রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

ভারতবর্ষ,পর্ব ৪

চার

ঐ রোজদিনকার নাবিক মৎস্যজীবিরা জানে কোথায পৌঁছালে সমুদ্র হযে যায় পাক স্ট্রেইট কোথায়ই বা সেটা হয গালফ অফ মান্নার! মানচিত্র খুঁটে খুঁডে যে একাকী নাবিক ডাঙা ছুঁয়ে ছুঁয়ে চষে বেড়ায ভূমণ্ডল সে জানে সমুদ্রের কোন সীমান্ত থাকে না। কেউ বলতে পারবে না কোথায় বঙ্গোপসাগরের আরম্ভ, কোথায়ই বা ভারত মহাসাগরের শেষ। এমনি ছোট ছোট সমুদ্রের ছিটমহলে দাঁড়িয়ে ভারত মহাসাগর দেখা - সে দেখার বেশিটাই কল্পনায়। হ্রদ বা পাথরে ঘেরা সমুদ্র যেটাই দেখছি তা যদি দিগন্তবিস্তৃত হয তাহলে সেটার ভারত মহাসাগর হলেই বা কি। জলের বর্ণ সেও তো নীলই সর্বত্র। আকাশেরও। এখানের বাতাসে বিকৃত ধোঁযা ছড়াবার কোন ভিলেন দাঁড়িয়ে নেই।

এখানে প্রথম আসার দিনটা মনে আছে। ভোরবেলা ট্রেন পৌঁছাচ্ছে রামনাড। আমি তখন পর্যন্ত শুধু জানি রামেশ্বরম মন্দিরের কথা। আর জানি ধনুষ্কোডি শহরের কথা। সেখানেও আছে একটা কিম্বা একাধিক মন্দির। ১৯৬৪ সালে এক বিধ্বংসী সাইক্লোনে ধনুস্কোডি শহর তামিলনাড়ুর মৃল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আসার দিন মনে হয়েছিল রামনাড শহরও যেন ডাঙা হতে বিচ্ছিন্ন। ট্রেন চলছে জলের ওপর দিয়ে অতিশয় মন্থর গতিতে। জলের ঢেউ বলে দিচ্ছে আমরা সমুদ্রের ওপর দিযে এগোচ্ছি।

একটা সামন্ত রাজ্যে দাঁড়িযে ভারতবর্ষকে কল্পনা করা নাও সম্ভব হতে পারে - জমির ওপর নানা দেয়ালের বাধা, নানা ভাষাসংস্কৃতির বিস্তার। বিবিধতার রং ঢং দেখে ফুরয না। ডাঙার মানুষেরা বলে বারো মাইলে নাকি ভাষাও বদলে যায়। কিন্তু একটা সমুদ্রের মুখোমুখি দাঁড়ালে গোটা সমুদ্রকেই দেখা হয়ে যায় যা আবৃত করে রেখেছে গোটা এই পৃথিবীকেই।

আমরা এবার এসেছিলাম মাদুরাই, হাসান হয়ে পীচবাঁধান রাস্তা ধরে। এবার মনে হয রামেশ্বরম এর অবস্থানটা কিছুটা পরিস্কার হোল। রামেশ্বরম ও ডাঙার মাঝে সমুদ্রের একটা খাল পেরোতে হয। আমাদের পেরনোর রাস্তাটা অনেক উঁচু করে বেঁধেছে একটা সরলরেখায়। মাঝখানটায় গেলে সমুদ্র ঘিরে ফেলে চারদিক থেকে ঘূর্ণিঝড়ের মত। হোটেলে থিতু হওয়ার পর আবার সেই ধনুস্কোডির রাস্তায। জেনে আসতে পরদিন ভোরবেলা ধীবরদের টেম্পো গাড়ী ধনুস্কোডি যাবে কি না। কদিন ধরেই আকাশে মেঘ।

যেখানে পাকা রাস্তা শেষ হয়েছে সেখানেই একটা সিকিউরিটি পুলিশের ক্যাম্প। প্রথম বার আসাতেই একটি ছেলের সঙ্গে আলাপ। প্রদীপ মণ্ডল। বাঁকুড়া জেলায় বাড়ি। আগে যখন এসেছি তখন এই চেকপোস্ট এতো জব্বর ছিল না। একটা হাত দিয়ে চলে এমন লেভেল ক্রসিং এর গেট, একটা গুমটি। আমি এসে ধনুস্কোডি নিয়ে নানা প্রশ্ন করায আরো কযেকজন সিকিউরিটি গার্ড নেমে এসেছিলামআগুন বালিয়াড়ির ওপর থেকে। প্রদীপ আমাকে নিয়ে গেছিল প্রায় আধ কিলোমিটার ভেতরে। আবার আসতে বলেছিল। মাছের কযেকটা টেম্পোই ধনুস্কোডি যায়। সিজনে প্রায রোজই। রাস্তা বা রোড তাকে যাই বলি সেটা সৈকতের বালিতে ঢাকা একটা সুঁডিপথ তার দুধারেই সমুদ্র। ক্রমাগতই ঢেউ এর ছিটে গাযে এসে লাগে। পা ডুবে যাচ্ছে বালিতে। আধ কিলোমীটার এগিয়ে আবার ফিরে আসায় দিনের অনেকটা সময় আমার খরচ হয়ে গেল তবুও প্রদীপ আমার ধনুস্কোডি অ্যাডভেঞ্চারে সর্বক্ষণ ইন্ধন যুগিযে গেল। কিচ্ছু বুঝি নি তখন যে ধনুস্কোডি যাত্রার অন্য কোন দিক ও থাকতে পারে। গতবার যখন এলাম তখন জায়গাটা যেন কিছুটা থমথমে। চেক পোস্টএ একটা দুটো নিরস্ত্র, গার্ডের অলস পায়চারির বদলে অন্তত ছয়জন গার্ড পোস্ট আগলে। তাদের কাঁধে কলশনিকভ।


চলবে ...