সোমবার, আগস্ট ১০, ২০২০

মহাসত্যের বিপরীতে তৃতীয় খণ্ড # চতুর্থ পর্ব

মাও শৃসানের ডাইরি

আমার মন দিনে ভবঘুরে;/ রাতে ঘুমাতে পারি না।

দৈনন্দিন কাজের শেষ নেই;/ ক্লান্তি আমার একমাত্র বন্ধু।

- ৎসাংইয়াং গ্যাৎসো( ৬ষ্ঠ দলাই লামা)


আমি যখন শিশু, মা আমার দুধনাম দিয়েছিলেন শৃসান ইয়াজি। তিনি তৎকালীন আর দশজন চীনা মায়ের মতন ঈশ্বর ও ভাগ্যে বিশ্বাস করতেন। আর আমার জন্মের পর প্রথা মেনে একজন জ্যোতিষীকে দিয়ে আমার কোষ্ঠী রচনা করান। আরেকজন গণৎকার মাকে বলেন যে আমার কোষ্ঠী ভাল নয়, বেঁচে থাকাই কঠিন হবে যদি না একজন ধর্মমা আমাকে সংরক্ষণ করেন।

তখন মায়ের এক ছোটোভাইয়ের বউ আমার ধর্মমা হয়ে আমাকে কিছুদিন তাঁর কাছে নিয়ে রাখতে রাজি হন। কিন্তু রোজ মাকে মামাবাড়িতে গিয়ে দুধ খাইয়ে আসতে হতো। কোনোদিন দেরি হলে, বা রাতবিরেতে আমি খিদেয় কাঁদলে ওই মামিই আমাকে স্তন্যপান করাতেন। আমার মা মন থেকে এই ব্যবস্থা মেনে নিতে পারেন নি। তিনি আমার মামার বাড়ি যাওয়ার পথে মানুষের আকৃতির একটি পাথরের আকৃতি দেখতে পান।

আমি একটু বড়ো হলে তিনি ওই মামিকে তাঁর মনের কথা জানিয়ে, আমাকে নিয়ে ওই পাথরমূর্তির সামনে নতজানু হয়ে বসে তাকে আমার ধর্মমা হওয়ার জন্য প্রার্থনা করতে বলেন। আর তারপর মা আমার নাম দেন ‘শৃসান ইয়াজি’। আমাদের মান্দারিন ভাষায় ‘শৃ’ মানে পাথর, ‘সান’ মানে তিন, আর ‘ইয়াজি’ মানে হল সন্তান। আমি মায়ের তৃতীয় সন্তান ছিলাম বলেই হয়তো তিনি এরকম নাম রাখেন। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, সেই মূর্তিটি ছিল কুয়ানয়িন বুদ্ধ মূর্তি।

আমি পরে মার্ক্সবাদে দীক্ষিত হওয়ার পরেও এই দুধনাম ব্যবহার করেছি। ১৯২৩ সালে, স্থানীয় সরকারের নজর এড়াতে আমার বন্ধু কমরেডদের ‘মাও শৃসান’ নামেই চিঠি লিখেছি দীর্ঘকাল। তাঁরাও আমাকে চিঠিতে এই নামেই সম্বোধন করতেন।

আমি তেমনি আমার ধর্মমাকেও ভুলিনি। এমনকি ১৯৫৯ সালের জুন মাসে আমার জন্মভূমি শাওশান গ্রামে গিয়ে আত্মীয়স্বজন ছাড়াও ছাত্রছাত্রীদের এক নৈশভোজে ডেকেছিলাম। যখন আমাকে বলা হয় যে সবাই এসে গেছেন, আমি মজা করার জন্যে বলি, আমার গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা এবং আত্মীয়স্বজন সবাই উপস্থিত হয়েছেন, কিন্তু আমার ধর্মমা এখনও আসেননি। আমরা কি তাঁর জন্য অপেক্ষা করবো?

গ্রামের সবাই পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করেন। বর্ষীয়ান ব্যক্তিরা সবাই জানতেন যে আমার মামিমা আমার ধর্মমা হয়েছিলেন। কিন্তু অনেক আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।!

একটু থেমে আমি হেসে বলি, না থাক, অপেক্ষা করতে হবে না, খেতে শুরু করা যাক!

তখন এক কিশোরী আমাকে জিজ্ঞেস করে, আপনার ধর্মমা কে ?

তখন আমি বলি, আমি শানচাই গ্রামের ওই পাথর ধর্মমার ছেলে, কুয়াননিন বুদ্ধের মূর্তিটা গো!

একথা শুনে গ্রামের সবাই অবাক, তারপর সবার মুখে হাসি ছড়িয়ে যায়।

১৯০৯ সালে ১৬বছর বয়সে আমি নানইয়ুয়ে পর্বতের মন্দিরে তীর্থযাত্রায় যাই। এই যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল দুটি। প্রথমতঃ, আমার মা এই মন্দিরে কুয়ানয়িন বুদ্ধ কে প্রার্থনা করে বলেছিলেন যে তাঁর ছেলে সাবালক হয়ে উঠলে তিনি তাকে বড়ো করে অর্ঘ্য দেবেন। সেসময় মা খুব অসুস্থ থাকায় তাঁর মানত পূরণ করতে আমি গিয়েছিলাম। আর দ্বিতীয়তঃ, অসুস্থ মাকে রোগমুক্ত করার জন্য প্রার্থনা জানাতে।

১৯১৭ সালের জুলাই মাসে আমার প্রিয় বন্ধু সিয়াও ইউকে সঙ্গে নিয়ে পায়ে হেঁটে বেরিয়ে পড়ি হুনান প্রদেশ ঘুরতে; পাঁচটি জেলা ঘুরেছি, পাঁচটি মহকুমার মধ্য দিয়ে হেঁটেছি, অথচ আমাদের এক পয়সাও খরচ করতে হয়নি। গ্রামে গ্রামে কৃষকরা আমাদের খেতে দিয়েছেন, থাকতে দিয়েছেন, যেখানে গেছি, সেখানবেই খুব আদর-যত্ন পেয়েছি। সিয়াও ইউ পরে একটি বইয়ে লিখেছে সেই অসাধারণ অভিজ্ঞতার কথা, আর সেই ভিক্ষুর জীবন কাটানোর পরিকল্পনা যে আমার মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল তা-ও লিখতে ভোলেনি।

আমরা ছাংশা শহর থেকে বের হয়ে, প্রথমে সিয়াং নদী পার হয়ে পৌঁছোই সহপাঠী ওয়াংশি-র গ্রামে। তাঁর বাড়িতে রাতে থেকে ভোরে স্নানটান সেরে শিয়াংশান বৌদ্ধ মন্দির দেখতে বেরোই। পথে সেই গ্রামের স্কুল দেখতে যাই, কিছুক্ষণ স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে গল্প করি। তারপর কিছুটা হেঁটে শিয়াংশান বৌদ্ধ মন্দির দেখতে যাই।

এই মন্দিরটি নির্মিত হয় থাং রাজবংশের আমলে(৬১৮-৯১৭)। কিন্তু ইউয়ান রাজবংশের ক্ষমতা(১২৭১-১৩৬৮) যখন প্রায় অবলুপ্ত তখন মন্দিরটির ভগ্নদশা হলে ১৩৮২ সালে দুই বৌদ্ধ শ্রমণের উদ্যোগে মন্দিরটি সারাদেশ জুড়ে খ্যাতিলাভ করে। আমরা পরিকল্পনা করি যে ঘুরে এসে, এই মন্দিরে কিছুদিন থেকে এখানকার ইতিহাস জানবো আর বৌদ্ধ দর্শন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করবো!

সেখান থেকে আমরা সারাদিন এবং প্রায় সারারাত হেঁটে ভোরের দিকে পৌঁছোই বর্ধিষ্ণু জনপদ হলুংশানের পাইইউনসি বৌদ্ধ মন্দিরে। ছাংশা থেকে হলুংশানের দূরত্ব প্রায় ৭০ চীনা মাইল। আমি সেই মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে অনেক ক্ষণ ধরে কথা বলার সুযোগ পাই। জন্ম, মৃত্যু, বার্ধক্য, জরা, পুনর্জন্ম ও কর্মফল নিয়ে আমাদের প্রশ্নের উত্তর তিনি অত্যন্ত সরলভাবে বুঝিয়ে বলেন। আমরা সে রাতে পাইইউনসি মন্দিরেই আশ্রয় পাই।

পরদিন ভোরে সেখান থেকে বেরিয়ে আমরা সারাদিন হেঁটে একটা দূরবর্তী গ্রামে পৌঁছোই। আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগে, আচ্ছা তাহলে মানুষের নানা সমস্যা সমাধানে বৌদ্ধধর্মের ভূমিকা কী? প্রধান পুরোহিতের বলা কথাগুলির রেশ তখনও আমাদের আবিস্ট করে রেখেছে। মনে একটা নতুন উৎসাহ ও উদ্দীপনা। প্রধান পুরোহিতের কথা ভাবতে ভাবতে আমরা দুই বন্ধু এমনই কয়েকদিন পায়ে হেঁটে ওয়েইশান পর্বতের পাদদেশে একটি পাহাড়ি নদীর ধারে পৌঁছোই। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এই পর্বতের কোলে একটি বৌদ্ধ মন্দির ও গোম্পা রয়েছে। সেখানকার প্রধান পুরোহিত ফাং চাং অত্যন্ত পণ্ডিত মানুষ, তাঁর জ্ঞানের খ্যাতি সারা দেশে। তাঁর সঙ্গে কথা বলা আর সেখানকার ভিক্ষুদের জীবনযাপন দেখার আকর্ষণ আমাদের টেনে নিয়ে চলে। কিন্তু দুর্গম পাহাড়ি পথেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। মিইন গোম্পার দরজায় পৌঁছুতেই প্রথা অনুযায়ী দুই ভিক্ষু আমাদের আপ্যায়ণ করে ভেতরে নিয়ে যান। আমরা প্রথমেই তাঁদের বলি, আমরা ভিক্ষা করতে এসেছি!

তখন একজন ভিক্ষু বলেন, ভগবান বুদ্ধের আরাধনা করা আর ভিক্ষা করা একই ব্যাপার!

একথা শুনে আমার মনে হয়, ভিক্ষু যেন সাম্যর কথাই বলছেন, এই ক্তহাটিতে ব্যক্ত হয় যে সব মানুষই এক আর সমান।

অন্য ভিক্ষু আমাদের ধূপকাঠি আর দিয়াশলাই দিয়ে সেগুলি জ্বালিয়ে বুদ্ধ মূর্তিকে পুজো করতে বলেন।

আমি বলি, প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে আলোচনা করতে আসাই আমাদের উদ্দেশ্য, পুজো দেওয়া নয়।

একথা শুনে ভিক্ষু মনক্ষুন্ন হয়ে বলেন, প্রধান পুরোহিত যার তাঁর কথামতন সকলের সঙ্গে সাক্ষাত করেন না! যদি একান্তই সাক্ষাত করতে চান তাহলে দুজনকেই লিখে আবেদন করতে হবে!

তখন আমি আর সিয়াও ইউ একখণ্ড কাগজে আমাদের ইচ্ছা প্রকাশ করে ভিক্ষুর হাতে দিই।

কিছুক্ষণ পর মঠাধ্যক্ষ আমাদের ডেকে পাঠালেন। পারস্পরিক সৌজন্য বিনিময়ের পর তিনি আমার প্রশ্ন শুনে বলেন, এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার মতো যথেস্ট সময় এখন নেই, রাত হয়ে গেছে!

তবু তিনি আমাদের সংক্ষেপে বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে বলেন। তারপর রাতের খাওয়ার সময় হলে বলেন, এখন খেয়ে তোমরা বিশ্রাম নাও! সকালে গোম্পা ঘুরে দেখ, আগামীকাল দুপুরে আবার কথা বলবো!

পরদিন দুপুরে মঠাধ্যক্ষ প্রতিশ্রুতি পালন করেন। আমাদের দুজনকে ডেকে বৌদ্ধ ধর্মের উপকারিতার কথা বুঝিয়ে বলেন। এই বিস্তারিত আলোচনায় আমাদের মনে বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে এক নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত হয়।

সিয়াও ইউ মঠ সংগঠন এবং চীনে বৌদ্ধধর্ম বিস্তার নিয়ে প্রশ্ন করে। মঠাধ্যক্ষ অপ্রস্তুত হাসেন। আমি বুঝি যে এই প্রশ্নের জবাব দিতে তাঁর অনেক সময় লাগবে। সেজন্যে আমি জিজ্ঞেস করি, এত ভিক্ষু এই মঠে কেন আসেন?

মঠাধ্যক্ষ বলেন, মূলতঃ বৌদ্ধধর্ম সংক্রান্ত গ্রন্থের আলোচনা করতে এবং ধর্মীয় নির্দেশ সম্পর্কে জানতে, এসব জেনে অনেকে ভিক্ষু বা ভিক্ষুণী হতে চান!

আমি মঠাধ্যক্ষকে মান্দারিন ভাষায় বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ প্রকাশনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি সে সম্পর্কেও সংক্ষেপে জবাব দেন।

সিয়াও ইউ মঠাধ্যক্ষের কাছে বিনীতভাবে বলে, আমাদেরকে একটা এমন চিঠি লিখে দিন, যেটা দেখালে অন্যান্য গোম্পাগুলিতেও এমন আতিথেয়তা পাবো!

মঠাধ্যক্ষ হেসে বলেন, কোনও প্রয়োজন নেই, তোমরা যে মঠে যাবে, সমান আতিথেয়তা পাবে!

তারপর তিনি সিয়াও ইউকে বলেন, তুমি জিজ্ঞেস করছিলে, চীনদেশে বৌদ্ধধর্ম কিভাবে এত প্রভাব বিস্তার করেছে? এটা ঠিক যে বৌদ্ধধর্ম এমনকি কনফুসিয়াসের চিন্তাধারাকেও প্রভাবিত করেছে। কারণ, বৌদ্ধধর্ম একটি সর্বজনীন সত্যকে প্রতিফলিত করে এবং জীবনদর্শনের এক উপযোগী দিককে তুলে ধরে!

সিয়াউ ইউ বলে, ধর্মীয় চিন্তাভাবনার জন্যেই হোক, কি দর্শনের জন্যেই হোক বৌদ্ধধর্মকে ‘চীনের সম্রাট’ বলা হয়!

সিয়াও ইউর মুখে একথা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করলে সে হেসে বলে, থাং সম্রাটেরা প্রথমে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে প্রত্যেক প্রদেশে একটি করে কনফুসিয়াসের মন্দির নির্মাণ করতে হবে। এরপর দেশের সর্বত্র স্থাপিত হয় তাও মন্দির। তারপর আসে বৌদ্ধ ধর্ম। বিদেশি হলেও সহজিয়া, তাই এই ধর্ম চীনে সাদরে গৃহীত হয়, তিব্বতে ছড়িয়ে পড়ে, এবং ক্রমশ সর্বত্র বৌদ্ধ মন্দির ও মঠ স্থাপিত হয়। তার মানে, থাং বংশের রাজত্বে একসঙ্গে কনফুসিয়াসের ধর্ম, তাও ধর্ম এবং বৌদ্ধধর্ম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতো!

মঠাধ্যক্ষ মিষ্টি হাসেন। আমি মাথা নেড়ে বলি, এই ইতিহাস আমার জানা। একজন থাং সম্রাট তো ভারত থেকে বুদ্ধের স্মৃতির অংশবিশেষ চীনে আনাতে চেয়েছিলেন!

এই ওশেইশানের মিইন গোম্পা থেকে ফেরার পথেও সিয়াও ইউর সঙ্গে বৌদ্ধধর্ম নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। সেখান থেকে ফিরে আসার পরে আমার চিন্তায় ধীরে ধীরে বৌদ্ধধর্মের ছাপ পড়তে থাকে।

এতটাই ছাপ পড়ে যে কয়েক মাস পর সেপ্টেম্বরের এক রবিবারে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ছাংশা থেকে ত্রিশ মাইল দূরে চাওশান পর্বতচূড়ায় নির্মিত চাওশান মন্দির দর্শনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি।

তার সপ্তাহতিনেক আগে ২৩ আগস্ট, ১৯১৭য় আমার বন্ধু লি চিংশিকে একটি বড় চিঠি লিখেছিলাম। লি পরে একজন খ্যাতনামা ভাষাবিদ হন। সেই চিঠিতে বহু বিষয়ের কথা ছিল। যেমন সারা বিশ্বের বিভিন্ন সরকারের কাঠামোর কথা লেখার পর, আমার মতে চীনদেশে কোন ব্যবস্থাপনা যথোপযুক্ত হবে বলে মনে করতাম তা-ও লিখেছি। একথাও লিখেছিলাম, আমি দর্শন এবং তত্ত্ব নিয়ে আরও পড়াশুনা করতে চাই।

আমি সেই চিঠিতে কনফুসিয়াসের চিন্তাধারায় ক্রমবিবর্তণের তিনটি পর্যায় – বিশৃংখলার যুগ, শৃংখলার যুগ আর মহাশান্তির যুগ নিয়ে যেমন দীর্ঘ আলোচনা করেছি, তেমনি বৌদ্ধধর্মের ত্রিলোক দর্শন নিয়েও লিখেছি।

আমার মনে তখন একটা আশ্চর্য সঙ্গম হচ্ছিল, কনফুসিয়াস উত্থাপিত ‘চুনজি’ বা ভদ্রলোক বা উৎকৃষ্ট মানুষ আর ‘শিয়াও রেন’- ইতরজন বা নিকৃষ্ট ব্যক্তি প্রসঙ্গে আমার মনে হয়, ইতরজনেরা ভদ্রলোকদের জন্য পরিশ্রম করে, তাই ভদ্রলোকের প্রয়োজন ইতরজনদের বাঁচানোর জন্য করুণাপূর্ণ হৃদয়। পরবর্তীকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু আমাকে তাঁর সরকারের মূলনীতি হিসেবে যে ‘বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়’ লক্ষ্য অর্জনের কথা বলেছেন, সেখানেও অনেকটা এমন বোধিচিত্ত প্রকাশ পায়।

সেদিন চাওশান পৌঁছে দেখি, মন্দিরটি চার অংশে বিভক্ত, আর সেখানে আছে মিলাফো বা মৈত্রেয় বুদ্ধের মূর্তি, কুয়ানয়িন বুদ্ধের মূর্তি। তখন মন্দিরের প্রায় ভগ্নদশা আর ভিক্ষুদের সংখ্যাও খুব কম। কিন্তু তাঁরা আমাদের আতিথেয়তায় কোনও ত্রুটি রাখেন নি। আমরা একরাত ছিলাম। মন্দিরগুলি ভালভাবে ঘুরে দেখার পর আমরা রাতে মঠাধ্যক্ষ ও ভিক্ষুদের সঙ্গে আলোচনায় বসি। বৌদ্ধধর্মের পরিধি বাড়িয়ে চীনের নানা সামাজিক প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা গড়ায় ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত। আমার এক সঙ্গী চাং পিতি তাঁর ডাইরিতে এই ঘটনাটি লিখে রেখেছেন।

অবশেষে মন্তব্য হিসেবে তিনি লিখেছেন, ‘মাও-এর মতে পাশ্চাত্যের মানুষদের কাছে বস্তুগত চাহিদা খুবই আকর্ষণীয়। তাঁরা ছোটেন খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান এবং শারীরিক চাহিদা পূরণের পেছনে। কিন্তু মানুষের জীবন যদি শুধু খাদ্য, পওশাক-আশাক, ঘর-বাড়ি আর শারীরিক চাহিদার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে মানুষের জীবনের কোনও মূল্যই থাকবে না। ...সাফল্য যদি অর্জন করতেই হয়, তবে একজন মানুষকে তাঁর ইচ্ছাশক্তি এবং শারীরিক শক্তিকে এক করতে হবে। ডাইরির তারিখ ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯১৭।

এটা সত্যি যে, মার্ক্সবাদের সংস্পর্শে আসার আগে আমি বৌদ্ধধর্মকে একটি আচরণীয় ধর্ম এবং বিশ্বাসের সমাহার ভাবতাম। আমি মনে করতাম, কারও আচরণমূলক ধর্ম নাও থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর একটি বিশ্বাসের জায়গা থাকতে হবে। আমি বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা অবলম্বণেই মানুষের ভালো করা এবং সমাজের সার্বিক উন্নতির কথা ভেবেছিলাম। চীনের মাটিতে কনফুসিয়ান চিন্তাধারা কেন দীর্ঘজীবী হয়েছে আর চীনের জনগণের ওপর এর প্রভাব যে বৌদ্ধধর্মের থেকে অনেক বেশি সেটাও আমি অনুভব করেছি।

১৯১৯ সালের অক্টোবর মাসে আমার মায়ের কফিনে শায়িত মৃতদেহ সমাহিত করার আগে চীনা সামাজিক রীতি অনুসারে ‘জিওয়েন’ বা শ্রদ্ধা ও শোকপ্রস্তাব পাঠ করে মন থেকেই উচ্চারণ করেছিলাম, ‘মায়ের মৃত্যু হয়নি, দেহ নশ্বর, আত্মা অবিনশ্বর, আমার আশা, আমার এই প্রার্থনা সেই আত্মা গ্রহণ করবে! ’।

তখনও আমি বৌদ্ধমত এবং আত্মা অবিনশ্বর তত্ত্বে বিশ্বাস করলেও ১৯১৯এর আগেই আমার মনে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ পর্যন্ত যখন ছাংশা শহরের প্রথম নরম্যাল স্কুলের স্নাতকস্তরের ছাত্র। ওই সময়ে চীন দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা আমাকে প্রভাবিত করে।

১৯১১ সালে, মুখ্যতঃ চীনের বিখ্যাত জাতীয়তাবাদী নেতা ডাঃ সুন ইয়াত সেনের নেতৃত্বে বিপ্লবের পর ১৬৮৮ সাল থেকে চলে আসা ছিং রাজবংশের রাজত্বের অবসান ঘটে। ১৯১২ সালের ১ জানুয়ারি নানচিং শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রজাতন্ত্রী চীন, আর সুন ইয়াত সেনকে এই অস্থায়ী সরকারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা হয়।

তার আগে আমাদের দেশে সুপ্রাচীনকাল থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে একের পর এক রাজবংশ রাজত্ব করেছে। ছিং রাজবংশের শেষ কয়েক দশক দেশের শাসন-ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কয়েকটি প্রতিবেশি দেশ চীনের নানা প্রান্তে নিজের নিজের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। সবার আগে জাপান দুর্বল ছিং শাসকদের বাধ্য করেছিল চীনের কিছু অঞ্চল নিজেদের দখলে রেখে নিজস্ব শাসন ব্যবস্থা কায়েম রাখতে। তারপর ভারতের দিক থেকে ও সমুদ্রপথে এল ব্রিটিশ, জার্মানি, পর্তুগাল, বেলজিয়াম ইত্যাদি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি।

অন্যদিকে দুর্বল শাসনের সুযোগ নিল বিভিন্ন প্রদেশের ভারপ্রাপ্ত একাধিক সেনাপতি ও জমিদার। তারা স্বাধীনভাবে কর আদায় ও রাজ্যশাসন করতে শুরু করে। চীন পরিণত হয় এক আধা-ঔপনিবেশিক আধা-সামন্ত্রতান্ত্রিক দেশে। দেশের এই ভঙ্গুর অবস্থা, অধিকাংশ মানুষের দারিদ্র দেখে আমি খুব কষ্ট পেতাম। মনে মনে এর প্রতিকারের উপায় খুঁজতাম।

তখনই বিদেশে শিক্ষাপ্রাপ্ত ও পাশ্চাত্যের উন্নয়ণশীল শিল্প ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত কিছু বুদ্ধিজীবী এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। সামন্ত সেনাধিপতি ও সামরিক একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে একটি গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক সরকার স্থাপনের লক্ষ্যে তাঁরা শুরু করেন ‘নয়া সাংস্কৃতিক আন্দোলন’। এই আন্দোলনের মূল স্লোগান ছিল ‘বিজ্ঞান ও গণতন্ত্র’। ফলস্বরূপ, ডাঃ সুন ইয়াত সেনের নেতৃত্বে বিপ্লব ও প্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠা আমাকে আশান্বিত করে। মনে মনে ভাবি, এবার নিশ্চয়ই আমার দেশ একটি ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন ও শক্তিশালী দেশ হয়ে উঠবে।

কিন্তু দেশের সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো আর হাজারো কুসংস্কারের অচলায়তন ভাঙা এত সহজ কাজ ছিল না।‘নয়া সাংস্কৃতিক আন্দোলন’-এর দুই প্রধান নেতা ছেন তুশিউ এবং হু শৃ ১৯১৫ সালে ‘নব যুবক’ নামে পত্রিকা প্রকাশ করে নিজেদের এবং অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের মত প্রকাশে সক্রিয় হন। শুরু হয় পাশ্চাত্যের চিন্তাক্ষেত্রে প্রকাশিত কয়েকটি গ্রন্থের চীনা ভাষায় অনুবাদ ও প্রকাশ। আমি নিয়মিত এই পত্রিকা পড়তাম।

এই পত্রিকাই কয়েকবছর পর ‘৪ মে আন্দোলন’-এর ইন্ধন জোগায়। যাঁরা এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন বুদ্ধিজীবী ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় অক্টোবর বিপ্লবের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে মার্ক্সের চিন্তাধারার প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁরা মার্ক্স ও লেনিনের কয়েকটি রচনা সংগ্রহ করে যুবকদের মধ্যে মার্ক্সবাদ প্রচার শুরু করেন। আমিও তখন দেশবাসীর দারিদ্র দূর করতে সঠিক পথের সন্ধানে ছুটছিলাম। ১৯১৮ সালে আমি ও ছাংসার প্রথম নর্মাল স্কুলের কয়েকজন সতীর্থ মিলে ‘নতুন মানুষ পাঠচক্র’ নামে একটি সংঘ গঠন করি। এই সংঘের উদ্দেশ্য বর্ণনা করে আমরা একটি প্রচারপত্রও প্রকাশ করি। এতে লিখেছিলাম, ‘ আজ আমাদের দেশ এক চরম সংকটের মুখোমুখি। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও সদস্য আদৌ নির্ভরযোগ্য নয়। আমরা আমাদের সমমনোভাবাপন্ন সকল ব্যক্তিকে নিয়ে একটি সংগঠন গড়তে চাই। এর মূল উদ্দেশ্য হল আত্মোন্নতি ও দেশের সংস্কার সাধন। এই ধারণার প্রতি আগ্রহী সকলকে অনুরোধ করছি তাঁদের মতামত আমাদের লিখে জানাতে। আমরা প্রত্যেকের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করে স্থির করবো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা’। ক্রমে আমাদের ‘নতুন মানুষ পাঠচক্র’ –র সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকে। আমরা নানা সমাজসেবার কাজ করতে থাকি।

তাছাড়া আমরা হুনান প্রদেশের যুব ছাত্রদের, বিদেশে বিশেষ করে জাপানে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করতাম। এই কাজ করতে গিয়েই আমার পরিচয় হয় পিকিং শহরের ‘ ফ্র্যাঙ্কো চাইনিজ এডুকেশনাল অ্যাসোসিয়েশন’-এর সঙ্গে। এই সংস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল ফ্রান্সে চীনা যুবকদের ‘অর্ধেক দিন কাজ, অর্ধেক দিন পাঠ’ প্রকল্পের জন্য ছাত্র নির্বাচন এবং সে দেশের বিভিন্ন শহরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা। পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও চিন্তাবিদ সাই ইউয়ানফেই ছিলেন এই সংস্থার সভাপতি।

ঘটনাচক্রে ১৯১৮ সালেই আমাদের ছাংসা প্রথম নর্মাল স্কুলের শিক্ষক ইয়াং ছাংচি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিযুক্ত হয়ে পিকিংয়ে থাকতে শুরু করেন। এই যোগসূত্রে আমরা সাই ইউয়ানফেই -এর সঙ্গে যোগাযোগ করি। আর তাঁর অনুমতি পেয়ে আমরা কয়েকজন পিকিং যাই। তিনি আমাদের সংস্থার ইচ্ছুক যুবকদেরও ফরাসী দেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু আমি নিজে বিদেশ যাওয়ার ইচ্ছে সংবরণ করেছি। কিন্তু তাহলে আমি পিকিং শহরে কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করবো?

এই সমস্যারও সমাধান করলেন আমাদের শিক্ষক ইয়াং ছাংচি। তাঁর প্রচেষ্টায় এবং সাই ইউয়ানফেই –এর অনুমোদন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক লি তাচাও আমাকে গ্রন্থাগারের একজন কর্মীরূপে নিযুক্ত করেন।

এই লি তাচাও ছিলেন মহাজ্ঞানী। কর্মসূত্রে তিনি ছাড়াও নিয়মিত শিক্ষক–পাঠকদের সংস্পর্শে এসে আমি ঋদ্ধ হই। কিন্তু তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন ব্যস্ত মানুষ। দক্ষিণী টানে কথা বলা একজন সহ-গ্রন্থাগারিকের সঙ্গে কথা বলা কিম্বা সব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় তাঁদের ছিল না। ব্যতিক্রম ছিলেন শুধুএকজন অসাধারণ মানুষ, কমরেড লি তাচাও।

তাঁর কথায় আমি পিকিং-এর ‘দার্শনিক সমিতি’ এবং ‘সামাজিক সমিতি’ পরিচালিত পাঠক্রমে যোগ দিই। এই দুই সংস্থার মাধ্যমে সমভাবাপন্ন কয়েকজন চীনা যুবকের সান্নিধ্যে আসি। আমার রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ বাড়তে থাকে, ক্রমে অনেক বেশি বাস্তববাদী হয়ে উঠি। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই নিজেকে দিশেহারা বলে মনে হয়। তখন এক ছাত্র চু হসুন-পেই-এর সঙ্গে পরিচয় হয়। সে আমার সঙ্গে চীনে অরাজকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করে। তাঁর কাছে কিছু পেমপ্লেট পড়ে আমি আরও প্রভাবিত হই। কিন্তু কিছুতেই মন স্থির করতে পারি না যে আমার পথ কী হবে!

এই বিভ্রান্তির অবসান ঘটে যখন আমি মনে মনে লি তাচাওকেই গুরু বলে মেনে নিই। তিনি তখন দেশের যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে মার্ক্সবাদ প্রচার এবং রাশিয়ায় অক্টোবর বিপ্লব সম্পর্কে অবহিত করার জন্যে অগ্রণী ভুমিকা নিয়েছিলেন। অবস্র সময়ে গ্রন্থাগারে বসেই তাঁকে রাজনীতির নানা দিক নিয়ে প্রশ্ন করতাম, আর তিনি আমাকে সুন্দরভাবে উদাহরণ দিয়ে সব বুঝিয়ে দিতেন।

১৯১৮ সালে তিনি ‘ফরাসী বিপ্লব ও অক্টোবর বিপ্লব তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, তা সম্ভবতঃ আমাদের আলোচনার ফসল। ১৯১৮-র ১৫ নভেম্বর থিয়েন আন মেন চত্বরে একটি জনসভায় লি তাচাও ‘বলশেভিজম-এর জ্য’ শীর্ষক একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। আমি অবাক হয়ে শুনি যে সেই বক্তৃতাও আমার সঙ্গে তাঁর আলোচনার ফসল।

তাঁর সাহায্যেই আমি ছাত্র না হয়েও পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিবাদী ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হই।

১৯১৯ সালের ১৪ইমার্চ, ফ্রান্সগামী ছাত্রদের সঙ্গে আমি পিকিং থেকে সাংহাই যাই। নানা ব্যবস্থাপনা ও জাহাজ ছাড়ার অপেক্ষায় দেখতে দেখতে ২০ দিন কেটে যায়। ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে জানুয়ারি মাসে স্বাক্ষরিত চীনের স্বার্থবিরোধী ভার্সাই চুক্তির বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন। ২রা এপ্রিল সাংহাইয়ের পথে সেই আন্দোলনের মিছিলে হাঁটি। ৬ই এপ্রিলে বন্ধুদের জাহাজ ছাড়লে, ৭ তারিখ আমি ছাংসা যাই। সেখানে আমিই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিই। ৪ঠা মে ছেন তুশিউ-র নেতৃত্বে সরকার বিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী একটি বিশাল মিছিল পিকিং শহর পরিক্রমা করার সময় স্থানীয় সরকার দমন নীতি প্রয়োগ করলে দেশব্যাপী আন্দোলন আরও জোরদার হয়। আন্দোলনের ঢেউ ছাংসাতেও আছড়ে পড়ে। সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিই আমি।

আর পাঁচমাস পর অক্টোবর মাসে আমি যে মাকে হারাই সে কথা আগেই লিখেছি।


চলবে ...