বৃহস্পতিবার, মে ২৮, ২০২০

বিহুর লগনে বৈশাখ আসে রঙালী-রভসে


নতুন বছর এলো নিয়মের নিত্তিতে । এলো বিহু , বিজু, এলো নববর্ষ । চৈত্রের শেষ থেকে বৈশাখ । এক সপ্তাহ ধরে অসমের গাঁও এ গঞ্জে শহরে নগরে চলবে রঙালী বিহুর আনন্দোৎসব । বড়দের প্রণাম ছোটদের স্নেহাশিস দিয়ে গ্রামের বয়স্কদের প্রণতি জানিয়ে নামঘরে প্রদীপ (কোথাও কোথাও শস্য ক্ষেত্রে ) প্রজ্বলন করে শুরু হয় বিহু উৎসব । বিহু মূলত কৃষি উৎসব । নতুন পাতা নতুন ফুল নতুন শস্যের ঈঙ্গিত নিয়ে সমতল পাহাড় হেসে ওঠে নব আনন্দে । তার সঙ্গে সংগতি রেখে দ্রিম দ্রামে শুরু হয়ে যায় বিহু । পুরাতন বিদায় ও নবীন বরণ । চৈত্রের শেষদিন পুরাতন বিরাগ তিক্ততা ভুলে আত্মীয় পরিজনবেষ্টিত হয়ে লগে ভাগে ( একসঙ্গে ) আহার ও বস্ত্রাদি ( বিশেষত হাতে বোনা লাল-সাদা গামছা ) বিনিময় হয় । নববর্ষের দিনে শুরু হয় বিহুর উতাল মাতাল নৃত্য গীত । গত বছরে এই বিহুর মরশুমে আমরা ছিলাম উজান অসমের ধেমাজিতে দিলীপ- রসনা , বুবু-মিনুর আহ্বানে । আহোমপরম্পরায় কাঁসার ঢাকনাদেওয়া রেকাবি (শরাই )তে পান তাম্বূল ও মুগার চেলেং চাদর ( উত্তরীয় )দিয়ে বরণ করা হয় । আমরা দলে বলে ছিলাম প্রায় একশ জন । বিহুর লগ্নে নামকীর্তনের আসর পেতেছিল দিলীপ বুঢ়াগোহাঈ ।উপাধিটি অসম রাজাদের প্রদত্ত । বুঢ়াগোঁহাঈ হচ্ছে আহোমরাজার বিশিষ্ট পরামর্শদাতা , মন্ত্রী । রসনা ও মিনুর নেতৃত্বে কমবয়সী বৌ-মেয়েদের একটি দল প্রত্যকের পা ধুইয়ে চরণ স্পর্শ করে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে ঘরে নিয়ে গেল । প্রতিজনকে বিখ্যাত অসমীয়া গামছা দিয়ে বরণ করে খেতে দিয়েছিল জলপান । ঘরে পাতা দই চিড়া ,ক্রি্ম গুড় । সন্ধ্যায় বাড়িতে এলো গৃহস্থকে আশীর্বাদ দিতে বিহুর হুচুরির দল । পরম্পরা মুগার মেখেলা চাদর (নারী ) ও মুগার ধুতি কুর্তি পরিহিত ( পুরুষ) নাচিয়ে গাইয়ের দল । সারাসন্ধ্যা ধরে চলল বিহুর নৃত্য গীত । দুইহাত তোলে গৃহস্থকে দিল আশীর্বাদ । দিলীপের বড় পুত্রটি ঘুর ঘুর করছে সুন্দর মুখের আশে পাশে । বললাম , চেতন কি ব্যাপার ? চেতন বলল ‘বড়মা , আজকে বিহু, সব মাপ । সব চলে । আজকে কেউ বকবে না । আজকে যে প্রেমের দিন গো । বিহু বিহু লাগিছে গাত’। ওরে তাইতো ! রঙালী বিহু যে প্রেমের উৎসব ।

প্ৰতিজন অসমীয়ার ‘বাপতিসাহোন’ (পরম্পরা ভাবে চলে আসা, পূর্বপুরুষ থেকে চলে আসা ) । ভূপেন হাজরিকা বলেছিলেন , ‘অসমীয়ার আয়ুসরেখা’। বিহুর সময়েপৰম্পরা গতভাবে চলে আসা গীতগুলিকেই বিহুগীত , চেতন বলে । ছোটভাই আঠার ছুঁই ছুঁই । ইতিমধ্যেই লায়েক হয়েছেন । বিহুর মরম স্নেহে ভেসে গিয়ে ঘরে নিয়ে এলো রাঙা টুকটুকে কিশোরী । যার হাসিতে মাদকতা , চাহনিতে বিভঙ্গ । চুমচুম কাত । সমাজ আইন পরিবারকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কিশোরী কিশোর মন্দিরে সেরে নেয় স্বীকৃতি কর্ম । তারপর সোজা বাড়ি নিয়ে আসে । চুমচুম গুন গুন করে ,

‘ চকুৱে চকুৱে কি চোৱা লাহৰী
মই চালে তলমুৰ কৰা
তুমি নেমাতিলেও মাতিব পাৰো মই
জানোছা কেতেৰামাৰা।।

( চোখে চোখে কি চোরা চাহনি , আমি মুখ তুলে তাকালেই তুমি নতমুখী । তুমি না ডাকলে ও আমি ডাকতে তো পারি ...) । আদর গায়ে লজ্জায় নতমুখী বৌমা শাশুড়িমার পিছনে লুকায় । শাশুড়ি ফিক করে হেসে নববধূকে টেনে নিয়ে যায় । চেতন জোরে জোরে হেসে বলে , এ অসমীয়া সংকৃতির অঙ্গ বড়মা । আমরা এমন প্রেমের বন্ধনে থাকি’ ।

বিহু যৌবনের উৎসব ।

কৃষি প্রধান অসমীয়ারমানুষের বিহু হল জাতীয় উৎসব ।বিহু উর্বরতার গান গায় ।উর্বরতার স্বপ্ন সাজায় । যৌবনের ঢল নামে প্রকৃতির দেহে । গাছে গাছে ফুটে ফুল , ফুটে ‘ভেবেলি লতা’। বিহু আনেকৃষিজীবি মানুষের অন্তরে আশা ও আনন্দের জোয়ার । দেহ এবং মনের জড়তা ভাঙার উৎসৱ ।বিহুর উৎসবে জেগে উঠে অসমীয়া সমাজ । প্রকৃতি ও মানুষ বিহুতে একাকার হয়ে যেত একসময় ।প্ৰকৃতিতে যেমন নতুন সাজ। তেমনি গ্রামে গঞ্জে অসমীয়া যুবতীর অঙ্গেও মেতে উঠে বিহু বিহু ।–
চ’তে গৈয়ে গৈয়ে ব’হাগে পালেহি
ফুলিলে ভেবেলী ল’তা।। ( চৈত্র বিদায় নিয়ে বৈশাখ এসেছে । প্রস্ফুটিত ভেবেলী লতাও )
বিহু গীতগুলিতে এক একটি ভাবে প্ৰকাশ দেখা যায় । এই বিহুটিতে বিহু পাগল যুবক-যুবতীর অন্তরে প্ৰেমের ভাব জাগে উঠে। অপরূপ সৌন্দর্যে প্ৰাণ উতলা করা প্ৰকৃতি রঙ লাগে যুবসমাজে । বসন্তের সমাগমে পৃথিবীর দেহে যেমন আসে যৌবনের জোয়ার । কিশলয় তৃণের সুবাসে কোকিলের মধুর তান , কেতেকী মধুর কণ্ঠ মন কেমন করে উঠে । কোমল তুলার মতো মন গুলিও ওড়ে ওড়ে ছড়িয়েপড়তে চায় এদিক ওদিক ।বিহু গীত মুলত শৃঙ্গার রস প্রধান । নানা রঙ্গে প্রকৃতি সাজে , মেতে উঠে প্রেমিক প্রেমিকার মন । ঘন বনতলে সবুজ দিগন্তে কপৌ ফুলের রুপ রঙের মাদকতায় মন কেবল বলে

চকুৱে চকুৱে কি চোৱা লাহৰী
মই চালে তলমুৰ কৰা
তুমি নেমাতিলেও মাতিব পাৰো মই
জানোছা কেতেৰামাৰা।।

( চোখে চোখে কি চোরা চাহনি , আমি মুখ তুলে তাকালেই তুমি নতমুখী । তুমি না ডাকলে ও আমি ডাকতে তো পারি ...) ইত্যাদি।
প্ৰেমে চঞ্চল যুবক যুবতী । মন ঘরেও বসে না , মাঠেও না । প্ৰেম যত প্রগাঢ় হয় প্ৰেমিকার সান্নিধ্যের জন্য প্ৰেমিকের মনব্যাকুল হয়ে ওঠে । পলকে চোখে হারায় । এক পলক না দেখলেই বহু যুগ অদেখা যেন মনে হয় । এই অবস্থাটির অতি সুন্দর বর্ণনা রয়েছে বিহুগীতে , ‘ হাঁহ হৈ পৰিম গৈ তোমাৰ পুখুৰীত,পাৰ হৈ পৰিমগৈ চালত। ঘাম হৈ সোমাই যাম তোমাৰ শৰীৰত, মাখি হৈ চুমা দিম গালত।‘ ( হাঁস হয়ে তোমার পুকুরে ঝাঁপ দেবো , পায়রা হয়ে বসব গিয়ে চালেতে ; ঘাম হয়ে মিশে যাব তোমার শরীরে , মাছি হয়ে চুমা দেবো গালে’ ।

মুগার ধুতিচাদরে বিহু যুবকটি হয়ে নেচে মেতে উঠলো চেতন । গলা ছেড়ে পেপার সুরে সুর মিলিয়ে গেয়ে উঠলো গান ।
‘ভিতৰি ভিতৰি লোকলৈ পীৰিতি,
মোৰ লগত চুপতি মাৰা,
আগতে নেজানো এতিয়া জানিছো,
তোমাৰো দুফলীয়া মন।‘ ( তলে তলে অন্যের সঙ্গে পিরীতি কর , আমার সঙ্গে যত হিসেব । আগে জানতাম না , এখন জেনেছি তোমার রয়েছে দুই-ফালি মন’। রোমান্টিক এই গীতটির মধ্যে কোথাও বিষাদ তীব্র ভাবে ফুটে উঠেছে । চেতনের চোখ মুখ বিষাদে ভরা । মনটি যেন কোথাও হারিয়ে গেছে । ও চেতন শোন , চেতন মূক । নীরব । কাকা বুবুর একমাত্র পুত্র ধন কাছে এসে হাতটি ধরলো ।‘বড়মা চেতনের অন্তরে আঘাত আছে । ওর মেয়েটি ওকে ছেড়ে গেছে জানো ?’ কী অনায়াসে ওরা বলতে পারে ! কোন লুকোচুপি নেই , দ্বিধা দন্ধ নেই । প্রকৃতিরসরলতায় বন্য সৌন্দর্য এ ঝলমল করছে ।

একটি যুবকের বুক ভাঙার খবরে পাড়া প্রতিবেশি স্বজন পরিজন সকলে সম দুঃখে ভাগ নিতে জানে । ধন ধরলো চেতনের হাত গভীর স্নেহে ।মনে পড়েছে কয়েকমাস আগে বুবু টেলিফোনে জানিয়ে ছিল , ধন একটি মেয়েকে ঘরে নিয়ে চলে এসেছে । বলিস কী রে ? এবার করবে কী ? পিটাবি নাকি ? বুবু হাসলো , না মা । গ্রাম ডেকে ভোজ খাওয়াতে হবে । এই রীতি ।

এই রীতির কথা গুলি বিহু গীতেও রয়েছে । প্রেম বিষাদ ছাড়াছাড়ি গান্ধর্ব বিবাহ , বিহু গীতে ছড়িয়ে আছে।
রয়েছে আছে আন্তরিকতা, গভীরতা এবং প্রেমের দহন জ্বালাও। রসনা বললো, ‘ বিহুগীত প্ৰেম পীরিতির গীত। এর সঙ্গে শোক তাপ জ্বালা যন্ত্ৰণা থাকে। সেই যন্ত্রনাতে অস্থির হয়ে আমার পুত্র চেতনের অন্তর পুড়ে ছাই হয়ে গেল ।মা ছেলেটিকে একটু বোঝাও না , স্থির হয়ে আগামীদিনের কথা যেন ভাবে’ ।

মনটি বিষাদ যুক্ত হল ।চোখের কোন চিক চিক করে উঠলো । রসনার নিজের তাঁতে বোনা বিহুয়ানটি গায়ে দিয়ে চেতন বুঢাগোহাঈ ঘুরে বেড়াচ্ছে পরম নিঃস্পৃহ ভঙ্গিতে ।