বুধবার, জুলাই ৮, ২০২০

মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শঙ্করদেব, কোচবিহারের মহারাজা নরনারায়ণ ও মধুপুর সত্র

মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শঙ্করদেব, কোচবিহারের মহারাজা নরনারায়ণ ও মধুপুর সত্র

কুমার অজিত দত্ত


মহাপুরুষ শঙ্করদেব তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যদের সঙ্গে নিয়ে সুদূর তীর্থ-ভ্রমণ সেরে একদিন প্রবেশ করলেন কোচবিহার রাজ্যের একটি নির্জন স্থানে । সঙ্গে ছিলেন তাঁর প্রধান শিষ্য মাধবদেবসহ নারায়ণ দাস,গোকুলচাঁদ প্রমুখ শিষ্যরা। মতান্তরে জানা যায় সঙ্গে শঙ্করদেবের বড় ছেলে রামানন্দও ছিলেন। পথ-ক্লান্তিতে সবাই জেরবার। শঙ্করদেব বললেন এই নির্জন সুশীতল স্থানে একটু জিরিয়ে নিলে কেমন হয় বৎসরা ? শিষ্য-প্রশিষ্যরা সম্মত হয়ে বলে ওঠে,হ্যাঁ, তাই হোক গুরুদেব।কাছেই ছিল একটি পাকুড় গাছ। সেটার নীচে বিস্তৃত ছায়ায় কয়েকদিন বিশ্রাম করবেন বলে স্থির করলেন শঙ্করদেব।এই নির্জন মোহময় পরিবেশে মন ভরে ভাগবত সাধনাও করা যাবে , করা যাবে ভাগবত পাঠও।

শঙ্করদেব তাঁর শিষ্যদের সহযোগিতায় ওই পাকুড় গাছের নীচে কিছুদিনের মধ্যে স্থাপন করে ফেললেন ভগবান বিষ্ণুর ছোটোখাটো একটা বেদী। ওই বেদীর চারপাশ ঘিরে শিষ্য-প্রশিষ্যদের নিয়ে তিনি বসলেন ভাগবত সাধনায়। সমবেত শিষ্যবৃন্দকে শোনাতে লাগলেন ভাগবত-তত্ত্বের নানাবিধ ব্যাখ্যা। সকাল-সন্ধ্যে চলতে থাকে এই ভাগবত-কর্ম আর হরিকীর্তন ।এরই মধ্যে একদিন শঙ্করদেবের মুখ-নিঃসৃত এই মধুমাখা হরিকীর্তনে আচ্ছন্ন হতে হতে শিষ্যরা দেখতে পেল একটি আশ্চর্য ঘটনা! যে-পাকুড় গাছটির নীচে বসে তাঁরা হরিকীর্তনে মগ্ন ছিলেন সেই গাছটিতে ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ আকারের মধুঠাসা মৌমাছির চাক।সেখান থেকে টপ টপ করে পড়তে শুরু করেছে মধুরস। এই দৃশ্য দেখে শিষ্যরা সবাই জয় গুরুদেবের জয়, জয় শ্রীবিষ্ণুর জয় বলে জয়ধ্বনি দিতে থাকে। প্রধান শিষ্য মাধবদেব বলে উঠলেন , ‘কী মধুময় স্থান! একদিকে গাছ থেকে পড়ছে সত্যিকারের মধুরস,অন্যদিকে গুরুদেবের মুখ দিয়ে নিঃসৃত হচ্ছে ভাগবত মধুরস।আবার স্থানটিও ভক্তবৃন্দের পায়ের ধুলোয় মধুমাখা , আজ থেকে স্থানটির নাম মধুপুর দিলে কেমন হয় গুরুদেব’? মহাপুরুষ শঙ্করদেব মাথা নত করে সম্মতি দিলেন আর ম্রিয়মাণ হাসতে লাগলেন।

এরপর থেকে হরিনাম আর ভাগবত সাধনায় সবাই এমনই মগ্ন হয়ে পড়লেন যে ওঁদের কাছে দিন-রাত-সপ্তাহ-মাস সব যেন একাকার হয়ে গেল।এবং অনতিবিলম্বে স্থানটি একটি পূজাস্থলের রূপ নিয়ে নিল। খবরও পৌঁছে গেল আশপাশের গ্রামগুলিতে।রটে গেল শঙ্করদেব নামে একজন ত্রিকালদর্শী মহাপুরুষ এসেছেন রাজ্যের এই প্রান্তে ওই পাকুড় গাছের নীচে।তিনি মহা শক্তিধর। প্রথম প্রথম একজন দুজন করে গ্রামবাসীরা আসতে শুরু করে কৌতূহলী চোখ নিয়ে। এরপর ক্রমশ সংখ্যায় বাড়তে থাকে। এবং একদিন দলে দলে আসা শুরু করে।শঙ্করদেবের ঈশ্বর সদৃশ সৌম্য রূপ দেখে ওরা সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করতে থাকে।তাঁর মুখ নিঃসৃত হরিনামে প্রভাবিত হয়ে ওরা ওই পূজাস্থলের পরিচর্যায় আত্মনিয়োগ করা শুরু করে। পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলি থেকে আসা শুরু করে ফলমূল,দুধ ইত্যাদি উপচার। গ্রামের যুবকেরা বানিয়ে দেয় বাঁশের ছাউনি।এ-ভাবেই, আশপাশের গ্রামগুলির সবাই হয়ে যায় একদিন শঙ্করদেবের ভক্ত। ওরাও সকাল-সন্ধ্যে এখানে এসে গায় হরিনাম। এবং আস্তে আস্তে সবার মনের অগোচরেই সারা কোচবিহারে ছড়িয়ে পড়তে থাকে শঙ্করদেব প্রচারিত বৈষ্ণব ধর্ম অর্থাৎ প্রেম বা ভক্তি ধর্মের অমর বাণী । পরিশেষে একদিন পৌঁছে যায় কোচরাজারভাই শুক্লধ্বজ অর্থাৎ চিলারায়ের কানেও। তিনি নিজে শাক্ত হয়েও, কোন জাদুবলে যেন শঙ্করদেব প্রবর্তিত বৈষ্ণব ধর্মে অনুপ্রাণিত হতে শুরু করলেন।

কোচবিহার শাসনে ছিলেন তখন প্রবল প্রতাপশালী রাজা নরনারায়ণ।তিনিও ছিলেন গোঁড়া শাক্ত। আমরা জানি নরনারায়ণের পিতা শাক্তবিশ্বাসী বিশ্বসিংহই প্রথম নির্মাণ করিয়ে দিয়েছিলেন বর্তমানের কামাখ্যা মন্দিরটি।এবং পরবর্তীতে প্রাকৃতিক প্রলয়ে মন্দিরটি ধ্বংস হয়ে গেলে নতুন করে সংস্কার করে দেন তাঁর পুত্র এই রাজা নরনারায়ণ। তো, রাজা বিশ্বসিংহের আমল থেকেই কোচবিহারে শাক্তধর্মের বহুল প্রচলন ছিল। জীবন-যাপনে প্রজারা দেবীপূজাতেই নির্ভরশীল ছিল বেশি। রাজা নরনারায়ণের শাসনকালে এসে সেটা আরও নিবিড় হতে থাকল।আর বাড়তে থাকল ব্রাহ্মণদের দৌরাত্ম্যও।

এই ব্রাহ্মণদেরই টনক নড়ে গেল একদিন, যখন ওরা জানতে পারল মধুপুরে শঙ্করদেব ও তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যরা ভালো মতোই গেড়ে বসেছেন। এবং তাঁর প্রবর্তিত ভক্তি বা প্রেম ধর্ম কোচবিহারের প্রজাদের মধ্যে সুগন্ধি ঘ্রাণের মতো ধীরে ধীরেযাচ্ছে ছড়িয়ে। শঙ্করদেবের মনীষা, বিদ্য্যাবত্তা আর ধীশক্তি এতোই প্রবল ছিল যে ওইসব ব্রাহ্মণরা তাঁর ধার ঘেঁষতে সাহস পায়নি। তাই ওরা রাজা নরনারায়ণের কান ভারী করতে থাকে এই বলে, ‘মহারাজ, শঙ্করদেব আপনার সাম্রাজ্যে দেবীপূজা বন্ধ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে’। এই কথা শুনে রাজা ক্ষোভে ফেটে পড়লেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ‘গড়মলি’দের(অনুচরদের) আদেশ দিলেন শঙ্করদেব আর মাধবদেবকে ধরে এনে হত্যা করতে।এই সংবাদটি প্রথমে শঙ্করপুত্র রামানন্দের কানে গেলে সে দ্রুত চিলারায়কে জানায়। চিলারায় সদলবলে মধুপুর গিয়ে শঙ্করদেবকে নিয়ে অন্তর্হিত করে রাখেন নিজের আশ্রয়ে।(শঙ্করদেবের সঙ্গে চিলারায়ের একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। চিলারায় বিয়ে করেছিলেন শঙ্করদেবের এক ভাইয়ের মেয়ের কন্যাকে।) শঙ্করদেবের পরামর্শে মাধবদেবকে লুকিয়ে রাখেন পাশের কোনও এক গ্রামে। কারণ শঙ্করদেবের অনুপস্থিতিতেমধুপুর পূজাস্থলে বৈষ্ণব সাধনা চালিয়ে যেতে হবে তো মাধবদেবকেই।

রাজার গড়মলিরা মধুপুর এসে শঙ্করদেবকে না পেয়ে ভক্ত নারায়ণ দাস আর গোকুলচাঁদকেই জোর করে ধরে নিয়ে গেল।শঙ্করদেব-মাধবদেব কোথায় লুকিয়ে আছে এ-তথ্যটি বের করার জন্য গড়মলিরা ওদের ওপর অত্যাচার চালাতে থাকে।কিন্তু নারায়ণ দাস-গোকুলচাঁদের মুখ খুলতে পারল না ওরা।অনন্যোপায় হয়ে রাজা অবশেষে কড়া শাস্তির জন্য ওদের তুলে দেন ভুটিয়াদের হাতে ।ভুটিয়ারাও সফল হল না । এদিকে শঙ্করদেব চিলারায়ের শরণে থেকে লিখে ফেললেন ‘সীতাস্বয়ম্বর’ ভাওনা(একাঙ্ক নাটক)।দীর্ঘ কাপড়ের ওপর কৃষ্ণলীলার চিত্র এঁকে সেটি তিনি উপহার দিলেন চিলারায়কে।

কেটে যায় মাসাধিক কাল। এরই মধ্যে গুপ্তচরের মাধ্যমে একদিন রাজা খবর পেয়ে গেলেন যে, শঙ্করদেব তাঁরই ভাই চিলারায়ের হেফাজতে আত্মগোপন করে রয়েছেন। রাজা সঙ্গে সঙ্গে অনুচর দিয়ে ভাইয়ের কাছে হুকুম পাঠালেন এই বলে যে,সে যেন শঙ্করদেবকে নিয়ে দ্রুত হাজির হয়ে যায় রাজসভায়।চিলারায় পড়লেন দোটানায়। তিনি শঙ্করদেবকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘আপনি যদি ব্রাহ্মণদের হাত থেকে নিজেকে বিপদমুক্ত করতে পারেন তবেই আমি আপনাকে রাজার কোপানল থেকে রক্ষা করতে পারব’।জবাবে শঙ্করদেব বলনেন,’ব্রাহ্মণদের প্রতি ভয় আমার বিন্দুমাত্র নেই,রাজা অন্যায় করবেন ভেবেই তো আমি আপনার শরণাপন্ন হয়েছি’।অবশেষে চিলারায় রাজ-আজ্ঞা মেনে নিয়ে শঙ্করদেবকে রাজসভায় নিয়ে গেলেন।

রাজা নরনারায়ণ একদিকে যেমন ছিলেন প্রবল পরাক্রমশালী রাজা অন্যদিকে ছিলেন মহা পণ্ডিতও। বিদ্বানব্যক্তির যথোচিত সম্মান দিতে জানতেন। তাঁর রাজসভা পণ্ডিত ও শাস্ত্রজ্ঞমণ্ডলীতে ভরা ছিল। শঙ্করদেব যখন সভাগৃহে প্রবেশ করলেন তাঁর শান্ত ও সৌম্যকান্তি চেহারা দেখেই রাজা নরনারায়ণ মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি সিংহাসন ছেড়ে নেমে এসে শঙ্করদেবকে ‘চৌরাঘর’-এ( বিশিষ্ট অতিথিদের বসবার বিশেষ জায়গা) আমন্ত্রণ জানালেন। ‘চৌরাঘর’টি ছিল একটু উপরের দিকে,বেশ কয়েকটি ধাপ ডিঙিয়ে উঠতে হয়। রাজা অবাক হয়ে দেখলেন ও শুনলেন যে,শঙ্করদেব একেকটি ধাপ ডিঙোচ্ছেন আর সুন্দর সুললিত কণ্ঠে আওড়াচ্ছেন রাজ-মাহাত্ম্য বিষয়ক শ্লোক।এবং ‘চৌরাঘর’-এ পৌঁছে রাজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে ‘মধুদানব দারণ দেব্বরং’ এই স্তবটি তোটকচ্ছন্দে আবৃত্তি করলেন। রাজা শঙ্করদেবের এই বিপুল শাস্ত্রজ্ঞানে অভিভূত হয়ে পড়লেন। তাঁকে সসম্মানে আহ্বান জানিয়ে বসালেন কম্বলের আসনে।আপ্যায়ন করলেন আহারে।তারপর তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতাতেই দিনটি কাটিয়ে দিলেন।সভাশেষে আগামীকাল শঙ্করদেবকে আবার আসার জন্য বিনম্র অনুরোধ জানালেন।

পরদিন রাজা তাঁর সভা-চৌহদ্দিতে বিচারসভা ডাকলেন। দেখতে চাইলেন তাঁর সভা অলঙ্কৃত করা পণ্ডিত ব্রাহ্মণরা শাস্ত্রজ্ঞান ও তর্কযুদ্ধে শঙ্করদেবকে হারিয়ে,ওরা এ-রাজ্যে বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারের অপরাধে শঙ্করদেবকে যে-দণ্ড দিতে চাইছে, সেটা দিতে পারে কিনা? শঙ্করদেব যথাসময়ে এসে উপস্থিত হলেন।রাজা তাঁকে সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়ে বসালেন নির্দিষ্ট একটি বিশেষ আসনে। তারপর সবার উদ্দেশ্যে এই প্রশ্নটি নিবেদন করলেন, ‘পুরাণের সংখ্যা কতো’? জবাবে সভার পণ্ডিতরা জানালেন, ‘পুরাণের সংখ্যা হচ্ছে আঠেরো’। কিন্তু শঙ্করদেব বললেন অন্যরকম, ‘আঠেরো হাজার’। সঙ্গে সঙ্গে তিনি কয়েক হাজার নাম গর-গর করে বলে দিলেন। সভাপণ্ডিতরা কেউই আর শঙ্করদেবের সঙ্গে পেরে উঠল না । রাজা খুব খুশি হয়ে শঙ্করদেবকে অনুরোধ করলেন এই বলে, ‘মহাশয়, আমি নির্বাচিত কয়েকটি শব্দ উল্লেখ করব আপনি সেই শব্দগুলি একত্র করে যে-কটি পারেন অর্থযুক্ত শ্লোকনির্মাণ করে দিন দয়া করে।আমি নিজে এই শব্দগুলি দিয়ে আটটি শ্লোক রচনা করতে পারি’। বলতে বলতে তিনি শব্দগুলি উল্লেখ করলেন। শঙ্করদেব সঙ্গে সঙ্গে ওই শব্দগুলি দিয়ে সাতটি শ্লোক নির্মাণ করে সেগুলির অর্থ ও বিস্তৃত ব্যাখ্যাও করে দিলেন। রাজা প্রীত ও বিস্ময়াভিভুত হয়ে বলে উঠলেন, ‘আমি তো এইসব অর্থ আর ব্যাখ্যা কখনো কল্পনাও করিনি! যা হো্‌ক, আরও বলুন থামলেন কেন!’ শঙ্করদেব জবাব দিলেন, ‘না, আমি এর বেশি আর পারব না, এটুকু যে করলাম তা একমাত্র আপনি আদেশে করলেন বলেই সম্ভব হল’। বলতে বলতে তিনি অস্ফুট হাসতে থাকেন।রাজা শঙ্করদেবের মনোভাব বুঝতে পারলেন। তিনি তাঁর সম্মানার্থেই সাত অতিক্রম করতে চাইছেন না। শঙ্করদেবের এই মহানুভবতায় রাজা অত্যন্ত তৃপ্ত হলেন।এবং সেদিন থেকে মনস্থ করলেন,শঙ্করদেবের সব সুখে-দুঃখে তিনি পাশে থাকবেন।

পরদিন বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ পশ্চিম দেশীয় এক স্বঘোষিত ব্রাহ্মণ পণ্ডিত তার চ্যালা-চামুণ্ডাদের নিয়েএসে হাজির হয় রাজা নরনারায়ণের রাজসভায়।এসেই সে ঘোষণা করে যে, সে নাকি ইতিমধ্যে পাণ্ডিত্যের জোরে অনেক দেশেররাজসভা জয় করে ফেলেছেন এবং কোচবিহারে এসেছেন সেই উদ্দেশ্য নিয়েই। রাজা নরনারায়ণ শঙ্করদেবকে দায়িত্ব দেন ওই পণ্ডিতম্মন্য ব্রাহ্মণের সঙ্গে তর্ক-যুদ্ধে উত্তীর্ণ হতে।শঙ্করদেব রাজার আদেশ মাথা পেতে নিয়ে ব্রাহ্মণের সঙ্গে প্রবৃত্ত হন তর্কযুদ্ধে। ভাগবত-বেদ,কুল-ধর্ম-বর্ণ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে পরতে পরতে তর্কযুদ্ধ এগিয়ে চলল...।প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্রাহ্মণের মুখে চুনকালি পড়ল,ওর সব অহংকার চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।শঙ্করদেব প্রমাণ করলেন ভাগবত শুধু ব্রাহ্মণদের নয়। ভাগবত সবার।ব্রাহ্মণ ভাগবত পড়লে ব্রহ্মত্ব লাভ হয়,ক্ষত্রিয় পড়লে তাঁর রাজ্য সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, বৈশ্য পড়লে ধন-সম্পত্তি বৃদ্ধি পায় আর শূদ্র পড়লে সব পাপ থেকে মুক্ত হয়। এক সময় বাঁচার আর কোনও পথ না পেয়ে পশ্চিমী ব্রাহ্মণ দলবল নিয়ে মাথা নিচু করে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।শঙ্করদেবের এই মনস্বিতা দেখে রাজা তাঁকে প্রতিদিন রাজসভায় হাজির হওয়ার আবেদন জানালেন।শঙ্করদেব বললেন, মহারাজ আপনার রাজ্যে কোনও বিষ্ণুর মন্দির নেই কীভাবে আপনার সভাসদ হই বলুন তো ?কী ভাবেই বা আপনার রাজ্যের অন্নজল গ্রহণ করি? শঙ্করদেবের এই কথা শুনে রাজা নরনারায়ণ সেই মুহূর্তে মন্ত্রীকে ডেকে আদেশ দিলেন একটি অষ্টধাতুর বিষ্ণুর মূর্তি বানিয়ে মন্দির নির্মাণ করিয়ে দিতে।এবং শঙ্করদেবের ইচ্ছা অনুযায়ী এই আদেশও দিলেন মধুপুরের পূজাস্থলে একটি সত্র নির্মাণের,যাতে সেখানে শঙ্করদেবের একশরণ বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত ভক্তজনেরা আশ্রয় নিয়েঈশ্বর-সাধনায় নিমগ্ন হতে পারে।মন্ত্রী রাজার আদেশ শিরোধার্য করেরাজ্যের সেরা ভাস্কর ও বাস্তুশিল্পীদেরনিয়োগ করলেন এ মহৎ কাজে।

শঙ্করবদেব চলে এলেন আবার তাঁর প্রাণের মধুপুর পূজাস্থলে ।শুরু করলেন ভাগবত-সংকীর্তন।দলে দলে কোচ রাজ্যের দিগবিদিক থেকে নতুন নতুন ভক্তরা বহু সংখ্যায় আসা শুরু করল আবার।মধুপুর পূজাস্থলের কথা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকল।কোচ রাজ্যে বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারে আর বাধা রইল না।শঙ্করদেব মাঝে মাঝে চলে যেতেন তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়িতে কাগজকুটা গ্রামে।সেখানেও তিনি হরিনাম প্রচার করতে শুরু করলেন। কিছুদিনের মধ্যে ওই গ্রামটিও খ্যাত হয়ে উঠল।

এদিকে রাজ্যে শঙ্করীয় বৈষ্ণব ধর্মের এত ছয়লাপ আর রাজসভায় শঙ্করদেবের এত সমাদর দেখে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের অন্তরাত্মা হিংসায় জ্বলে উঠল। ওরা সততই চেষ্টা করতে লাগলো শঙ্করদেবকে কীভাবে বিপাকে ফেলা যায়,কী ভাবে বিভিন্নভাবে ক্ষতিসাধন করা যায়।বিষয়টা একদিন রাজার কানে পৌঁছে গেল, চোখেও পড়ল। ওই পণ্ডিতদের শায়েস্তা করার জন্য রাজা তাঁদের নির্দেশ দিলেন একদিনের মধ্যে ভাগবতের একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করে দিতে।ওরা পারল না একদিনের মধ্যে কাজটি করে দিতে।রাজার কাছে অনুনয়-বিনয় করে বলল , কাজটা করে দিতে তাঁদের আট থেকে দশ দিন লাগবে। রাজা সঙ্গে সঙ্গে শঙ্করদেবকে অনুরোধ করলেন । শঙ্করদেব সারসংক্ষেপটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে করে দিলেন।এবং পুস্তকটির নাম দিলেন ‘গুণমালা’। পুস্তকটি শঙ্করদেব সপারিষদ রাজাকে পাঠ করে শোনালেন। রাজা অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে শঙ্করদেবকে স্বর্ণালঙ্কারে পুরস্কৃত করলেন আর ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের করলেন তিরস্কার।

কিন্তু শঠ ব্রাহ্মণরা তখনও শঙ্করদেবকে হেনস্থা করা থেকে বিরত থাকল না। নানান ভাবে ওরা তাঁকে পথে-ঘাটে ঠাট্টা-টিটকারি করতে থাকল। একদিন ওরা শয়তানি করে এক পাত্র রান্না করা মাংস কাপড় দিয়ে ঢেকে চুপিচুপি রেখে এলো শঙ্করদেবের কাগজকুটার বাড়িতে।তারপর রাজার কাছে এসে নালিশ জানাল যে, সবাই বলে শঙ্করদেব বৈষ্ণব কিন্তু সে দেখছি বাড়িতে বসে বসে পশুর মাংস খাচ্ছে।তাও আবার দেবতাকে উৎসর্গ না করেই। রাজা এদের বিশ্বাস করলেন না। তথাপিও এদের কথাটা কতটুকু সত্য সেটা যাচাই করার জন্য তিনি এইসব ব্রাহ্মণদের সঙ্গে কয়েকজন রাজ-কর্মচারীকে পাঠিয়ে দিলেন শঙ্করদেবকে ডেকে আনার জন্য।ওরা ওই মাংসের পাত্রসহ শঙ্করদেবকে নিয়ে আসে রাজসভায় ।কিন্তু রাজার আদেশে যখন পাত্রের আচ্ছাদন খোলা হয় দেখা গেল সেখানে মাংসের বদলে রয়েছে চিনি,কলা,মধু,দুধ,সাগু ইত্যাদি! এই দৃশ্য দেখে ওইসব শঠ ব্রাহ্মণরা গলবস্ত্র হয়ে তাঁর কাছে আনত হয়ে ক্ষমা চাইল,তাদের দোষ স্বীকার করল। এবং চতুর্দিকে ঘোষণা করল যে, শঙ্করদেব মানুষ নন, দেবতা। রাজা শঙ্করদেবকে বিপুল উপঢৌকনসহ করজোড়ে সম্মানিত করলেন এবং তাঁর কাছে আন্তরিক ভাবে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন বিষ্ণু-মন্ত্রে দীক্ষা নেওয়ার। কিন্তু শঙ্করদেব সম্মত হলেন না । তিনি দীক্ষাদানে বেশ কয়েকটি কঠোর নীতি অনুসরণ করে থাকেন। ওই নীতিগুলির অন্যতম হল : তিনি রাজা, ব্রাহ্মণ ও মহিলাদের দীক্ষা দেন না ।রাজা মেনে নিলেন শঙ্করদেবের ওই নীতি। তবে ক্রমে ক্রমে উত্তরকালে রাজা ও তাঁর ভাই চিলারায় শঙ্করদেবের একজন বড় ভক্ত হয়ে উঠলেন। শঙ্করদেব নির্বিবাদে কখনও মধুপুর পূজাস্থলে কখনো কাগজকুট গ্রামের বাড়িতে থেকে নিজ ধর্মতত্ত্ব প্রচারে মগ্ন হয়ে পড়লেন।

এদিকে অষ্টধাতুর বিষ্ণুমূর্তি ও প্রস্তর নির্মিত মন্দিরটি যথাসময়ে যথার্থ ভাবে রূপায়িত হয়ে উঠল। রাজা নরনারায়ণ এ-বার্তায় প্রীত হয়ে শঙ্করদেব ও সভার জ্যোতিষ-পণ্ডিতদের পরামর্শে স্থির করলেন যে, মাঘ মাসের উত্তরায়ণ সংক্রান্তির পূর্ণিমা তিথিতে মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে মন্দিরের দ্বার উদ্ঘাটন করবেন।সেই দিনটি সমাগত হলে রাজা শঙ্করদেবকে অনুরোধ করলেন যেন পুরো পুজোর অনুষ্ঠানটি তিনি নিজে পৌরোহিত্য করেন।শঙ্করদেব নম্র সুরে বললেন, ‘না মহারাজ, আপনার পুরোহিত দিয়েই কাজটি সুসম্পন্ন হোক, আমার সঙ্গে ব্রাহ্মণ যারা আছেন তাঁরাই দেখাশোনা করবেন’।রাজা বুঝলেন, শঙ্করদেব নিজে ব্রাহ্মণ নন বলে সম্মত হচ্ছেন না।তবে মূর্তিটির নাম শঙ্করদেবইরাখেন--- বংশীধর বা মদনমোহন। অনুষ্ঠান শেষে মন্দিরটির নামকরণ হয়--- মদনমোহন মন্দির।

কয়েকদিন পর মধুপুরের সত্রটিও সেজে ওঠে। মহাপুরুষ শঙ্করদেবের পরামর্শে রাজা নরনারায়ণের পৃষ্ঠপোষকতায় সত্রের গর্ভগৃহে স্থাপিত হয় মণিকুট সিংহাসন।সারাদিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় শঙ্করদেব রচিত নাম-কীর্তন। তারপর রাজা সত্রটি সমঝে দেন শঙ্করদেবের হাতে।শঙ্করদেব সেখানে বেশ কিছুদিন বৈষ্ণবযাপন করার পরপ্রধান শিষ্যমাধবদেবের কাঁধে সত্রের সব দায়িত্ব অর্পণ করে চলে যান কাগজকুটা গ্রামে। জন্মভুমি ও কর্মভূমি আহোম রাজ্যে আর ফিরে গেলেন না।জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত ওই কাগজকুটা গ্রামেই তিনি নাম-কীর্তন করে আনন্দে কাটিয়ে গেছেন।তবে কাছের শিষ্য মাধবদেব ও নারায়ণ দাসকে আহোম ও হেড়ম্ব রাজ্যে নিয়মিত পাঠিয়েছিলেন তাঁর একশরণ বৈষ্ণব ধর্মের প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন করার জন্য। মাধবদেবও তাঁর শেষ জীবন কাটিয়ে গেছেন মধুপুর সত্রেই।

তথ্যসাথি :

১.উমেশচন্দ্র দে প্রণীত গ্রন্থ : ‘শঙ্করদেব’(সম্পাদনা— বাণীপ্রসন্ন মিশ্র)।প্রকাশক : বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি সমাজ,গুয়াহাটি ।

২. ভগবতীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত গ্রন্থ : ‘কোচবিহারের ইতিহাস’(সম্পাদনা— ডঃ নৃপেন্দ্রনাথ পাল)। প্রকাশক : অণিমা প্রকাশনী,কলকাতা-৯।

৩. আন্তর্জাল ও কিছু জনশ্রুতি।