শনিবার, নভেম্বর ১৬, ২০১৯

মহাসত্যের বিপরীতে,পর্ব -৯

‘একমাত্র ভিতু না হলে কেউ কখনও এই বলে গর্ব করবে না যে সে ভয় কাকে বলে জানে না। - বাট্রার্ন্ড রাসেল।

নয় .

অজানা নির্জন পথে গরবেরও বেশ ভয় করে। কিন্তু সে ভয়কে জয় করার জন্য নিজের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনকে ঘোড়ার ক্ষুরের ছন্দে মিশিয়ে চলতে থাকে।

সামান্য বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে দিনরাত দুদিন ঘোড়া চালানোরপরই সে পাহাড়ের গা বেয়ে চলতে থাকা এই অজানা পথে পৌঁছে যায়। এই পথে রাতে ঘোড়া চালানোর সাহস তার নেই। সেজন্যে তারপর থেকে গত তিনদিন পার্বত্য অরণ্য পথে সারাদিন ঘোড়া চালিয়ে রাতে বিশ্রাম নিয়েছে। কেননা রাতে পথ দেখা যায় না। কোনও ঝর্ণার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দুজনেই জল খায়। বিশ্রামের সময় পেট ভরে ঘাস খায় নাগপো। এই কালো ঘোড়াটির বয়স মাত্র বছর চারেক। লাগস্পার আস্তাবলেই জন্ম এটার। এই নাগপোর সমস্ত দামালপনার সঙ্গী ছিল গরব। সে-ই ওকে পোশ মানিয়েছে – লালনপালন করেছে।

কিশোর বয়সে প্রত্যেক মানুষই কাউকে ভালবাসতে চায়, ভালবাসা পেতে চায়। গরবের জীবনে নাগপো হল সেই প্রাণীটি। গরবের মা ছিলেন সহজ, সরল, ভীরু প্রকৃতির। লাগস্পা কিম্বা তার স্ত্রী চসডেন যেভাবে ছেলের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করতেন, নিয়ার্কি কখনও কথায় বা আচরণে তা প্রকাশ করতেন না। কিন্তু ওই কিশোর বয়সে গরব ছিল ভালবাসার কাঙাল। লাগস্পা দয়ালু মনিব হলেও সে ভীষণ স্বার্থপর। কিন্তু নাগপোর ভালবাসা নিখাদ। সে গরবের গা হাত চেটে দিত, ওর বুকে নাক ঘষতো। সেজন্যে গরব ওকে যতটা ভালবেসে ফেলে তা কোনও মানুষকে পারেনি। ঘরপালানো যুবক আর চুরি করা ঘোড়াটির মধ্যে এই অসাধারণ বন্ধনই ওদেরকে দূরে, আরও দূরে নিয়ে চলে। এখন পেটের দায়ে নাগপোকে বিক্রি করার কথা ভাবলেই গরবের বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। রাতে কোনও প্রাকৃতিক কারণে ঘুম ভেঙ্গে গেলে সে উঠে গিয়ে খুঁটিতে বাঁধা নাগপোর গলা জড়িয়ে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে, চুমু খায়। দিনে চলতে চলতে ক্লান্ত হলে কোনও ঘন ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে বসে খাওয়া-দাওয়া করে। তারপর আবার পথ চলা।

তবুও, ওর খাবার শেষ হয়ে গেলে নাগপোকে বিক্রি করা ছাড়া আর কোনও পথ থাকবে না! এই দামি ঘোড়ায় চেপে তো আর কেউ ভিক্ষে চাইতে পারে না! তার কাছে অবশ্য একটি ‘ধার চোক’ রয়েছে। প্রব্রজ্যা হলে তিব্বতের যে কোনও প্রান্তের যে কোনও বাড়িতে গিয়ে দাঁড়ালে কেউ বিমুখ করবে না। আর হাতে ধার চোক থাকলে তো কথাই নেই। তিব্বতি ভাষায় এর মানে প্রার্থনা ধ্বজা। ‘ধার’ মানে জীবন, সৌভাগ্য, স্বাস্থ্য আর ধনবৃদ্ধি আর ‘চোক’ মানে সমস্ত প্রাণী। তিব্বতি বিশ্বাস, এই প্রার্থনা ধ্বজ বাতাসের প্রাকৃতিক জ্বালানি দিয়ে শান্তভাবে পরিবেশের সরগমকে অনুকূল আর সমস্ত সজীব প্রাণকে আনন্দ এবং সৌভাগ্য এনে দেয়।

‘ধার চোক’ এ আঁকা মন্ত্র ‘ওম মণি পদ্মে হুম’ এর ছয় শব্দাংশের অর্থ হল যোগ আর জ্ঞানের অভিন্ন মিলনের আধারে সাধনা করতে করতে কেউ নিজের অপবিত্র শরীর, কথা আর মস্তিষ্ককে ভগবান বুদ্ধের মতন পবিত্র শরীর, বাণী আর মস্তিষ্ককে ভগবান বুদ্ধের মতন পবিত্র শরীর, বাণী আর মস্তিষ্কে রূপান্তরিত করতে পারে। বুদ্ধত্ব অর্জন করতে কোনও বাইরের উপাদানের সন্ধান করতে হবে না, নিজের ভেতরে সঞ্চিত তত্ত্ব-সমূহের সঠিক উপযোগেই তা অর্জন করা সম্ভব!

গৃহশিক্ষকের কাছে শেখা এই কথাগুলি কানে বাজে। এসব ভাবলে তার চোখে জল চলে আসে। তবুও গৃহশিক্ষকের কথামতনই পথে বেরুনোর আগে সঙ্গে ‘ধার চোক’ নিতে ভোলেনি গরব।এই পতাকা হাতে নিয়ে কেউ বাড়িতে এলে অন্তত একবেলা সসম্মানে পেট ভরে খাইয়ে দক্ষিণা সহ অতিথি বিদায় করাই তিব্বতের রীতি।

এই পথ কোথায় যাচ্ছে তা-ও জানে না গরব। প্রধান সড়ক এড়িয়ে অনেক দূর দিয়ে চলছে বলে পথে দুটো মাত্র গ্রাম দেখেছে সে। সেই গ্রামগুলিতে না ঢুকে সে পাশের জঙ্গলের পথ ধরে এগিয়ে গেছে।চলতে চলতে বার বার চোয়াল শক্ত হয় তার। কোনোভাবেই সে আর কারো গোলামি করবে না। নিতান্ত বাধ্য হলে নাগপোকে বিক্রি করে সেই টাকায় কোনও ছোটো ব্যবসা শুরু করবে। কিন্তু যতক্ষ্ণ সম্ভব সে নাগপোকে কাছছাড়া করতে চায় না। কিন্তু ঘর ছেড়ে বেরুনোর পর পাঁচদিন পেরিয়ে গেলে এই ভাবনার টানাপোড়েন আর ক্রমাগত দিশাহীন যাত্রা তার মুক্তির আনন্দকে ক্রমে মেঘাচ্ছন্ন করতে শুরু করে। ষষ্ঠদিন ভোরে গরব একটি বৃক্ষ গুল্মহীন ন্যাড়া পার্বত্য এলাকায় ঢুকে পড়ে। কিছুক্ষণ যেতেই সে হঠাৎ দেখে দূর থেকে ছ’জন অশ্বারোহী দ্রুতবেগে ওর দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে। গরব তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে বুঝতে পারে – এরা ডাকাত। নিজের অজান্তেই একটা অজানা ত্রাস তাকে থামিয়ে দেয়। আশপাশে কোনও বসতি কিম্বা আড়াল নেই যে সে দ্রুত লুকিয়ে পড়বে। আর ডাকাতরা যখন দেখেই ফেলেছে লুকিয়ে খুব একটা লাভও হবে না। গরব ঘোড়া থামায়। ভয়ে তার বুক কাঁপতে শুরু করে।

তখুনি ওর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে যাওয়ায় সে দ্রুত ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। তার দিকে দ্রুত ছুটে আসা তেজি মানুষগুলির মধ্যেই সে তার ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। সে অনুভব করে, এই মুহূর্তে তার দিকে দ্রুত ছুটে এগিয়ে আসছে একটি রোমহর্ষক ভবিষ্যৎ।

একথা ভাবতেই একটা অদ্ভূত শিহরণ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি তার শিহরণ নাগপোর শরীরেও ছড়িয়ে পড়ে। সে-ও একবার কেঁপে ওঠে। একটা গিরগিটি ওকে একদৃষ্টে সতর্কভাবে দেখতে দেখতে পাহাড়ের তামাটে রঙের সঙ্গে আগুনের হলুদ আভা মেশানোর প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় মগ্ন। মাঝেমধ্যে ওর চোখ বন্ধ হলেও গরব জানে যে ওর দৃষ্টি কতটা সতর্ক!

গরব ওটার দিকে মন সরিয়ে অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত রাখে। উদ্ধতভাবে পথ আগলে দাঁড়ানোর ভঙ্গীতে নাগপোকে আড়াআড়ি পা ফাঁক করে দাঁড় করিয়ে সে জোর করে মুখে তির্যক হাসি আনার চেষ্টা করে। ততক্ষণে সেই ছয় অশ্বারোহী ওর একেবারে সামনে এসে পড়ে। ওদের সর্দার বাজখাই আওয়াজে চেঁচিয়ে বলে, নেমে দাঁড়া, ঘোড়াটা দে, আর প্রাণের ভয় থাকলে টাকা-পয়সা লুকানোর চেষ্টা করবি না!

গরব তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে, আমি ঘোড়া থেকে না নামলেই তোদের মঙ্গল! এখন আমার কাছে কোনও টাকাপয়সা নেই, তবে আমাকে সঙ্গে নিলে ভবিষ্যতে উপার্জন করে দিতে পারি বন্ধু!

তারপর একে একে ছয়জনের পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, আমি তোদেরই অপেক্ষায় ছিলাম !

ডাকাতরা ওর ঔদ্ধত্য দেখে থ। কে এই যুবক? ওদের সর্দার জিজ্ঞেস করে, কোথা থেকে আসছিস?

গরব চোয়াল শক্ত করে বাঁকা হেসে বলে, সাহসীরা এ ধরনের প্রশ্ন করে না!

  • এই ঘোড়াটি তোর নিজের?
  • তোদের ঘোড়াগুলি যতটা তোদের, এটিও তেমনি!
  • চুরি করেছিস?
  • যদি বলি দখল করেছি, অথবা কেড়ে নিয়েছি!
  • আমি ডাকাবুকো সঙ্গী চাই, অবশ্য জানি না তোরা আদতে কতটা সাহসী!
  • তুই বেশ লম্বা চড়া মজবুত গড়নের ছেলে, কিন্তু বইয়স্টা খুবই কম, আগে কোনও অভিযানে গেছিস?
  • কাজের সময় দেখতে পাবি, আমি কতটা পারি!
  • মানে, তুই আমাদের দলে ঢুকতে চাস? - একজন অজানা, অচেনা –
  • আমার কাছে ভালো চা আছে, চল আগুন জ্বালিয়ে, চা বসিয়ে কথা বলি, চা খেতে খেতে পরস্পরকে জানি!

ওর কথা শুনে দস্যুরা অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে। ওদের সরদার বলে, বাঃ, তুই বেশ রসিক তো, আর কী বললি, আমাদের অপেক্ষায় ছিলিস?

দস্যুরা এই অকুতোভয় যুবকটিকে দেখে অবাক। ওরা ভাবে, এ নিশ্চয়ই অন্য অঞ্চলে অভিযান চালানো কোনও ডাকাত দলের সদস্য ছিল যে দল ভেঙে যাওয়ায় বা ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে মনোমালিন্যের কারণে দল ছুট হয়েছে। বয়স কম হলেও এমন হাট্টাকাট্টা শরীর আর ডাকাবুকোছেলেটির নির্ঘাৎ ডাকাতির অভিজ্ঞতা রয়েছে!

কঠিন পাথুরে মাটির ফাটলে জংলি ঘাস ও কিছু আগাছা। সেগুলির কিছু শুকনো ডালপাতা কুড়িয়ে ওরা একজায়গায় জড়ো করে। তিনদিকে তিনটি প্রায় সমান আকারের পাথর রেখে সবাই গোল হয়ে বসে বাতাস আটকায়। গরব আগুন ধরিয়ে চা বসায়। আর ইচ্ছে করেই অন্যদের দিকে তেমন না তাকিয়ে আগুনে ডালপালা ও শুকনো পাতা গুঁজে দিতে থাকে। ততক্ষণে পাহাড়ের দেওয়ালে একটু জায়গা বদলে সেই গিরগিটিটা একটি মথ শিকার করে ফেলেছে। ওটাকে দ্রুত গিলতে গিলতে একদৃষ্টে সতর্কভাবে ওদেরকে দেখছে। দেখতে দেখতে পাহাড়ের তামাটে রঙের সঙ্গে আগুনের হলুদ আভা মেশানোর প্রতিবর্ত ক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে ওটার চোখ বন্ধ হলেও গরব তার অভিজ্ঞতা থেকে জানে যে ওর দৃষ্টি কতটা সতর্ক! গরব ভাবে, এই প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর থেকে কতকিছু শেখার আছে! সে নিজের অজান্তেই এই গিরগিটির সতর্কতা আর প্রয়োজনে রং বদলানোর কৌশল গ্রহণ করে।

নিজের জীবন এবং অভিযানের বৃত্তান্ত সম্পর্কে একটি শব্দ উচ্চারণ না করলেও চা খেতে খেতে ওর কথা বলার ঢং, চোখে চোখ রেখে তাকানো আর বেপরোয়া শরীরী ভাষা ডাকাত সর্দার ও তার সঙ্গীদের মুগ্ধ করে। এরা পাতি লুটেরা। তীক্ষ্ণধী গরবের সঙ্গে ওদের সীমিত জ্ঞানগম্যির কোনও তুলনা হয় না। কিছুক্ষ্ণের মধ্যেই ওরা তাকে দলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়।

গরব তেমন কোনও আগ্রহ না দেখিয়ে ওদের প্রস্তাবে সায় দেয়। মনে মনে একথা ভেবে সে খুশি হয় যে নাগপোকে আর কাছছাড়া করতে হবে না! সে মনে মনে গিরগিটিটাকে প্রণাম জানায়। এখন শুধু সুযোগের অপেক্ষা আর একবার সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারলেই কেল্লাফতে! ডাকাতদলটি সঙ্গে ঘন্টাখানেক ঘোড়া চালানোর পর যে গ্রামে পৌঁছোয়, সেই গ্রামেই এদের মধ্যে এক ডাকাতের বাড়ি। সেই বাড়িতেই গরবের থাকার ব্যবস্থা হয়।

গরবকে দলে নেওয়ার ক্ষেত্রে ডাকাতদের এই তাড়াহুড়োর কারণটি ওরা না বললেও দু’দিনের মধ্যেই গরব তা বুঝে যায়। ৬-৭ দিন পরেই ওই পথ দিয়ে একটি বড় অভিযাত্রী দলের যাওয়ার কথা। সেই দলকে আক্রমণ করতে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধির চাহিদা রয়েছে। ওরাই গরবকে একথা জানায়।

কাজেই গরবকে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি! ডাকাতদলে যোগ দেওয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই অসাধারণ বউনি করে সে। অভিযাত্রী দলের প্রতি তার ক্ষমাহীন রুক্ষ ব্যবহার আর একরকম হাসতে হাসতে ওদের প্রায় সর্বস্ব কেড়ে নেওয়া, নিজের যোগ্যতা প্রমাণের বাধ্যতা ক্রমে ওকে দলের মধ্যে বিশিষ্ট হয়ে উঠতে সাহায্য করে। পরবর্তী সময়ে সে এই বিপজ্জনক পেশাকে পছন্দ করতে শুরু করে।

পরপর তিনটি সফল অভিযানে সে ব্যক্তিগতভাবেও বেশ সম্পদশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু কিছুদিন পরই তার অস্বস্তি শুরু হয়। সে দলের অন্য ডাকাতদের বলে, -ধ্যাৎ, তোদের এখানে কাজ করে মজা নেই! এই পথে অনেক কম অভিযাত্রী আসে। চল, আমরা হলুদ নদীর উৎসের দিকে যাই। ওদিক দিয়ে অনেক বেশি অভিযাত্রী যায়!

আসলে সে মনে মনে ছোটোবেলার গ্রাম থেকে দূরে, আরও দূরে যেতে চায়। কিন্তু দলের কেউই নিজেদের এলাকা ছেড়ে তার সঙ্গে যেতে রাজি হয় না।

ওরা কেউই দুঃসাহসী নয়, প্রত্যেকেরই পিছুটান রয়েছে। তাই গরব একাই আবার নিজের টাকা – পয়সা, বন্দুক আর নাগপোকে নিয়ে একদিন হলুদ নদীর উৎসস্থলে পৌঁছে যায়। সেখানকার দস্যুদলের লোকেরা অবশ্য গরবের পরিচয় আগে থেকেই জানতো। আগের দলটিকে নিয়ে পূর্ববর্তী তিনটি অভিযানের সাফল্য তাকে এই খ্যাতি এনে দিয়েছে। ওরা সবাই মূলতঃ সম্পন্ন কৃষক ঘরের অভিযানপ্রিয় যুবক। গরবের স্বভাবজাত দামালপনা ক্রমে সমস্ত সন্দেহ কাটিয়ে দ্রুত ওদের হৃদয় জিতে নেয়। দলের রাশভারি সর্দার ওকে ভরসা করতে শুরু করে।

পরবর্তী তিনবছর উত্তর তিব্বতের শুষ্কভূমিতে ধনী মঙ্গোলিয়ান এবং চীনা বণিকদের অভিযাত্রী দলগুলির উপর একের পর এক আক্রমণ হেনে তারা অভূতপূর্ব সাফল্য পায়। সাহস আর আক্রমণের পারদর্শিতা তাদের অপ্রতিরোধ্য করে তোলে। ফলে তারা বেশ সম্পদশালী হয়ে ওঠে। বেশ কয়েকটি সমতল গ্রামে অনেককটা নিজস্ব তাঁবু আর অসংখ্য গবাদি পশু এবং ঘোড়ার মালিক হয়ে ওঠে। তার কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এমনকি চীন, মঙ্গোলিয়া হয়ে তাকলামাকান মরুভূমি পর্যন্ত রেশম পথের প্রায় সমস্ত জনপদে।

তারপর আসে সেই ভয়ংকর দিন। ওদের কাছে পৌঁছনো সংবাদ অনুসারে ওরা যে ব্যবসায়ী দলটিকে আক্রমণ করে তাদের সঙ্গে সশস্ত্র রক্ষীর সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। আসলে সুরক্ষার খাতিরে দুটো অভিযাত্রী দল একসঙ্গে মিলে যাত্রা করছিলো। কিন্তু দ্বিতীয় দলটির খবর ডাকাত দলের কাছে ছিল না। ফলে ডাকাতির সময় রক্ষীবাহিনী গুলি চালায়। গুলি বিনিময়ে চারজন ডাকাতের তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয়, অন্য অনেকেই বেশ জখম হয়। তাদের সর্দারের বুকে গুলি লাগায় সে ঘোড়া থেকে পড়ে ছটফট করতে করতে নিথর হয়ে পড়ে। ডাকাত দল ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।

অকুতোভয় গরব ওদের সঙ্গে সামান্য পিছিয়ে দ্রুত সবাইকে একত্রিত করে বোঝায় লুটের মাল কত মহার্ঘ, তাছাড়া তাদের সর্দার ও সহযোদ্ধাদের হত্যার বদলা নিতে হবে। এভাবে দলের সবাইকে তাড়িয়ে সে দলটাকে দু’ভাগে ভাগ করে দুই কোণ থেকে সাড়াশি আক্রমণ হানে। তারপর ওরা ব্যবসায়ী দলটিকে উপর্যুপরি গেরিলা আক্রমণে পর্যুদস্ত করে সমস্ত রক্ষীকে মেরে ফেলে। দুদিন ধরে এই গেরিলা লড়াই চলে প্রায় চার কিলোমিটার বন্ধুর এলাকা জুড়ে। অবশেষে তারা ব্যবসায়ীদের সর্বস্ব লুট করে সামান্য খাবার সঙ্গে দিয়ে ছেড়ে দেয়।

সেদিন ডেরায় ফিরে ওরা প্রত্যেকেই আকন্ঠ মদ গিলে শুকনো মাংস ও ৎসাম্পা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন লুটের মাল ভাগ বাটোয়ারা করার আগেই দলের সবাই একসঙ্গে বসে সর্বসম্মতিক্রমে গরবকে তাদের নতুন দলপতি বেছে নেয়।

ওকেই দলপতি বাছার মূল কারণ হয়তো দলের সামনে সে যেমন সাহস, সংগঠন ক্ষমতা আর অভিনব রণকৌশল প্রদর্শন করেছে তা থেকেই সে অধিকাংশ দস্যুর মনে প্রাকৃতিকভাবেই দলপতির আসন দখল করে নিতে পেরেছিল।

নতুন দলপতির অধীনে দলটা যেন অনেক সংহত এবং তীব্র আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এই আক্রমণের তীব্রতা অভিযাত্রীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলায় তারা সহজেই আত্মসমর্পণ করতো। তাই কোনও রক্তপাতের প্রয়োজনই পড়তো না। আর কিংবদন্তীর খাম্পাদের মতন একবিন্দু রক্ত না ঝরিয়েও তারা হলুদ নদীর উৎসস্থলের কাছাকাছি থেকে উত্তর তিব্বতের শুষ্কভূমিতে রেশম পথের বিভীষিকা হয়ে ওঠে। মঙ্গোলিয়ার ধনী ব্যবসায়ী এবং চীনা বণিক দলগুলির উপর একের পর এক আক্রমণ হেনে গরব ও তার দল আরও অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে। তারপর একদিন সেই বিশাল দলটিকে আক্রমণ করে তারা অনেক লাভবান হয়।

আর তারপরই এই প্রথম ওদের পথ আগলে দাঁড়ায় এক নিরস্ত্র তরুণী। দুহাত প্রসারিত করে থামিয়ে দেয় দুর্ধর্ষ খাম্পা দলটিকে। এই মেয়েটি নাকি ছোটোবেলা থেকেই স্বপ্নে এক ঘোড়সওয়ারকে দেখতো। তাকে পাওয়ার জন্যেই ঘর ছেড়ে পালিয়েছে সেই উদ্বিগ্নযৌবনা। অবশেষে সেদিন কালো নাগপোর পিঠে গরবকে দেখে চিনতে পারে –সে-ই তার স্বপ্নের সেই ঘোড়সওয়ার।

মেয়েটির নাম দেচমা। সে এখন আর গরবের কাছছাড়া হতে চায় না। তার তীব্র প্রেমের জোয়ারে ভেসে বদলে যেতে থাকে দোর্দণ্ডপ্রতাপ এক দস্যুসর্দার। ক্রমে সে হয়ে উঠতে থাকে প্রেমিক। কাম ও তীব্র আশ্লেষ থেকেও অনেক গভীর এই প্রেমের হাতছানি – যাকে শুধু খরস্রোতা হলুদ নদীর সঙ্গে তুলনা করা যায়। এই প্রেম নাকি অদৃষ্টের পরিহাসে বদলে হলুদ নদীর উৎসমুখের দস্যুদের জীবনের গতিপথ। একদল দস্যুকে বণিকের ছদ্মবেশে সঙ্গে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত দীর্ঘ স্বপ্নের মতন যাত্রাপথ অতিক্রম করে গরব ও দেচমা গিয়ে পৌঁছোয় তিব্বতের রাজধানী লহাসা শহরে। লুটের সামগ্রী বিক্রি আর দলাই লামার দর্শন – এই দুই উদ্দেশ্য নিয়ে।


চলবে ...