হেঁটে বেড়ায়, ভেসে বেড়ায়, আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলে, ধরতে গেলেই কৌশলে সরে যায়... আমি আবার তাঁকে পেতে চাই, আদর করতে –

একথা বলতে বলতেই গরব হঠাৎ উঠে একরকম বাচ্চাদের মতন ছুটে অন্ধকারে ঢুকে পড়ে। ইয়ংডেন মাথা নেড়ে আলেকজান্দ্রাকে বলে, লোকটা দেখছি বদ্ধ পাগল হয়ে গেছে!

কিন্তু আলেকজান্দ্রার মনে হয়, গরব পাগল নয় – একজন আদ্যোপান্ত প্রেমিক ! কিছুক্ষণ আগে তাঁর জীবনের গল্প শোনার অনেক আগে গরবকে সেই পলায়নপর প্রেমিক যুগলকে অপ্রত্যাশিতভাবে সাহায্য করতে দেখার পর থেকেই তিনি এমনটি ভাবছেন!

সেই যুগলের নৈশ অভিযান দেখে নিজের জীবনের নাটকীয় গল্প বলতে শুরু করার ঘটনা এই প্রেমিক অভিযাত্রীকে আরও ভাল করে চিনতে সাহায্য করে।


##


পরদিন সকালে নেশামুক্ত গরবকে দেখে আলেকজান্দ্রা বলেন, সুপ্রভাত!

কিন্তু ওর সম্ভাষণের কোনও জবাব না দিয়ে গরব এমন ভয়ানক দৃষ্টিতে তাকায় যে ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আলেকজান্দ্রার ধর্মপুত্র ইয়ংদেন ভয় পেয়ে যায়। তাঁবুতে ফিরেই সে বলে, চলো মা, আজই এখান থেকে চলে যাই! কাল নেশার ঘোরে ডাকাত সর্দার আমাদেরকে অনেক বেশি কথা বলে এখন অনুশোচনায় ভুগছে, সে পারলে যা বলেছে সবই মিটিয়ে দিত, তা যখন সম্ভব নয় আমাদের কন্ঠরোধ করার জন্যে সে কোন পথ অনুসরণ করবে কে জানে! লোকটাকে বিশ্বাস হয় না!

আলেকজান্দ্রার মনে হয় তাঁর ধর্মপুত্র একটু বেশিই দুশ্চিন্তা করছে! তবুও সে একটু পরেই গিয়ে গরবকে বলে, দীর্ঘযাত্রাপথে তোমার এখানে কয়েকদিন ভালোই বিশ্রাম নিলাম, আজ আবার পথে বেরিয়ে পড়বো! আমাদেরকে অনেক দূর যেতে হবে যে!

গরব মাথা নেড়ে সায় দেয়। আলেকজান্দ্রা তাঁবুতে ফিরে জিনিসপত্র গোছাতে শুরু করেন। ঘোড়ার পিঠে রসদ ভরে নেওয়ার সময় ব্যাগ ভরে রসদ দিতে আসা এক যুবককে দেখে আলেকজান্দ্রার কী মনে হতেই তিনি জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি অনগ?

আলেকজান্দ্রা গতকাল থেকেই দেখছিলেন যে লোকটা মুখ বুজে গরবের ফাইফরমাশ খেটে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে অনুচ্চ স্বরে কথাও বলছে!

লোকটা প্রশ্ন শুনে অবাক হয়ে বলে, হ্যাঁ, আমার নাম অনগ ! আপনি কেমন করে জানলেন?

আলেকজান্দ্রা ভাবেন, সো সা লিং এর ইচ্ছেপূরণ করেছে অনগ, অবশেষে গরবের দলে এসে ভিড়েছে !

এভাবে গরবকে প্রেমিক ভাবার সপক্ষে তাঁর হাতে আরেকটি প্রমাণ জোটে। তাঁর বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয় যে এই দস্যুসর্দার কোনওরকম অশ্লীল ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে নিজের স্ত্রীকে মারেনি, একটি কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসকে সে নিজের আধ্যাত্মিক অধঃপতনের কারণ ধরে নিয়ে এহেন কুকর্ম করে থাকতে পারে। এই কাহিনিতে আলেকজান্দ্রার মনে সবচাইতে দাগ কেটেছে সো সা লিং এর সেই তন্ত্রসাধকরা আর সেই সোনালি চুল সাহেব যে আজীবন তিব্বতে থেকে যেতে চেয়েছিলেন! কিন্তু কেন? গরবের বর্ণনানুযায়ী লোকটি তখন যুবক ছিল। তিনি এখন কোথায়? কী করছেন?

অলোক ভাবে, আলেকজান্দ্রা কি নিছকই তাঁর গল্পের ট্র্যাজিক পরিণতি দিতে দ্বিতীয়বার মিলনের সপ্তাহখানেক পরই গরবের হাতে দেচমার সম্ভাব্য মৃত্যুর কথা লিখেছেন? তখনই যদি দেচমা মরবে তাহলে সে ছিলিং পাঞ্চুক জানবাকের ঠাকুমা হল কেমন করে?তাদের পুত্রসন্তানের কথা কি আলেকজান্দ্রা জানতেন না ?না জানলে, আলেকজান্দ্রার নাতনি কিভাবে লাদাখে এসে ছিলিং পাঞ্চুক জানবাককে খুঁজে বের করলেন ? কেন করলেন?

পাঞ্চুক বলে, আমি শুধুই গল্পের শ্রোতা সাহেব! আপনাকেও আমি নিজের কথা বলিনি! ঠাকুর্দার বন্ধু ছুল্টিং নিমা অনগ ও তাঁর স্ত্রী আমার বাবাকে নিজেদের সন্তানের মতন করে মানুষ করেছেন, পরে তাঁদের একমাত্র মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন। চতুর্দশ দলাই লামা তেঞ্জিং গ্যাৎসোর ছোটভাই গ্যালো থন্দুপ যখন শরনার্থী তিব্বতিদের মধ্য থেকে যুবকদের নির্বাচন করে আমেরিকার সাইপান ও কোলোরাডোতে কমান্ডো ট্রেনিং নিতে পাঠায়, সেই দলে আমার বাবাও ছিলেন। দাদু আর দিদার আপত্তি থাকলেও আমার ঠাকুর্দা একবাক্যে রাজি হন। তাঁর মতে, একজন জাগস্পা সর্দার যে নাকি লিং এর গেসারের মতন পরিত্রাতা আর বোধিসত্ত্বের মতন করুণার অবতার হতে চেয়েছিল, তাঁর ছেলে মাতৃভূমিকে চীনা আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে উন্নত সেনা প্রশিক্ষণ নিতে যাবে, এটাই তো স্বাভাবিক!

আমার বাবা কম্যান্ডো হলেও তিনি ছিলেন রেডিও অপারেটর। তাঁর ডাইরি আমি পড়েছি।

অলোক সোৎসাহে জিজ্ঞেস করে, আমি পড়তে পারি?

পানচুক হেসে বলে, কেমন করে পড়বেন?আপনি তিব্বতি হরফ জানেন?যে কথা বলছিলাম, আমেরিকায় ট্রেনিং দিয়ে ওদেরকে আমেরিকার বিমান ভারতের তেজপুর বিমানবন্দর থেকে উড়ে গিয়ে লাহসা থেকে কিছুদূরে এয়ারড্রপ করেছিল। ওরা চীনা লালফৌজের সঙ্গে ওই ভয়ানক যুদ্ধের নাম দিয়েছিল অপারেশান সেন্ট বারনান। কিন্তু প্রতিশ্রুতিমতন এদের সাহায্যে পরবর্তী কোনও কম্যান্ডো দল না আসায় এরা প্রত্যেকেই দুই থেকে দশ বা ততোধিক চীনা সৈন্যকে হত্যা করতে পারলেও, লালফৌজের বুকে ভয় ধরিয়ে দিয়েও একদিন হেরে যায়।

অবশ্য তার আগেই ১৯৫৯-এর ১০ মার্চ চীনের হাতে বন্দী হওয়া এড়াতে কাশাগের সিদ্ধান্ত অনুসারে চতুর্দশ দালাই লামা তেঞ্জিং গ্যাৎসো লাহসা ত্যাগ করেন। সেই সময় ঠাকুর্দা গরব ও দাদু অনগের নেতৃত্বে ডাকাতদলের সদস্যরা তাঁদেরকে পাহারা দিচ্ছিলেন!

অলোক কী ভেবে জিজ্ঞেস করে, সঙ্গে কি এক সোনালি চুল সাহেবও ছিলেন ?

পানচুক অলকের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কেমন করে জানলে? দাদু বলেছেন, এক সোনালি চুল সাহেবই আমার ঠাকুর্দার ডাকাতদলকে দালাই লামার রক্ষার কাজে নিয়োগ করেছিল। তাঁর উদ্যোগেই গ্যাল থন্দুপ তিব্বতি কম্যান্ডোদের নির্বাচন করেছিলেন। দালাই লামার মহানিষ্ক্রমণের আগে ওই সাহেব গ্যালো থন্দুপের সঙ্গেই পোটালা প্যালেসে থাকতেন – খুব ভাল তিব্বতি শিখে নিয়েছিলেন!

অপারেশান সেন্ট বারনানে প্রায় সমস্ত কম্যান্ডো মারা গেলেও আমার বাবা অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। শান্ননের কাছে তাঁর সঙ্গে সেই সোনালি চুল সাহেবের দেখা হয়। সেই সাহেবই তাঁকে জানায় দালাই লামার মহানিষ্ক্রমণের কথা। তাঁর সঙ্গে গিয়ে ২৯শে মার্চের বিকেলে দালাই লামার সঙ্গে দেখা হলে বাবা-ই প্রথম রেডিও যোগাযোগ স্থাপন করে আমেরিকার রাস্ট্রপতি আইজেনহাওয়ারকে দালাই লামার অবস্থান জানান। পাশাপাশি ভারী গলায় প্রতিশ্রুত সাহায্যের অভাবে তিব্বতি কম্যান্ডো দলের সম্ভাব্য পরিণতির কথা জানিয়ে সাহায্যের আবেদন রাখেন। পরদিন দুপুরে দলটি খেঞ্জিমানা গিরিপথ দিয়ে ভারতের তাওয়াং গোম্পায় পৌঁছায়। সেখান থেকে তেজপুর। তারপর আর কোনোদিন সাহেবের সঙ্গে বাবার দেখা হয়নি। সেই সোনালি চুল সাহেবের নাম ছিল হেইনরিচহ্যারের। অলোকের মনে পড়ে কোথায় যেন পড়েছে, এরকম নামের একজন অস্ট্রেলিয়ান পর্বতারোহী দালাই লামার বন্ধু ছিলেন। তিনি কি সি আই এ-র লোক ছিলেন?কে জানে?তবে তিনি যে ভাল তিব্বতি জানতেন তাতে কোনও সন্দেহ ছিল না।

পাঞ্চুক বলে, ধর্মশালায় আশ্রয় পাওয়ার পর শরনার্থীদের মধ্য থেকে তেজি যুবকদের বেছে আবার কম্যান্ডোদল তৈরি হয়। আমার বাবাই ছিলেন ওই দলের একমাত্র সদস্য যার যুদ্ধের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল। তাই তাঁকে সরাসরি ক্যাপ্টেন র‍্যাঙ্ক দেওয়া হয়। সেই কম্যান্ডো দল পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ভারতের হয়ে পূর্ব সীমান্তে সাফল্যের সঙ্গে লড়াই করেছে। ইন্দো তিব্বতি সীমান্ত পুলিশেও ভারতের অন্যান্য পাহাড়ি যুবকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিব্বতিরা সাহসিকতার সঙ্গে অতন্দ্র প্রহরায় সীমান্ত রক্ষা করে যাচ্ছে। কিন্তু তিব্বতকে চীনাদের কবল থেকে মুক্ত করার স্বপ্ন আজও অধরা রয়ে গেছে।

= তৃতীয় খণ্ড সমাপ্ত =