রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

বাংলা গানের সেকাল একাল পর্ব - ১১

বাংলা গানের স্বর্ণ-সময় : নজরুল ইসলামের অবদান

কাব্যের লাবণ্যই বাংলা গানের আশ্রয়,’আধুনিক বাংলা’ তকমা লাগা গানের ক্ষেত্রেও তাই । রবীন্দ্রনাথ,দ্বিজেন্দ্রলাল,অতুলপ্রসাদ,রজনীকান্ত পেরিয়ে নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথের পরে যার কাছে বাংলা গানের ঋণ সবচেয়ে বেশি । রবীন্দ্রগানের ঐশ্বর্যে বাঙালি মজেছিল তাঁর মৃত্যুর অনেক পর থেকে । তাঁর গানে মজে যেতে বাঙ্গালির এতো দেরি হল কেন তা এক চিরকালীন ধন্দ । বাঙালি যখন থেকে রবীন্দ্রগানে মজে যেতে শুরু করলো তার অনেক আগেই নজরুলের কলম ও কন্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেছে । ১৯২৮ বাংলা গানের তখনও অপরিণত ভুবন, নজরুল পাকাপাকিভাবে এলেন গানের জগতে । অর্থের প্রয়োজনে গ্রামফোন কোম্পানির মাসমাইনের চাকুরি নিতে হয়েছিল । ১৯৩৩এ প্রকাশিত ‘রুবাইত-ই-উমর খৈয়াম গ্রন্থের ভূমিকায় নজরুল লিখলেন “কাব্যলোকের গুলিস্তান থেকে সঙ্গীতলোকের রাগিনী দ্বীপে আমার দ্বীপান্তর হয়ে গেছে” । বাংলা গানে নজরুলের অবদান বিস্ময়কর । তাঁর গীত রচনার সংখ্যা প্রায় চার হাজার, তার মধ্যে রেকর্ড হয়েছে ১৭০০ গান । গানের সবক’টি শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল, গীত রচনা, সুর সংযোজন, গাইয়ন ও গায়নশৈলী নির্মাণ, ইসলামি গান, গজল (বাংলায় গজল গানের তিনিই প্রবর্তক) হাসিরগান, শ্যামা সঙ্গীত, থিয়েটার ও সিনেমার সঙ্গীত পরিচালনা, (এমনকি একটি চলচ্চিত্রে অভিনয়) সব । অথচ নজরুলের সক্রিয় সাঙ্গীতিক জীবন মাত্র ১৪ বছরের ।

শৈশবে পিতৃ-মাতৃহীন নজরুলের সঙ্গীত শিক্ষার সূত্রগুলি, তাঁর সাঙ্গীতিক জীবন গড়ে ওঠার কিছুই জানা যায় না । সঙ্গীতের প্রথাগত শিক্ষা অর্জন করার কোন সুযোগ নজরুল পাননি । লেটোর দলে ঘুরে বেড়ানো এবং শৈশব-কৈশোরের বাউন্ডুলে জীবনে বাংলার লোক আঙ্গিকের বিভিন্ন ধারার গান বাউল, ঝুমুর, পাঁচালী গান, টপ্পা ইত্যাদির সুর আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন, তার সব কিছুই বাংলা গানের ভুবনে উজাড় করে দিয়েছিলেন নিজেকে নিংড়ে দিয়ে ।

নজরুলের গানের ভুবন ছিল স্বতস্ফূর্ততায় ভরপুর । পেটের দায়ে কাব্যলোক থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়ে গ্রামফোন কোম্পানির দাসত্ব নেওয়ার জন্য তাঁর নিজের যন্ত্রণা বড় কম ছিল না । কবি বন্ধুদের অনেকেই তাঁকে ত্যাগ করেছিলেন । এই সময় রবীন্দ্রনাথকে এক পত্রে নজরুল লিখেছিলেন “গুরুদেব, বহুদিন আপনার শ্রীচরণ দর্শন করিনি । আমার ওপর থেকে হয়তো প্রসন্ন কাব্যলক্ষী হিজ মাষ্টার্স ভয়েসের কুকুরের ভয়ে আমায় ত্যাগ করেছেন । সুতরাং সাহিত্যের আসর থেকে আমি প্রায় স্বেচ্ছা-নির্বাসন নিয়েছি । ... আমার এক নির্ভিক বন্ধু আমাকে উল্লেখ করে একদিন বলেছিল ‘যাকে বিলিতি কুকুর কামড়েছে তাকে আমাদের মাঝে নিতে ভয় হয় । সত্যি, ভয় হবারই কথা । তবু কুকুরে কামড়ালে লোকে নাকি ক্ষিপ্ত হয়ে অন্যকে কামড়াবার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে । আমার কিন্তু সে শক্তি নেই, আমি হয়ে গেছি বীষ জর্জরিত নির্জিব” । সূত্র – অরুণ কুমার বসু / ‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’, পুরশ্রী পত্রিকা, জুলাই ১৯৯৯) । তবু নজরুল তাঁর ভেতরের বিষ জর্জরতার কোন প্রভাব তাঁর সঙ্গীত সৃজনে পড়তে দেননি । কন্ঠ স্তব্ধ হবার আগে, শেষের দিকে অর্থকষ্ট, পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্ত্রীর চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে না পারার গ্লানি তাঁর অনাবিল ঝর্ণা ধারার মত সঙ্গীত সৃজনে পড়তে দেননি বিন্দুমাত্র । ভিতরে ক্ষয় ধরলেও বাইরে তা প্রকাশ করেননি । বাংলা সঙ্গীত সৃজনের নিজস্বতায় রবীন্দ্রনাথের অবদান যতটা, ততটাই কাজী নজরুলেরও ।

বস্তুত গানের নজরুল এক বিস্ময়কর প্রতিভা । কাব্যের নজরুলের নির্মোহ আলোচনা কম হয়নি । রবীন্দ্র-উত্তর যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাস মনে করেছিলেন “তাঁর কবিতা চমৎকার কিন্তু মানোত্তীর্ণ নয়” । অবশ্য একথাও জীবনানন্দ বলেছিলেন যে “... এরকম পরিবেশে হয়তো শ্রেষ্ঠ কবিতা জন্মায় না কিংবা জন্মায়, কিন্তু মনন প্রতিভা ও অনুশীলিত সুস্থিরতার প্রয়োজন । নজরুলের তা ছিল না” । নির্ভুল মূল্যায়ন । শৈশব থেকে দারিদ্রের মুখোমুখি হয়ে মাত্র ৯বছর বয়সে পিতৃহারা নজরুল তাঁর বহুমুখী সৃজনশীলতা পাখনা মেলার মত আকাশের সন্ধান পেলেন না । ১৯১৯ থেকে ১৯২৮ - নজরুলের কাব্যজীবনের এই ৯ বছরের সময়কালেও কবেই বা সুস্থিতি পেয়েছিলেন তিনি ! করাচির সেনানিবাসের পাট চুকিয়ে ফিরে এলেন ২০বছর বয়সে, দেশ তখন উত্তাল । সদ্যগঠিত কম্যুনিষ্ট পার্টির সংঠন, কৃষক সমিতি, সাংবাদিকতা, স্থায়ী থাকার জায়গা নেই, উপার্জনের ব্যাবস্থা নেই । কাব্যসাধনার জন্য সুস্থিতি পাবেন কি করে ? এর সঙ্গে ছিল পত্রিকা সম্পাদনার ধকল, মৌলবাদী হিন্দু – মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের আক্রমণ, কারা বরণ । তথাপি বিস্ময়কর এই যে কি অমিত ঐশ্বর্য দান করে গিয়েছেন সেদিনের তরুণ প্রজন্মের কাছে । দেশ ও সমাজ প্রেম তাঁর কাব্যে মুক্তকন্ঠ সুস্পষ্টতা পেয়েছিল । সমবয়সী ভিন্ন ধারার কবি জীবনানন্দ দাস যেমন বলেছিলেন “ভাষা,ভাব বিশ্বাসের আশ্চর্য যৌবন রয়েছে এই কবিতাগুলির ভিতর”।

সুস্থিত হলেন তখন যখন তিনি ‘গানের নজরুল’ । যখন তিনি সুরের রাজা হয়ে আধুনিক বাংলা গানের স্বর্ণযুগ নির্মাণের প্রস্তুতি সারছেন । গান তাঁর ঝোড়ো জীবনেরও প্রধান সঙ্গী ছিল । গান তো নয় – দেশাত্মবোধের চারণমন্ত্র । ১৯১৯এ নেতাজি সুভাষচন্দ্র স্মৃতিচারণ করেছিলেন “আমরা যখন যুদ্ধে যাবো, তখন সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে । আমরা যখন কারাগারে যাবো, তখন তাঁর গান গাইবো” । গান তিনি ছেলেবেলা থেকেই গাইতেন, সুর করতেন । ১৯২০তে করাচির সেনানিবাস থেকে ফিরে আসার পর গান শুনিয়েই জয় করে নিয়েছিলেন কলকাতার বিদগ্ধ মহলকে । সভা-সমিতি কিংবা ঘরোরা সাহিত্য আড্ডায় তাঁর গানই থাকতো প্রবল আকর্ষণের কেন্দ্রে । নানান বিদগ্ধজনের স্মৃতিকথায় নজরুলের আপনভোলা গানপাগল মূর্তিটির ছবি লেখা আছে । মুজফফর আহমেদ লিখেছেন ‘কারখানার শ্রমিকরা পর্যন্ত ডেকে নিয়ে যেতেন নজরুলকে’। বুদ্ধদেব বসু তাঁর স্মৃতিচারণে জানিয়েছেন ‘নজরুল যে ঘরে ঢুকতেন সে ঘরের সবাই ঘড়ি দেখতে ভুলে যেতেন’ । অথচ প্রথাগত কোন সংগীত শিক্ষা তাঁর ছিল না । বাল্যেই পিতৃহারা, লেটোর দলে গান গাওয়া, পাঊরুটির কারখানায় কাজ করা কিংবা রেলের গার্ড সাহেবের ঘরে ফরমাস খাটা নজরুলের সামনে সে সুযোগ আসেনি । যেমন ছিলনা তাঁর কোন প্রথাগত ছাত্রজীবন । লেটোর দলে ঘুরে বেড়ানো বাউন্ডুলে নজরুল বাংলার মাটি থেকে তামাম লৌকিক সুর আত্মস্থ করেছিলেন । কিন্তু তাঁর সাংগীতিক প্রতিভার পটভুমি কিভাবে নির্মিত হয়েছিল তার কোন লেখাজোখা নেই । নজরুল স্মৃতির সবচেয়ে বিশ্বাস্য সূত্র মুজফফর আহমেদ তাঁর স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন যে কলকাতায় আসার পর রবীন্দ্রসংগীতই তাঁর পরিবেশনের শীর্ষস্থানে থাকত । তিনি নজরুলকে ‘রবীন্দ্র সংগীতের হাফেজ’ বলতেন । চুরুলিয়ার বাউন্ডুলে কৈশোর জীবনে কিংবা করাচির সেনা নিবাসে রবীন্দ্রনাথের গান কি করে আয়ত্ব করেছিলেন নজরুল, এ বড় বিস্ময় ! বাল্য ও কৈশোরে শুধু লেটোর দলের গানই নয়,কবিগান, ঢপ, কীর্তন, আখড়াই, ভাদু, মনসার গান,কাওয়ালি,ঝুমুর, পাঁচালি ইত্যাদি লোক আঙ্গিকের গান তিনি আত্মস্থ করেছিলেন যা পরবর্তী সময়ে ‘গানের নজরুল’কে নির্মাণ করেছিল ।

একথা বললে অতিউক্তি হবে না যে, নজরুলের সাংগীতিক প্রতিভাকে ভর করেই গ্রামফোন কোম্পানী বাংলা গানের বিপণন ব্যবসাকে প্রথম পোক্ত করতে পেরেছিল । গত শতকের বিশের দশকের মধ্যভাগ, বাঙালির গান শোনার কান সবে তৈরী হতে শুরু করেছে । কলকাতা বেতার ব্যবস্থা সবে শুরু হয়েছে ১৯২৭এর ১৬ই অগস্ট, বাংলা চলচ্চিত্র তখনও নির্বাক । ঠিক এই সময়েই অসামান্য সাঙ্গীতিক প্রতিভা নজরুলকে ‘শিকার’ করলো গ্রামফোন কোম্পানী । নজরুলেরও স্থায়ী উপার্জনের প্রয়োজন ছিল। কলের গানের বণিক নিংড়ে নিলো নজরুলকে । সেই সময় নজরুলের লেখা এবং তাঁর প্রশিক্ষণে গান রেকর্ড করার জন্য লাইন পড়ে যেতো, কারণ তাঁর রচনা ও সুর মানেই ছিল সেই শিল্পীর অবধারিত সাফল্য ও লোকপ্রিয়তা । তিরিশের দশকে সেকালের প্র্মুখ শিল্পীরা – আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, কমলা ঝরিয়া,কাশেম মল্লিক,আব্বাসউদ্দীন, যুথিকা রায়, মৃণালকান্তি ঘোষ,ধীরেন দাস, ফিরোজা বেগম, সুপ্রভা সরকার এবং আরো অনেকেই নজরুল গানের সার্থক শিল্পী রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন ।এঁরা সকলেই নজরুলের প্রশিক্ষণে গ্রামফোনে গান গেয়েছেন ।বস্তুত রবীন্দ্রগানের বাইরে আধুনিক বাংলা রেকর্ডের গানে কাব্যের লাবণ্য ও পরিশীলিত গায়ন ভঙ্গি প্রথম নিয়ে এসেছিলেন নজরুলই । চল্লিশ থেকে ষাট দশক পর্যন্ত যে সময়কালকে আমরা বলি বাংলা গানের স্বর্ণযুগ । সেই স্বর্ণযুগের গানের জলসায় তিনি নেই । কিন্তু সংশয়ের যায়গা নেই এই স্বর্ণযুগের প্রস্তুতিপর্ব সারা হয়েছিল নজরুলের হাতেই ।

রবীন্দ্রনাথ নিজের গানের ভবিষ্যৎ দেখেছিলেন – বলেছিলেন ‘বাঙালিকে সুখে দুঃখে আমার গানই গাইবে, এ গান তাদের গাইতেই হবে’ । নজরুলও তেমনই আত্মপ্রত্যয়ী ছিলেন । ১৯৩১এজনসাহিত্য সংসদের অধিবেশনের ভাষণে নজরুল আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলেছিলেন “সাহিত্যে দান আমার কতটুকু তা আমার জানা নেই, তবে এটুকু মনে আছে, সংগীতে আমি কিছু দিতে পেরেছি । সংগীতে যা দিয়েছি সে সম্বন্ধে আজ কোন আলোচনা না হলেও ভবিষ্যতে যখন আলোচনা হবে তখন আমার কথা সবাই মনে করবেন – এ বিশ্বাস আমার আছে” । রবীন্দ্রনাথের গানের কথা ও সুর সংরক্ষণের বন্দোবস্ত ছিল, শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর প্রয়াসে রবীন্দ্রনাথের গান পেয়েছে এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ কিন্তু নজরুলের গানের ক্ষেত্রে তা হয়নি । নজরুলের বহু গানের কথা ও সুর হারিয়ে গেছে, অনেক নজরুল ভক্ত তাঁর গানকে নিজের গান বলেও চালিয়ে দিয়েছেন একথাও শোনা যায় । নজরুলের অনভিজাত দিলখোলা জীবন যাপনই এরকম সুযোগ করে দিয়েছিল । দু খিলি জর্দাপান খাইয়েই নাকি গান লিখিয়ে নেওয়া যেত তাঁকে দিয়ে ।

গানের জগতে নজরুল ছিলেন মাত্র বারো বছর, আর এই অল্প সময়কালেই, বিপণনযোগ্য বাংলা গানের ভুবনকে শাসন করেছেন, ধারে কাছে কেউ ছিলেন না । রবীন্দ্রনাথও নয় । সত্য বটে, নজরুলের গানে রবীন্দ্রনাথের গানের মত আলোক সামান্য নান্দনিক স্পর্শ ছিল না । তাঁর গান ছিল স্বতস্ফূর্ত, সরল, আবেদনে প্রত্যক্ষ আর তাই শিক্ষিত, আশিক্ষিত সকলকেই স্পর্শ করে তাঁর গান । আধুনিক বাংলাগানের ক্ষেত্রে নজরুল জনপ্রিয়তার শিখরে উঠলেন আর এই সূত্রেই বাংলার বিদগ্ধ মহল ও তাঁর কবি বন্ধুদের কাছ থেকে পেলেন উপেক্ষা । তাঁরা অনেকেই দূরে সরে গেলেন । গ্রামফোন কোম্পানীর বেতনভোগী চাকুরে, বণিক কোম্পানীর নির্দেশমত হালকা চটুল গানের নির্মাণও তাকে করতে হয়েছিল পেটের দায়ে । বাংলা সংগীতের ভান্ডারকে নজরুল ঐশ্বর্যমন্ডিত করেছেন, কিন্তু গ্রামফোন কোম্পানীর বানিজ্যিক স্বার্থ মেটাতে গিয়ে কম মূল্য চোকাতে হয়নি নজরুলকে । সেই মূল্য তাঁর সমাজসচেতন গণমুখী কাব্যচেতনার সঙ্গে চির বিচ্ছেদ । ইসলামী গান, বাংলা গজল গানের জন্য বিরূপ হয়েছিলেন হিন্দুরা, তাঁর কবিবন্ধুরা আর শ্যামা সংগীত গান রচনার জন্য বিধর্মী আখ্যা পেয়েছিলেন মৌলবাদী মুসলিমদের কাছ থেকে । গানের নজরুলের কাছ থেকে তাঁর বন্ধুদের দূরে সরে যাওয়া বা রেকর্ড কোম্পানীর দাসত্ব মেনে নেওয়া নজরুলকে গ্লানিবোধে আক্রান্ত ও বিষাদগ্রস্ত করেছিল সেকথাও আমরা জানি । রবীন্দ্রনাথকে লেখা একটি পত্রে নজরুল লিখেছিলেন “গুরুদেব, বহুদিন আপনার শ্রীচরণ দর্শন করিনি । আমার ওপর হয়তো প্রসন্ন কাব্যলক্ষী হিজ মাস্টার্স ভয়সের কুকুরের ভয়ে আমাকে ত্যাগ করেছেন । কাজেই সাহিত্যের আসর থেকে আমি প্রায় স্বেচ্ছানির্বাসন নিয়েছি । ... আমার এক নির্ভিক বন্ধু আমাকে উল্লেখ করে একবার বলেছিলেন যাকে বিলিতি কুকুরে কামড়েছে তাকে আমাদের মাঝে নিতে ভয় হয় । সত্যি ভয় হবারই কথা, তবু কুকুরে কামড়ালে লোকে নাকি ক্ষিপ্ত হয়ে অন্যকে কামড়াবার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে । আমার কিন্তু সে শক্তি নেই, আমি হয়ে গেছি বীষ জর্জরিত নির্জীব” । (সূত্র – ‘অঞ্জলী লহ মোর সংগীতে’ / অরুণ কুমার বসু , ‘পুরশ্রী’ পত্রিকা, জুলাই ১৯৯৯ ) । আর্থিক অসাচ্ছল্য, পুত্র বুলবুলের অকাল মৃত্যু, নিকটজন ও কবিবন্ধুদের দূরে সরে যাওয়া, স্ত্রী প্রমিলার পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী হয়ে পড়া নজরুলকে ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত, বিষাদগ্রস্ত করেছিল । কিন্তু সেই ক্লান্তি, বিষাদের বিন্দুমাত্র ছায়াপাত তাঁর সংগীত সৃষ্টিতে পড়েনি । শুধু অফুরন্ত দিয়ে গেছেন বাংলা গানের ভান্ডারে । ভেতরের ক্ষয় গোপন করে শুধু রাশি রাশি দিয়ে গেছেন ।

গ্রামফোন রেকর্ডের গান নিশ্চিতভাবেই ‘গানের নজরুলের’ সামগ্রিক পরিচয় নয় । তাঁর জাগরণের গান, যৌবনের গান প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে প্রবাদের মত হয়ে আছে । সেখানে আজও তাঁর আসন অটল । নজরুলের সচেতন সৃষ্টির সময়কালই তো মাত্র ২১বছরের – ১৯২০ থেকে ১৯৪১ । ১৯৪২এর অগস্ট-সেপ্টেম্বর থেকে তিনি যখন বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন তখন তাঁর বয়স সবে বিয়াল্লিশ । ফুলের জলসায় নীরব কবি বেঁচেছিলেন আরো ৩৫ বছর । ১৯৭৬এর ২৯শে অগস্ট নজরুলের দেহাবসান হয় । সে তো তাঁর দেহের মৃত্যু । নজরুল ইসলাম বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন মৃত্যুঞ্জয়ী বীরের মর্যাদায় । বাংলার শেষ চারনকবিনজরুলের গান কিংবা গানের নজরুল সম্পর্কে কথা সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে উপসংহার টানি “...দুঃখের পথে আর এক পাথেয় নজরুলের গান । বুকভরা, কন্ঠভরা গান । অপরাজিত প্রাণের অনন্ত উদার জলোচ্ছ্বাস – রাত্রির সীমান্তে প্রভাতী পাখির কলধ্বনি” । (‘নজরুল স্মৃতি’)

কত শিল্পীকে যে নজরুল গানের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, কত শিল্পী যে তাঁর সুরে গান গেয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তার হিসেব আমরা সামান্যই জানি । নজরুলের স্নেহ-বৃত্তে থেকে যে সব শিল্পী প্রবাদ-প্রতীম হয়ে গেছে তাদের কয়েকজন হলেন ইন্দুবালা, আঙ্গুরবালা, কমলা ঝরিয়া, ধীরেন দাস, মৃণালকান্তি ঘোষ, কানন দেবী, ফিরোজা বেগম প্রমুখ । তাঁদের কয়েকজনের কথা আগামী পর্বে ।



(আগামী পর্বে ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’ : নজরুল-গানের তিন কন্যা আঙুরবালা, কমলা ঝরিয়া ফিরোজা বেগম)