শুক্রবার, অক্টোবর ২৩, ২০২০

মহাসত্যের বিপরীতে, তৃতীয় খণ্ড # তৃতীয় অধ্যায়

আমি যাকে ভালবাসি/ থাকতে পারে সাথে/ সমুদ্রতলের মণিমুক্তোর মতন।

- ৎসাংইয়াং গ্যাৎসো( ৬ষ্ঠ দলাই লামা)

একথা একশোভাগ ঠিক, যে যাকে ভালবাসে, সে হৃদয়ে থেকে যায় ড্রাগন কিম্বা সাপের মাথার মণি অথবা ঝিনুকের বুকে মুক্তোর মতন। ভালবাসার মানুষটি বেঁচে না থাকলেও এই অনুভব বদলায় না! কী অসাধারণ কথা লিখে গেছেন অবলোকিতেশ্বর মহামান্য ৬ষ্ঠ দলাই লামা।

সামতেন লিং মঠের জীবন দেচমার কাছে ক্রমে একঘেয়ে হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান কোনদিনই তাকে তেমন টানে না। তাই ভেতরে ভেতরে বিরক্তি ও এক দুর্বোধ্য ক্লান্তি অস্থির করে তোলে। সামতেন লিং এর গ্রন্থাগারে বসে বসে বুদ্ধের বানী ও বোধিসত্ত্বদের উপদেশমালা পড়তেও আর ভাল লাগে না। ঘুম পায়। মঠাধ্যক্ষার কাছে গিয়ে নিয়মিত বসে, নানা আচার অনুষ্ঠান দেখে, কিন্তু সক্রিয় অংশগ্রহণ করে না, এমনকি এগুলির মানে বোঝারও কোনও চেষ্টা সে করে না।

মঠাধ্যক্ষা এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের উচ্চ-ধর্মশিক্ষায় শিক্ষিত মহিলা। নিঃসন্তান। বিধবা হওয়ার পর দীক্ষা নিয়ে নিজের সমস্ত সম্পত্তি এই মঠকে দান করেছেন। কিন্তু এই মঠের কারও জীবনযাপন দেচমাকে আকর্ষণ করে না। সে যে আকৈশোর দিবাস্বপ্নচারিনী! এখনও সে একইরকম স্বপ্নে বিচরণ করে।

তার স্বপ্নে হামেশাই অতীত, বর্তমান ও কল্পনা একাকার হয়ে যায়। এই স্বপ্নের ঘোরে ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়ে একদিন সে গরবকে পেয়েছিল, সেই স্বপ্নের নায়কের মৃত্যু তার জীবনকে অর্থহীন করে তুলেছে। সেদিন থেকে সে একরকম নির্বাক, কৌতুহলহীন, নিজের প্রতি অমনোযোগী, আর এই মঠে দীর্ঘদিন থেকে ক্রমে পূজাচার ইত্যাদির একঘেয়েমির শিকার। মাঝেমধ্যে তো এটাই বুঝে উঠতে পারে না যে বেঁচে থেকে কী হবে!

কখনও মঠের আয়নার সামনে দাঁড়ালে তার মলিন পোশাক আর পরিত্যক্ত সৌন্দর্য দেখে নিজেই অবাক হয়। তার মুন্ডিত মস্তক যেন এই পরিত্যক্ত সৌন্দর্যেরই প্রতীক। সে মনে করে, এই সমস্ত কিছু তাঁর বৃদ্ধ দাদু-দিদার স্নেহের প্রতি কৃতঘ্নতার পরিণাম! তাঁদেরকে বিপন্ন ও অসহায় অবস্থায় ফেলে স্বার্থপরের মতন শুধু নিজের স্বপ্নের পেছনে ছোটার প্রায়শ্চিত্য করছে। এই প্রায়শ্চিত্য যতদিন শেষ না হবে, এই একঘেয়ে বিরক্তিকর জীবন থেকে সে মুক্তিও পাবে না। তারপর যদি তার মৃত্যু আসে!

তার আরও মনে হয় যে, গরবকে এত পাগলের মতন ভালবেসে তার সঙ্গে মিলনসুখকে দীর্ঘায়িত করতে সে তাকে মাসের পর মাস ঘোড়ার পিঠে ছুটতে ও নানারকম ঝুঁকি নিতে উৎসাহ জুগিয়েছে। ফলস্বরূপ, সে তার প্রিয়তমকে হারিয়েছে!

দেচমাকে মৃত ভেবে অ্যামনে ম্যাৎচেনের গুহায় গরব যখন গুরুর নির্দেশে বোধিসত্ত্বদের দর্শানো সেবার পথে নিজের জীবন উৎসর্গ করে পুরনো ডাকাতদের পক্ষ থেকে আবার সর্দার হওয়ার আহ্বান বিনীতভাবে প্রত্যাখ্যান করছে, মনে মনে ভবিষ্যতে একজন ধর্মীয় নায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, গরবকে মৃত ভেবে সামতেন লিং মঠে দেচমা তখন নিরুপায় সন্ন্যাসিনী; নিতান্ত অনিচ্ছায় মঠবাসিনীদের করনীয় গতানুগতিক আচার অনুষ্ঠানের অমনোযোগী অংশীদার।

অলকের ইচ্ছে করে এমন কিছু করতে যাতে ওদের দুজনের আবার দেখা হয়! সে পারবে কী? লেখক হলেই কি কেউ জোর করে বিস্ফোরণে বিচ্ছিন্ন দুটি গ্রহাণুকে মহাকাশের বুকে মিলিয়ে দিতে পারে? মিলিয়ে দিলেও কি পারবে তাদের অক্ষত রাখতে? অর্ধশতাব্দীরও অনেক আগে এক বিদেশিনী লেখিকার তৈরি চরিত্রগুলিকে ধার করে নিজের গল্পে নিজস্ব তিব্বতি অভিজ্ঞতায় মিশিয়েছে অলক। কিন্তু মাঝখানে বয়ে যাওয়া মহাকালের গতিকে কি যথাযথ পরিমাপ করতে পারবে সে? কেউ কি পারে তা? সে ভাবতে থাকে।

মাঝেমধ্যেই দেচমাকে অন্য মঠবাসিনীদের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে ভিক্ষে চাইতে যেতে হতো। সারাদিন ভিক্ষের পর সন্ধ্যায় ওরা মঠে ফিরতো। সামতেন লিং এ দু বছর থাকার পরই একদিন সে দুজন প্রবীণা সন্ন্যাসিনীর সঙ্গে দূরবর্তী এক জনপদে যাওয়ার সুযোগ পায়। সেখানে তাঁদের রাতে থাকতে হবে। এক ধনী বিধবা তাঁর বাড়িতে সন্ন্যাসিনীদের নিয়ে গিয়ে চা-পানের পূণ্যার্জন করতে চান বলে মঠে আবেদন জানিয়েছিলেন। তাঁদের হাত দিয়ে তিনি মঠের অন্য সকলের জন্যে চায়ের সরঞ্জামও পাঠাতে চান। মহিলার সেই খামারবাড়িটি যে সেই পাহাড়ি নদীর কাছাকাছি, যার ওপারে রয়েছে দেচমা ও গরবের দীর্ঘ মিলনের রাতগুলি, সে ও গরব পাশাপাশি ঘোড়ায় চেপে ছুটে চলেছে যেন স্বপ্নের অতীতে, আর সেই নদী পার হতে গিয়েই যে গরবকে হারিয়েছিল তা দেচমা জানতো না!

প্রথা অনুযায়ী সন্ন্যাসিনীদের পুরো দু’দিন দু’রাত সেই খামারবাড়িতে থাকতে হবে। সন্ন্যাসিনীদের এভাবে সেবা করে তিনি যা পুণ্য অর্জন করবেন, সেই ধনী বিধবার বিশ্বাস যে এতে তিনি আগামী জন্মে আরও ধনসম্পদের অধিকারিনী হবেন!

ওই খামারবাড়ির পথে যেতে যেতে দেচমা একসময় বুঝতে পারে যে সে পরিচিত এলাকার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে,। সেই অভিশপ্ত নদীটি আর বেশিদূরে নয়, না জানি কেন সে কিছুটা চনমনে হয়ে ওঠে। হঠাৎ করে তাঁর মনে সেই নদীটাকে, বিশেষ করে নদীর ওই অগভীর অংশটিকে আরেকবার দেখার প্রবল ইচ্ছা জাগে। সেখানে নদীতীরের সেই অরণ্য, যার প্রায় প্রতিটি গাছের গুঁড়িতে সে গরবকে খুঁজেছে, আর জলের মধ্যে জেগে থাকা সেই শঙ্কু আকৃতির পাথরটি, যার তীক্ষ্ণ অগ্রভাগে গরবের পশমি টুপিটাকে ঝুলে থাকতে দেখে সে তার মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছিল।

সে অবশ্য সঙ্গিনীদের কাছে নিজের ইচ্ছার কথা জানায় না! জানালে তাঁরা কোনও কারণে মানা করতে পারেন। কিন্তু দেচমার মনে যখন ইচ্ছে জেগেছে, সে অবশ্যই যাবে! পরদিন কাকভোরে সবার আগে ঘুম থেকে উঠে সে নদীর পথে বেরিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ চলার পর কয়েকজন কৃষককে দেখতে পেয়ে সে নদীর অংশটি কোনদিকে জানতে চায়। ওরা আঙুল দিয়ে পথ দেখিয়ে বলেন, এই ক্রোশখানেক দূরে!

দেচমা দ্রুত পা চালায়। সূর্যোদয়ের একটু পরেই সেখানে পৌঁছে যায়।

তখন বসন্তকাল। রোদে সামান্য তাপ থাকলেও পাহাড়ের বরফ তখনও গলতে শুরু করেনি। দেচমার দেখা প্রবলা খরস্রোতা এখন শীর্ণ, ধীরগতিতে কুলকুল করে বয়ে চলেছে। স্বচ্ছ জলের নিচে ঝকঝকে নুড়িপাথর ও শ্যাওলা! অরণ্যের পথে হাঁটতে হাঁটতে দেচমা সেই জায়গাটি খুঁজে পায় যেখানে সে পাথরে ঝুলতে থাকা গরবের টুপি দেখতে পেয়ে নিজের চুলগুলি কেটে বৈধব্য বরণ করে নিয়েছিল। তারই ফলস্বরূপ এই নিরানন্দ সন্ন্যাসিনীর আঙরাখা পরে একঘেয়ে দিন কাটাচ্ছে। দু’বছর কয়েকমাস পর প্রায় একই জায়গায় হাঁটুগেড়ে বসে সে মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে প্রণাম করে। কাকে প্রণাম করে? মনে মনে তথাগত বুদ্ধের মুখশ্রী কল্পনা করে। কিন্তু একী, তার মনের মধ্যে ভেসে ওঠে গরবের মুখ। আর প্রণাম সেরে চোখ খুলতেই সে একটি আজব দৃশ্য দেখে।

সেই শঙ্কু আকৃতির পাথরটার মাথায় কিছু একটা ঝুলছে, যা থেকে পাখির ডানার মতন কিছু পতপত করছে। নীলাভ ওই বস্তুটির গায়ে একটি চকচকে চাকতির মতন কিছু দেখে সে বুঝতে পারে এটি নির্ঘাত গরবের সেই টুপিটি যা নীল ও সোনালি রিবন দিয়ে সাজানো ছিল।

দেচমা কি ভুল দেখছে? দীর্ঘ প্রায় আড়াই বছর পরেও রোদ জল ঝড় বৃষ্টি তুষারপাতে বিবর্ণ হয়েও একই পাথরের গায়ে টুপিটা একইভাবে ঝুলছে, হাওয়ায় পতপত করে পাখির ডানা ঝাপটানোর মতন উড়ছে রিবনগুলি! দেচমা নদীর পাড়ে জুতো খুলে রেখে জল থেকে জেগে থাকা বড় বড় পাথরগুলিতে পা রেখে ওই বড় পাথরটার কাছে পৌঁছে যায়। সেই মলিন টুপিটাকে হাতে নিয়ে সারা শরীরে এক অদ্ভূত শিহরণ বয়ে যায়। সে যেন মহাকালের হাত থেকে নিজের অতীতের এক টুকরো ফিরে পেল! এমনও বাস্তবে হয়? নাকি সে বরাবরের মতনই দিবাস্বপ্ন দেখছে? না, এই তো সে খালিপায়ে হিমশীতল পাথরের উপর দাঁড়িয়ে আছে, এভাবে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে জমে যাবে, এখন মন্দগতিতে বয়ে চলেছে নদীটি! সে আবার সাবধানে পা ফেলে ফেলে নদীতীরে ফিরে আসে।

দু’বছর পরেও টুপিটাকে একই পাথরে একইভাবে ঝুলতে দেখে ওর মনে একটা নতুন আশার সঞ্চার হয়। এটি নিঃসন্দেহে একটি শুভ সংকেত। দেচমার মন বলে, গরব নিশ্চয়ই মারা যায়নি, সে অবশ্যই বেঁচে আছে; নাহলে এই টুপিটা এতদিন ওই পাথরে ঝুলে থাকতো না!

সে কোথায়? দেচমা কিছুই ভাবতে পারে না, কিন্তু সেই সকালের মিষ্টি রোদে ক্রমে ওর কল্পনার ঘোড়াটি আবার মনের মধ্যে স্পষ্ট হতে থাকে। গা ঝাড়া দিয়ে ফসিলপ্রায় স্বপ্নের নায়ক আবার সজীব হয়ে উঠতে থাকে! কোথায় পাবে তাকে? কিন্তু দেচমার মনে ক্রমে একটা প্রত্যয় জেগে উঠতে থাকে, আবার একদিন সে তাকে ফিরে পাবেই! একদিন সে তার স্বপ্নের নায়ককে পেতে সবকিছু ছেড়ে পথে নেমেছিল বলেই স্বপ্ন সফল হয়েছিল। এবারও তেমনি তাকে পেতে আবার পথে নামতে হবে! পেছনে তাকালে চলবে না!

একজোড়া টিয়া পাখি গাছের ডালে বসে পরস্পরকে আদর করছে। এই দৃশ্য দেখে না জানি কেন তার গায়ের রোম কাঁটা দিয়ে ওঠে।

নদীতীরে ফিরে পায়ে জুতো গলানোর আগেই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে আর সঙ্গিনী সন্ন্যাসিনীদের কাছে ফিরবে না। মঠে ফেরার প্রশ্নই ওঠে না! মলিন টুপিটাকে সে আঙরাখার ভেতরে বুকে গুঁজে নেয়। তারপর নদীর উজানে অগভীর অঞ্চলটার দিকে হাঁটতে থাকে। সেখানে পৌঁছে নাজানি কেন সে আবার জুতো খুলে হাতে নেয়, আঙরাখা গুটিয়ে হাঁটুর উপর তুলে ধরে। সাধারণ তিব্বতি মেয়েদের তুলনায় সে বেশ লম্বা। সাবধানে পা ফেলে ফেলে আঙরাখা বিন্দুমাত্র না ভিজিয়ে সে নদীর অপর পাড়ে উঠে যায়।

তার কখনোই মনে হয় না যে সে কোনও বোকামি করছে!, মঠের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে একা মেয়েমানুষ অনিশ্চিতের পথে পা বাড়িয়েছে। এই নতুন অভিযানে তার পরনের আঙরাখা আর জুতোজোড়া ছাড়া আর কিছু নেই। গরব জীবিত রয়েছে এমন একটা সদ্য জেগে ওঠা বিশ্বাস ছাড়া কোনও প্রমাণ তার হাতে নেই। অবশ্য প্রমাণের ভাবনা অধিকাংশ সরল বিশ্বাসী তিব্বতিদের তেমন ভাবায় না! টিয়াপাখি দুটি এখন আকাশে উড়ে উড়ে নদীর এপারে ওপারে পরস্পরের সঙ্গে খুনসুটি করছে। কী এক আশ্চর্য তাড়নায় দেচমার হাঁটার গতি বেড়ে যায়।

গতরাত থেকে দেচমা কিছুই খায়নি। কিন্তু প্রথম গ্রামের প্রথম বাড়িতে পা রাখতেই তার খাবার জোটে। সে জানতো একজন পদব্রজ্যা সন্ন্যাসিনীকে কেউ ফিরিয়ে দেবে না! হাজার হাজার পুরুষ-নারী প্রায় সারা বছরই তিব্বতের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে তীর্থযাত্রা কিম্বা কোনও প্রাজ্ঞ লামার সঙ্গে দেখা করতে যায়। তাদেরই মতন একজন পরিব্রাজক দেচমা কারও কোনও বিশেষ মনোযোগ দাবি না করে দু’বেলা ভিক্ষান্ন আর রাতে মাথা গোঁজার ঠাই সম্পর্কে প্রায় নিশ্চিন্ত হয়ে নিজের প্রিয়তমকে খোঁজার দ্বিতীয় অভিযানে এগিয়ে যেতে থাকে। চরৈবেতি চরৈবেতি...।

পায়ে হেঁটে পথ চলার গতি তেমন দ্রুত হয় না, বিশেষ করে প্রায় প্রতিটি গ্রামে দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষে করে এগুতে হলে, অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে হলে আরও দেরি হয়। তাকে যে গরবের খোঁজ নিতেই হবে! সেজন্যে ভিক্ষার চাইতে ভাল বৃত্তি আর কিছু হতে পারে না! আর লোকের সঙ্গে কোনও ব্যক্তিগত কথা না বলে, মহিলাদের দিকে মিষ্টি হেসে, বাচ্চাদের মাথা নেড়ে আদর করে এগিয়ে যাওয়ার কায়দা সে ধীরে ধীরে ভালোই রপ্ত করেছে।

দেচমার অবশ্য কোনও নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই, পরিকল্পিত কোনও পথও নেই। কয়েক বছর আগে প্রথম যেদিন বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল সেদিনও এমনি নির্দিষ্ট কোনও গন্তব্য ছিল না। স্বপ্নে দেখা নায়ককে পাওয়ার আকুতি নিয়েই সে পথে বেরিয়ে ঘুরতে ঘুরতে একদিন সত্যি সত্যি তাকে পেয়ে গেছিল। সেই পাওয়া আর দিনের পর দিন, মাসের পর মাস চুটিয়ে প্রেম, মাইলের পর মাইল বিস্তৃত বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, পাহাড় পর্বত শুষ্ক মালভূমি আর নানা নদী তীরবর্তী অসংখ্য জনপদ পেরিয়ে যাওয়া। এত অল্প সময়ের মধ্যে এত দীর্ঘ যাত্রার ওই জীবন আবার ফিরে পাক বা না পাক, মানুষটিকে সে আবার ফিরে পেতে চায়। একান্ত আপন করে পেতে চায়, এগিয়ে যেতে থাকে।

সে যে এখন কোথায় আছে কে জানে! সেজন্যে যার সঙ্গেই দেখা হয় দেচমা তাঁকে সেই প্রবল জলোচ্ছ্বাসের পর কোনও সুঠাম যুবক কিম্বা ঘোড়াকে দেখেছে কি না সে ব্যাপারে প্রশ্ন করে। দেখতে দেখতে শীতকাল এসে যায়।

এভাবে একদিন নদীর জল সম্পূর্ণ বরফ হয়ে যায়। চলার পথেও বরফ আর হু হু ঠাণ্ডা বাতাস, দুপুরবেলা ছাড়া আর হাটা যায় না! দেচমা তবু যতটা সম্ভব বেশি সময় হাঁটে। ওই নদীর উজানে কিছু গ্রাম আর ভাটিতে দু’পারের অসংখ্য গ্রামে ঘুরে ঘুরে প্রায় ছয়মাস কেটে যায়। তারপর সে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল গা এবং ক্যারকু এলাকার গ্রামগুলিতে ঘুরতে থাকে। স্থানীয় উচ্চারণে ক্যারকুকে ৎচেরকু, চীনা মানচিত্রে অবশ্য ওই বিস্তীর্ণ তৃণভূমির দক্ষিণপ্রান্তের অঞ্চলটির নাম লেখা রয়েছে জারক্যান্ডো, আবার কোনটায় জ্যাকান্ডো। ওই অঞ্চলে পৌছোনোর আগেই অবশ্য শীত কমে যায়। আর সেখানে পৌঁছে সে দূরে অ্যামনে ম্যাৎচেন পর্বত দেখতে পায়। মাঝে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি। এভাবে নিজের অজান্তেই সে একদিন গরবের ডাকাতদলের লোকেরা যে গ্রামগুলিতে থাকে সেই তাঁবু টাঙানো পশুপালকদের একটি গ্রামে ঢুকে পড়ে।

গ্রামটির চেহারা দেখেই দেচমার মনে আশা জাগে। মনে হয়, এমন গ্রামের বর্ণনা সে গরবের মুখে শুনেছে। সে ভাবে, এমনও তো হতে পারে যে গরব আবার এমনি একটা গ্রামে এসে আবার আগের মতনই রয়েছে। সে কি আবার বিয়ে করেছে? ওর বুকে এক অযাচিত উৎকণ্ঠা বাসা বাঁধে। ওই গ্রামে ঢুকে প্রথম বাড়িতে জিজ্ঞেস করে বুঝতে পারে সে যা ভেবেছে তা-ই ঠিক, এটাই সেই ঙ্গোলোগ এলাকা!!!

তার মনে একটা নতুন আশা জাগে। দেচমা জানে, গরবের সঙ্গে সেই অভিযানে যে ডাকাতরা গেছিল শুধু তাদের মধ্যে কারও সঙ্গে দেখা হলে তাকে চিনতে পারবে! অন্যরা কেউ তাকে চিনতে পারবে না! অবশ্য গরবের তৎকালীন বন্ধুরাও এই মলিন সন্ন্যাসিনীর বেশে তাকে চিনতে পারবে কিনা কে জানে! এই আড়াই বছরে তার মুণ্ডিত মস্তকে চুল গজিয়েছে।

দেচমা নীরবে ওই গ্রামের দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষে করতে থাকে। এখানে সে গরবকে নিয়ে কোনও প্রশ্ন করার সাহস পায় না। যদিও চীনা মুসলমান বাহিনীর আক্রমণের পর বেশ কয়েকবছর কেটে গেছে, তবুও সে জানে যে গরবের মাথার দাম ঘোষণা করা হয়েছিল, গরব যদি আদৌ এখানে থাকে তাহলে সে কোন পরিচয়ে আছে, আত্মগোপন করে আছে কিনা কে জানে!

এভাবে দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষে চেয়ে সপ্তম দিনে ঙ্গোলোগ এলাকার তৃতীয় গ্রামে ঢুকতেই গরবের ডাকাতদলের একজনের সঙ্গে তার দেখা হয়ে যায়। প্রাথমিক কুশল বিনিময়ের পর সে তাকে বলে, দুজন ডোকপা (পশুপালক) পুবের ওই অ্যামনে ম্যাৎচেন পাহাড়ের গুহায় গরবকে দেখেছে। সে মহান সন্ন্যাসী দর্দজি মিগ্যুরের শিষ্য হয়ে আধ্যাত্মিক জীবনযাপন করছে।

দেচমা একথা শুনে অবাক হলেও, আধ্যাত্মিক জীবনযাপনের ব্যাপারটা তার কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকে না! সে জানে, গরব তাকে কত ভালবাসত! তার বিরহে গরবের দিনগুলি নিশ্চয়ই শোকগ্রস্ত নিরাশাময় হয়ে পড়েছিল। সেই অবস্থায় কোনও সন্ন্যাসীর শরণাপন্ন হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। তিব্বতে লামা সন্ন্যাসীরা কোনও পেশার মানুষকেই নিরাশ করেন না!

দেচমা আর দেরি না করে লোকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে, তাঁর দেওয়া সামান্য রসদ সঙ্গে নিয়ে অ্যামনে ম্যাৎচেনের পথে হাঁটে। এখন আর তার বুক ঢিপঢিপ করছে না। তবে সোজা পূবদিকে হাঁটার উপায় নেই। মাঝে রয়েছে জনবসতিহীন বিস্তীর্ণ তৃণভূমি। ওই পথে কেবল ঘোড়া বা খচ্চরের পিঠে চেপে কাফেলার সঙ্গে যাওয়া যায়। দেচমা তাই সরাসরি না গিয়ে জনবসতি ধরে ধরে ঘুরপথে রাতে বিশ্রাম নিয়ে সারাদিন হেঁটে এগুতে থাকে। এতে তার আরও কয়েকমাস সময় পেরিয়ে যায়।

দেচমা তবু স্বপ্নাদিষ্টের মতো সোনার পাহাড় অ্যামনে ম্যাৎচেনের পথে হেঁটে যেতে থাকে, হেঁটে যেতে থাকে

চলবে ...