রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

মহাসত্যের বিপরীতে,পর্ব ১৮

# আঠেরো

রূপসী নামের এক আশ্চর্য নৌকা আছে

আমার।

যার ডানায় উৎসবের হাওয়া/ সমস্ত রোদ্দুর থেমে যায় তার কাছে।

নৌকা ভাসে।

ভেসে যায় প্রদীপ্ত আলো, কলাপাতায় মোড়া

দুঃখ, সুখ-সুখ দিন।

- অদিতি বসু রায় (রূপসী)


একটা অদ্ভুত অনুভূতি গরবকে এক অজানা লক্ষ্যের দিকে টানছে। অজানা লক্ষ্য। কেমন সেই লক্ষ্য? কীসের আকর্ষণ? একটি মেঘের মতন অস্পষ্ট কিছু। যার ডানায় তার কাছে সমস্ত রোদ থেমে থাকে। ভেসে যায় যেন সুখ – সুখ দিনগুলি! এই অস্পষ্ট মেঘকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করেও সে বিফল হয়েছে। যতদিন যাচ্ছে ওই অনুভূতি ততই প্রবল হয়ে উঠছে। দেচমার প্রতি আশ্লেষ ছাপিয়ে তাকে উন্মাদ করে তুলছে এই

অনুভূতি। এই আকর্ষণেই প্রায় ঘোড়া ছুটিয়ে সে দেচমা ও দুই অনুগামী গোরিং এবং ৎসোণ্ডুকে সঙ্গে নিয়েলাহসা থেকে এতদূর খ্যাং তিসের পথে ছুটছে। কীসের আকর্ষণ? যা তাকে কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার রাতগুলিকেছেড়ে দিয়ে অন্য দিনগুলিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় চোদ্দো ঘণ্টা ঘোড়া চালাতে বাধ্য করেছে।এই পথ দুর্গম হলেও পথনির্দেশ খুব সোজা। লাসা থেকে দ্রেপুং দ্রুত ঘোড়া চালিয়ে পৌঁছতে দুপুর হয়ে যায়।

তখন দ্রেপুং গুম্ফায় দু’জন লামা রংচঙে পোশাক আর মাথায় মুকুট পরে বিরাট বিরাট লম্বা দু’টো বাঁশিতে ফুঁদিচ্ছেন। গরবরা গুম্ফার দিকে না গিয়ে ঘোড়া চালাতে চালাতেই কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম জানিয়ে সাংপোনদের দিকে এগিয়ে যায়। এই সাংপোর পাড় ধরে এগিয়ে গেলে তার উৎসমুখ মানস সরোবরে পৌঁছে যাওয়া যাবে। সাংপোর তীরে পৌঁছতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে যায় । দ্বিতীয়ার চাঁদের আলোয় নদীর তীরে তাঁবুখাটিয়ে ওরা খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়ে।

পরদিন সকালে উঠে আবার যাত্রা শুরু। সাংপোর ধার ঘেঁষে পথটি মোটেই সমতল নয়। বড় বড় পাথরের পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে এগিয়েচলেছে, সতর্ক হয়ে ঘোড়া চালাতে হলেও চলায় মজা আছে। দুপুরের আগেই চুসুল পেরিয়ে আরও বন্ধুর পথে এগোতে থাকে ওরা। নদীটা ওই অঞ্চলে শান্ত ও গভীর। পাশ দিয়ে চললেও এতটুকু শব্দ কানে আসে না। পথে শুকনো পাথরের ফাঁকে ফাঁকে কিছু ছোটোবড়ো ঘাস। সেখানে ঘাস একটু বেশি সেখানে সামান্য জিরিয়ে ওরা ভারবাহী খচ্চর ও ঘোড়াগুলিকে ঘাস খেতে দিয়ে নিজেরা আগুন জ্বালিয়ে, নদীর জল এনে ৎসাম্পা বানিয়ে খেয়ে

নেয়। তারপর আবার ঘোড়ার পিঠে চড়ে এগিয়ে চলা। নদীর এই তীরে পাহাড়ের উত্তরদিকের দৃশ্য বেশ সুন্দর। কিন্তু সেদিকে তাকানোর খুব একটা অবকাশ নেই চলার পথের বন্ধুরতার কারণে।দুপুরের দিকে একসঙ্গে অনেকের হাসির শব্দে ওদের গতি আরও মন্থর হয়। ওরা তাকিয়ে দেখে

দশ বারোজন যুবক এবং কয়েকজন যুবতী একসঙ্গে স্নান করছে। যুবতীদের কোমরে কাপড়ের পটি থাকলেও বুক ছেলেদের মতোই সম্পূর্ণ খোলা। গোরিং মুচকি হেসে ৎসোণ্ডুকে বলে, আহা, ওদের ঠান্ডা লেগে যাবে যে ! ৎসোণ্ডু ওকে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইশারায় চুপ করে থাকতে বলে। দেচমা দুষ্টু হাসি হেসে গরবের দিকে তাকায়। গরব একবার মুচকি হেসে আবার গম্ভীর হয়ে বলে, ওখানে একটা উষ্ণপ্রস্রবণনদীর সঙ্গে মিশেছে। ওদেরকে দেখে উষ্ণপ্রস্রবণে স্নানরত যুবক - যুবতীরা জিভ বের করে অভিবাদন জানিয়ে ওদেরকেও স্নান করার জন্য ডাকে। প্রত্যুত্তরে গরব জিভ বের করে

অভিবাদন জানিয়ে বলে, ধন্যবাদ, আমাদের তাড়া আছে!

সামান্য এগিয়েই ওরা একটা পায়ে চলা পথ পেয়ে যায়। অনেকক্ষণ জঙ্গলের পথে চলতে চলতে হঠাৎ একটি মাঠ। সেই পথেই ওরা এগোয়। সেখানে নদী বাঁক নিয়েছে, নদী থেকে শুরু হয়েছে বিরাট প্রাকৃতিক পাচিল। ইচ্ছে থাকলেও এগোনোর উপায় নেই। কাজেই সেই পথ ধরেই ওরা

দক্ষিণদিকে নামতে থাকে। ডানদিকে পাহাড়ের পাঁচিলের জন্য সূর্যালোকও ওই পথে পৌঁছতে পারে না। পাহাড়ের পাঁচিলটা পেরোতেইনজরে পড়ে কয়েকটি বাড়ি। চাষের উপযোগী কিছুটা জমি, দুটো গাধা, কয়েকটি মুরগি। ওরা সেই চার অশ্বারোহীকে দেখে যেন অবাক হয়ে যায়।গরবরা

নদীটাকে নিশানা রেখে এগিয়ে চলেছে। পাহাড়টা ডিঙিয়ে আবার ডানদিকে গিয়ে নদীর ধার ধরতে হবে। সাংপোই আপাতত ওদের একমাত্র পথনির্দেশ। নদীর ধারে পৌঁছতে আরও আধঘণ্টা লাগে। তারপর অনেকটা সমতল পথ পেরিয়ে হঠাৎ পথ শেষ হয়ে যায়। বাঁদিক থেকে একটা

ছোটো নদী সাংপোতে মিশে গিয়ে সংগম সৃষ্টি করেছে। বাধ্য হয়ে ওরাও বাঁদিকে ওই নদীর উৎসের দিকে চড়াই চড়তে থাকে।পাহাড়ে চলার পথ এভাবেই থেকে থেকে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। প্রায় প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা হতে থাকে। কিছুক্ষণ চলার পর নদীটা ক্রমে সরু হয়ে আসে। মাঝখানে অসংখ্য বড় বড় পাথরে ধাক্কা খেয়ে সেটা আরেকটু বাদিকে প্রায় ঝর্নার মতন। ওরা সেখানে ধীরে ধীরে সতর্কভাবে নদী পার হয়। তারপরই ঘোড়া থেকে নেমে প্রত্যেকেই শুকনো কাপড় দিয়ে প্রত্যেকের ঘোড়ার পাগুলি ভালভাবে মুছে দেয়। মুছে দেয় খচ্চরগুলির পা-ও। তারপর পশমি কাপড় দিয়ে ওদের পাগুলি জড়িয়ে বেঁধে দেয়। গায়েও পশমি কাপড়ের চাদর জড়িয়ে দেয়। ডালপালা জোগাড় করে আগুন জ্বালিয়ে খচ্চর ও ঘোড়াগুলির পায়ে সেঁক দেয়। নিজেরা ঝর্নার জল ফুটিয়ে মাখন মেশানো চা করে খায়, সঙ্গে খায় ৎসাম্পা। ততক্ষণে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। ওরা পাহাড়ের কোলে দুটো তাঁবু টাঙিয়ে ঢুকে পড়ে। গোরিং আর ৎসোণ্ডু একটায়, আর গরব আর দেচমা অন্যটায়। ওরা বিছানা পেতে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আদর করে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম ওদের অবশ করে দেয়। কাকভোরে একটি অজানা পাখির ডাকে গরবের বাহুলগ্না দেচমার ঘুম ভাঙে। ধড়মড় করে উঠে বসে গরবকে চুমু দিয়ে ঘুম ভাঙায়। দুজনে নদীর ধারে আগাছার আড়ালে প্রকৃতির ডাকে সাড়া

দিয়ে ফিরে এসে গোরিং আর ৎসোণ্ডুকে ডেকে দেয়। তাড়াতাড়ি আবার যাত্রার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে।কিছুক্ষণ এগুনোর পরেই ওদের পথে পড়ে একটি পাহাড়ি গ্রাম। কিছুটা হাল চষা জমি। মাটির গাঁথুনিতে পাথরের চাঁই বসিয়ে তৈরি বাড়িগুলির দেয়াল, টিনের চাল আর কাঠের দরজা-

জানলাগুলি দেখে ওরা বোঝে যে এটা একটা মধ্যবিত্ত তিব্বতি গ্রাম। কয়েকটি কুকুর তারস্বরে চিৎকার করে অনাহুত অতিথিদের আসার খবর দিতেই একদল শিশু-কিশোর কিশোরী ছুটতে ছুটতে ওদেরকে দেখতে চলে আসে। ওরা জিভ বের করে অভিবাদন জানিয়ে কুকুরগুলিকে চুপ

করায়। অশ্বারোহীরাও বাচ্চাগুলির অভিবাদনের জবাব দেয় একগাল হেসে। এরকম অনেকক্ষণ পর জনবসতি ওদের খুব ভাল লাগে। ওরা দুলকি চালে ঘোড়া চালায়। একটি বাড়ির উঠোনে বিছানো একটা চটের উপর আরও কয়েকটি শিশু বসে ছিল। এক বৃদ্ধা তুলো থেকে লাটিমে করে

সুতো বানাচ্ছেন। তিনি এবং বসে থাকা শিশুরাও জিভ বের করে অভিবাদন জানালে অশ্বারোহীরা বৃদ্ধার দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে জিভ বের করে অভিবাদন জানায়। মহিলার পাশেই বিছানো আরেকটি চটে কিছু যব শুকোচ্ছে, পাশেই কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আরেকটি কুকুর। তখনই

ঘর থেকে বেরিয়ে এসে অভিবাদন করেন একজন ভদ্রলোক। ওরাও ভদ্রলোককে অভিবাদন করে। ভদ্রলোক ওদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় একটি চৈত্যের সামনে। ওরা খুশি হয়ে ঘোড়া থেকে নেমে ওই চৈত্যের চারপাশে প্রদক্ষিণ করে ধর্মচক্র ঘুরিয়ে চৈত্যে প্রণাম করে। চৈত্যটি দু’মানুষ

সমান উঁচু আর চারদিকে আটকানো যোলোটি চক্র। আকারে ছোটো হলেও পঞ্চতত্ত্ব ও মণ্ডলার পূর্ণরূপ প্রকাশ পেয়েছে। তার সামনে একটি গভীর খাদের ওপর অসংখ্য রঙিন প্রার্থনা পতাকা উড়ছে। গ্রামটির নাম দিংবো। ওরা খ্যাং তিসে যাচ্ছে শুনে লোকটি ওদের হাতে এক থলে যবের

লাড্ডু তুলে দেন। তারপর হাসিমুখে ওদেরকে হাত নেড়ে বিদায় জানান। হাত নাড়তে থাকে বাচ্চাগুলি। ওরা প্রত্যেকেই খুকখুক কেশে ঘোড়া চালায়। লাহসা ছাড়ার দু’দিন পর থেকেই ওদের কাশি হয়েছে। শুকনো কাশি। ওরা আবার সাংপোর দিকে এগিয়ে যায়। আধঘণ্টার মধ্যেই

সাংপোর কাছে পৌঁছে আবার দক্ষিণ ধার ধরে পশ্চিমগামী যাত্রা। দিংবোর ওই ভদ্রলোক বলেছিল, ওখান থেকে পায়ে হাঁটা পথে তিন-চার দিন গেলে আসবে নীয়াং নদী। নদী পার হওয়ার জন্য ফেরি নৌকা পাওয়া যাবে। নদীর ওপারেই সীগাৎসে। ঘোড়ায় চড়ে নীয়াং পৌছতে অশ্বারোহীদের লাগে দু’দিন। কিন্তু ফেরি না পাওয়ায় একরাত কাটাতে হল তাঁবু খাটিয়ে। কাছেই একটি চায়ের দোকান থাকলেও ওরা নিজেদের মতনই থাকে।

তৃতীয়দিন সকালবেলা ওরা একজন একজন করে ঘোড়া নিয়ে ফেরি নৌকায় উঠে ওই খরস্রোতা পার হয়। প্রথমে ৎসোণ্ড, তারপর গোরিং, তারপর দেচমা ও সবশেষে গরব। লাহসা থেকে সীগাৎসের দূরত্ব একশো তিরিশ মাইল। পথে বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে ওরা পৌছল নয় দিনে। গরব

জানে, সীগাৎসে তিব্বতের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। লাসা প্রথম, দ্বিতীয় সীগাৎসে, তৃতীয় গীয়াংসে, চতুর্থ ইয়াটুং। ওরা অবশ্য লাসা ছাড়া এগুলির মধ্যে আর কোনওটাই দেখেনি। নীয়াং আর সাংপোর সংগমে গড়ে ওঠা এই সীগাৎসেতেই থাকতেন মহামান্য পাঞ্চেন লামা। গরবের গৃহশিক্ষক

একদিন বলেছিলেন, ঐতিহ্য অনুযায়ী পাঞ্চেন লামা হলেন মহামান্য দলাই লামার ধর্মভাই। একসময় গোটা তিব্বতের সমস্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও প্রচারের মূল দায়িত্ব ছিল পাঞ্চেন লামার। দলাই লামার দায়িত্ব ছিল শুধু প্রশাসন সামলানো। কিন্তু ক্রমে দলাই লামাই সমগ্র তিব্রতের

সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন। পাঞ্চেন লামা এখন শুধু সাং প্রদেশের শাসক। এই সাং প্রদেশের তিনটি প্রধান শহর সীগাৎসে, গীয়াৎসে এবং ফারীর মানুষের কাছে এখন তিনিই সর্বেসর্বা। পাঞ্চেন লামাকে অনেকে তাশী লামা কিংবা পাঞ্চেন রিম্পোসে বলে। অবশ্য এখন তাঁর সঙ্গে দলাই লামার

মতভেদের ফলে ভয়ে তিনি নাকি চীন পালিয়ে গেছেন। এই পালিয়ে যাওয়া ব্যাপারটা গরব মনে মনে মেনে নিতে পারেনি। যিনি ঈশ্বরের দূত, তিনি এমন ভয় পাবেন কেন? নিজেরা কথা বলে বিবাদ মিটিয়ে নিলেই হয়!

অলোক জানে, দলাই লামার সঙ্গে পাঞ্চেন লামার এই বিবাদের সূত্রপাত ১৯০৪ সালে। সে বছর ব্রিটিশ কমান্ডার ফ্রান্সিস ইয়ংহাসব্যান্ড লাহসা অভিযানে গেলে দলাই লামা সেটাকে বিদেশি আক্রমণ ভেবে চিনে পালিয়ে যান। দলাই লামাকে ভক্তরা বজ্রপাণী ভুবনবিজয়ী বলে মনে করেন । তিনি কেমন করে দেশবাসীকে বিদেশি আক্রমণের মুখে ফেলে দিয়ে নিজের জীবন বাঁচাতে পালিয়ে যান তা সাধারণ মানুষ ভেবে পায় না।

মহামান্য চেন-রে জির সমালোচনা করা সাধারণ মানুষের শোভা পায় না। তাই তারা চুপ থাকেন। সেই নীরবতাই ছিল পাঞ্চেন লামার পাথেয়। দলাই লামার অবর্তমানে তিনি দেশ ও প্রজারক্ষার গুরুদায়িত্ব পালন করে ক্রমে জনপ্রিয় অধিনায়ক হয়ে ওঠেন। ১৯১১ সালে চিনে বিপ্লব শুরু হয়। তার আগেই ত্রয়োদশ দলাই লামা তিব্বতে ফিরে এসেছেন। তিনি ভাবেন তিব্বতকে চিনা কবল থেকে মুক্ত করার এটাই সুবর্ণ সুযোগ।

তিনি তিব্বতকে ‘স্বাধীন স্বতন্ত্র দেশ’ বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু এই ঘোষণার বিপরীত ফল দেখা দেয়। অনেক উচ্চপদস্থ চীনপন্থী লামা তার বিরোধিতা করায় লাসায়ও বিশৃঙ্খলা দেখা যায়।

শেষ পর্যন্ত প্রাণের ভয়ে দলাই লামা আবার পালিয়ে দার্জিলিং গিয়ে ইংরেজদের আশ্রয় ও সাহায্য চান। ইংরেজরা চীনকে দ্রুত সমাধানের হুমকি দেয়। শক্তিশালী ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধের পথে না গিয়ে ১৯১৩ সালের সিমলা চুক্তিতে চীন ‘ স্বাধীন তিবৃত ’ কে মেনে নেয়। কিন্তু আন্তরিকভাবে পিকিং কখনও স্বাধীন তিবব্বত কে মেনে নেয়নি। তলে তলে ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। চীনপন্থী বেশ কয়েকজন লামা ও কিছু ধনী নাগরিক ১৯২৪

সালে লাহসার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলে দলাই লামা শক্ত হাতে সেই বিদ্রোহ দমন করেন। এবার পাঞ্চেন লামা তার ভক্তদের নিয়ে পালিয়ে গিয়ে চীনে আশ্রয় নেন । কিন্তু তখনই প্রয়াত হন ত্রয়োদশ দলাই লামা।

গরবরা সীগাৎসে পৌঁছেই সেই সাংঘাতিক মর্মবিদারী খবর পায়। ওরা সীগাৎসে পৌঁছানোর দুদিন আগেই নাকি মহাপ্রয়াণে চলে গেছেন ত্রয়োদশ দলাই লামা। তিনি আবার কোথায় জন্ম নেবেন তার কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে যাননি। তবে লাহসার উত্তর-পূর্ব আকাশে একটি অস্বাভাবিক মেঘখণ্ডকে দেখে জ্যোতিষীরা বলেছেন মহামান্য চেন-রে জি উত্তর-পূর্বের কোনও অঞ্চলে পুনর্জন্ম নেবেন। মহাপ্রয়াণের পর পোটালা থেকে তার মরদেহকে নরবুলিংকা প্রাসাদে নিয়ে এলে তার মুখটাও নাকি উত্তর-পূর্ব দিকে ঘুরে গিয়েছে। এই দুই ঘটনাকে জ্যোতিষীরা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ভাবেন।

খবরটা জেনে মহামান্য চেন-রে-জি’ র সঙ্গে সাক্ষাতের সুখস্মৃতি ওই ডাকাতদের চোখেও জল এনে দেয়। আবেগে প্রত্যেকেরই দু’ গাল বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ে। সীগাৎসেতে পা রেখেই ওরা মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে প্রণাম করে। মহাপুণ্যক্ষেত্র সীগাৎসের তিনটি অংশ। প্রথম ভাগটি

দুর্গ, বহু বছর আগে চীনারা এই দুর্গে তাদের ঘাঁটি বসিয়েছিল। দুর্গের নীচেই শহর ও বাজার, আর কয়েক মাইল দূরে তাশীলুম্পো হল এখানকার মূল গুম্ফা। লাহসায় যেমন পোটালা এখানে,তেমনি তাশীলুম্পো প্রাসাদ। এখানেই পাঞ্চেন লামা থাকেন। দলাই লামার গ্রীষ্মাবাসের মতন তাশীলুম্পোরও একটা গ্রীষ্মাবাস রয়েছে শহর থেকে বারো মাইল দূরে কুন-কিয়াপ্লিং-এ ।ওদের লক্ষ্য স্থির, তাই ভীষণ তাড়া,- খ্যাং তিসে ডাকছে! তাই বাজারের মধ্য দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে ওরা শহর পেরিয়ে যায়। পথের দু’পাশে যেখানে-সেখানে পশুপাখির বাজারে গাধা, চমরি গাই, ভেড়া ও মুরগি বিক্রি

হচ্ছে। ওরা বাজার থেকে বেশ কিছুদিন চলার উপযোগী রসদ কিনে নেয়। তারপর আবার শহর থেকে বেরিয়ে সাংপার তীর ধরে ঘােড়া চালিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। বাঁদিকে দুর্ভেদ্য হিমালয়ের গা ছুঁয়ে অপেক্ষাকৃত সমতল পথে এগোনোর চেষ্টা করতে থাকে। দুপুর গড়াতেই ওরা পৌঁছে যায়

একটি তেমাথায়। জায়গাটির নাম লাসাজোং। এখান থেকে বাঁদিকের পথটি গেছে নেপালের কাঠমাণ্ডুর দিকে। ডানদিকের পথটি ধরে এগিয়ে সাংপো পার হতে হয় ফেরি নৌকায় একজন একজন করে। এখন থেকে সাংপোর ডান ধার বরাবরই পথটা এগিয়ে গেছে। বাঁ ধারে খাড়া

পর্বতগাত্র। শীত এখানে খুবই শুকনো, রাতের ঠান্ডা কনকনে। ওরা পথের পাশে একটা ভাঙা বাড়িতে রাত কাটিয়ে আবার যাত্রা শুরু করে।

গরবের ব্যবহারে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ করছে দেচমা। যতদিন যাচ্ছে রাতের মিলনে সে যেন কেমন যান্ত্রিক ও দায়সারা। সে কি দীর্ঘ পথভ্রমণে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে? না হলে তার আকর্ষণ আর প্রতিরাতে নতুন নতুন আবিষ্কারের নেশা স্তিমিত হয়ে পড়বে কেন? পরদিন সন্ধ্যায়

ওরা পৌছয় লাকা গ্রামে। গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে একটা চোরতেন। এই অঞ্চলে বার্লি ও যবের চাষ খুব ভাল হয়। গ্রামের মানুষ ওদের গরম-গরম ৎসাম্পা খাইয়ে অতিথি সৎকার করে।

তারপর নিয়ে যায় মণ্ডপের মতন বাড়িতে। সেখানে ওরা জুতো খুলে, হাত্মুখ ধুয়ে একটু টানটান হয়। কিছুক্ষণ পর মেঘহীন পরিষ্কার আকাশে পঞ্চমীর বাকা চাঁদ উঠলে, একটি কাঠের উনুনে বিরাট হাঁড়ি বসিয়ে আগুন জ্বেলে, ওরা সবাই চারপাশে বিচুলি পেতে বসে সমবেত কণ্ঠে গান গাইতে শুরু করে। কী চমৎকার সুর! মাঝে দু’জন মহিলা উঠে গিয়ে হাঁড়ি থেকে পানীয় তুলে সবাইকে কাসার বাটিতে করে দিতে থাকেন। হালকা গরম এই বার্লির মদ প্রত্যেকের কণ্ঠে যেন আরও জোর এনে দেয়। মজা পেয়ে গরব, দেচমা, ৎসোণ্ডু ও গোরিং ওদের গানে গলা মেলায়। পানের

পর গান ক্রমে আরও জমে উঠলে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে ছন্দে ছন্দে পা ফেলে নাচতে শুরু করে। নাচতে নাচতে মেয়েরা হিহি করে হেসে উঠতে থাকে। নারী ও পুরুষেরা অবাধভাবে মিশে সৃষ্টি করছে এক অপূর্ব পরিবেশ। দুই মহিলা এগিয়ে এসে দেচমা ও গরবকে টেনে নাচের দলে ঢুকিয়ে দেয়। ৎসোণ্ডু আর গাোরিং মদের বাটিতে চুমুক দিয়ে স্থানীয়দের গানের ছন্দে পা ফেলে সর্দার ও দেচমার নাচ দেখে। নাচ আর সমবেত কণ্ঠের লয় দ্রুততর হলে মনে হয় স্বর্গ নেমে এসেছে। শেষে একসময় তারা থামলে সবাই একে একে টলতে টলতে বাড়ির পথ ধরে। মণ্ডপ ঘরে পড়ে থাকে এক শূন্য হাঁড়ি আর চার অভিযাত্রী। গরব আর দেচমাকে ওখানে রেখে ৎসোণ্ডু আর গোরিং একটু দূরে খাটানো তাঁবুতে ঢুকে পড়ে। পরস্পরের চোখে তাকিয়ে অর্থপূর্ণ হেসে ওঠে গরব আর দেচমা। বেশ কিছুদিন পর প্রবল আকর্ষণে দেচমাকে নিজের বুকে টেনে নেয় গরব। এই আশ্লেষে দেচমা আপ্লুত হয়ে পড়ে। তাঁর চোখে জল চলে আসে। তারপর দুজনেই দুই পাজা খড় হাতে নিয়ে তাদের তাঁবুতে গিয়ে ঢোকে। খড়ের উপর কম্বল বিছিয়ে ওরা আবার পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে থাকে। সেই রাতটা স্বপ্নের মতন কেটে যায়। পরদিন ভোরে সেই মধুর স্মৃতি নিয়ে ওরা তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে আবার ঘোড়ার পিঠে চাপে। সাংপোর এই উপত্যকায় চলার পথ বেশ ভাল। সাংপোর বাঁপাশে খাড়া পর্বতগাত্র। কিন্তু ডানপাশের পথ বেশ মসৃণ। নদীর উত্তর দিকের পাহাড়টা মাইলখানেক দূরে সরে গিয়েছে। গাছ- গাছড়া খুব একটা নেই। নদীর চড়া, ছোটোছোটো নুড়ি আর বালি। দিনের বেলা সূর্যের প্রখর আলো সেই বালিতে ঠিকরে পড়ে চোখ ধাধিয়ে দেয়। লোকবসতি নেই বললেই চলে। দুদিন পর পথের পাশে গেবুক নামে একটি গুম্ফা পেয়ে ওরা সেখানে রাত কাটায়। কিন্তু সেখানে সামান্য অসতর্ক হতেই ওদের কাঁধের চাদরগুলোকে ইঁদুরে কেটে কুচিকুচি করে। এই বড় আকারের পিকা ইদুরগুলি একেকটা খরগোশ আকারের। প্রার্থনা গদিটাও নানা জায়গায় কেটে এফোড়-ওফোড় করেছে। তবুও ঘর ও দেওয়ালের সজ্জা বেশ সুন্দর। তাংখা ও খোপের ওপর রাখা ভারী ভারী ধর্মগ্রন্থগুলি অব্দি অবশ্য পিকা ইদুররা পৌঁছতে পারেনি। দরজার উপরে

ঝোলানো কাঠের মুখোসটাও অক্ষত। পরদিন ভোরে আবার যাত্রা শুরু। সারাদিন প্রায় একভাবে ঘোড়া চালিয়ে ওরা পৌঁছয় সাকা গ্রামে । সেখানে রাত কাটিয়ে ঘোড়ায় চড়ার পর দু'দিন ওদের পথে কোনও গ্রাম পড়েনি। দ্বিতীয়দিন বিকেলে ওরা পৌঁছয় পাসাগুক গ্রামে। পাসাগুক বেশ বড় এবং বর্ধিষ্ণু গ্রাম। বড় হলেও বেশ শান্ত এই গ্রামটিতে হাজারখানেক মানুষের বাস। গ্রামে ঢুকতেই নজরে পড়ে একপাল চমরি গাই। কয়েকটি ছোটো ছেলেমেয়ে ওদের দেখে পথে বেরিয়ে আসে। চমরি গাইগুলি বিচুলির সঙ্গে লালা মিশিয়ে অলসভাবে চিবিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের মাঝামাঝি আসতেই ওদের চোখে পড়ে খুঁটির উপরে বাঁধা সারি সারি সাদা পতাকা। তারপরই অবাক হয়ে দেখে একটি গুম্ফা। সাধারণত গুম্ফার চূড়া গ্রামের মধ্যে থেকে মাথা উঁচু করে জেগে থাকে বলে দূর থেকে দেখা যায়। কিন্তু এই মাঝারি গোছের গুম্ফার চুড়াটা তেমন উঁচু নয় বলে দূর থেকে দেখা যায়নি।

গুম্ফার সামনে ঘোড়া থামিয়ে দেওয়ালের চারিদিকে ঘুরে মণি-চক্র ঘুরিয়ে গুম্ফার ভেতরে ঢুকতেই চোখে অন্ধকার ঠেকে। ওদের চোখ অন্ধকারে অভ্যস্ত হলে সামনে নজরে পড়ে বুদ্ধের মুর্তি। নীচের বেদিতে সারি সারি বাটিতে জল। বাটির উপর চাল আর বিরাট ঘিয়ের প্রদীপ।

ওরা সবাই অল্প করে প্রসাদি চাল চিবিয়ে গুম্ফার রান্নাঘরটা খুঁজে বের করে। তারপর আগুন ধরিয়ে নিজেদের খাবার বানিয়ে খেয়ে ওরা ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন পাসাগুক ছেড়ে সামান্য এগোতেই চড়াই শুরু। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই ডানদিক থেকে একটা খরস্রোতা এসে সাংপোতে মিশেছে। এখানে নদী পারাপারের কোনও ব্যবস্থা নেই দেখে ওরা ডানদিকে ওই নাম না জানা খরস্রোতার উৎসের পথে চড়াই চড়তে থাকে। প্রায় ঘণ্টাখানেক অশ্বারোহণের পর খরস্রোতার জলের গভীরতা কম পেয়ে ওরা সাবধানে নদী পার হয়ে আবার খচ্চর ও ঘোড়াগুলির পা মুছে দেয়।

তারপর আবার দক্ষিণমুখী ঘণ্টাখানেক ঘোড়া চালিয়ে সাংপোর ধারে ফিরে আসা। প্রত্যেকেরই বেশ খিদে পেয়েছে। ওরা একজায়গায় বসে সেই দিংবো গ্রামের ভদ্রলোকের উপহার দেওয়া ঝোলাটি বের করে। যবের লাড্ডুগুলি খায়। ভাগ্যিস, ওরা খাবারের থলেগুলি ঘোড়ার পিঠ থেকে নামায় নি। নাহলে গেবুকের পিকা ইদুরেরা আগেই সব সাবড়ে দিত! চারপাশে কোথাও গাছগাছড়া এমনকী এক চিলতে শুকনো ঘাসও নেই যে তা জ্বালিয়ে আগুন ধরানো যাবে! এ চির তুষারের এলাকায় বুঝি কোনওদিন ঘাস জন্মায় না! তাহলে পথচারী কী করবে? মহাতীর্থের অনন্ত পথ সত্যি কঠিন, কিন্তু ওরা নিশ্চিত যে এ পথ শেষ হবেই—এই সাংপোর উৎসেই পাবে পবিত্র মাকাম ৎসো হ্রদ আর তারপর পবিত্র খ্যাং তিসে। বিকেলে একটা

ছোট্ট গ্রাম পেল, কিন্তু সেই গ্রামে কোনও মানুষ নেই। গ্রাম খালি করে আট-দশটি বাড়ির প্রত্যেকেই কোথাও কাজে বা তীর্থে গেছে হয়তো।একটি বড় বাড়িতে দুটো ঘরে বিচুলির বিছানা পেয়ে ওরা তাদেরই রান্নাঘরে কাঠ জ্বেলে ৎসাম্পা বানিয়ে খায়। গোয়ালে একটি চমরি গাই খুঁটিতে বাঁধা। দেচমা সেই চমরির দুধ দোয়ায়, গরম করে। ৎসাম্পার সঙ্গে প্রত্যেকেই গরম দুধ খেয়ে ওই দুই ঘরে বিচুলির বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে ওরা গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে আসার আগে পর্যন্ত গ্রামের কেউ ফিরে আসেনি। ওরা হাতজোড় করে তথাগতের কাছে ওই বাড়ির মালিক ও প্রত্যেক গ্রামবাসীর মঙ্গলকামনা করে নিজেদের পথে এগিয়ে যায় ।


চলবে...