শনিবার, ডিসেম্বর ৫, ২০২০

মহাসত্যের বিপরীতে, তৃতীয় খণ্ড # সপ্তম অধ্যায়

‘ ফুলের ঋতু পেরিয়ে গেছে/ ফিরোজা মৌমাছির কোনও শোক নেই

ভালবাসায় লালিত,/ আমার কোনও বিষাদের ঋতুও নেই’।

- ৎসাংইয়াং গ্যাৎসো( ৬ষ্ঠ দলাই লামা)

লাহসায় প্রথমবারের শীত কেমন কেটেছে সেই স্মৃতি আমার খুব কম। শুধু মনের মধ্যে একটি ঘটনা যেন এখনও সেঁটে আছে। আগের বছরের অশুভ শক্তিগুলি বিনাশের জন্য বছরের শেষমাসে পোতালা প্রাসাদে নামগিয়াল মঠের লামা-পরম্পরায় চামনৃত্যের আয়োজন করা হয়। কিন্তু তখনও আমার আনুষ্ঠানিক তক্তারোহন হয়নি, সেজন্যেই হয়তো প্রশাসন ভাবে যে আমার পোতালা প্রাসাদে যাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু প্রশাসনের আমন্ত্রণে দাদা লোবসাংগ সামতেনকে সঙ্গে নিয়ে মা সেখানে যান। সেজন্যে আমার খুব হিংসে হয়। তার উপর অনেক রাতে বাড়ি ফিরে সে রংবেরঙের আজবদর্শন ভারী-ভারী পোশাক পরা নৃত্যশিল্পীদের কথা বলে, না দেখতে পাওয়ার জন্য আমার ভাগ্যকে দোষ দিতে থাকলে কষ্টে দু’চোখ জলে ভরে ওঠে। আগে হলে দাদাকে কষিয়ে দু’ঘা দিতাম। কিন্তু মা বলেছেন, এখন আমি দলাই লামা, এখন আর কারোও গায়ে হাত তুলতে পারবো না! সেদিন তাই বিছানায় শুয়েও চোখের জল মুছতে মুছতে অনেকক্ষণ জেগে থাকি।

আমাকে কাঁদতে দেখে দাদা কিছুক্ষণ আমার দিকে চুপ করে তাকিয়ে থাকে। তার চোখও যেন আমার দুঃখে জলে ভরে ওঠে। সে আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। তারপর আমরা দু’জন মায়ের রেখে যাওয়া ৎসাম্পা খেয়ে বাথরুম ঘুরে এসে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ি।

১৯৪০ সালে প্রায় পুরো বছরটাই আমি নরবুলিংকায় থাকি। গ্রীষ্ম ও বসন্তের সময় আমার বাবা-মা প্রায়ই আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। বছরের শেষে আমাকে দলাই লামা রূপে নিয়োগ করা হলেতাঁরাও তিব্বতী সমাজের সর্বোচ্চ অভিজাত বর্গে সামিল হন, তাঁদের সম্পদও অনেক বৃদ্ধি পায়। প্রাসাদ এলাকায় তাঁদেরকেও খুব সুন্দর একটি বাড়ি দেওয়া হয়, যেখানে আমি প্রায়ই চুপি চুপি একজন সেবককে সঙ্গে নিয়ে পৌঁছে গিয়ে কিছুক্ষণ থেকে আবার লুকিয়ে ফিরে আসতাম। কিন্তু কিছুদিন পরই আমার সরকারি অভিভাবক এবং রাজ্যের রিজেন্ট রেটিংগ রিনপোচে এটি টের পেয়ে যান। কিন্তু যেহেতু এটি অনুমোদিত ছিল না, তিনি সব বুঝেও বোঝেন নি, জেনেও জানেন নি এমন ভাব করে থাকতেন। তাঁর এই দেখেও না দেখা, বুঝেও না বোঝার ব্যাপারটা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছে।

বিশেষ করে খাওয়ার সময় আমি মায়ের কাছে যেতে চাইতাম। কারণ, আমার তখন ডিম এবং মাংস খাওয়া নিষেধ, আর এই জিনিসগুলি আমি মায়ের কাছে গিয়ে চুপি চুপি খেয়ে আসতাম, অনেক সময় লুকিয়ে নিয়েও আসতাম। কিন্তু দীর্ঘদিন কোনও কিছু লুকিয়ে রাখা যায় না। একবার মনে আছে, গিয়োপ কেনপো রাজ্যের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা না বলে আমার ঘরে ঢুকে আমাকে ডিম খেতে দেখে ফেলেন। এই দৃশ্য দেখে তিনি হতবাক হয়ে যান।আমিও চমকে উঠে নিজের অজান্তেই চেঁচিয়ে উঠি, ‘যাও, এখান থেকে যাও!’

এখনও সে কথা ভাবলে ভীষণ অনুশোচনা হয়। না জানি সেদিন গিয়োপ কেনপো রাজ্যের সেই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কী বলতে এসেছিলেন, আমাকে এভাবে লুকিয়ে ডিম খেতে দেখে আর আমার দুর্ব্যবহারে কী ভেবেছিলেন! তিনি যদি কষ্ট পেয়ে রিজেন্টকে সব বলে দিতেন তাহলে কী হতো?

‘সংযম’ শব্দটির আদি অর্থগুলির মধ্যে একটি মজাদার দ্ব্যর্থবোধক ব্যঞ্জনা আছে। একটি অর্থ হল ‘নিয়ন্ত্রণ’, আরেকটি হল ‘দমন’। প্রথমটি এক ধরণের নিয়মানুবর্তী থাকার আভাস দেয়। আর অন্যটি অনেক সময় নিগ্রহের কাছাকাছি চলে যায়। পরবর্তী সময়ে বুঝেছি, আমার বাবা –মা কিম্বা রিজেন্ট, কেউই চাননি যে আমার বালক মনে এই ‘সংযম’ নিগ্রহের রূপ নিক। তাই তাঁরা জেনেশুনেই সামান্য ছাড় দিতেন। আরও একবার, আমার মনে আছে, আমার বাবা আমার সামনে বসে মাংস খাচ্ছিলেন, আর আমি ক্ষুধার্ত কুকুরছানার মতন তাঁর খাওয়া দেখছিলাম, তারপর লোভ সামলাতে না পেরে তাঁর কাছে চেয়ে বসি। বাবা আমাকে একটুকরো মাংস দিলে আমি তাড়িয়ে তাড়িয়ে চিবিয়ে খাই, অত্যন্ত সুস্বাদু লাগে। তবে আমার মা- বাবাই আমাকে এভাবে মাঝেমধ্যে চেখে দেখার বাইরে নিষিদ্ধ কিছু খেতে দিতে চাইতেন না। বাবা বলতেন, এতে তোর অভ্যাস খারাপ হয়ে গেলে, পরে বড়ো হয়ে আমাদেরকেই দোষ দিবি, আমরা দোষের ভাগীদার হতে চাই না! দলাই লামাকে সেভাবেই বড়ো হওয়া উচিত যেভাবে বড়ো হলে তাঁর সমস্ত ঐশ্বরিক গুণ যথাসময়ে প্রকাশিত হবে!

মা –বাবা বোঝালে আমার কাছে সেই কথাগুলিই চূড়ান্ত বলে মনে হতো। আমি বুঝেছিলাম, আমাকে বিধিমাফিক নিয়ন্ত্রণ মেনে চলতে হবে যতটা নিজের ভালোর জন্যে, ততটাই বহুজনের হিতের জন্য। পরে জেনেছি, আমার যাতে স্বভাব খারাপ না হয় সেজন্যে তাঁরা নিজেরাও অনেক সংযত হয়ে থাকতেন। আর মায়ের চেষ্টা থাকতো আমার জন্যে অনুমোদিত খাবারকেই যতটা সম্ভব সুস্বাদু করে রান্না করা যায়, তা সুনিশ্চিত করা। এভাবে সব মিলিয়ে লাহসায় আমার প্রথম বছরটি বেশ ভালোই কেটেছে।

আমি তখনও সন্ন্যাসী হয়ে উঠিনি, সেজন্যে অনেক পড়াশোনা করতে হবে ! লবসাংগ সামতেনও তাঁর কুম্বুমের স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে আমার সঙ্গেই পড়াশোনা করছিলেন। ১৯৪০ সালের শেষে প্রবল শীতের সময় আমাকে পোটালায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং তিবতের ধর্মগুরুর পদে অভিষিক্ত করা হয়। এই উপলক্ষে যে অনুষ্ঠান হয়েছিল, তার কোনও বিশেষ স্মৃতি আমার নেই, শুধু মনে আছে সেদিন প্রথমবার সি শী ফুন্সোগ( আধ্যাত্মিক ও পার্থিব জীবনের সর্বোত্তম কর্মের সভাগার) মিলনায়তনে রাখা কাঠের কারুকার্যময় বিশাল রত্নখচিত সিংহাসনে আমাকে বসানো হয়েছিল। পোতলা প্রাসাদের বাঁদিকের কক্ষে এটি রাজ্যের প্রধান মিলনায়তন।

তারপরই আমাকে শহরের মাঝখানে জোখাং মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে আমাকে ভিক্ষুত্বের দীক্ষা দেওয়া হয়। সেখানে তাফুয়ে নামে একটি অনুষ্ঠান হয়, যার মানে, চুল কাটানো। তারপর থেকে আমাকে আজীবন মুন্ডিত মস্তক এবং সন্ন্যাসীদের জন্য ধার্য লালচে বাদামী পোশাক পরে থাকতে হবে। সেই অনুষ্ঠানের স্মৃতিও আমার তেমন মনে নেই। শুধু মনে আছে নৃত্যশিল্পীদের অসাধারণ পোশাক আর হাল্কা থেকে ক্রমে দ্রুতলয়ে নাচ দেখে আমি উত্তেজিত হয়ে উঠছিলাম, আর ভাই লোবসাংগসামতেনকে বারবার ডেকে বলছিলাম,আরে, এদিকে দ্যাখ দাদা!

রিজেন্ট রেটিংগ রিনপোচে, সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রধান হওয়ার পাশাপাশি আমি যতদিন নাবালক ছিলাম, ততদিন আমার প্রধান শিক্ষকও ছিলেন। তিনিই প্রতীকীভাবে আমার কেশ মুণ্ডন করান। প্রথমদিকে তাঁর থেকে আমি অত্যন্ত সতর্ক থাকতাম। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তিনি আমার প্রিয় হয়ে ওঠেন।

আমার চোখে তাঁর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তাঁর একদিকের নাসিকা সবসময় বন্ধ থাকতো। একজন ব্যক্তি হিসাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কল্পনাপ্রবণ, সবকিছুকে অতি সহজেই নিতে পারতেন এবং কখনও বিরক্ত হতেন না। তিনি ঘুরে বেড়ানো আর ঘোড়ায় চড়া খুব পছন্দ করতেন, সেজন্যে আমার বাবার সঙ্গে তাঁর ভাল বন্ধুত্ব হয়েছিল। তবে এটি দুঃখের বিষয় যে তাঁর শাসনকালে প্রশাসনে চূড়ান্ত দুর্নীতি শুরু হওয়ায় তিনি একজন বিতর্কিত ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। এর উদাহরণ হ'ল রাজ্যে উচ্চপদগুলির বিকিকিনি প্রচলিত ছিল।

আমার অভিষেকের সময় লোকেরা বলত যে এই কাজটির জন্য রেটিংগ রিনপোচে উপযুক্ত ব্যক্তি নন। তিনি যেহেতু ব্রহ্মচর্য ব্রত ভঙ্গ করেছেন, সেজন্যে তিনি এখন আর ভিক্ষু নেই। জাতীয় সংসদে তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনা করার অপরাধে একজনকে যেভাবে শাস্তি দিয়েছেন, তা নিয়ে লোকে প্রকাশ্যে নিন্দা করা শুরু করে। যাই হোক না কেন, প্রাচীন ঐতিহ্য অনুসারে,আমার আসল নাম লহামো থোন্ডুপ বদলে হয়েছে জামফেল য়েশে, এখন আমার পুরো নাম জামফেল ইয়েশে নগাবাংগ লোবসাংগ য়েশে তেনজিন গ্যাৎসো।

রেটিং রিনচে ছিলেন আমার প্রধান শিক্ষক, তাছাড়া তাথাগ রিনপোচে আমার কনিষ্ট শিক্ষক নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত আধ্যাত্মিক ও দয়ালু ব্যক্তি। তিনি আমাকে পড়ানোর পর প্রায়ই অন্যান্য বিষয়ে কথা বলতেন, হাসি –মজাও করতেন; এসব আমার খুব ভাল লাগতো।

তা ছাড়াও প্রাথমিক বছরগুলিতে আমাকে যারা দলাই লামারূপে চিহ্নিত করেছিলেন, সেই খোঁজ দলের নেতা কিয়ুতসাং রিনপোচেকে আমার তৃতীয় শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। প্রথম দুই শিক্ষকের মধ্যে কেউকোনও কারণে অনুপস্থিত হলে, তিনি আমাকে পড়াতেন।

আমি কিয়ুতসাং রিনপোচেকেও খুব পছন্দ করতাম। তিনি এতই মিষ্টি স্বভাবের ছিলেন যে আমি কখনও তাঁকে তেমন গুরুত্ব দিতাম না। পড়ার সময় যখন কোনও অংশ আমাকে পুনরাবৃত্তি করতে বলতেন, আমি তখন তাঁর ঘাড়ে ঝুলে পড়ে বলতাম, ‘আপনিই বলুন!’...এর ফলে যখন ঊনিশ বছর বয়সী ত্রিজাং রিনপোচেকে আমার কনিষ্ঠ শিক্ষক নিযুক্ত করা হয়, তখন তিনি তাকে সতর্ক করেছিলেন যে, ওর সামনে একদম হাসবেন না, তাহলে সে আপনার ভালমানুষির সুযোগ নেবে।

তবে এই ব্যবস্থা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, কারণ আমি ভিক্ষু হওয়ার কিছুদিন পরেই রেটিংগ রিমপোচে রিজেন্ট পদ ছেড়ে দেন, মূলত তাঁর প্রতি জনসাধারণের অবিশ্বাসের কারণে। এই সময় আমার বয়স মাত্র ছয় বছর, তবুও আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে আমি কাকে বেশি পছন্দ করি।আমি তাথাগ রিনপোচেকে বেছে নিলে, প্রশাসন তাঁকেই আমার প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত করে। তাঁর স্থানে লিং রিনপোচেকে আমার কনিষ্ঠ শিক্ষক নিযুক্ত করা হয়।

তাথাগ রিনপোচে যত মিষ্টি স্বভাবের ছিলেন লিং রিনপোচে তুলনায় অনেক কম কথা বলতেন, তেমনি রাশভারী প্রকৃতির মানুষ, তাই শুরুর দিকে আমি তাঁকে খুব ভয় পেতাম। আমি তাঁর সেবককে আসতে দেখলেই ভয় পেতাম, এবং তাঁর পায়ের আওয়াজ চিনতে শুরু করি, এই শব্দ শুনে আমার বুক কাঁপতো। কিন্তু যত সময় গেছে, আমি তত তাঁর নিকটে এসেছি এবং আমাদের সম্পর্ক ততই ভাল হয়েছে। তারপর থেকে ১৯৮৩ সালে তাঁর মৃত্যুর দিনটি পর্যন্ত তিনি আমার সঙ্গেই ছিলেন।

এই তিন শিক্ষক ছাড়াও তিনজনকে আমার ব্যক্তিগত সেবক হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছিল।এই তিনজনও ছিলেন লামা। তাঁদের মধ্যে একজন চোপান খেনপো অর্থাৎ ধর্মীয় কর্মসূচী আধিকারিক। দ্বিতীয়জন ছিলেন ভোজনালয় আধিকারিক সোলপোন খেনপো, আর তৃতীয়জন বস্ত্রাগারের আধিকারিক সিনপোন খেনপো। এই তৃতীয় পদে ছিলেন কেনরাপ তেনজিন, তিনিও দলাই লামা অনুসন্ধান দলের সদস্য ছিলেন। তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছোটবেলাতেই আমাকে খুব মুগ্ধ করে।

ছোটোবেলায় ওই ভোজনালয় আধিকারিককে আমি এতই ভালবাসতাম যে তাঁকে চোখে হারাতাম। তিনি কোনও কাজে বাইরে থাকলে আমার ঘরের পর্দা তুলে রাখতে হতো যাতে অন্ততঃ তাঁর কাপড়ের নীচের প্রান্তটি দেখতে পাই। আমার এই আবদারে তিনি কখনও বিরক্ত হতেন না। তিনি খুব সরল মানুষ ছিলেন এবং টাকমাথা। তিনি ভাল গল্প শোনাতে পারতেন না,আমার সঙ্গে খেলতেন না; কিন্তু সেজন্যে আমি তাঁকে কম ভালবাসিনি।

আমি সবসময় আমার সম্পর্ক নিয়ে ভাবছি।এখন আমি মনে করি এটি খাওয়ানো ব্যক্তির সাথে বিড়ালছানা বা খুব ছোট একটি প্রাণীর মতো ছিল।আমি প্রায়শই ভাবি যে খাওয়ানো মানুষের সম্পর্কের মূল কারণগুলির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

লামা হিসাবে দীক্ষা পাওয়ার পরেই আমার পড়াশোনা শুরু হয়। আগে কেবল পড়তে শেখানো হয়েছিল। লোবসাং সামতেন এবং আমি, দুজনকে এক সঙ্গে শেখানো হয়েছিল। আমাদের শিক্ষাদানের দুটি কক্ষ খুব ভাল করে মনে পড়ে; একটি পোটালায় এবং অন্যটি নরবুলিংকায়। প্রথমটির দেওয়ালে দুটি চাবুক ঝুলতো, একটি হলুদ রেশম এবং অন্যটি চামড়ার।আমাদের বলা হয়েছিল যে প্রথমটি দলাই লামার জন্য এবং দ্বিতীয়টি তার ভাইয়ের জন্য। আমরা সেগুলি দেখে খুব ভয় পেতাম। শিক্ষক সেগুলির দিকে তাকালে আমরা কাঁপতাম। তবে হলুদ চাবুক কখনও ব্যবহার করতে হয়নি, হ্যাঁ, চামড়ারটি দু'বার ব্যবহৃত হয়েছিল। বেচারা লোবসাং সামতেন! সে তার ভাইয়ের মতো লেখাপড়ায় তেমন প্রখর ছিল না।তবে, মাঝে মাঝে আমি এটাও ভাবি যে তিব্বতী প্রবাদ অনুসারেমেষকে ভয় দেখাতে ছাগলকে পেটানোর কারণ কখনো হয়তো আমিও ছিলাম। আমার জন্যেই হয়তো লোবসাং সামতেনকে এই শাস্তি পেতে হয়েছিল।

যদিও আমি এবং লোবসাং সামতেন দুজনেরই সমবয়সী বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার অনুমতি দেওয়া হয়নি, আমাদের কখনও সঙ্গীর অভাব হয় নি।নোরবুর্লিংকা এবং পোটালা উভয় প্রাসাদেই সাফাইকর্মী ও সেবকের কোনও খামতি ছিল না – অবশ্য তাঁদের কাউকে চাকর বলা যায় না। এরা সেনাবাহিনীর কর্মী ছিলেন, এবং অধিকাংশই অল্পশিক্ষিত কিম্বা অশিক্ষিত। তাঁদের কাজ ছিল ঘরগুলি পরিষ্কার রাখা এবং মেঝেগুলি যাতে সবসময় চকচক করতে থাকে তা সুনিশ্চিত করা - আমি প্রায়ই সেই চকচকে মেঝেগুলিতে স্লিপ করা খেলতাম বলে তাঁরা সেগুলিকে সবসময় চকচকে রাখা শুরু করে।

তারপর একদিন লোবসাং সামতানকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।– কারণ হিসেবে বলা হয় যে, আমরা খুব ঝগড়া করি! তারপর থেকে এই কর্মীরাই শুধু আমার সঙ্গে রয়ে যায়। তবে এঁরা প্রত্যেকেই খুব ভাল সঙ্গী ছিলেন, - বড় হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা বাচ্চাদের মতন আমার সঙ্গে খেলতেন।

আমার বয়স যখন আটবছর তখন লোবস্যাং সামতেনকে একটি বেসরকারি স্কুলে পড়াশোনা করার জন্য পাঠানো হয়। এই ঘটনা আমাকে খুব কষ্ট দেয়, কারণ, তখনও আমি সুযোগ পেলেই পোটালা পরিসরে মা –বাবার কাছে গিয়ে তাঁর সঙ্গে খেলতাম। সে বেসরকারি বোর্ডিং স্কুলে চলে যাওয়ায় শুধু মাসে একবার পূর্ণিমার ছুটিতেই তার সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারতাম। কিছুক্ষণ গল্প করার পরই চলে যাওয়ার সময় যতবার সে আমাকে বিদায় জানাতো, আমি জানালার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে মন খারাপ করে বাইরে যেতে দেখতাম।

এই মাসিক সাক্ষাৎ ছাড়াও মাঝে মাঝে মা আমার বড় বোন সেরিং ডোলমাকে সঙ্গে নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। আমি অধীর হয়ে এই দিনটির অপেক্ষা করতাম, কারণ তাঁরা সঙ্গে বিশেষ বিশেষ খাবার ও পানীয় আনতেন। আমার মা সবসময়ই খুব ভাল রান্না করতেন। মায়ের হাতে বাড়িতে তৈরি নানা বেকারি আইটেম এবং পেস্ট্রির স্বাদ ছিল অতুলনীয়।ই মাসিক সভার সময় খুব ঘন ঘন ছিল।

আমি আরও বড়ো হলে, তখন আমার মা আমার কনিষ্ঠ ভাই তেনজিন চোগ্যালকেও সঙ্গে নিয়ে আসা শুরু করেন। সে আমার থেকে বয়সে বারো বছর ছোটো এবং আমার থেকেও দুষ্টু ছিল। তাঁর প্রিয় খেলাগুলির মধ্যে একটি ছিল টাট্টু ঘোড়াগুলিকে বাড়ির ছাদে চড়িয়ে দেওয়া।আমার মনে আছে একদিন সে আস্তে আস্তে এসে আমাকে বলে যে মা নাকি আমাকে কসাইয়ের কাছ থেকে শূয়োরের মাংস আনতে বলেছেন।আমার জন্যে এই জাতীয় কাজ নিষিদ্ধ ছিল, যদিও আমাদের নিজে গিয়ে মাংস কেনা ভুল মনে করা হয়নি – কিন্তু কসাইয়ের কাছে গিয়ে নির্দিষ্ট মাংস চাওয়ার অর্থ হল, এই পশুটিকে আমাদের জন্যই মারা হবে।

মাংস খাওয়ার বিষয়ে তিব্বতিদের চিন্তাভাবনা কিছুটা ভিন্ন। বৌদ্ধধর্ম সুস্পষ্টভাবে মাংস খাওয়া নিষেধ করে নি। কিন্তু বলা হয়েছে, খাওয়ার জন্য প্রাণীদের হত্যা করা উচিত নয়। তিব্বতি সমাজে মাংস খাওয়ার অনুমতি রয়েছে - বাস্তবে এটি প্রয়োজনীয়, কারণ ৎসাম্পা ছাড়া সাধারণ মানুষের খাওয়ার বেশি কিছুই নেই - তবে প্রাণীহত্যার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নিষেধ রয়েছে। এই হত্যার কাজটি লাহসায় বৌদ্ধ ছাড়া অন্যরা করে। লাহসায় অনেক মুসলমান আছেন, তাঁদের নিজস্ব মসজিদও আছে, তাই অধিকাংশ কসাই মুসলমান।গোটা তিব্বতে তখন কয়েক হাজার মুসলমান ছিলেন,তাঁদের অর্ধেক কাশ্মীর থেকে এবং বাকিরা চীন থেকে এসেছিলেন।

একবার মা আমার জন্য লুকিয়ে তাক্তসারের একটি বিশেষ ডিশ, মাংসের কাবাব নিয়ে আসেন, আমি অন্য কাউকে কিছু না বলে পুরোটাই নিজে খেয়ে নিই। কারণ, আমি যদি সেবকদের বলতাম, তাহলে তাঁদেরও ভাগ দিতে হতো, কিন্তু পরদিনই আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি। ফলস্বরূপ, একজন নতুন রান্নাঘর আধিকারিক নিয়োগ করা হয়।তাথাগ রিনপোচে আমাকে অনুশোচনা করে বলেন যে এর জন্য তিনিই দায়ী! আমি তাথাগ রিনপোচেকে খুবই ভালবাসতাম, তাঁকে মিছিমিছি অনুতপ্ত হতে দেখে আমাকেও সত্য কথা বলতে হয়। এই সত্যভাষণ আমার জীবনে নতুন পাঠ হিসাবে প্রমাণিত হয়।

সেদিন তাথাগ রিনপোচে আমাকে দলাই লামা হওয়ার তাৎপর্য বোঝাতে শুরু করেন। কয়েকদিন ধরে এই পাঠ চলেছে। ।

পোটালা মহল দেখতে খুব দুর্দান্ত এবং সুন্দর তবে এটি জীবন যাপনের দিক থেকে ভাল নয়।খ্রিস্টান ক্যালেন্ডার অনুসারে, সপ্তদশ শতাব্দীতে, মহান পঞ্চম দালাই লামা তাঁর শাসনের শেষ বছরগুলিতে একটি ছোট ভবনের পাশে দাঁড়ানো ‘লাল পাহাড়ি’ একটি শিলার উপর এই প্রাসাদ তৈরি করিয়েছিলেন। ১৬৮২ সালে তাঁর মৃত্যুর সময়ও এটির নির্মাণ প্রক্রিয়া চলছিলো। তাঁর অনুগত প্রধানমন্ত্রী দেশি সাঙ্গিও গ্যাতসে, পনের বছর ধরে প্রাসাদটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত এই সত্যটি জনসাধারণের কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন এইবলে যে দালাই লামা দীর্ঘ যাত্রা ও বিশ্রামে চলে গেছে।

পোটালা শুধুই প্রাসাদ ছিল না। এতে বেশ কয়েকটি সরকারি অফিস এবং সংরক্ষণাগারও রয়েছে, নামগিয়াল - যার অর্থ 'বিজয়ী' – মঠ, এখানে ১৭৫জন লামা থাকতেন। এতে বেশ কয়েকটি মন্দির এবং তরুণ লামাদের পড়াশুনোর জন্য একটি বিদ্যালয় ছিল।

যখন আমি শিশু ছিলাম, আমাকে সবার উপরে সাততলায় পঞ্চম দলাই লামার ঘরটি দেওয়া হয়। এটি খুব ঠান্ডা এবং অন্ধকার, আমার মনে হয় পঞ্চম দলাই লামার মৃত্যুর পরে কেউ আর এই ঘরে আসেননি। এর মেঝেটি প্রাচীন জায়গায় জায়গায় ভাঙ্গা, সেজন্যে সবসময় কার্পেটে ঢাকা চারটি দেওয়ালে টাঙানো ঝালরগুলির পেছনে প্রচুর ঝুল আর ধুলো।ঘরের এক প্রান্তে একটি বেদীর উপরে কয়েকটি মাখনের প্রদীপ। বুদ্ধমূর্তির সামনে ছোট কাপে কাজুবাদাম কিসমিস ইত্যাদির পাশে জল রাখা হতো। প্রতিদিন ইঁদুরেরা আক্রমণ করত এবং সেগুলি চাটত - এবং আমি ওই ছোটো ছোটো প্রাণীদের পছন্দ করতাম।তারা খুব সুন্দর এবং নির্ভয়ে তাদের খাবার গ্রহণ করত। রাতে যখন আমি শুতে বিছানায় শুয়ে থাকতাম, অনেকক্ষণ ধরে তাঁদের দৌড়ানোর শব্দ আমি টের পেতাম। কখনও কখনও তারা আমার বিছানাতেও উঠে পড়তো। ঘরে বেদিকা ছাড়াও আরেকটি বড় জিনিস ছিল - একটি বৃহৎ কাঠের বাক্স, এর মধ্যে লাল রেশ্মের কাপড়ে আচ্ছাদিত বড়ো বড়ো তোষক আর লেপ ছিল। ইঁদুরগুলি সুযোগ পেলেই সেই বাক্সে ঢুকে দৌড়ঝাঁপ করতো,আমি ঘুমানোর সময় লেপমুড়ি দিতে গিয়ে তাদের পেচ্ছাবের গন্ধ পেতাম।

পোটালা এবং নরবুলিংকা দুই জায়গাতেই আমার রুটিন একই রকম; হ্যাঁ, দ্বিতীয় স্থানে শিক্ষার সময়টি এক ঘন্টা বাড়ানো হয়েছিল, কারণ গ্রীষ্মের দিনগুলি বড়।তবে এর কারণে আমার কোনও সমস্যা হয়নি; আমি কখনই সূর্য ওঠার পর বিছানা ছাড়া পছন্দ করি না। একবার আমি অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম, উঠে দেখি, লোবসাং সামতেন বাইরে খেলছে, আমার খুব রাগ হয়।

আমি প্রতিদিন সকাল ছ’টায় উঠে প্রাতঃকৃত্য সেরে পোশাক পরিবর্তন করে প্রায় এক ঘন্টা প্রার্থনা ও ধ্যান করতাম। তারপর মধু বা চিনি দিয়ে চা এবং ৎসাম্পা দিয়ে সকালের খাবার খেতাম। তারপরে আমার প্রথম ক্লাস নিতেন কেনারাপ তেনজিন। অক্ষর শেখার পর থেকে তেরো বছর বয়স পর্যন্ত আমাকে লিখনশৈলী শেখানো হয়। তিব্বতী ভাষার দুটি প্রধান লিপি রয়েছে ঊ-চেন এবং ঊ-মে; প্রথমটি ব্যবহৃত হয় সাহিত্যের পাণ্ডুলিপি লিখতে আর দ্বিতীয়টি সরকারি কাজ, ব্যবসায়ী লেনদেন এবং চিঠি পত্র লেখায়।প্রাথমিকভাবে আমার জন্যে ঊ-মে শেখার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু আমি এটি এত দ্রুত রপ্ত করে নিই যে, আমাকে নির্ধারিত সময়ের আগেই দ্বিতীয় লিপিটাও শেখানো হয়।

যখনই আমি এই সকালের ক্লাশের কথা ভাবি, তখন না হেসে থাকতে পারি না। যখন আমি বস্ত্র আধিকারিকের তীক্ষ্ণ তদারকিতে পোশাক পরতাম, তখন পাশের ঘরে আচার-অনুষ্ঠান আধিকারিকের প্রার্থনার স্বর শুনতে পেতাম। আমার পড়ার জায়গা ছিল আমার শয়নকক্ষ সংলগ্ন বারান্দায়, যেখানে সারিবদ্ধ অনেক কটা ফুলের টব রাখা ছিল। এখানে শীত কম লাগতো। রোজ ছোটো ছোটো, কালো ও লালচঞ্চু পায়রার মতন দেখতে ডুঙ্কর পাখিরা আসতো। পোটালার উচ্চতায় তারা বাসা বানিয়েছে দেখে আমার খুব ভাল লাগতো। মনে হতো ওরা আমার জন্যেই এখানে বাসা বানিয়েছে। আচ্ছা পঞ্চম দলাই লামার সময়েও কি এই প্রাসাদের সাততলায় ডুঙ্কর পাখিদের বাসা ছিল? এখনকার পাখিরা কি তাঁদের পুণর্জন্ম? খুব জানতে ইচ্ছে করে। আমি যদি অবলোকিতেশ্বরের অবতার হয়ে থাকি, আমিই যদি সমস্ত দলাই লামার মহান আত্মা ধারণ করে থাকি, তাহলে এই ডুঙ্কর পাখিদের সম্পর্কে জানি না কেন? মনে মনে ভাবি, আমাকে অনেক সাধনা করতে হবে, অনেক কিছু পড়তে হবে, জানতে হবে; তবেই হয়তো আমি নিজের সম্পর্কে ও বিশ্বসংসার নিয়ে সবকিছু জানতে পারবো!

এই সময়, আচার-অনুষ্ঠান আধিকারিকের আমার ঘরে বসে অপেক্ষা করতেন।তাঁর আবার প্রার্থনা করার সম‍য় ঢুলতে থাকার অভ্যাস ছিল। যখন তাঁর ঘুম পেত তিনি গ্রামোফোনের আওয়াজের মতো মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করতেন। তারপর এই যন্ত্রে বিদ্যুতের ভোল্টেজ কমতে শুরু করলে যেমন ধীরে ধীরে গ্যাং গ্যাং আওয়াজ করতে করতে একসময় থেমে যায়, তেমনি তাঁর মন্ত্রোচ্চারণ থেমে যেত। তারপর যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর চোখ বন্ধ থাকতো, তাঁর আওয়াজও বন্ধ থাকতো, আর চোখ খুললেই তিনি আবার শুরু করতেন। কিন্তু এর মধ্যেই তিনি প্রার্থনার ক্রম ভুলে যেতেন এবং মনে রাখার প্রচেষ্টায় কয়েকটি শব্দ বারবার বলে যেতেন। এসব দেখে আমি খুব মজা পেতাম। কিন্তু এ থেকে আমারও একটা সুবিধা হয়েছিল। আমার যখন প্রার্থনা শেখার সময় এল, তাঁর আগেই বারবার শুনে শুনে সেগুলি মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল, শুধু সামান্য ঝালিয়ে নিতে হয়েছিল।

ইতিমধ্যে আমি এটি লিখতে শিখে গেলে মুখস্ত করার শিক্ষাও শুরু হয়ে যায়। গোড়ার দিকে শুধুমাত্র বৌদ্ধ সুত্ত মুখস্থ করতাম, প্রতিদিন যতটা মুখস্থ করতাম, সন্ধ্যায় শিক্ষকের সামনে ততটা আবৃত্তি করে শোনাতে হতো। কোনও অংশ স্মরণে না থাকলে সেটা আবার পরদিন সকালে মুখস্থ করে আবার সন্ধ্যায় আবৃত্তি করার রীতি ছিল। কিন্তু আমার মনে নিজের সম্পর্কে ও বিশ্বসংসার নিয়ে সবকিছু জানার প্রবল আগ্রহ ছিল বলেই হয়তো প্রতিদিন খুব তাড়াতাড়ি মুখস্থ করতে পারতাম। কিন্তু এটাও সত্যি যে যে সুত্ত আমি ভালভাবে না বুঝেই মুখস্থ করতাম, সেগুলি তত তাড়াতাড়ি ভুলেও যেতাম। বড় হয়ে এগুলি আমাকে আবার বুঝে বুঝে পড়তে হয়েছিল নিজের তাগিদেই।

এই দৈনন্দিন শিক্ষাক্রম দশটা নাগাদ শেষ হলে, আমি কিছুটা বিশ্রাম পেতাম। তারপর সরকারি আধিকারিকদের একটি বৈঠক হতো, ছোট হওয়া সত্ত্বেও আমাকে সেই বৈঠকে অংশ নিতে হতো। এভাবে অভিষেকের পর প্রথম থেকেই, আমি তিব্বতের আধ্যাত্মিক কর্তা হওয়ার পাশাপাশি মহাজাগতিক বিষয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। এই দৈনন্দিন বৈঠকটি পোটালা প্রাসাদে আমার ঘরের পাশের ঘরেই আয়োজিত হতো। আমি সাততলার বারান্দা থেকেই দেখতে পেতাম যে আধিকারিকরা একে একে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার দপ্তরগুলি থেকে বেরিয়ে আসতেন। এই বৈঠকগুলি অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক ছিল, সেখানে প্রত্যেক কর্মকর্তাকে সেদিনের করণীয় কাজের কথা বলা হতো। সেই বৈঠকে আমার সঙ্গে সমস্ত প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতা যত্ন সহকারে পালন করা হতো। আমার প্রতিহারী, ডোনয়ের চেনমো আমার ঘরে এসে আমাকে প্রথা মেনে মিলনায়তনে নিয়ে যেতেন, সেখানে প্রথমে রিজেন্ট এবং পরে কেশোগের চারজন কর্মকর্তা আমাকে সিনিয়রিটি অনুযায়ী স্বাগত জানাতেন।এই সভার পরে, আমি আবার আমার পড়ার ঘরে ফিরতাম এবং সঠিক উচ্চারণ সহকারে কনিষ্ট শিক্ষকের সঙ্গে আমার আমার সকালে মুখস্ত করা পাঠ আবৃত্তি করতাম। তারপর শিক্ষক আমাকে পরদিন কোন পড়াটি মুখস্থ করতে হবে, সেটি পাঠ করে শোনাতেন, এবং এর মানে বুঝিয়ে দিতেন।এই প্রক্রিয়া চলতো দুপুর পর্যন্ত। তারপর একটি ঘণ্টা বাজতো – প্রত্যেক ঘন্টাতেই ঘণ্টা বাজিয়ে সবাইকে জানান দেওয়া হতো যে কটা বাজে! শুধু একবারই ভুল করে বারোটার পর একঘণ্টা পেরোলে তেরো বার ঘণ্টা বাজানো হয়েছিল। এই সময়শঙ্খধ্বনিও করা হতো, আর বালক দলাই লামার দৈনন্দিন জীবনের সবচাইতে মজার সময় শুরু হতো - খেলাধূলা।

এক্ষেত্রে আমি খুব ভাগ্যবান; আমার অনেক খেলনা ছিল। আমি যখন ছোট ছিলাম, ভারতের সীমান্তবর্তী গ্রাম দ্রোকো থেকে একজন আধিকারিক আমার জন্য বিদেশ থেকে আমদানি করা খেলনা আর আপেলের মরসুমে আপেল ভরা কার্টনও পাঠাতেন। তাছাড়া লাহসা সফরে আসা বিদেশী উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা আমার জন্য বিভিন্ন ধরণের উপহার আনতেন।এর মধ্যে লাহসায় নিযুক্ত ব্রিটিশ বাণিজ্য মিশনের সভাপতি প্রতি বছর আমার জন্য যে খেলনার সেট আনতেন সেগুলি আমার সবচাইতে প্রিয় খেলনা ছিল। এই গেমগুলির মধ্যে সবচেয়ে সহজ, কিছুটা শক্ত এবং সবচেয়ে শক্ত অনেক সেট ছিল। আমার পনের বছর বয়স হওয়ার আগেই আমার কাছে এরকম অনেক সেট জমা হয়।

আমার যখন সাত বছর বয়স, তখন দুই আমেরিকান কর্মকর্তার একটি বোর্ড লাহসায় আসেন। তাঁরা আমার কাছে রাষ্ট্রপতি রুজভেল্টের একটি চিঠি, সঙ্গে এক জোড়া সুন্দর পাখি এবং একটি অসাধারণ ঘড়ি নিয়ে এসেছিলেন। আমার এই উপহারগুলি খুব পছন্দ হয়েছিল।কিন্তু, চীন থেকে আগত আধিকারিকদের উপহার আমার পছন্দ হয়নি, - ছোট বাচ্চার জন্য সিল্ক ব্যাগ পাঠানোর কী দরকার ছিল!

একইভাবে, ‘কু -উ –উ- ঝিক ঝিক...’ করতে থাকা ব্যাটারিচালিত একটি রেললাইন সহ রেলগাড়ি আমার খুব পছন্দ ছিল। আমার কাছে এমনই সীসের তৈরি সৈন্যদের একটি সেট ছিল, আমি বড় হয়ে সেই সেট গলিয়ে ভিক্ষু সন্ন্যাসীদের একটি সেট প্রস্তুত করি। কিন্তু সেগুলি যখন সৈনিক ছিল, তখন আমি সেগুলি নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতাম এবং সৈন্যসজ্জায় কয়েক ঘন্টা সময় দিতাম। তারপর যখন যুদ্ধ শুরু হতো, কয়েক মিনিটের মধ্যেই সমস্ত সৈন্য আছড়ে–উল্টে পড়ে যেত এবং অনেক মাথা খাটিয়ে তৈরি করা আমার সমরসজ্জা তছনছ হয়ে যেত। একই জাতীয় খেলা ছিল ৎসাম্পার আটার লেই দিয়ে তৈরি ট্যাঙ্ক এবং বিমানগুলির যুদ্ধ।

এই কাজের জন্য, আমি প্রথমে আমার পুরানো সেবকদের নিয়ে কে কত ভাল মডেল তৈরি করতে পারে – এ ধরণের প্রতিযোগিতার আয়োজন করতাম। তাঁদেরকে সমান পরিমাণে ৎসাম্পার আটা দিয়ে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, যেমন ধরুন, আধঘন্টার মধ্যে একটি মডেল তৈরি করতে বলা হতো। ওরা সেটা বানানোর পরে আমি তৈরি জিনিসগুলি পরীক্ষা করতাম। এই কাজে বেশ দক্ষ ছিলাম, তাই এটি আমার পক্ষে খুব সহজ ছিল। যাঁরা ভাল মডেল তৈরি করতে পারেনি, তাঁদের আলাদা করে দিতাম। তারপরে আমি আমার মডেলগুলিকে প্রতিপক্ষের কাছে দ্বিগুণ বড় ৎসাম্পার আটার লেইয়ের বিনিময়ে বিক্রি করতাম এবং এইভাবে আমার সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করতাম এবং পাশাপাশি বিনিময় বাণিজ্যের আনন্দ পেতাম। এর পরে, আমাদের সেনাবাহিনী যুদ্ধে নামতো। এতক্ষন পর্যন্ত প্রতিটি কাজ আমার ইচ্ছা অনুসারে সম্পন্ন হত, কিন্তু তারপরই আমার পরাজয়ের পালা শুরু হতো।

আমার সেবকরা যে কোনও পরিস্থিতিতেই পশ্চাদপসরণ করতে প্রস্তুত ছিল না। আমি তাদের উপর দলাই লামার কর্তৃত্বও ফলাতে চাইতাম, কিন্তু এক্ষেত্রে অসফল হতাম। আমি অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে, কখনও রেগে মুষ্ঠিবদ্ধ হাতেও উত্তেজিত হয়ে ক্রুদ্ধ হতাম, এমনকি কান্নাকাটিও করতাম।

খেলনা ছাড়াও আমি সামরিক ড্রিল পছন্দ করতাম।আমাদের সেনাবাহিনীর প্রাক্তন সদস্য ছিলেন আমার কর্মচারী নরবু থোন্ডুপ। আমি তাঁর কাছ থেকে এই ড্রিল করা শিখেছি। ছোটোবেলাতেই আমার গায়ে এত জোর ছিল যে আমি কঠোর পরিশ্রম করতে পিছুপা হতাম না। আমি একটি খেলা খুব পছন্দ করতাম, সেটি হল দ্রুত দৌড়ে গিয়ে ৪৫ডিগ্রি এঙ্গেলে রাখা একটি বোর্ড লাফিয়ে পার হওয়ার প্রতিযোগিতা, কিন্তু প্রশাসন এই খেলাটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছিল। এই ঝুঁকিপূর্ণ খেলাটা খেলতে গিয়ে আমি একবার বেকায়দায় পূর্ববর্তী দলাই লামার ব্যবহৃত জিনিসের মধ্যে একটি ঘোরানো লাঠি ছিল। সেটির হাতল ছিল হাতির দাঁতের। আমি এটা হাতে নিয়ে বনবন করে ঘুরিয়ে বেশ মজা পেতাম। একদিন আমি যখন এটা নিয়ে দ্রুত আমার মাথার চারদিকে ঘোরাচ্ছিলাম, তখন এটা আমার হাত থেকে ছিটকে গিয়ে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা লোবসং সামতেনের মুখে লাগে, আর সে চিৎকার করে মাটিতে পড়ে যায়। এক মুহুর্তের জন্য আমার মনে হয় যে আমি তাকে মেরে ফেলেছি! কিন্তু কিছুক্ষণ পরই সে উঠে দাঁড়ায়,তার চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু গড়ায় আর তাঁর ডান কপাল ও কানপটিতে একটি গভীর ক্ষত থেকে রক্ত ঝরতে দেখে আমি ভয়ে চেঁচিয়ে উঠি। দাদার ডান কপালের ওই ক্ষতটি কিছুদিন পর পেকে গিয়ে সারতে অনেক সময় লেগেছিল। এবং এর পরে, তাঁর কপালে এই দাগ সারাজীবনের দাগ হয়ে থেকে যায়।

দুপুর একটা বাজতেই হালকা খাবার খাওয়ার সময়।পোতালা প্রাসাদে আমার ঘরটির অবস্থা এমন ছিল যে সকালে আমার পড়াশোনা শেষ হতেই আমার ঘরটি রোদে ভরে যেত। কিন্তু কিছুক্ষণ পর থেকেই রোদ সরতে শুরু করতো আর দুপুর দুটোবাজতেই অন্ধকার হতে শুরু করতো। এই অন্ধকার আমার ভাল লাগতো না। ঘরে অন্ধকার বাড়ার সাথে সাথে আমার মনও কেমন যেন অন্ধকারে ভরে উঠতো।দুপুরের হাল্কা ভোজনের পরই আবার আমার পড়াশোনা শুরু হয়ে যেত। দেড় ঘন্টা ধরে কনিষ্ঠ শিক্ষক আমাকে সাধারণ জ্ঞান পড়াতেন।তিনি অন্যান্য বিষয়ও পড়াতেন, তবে আমি কোনও বিষয়ে আগ্রহ দেখাতাম না।আমার তখন পড়তে ভাল লাগতো না।

বৌদ্ধধর্ম - দর্শনে ডক্টরেট পেতে সাধারণ সন্ন্যাসীদের জন্য নির্ধারিত পাঠক্রম অনুসারে আমাকে গোড়া থেকে শেখানো হচ্ছিলো। আমার মতে, এই পাঠক্রম অত্যন্ত ভারসাম্যহীন ছিল এবং বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে যে ব্যক্তিকে দেশের নেতৃত্ব দিতে হবে, তাঁর পক্ষে এটি অত্যন্ত অসম্পূর্ণ এবং দুর্বল পাঠক্রম ছিল। আমাকে পাঁচটি প্রধান আর পাঁচটি সাধারণ বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতে হয়েছিল। এই পাঁচটি প্রধান বিষয় ছিল তর্কশাস্ত্র, তিব্বতি সংস্কৃতি এবং শিল্প, চিকিত্সা বিজ্ঞান, সংস্কৃত ভাষা এবং বৌদ্ধ দর্শন। এগুলির মধ্যে শেষটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সবথেকে কঠিন ছিল। এতে পাঁচটি বিভাগের পাঠকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতোঃ ‘প্রজ্ঞা-পারমিতা’ অর্থাৎ সম্পূর্ণ জ্ঞান, ‘মাধ্যমিক’ অর্থাৎ, মধ্যপন্থার দর্শন, ‘বিনয়’ অর্থ্যাৎ, সন্ন্যাসীদের আচরণের নিয়ম, ‘অভিধর্ম’ অর্থাৎ তত্ত্ববাদ, এবং প্রমাণ অর্থাৎ , তর্কশাস্ত্র বা জ্ঞানমীমাংসা।

পাঁচটি সাধারণ বিষয় ছিলঃ কবিতা, সংগীত এবং নাটক, জ্যোতিষ, ছন্দ এবং বাক্য-রচনা এবং প্রতিশব্দ। আসলে ডক্টরেট বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শন, তর্কশাস্ত্র এবং দ্বন্দ্বাত্মক পদ্ধতিতে ব্যুৎপত্তির জন্যই ভূষিত করা হয়। ফলস্বরূপ, আমি ভারতে আসার অনেক পরে সত্তরের দশকে ভালভাবে সংস্কৃত ব্যাকরণ শিখেছি এবং আমি চিকিত্সা শাস্ত্রের মতো অনেকগুলি বিষয় অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে পড়াশুনা করেছি।

একজন তিব্বতী ভিক্ষুর শিক্ষার মূল বিষয় দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি অর্থাৎ বিতর্কের শিল্পশিক্ষা। দুই ব্যক্তি একে অপরকে প্রশ্ন করে এবং একসাথে একটি নির্দিষ্ট অঙ্গভঙ্গি করে। প্রশ্ন জিজ্ঞাসার সময়, ব্যক্তিটি তাঁর ডান হাতটি মাথা পর্যন্ত উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে সামনের বাঁ হাতে সেটি দিয়ে আঘাত করে, একই সঙ্গে তিনি বাঁ পা মাটিতে আছড়ে ফেলেন। তারপর তিনি তার ডান হাতটি মাথা থেকে তুলে প্রতিপক্ষের মাথার নিয়ে যান। অপর ব্যক্তি চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে প্রশ্নের উত্তরের দিকে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে সারাক্ষণ তাঁর চারপাশে ঘুরতে থাকা প্রতিপক্ষকে মাত দেওয়ার ফন্দি আঁটে। এই লড়াইয়ে উপস্থিত বুদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রশ্নকারীর যুক্তিটিকে একটি অস্ত্র বানিয়ে তাঁকেই পরাস্ত করার শিল্প, যাতে দর্শকরাও হাসতে শুরু করে। সেজন্যে বিতর্কিত এই শিল্পটি অশিক্ষিত তিব্বতীয় সমাজের মধ্যেও খুব জনপ্রিয় কারণ এটি দর্শনের কঠিন ধারণাগুলি বুঝতে না পেরে কেবল মানুষকে বিনোদন দেয়।প্রাচীন যুগে মঠগুলিতে এই তর্ক-বিতর্কগুলি দেখতে আশপাশের গ্রাম কিম্বা শহরবাসী ভিড় করতো, অনেক দূরদুরান্তের মানুষ এসে রাত্রিবাস করতো।

বিতর্কের এই নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে দক্ষতা অর্জনকে একজন সন্ন্যাসীর একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ হিসাবে বিবেচনা করা হত, তাই দলাই লামা হিসেবে আমাকে কেবল বৌদ্ধদর্শন এবং তর্কশাস্ত্রেই নয়, বিবাদ-বিবাদেও দক্ষ হতে হবে। সেজন্যেই আমাকে দশবছর বয়স থেকেই অধ্যাবসায় নিয়ে এই বিষয়গুলি পড়তে শুরু করতে হয়েছে, এবং বারো বছর বয়সের পর থেকেই আমাকে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি শেখানোর জন্য দুজন শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিল।

বিকেলে ক্লাসে এক ঘন্টা পড়ানোর পর, আমার শিক্ষকরা সেদিনের বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক করতে এক ঘন্টা অভ্যাস করতেন। তারপরে, চারটে নাগাদ চা আসে।বিশ্বে ব্রিটিশদের থেকে অনেক বেশি চা পান করেন তিব্বতিরা।একটি চীনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাল ফৌজের আগ্রাসনের আগে তিব্বত চীন থেকে প্রতি বছর এক কোটি টন চা আমদানি করতো। আমার মতে এই পরিসংখ্যান ঠিক নয়। তিব্বতিরা আর্থিকভাবে চীনের উপর কতটা নির্ভরশীল তা প্রমান করাই এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য। কিন্তু এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে তিব্বতবাসীদের চা-প্রেম অবশ্যই প্রমাণিত হয়। আর ব্যক্তিগতভাবে, আমার দেশবাসীর এতটা চা-প্রেম আমি পছন্দ করি না।


চলবে ...