শনিবার, নভেম্বর ১৬, ২০১৯

ভারতবর্ষ,পর্ব -৭

সাত

সকালে বেরোলাম ঐ ঝড়ঝাপ্টা নিযেই। একটু বেলা করেই বেরিয়েছি। আমরা নাগরকযেল এর রাস্তা ধরে কোভলম বীচ যাবো। সেখানে রাত্রি বাস। পথে, রাস্তা থেকে একটু বেরিয়ে দেখে যাবোপদ্মনাভপুরম প্যালেস। এখনো সাইক্লোন তটে ঝাঁপিয়ে নামে নি। এবার তো আমরা পূর্বউপকূল থেকেও বেরিয়ে এলাম। কোভলম পশ্চিমউপকূলে । কন্যাকুমারীতে রাস্তার দোকানীরা ফুটপাতে বসে নানান পশরা নিয়ে বেচতে চায সমুদ্রের থেকে তোলা শামুক, শঙ্খ, ঝিনুক, মুক্তো রংএর নটিলাস, তিন সমুদ্রের বালি। কিনতে আসে তীর্থযাত্রী, ট্যুরিস্ট। অনেকবার এসে দেখেছি বাজার এখানে জমে না। ভুল হযতো। চোখের ভুল, মনের ভুল। হযত। আমি একবার কিনেছিলাম একটা কোরালের টুকরো, শুকনো গাছের ডালের মতো। যথেষ্ট বড়ো তুলে আনার জন্য। বিক্রেতা বলেছিল তুতিকুড়ির কোরাল। একবার তুতিকুড়ি গেছি তখনো নতুন পোর্টের নির্মাণ চলছে।

  • নির্মানাধীন পোর্টের থেকে বেরিয়ে আমরা সমুদ্রের কিনারে এলাম। বীচ নেই এর মতো। বীচ এ নেমে সমুদ্রের জল ছুঁতে গেছি পাকদণ্ডির দুধারে স্তূপ করে রাখা কোরালদের ভাঙা ঘরবাড়ি।নতুন হারবার গড়ছে সমুদ্রের ভেতরে। সেখানে নিশ্চয়ই কোরালের কলোনী ছিল, কোরাল রীফ। এই কোরালকে প্রবাল বলতে বাধে। প্রবাল শব্দটিকে বেশি কাব্যিক ও অলঙ্কৃতও মনে হয, মণিমুক্তো যেমন। কোরাল এক ধরণের কীট যা সমুদ্রের তলায় জন্মায় এবং তাদের শরীর জমে জমেই হাড়গোড়ের চেহারা নেয ততক্ষণে অবশ্য তা ফসিল হয়ে গেছে। কোরাল ঐভাবেই বাড়ে। কোরালরা নিজেদের পরিবেশ সম্পর্কে অত্যন্ত সংবেদনশীল। জলের তাপ কিম্বা গভীরতার হেরফের হলে তারা নিজের নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে না। তাদের বসবাসের সেখানেই ইতি।


আরেকবার কিনেছিলাম বড়ো সাইজের একজোড়া ঝিনুক। বিশাল। আড়াআড়ি মাপলে দেড় ফুট। অনেক ভারি। তুলে নেওয়ার পর বুঝলাম বিরল একটা কেনাকাটা হয়েছে। বস্তুটা একটা ফসিল। সম্ভবত তুতিকুড়ির কোরালের ধ্বংসস্তূপ থেকেই বেরিয়ে আসা। আমার কন্যাকুমারিকার ফুটপাথ বাজারে কেনাকাটার ভেতরে আরেকটা অকিঞ্চিত্কর কেনা হয়ে ছিল একটা মাটির হাঁড়ি। সেটা অন্য বারের যাত্রায়। সম্ভবত এই কেনার দুটো কারণ ছিল।হাঁড়ির গডনটি ছিল ফুলদানির মত সাইজে বেশ বড়ো। সাদামাটা আর টেরাকোটার রংটা ছিল অভিজাত যেন বা পাঁচমুড়ার। হাঁড়িটা এতবছর হযে গেল এখনো আছে।

কেরলের রাজকুল ধর্মও সংস্কৃতিতে নিষ্ঠ ছিলেনযে কারণে এখানের প্রকৃতি, পরিবেশ, চাষবাস, খাদ্য আচরণ, স্থাপত্য সবকিছুতেই একটা নিজস্বতা। কেরলের ভৌগলিক বিস্তারে দেখা যাবে এই নিজস্বতারই প্রতিফলন। পুরো রাজত্বটিতে অল্প জমিও এমন নেই যেখানে চাষ আবাদ হয না কিন্তুউত্পাদনগুলি বিবিধ ও মহার্ঘ। নানাবিধ মশলা সহ এখানের পাহাড়ি সরু কাটাছেঁড়া জমিতে হয ধানচাষ।

বিভিন্ন ধরণের শস্য - না গম নয, সিরিয়াল ও ডাল যেগুলির কয়েকটি শুকনো জমিতেও জন্মায়। কাঠের শিল্পকলার জন্য কেরল বিখ্যাত। আরেকটা খ্যাতি আছে কেরলের সেটা এখানের নিজস্ব স্থাপত্য। কেরলের বাস্তুশাস্ত্র নিযে সারা দেশেরই শুধু নয, বিশ্বের অন্য বাস্তুকারেরাও চিন্তা ভাবনা করেন। এই বাস্তু কলারই এক অনন্য নিদর্শন এই পদ্মনাভপুরমের প্রাসাদ। ভরদুপুরে এসেছি পদ্মনাভপুরম প্রাসাদ। কেরলে ছেড়ে যাওয়া প্রাসাদ এমনি আরো কযেকটাই আছে। একটা দেখেছিলাম কোইলনের কাছাকাছি। কোইলন তিরুভন্তপুরম বা ত্রিভান্ড্রাম শহরের উত্তরে আরেক বড়ো শহর। কেরলে ওরা ইংরেজী নামগুলো বাতিল করে দেশি নামগুলো ফিরিয়ে আনছে। কোইলন হযেছে কোল্লম, অ্যালেপ্পি হযেছে আলাপ্পূজা, কোচিন কোচি, ত্রিচূর ত্রিশূর, কোন্নানূর কিন্নূর, এইরকম । কোইলনের প্রাসাদ পরিত্যক্ত হযে গেছে কিন্তু তার সৌন্দর্য ঢাকা পড়ে নি। একটা শহরের মত জায়গা জুড়ে রাজবাড়ী, প্রাসাদ বলা ঠিক হবে না। একটা বাড়িও একতলার বেশি উঁচু নয। টালির চালা নামানো ইট কাঠের ঘরবাড়ি। পিটার ব্রুকস এর মহাভারত এ ভারতের প্রাচীন রাজত্ব গুলিকে যেরকম দেখান হযেছিল, সেই ধরণের।

পদ্মনাভপুরমে ত্রিবাঙ্কুর রাজঘরাণার কোন বৈভব প্রদর্শনী নেই যা আছে তা এই জগতের, জীবনের কিছু সততা ও সরলতা, যা টেকে। সব আছে রাজপ্রাসাদে যা যা থাকার কথা। মন্ত্রণাসভা, রাজসভা, বসবাসের এলাকা, তুলনীয়ভাবে যেগুলি দেওয়ানী খাস, দেওয়ানী আম, রাজনিবাস - সব ঘুরে ঘুরে দেখা। কাঠের স্থাপত্য । কোথাও সৌন্দর্যের খামতি নেই। বাইরে ঘোর বর্ষা, ভ্যাপসা গরম। রাজপ্রাসাদের ভেতরটা শুকনো, ঠাণ্ডা। কোথাও একটা ইলেকট্রিক পাখা নেই। এয়ার কণ্ডিশনার নেই।

কাঠের কারিগরিতে ঢাকা মহলের ভেতরকার শীত, আতপ, আর্দ্রতা সব নিযন্ত্রন করে রেখেছে কাঠের স্থাপত্যশিল্প ...

চলবে