শুক্রবার, নভেম্বর ২২, ২০১৯

বাংলা গানের সেকাল একাল : পর্ব ১৮

রবিগান : সুরের ঝর্ণাধারা

রবীন্দ্রনাথ নিজকন্ঠে তার গান রেকর্ডে গেয়েছিলেন ১৯০৮এ, শান্তিনেকেতনের আশ্রমকন্যারাও সেই আদিপর্বে রেকর্ডে গান গেয়েছিলেন, কিন্তু সেই ‘রবিবাবুর গান’ থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত হতে সময় লেগেছিল অনেক । ১৯৩৫এ পঙ্কজ কুমার মল্লিকের সঙ্গীত পরিচালনায় মুক্তি ছায়াছবিতে রবীন্দ্রনাথের গান ব্যবহৃত হ’ল । রবীন্দ্রকাহিনি নয় এমন চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথের গানের প্রয়োগ সেই প্রথম । তারপর ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৪এর মধ্যে দশবারোটি রবীন্দ্র কাহিনি নয় এমন চলচ্চিত্রে রবীন্দ্র গানের সার্থক প্রয়োগ হয় । ছায়াছবিতে ববহৃত হবার ফলে তাঁর গান সমাদৃত হতে শুরু করল । ত্রিশের দশক থেকেই বাঙালি বিদ্যোৎসমাজে তাঁর গানের সার্বজনীনতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক শুরু হয় । তবুও সত্য এই যে, রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় তাঁর গানের সঙ্গে বাঙালির প্রবল আত্মীয়তা ঘটেনি, ঘটেছে ১৯৬১তে তার জন্মশত বার্ষিকীর পরে ।

রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই একদল দক্ষ রবীন্দ্রগানের গায়ক গায়িকা ও প্রশিক্ষক তৈরি হলেন শান্তিনিকেতন সঙ্গীত ভবনের প্রয়াসে । তাঁদের আন্তরিক প্রয়াসে পতিষ্ঠিত সঙ্গীত শিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলি রবীন্দ্রগানের প্রসারে মুখ্য ভুমিকা নিয়েছিল তার প্রয়াণ-পরবর্তী কালে । রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পরের বছর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘গীতবিতান’ (১৯৪২) , তারপর ‘রবিতীর্থ’(১৯৪৬), ‘দক্ষিণী’ (১৯৪৮) ও ‘সুরঙ্গমা’ (১৮৫৭) । শৈলজা রঞ্জন মজুমদার, শুভ গুহঠাকুরতা, নীহারবিন্দু সেন, সুবিনয় রায় প্রমুখ এই প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে যুক্ত থেকে পরবর্তী প্রজন্মকে দীক্ষিত করেছেন রবীন্দ্র গানে । একদিকে বিশ্বভারতী সঙ্গীতভবন অন্যদিকে এইসব শিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে উঠে এলেন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, মায়া সেন, সুচিত্রা মিত্র, গীতা ঘটক, সাগর সেন, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়, ঋতু গুহ প্রমুখ । ১৯৬১তে পৌছে তাঁর গানের যে সর্বগ্রাসী প্রভাব দেখা দিল তা সম্ভব হয়েছিল এঁদের কন্ঠ লাবণ্য ও গায়ন শৈলীর গুনে । কণক দাশ, পঙ্কজ মল্লিক, সায়গল, কানন দেবী,দেবব্রত পরবর্তী প্রজন্মের এঁরাই রবীন্দ্রগানের চাহিদা মিটিয়েছেন অসামান্য দক্ষতায় । সেই পথ বেয়ে উঠে এসেছেন রবীন্দ্রগানের দক্ষ শিল্পীরা । মানুষ শুনছেন তাঁদের গান ।

রবীন্দ্রনাথের বয়স ১৫৮ বছর, রবীন্দ্রনাথের গানের বয়স ১৩৬ বছর, কিন্তু ‘রবীন্দ্র সঙ্গীত’এর বয়স খুব বেশি হলে ৬০ বছর । কথাটার মধ্যে একটা হেঁয়ালি আছে তাহ’ল রবীন্দ্রনাথের গানে আম বাঙালির মজে যাওয়ার শুরু কম বেশি ৬০ বছরের বেশি নয় – অন্তত আজকের মত সর্বপ্লাবী ছিলনা তাঁর গান । আমার বেশ মনে আছে চল্লিশের শেষ দিকে কিংবা পঞ্চাশের শুরুতেও রেডিওতে ‘এবার রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইছেন...’ ঘোষণা হওয়া মাত্রই বাড়ির গুরুজন কারো নির্দেশ আসতো রেডিওটা বন্ধ করে দেবার । তো সেই দৃশ্য থেকে আজ, পথ চলতি মানুষের পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসা গানের সুর শুনে থমকে দাঁড়িয়ে যাওয়া । রবীন্দ্রনাথের গানের সর্বপ্লাবী হয়ে ওঠার ইতিহাসের সূত্রপাত কবির জীবদ্দশায় হয়নি । কেন হয়নি সে অন্য প্রসঙ্গ । আমাদের সে এক দুর্ভাগ্য এটুকুই বলা যায় ।

সতেরো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ইংল্যান্ডে পড়তে যান । সেখানে তাঁর পাশ্চাত্য সংগীত সম্পর্কে ধারণা হয় । সেখান থেকে কয়েকটি আইরিশ লোক সংগীতের সুর সংগ্রহ করেন । বিলেত থেকে ফিরে তিনি গীতিনাট্য ‘বাল্মীকি প্রতীভা’ ও ‘কালমৃগয়া’ রচনা করেন । জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন “এই দেশী ও বিলিতি সুরের চর্চার মধ্যে বাল্মীকি প্রতীভার জন্ম হইল”। সুতরাং বলা যায় বিলাত থেকে প্রত্যাগমনের পরই রবীন্দ্রনাথের সংগীত রচনার ইতিহাসের সূত্রপাত । তারপরই একুশ বছর বয়সে ‘ভারতী’ পত্রিকায় ‘সঙ্গীত ও ভাব’ রচনায় মেলে ধরলেন তাঁর সঙ্গীত রচনার মূল সূত্রটি । অতয়েব রবীন্দ্রনাথের বিলাত প্রত্যাগত জীবন থেকেই তাঁর সঙ্গীত রচনার ইতিহাসের সূত্রপাত, যে সঙ্গীতের সুধারসে আমাদের অনায়াস অধিকার । মধ্যবিত্ত সংবেদনশীল বাঙালির নান্দনিক বোধের কাছে রবীন্দ্রনাথের গাঁ এক পরম প্রাপ্তি।

রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন তাঁর এক বিশেষ অভিধায় চিহ্নিত হ’ক এবং তাইই হয়েছিল কিন্তু অনেক পরে । ‘রবীন্দ্র সঙ্গীত’ এই অভিধাটির ব্যাপক প্রয়োগ রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারেননি, যদিও রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর , ধূর্জটি প্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ তাঁদের সঙ্গীত বিষয়ক লেখায় ‘রবীন্দ্র সঙ্গীত’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন । দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরই প্রথম ‘রবীন্দ্র সঙ্গীত’ অভিধাটি ব্যবহার করেন তাঁর একটি গ্রন্থে ১৯২৯এ ।

‘রবিবাবুর গান’ থেকে সর্বপ্লাবী ‘রবীন্দ্র সঙ্গীত’ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি বুঝতে চাইলে বাংলা গানের বিবর্তন প্রক্রিয়াটিও বুঝে নেওয়া দরকার, অন্তত তাঁর সময় কালের বাংলা গানের চেহারাটা । পাশাপাশি বুঝে নেওয়া দরকার বাঙালির সাংগীতিক রুচির বিবর্তনের ধারাটিকে । পাঁচালি গানের জনক দাশরথী রায়ের মৃত্যুর পরের বছর জন্ম রবীন্দ্রনাথের । তাঁর শৈশব কালে বিনোদন মূলক সঙ্গীত বলতে ছিল পাঁচালি, কবিগান, যাত্রা থিয়েটারের গান আর সম্পন্ন পরিবারে ওস্তাদি গান । গান তখনও বিপননযোগ্য সামগ্রী হয়ে ওঠেনি । ইতিমধ্যে ১৯০৫এর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল দিনগুলোতে পথে নামলেন রবীন্দ্রনাথ – লিখলেন ২২টি দেশাত্মবোধক গান । বাঙালির বিনোদন মূলক সাঙ্গীতিক রুচি তখন কীর্তনাঙ্গের গান, প্রেম ও ছলনামূলক প্রণয় সঙ্গীত কিংবা মোটা দাগের হাসির গান । কলের গান পৌছেছিল মাত্র কিছু সম্পন্ন মানুষের ঘরে ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পরের বিশ বছরে আমাদের গান শোনার ক্ষেত্রে দুটি যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে যায় । ১৯২৭এ কলকাতা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা ও ১৯৩২এ বাংলা চলচ্চিত্রের সবাক হওয়া । এই দুটি মাধ্যম উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় আমাদের সাংগীতিক রুচিরও বড় রকমের পরিবর্তন হ’ল । পঙ্কজ কুমার মল্লিক, কুন্দনলাল সায়গল, কৃষ্ণ চন্দ্র দে, কানন দেবী প্রমুখের শিষ্ট গায়ন শৈলির গুনে বাংলা গান আধুনিক হতে শুরু করলো । শান্তি নিকেতন ঘরানার বাইরে পঙ্কজ কুমার মল্লিক, সায়গল, কানন দেবী রবীন্দ্রনাথের গান গাইলেন । বস্তুত, রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় তাঁর গানকে লোকপ্রিয় করার কাজে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক এবং স্বাধীনতার পর হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও দেবব্রত বিশ্বাস ।

১৯৩২এ বাংলা চলচ্চিত্র সবাক হ’ল আর ১৯৩৫এ পঙ্কজ কুমার মল্লিকের সঙ্গীত পরিচালনায় মুক্তি ছায়াছবিতে রবীন্দ্রনাথের গান ব্যবহৃত হ’ল । রবীন্দ্রকাহিনি নয় এমন চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথের গানের প্রয়োগ সেই প্রথম । তারপর ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৪এর মধ্যে দশবারোটি রবীন্দ্র কাহিনি নয় এমন চলচ্চিত্রে রবীন্দ গানের সার্থক প্রয়োগ হয় । ছায়াছবিতে ববহৃত হবার ফলে তাঁর গান সমাদৃত হতে শুরু করল । ত্রিশের দশক থেকেই বাঙালি বিদ্যোৎ সমাজে তাঁর গানের সার্বজনীনতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক শুরু হয় । বিদগ্ধ সঙ্গীতবেত্তা দিলীপ কুমার রায় ও ধুর্জটি প্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দীর্ঘ পত্র বিনিময় থেকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত ভাবনার সারসত্যটাও আমরা জেনে যাই ।

ইতিমধ্যে একদল দক্ষ রবীন্দ্রগানের গায়ক গায়িকা ও প্রশিক্ষক তৈরি হয়ে গেছেন শান্তিনিকেতন সঙ্গীত ভবনের প্রয়াসে । তাঁদের আন্তরিক প্রয়াসে পতিষ্ঠিত সঙ্গীত শিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলি রবীন্দ্রগানের প্রসারে মুখ্য ভুমিকা নিয়েছিল তার প্রয়াণ-পরবর্তী কালে । রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পরের বছর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘গীতবিতান’ (১৯৪২) , তারপর ‘রবিতীর্থ’(১৯৪৬), ‘দক্ষিণী(‘ (১৯৪৮) ও ‘সুরঙ্গমা’ (১৮৫৭) । শৈলজা রঞ্জন মজুমদার, শুভ গুহঠাকুরতা, নীহারবিন্দু সেন, সুবিনয় রায় প্রমুখ এই প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে যুক্ত থেকে পরবর্তী প্রজন্মকে দীক্ষিত করেছেন রবীন্দ্র গানে । । একদিকে বিশ্বভারতী সঙ্গীত ভবন অন্যদিকে এইসব শিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে উঠে এলেন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, মায়া সেন, সুচিত্রা মিত্র, গীতা ঘটক, সাগর সেন, অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়, ঋতু গুহ প্রমুখ । ১৯৬১তে পৌছে তাঁর গানের যে সর্বগ্রাসী প্রভাব দেখা দিল তা সম্ভব হয়েছিল এঁদের কন্ঠ লাবণ্য ও গায়ন শৈলীর গুনে । কণক দাশ, পঙ্কজ মল্লিক, সায়গল, কানন দেবী, হেমন্ত, দেবব্রত পরবর্তী প্রজন্মের এঁরাই রবীন্দ্রগানের চাহিদা মিটিয়েছেন অসামান্য দক্ষতায় । তার পরে উঠে এসেছেন আরো এক ঝাঁক রবিগানে দীক্ষিত শিল্পী - প্রমিতা মল্লিক, শ্রাবণী সেন, রেজওয়ানা চৌধুরী, অদিতি মহসিন, সামা রহমান, জয়িতা চক্রবর্তী, স্বাগতালক্ষী দাশগুপ্ত প্রমুখ ।

একথা ঠিক রবীন্দ্রনাথের গানের অন্তর্দীপ্তিতে আকর্ষিত হতে বাঙালির অনেক সময় লেগেছে । রবীন্দ্রনাথ সেকথা জানতেন না তেমন নয় । কিন্তু তিনি স্থির প্রত্যয়ী ছিলেন যে বাঙালিকে তাঁর গান গাইতেই হবে । তিনি বলেছিলেন “বাংলাদেশকে আমার গান গাওয়াবোই । আমি সব যোগান দিয়ে গেলুম ; ফাঁক নেই । আমার গান গাইতেই হবে – সব কিছুতেই” । কোথা থেকে তাঁর এই প্রত্যয় ? বাংলা গানের শিকড় সন্ধান করেই তিনি এই নিশ্চিত বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন । তিনি বুঝেছিলেন বাঙালি কোন দিনই শাস্ত্রীয় গান বা তার গায়নরীতিকে আপন করে নেয়নি । তাই কীর্তনের মধ্যেই বাঙালি তার নিজের গান নিজে তৈরি করেছিল । বাউল, কীর্তন , রায়গুণাকর ভরত চন্দ্র, রামপ্রসাদ সেন, নিধুবাবু , দাশরথী রায়’এর পাঁচালি গান এবং লোকসঙ্গীত - বাংলা গানের যে নিজস্ব ধারা, সেই ধারা থেকেই তিনি বাংলা গানের উত্তরণ ঘটালেন আধুনিকতায় । তাঁর হাত ধরেই বাংলাগান আধুনিক হয়ে উঠল কাব্যের লাবণ্য আর সুরের মেল বন্ধনে । বললেন “আমার গানের মধ্যে সঞ্চিত হয়েছে দিনে দিনে সৃষ্টির শেষ রহস্য , ভালোবাসার অমৃত” । “গানের সুরে আমার মুক্তি ঊর্ধে ভাসে” এ উচ্চারণ শুধুমাত্র তাঁর গানের একটি কলি মাত্র নয়, আমাদের মনের মুক্তির মহামন্ত্র । তাই তাঁর জন্মের দেড়শ’ বছর পরেও আমাদের সব জিজ্ঞাসা, সব-সুখ-দুঃখ, বিষাদ-বেদনা থেকে উত্তরণের ঠিকানা লেখা আছে গীতবিতান’এর ২২৩২টি গানের মধ্যে ।

একুশ শতকের এই বৈদ্যুতিন বিশ্বে এখন একজন গ্রামীণ মানুষ তার কানে ভেসে আশা কোন গানকে অনায়াসে সনাক্ত করতে পারেন ‘রবীন্দ্র সঙ্গীত’ বলে । কোথায় এর রহস্য ? কেনই বা রবীন্দ্রনাথ বলতে পেরেছিলেন বাঙালি সুখে দুঃখে তাঁর গানই গাইবে । যে মানুষ রবীন্দ্রনাথের কবিতার একটা পংক্তিও পড়েননি তিনিও কোন রহস্যে রবীন্দ্রগানে অবগাহন করতে পারেন ? পারেন, কারণ ঐ যে রবীন্দ্রনাথই বলেছেন তাঁর গানে সঞ্চিত হয়েছে সৃষ্টির শেষ রহস্য , ভালোবাসার অমৃত ।

কি করে তাঁর গান এমন সর্বপ্লাবী হয়ে উঠল, তার অনুসন্ধান করতে আমি বুঝতে চাইব – বাংলা গান নিয়ে তাঁর মৌলিক ভাবনা আর গানের জন্য তাঁর আকুলতা । । প্রয়াত অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর এক স্মৃতিচারণে আচার্য ক্ষিতিমোহন সেনের সঙ্গে তাঁর আলাপচারিতার উদ্ধৃতি দিয়েছেন এইভাবে । “তাঁর কাব্যই বলো আর নাটকই বলো বা যেকোন গদ্য রচনাই বলো,সবকিছুর মধ্য দিয়েই ক্ষণে ক্ষণে হয়তো দেখবে তাঁর সেই দাড়ি জোব্বা উঁকি মারছে । তিনি যে রবীন্দ্রনাথ একথা তিনি ভুলতে পারতেননা । কিন্তু তাঁর গান রচনার সময়, আমি কাছ থেকে দেখেছি –তাঁর আত্ম সচেতনতা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হ’ত, তখন দেখতে পেতাম সত্যিকারের রবীন্দ্রনাথকে যেন একেবারে খোলস ছাড়ানো ন্যাংটো মানুষ”। অর্থাৎ সঙ্গীত রচনার ক্ষেত্রে সবকিছু ভুলে যাওয়া এক বিভোর মানুষ ।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর তাবৎ সৃজন কর্মের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন সঙ্গীত সৃজনকে, সবচেয়ে বেশি মমতাও ছিল গানের প্রতি । সঙ্গীত রচনা তাঁর কাব্য রচনার সমন্তরাল রূপেই বিকশিত হয়েছিল – আমরা জেনেছি তাঁর নিজের কথা থেকে । কিন্তু সঙ্গীত রচনা সম্পর্কে, সঙ্গীত বিষয়ে তাঁর মৌলিক ভাবনা সম্পর্কে তিনি যত বিস্তারে লিখে গেছেন, বোধ করি কাব্য রচনা সম্পর্কে ততটা নয় । জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে সাঙ্গীতিক পরিমন্ডল ছিল , অস্তাদি গানের চর্চা হ’ত, দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ব্রহ্ম সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল বাল্যেই । সেকালের প্রখ্যাত বাঙালি সঙ্গীতজ্ঞ যদুভট্ট ছিলেন তাঁর বাল্যের সঙ্গীত শিক্ষক । বিদ্যালয় শিক্ষার ক্ষেত্রে যেমন, প্রথাগত সঙ্গীত শিক্ষার ক্ষেত্রেও তেমন তিনি আটকে থাকেননি । শাস্ত্রীয় গানের মধ্যে তিনি বাংলাগানের ভাবসৌন্দর্য খুঁজে পেলেননা । সঙ্গীত রচনা তাঁর কবিতা রচনার সমান্তরাল রূপেই বিকশিত হয়েছে – একথা রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলে গেছেন । কবিতার মত সঙ্গীত রচনার ক্ষেত্রেও ‘ভাব সৌন্দর্য’র অন্বেষণই তার সংগীত দর্শনের মূল সূত্র । ২১ বছর বয়সে ভারতী পত্রিকায় ‘সংগীত ও ভাব’ নিবন্ধে লিখলেন “ আমাদের সংস্কৃত ভাষা যেরূপ মৃত ভাষা, আমাদের সংগীত শাস্ত্রও সেইরূপ মৃত শাস্ত্র । ইহাদের প্রাণ বিয়ওগ হইয়াছে কেবল দেহ মাত্র অবশিষ্ট আছে । এই নিবন্ধে যুবক রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট করে জানালেন (শাস্ত্রীয় সংগীতের) “ গায়করা সংগীতকে যে আসন দেন আমি সংগীতকে তদপেক্ষা উচ্চ আসন দিই । তাঁহারা সংগীতকে কতকগুলো চৈতন্যহীন জড় সুরের উপর স্থাপন করেন, আমি তাহাকে জীবন্ত অমর ভাবের উপর স্থাপন করি । তাহারা গানের কথার উপরে সুরকে দাঁড় করাইতে চান, আমি কথাগুলিকে সুরের উপর দাঁড় করাইতে চাই”। এটাই রবীন্দ্রনাথের গানের সার কথা ।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর একক প্রচেষ্টায় বাংলা গানকে আধুনিক করে তুললেন । কবিতা ও গদ্য সাহিত্যের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন । উনিশ শতকের নবজাগরণের উত্তরাধিকার – রামমোহন থেকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত । কিন্তু সংগীত রচনার ক্ষেত্রে তেমন কোন শিষ্ট আদর্শ তাঁর সামনে ছিলনা । তাঁর সমকালে একদিকে কলকাতার বাবু বিলাসের চটুল ছলনা মূলক প্রণয় সঙ্গীত, হিন্দুস্থানি ওস্তাদি গানের আসর অন্যদিকে বৃহত্তর বাংলায় কীর্তন, বাউল, রামপ্রসাদী , আখড়াই, কবিগান, পাঁচালি। এই সাঙ্গীতিক প্রতিবেশে বাংলাগানকে আধুনিক করে তোলার দায় একা নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ । তাঁর জন্মের দশ / পনেরো বছর আগে ও পরে বৃহত্তর বাংলার গানেই ধারাটি রুদ্ধস্রোত হয়ে গিয়েছিল । প্রয়াত হয়েছেন পাঁচালি গানের জনক দাশরথী রায় , এইগানের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী কৃষ্ণকমল গোস্বামী, কীর্তন গানের গোবিন্দ অধিকারী, হাসির গানের রূপচাদ পক্ষী প্রমুখ । রবীন্দ্রনাথ অতয়েব শূণ্য থেকে শুরু করলেন এবং বাংলা গানের মুক্তি ঘটালেন ।

রবীন্দ্রনাথের গানে আধুনিকতার যে নির্মিতি তার মূলে ছিল বাঙালির মনন, তার যাপন সম্পর্কে তার গভীর অন্বেষণ, অধ্যয়ন । বাঙালির ভাষা ও সাহিত্যের শুরুই কাব্যের বাঁধনে । বাঙ্গালি কোনদিনই রাজ দরবারের গানকে আপন করে নেয়নি, সঙ্গীত শাস্ত্রের অনুশাসনও সে মানেনি, জনপদের গানকেই সে চেয়েছে । বাংলার প্রথম নবজাগরণ কালের কীর্তন গান থেকে মধ্যযুগ পেরিয়ে তাঁর সমকালের পাঁচালি গান পর্যন্ত আমরা বাংলা গানের এই একই ধারা দেখি এবং সে গান কাব্য নির্ভর । কীর্তন থেকে রামপ্রসাদী, টপ্পা, পাঁচালি গানের সে স্রোত সবেতেই কাব্যের সঙ্গে সুরের মেলবন্ধন, রবীন্দ্রনাথ বাংলা গানে আধুনিকতার নির্মাণ করলেন এই ধারাতেই । ‘আত্ম প্রকাশের জন্যই বাঙালি গানকে অত্যন্ত করে চেয়েছে’ এই সত্য বুঝেছিলেন বলেই তিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন বাংলা গানের জন্য ।

দ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমকালের চেয়ে সহস্র যোজন অগ্রগামী ছিলেন বলেই নিজের সৃষ্টির প্রতি এমন স্থির বিশ্বাস ব্যক্ত করতে পেরেছিলেন জীবনের উপান্তে এসে “...যুগ বদলায়, তার সবকিছু বদলায় । তবে সবচেয়ে স্থায়ী হবে আমার গান এটা জোর করে বলতে পারি .....যুগে যুগে এ গান তাকে গাইতেই হবে । তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর সুরের ধারায় অবগাহন করে চলেছি, চলবো আরো বহুদিন , যতদিন বাঙালি জাতীসত্তার অস্তিত্ব থাকবে ।

গত ষাট বছর ধরে অনেক দক্ষ দক্ষ শিল্পীর রবিগান শুনছি, তাঁদের দীক্ষিত গায়নশৈলীতে রবিগানের অমৃত ধারায় অবগাহন করছি । প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর গান গেয়ে চলেছেন । তবুও রবীন্দ্রগানের কথা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি এ গানের তিন কিংবদন্তীর কথা না বলা হয় । নিশ্চিতভাবের এই তিন কিংবদন্তী হলেন দেবব্রত বিশ্বাস, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুচিত্রা মিত্র । তাঁদের কথা বলবো আগামী পর্বে ।



(আগামী পর্বে রবিগানের তিন কিংবদন্তী : দেবব্রত কণিকা সুচিত্রা )